এমন শহরও কি আছে, যেখানে গেলে জীবন থেকে হারানো সবই ফিরে পাওয়া যায়? কাকেদের রহস্যময় ভুবনে যার প্রবেশাধিকার মিলেছে, ওই লোকটাই বা কে? নীরদদের গ্যারেজে কেন ঘুমিয়ে থাকে একটা পরিত্যক্ত ডাটসান ব্লুবার্ড? এ কাহিনীর নামহীন কথক খুঁজে ফিরছে ধাঁধাঁর উত্তর। সে কি একজন ব্যক্তি? নাকি অখ্যাত কবি বিনয় মজুমদার, বেদেকন্যা মিতিয়া, চিরযৌবনা লীলা মজুমদার অথবা অসীম সরকার এবং ইলা রহমানেরা তারই এক-একটা সত্ত্বা? সকলের অলক্ষ্যে তার লুকনো গল্পগুলোকে যে নিংড়ে নিচ্ছে প্রতি রাতে, সেই অন্ধ ফকির কানা নেজামই বা কোথা থেকে এলো? রহস্য অভিযান, ফ্যান্টাসি, দার্শনিক জিজ্ঞাসা আর কিছু বিস্মৃত ইতিহাস মিলেমিশে এই উপন্যাস তৈরি করেছে এক পৌরাণিক কালো কৌতুকের জগত।
১. প্রকাশিত হওয়ার আগেই "চায়ের কাপে সাঁতার" নিয়ে কৌতূহল ছিলো অনেক। এ কারণে একটু ভয়েই ছিলাম। প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে তো বইটা? উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ। শুধু যে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে তা-ই নয়, এক উপন্যাসে এতো কিছু পেয়ে যাবো ভাবিনি।
২. জগদীশ গুপ্ত কেন মধ্যবয়সে লেখালেখি শুরু করলেন তা নিয়ে সাগরময় ঘোষের "সম্পাদকের বৈঠকে" বইতে একটা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা আছে। জগদীশ গুপ্ত গৃহস্থালি কাজে অমনোযোগী ছিলেন বলে তার স্ত্রী তাকে প্রায়ই খোটা দিতেন।তিনি ঝগড়া এড়াতে একদিন গল্প লিখতে শুরু করলেন। দেখলেন স্ত্রী কিছু বলছে না।এভাবেই তিনি গল্প লিখতে লিখতে পুরোদস্তুর সাহিত্যিক হয়ে গেলেন! এ ঘটনা জগদীশ গুপ্ত নিজে বললেও তা যে সত্য নয় তা বুঝতে জহুরি হতে হয় না। অন্তর্গত প্রবল তাড়না বা নিজেকে প্রকাশের সুতীব্র বাসনা না থাকলে যে জগদীশ গুপ্ত হওয়া যায় না তা তার পাঠকমাত্রেই জানেন।
এ বই পড়ার সময় মুরাকামি'র উপন্যাস সংক্রান্ত ভাবনাগুচ্ছ "নভেলিস্ট এজ এ ভোকেশন"ও পড়ছিলাম। সেখানে তিনি বলেছেন, "What I want to say is that in a certain sense, while the novelist is creating a novel, he is simultaneously being created by the novel as well." কীভাবে লেখক সৃষ্টি হচ্ছেন তার লেখার দ্বারা?মুরাকামি জানাচ্ছেন, উপন্যাস লেখার একটা পর্যায়ে উপন্যাসের ওপর লেখকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। লেখক তখন এমন সব আবেগ, এমন সব অপ্রকাশিত অনুভূতির ঘোরে পড়েন যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি নিজেই সচেতন ছিলেন না। অর্থাৎ জীবন ও জগতের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া করেন ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসের মাধ্যমে।সে বোঝাপড়ায় তিনি নিজেকেও আরেকটু ভালোভাবে আবিষ্কার করতে পারেন। উপন্যাস লেখা তাই একটি মানসভ্রমণ। এনামুল রেজা তার উপন্যাসে "চায়ের কাপে সাঁতার" এ আমাদের সঙ্গী করছেন সেই ভ্রমণে। কেন? সহজভাবে উত্তরটা তিনি নিজেই দিচ্ছেন উপন্যাসে, "যদিও জানি, মানুষের বলার মতো গল্প থাকুক আর না থাকুক, অন্যকে কিছু একটা শোনাতে সে চায়। শুনবার চেয়ে শোনাবার জন্য আমাদের মন আইটাই করে।" কী গল্প শোনাচ্ছেন তিনি? ফ্ল্যাপে লেখা আছে " রহস্য অভিযান, ফ্যান্টাসি, দার্শনিক জিজ্ঞাসা আর কিছু বিস্মৃত ইতিহাস মিলেমিশে এই উপন্যাসে তৈরি করেছে এক পৌরাণিক কালো কৌতুকের জগৎ।" উপন্যাসের কথক অনাম্নী। গল্পের মূল ঘটনাস্থল মায়ানগর। এই মায়ানগর আমাদের খুব চেনা। কথকের গল্পে একে একে ঢুকে পড়ছে কানা নেজাম, নীরদচন্দ্র মজুমদার, অসীম সরকার, লীলা মজুমদার, বিনয় মজুমদার, কাজী মাজনুনের অজাচারের গল্প। কানা নেজামের অকথ্য গালিগালাজ থেকে যে গল্প শুরু হয় তা একসময় পৌঁছে যায় ইতিহাসের অলিগলিতে। সাম্প্রতিক বিডিআর বিদ্রোহ, ছাত্র রাজনীতি, মায়ানগরে কথকের রহস্যময় থাকার জায়গা, নিগ্রহ, রূপকথার গল্প হয়ে বিনয় মজুমদারের হাত ধরে গল্প যাত্রা করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। কথকের ব্যক্তিগত যাত্রার সাথে সাথে গল্প হয়ে উঠছে আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইতিহাসের এক পুনর্নির্মাণ ( কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি আর কোথায় থাকবো?) বর্ষীয়সী লীলা মজুমদারের প্রতি কথকের নিষিদ্ধ টান, বিচিত্র সব স্থানে অসীম সরকারের জাদুমন্ত্রের মতো উদয় ও তিরোধান,নামহীনদের সভা, কাকবিশারদ, এলাকায় ঘটে যাওয়া নিতান্ত এক সাধারণ মারামারি থেকে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন লেখক? কথকের নিজেকে আবিষ্কারের যে যাত্রায় আমরা যাচ্ছি তার কি কোনো শেষ আছে? যা জানছি তা কি সত্য? ইতিহাসের চোরাগলিতে আমার কি জায়গা আছে?
এই বই পড়ার সময় হঠাৎ আমার এক ছাত্র প্রশ্ন করলো, "স্যার, বইটা কি পিঁপড়াদের নিয়ে?" আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, "তোমার কেন এইটা মাথায় আসলো? " ছাত্র বললো, "এই যে চায়ের কাপে সাঁতার! শুধু পিঁপড়ারাই চায়ের কাপে সাঁতার কাটে!" আমি ওকে বললাম, "পিঁপড়ার জন্য এই চায়ের কাপটাই অনেক বড় জায়গা। এখানেই তাকে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে আর সে চেষ্টা করছে বাঁচবার। পিঁপড়া কিন্তু মরার আগ পর্যন্ত হাল ছাড়ে না। আমাদের জীবনকে একটা চায়ের কাপ ধরে নাও।সেখানে সবাই মিলে সাঁতার কাটছি। হয়তো তীরে পৌঁছানো হবে না। কিন্তু যাত্রাটাই বা কম কি?"
এই সুদীর্ঘ উপন্যাসের বিচিত্র ও আপাত সম্পর্কহীন চরিত্র ও ঘটনাগুলোকে শেষ পর্যন্ত এনামুল রেজা যেখানে দাঁড় করিয়ে দিলেন তাতে সুস্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। আছে আরো প্রশ্ন। যা হয়তো আমাদের একদিন উত্তরের কাছে নিয়ে যাবে। ততোক্ষণ পর্যন্ত, সাঁতার কাটা যাক।
আমি গুডরিডসের এই তারকা পদ্ধতিতে চায়ের কাপে সাঁতার বইটাকে জাজ করতে পারব না। এনামুল ভাইয়ের বইটা পড়া শুরু করি আমি ফেব্রুয়ারিতে, সংগ্রহের পরপরই। একটু একটু করে প্রায় চার মাসে লাগিয়ে শেষ করলাম। এত লম্বা সময় একটা বইয়ের সাথে কাটালে আমার ক্ষেত্রে বইয়ের ভেতরের জগতের সাথে লীন হয়ে যায় বাস্তবতা। এক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছিল। পুরো জার্নিটাই ছিল অনেকটা ঘোরের মতন। বইয়ের প্রোটাগনিস্টের সাথে ঘোরের মধ্যে কেটেছে পুরোটা সময়। বিস্তারিত রিভিউ লিখব, একটু ঘোরটা কাটুক। ম্যাজিক রিয়ালিজম, লিটারেরি ফিকশন পছন্দ করেন, এমন যে কেউ চায়ের কাঁপে নির্দ্বিধায় সাঁতার কাটা শুরু করতে পারেন।
দুই সপ্তাহ সময় লাগল। এই সময়ের পুরোটাই কেঁটেছে চায়ের কাপে সাঁতারের চরিত্রদের সাথে। এক লাখ ত্রিশ হাজার শব্দের উপন্যাস, ৪৬৮ পৃষ্ঠার উপন্যাস, এত দ্রুত সময়ে শেষ করে ফেলেছি, বলাটা বাহুল্য যে কেমন লেগেছে। আমি আসলে এমন দীর্ঘ উপন্যাসই পড়তে চাই।
মানুষের জীবনে কতগুলো লেয়ার থাকে? এক তো অবশ্যই না। একের অধিক, কিংবা কখনো তারচেয়ে বেশি। আমরা খালি চোখে যাপন করি একটা জীবন, ভেতরের জীবন তারচেয়েও অনেক বেশি। রেজা এই মাল্টিলেয়ার জীবন নিয়েই ডিল করেছেন।
গল্প, তার ভেতরে গল্প, তার ভেতরেও গল্প। পরস্পর বিপরীতপমুখী গল্প। সুতো ছাড়তে ছাড়তে সুতো টেনে ধরার গল্প। অসাধারণ ন্যারেটিভ কৌশল, উইটি ভাষা, কালো কৌতুক, যৌনতার দুর্দান্ত ব্যবহার।
একটা উপন্যাসেই রেজা যেন রেখে গেলেন আরও অনেক উপন্যাসের বীজ। এমন একটা সৃষ্টি যার প্রতিটা চরিত্র নিয়ে হতে পারে আলাদা আলাদা উপন্যাস। কেবল পাঠ শেষ করে ওঠা। এই আবেশ আরও দীর্ঘক্ষণ থাকবে। ক্রাফটে রেজার দক্ষতা দেখে তার জন্য জমা থাকল ঈর্ষা।
ডাস্টকভার, স্পাইন, হার্ডকভার সবই ঠিক ছিল। কিন্তু নিজেকে হারানো শুরু করি ঠিক যেখান থেকে শুরু হয় মায়ার গল্প। মায়ার গল্প কোথা থেকে শুরু হয় জানেন? আমার তো মনে হয় লেখকের লেখা প্রথম অক্ষর থেকেই। আস্তে আস্তে সে গল্পও ঝাপসা হতে শুরু করে আর পরাবাস্তব জগৎ এর সাথে শুরু হয় মিলে মিশে যাওয়ার খেলা। Bang bang. He shot me down Bang bang. I hit the ground Bang bang. That awful sound Bang bang. My baby shot me down'
নেজাম, অসীম, ইলা, বিনয়, নিরদ, কাকবিশারদ এমনকি লীলা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে তাদের গল্পের গভীর জগৎ এ। গল্পের জগৎ তৈরী করতে হলে গল্প বলা কিন্তু জরুরি নয়। জানিনা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে লেখক শব্দের যে খেলা করেছেন, মনে যতটা দাগ কেটেছে তা কি লেখক মেলানোর চেষ্টা করেছেন? করুক বা না করুক, অনেক সময় আছে সাতার কাটার৷ জীবনের কুয়ো তে সাতার কাটতে কাটতে কখনো উত্তর পেলে জানিয়ে দেব উত্তর না খোজা কারোর কাছে।
❝যদি জোটে একটা পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি জোটে যদি এরও অধিক আমায় ভিক্ষা দিও অনুরাগী❞
বেশ কয়েকদিন ধরে পড়ছিলাম এনামুল রেজার “চায়ের কাপে সাঁতার”। একজন লেখককে সামনাসামনি চেনার ঝামেলা অনেক – তাঁর বইটার ব্যাপারে নেতিবাচক কিছু লেখার আগে একটু হলেও মন খচখচ করে। এজন্য চেষ্টা করি রিভিউ লেখার সময় ব্যক্তি মানুষ লেখককে ভুলে থাকার। রেজার বইটা নিয়ে লেখার সময় কথাটা মাথায় রাখছি।
আমি আসলে এ জীবনে বুঝে উঠতে পারলাম না গল্প আর গদ্য এই দুয়ের মধ্যে কোন জিনিসটা আমার বেশি ভালো লাগে। আমার এক বান্ধবী বলে আমি নাকি আমার প্রিয় লেখক রশীদ করিমকে বলি শুধু মাত্র ব্যতিক্রম হওয়ার জন্য। কিন্তু সত্যিই রশীদ করিমের গদ্য আমার এতো ভালো লাগে যে মনে হয় এক টুকরা ইটের বর্ণানা দিলেও আমি হা করে পড়ব। আবার আমার আরেকজন প্রিয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ – যিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্পকারদের একজন। “চায়ের কাপে সাঁতার” বইটাকেও দুই আঙ্গিক থেকে বিচার করা যায়। অরৈখিক ভাবে লেখা হলেও “চায়ের কাপে সাঁতার” উপন্যাসটার প্লটের একটা স্ট্রাকচার আমরা দাঁড়া করাতে পারি। ধরে নিচ্ছি প্রথম চ্যাপ্টারটা (শহর ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা) যেখানে কানা নেজাম কথকের বাসায় দাওয়াত খেতে আসে সেটা হচ্ছে এ গল্পের অ্যাবসোল্যুট বর্তমান। এ পর্যায়ে কথক চাকুরীজীবি, বয়স ২৭। একটু পেছনে পেছালে পাব কয়েকদিন আগের অতীত যখন সুপর্ণাকে ঝাড়ি দিচ্ছেন লীলা মজুমদার, রাতভর বিনয় মজুমদার গল্প করছেন কথকের সাথে (সেখান থেকে তাঁর যুবক জীবনের গল্প, মিতিয়া, আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প আসবে শাখা প্রশাখার মতো), নামহীনদের সভায় যাওয়া ইত্যাদি। বর্তমান আর অল্প আগের অতীতে অসীম সরকার অনুপস্থিত। এর কয়েক বছর আগের (অনুমান করছি ৭-৮ বছর) অতীতে দেখা যাচ্ছে নদ্দা বুড়ি খুন হয়েছে, ধারনা করা হচ্ছে যে ছুরিটা দিয়ে খুনটা হয়েছে সেটা লুকাতে এসে অসীম সকারের মাধ্যমে নীরদচন্দ্রের সাথে কথকের পরিচয় হয়, সেই থেকে লীলা-বিনয়ের বাড়িতে সাবলেট ভাড়া থাকার শুরু কথকের। যেহেতু টিউশনি করে ভাড়া মেটানোর কথা বলা হচ্ছে ধরে নিচ্ছি এই অংশে অসীম-ইলা-কথক সবাই স্নাতকের ছাত্র-ছাত্রী। এরও কয়েক বছর আগে কলেজে ভর্তি হতে পুবপাড়া থেকে মায়ানগরে আসে কথক, সেদিনই ট্রেনে অসীম সরকার আর ইলা রহমানের সাথে পরিচয় হয় তার। এরপর পরই থাকবে মায়ানগরে শুরুর দিকে নেসার গাজী হোটেলের দিন গুলির গল্প। আসবে নৃপেণ ভট্ট, জাহানারা ম্যাডাম সহ আরও অনেকে, আসবে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা। অন্যদিকে আমাদের অ্যাবসোল্যুট বর্তমান থেকে একটু সামনে মানে ভবিষ্যতে আগালে আমরা পাব রড দিয়ে বাড়ি খাওয়া কিশোরের মরো মরো অবস্থা, কাকবিশারদ মানে নীরদচন্দ্রের মামার আগমন, কাকবিশারদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির কাহিনি, নীরদের বিয়ে, কথকের পালিয়ে বেড়ানো আর একদম শেষ চ্যাপ্টারে গল্পের সমাপ্তি। তবে খাপছাড়া ভাবে একটা অধ্যায় আছে যেটা আসলে আরও বেশ খানিকটা দূরের ভবিষ্যতের একটা দিন যেখানে দেখা যাচ্ছে কাকবিশারদের যক্ষার চিকিৎসা চলছে আর কথক তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গেছে (প্রভুভক্ত কুকুরের প্রভু)। আবার এই চ্যাপ্টারেই (যেটা অনেক দূরের ভবিষ্যত আমার মনে হয়েছে) কাকবিশারদ বলছেন – “আবার যখন হের দেখা তুমি পাইবা তখন জানবা” – যেটা আবার গল্পের শেষ লাইনে আবার বলা হয়েছে (হিসাবে আমার কাছে সেটা অল্পদূরের ভবিষ্যত)। এখানে লেখক ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত একটা logical fallacy সৃষ্টি করেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে।
“চায়ের কাপে সাঁতার” এর কাহিনির অবতারণা একেবারেই রৈখিকতার ধার ধারেনি। আগের গল্প পরে, পরের গল্প আগে – এভাবে এগিয়ে গেলেও শেষতক সব গুলো ডট সুন্দর ভাবে কানেক্ট করেছেন লেখক। যেমন – কথক বিনয় মজুমদারকে এক রাতে বলছেন কাজী মাজনুন হকের ব্যানড উপন্যাস রক্তিম চন্দ্রালোকে কিভাবে কলেজের লাইব্রেরিতে একটা পত্রিকায় পড়েছিলেন (এই ঘটনাটা আগে বলা আছে, সম্ভবত বইয়ের মাঝামাঝি কোথাও)। আবার বেশ কয়েক চ্যাপ্টার পরে যেয়ে প্রায় শেষের দিকে কলেজ লাইব্রেরিতে ওই পত্রিকাতে উপন্যাসটা পড়ার ঘটনাটা বর্ণনা করেছেন। এরকম আরও উদাহরণ আছে। তবে অরৈখিক ভাবে লিখলেও কোথাও কোন “loose end” রাখেননি – কোন ঘটনার অবতারণা করেছেন আর সেটার কোন সমাপ্তি দেননি এমন হয়নি। যদিও অসীম সরকারের অন্তর্ধানের কারনটা একটা রহস্যের মত ছেড়ে দিয়েছেন লেখক। এটাকে অবশ্যই লুজ এন্ড বলতে পারছি না। যেমন – অসীমের সাথে শেষ কথপোকখনের পরে ইলা রহমান বলছে, “তোর বন্ধু কী করেছে শুনবি? সাহস আছে তোর শুনবার?” – এই কী করেছে অসীম সে ব্যাপারে কল্পনা করে নেয়ার স্বাধীনতা ইচ্ছা করেই মনে হয় তুলে দিয়েছেন রেজা তাঁর পাঠকদের হাতে। আবার নেসার গাজী হোটেলে রহস্যময়ী নারীর পিছে পেঁচানো সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বিডিআর বিদ্রোহের রাতে কিভাবে ডাস্টবিনে পৌছে গেলেন কথক - এখানেও পাঠকের কল্পনার জন্য জায়গা ছেড়েছেন রেজা।
পুরো বইটাতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেখা যায় বেশ অনেক গুলো। আপাতত ধরে নিচ্ছি নামহীন কথক, অসীম সরকার, কানা নেজাম এদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন। যেহেতু অনেকগুলো টাইমলাইনে কাহিনি চলছে চরিত্র গুলোকে সময় আর পটভূমি অনুসারে ডেভেলপ করার একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো রেজার সামনে। অথচ এইক্ষেত্রে খুব সাবলীল ভাবেই তিনি উতরে গেছেন। character development এ তাঁর সূক্ষ্ম ডিটেইল গুলো ছিলো চোখে পড়ার মত। যেমন – মায়ানগরে ছয় মাস কাটিয়ে কথক যখন গেছে পুবপাড়ায় তখন তাকে সবাই বলছে তুমি শুকিয়ে গেছো (সে বয়সে আমরা সবাই যেমন কম বেশি হালকা পাতলা রোগা থাকি) আবার ২৭ বছরের কাহিনিতে দেখা যাচ্ছে ইলা রহমান তাকে বলছে “মোটা হচ্ছো” (যেমনটা ওই বয়সটায় আমরা হয়ে থাকি)। এই ডিটেইল গুলো অনেক সময় পাঠকদের চোখেও পড়ে না তবে এসব সচেতন ভাবে যখন লেখকেরা লেখেন তখন তার ক্র্যাফটের প্রতি এমনিতেই শ্রদ্ধা চলে আসে। আবার দেখা যায় ম্যাচুরিটিরও একটা গ্রাফ দেখতে পাই চরিত্রগুলোর সময়ের সাথে – যেমন রেপের ঘটনাটা ওই সময় কথক অসীমকে বলতে পারে না কিন্তু ভবিষ্যতের কাহিনিতে সেই লজ্জা কাটিয়ে ঘটনাটা সে বলে। ইলাকেও দেখা যায় উচ্ছল কিশোরী থেকে নারীতে পরিণত হতে। তবে অসীমকে কিশোর বয়স-যুবক বয়স সব সময়ই বেশ পাকনা দেখা যায়। আবার এই বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হল জাদুবাস্তবতা - নেসার গাজীর হোটেলের করিডোরের রহস্যময়ী নারী যে খোঁজ দেবে এমন পৃথিবীর যেখানে হারানো সব কিছু পাওয়া যায়, কানা নেজামের ভিডিও ক্যাসেটের উদ্ভট দোকান, কথা বলা কুকুর, কথা বলা কাক আরও অনেক প্রসংগে আসবে জাদুবাস্তবের উদাহরণ। এখনকার সময়ে জাদুবাস্তবতা নিয়ে কাজ করেছেন এমন লেখক কম হবে না কিন্তু তেমন কেউই ভালো করে কাজটা করতে পারেননি। এটা জাদুবাস্তব - শুধু জাদুও না, শুধু বাস্তবও না। রেজা এদিক থেকে আবারও প্রসংশা পাবেন কারন "চায়ের কাপে সাঁতার"এর magic realism is magical, yet it is very grounded to reality. এখানে রেজা অবশ্যই সার্থক।
জানামতে রেজা প্রচুর পড়েন আর লেখক মাত্রেই পঠনপাঠন তাঁর শক্তির জায়গা। আর রেজার লেখায় তাঁর পড়া অন্যান্য লেখকদের ছায়া থাকবে না এটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। তাই কখনও মনে হয় হুমায়ূন আহমেদকে পড়ছি – চরিত্রগুলোর কথপোকথন, কথকের হিমু হিমু ভাব, হালকা আলাপের মধ্যে দিয়ে বড় বড় দার্শনিক আলাপ নিয়ে আসা এসব ট্রোপ আমাকে হুমায়ূন আহমেদকেই মনে করিয়ে দেয়। আবার ডেকে নিয়ে আসেন হারুকি মুরাকামি কে – মুরাকামির বইতে যেমন করে রহস্যময় বিড়াল থাকে, কুয়া থাকে - রেজা এনেছেন কাক। আবার রেজার বইতে খুবই উইয়ার্ড সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের অবতারণা রয়েছে সেটাও মুরাকামির বইয়ের কমন একটা ট্রোপ। আবার কার্ট ভোনাগাট যেমন নিয়ে আসেন কাল্পনিক লেখক Kilgore Trout কে, রেজা নিয়ে এসেছেন ঐরাবত প্রদোষ আর কাজী মাজনুন হককে। আমার ভবিষ্যত বাণী বলে রেজা সামনের বই গুলোতেও এদের কাউকে না কাউকে বা দুজনকেই আবার নিয়ে আসবেন। পঠিত লেখকদের ছায়া নিজের লেখায় থাকাটা কোন ভাবেই খারাপ কিছু না – কাকফা, রবীন্দ্রনাথদের লেখার ছায়া আছে অনেক বড় বড় লেখকের লেখায়। আমার কাছে বরং এসব দেখে রেজার পঠন পাঠনের প্রতি আরও আস্থা তৈরী হয়েছে। আর সবকিছুর উর্ধ্বে বলা যায়, রেজার লেখায় নিজেস্বতা আছে। এ ব্যাপারে ইয়াসিন রেজার রিভিউ থেকে কথাটা ধার করলাম- (উনার রিভিউয়ের লিংকটা রইল এখানে) “সাহিত্যে মৌলিকত্ব বজায় রাখা খুব কঠিন জিনিস। পূর্ববর্তী মহান সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ মহৎ লেখক হতে পারেননা আবার লেখায় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে অনবদ্য কিছু সৃষ্টিকরা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। ' চায়ের কাপে সাঁতার' একান্ত ভাবেই এনামুল রেজার নিজস্ব সৃষ্টি।”
আরেকটা জিনিষ আমার এই বইতে খুব আশ্চর্য লেগেছে। আমাদের সময়ে যেসব লেখক-লেখিকারা লেখেন, তাদের তেমন কাউকেই দেখিনি খুব অপকটে যৌনতার কথা লিখতে পারেন। এর কারন হিসেবে আমার মনে হয় আমরা যে জেনারেশন থেকে উঠে এসেছি – সব সময় “ভালো ছেলে” বা “ভালো মেয়ে” হওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেখানে। আমাদের জেনারেশনের কেউ লিখতে বসলেই হয়ত ভাবেন যে বইটা বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্নীয়রা পড়বেন, তারা কী মনে করবেন আমি অশ্লীল কিছু লিখলে। রেজাকে দেখলাম তার ব্যতিক্রম – অবলীলায় তিনি প্রকাশ করছেন কথকের যৌন চেতনা কে (আবার ভালগারও নয়)। রেজা যে তার সোস্যাল কন্ডিশনিং থেকে বের হয়ে এরকম লেখার সাহস করেছে এটাও বিরাট একটা ব্যাপার। এটা শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে নয়, যেকোন সামাজিক সংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে লেখকরা যখন লিখতে পারেন সেটা সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য।
আমার কাছে মনে হয়েছে “চায়ের কাপে সাঁতার”এর একটা নেতিবাচক দিক– এর কোন নির্দিষ্ট গল্প নেই, বরং বলা যায় it’s a humongous buffet of stories, তাই ভুরিভোজ হয়েছে ভালই কিন্তু ব্যুফেতে যেমন কোন একটা ডিশকে অ্যাপ্রিসিয়েট করা যায় না, “চায়ের কাপে সাঁতার” বইতেও কোন একটা গল্পে ফোকাস করা যায় না। আমার মতো পাঠক যারা- যারা বই পড়েই “তারপর কী হলো”, “তারপর কী হলো” এই মোটিভেশনের কারনে (সত্যি বলতে এরা কোন ভাবেই প্রথম, এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠকদের কাতারে পড়ে না!), তাদের জন্য বইটা একবার হাত থেকে নামিয়ে পরের বার হাতে তুলে নিতে কষ্ট হবে। আর পড়ার জার্নিটাও হয়েছে একটু ক্লান্তিকর। তবে সেটা ভালো লিটারেচারে যেমনটা ঘটে – “healthy boredom”, সে গোত্রেই ফেলা যায়।
আর এই বইতে সবাই এতো চা খায় বাপরে বাপ! আবার চরিত্রের সাথে সাথে চায়ের ধরনও পালটে যায় – কখনও চলে চিনি ছাড়া কন্ডেন্সড মিল্কের চা, কখন পুদিনাপাতা, আদাকুচি দিয়ে রঙ চা, কখনও শুধু লিকার চা। বইয়ে চায়ের উল্লেখ থাকলে আমরাও চা খেতে ইচ্ছা করে। and if I had taken a sip every time tea is mentioned in this book …তাইলে এতোক্ষণে রক্তণাপ্রলীতে চা বয়ে যেতো আমার। “চায়ের কাপে সাঁতার” নামটা সার্থকই বটে।
“চায়ের কাপে সাঁতার”এর আরেকটা মজার ব্যাপার হল – এটা আমার কাছে বিগত কয়েক বছরে পড়া সবচেয়ে “giftable” বই। একটু বেশি বাজেটে দিতে চাইলে যে কাউকে এই বইটা উপহার দেয়া যায়। একেবারেই বই পড়ে না, আগে পড়ত এখন পড়ে না, কখনও বই পড়েনি কিন্তু পড়া শুরু করতে চাইছে, সাময়িক পড়ুয়া, পাঁড় পড়ুয়া – যে কেউ উপভোগ করবে এমন উপাদান আছে এই বইটাতে। এভাবেও লিখতে পারে যায় – সেটা চাট্টিখানি কথা নয়। বইটার ভাষা খুব সহজ – বর্তমান সময়ের বিশিষ্ট লেখক সুহান রিজওয়ান যেমনটা বলেছেন যে রেজা যেন সচেতন ভাবেই এড়িয়ে চলেন ভাষার উচ্চাভিলাষ (সুহানের রিভিউটা এখানে থাকল)। সব মিলিয়ে এই বইটা “cult favorite” হয়ে উঠলে আমি খুব একটা অবাক হব না।
বইয়ের নাম: চায়ের কাপে সাতার লেখক: এনামুল রেজা প্রকাশনী: আদর্শ প্রকাশকাল: ২০২৩ রেটিং: ৫/৫ কখনো কখনো একগুচ্ছ গল্প লেখকের উপর ভর করে, লেখক ঠিক নিজেও জানেন না কি লিখছেন। ❝চায়ের কাপে সাঁতার❞বইটি অনেকটা ঠিক এরকম। অনেকটা ডিস্টোপিয়ান ধাচের এক শহর 'মায়ানগর'- গ্রাম থেকে শহরে আসা, নামহীন এক কথকের মনের টুকরো টুকরো কথা- কিছু ঘটনা - কিছু গল্প- কিছু চরিত্র! কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন! এই নিয়েই অল্প করে ডুব দিতে হবে চায়ের কাপে!
❝জীবন সাঁতার। জীবন বিবিধ রকম পানিতে সাঁতার। কানা নেজাম এক ধরনের পানিতে। অসীম এক ধরনের পানিতে। বিনয় মজুমদার আর লীলা মজুমদারের পানিও ভিন্ন। ভিন্ন নীরদ আর সুপর্ণার সাঁতারের পানি। কিন্তু সবার একটা কমন সুইমিং পুল আছে। সেই কমন জলাধারটা কোথায়?❞
গল্পের শুরু হয়েছে এক অন্ধ ফকির 'কানা নেজাম' এর সাথে কথকের কথোপকথন দিয়ে। হঠাৎ রাস্তায় মারা পড়ল এক বেওয়ারিশ কুকুর- তার থেকে মারামারিতে লাশ পড়ল স্থানীয় এক কিশোরের- খুব অদ্ভুত তাই না? ধীরে ধীরে প্রেক্ষাপটে আসতে লাগল নামহীন গল্পকথকের বন্ধু নীরদ, তার বাবা বিনয় মজুমদার, মা লীলা-হারিয়ে যাওয়া বন্ধু অসীম সরকার,তার প্রেমিকা ইলা, সাথে আছে এক কাকবিশারদ- যিনি কথা বলতে পারেন কাকেদের সাথে- যাকে একদিন গল্প বলতে ডাকা হয় নামহীনদের সভায়, শহরের প্রাচীনতম বটবৃক্ষের ছায়ায়। গল্প আগাতে থাকে সবার ফ্লাশব্যাক কাহিনির মধ্যে! কখনো রয়েল বেঙ্গলের পেট এ করে কথকের শহরে পদার্পণ - কখনো ফিরে যাওয়া সে নেসার গাজির হোটেলে- কখনোবা এসে যায় লীলা মজুমদারকে নিয়ে কথকের অবচেতন মনের ফ্যান্টাসি! কখনো ধরা দেয় দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন সময়ে ভিন্ন আঙ্গিকে- মুগ্ধ করে রাখে পাঠককে।
উপন্যাসের টাইমফ্রেমের কথা চিন্তা করলে, দুইদিকে এগিয়েছে গল্পগুলো, একটা হলো মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা, যা বিনয় মজুমদার বলেছেন কথককে, আরেকটি হলো বর্তমান সময়ের, যে সময়ের সারথি হলো আমাদের গল্প কথক। যদিও মায়ানগর শহরটি কাল্পনিক, তবুও তা মনে করে দেয় মৃতপ্রায় নগর ঢাকা- যেখানে আটটা- পাচটার ঘড়িতে জীবন বন্দী।এসেছে বিগত দশকের কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা, অবশ্যই তা কুয়াশার চাদরে পরিচয় লুকিয��ে। তবে, ' চায়ের কাপে সাতার ' কিন্তু ইতিহাস আশ্রিত কোনো উপন্যাস নয়- বরং এগুলো হলো গল্পের মধ্যে এসে পড়া কিছু উপগল্প, যেগুলোতে লেখক মিলিয়ে দিয়েছেন তার চরিত্রগুলোকে। হয়ত লেখক নিজেও উপেক্ষা করতে পারেন নি প্রবাহমান সময়কে।
তাহলে এখন যে কেউ, জিজ্ঞেস করতেই পারেন - এই প্রায় পাচশ পৃষ্ঠার উপন্যাসের প্লট কি? - যদি বলি, উপন্যাসটি একটা কুকুর ও একদল কাকের গল্প? অবাক লাগার মতোই প্লট। নাকি এক পাগল গল্পকারের গল্প, যার ভিতর জমে আছে এক রাশ গল্প? নাকি বলব শহুরে জীবনের নিঃসঙ্গতা আর এক সমুদ্র হতাশার গল্প- নাকি ক্রমাগত পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার গল্প- নাকি ম্যাজিক রিয়েলিজমে ঢাকা এক ডিস্টোপিয়ান সমাজের গল্প? - আসলেই ঠিক কোন জনরা তে পড়বে, তা নিয়ে রীতিমতো যুক্তিতর্ক করতে হবে, তা না হয় পরবর্তীতে যারা বইটি পড়বে, তাদের উপর ছেড়ে দিলাম।
বইটির সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে, জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে দেখা। লেখকের নিজের ভাবনাগুলো এসেছে চরিত্রগুলোর মুখে, এত বড় উপন্যাস পড়তে একবারও থেমে যেতে হয়নি- একদম সাবলীল লেখনি।অনেক কথা একদম মনে গেথে যাওয়ার মতো- কিছু লাইন তুলে দিলাম পোস্টের শেষে।
বইমেলার শুরু থেকেই বইটি নিয়ে অনেক আগ্রহ ছিল সবার। হবেই না কেন? একজন লেখক যখন তার প্রথম বই প্রকাশের ছয় বছর পর দ্বিতীয় বই বের করেন, তখন তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। অবশ্য লেখকের নিজের জন্য তা একটা কঠিন পরীক্ষা। আমার মতে লেখক এনামুল রেজা সে বৈতরণী ঠিকভাবে পার করে এসেছেন এই মাস্টারপিস বইটির মাধ্যমে। অনেকদিন মনের গভীরে দাগ কেটে রাখবে বইটি। একজনের রিভিউ-এ দেখলাম বার বার ফিরে আসতে হবে বইটির কাছে- তা আসলেই সত্যি। লেখকের জন্য অনেক শুভকামনা।
তবে সবশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল:
আসলেই কি কথক নামহীন? নাকি পুরো গল্পের খন্ড খন্ড চরিত্রগুলো লেখকের মনের বিভিন্ন দিক?
২।'‘জীবন সেই ট্রেনটার মতো, যা সকল স্টেশনে থামতে পারে কিন্তু কোথাও তার নিশ্চিত আশ্ৰয় নেই।”
৩।গভীরে ডুব দিলে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু কি আছে? প্রকৃতি কখনো অন্ধকার এবং আমাদের কখনো অন্ধ করে রাখাতেই তার সুখ, এমনই মনে হয়
৪।আমরা এতক্ষণ যে একে অন্যের সঙ্গ পেয়েছি, আমাদের মধ্যে বাড়ছিল বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা। জীবনও এমন। গন্তব্যের যত কাছাকাছি আসে মানুষ, ততই নিঃসঙ্গ হতে থাকে।
৫।মানুষে মানুষে দুরত্ব কীভাবে তৈরি হয়? একসাথে অনেক বছর পাশাপাশি কাটানোর পর অকস্মাৎ কি আমরা আবিষ্কার করি যে জীবন বদলে গিয়েছে? এই আমার সঙ্গে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল একটা মানুষ, অতঃপর কোনো হেমন্তের বিকেলে কি নিজেকে দেখতে পাই চায়ের কাপ হাতে আমি একাই বসে আছি বারান্দায়? আর কোথাও নেই কেউ। সেখানে বসে আকাশ দেখা যায় না, আকাশ ঢেকে রাখে বিকটাকৃতির সব দানব। ওদের কংক্রিটের শরীর, পেটে কত গুপ্তকুঠুরি, শরীরে কেটে বসানো শতেক জানালা ।
I hereby declare today that this book is one of the finest novels of this year.
চায়ের কাপে সাঁতার ছিল এবারের বইমেলার সবচেয়ে অ্যান্টিসিপেটেড বইগুলোর একটা। তাই জোগাড়ও করেছিলাম বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে। বইমেলায় আদর্শ স্টল পায় নি, তাই ওদের কাঁটাবনে প্রকাশনীখানা অনেক খোঁজাখুঁজি করে সেখান থেকেই কিনতে হলো। যত না জলদি তে বইখানা জোগাড় করেছি তত জলদি পড়া হয়ে উঠেনি। কেনার পর বসে এক নিমিষেই প্রথম পঞ্চাশ পাতা শেষ হয়ে গেল। ভাবলাম, নাহ, এত জলদি এই বই শেষ হতে দেয়া যাবে না৷ লেখনী আমাকে জলের মতন ভাসিয়ে বইয়ের শেষ কিনারায় নিয়ে যাবে। বইখানা জলদি শেষ হওয়ার বেদনা তখন চিনচিন করে উঠবে।
বেশ কয়েকমাস যখন আবার পড়তে বসলাম, কাক বিশারদ, কানা নেজাম, নেসার গাজীর হোটেল মিলিয়ে অদ্ভুতভাবে কাহিনী খানা আবার শুরু হলো। নীরদের বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার কাহিনিটুকুই তো বিশাল নাটকীয়। নাটকীয় আখ্যান পুরো উপন্যাস জুড়ে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের "নিরুদ্দেশ যাত্রা" গল্পটা আমার খুবই পছন্দের। সেটির শুরু হয়েছিল, "এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হল" লাইনটুকু দিয়ে। চায়ের কাপে সাঁতার শুরু হলো "যেমনটা ভেবেছিলাম, সেরকম বৃষ্টি হলো না" দিয়ে। বৃষ্টি দিয়ে শুরু করা আখ্যানের মাঝে কি বৃষ্টির মতন স্নিগ্ধতা কাজ করে? স্নিগ্ধ লেখনীর জাদুতে ধীরে ধীরে উপন্যাসের কাহিনী যখন অগ্রসরমান, উপন্যাসের চরিত্ররা তখন আমাদের সামনে ধীরে ধীরে ধন্না দিয়েছে। ম্যালা কিসিমের সব চরিত্র। চিরযৌবনা লীলা মজুমদার, অসীম সরকার, ইলা রহমান কিংবা নীরদ। কাজী মাজনুনের রক্তিম চন্দ্রালোকে কাহাদের মুখে সকলের চেহারা মিল হয়ে যাওয়াতে মনে হলো, মানুষ মাত্রই মুখোশ পরিধানকারী। মুখোশ হটে গেলে হিংসা, কাম, লোভাতুর সকলের অবিকল চেহারাই হয়ত বেরিয়ে আসবে। মাজনুন সাহেব সেই মুখোশটুকুকে খুলে সমাজের চিত্র দেখাতে চেয়েছিলেন। লেখক মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিডিআর বিদ্রোহ সময়ের প্রেক্ষিতে সবই তুলে ধরেছেন। টাইম ফ্রেমের পরিবর্তনে চরিত্রগুলোর বয়ানে কাহিনীতে মোচড়ের সৃষ্টি হচ্ছিল। সবচেয়ে ভাল লেগেছে, বিনয় মজুমদারের পার্টটুকু। রোমাঞ্চকর এক জীবনের যাত্রা অতিক্রম কাটিয়েছেন বিনয়বাবু। মিতিয়ার অংশটুকুতে দুঃখ লেগেছে বড়। অবশ্য গল্পের নায়কও কম যায় কিসে। ইলা রহমানের সাথে দেখা হওয়ার ঘটনায় অসীমের মতন আমিও আঁতকে উঠেছিলাম। মায়ানগর ব্যবহার করার কারণে প্রথমে একটু হোঁচট খাচ্ছিলাম, ভাবছিলাম মিরপুর মায়ানগরে কিভাবে যাতায়াত সম্ভব। পরে অবশ্য আঁচ করতে পেরেছি, ঢাকা শহরেরই রূপক নামকরণ মায়ানগর। উপন্যাসের শেষাংশে অসীম কিংবা ইলার সাথে যে ট্রায়ো দিয়ে রহস্যময়তা সৃষ্টি তাতে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে বারে বারে, আদৌ কি এরা বাস্তবিক চরিত্র নাকি গল্পকথকের কল্পনা।
ঝিকঝিক করে যেমন ট্রেন চলে তেমনি শব্দগুলোর ঝনঝনানি তে কাহিনী এগিয়েছে। দুর্দান্ত এক লেখনী। বহুদিন পর ঢাউস সাইজের কোন বই একদিনে শেষ করলাম। এই বই আপনাকে ভাবাবে, উপন্যাসের গভীরতায় তলিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর, ঘোরলাগা যে পরিণতির দিকে আমরা সকলেই মুখিয়ে থাকি, সে পরিণতিতেই উপন্যাসের যবনিকাপাত ঘটেছে। বলা চলে, একটি পরিপূর্ণ উপন্যাস।
সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে অনেকেরই বিস্তর অভিযোগ। ভালো লেখা হচ্ছেনা হ্যানত্যান। মজার ব্যাপার হচ্ছে সাহিত্যের ইতিহাসে যে যুগকে একসময় স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয়, সেসময়কালেও কিছু মানুষ থাকে যারা এসব বলে থাকে। আমার কথার মানে হচ্ছে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সবটাই বর্জ্যপদার্থ বলে যারা সমসাময়িক সাহিত্যকে বাতিল করে দেন তাদের ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। সত্যিকার ভালো উপন্যাস লেখা হচ্ছে এবং বাংলা সাহিত্যে এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। এনামুল রেজা'র ' চায়ের কাপে সাঁতার' কে আমার একখান খাঁটি উপন্যাস বলে মনে হয়েছে। সেইসঙ্গে বছরের অন্যতম সেরা তো বটেই।
সাহিত্যে মৌলিকত্ব বজায় রাখা খুব কঠিন জিনিস। পূর্ববর্তী মহান সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ মহৎ লেখক হতে পারেননা আবার লেখায় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে অনবদ্য কি��ু সৃষ্টিকরা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। ' চায়ের কাপে সাঁতার' একান্ত ভাবেই এনামুল রেজার নিজস্ব সৃষ্টি। কিছুটা আত্মজীবনীমূলক ও বটে। উপন্যাসের প্লট, ভাষারীতি আর অ্যাখানের রহস্যময়তা সবই অভিনবত্বের দাবিদার। । উপন্যাসের খামতি কিছু থাকলে হয়তো থাকতে পারে তবে সেটা খেয়াল করবার মতো অবসর পাঠক পায়না। চায়ের কাপে সাঁতার কাটতে পাঠক এতই নিমগ্ন থাকে যে এতকিছু ভাবতে সে যায়না। শুধু অনুভব করে চেনা জীবনের আড়ালে থাকে অন্য এক জীবনের রহস্যময়তার হাতছানি।
ক্লান্তিকর এক একটা দিনে পুরোনো কিছু নতুন করে ভাববার যেমন আর ফুরসত মেলেনা তেমনি সেসমস্ত দিনগুলোর ইস্তফা কি করে টানতে হয় সেটাই আপাতত ভাবনার বিষয়। সে ভাবনায় লাগাম দিয়ে কালো কৌতুকের পর্দা টেনে আসে জীবন নামক দর্শন। তাতে ডুব দেওয়াটাই কি শ্রেয়? নাকি আজীবন সাঁতার কাটতে কাঁটতে সিসিফাসকেও হার মানানো সহজ। কোনটা বেশি গৌরবের? অথবা চিন্তা করা যাক একটু অন্যরকম অনন্য এক জগতের। যেখানে আবছা আলো-আঁধারিতে খেলা করে রহস্য অভিযানেরা, কিছুটা ফ্যান্টাসি এবং অনেকটা দার্শনিক জিজ্ঞাসাকে টপকে বিস্মৃত ইতিহাস এ ঘেরা রহস্যময় এক ল্যাবরিন্থ..
সে���ানের কেন্দ্রবিন্দুতে কান পাতলে শোনা যায় এক গল্প বলিয়ের আশ্চর্য গল্প বলার ক্ষমতা। যেন অনর্গল ছড়া কাটছেন চঞ্চল অসীম সরকারের, মিরাকিউলাস ইলা মিত্রের কিংবা হিউমোরাস কানা নেজামের। কিছুটা কান টেনে প্রশ্বস্ত করলে আরো শোনা যায় অতীতের বিস্মৃতির পাতা উল্টানো নস্টালজিক বিনয় মজুমদারের, চিরযৌবনা লীলা মজুমদারের কিংবা বেখেয়ালি নীরদের গল্প। ওদিকে গল্পের ক্লাইমেক্স ঠিক কোন দিকে মোচড় দিব��� তার এক অনুমেয় ভবিষ্যৎ আবিষ্কার করছেন কাকেদের ভাষা বুঝতে পারা কাকবিশারদ..
যেকোনো উপন্যাসকে তরতরিয়ে সাফল্য মঞ্চে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ধ্যান-জ্ঞান সব এক করে লেগে পড়তে হয় চরিত্র বুননের কৌশলে, গল্পের মোড়ে মোড়ে বাঁক দেওয়া রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তৈরিতে এবং উপসংহারের বিশেষ নজরদারিতে। গল্পকে মূলত প্রাণ দেয় ডাইজেস্টিভ হিউমার আর নিজস্ব ক্রাফটিনেস এর এডভান্টেজকে কাজে লাগানো শব্দের পরিমিত খেলা। এসমস্ত প্রণালী অতি সুনিপুণভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে তবেই মঞ্চের দিকে এগিয়েছে লেখক। ফলাফলঃ একশোতে দেড়শো! সঙ্গে মুগ্ধ হয়েছি তার অসম্ভব সুন্দর গল্প বলিয়ে স্বভাবের। আবার চরিত্রের নামকরণেও দিয়েছেন বিশেষ নজরদারি।
কিছু প্রশ্ন জেঁকে বসে মাথায়। এই যেমন- বিনয় মজুমদার কি আসলেই বিনয়ী? চিরযৌবনা এক মধ্য বয়সী নারীর নাম কেনোই বা হলো লীলা মজুমদার? যার ভাবনা অসীমে বিস্তৃত। তিনিই কি অসীম সরকার? নামহীন গল্পকথক কি তাহলে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ এ ভুগবে?
এতসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে চায়ের কাপে কখনো সোজা কখনো উল্টো সাঁতার কাটতে কাটতে অথবা ভাসতে ভাসতে বুদ হওয়া যাক ন্যান্সি সিনাত্রার সেনশনাল কন্ঠের,
‘I was five, and he was six We rode on horses made of sticks He wore black, and I wore white He would always win the fight Bang bang. He shot me down Bang bang. I hit the ground Bang bang. That awful sound Bang bang. My baby shot me down'
মানুষ হিসেবে এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা যে আমরা কোন দৃশ্য বা ঘটনার সবগুলো স্তর একসাথে দেখতে পাই না। অথচ ঐসব ঘটনা বা দৃশ্য মূলত মাল্টিলেয়ার ঘটনা বা দৃশ্যের লব্ধি। খুব গভীরে ঢুকলেই কেবল তা টের পাওয়া যায় এবং নির্মাণ করা যায় মাল্টিপল দৃষ্টিভঙ্গি।
একজন উপন্যাসিক যখন দৃশ্য নির্মাণ করেন তার কাছে প্রয়োজনীয়তার বিচারে প্রতিটি স্তরের যাবতীয় অনুষঙ্গই সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দৃশ্য বা ঘটনার ভারসাম্যের জন্যই বিভিন্ন অনুষঙ্গের উপর আলোপাতের কমবেশ ঘটে।
এনামুল রেজা যখন গল্পের ভেতর গল্প বলতে বলতে পাঠককে গভীর থেকে গভীরে নিয়ে যান, তখন পাঠক সত্যিকার অর্থেই খোঁজ পেয়ে যাবে সেই মধুভান্ডের। গল্পের প্রতিটি স্তরের বাস্তবতা, চরিত্রের শক্তিমতা নিঃসন্দেহে আঁচড় কাটবে পাঠকের মনে। এক পর্যায়ে মনে হবে এরা গল্পের একেবারে উপরের স্তরের বাস্তবতা ও কেন্দ্রিয় কুশিলগুলোকে ঠেলে সরিয়ে জায়গা করে নিতে চাইছে শক্তি ও প্রাসঙ্গিকতার বিচারে।
উপন্যাসে বর্ণিত মায়ানগর রহস্যময়। অগনিত গলি-ঘুপচি, নগরবাসীর আনপ্রেডিক্টেবল স্বভাব, শহর ডুবিয়ে দেওয়া বৃষ্টি কিংবা শহরময় দাপিয়ে বেড়ানো বিষন্ন-স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ইঙ্গিত দেয় একটা ডিস্টোপিয়ান সময়ের। মানুষগুলো তবুও এখানে আসে আটকে পড়ে ভাঙ্গাচোরা বাড়ির বেজমেন্টের অন্ধকার গোলক ধাঁধায়। স্মৃতিকাতর মানুষগুলো হঠাৎ হঠাৎ মায়ানগর ছেড়ে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, ফিরে যেতে চায় পিছে ফেলে আসা ঘটনাবহুল জীবনের কাছে, স্বস্তির কাছে। কিন্তু আদৌ কি তারা ফিরে যেতে পারে? কিংবা যারা শেষমেশ যদিওবা ফিরে যেতে পারে তারা হয়তো ফিরে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার কোন সমান্তরাল সময়ে। সেখানে তার নিজেকে মনে হয় আরো বেশী অনাহূত, বিচ্ছিন্ন।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চাইলে ইতিহাসকে দেখতে হয় নিরপেক্ষভাবে ও ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায়। উপন্যাসিক এনামুল রেজা ইতিহাস ও মিথকে এই উপন্যাসে এনেছেন তার নির্মিত কাল্পনিক বাস্তবতায়। অতিচর্বনে ক্লিশে হয়ে যাওয়া ইতিহাসটাও এখানে প্রাণ পেয়েছে, প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক পপ কালচার জেনারেশনের কাছে ফিকে হয়ে যাওয়া রাজনীতিটাও।
একদিন নিজের গল্পটা বলা হবে, এই আকাঙ্খা নিয়ে অনেকেই স্রেফ মরে যায়। কেউ কেউ অভিজ্ঞতা কিংবা বোধের উন্মেষ দিয়ে জমিয়ে রাখা গল্পগুলোকে বিবিধ অর্থ ও ভাষা সহযোগে ভবিষ্যত শ্রোতার কাছে করে তোলে রোমাঞ্চকর ও আগ্রহজাগানিয়া। অনেকেই অবশ্য এসব গল্পের উপযোগীতা স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করে বাছ-বিচারহীন গোটা জীবন কাটিয়ে দেয়। কার্যকারণ বিবেচনায় এই তিনের পার্থক্য থাকলেও লাভ লোকসানের হিসেবে সবাই এক প্রকার প্রাপ্তিশূন্য। গল্পেরা আসলে বায়বীয়, আড়াল সন্ধানি মানুষগুলোর কাছে নিরাপদ আশ্রয়।
এসব স্রেফ আমার এলেবেলে ধারণা। চায়ের কাঁপ হাতে নিয়ে গল্পের চোরাপথ দিয়ে অন্যকারো অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকে পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণতই আমার উল্লেখযোগ্য কোন প্রত্যাশা থাকে না। তবুও হুটহাট আমি আটকে যাই অন্যকারো গল্পের ভেতর নিজের ব্যক্তিগত গল্পের সমিল খুঁজে পেয়ে। আপ্লুত হই যখন দেখি গল্পেরা এগিয়ে চলেছে আমার কাঙ্খিত রুপরেখা ধরে। ব্যতিক্রমে কখনোবা আহত হই, আবার চমকে উঠি দৃষ্টিভঙ্গির নিত্য নতুন আবিষ্কারে। এই বোধটা সত্য ও চিরন্তন।
উপন্যাস বলতে আমি বুঝি এমন এক বিস্তৃত ক্যানভাস যাতে করে স্থান-কাল-পাত্রের বিকাশের সম্ভাব্য প্রায় সমস্ত সঞ্চার পথেরই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এনামুল রেজার উপন্যাস "চায়ের কাপে সাঁতার" সেই অর্থে দুর্দান্ত একটা কাজ।
ঠিক কত দিন পরে একটা প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার বই পড়ে শেষ করলাম, চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। তাও আবার ভরপুর আনন্দ আর তৃপ্তি নিয়ে। আনন্দের কথাটা এজন্য টানলাম- বই পড়ুয়া মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন- হঠাৎ করেই একজন লেখকের মধ্যে নিজের পছন্দসই লেখনশৈলী আবিষ্কার করে ফেলা কি দারুণ একটা ব্যাপার; পাশাপাশি আজকাল কতটা রেয়ারও।
লেখক এনামুল রেজাকে আবিষ্কার করায় অবশ্য আমার নিজের তেমন কৃতিত্ব নেই। ভদ্রলোকের সাথে কোনভাবে ফেসবুকে জুড়ে গিয়েছিলাম। মেলায় বই বেরুচ্ছে, সেই সুবাদে উনার পোস্ট প্রায়ই চোখে পড়তো। একে তো কখনও পড়ি নি আগে, তারপর জানাশোনাও নেই, বইয়ের জনরা অজানা, সাথে দুর্মূল্যের বাজারে এত দামের একটা বই... সব মিলিয়ে চায়ের কাপে সাঁতার নামটা আগ্রহ জাগাতে পারলেও কেনার আগ্রহ ছিল না। তারপর একদিন রকমারি সার্চ করতে করতে কী ভেবে দু চার পৃষ্ঠা পড়লাম, এতই চুম্বকীয় লেখনী, এতই ভালো লাগছিলো যে সাথে সাথে অর্ডার করাও হয়ে গেলো। এমন লেখাই তো খুঁজি আমি, এ যে রত্ন! আর এতদিন পাত্তা দিই নি!!
বই হাতে আসার পরে সেই যে হাতে নিলাম একটু উলটে দেখবো বলে, আর নামানোর সুযোগ পেলাম না। কিছু ব্যক্তিগত কারন বশত গত কয়েক বছর ধরেই আমি বইয়ের জগতে অনিয়মিত, সেই আমাকে বলতে গেলে ঘাড় ধরে চায়ের কাপে সাঁতার কাটতে বাধ্য করালেন লেখক। আর ৪৬৮ পেজের বই শেষ করে থম মেরে বসেও থাকলাম বেশ অনেকক্ষণ, ফুরিয়ে গেল! বেশ তো লাগছিল।
মায়াবী এক শহর, মায়ানগরে গল্প কথকের আগমন আর শহরের সাথে নিজেকে ক্রমে খাপ খায়িয়ে নেওয়ার চেষ্টার গল্প চায়ের কাপে সাঁতার। জীবন যাপনের গল্প, সেই জীবন যাপন করতে করতে ক্রমে জীবনকে, জীবনের মানুষকে, এমনকি নিজেকে হারানোর গল্পও। আবার সেই হারানোকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় আমাদের সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সব অনুসন্ধানের চেষ্টা। সেইসব গল্প পড়তে পড়তে আমরা কখনও অতীতে হারাই, কখনো নিকট, কখনোবা দূর অতীত... কখনও আবার বর্তমানের ক্লেদ আর ক্লেশে জর্জরিত হই। তবুও আমরা বেঁচে থাকি, বেঁচে থাকার চেষ্টায় হারিয়ে ফেলা স্মৃতি গুলোকেই জীবনের আশ্রয় করি বোধহয়...
পড়তে পড়তে গল্প কথকের সাথে কোথায় যেন একাত্ম বোধ করি আমি। বাঘের পেটের ভেতর করে মায়ানগরে না হলেও, বাসে করে আমারও ওই বয়সে আগমন হয়েছিল জাদুর শহরে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন গুলো, শহরের অলিতে গলিতে নিজেকে খুঁজে ফেরা, গ্রামের জন্য প্রাণ আইটাই করা, মা, মায়ের আদর, বাবার অভাব বোধ করার দিন গুলো... সব যেন জ্যান্ত হয়ে ফিরে আসছিল। অপরিচিত এই ঢাকাকে আপন করার চেষ্টা, এইসব, যেন নিজের জীবনকেই বইয়ের অক্ষরে খুঁজে পাচ্ছিলাম। ভালো লাগাটা কী সেজন্য একটু বেশিই? এইসব নস্টালজিয়া? কে জানে!
বইয়ের প্রায় সব গুলো চরিত্রই রহস্যময়। লেখক বলতে গেলে কোন চরিত্রেরই সমাপ্তি টানেন নি। বিনয় মজুমদার, লীলা মজুমদার বা কাক বিশারদের কী হয়েছিল শেষ পর্যন্ত? কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল অসীম সরকার? কেনই বা ছায়া হয়ে দূরে সরে গিয়েছিল ইলা? কোন কিছুরই কোন উত্তর নেই, হয়তো অর্থও নেই। জীবনেরই বা অর্থ কী, কেবল যাপন করে যাওয়া, বাঁচতে চেষ্টা করে যাওয়া ছাড়া?
বিশাল বড় বই, অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনার আনাগোনা, অনেক অর্থহীন দৃশ্যপট... তবুও অস্তিত্বে বেশ ভালো রকম একটা ঝাঁকি দিয়ে গেল যেন। কিসের জন্য ছুটছি, কেন ছুটছি, তার বিনিময়ে কী হারাচ্ছি, এই ছোটার শেষ কোথায়... সব মিলিয়ে বই শেষ করার সপ্তাহখানেক পরেও আমি এখনো অসংলগ্নতা থেকে বের হতে পারি নি (এই লেখায়ও বোধহয় তার কিছু ছাপ পড়েছে)। আর এজন্যই জন্যই এ বইটা আমাকে আজ না হোক কাল, কিংবা আরও পরে, আবার তার জগতে টেনে নিবে।
আকারে দীর্ঘ কোন উপন্যাস বেটা রিডার হিসেবে পড়ে ফেলার কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে। সুবিধা হলো,পাঠক হিসেবে অনেক আগেই উপন্যাসটা উপভোগ করা যায়। আর অসুবিধা হলো বড় উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত পাঠ প্রতিক্রিয়া দিতে চাইলে, 'আরেকবার উপন্যাসটা পড়ে নেই এরপর লিখবো' ধরণের মানসিকতা কাজ করে। অথচ, প্রস্তুতি আর লেখার উদ্যমটুকু বার বারই পিছিয়ে যায়।
এনামুল রেজার 'চায়ের কাপে সাঁতার' উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কিন্তু, কখনও কখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার সফলতার চেয়ে, পথে নেমে পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলাটা বেশি জরুরী। সেই চিন্তা থেকেই বলতে হয়, 'চায়ের কাপে সাঁতার' উপন্যাসটির সাথে একজন পাঠক হিসেবে সপ্তাহখানেক বেশ ভালো সময় কেটেছিল। গল্পের ভেতর গল্প বলার যে দক্ষতা রেজা এই সৃষ্টিতে দেখিয়েছে তা দুর্দান্ত। গল্পকথকের চোখে দেখা চরিত্রগুলোর সংকট ও মায়ানগরের রহস্যময় পথে তাঁদের বিচরণের প্রভাব পাঠকমনে ভিন্ন ধরণের আগ্রহ জাগাবে। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, জাদুবাস্তবতা, টাইম জাম্প আর ইতিহাসের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল উপস্থাপনসহ উপন্যাসের পরিধির লাগামটা যদি আরেকটু নিয়ন্ত্রণ করা যেত তাহলে পুরো ভ্রমণটাই হতো টানটান। উপন্যাসের শেষটুকু অস্পষ্ট হলেও চমৎকার ঘোরলাগা। কিছু জায়গা থেকে প্রশ্ন থেকে গেলেও; উত্তর খোঁজার চেয়ে পাঠ অনুভূতি উপভোগ করাই বেশি জরুরী মনে হবে।
রেজা যে আঙ্গিকে তাঁর উপন্যাসের জগত সৃষ্টি করেছে সেখানে চিন্তাশীল পাঠকদের অবাধ বিচরণ ঘটুক সেই শুভকামনা থাকলো।
বইয়ের মূল চরিত্র খোলনগর থেকে মায়ানগরে আসে কলেজে পড়তে। এরপর থেকেই তার সাথে পথ চলা শুরু হয় পাঠকের। একটা সময়ে যেন পাঠক নিজেই এই চরিত্রটি হয়ে উঠেন তার চোখেই দেখতে থাকেন বইয়ের অন্যান্য চরিত্রদের। নামহীন গল্পকথক বর্তমানের গল্প বলতে বলতে হঠাৎ অতীতের গল্পে চলে যাচ্ছে এবং আবার বর্তমানের গল্পে ফিরে আসছে। বইয়ের পাতায় এই বিষয়টা ঘটানো হয়তো সহজ কিন্তু কঠিন কাজটা হচ্ছে সেই অতীত বর্তমানের গল্পের গোলকধাঁধায় পাঠককে স্মুথলি সাথে করে টেনে নিয়ে যাওয়া। এনামুল রেজা কাজটা এতই মুন্সিয়ানার সাথে করেছেন যে পাঠক হিসেবে একটুও হোঁচট খেতে হয়নি। আরামসে পাঠক অতীত-বর্তমান অতীত-বর্তমান করে করে পুরো বইটা শেষ করে ফেলতে পারবেন। আর শেষে গিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বসে থাকবেন।
এনামুল রেজার গদ্য সুন্দর, সাবলীল একদম একটানে পড়া যায়। উপন্যাসে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, বিডিআর বিদ্রোহ, নামহীনদের সভা ইন্টারেস্টিং লেগেছে, রহস্যময় চরিত্র কানা নেজাম - এই লোক কি আসলেই এই দুনিয়ার নাকি অন্য ডাইমেনশন থেকে এসেছে! কাকবিশারদ কি আসলেই কাকের ভাষা বুঝে! অসীম সরকার হঠাৎ কোথা থেকে আসে আর কোথায় হারায়? বিনয় ও লীলার বিয়ের গল্পটা পুরো হলো না। এটুকু না ঝুলিয়ে রাখলেও পারতেন লেখক। জীবন ত এরকমই। নিজের ও পরের অনেক কিছুর সাথে জড়িয়ে যাই আমরা। আর একাকী সময়ে ভাবতে বসি এ জীবন লইয়া মুই কী করিব! এর আসলে হয়তো কোন উত্তর হয় না। জীবন যখন যেমন তখন তেমন করে এগিয়েই চলে। অনেক অনেক কিছু বলার ছিল এই বই নিয়ে কিন্তু এইটা নিয়ে আমার মুরাকামি কমপ্লেক্স শুরু হয়েছে। মুরাকামির কোনো বই নিয়ে গুছিয়ে লিখতে পারি না। এই বই নিয়েও গুছিয়ে লিখতে পারছি না কিছু। অনুভবে আছে কিন্তু ভাষায় নাই টাইপ অবস্থা। এটুকুই জানানোর ছিল যে বইটা পড়তে ভালো লেগেছে। সমসাময়িক কোনো লেখক এত চমৎকার লিখছেন পাঠক হিসেবে এই বিষয়টায় আনন্দিত লাগছে।
‘চায়ের কাপে সাঁতার’ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কিছু লেখা সম্ভব না। এ নিয়ে প্রায় দিন পনেরো ভেবেছি। ভেবে ভেবে কয়েকটা বই শেষ করেছি অতৃপ্ত এক খচখচে বাসনা নিয়ে। যা বুঝলাম, এ নিয়ে সর্বোচ্চ কিছু অনুভূতি জোড়াতালি দেওয়া যায়। তা করতে গেলে আরেকবার টেবিলে বসতে হবে পেয়ালা সমেত চায়ের কাপ নিয়ে, সাথে প্রয়োজন হবে অখণ্ড এক অগোছালো খসড়ার। লিখতে লিখতে হয়তো আমার ঘুম পেয়ে বসবে অথবা ডুবে যেতে পারি ভাবালুতায়। কারণ ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজবে ন্যান্সি সিনাত্রার ‘ব্যাং ব্যাং’ গানের ‘He wore black, and I wore white He would always win the fight’
অথবা,
‘Now he’s gone, i don’t know why Until this day, sometimes i cry’... লাইন দুইটি।
ওটা কাটাতে ঘনঘন না হলেও কিছুক্ষণ পরপর চুমুক দিতে হবে সেই চায়ের কাপে। লিকার কড়া না-কি ঘন দুধ মেশানো চা, সে খবর আমার জানা থাকবে না। শুধু চুমুকটা শেষ হতেই ফিরে যাব মনিটরে আবদ্ধ ওই নীল ডকের সাদা অশূন্য পেজে, অন্তত কিছু শব্দের অস্তিত্ব থাকবে সেখানে। আর থাকবে আঙুলের নিচে ধুলো জমা ছাব্বিশ বা তারও বেশি বিশ্বস্ত চাবির গুটি। যারা চলবে খটাখট খট খট খট শব্দে তুলে। আমি হারাব তাদের একঘেয়ে গণ উল্লাসে, মুখরিত হবে আমার নীরব কক্ষ। এক সময় সেখানে নামবে প্রবল শূন্যতা। তখনই হয়তো আমি আসল অনুভূতি লিখতে সক্ষম হব। এর আগে চায়ের কাপে সাঁতার কাটব, একেবারে ডুবে, যা কেবলই নির্জন শূনত্যার একটি অদৃশ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। অনেকটা ভাসা ভাসা ধূসর ছায়া কিংবা খসে পড়া নক্ষত্রের মতো।
এর অর্থ সহজ, আমি ‘চায়ের কাপে সাঁতার’ কিংবা সংক্ষেপে ‘চাকাসাঁ’ নিয়ে কিছুই লিখছি না। যা লিখছি, তা কেবলই অব্যক্ত, অগোছোলো, অসামাজিক, অকল্পনীয় �� অসচরাচর কিছু শূন্যতায় ঘেরা এক শহরের গল্প।
‘এমন শহরও কি আছে, যেখানে গেলে জীবন থেকে হারানো সবই ফিরে পাওয়া যাবে?’ ─বাস্তবতার বিচারে সম্ভব না হলেও অবাস্তব... না, জাদুবাস্তবতার বিচারে অবশ্যই আছে। কীভাবে? তার জন্য এক গল্প কথকের সাথে পরিচিত হতে হবে। যার কোনো নাম নেই। তাকে আমরা চিনি স্রেফ একজন নামহীন কথক হিসেবে। সে আমাদের এক কিস্সা শোনায়। মায়ানগরের। এ নগর কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার আদ্যোপান্ত জানা না গেলেও, পরিচিত এক শহরের সাথে এর আবার ভীষণ মিল। এমনকি সময়ে সময়ে ঘটমান ঘটনারও। কিন্তু অমিলেরও কমতি নেই। সেই অমিলের মধ্যে জেগে থাকে কিছু চরিত্র। যাদের আমরা আগন্তুক, অবয়ব কিংবা অভাবহীন বলতে পারি। আহ... অভাবহীন বলতে একজনের নাম নিতে হয় শুরুতে। সে হলো কানা নেজাম। আজ্ঞে, ঠিক শুনেছেন। কানা নেজাম। না, ভুল করবেন না, সে আপনার গলির মোড়ে অথবা কোনো প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মহৎ প্রাণ কোনো সচ্ছল ব্যক্তি নয়। ও হলো একজন ভিক্ষুক। পাহ্লবী বাসস্টপের চিরবন্ধ পত্রিকা স্ট্যান্ডটির সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করে। এভাবে বলাটা খুব রূঢ় মনে হলে ক্ষমা করবেন। এ ভিক্ষুকের আবার কিছু অসাধারণ প্রতিভা আছে। সে আমাদের চেনা পরিচিত শহরে ঘুরে বেড়ানো অথর্ব ওসব কালপ্রিট ভিক্ষুকদের মতো নয়। তার একটি ছড়া আছে, ওটা কেটে ও ভিক্ষে করে। শুনবেন?
‘যদি জোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি জোটে যদি এরও অধিক আমায় ভিক্ষা দিও অনুরাগী’
এমন দরদমাখা কণ্ঠে যখন আপনি এক ভিক্ষুকের থেকে ছড়া শুনবেন, তখনও কি ভিক্ষে না দিয়ে থাকতে পারবেন। বোধ হয় পারবেন না। তাই ও অভাবহীন। তার ওপর কানা নেজাম শুধু ভিক্ষে করে না, আরও কী কী যেন করতে পারে। ওটার রহস্য আমাদের নামহীন কথক ধরতে পারেনি। হয়তো কোনোদিন পারবে, না পারলেও খুব একটা ক্ষতি নেই। যাহোক, ওর প্রভাব কাটতে না কাটতে গল্পে ঢুকে পড়ে অসীম সরকার। আরেকজন ছড়াকার। ছড়া কেটে কথা বলাতে যে পারদর্শী। গল্প কথকের একমাত্র জিগরি দোস্ত। যার সাথে শেয়ার করা যায় ভ্যালু নাই থেকে গোপনীয় এমন সব কথা। থাকে না এমন বন্ধু আপনাদের, যে আপনার এমন সব গোপন তথ্য জানে যা আপনার ছায়াও জানে না... অমনটা আরকি। আর ওসব কথার টপিকে ভরপুর থাকে নিষিদ্ধ সব জিনিস। প্রবল আকর্ষিত কিন্তু গোপনীয়।
নিষিদ্ধতার কথায় মনে হলো আরও একটি মজার বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করা উচিত। আপন বন্ধুর মতো। প্লিজ কাউকে বলবেন না যেন। অসীম সরকারের সাথে ইলা রহমানের প্রেম ছিল... না হবে হবে করছিল... না...। বুঝতে পারিছি নে শাইয়ো (একটি গালি যা দিত কানা নেজাম, আমিও দিলাম)। কিন্তু যতদূর জানি আমাদের গল্প কথন এমনটা বলেছিল। অবশ্য সে নিজেও যে বন্ধুর প্রেমিকার প্রেমে বার দুয়েক পড়েনি তা মিথ্যা বলিব না। কিন্তু অসীমের প্রেম আর শূন্যতা একটু কেমন যেন। সে প্রেক্ষাপটে আসে আর যায়। দরকারে ধরা দেয়। আবার হারায়। নামহীন কথক শুনেছে বিদ্যাকুঞ্জের এক শিক্ষিকার বাসায় একা না-কি তার যাওয়া-আসা। ওই মহিলা এক মেজর শহিদ বংফোর্সের স্ত্রী। নাম জাহানারা। সীবা বিদ্রোহে মরেছেন তার স্বামী। যা নিয়ে মায়ানগরে চলছে এক ভীষণ তোলপাড়। ওসব স্মৃতি নিয়ে হারিয়ে গেল অসীম সরকার। ক্ষণিক অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য।
গল্প কথকের অবস্থান বিষয়ক কিছু তো জানানো হলো না। জানাচ্ছি তার উৎপত্তি ও পরবর্তী গন্তব্যস্থল নিয়ে। শুরুটা হয়েছিল তার গ্রাম থেকে। ওখান থেকে মায়ানগরে আসতে হতো বাঘের পেটে করে। এসেছিল ও। বিদ্যাকুঞ্জে ভর্তি হতে। থাকার সিট মিলে নেসার গাজীর হোটেলে। লিখিত কিছু নিয়মে বন্দি সেই জীবন। রহস্যে ভরপুর সেই হোটেলের সাথে গল্প কথকের স্মৃতিটুকু খুব একটা সুখকর নয়। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কালো কাহিনির সাথে রুমমেট নৃপেনের সংবাদপত্রে উচ্চ স্বরে পড়া ধ র্ষ ণ সংক্রান্ত খবরের দরুনই কি তাকে ছাড়তে হয়েছিল সেই হোটেল? না রয়েছে ভিন্ন কোনো রহস্য? সেদিন যদি বিনয় মজুমদার অসুস্থ না হতো, তবে কী হতো গল্প কথকের?
গল্পের চাকা ঘুরে যায় অতীতে। সেই দুই বাংলার যুদ্ধ সময় কালে। গল্প কথককে হটিয়ে সেই সময় চালকের আসনে বসেন বিনয় মজুমদার। অতীতে হারান তিনি। গল্প করেন দুয়েকজন হারানো সাহিত্যিক নিয়ে। আমিও হারাই তার সাথে। চিরযৌবনা লীলা মজুমদারের স্বামী তিনি। যার প্রতি নিষিদ্ধ এক টান কাজ করে নামহীন কথকের। কী কারণে? মজুমদার পরিবারের একমাত্র ছেলে নীরদ আবার কথকের বন্ধু। যাদের কোনোমতে টিকে থাকা ঘরটিতে পরবর্তীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাবলেট থাকে সে। নীরদের সাথে ওদিকে সুপর্ণার গভীর প্রেম। সেই প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন লীলা মজুমদার। কেন?
এর পরপরই হয়তো শুরু হয় চাকাসাঁ’র মূল গল্প। গল্প না আসলে, এক জাদুবাস্তবায় মোড়া আখ্যান। বর্তমান থেকে অতীত, তারপর বিক্ষিপ্ত কিছু স্মৃতির রেখা মিলেমিশে চলতে থাকে একাকার হয়ে।
আপনাকে যদি বলা হয় ফ্রানৎসা কাফকা, গ্যুন্টার গ্রাস ও গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কেন সেরা... আপনি হয়তো খুব না ভেবেচিন্তে উত্তর দিবেন তাদের বিখ্যাত ‘দ্য মেটামরফোসিস’, ‘টিন ড্রাম’ ও ‘হান্ড্রেড ইয়ারস্ অভ সলিচিউড’-এর জন্য। আগামীতে... হয়তো আজ থেকে আরও বছর পাঁচ-দশেক পরে আমাকে যদি কেউ ‘এনামুল রেজা’ কেন সেরা জিজ্ঞেস করে। আমি হয়তো না ভেবেই উত্তর দিব ‘চায়ের কাপে সাঁতার’-এর জন্য। চাকাসাঁ উপন্যাস লিখতে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন দীর্ঘ ছয়টি বছর। জানি না, এই ছয় বছর কি শুধু এই উপন্যাসের পিছনে সময় দিয়েছেন কি না। আমার পাঠক কাম নব্য উউত্থাপিত লেখক সত্তা হিসেবে বিষয়টা জানতে ইচ্ছা করছে। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইনি কখনও। লেখক উত্তর দিলে হয়তো খুশি হব।
চাকাসাঁ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কথা তো আপনাদের এখনও বলাই হয়নি। তার নাম কাক বিশারদ। যে কাকেদের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারে। তাদের রহস্যময় ভুবনে যার প্রবেশাধিকার আছে। সম্পর্কে তিনি নীরদের মামা। কিন্তু কেমনতর মামা... তা এক রহস্য। গল্প কথকের সাথে তার পরিচয় খুব অদ্ভুত উপায়ে। ওসব আমি ব্যক্ত করছি না। আরও করছি না সেই নামহীনদের সভা নিয়ে। যেটা বসে শহর থেকে বহুদূর নির্জন এক প্রাচীন বৃক্ষের নিচে। কেমনতর সেই সভা, তাদের উদ্দেশ্য বা কী, জানতে হলে চায়ের কাপে সাঁতার কাটা জরুরি।
এখন কিছু উপলব্ধি শেয়ার করা যাক। চাসাকাঁ আমি দীর্ঘ সময় নিয়ে শেষ করেছি। লেখকের অদ্ভুত মায়াময় অথচ পরিচতের জগতের ভেতরে কাটিয়ে দিয়েছি গণনাহীন অনেকগুলো দিন। বইটি আমি প্রচণ্ড কাজের চাপে ফাঁকে, চেয়ারে বসে, চট্টগ্রাম হতে ঢাকা যাত্রাপথে, ঢাকা হতে ফিরতে বাসে... পুনরায় নিজ ঘরে এসে, এক রাত্রিতে শেষ করে ডুব দিয়েছিলাম শূন্যতায়। এর দিন কয়েক পর্যন্ত আমি আর কোনো বই হাতে নিইনি। এমনটা শেষ হয়েছিল ‘মাহাবুব আজাদ’-এর বড়োদের রূপকথা ‘আগুনি’ শেষ করার পর। দীর্ঘ বারো-শ পাতা আমি ছাব্বিশ দিনে পড়ে মনে হয়েছিল বাংলায় আর কোনো উপন্যাস না পড়লেও চলবে আপাতত। কিন্তু এরপরেও আমাকে বহু লেখা পড়তে হয়েছে। এবং প্রায় দেড় কি দুই বছর পর এসে ‘চাকাসাঁ’ পড়ে আমার অনুভূতি হয়েছে ঠিক সেদিনকার মতো। এই অনুভূতিগুলো এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। তবে সেটা চাপা।
চাকাসাঁ আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে এর সমাপ্তির জন্য। না শুধু সমাপ্তি না। উপন্যাসের শুরুটা এত কাব্যিক যে শুরুতে গল্পের ভেতরে চাঁদের আলোর মতো গলে ঢুকে যাওয়া যায়। লেখকের ভাষারীতি মায়াময়। কেমন এক আপন আপন গন্ধ পাওয়া যায় সেখানে। চরিত্রগুলোর কর্মকাণ্ড আর তাদের মুখনিঃসৃত বাহারি সংলাপ অন্যরকম ভালোলাগা এনে দেয়। ঠেলে দেয়ে এক অন্য দুনিয়ার চেনা জগতে। প্রচণ্ড ঘোর সেখানে। সে ঘোর কাটাতে প্রয়োজন হয��� চায়ের।
শুধু তা-ই নয়, এতে আছে ফ্যান্টাসির শৈল্পিক ছোঁয়া, নদ্দা বুড়ির মৃত্যু রহস্য কিংবা বেদেকন্যা মিতিয়ার অন্তর্ধানের গল্প। দর্শন তো ছোঁয়া যায় না এমন, শুধু উপলব্ধি করে যেতে হয়। ভ্রমের মতো। ভ্রম নিয়ে লেখক লিখেছেন:
‘ভ্রম বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। মানবসমাজে এই দর্শনটাই এক ধরনের ভ্রান্তি আসলে। বিভিন্ন বাস্তবতার বিভিন্ন চেহেরা থাকে। প্রকৃতির চক্রে চেনা বাস্তবতা থেকে শাফল হয়ে অন্য বাস্তবতায় পা রাখলেই মানুষ ভাবে যে তার ভ্রম হচ্ছে। নিম্নপর্যায়ের বুদ্ধিমতা হিসেবে এটা তার ডিফেন্স ম্যাকানিজম।’
আমারও বোধ হয় ঠিক তা-ই হয়েছিল। যেমনটা হয়েছিল পরিত্যক্ত ডাটসান ৫১ ব্লুবার্ড-এর ক্ষেত্রে। যেটা ঘুমিয়ে থাকে নীরদদের গ্যারেজে। কী কারণে তা জানতে পারবেন কেবল সাঁতার কাটা শেষে।
চাকাসাঁ গল্পটি ঠিক কার? গল্প কথকের না বাকি চরিত্রদের? না জীবনের? জীবন কী...
‘জীবন সাঁতার জীবন বিবিধ রকমের পানিতে সাঁতার। কানা নেজাম এক ধরনের পানিতে। অসীম সরকার এক ধরনের পানিতে। বিনয় মজুমদার আর লীলা মজুমদারের পানিও ভিন্ন। ভিন্ন নীরদ আর সুপর্ণার সাঁতারের পানি। কিন্তু সবার একটা কমন সুইমিং পুল আছে। সেই কমন জলাধারটা ঠিক কোথায়?’
আরও যদি যোগ করি তবে... চাকাসাঁ এক তিক্ত বাস্তবতায় মাখা গল্প। হয়তো পৌরাণিক কালো রসিকতার। যা আমরা ভুলে যেতে চাই বিস্মৃত ইতিহাস ভেবে। কিন্তু ইতিহাসের নবজাগরণ ঘটে। আর সেইসব ঘটায় এমন কিছু লেখক, যারা চাকাসাঁর মতো উপন্যাস লিখে। কমন জলাধারটা ঠিক এখানেই। কেউ কেউ শুধু গল্প বলে না... এমন কৌতুক করে যা জীবনের গল্প হিসেবে ফুটে উঠে জলাধারের মাঝে। এসব গল্প মোহাবিষ্ট, মিথ্যা মনে হয়। কিন্তু এর গভীরে লুকানো থাকে কেবলই সত্য।
রাত ৩ টা ১৮ মিনিটে ৪৬৯ পৃষ্ঠার সমাপ্তি; এক ধীর গতির ‘ফিভার ড্রিম’ এর অবসান।
সাধারণত কোনো বই পড়তে গেলে শব্দ আর পৃষ্ঠার অনুপাত এ এডাপ্ট করতে কিছুটা সময় লাগার পর একটা ফ্লো চলে আসে। বইয়ের কথাগুলা সাবলীল মনে হয়। কিন্তু এই বইটা কেমন যেন উল্টা কাজ করল। যতই তাড়াতাড়ি করতে যাই, সময় আরো বেশি লাগে।
সময়জ্ঞানবিহীন এই বইয়ের প্রত্যেক অধ্যায় নিজেদের মধ্যে ইন্টারকানেকশন সবসময় রাখতে চায় না। লেখক জোর করে কানেক্ট করায় দেন। এইরকম ঘোর এ ঘেরা ন্যারেটিভ এর জন্য সেটা কোনো এক ভাবে পারফেক্ট।
পুরা উপন্যাসটা অর্ধযুগ এর পরিক্রমায় যে সুগঠিত রূপ নিয়েছে, তার জন্য এর চরিত্র গুলা মোটেও সিরিয়াস না। তারা নস্টালজিক, ট্র্যাজিক আবার কখনো ‘,ডেভোইড অফ এনি ইমোশন’। তারা একেকজন কবিতা লাভার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে ভালোবাসতে দ্বিধাগ্রস্ত।
গুজব তৈরির কারখানার টেমপ্লেটে তাহারা একেকজন বি লাইক: অসীম সরকার: “ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখো” ইলা রহমান: “টুইন পিকস: ফায়ার ওয়াক উইথ মি” দা থার্ড হুইল: “স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার” আর বিনয় মজুমদার? সে তো নায়ক! বাকিরা বাকিদের জায়গা থেকে কন্ট্রিবিউশন দিয়ে গেছে।
এই গল্পের শুরুটা ছিল টুকরো টুকরো হয়ে, সেই টুকরো গুলোর ব্যাপ্তির কোনো সীমা ছিল না। পুবপাড়া টু মায়ানগর - আপডাউন টিকেট। ভায়া নেসার গাজীর হোটেল, বিদ্যাকুঞ্জ, ঝিকুরগাছা এন্ড মেনি মোর! অসম্ভব সুন্দর এই যাত্রার সমাপ্তি ছিল মনের মত।
বেশ অনেকটা সময় নিয়ে শেষ করলাম ‘চায়ের কাপে সাঁতার’। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সাথে এতোদিন থেকে নিজেই যেনো উপন্যাসের একটা চরিত্র হয়ে গিয়েছি। চরিত্রগুলোর সাথে নিজেও সাঁতার কেটেছি কখনো মায়ানগর, কখনো বা পুবপাড়া আবার কখনো কখনো গল্প করে সময় কাটিয়েছি কানা নেজাম, বিনয় মজুমদার বা কাকবিশারদের সাথে। লেখক এক বইয়ে এতোগুলো জনরার মিশেল করেছেন যে মোটা দাগে কোনো নির্দিষ্ট জনরায় একে ফেলা সম্ভব না। লেখক বইয়ের শেষে রেখে গেছেন পাঠকের জন্য অনেকগুলো প্রশ্ন। আমার মতে পাঠকের মনের এই প্রশ্ন গুলোই এই বইয়ের সার্থকতা। প্রশ্ন গুলো সবসময় ভাবাবে পাঠককে। বইটা শেষ করে মনে হবে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উক্তি “শেষ হয়েও হইলো না শেষ”। আমার পড়া অন্যতম সেরা বই হয়ে থাকবে ‘চায়ের কাপে সাঁতার’।
ঠিক কোন শব্দ কিংবা লাইন দিয়ে এই বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া শুরু করা যায়, তা নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু কোনো কিছুই যেন মাথায় আসছেনা। প্রায় এক মাস সময় নিয়ে শেষ করা এই অ সা ধা র ণ বইটার পাঠপ্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে এখনও সংশয়ে আছি।
উপন্যাস শুরু হয় রহস্যে মোড়ানো এক শহর ‘মায়ানগর’ এবং নামহীন এক যুবককে ঘিরে। সেই যুবকের চোখ দিয়েই আমদেরকে ধীরে ধীরে পরিচিত করানো হয় এক বিস্ময়কর জগৎ এর সাথে— ভিক্ষুক কানা নেজাম, যার অকথ্য গালিগালাজ যেন এক আলাদা ভাষা। ছড়া কেটে কথা বলা অসীম সরকার, যার প্রত্যেকটা বাক্য যেন ছন্দের মধ্যে বয়ে চলে। এরপর আসে আরও কিছু চরিত্র— নীরদচন্দ্র মজুমদার, লীলা মজুমদার, ইলা রহমান ইত্যাদি ইত্যাদি যারা সবাই মায়ানগরের কুহকী বাস্তবতার অংশ। একেকজন এ্যাবসার্ড চরিত্র। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে প্রথম একশ পাতা শেষ করতেই ঢুকে পড়ি কাহিনীর মূলে। রহস্য, নাটক, স্মৃতি আর বাস্তবতা মিলিয়ে এক অদ্ভুত জার্নিতে ছিলাম যেন। নাটকীয় আখ্যান পুরো উপন্যাস জুড়েই। ম্যাজিক রিয়েলিজমের স্বচ্ছন্দ প্রবাহ—যা কখনো জাদুর মতো, কখনো কালো কৌতুক এর মতো অবিরাম বইছে আমার মগজে। এই বই ঠিক কোন জনরায় পড়ে? জানা নেই। শুধু জানি ভালো লেগেছে।
4.5/5 । সাম্প্রতিক কালে বাংলা ভাষায় যে'কটি উপন্যাস পড়েছি , তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি অন্যতম। লেখক তাঁর এই উপন্যাসে একটি নিজস্ব জগৎ গড়ে তুলতে পেরেছেন, যা একইসাথে জাদুবাস্তবতা ও তাঁর দেশ কাল সময়ের বর্তমান ও সাম্প্রতিক অতীতের টালমাটাল পরিস্থিতির পরিচায়ক । এই উপন্যাসের কাহিনীর অন্তর্নিহিত যে রহস্যময়তা, লেখক তাকে তুলে ধরেছেন, তার জাল বিস্তা��� করেছেন ধীরে ধীরে, কিন্তু তার অহেতুক বলপূর্বক সমাধানের পথে হাঁটেননি, বরং নিরাসক্ত কুশলতায় তাকে পাথেয় করে তৈরি করেছেন ননলিনিয়ার এক আশ্চর্য ন্যারেটিভ। ভবিষ্যতে এই লেখকের আরো লেখা পড়বার ইচ্ছে রইল।
পুঃ- বইটির প্রচ্ছদের ছবিটি ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে । Rusty Lake এর কেউ ফ্যান থাকলে এই ছবিটির সাথে তারা হয়ত খানিক রিলেট করতে পারবেন।
we’re all familiar with an acquired taste, right? something you don’t like at first but after a few tries, or once you get used to it, you start to enjoy it. that’s exactly how this book feels to me.
প্রথম ৫০–৬০ পৃষ্ঠা পড়ার পরে আমি বুঝলাম আমি খুবই বিরক্ত ন্যারেটর-এর সাথে — আরো বেশি বিরক্ত সেই বিরক্তিকর ছড়াকার অসীম সরকারের সাথে। কিন্তু একমাত্র চরিত্র যাকে আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে, সে হচ্ছে কানা নেজাম, যেটা খুবই উইয়ার্ড, কারণ কানা নেজাম এমন সব বাংলা গালি দেওয়া শুরু করেছিল, and I haven’t found that amusing at all.তারপরেও আমার কেন তাকে ইন্টারেস্টিং মনে হলো? is it because of Nancy Sinatra’s Bang Bang? or his philosophy? I’m not sure. তারপর আমি আমার ফাকড-আপ মুডের দোষ দিয়ে বইটা পড়া থেকেই একটা ব্রেক নিলাম।
পরের দিন আমি টানা ১৫০ পৃষ্ঠা পড়লাম, আর তখন মনে হলো — শেষবার আমি এমন ঘোরলাগা বাংলা উপন্যাস পড়েছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা। মানে, আপনি কোনো চরিত্রের সাথে নিজেকে রিলেট করতে না পেরেও, শুধুমাত্র শব্দের বুননের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন, ওদের সিচুয়েশন ফিল করছেন, বুঝতে পারছেন ওরা কোথা থেকে আসছে, ওদের মোটিভ কী। যদিও এখানে এনামুল রেজা সেই নাম না বলা কথকের মোটিভটা ক্লিয়ার করে বলেননি, আমি একবার ভাবলাম চায়ের দোকানের ঘটনার পরে কথক Tarantino’s Kill Bill–এর মতো রিভেঞ্জের জন্য ঘুরছে। আবার মনে হলো Fight Club–এর মতো, সবাই হয়তো তার ইমাজিনেশন। কিন্তু পরে দেখি, লেখক পাঠকের ব্রেইন নিয়ে খেলেছেন ADHD ব্রেইনের মতো — এক গল্প থেকে আরেক গল্পে হুটহাট চলে যাওয়ার মাধ্যমে! এবং যখন গল্প শেষে পাজল মিলছিল, আমি মনে মনে বলে উঠেছি — ছেটিশফেকশন! (নীরদের ভাষায়)।
এনামুল রেজা ভাই যেভাবে এক গল্প থেকে আরেক গল্প বলার মাধ্যমে মায়ানগরের সিক্রেট, ওপেন সিক্রেট, রাজনৈতিক সিক্রেট, ১৯৭১-এর যুদ্ধ, গ্রামের মৃদু-মন্দ বাতাস, প্রেম-বিরহ, বন্ধুত্ব, sick desire (যারা রেইপ কেস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে চটি পড়ার মতো মজা পায়), এবং ১৯৭১ থেকে এখন পর্যন্ত মায়ানগরের মানুষের যে এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি এই সবকিছু একজন নাম-না-জানা ন্যারেটরের মাধ্যমে এত সুন্দরভাবে বলেছেন, সেটা সত্যিই well-crafted. hats off, ভাই।
কিন্তু ভাই, বইয়ের এন্ডিং নিয়ে আমার প্রচুর কমপ্লেইন আছে। that ending wasn’t satisfying at all. চায়ের কাপের সাঁতার–এর এন্ডিং আমার অনুভূতিদেশ (a word I’ve learned recently) একদম শূন্য করে দিয়েছে। now I have to think of a different ending myself.
বইটা কেনার একটা ছোট, কিন্তু খুব বিরক্তিকর স্মৃতি আছে। ২০২৩ সালের বইমেলায় বাংলা একাডেমি আদর্শকে স্টল দেয়নি। আমি সেই খবর মেলায় যাওয়ার আগেই পাইনি। কিন্তু বইটা কিনব এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েই যখন মেলায় গেলাম, তখন আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিল-এটা কিনেই বাসায় ফিরব। তাই আমি কাঁটাবনের আদর্শের দোকান খুঁজে, ফেব্রুয়ারির বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে, মায়ানগরের এক রিকশাওয়ালা মামাকে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে বাসায় ফিরেছি এই বই নিয়ে। কারণ… বৃষ্টির দিনে ভাড়া বেশি।
বইয়ের শুরুটা খুব অদ্ভুতভাবে হয়েছে, একজন অন্ধ ফকিরকে দিয়ে যে কি-না রাস্তার পাশে দাড়িয়ে পথচারীদের উদ্দেশ্যে একটাই গান গেয়ে যায়।
প্রথম দেড়শ পেজ পড়তেই আমার সবচে বেশি অসুবিধা হয়েছে, শুরুতে গল্প বেশ ধীরগতিতে এগিয়েছে এবং একে একে চরিত্রের আগমন ঘটছিলো।
প্রায় পাচশো পাতার এই অদ্ভুতুড়ে বই আমি পড়ে যাচ্ছিলাম জানতে যে লেখক এতোগুলো পাতাজুড়ে আসলে কি লিখেছে। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে দেড়শ পাতা পড়ার পর গল্পের মূলধারায় প্রবেশ করতে পেরেছি।
মূলত শুরুতে অনেকটা অংশজুড়ে ছাড়াছাড়াভাবে গল্প চলছিলো এবং ঠিক কি ঘটছে সেটা শুরু হয় দেড়শ-দু'শো পৃষ্ঠা পার হবার পর।
গল্প দু'টো ধারায় এগিয়েছে, একদিকে সমসাময়িক ঘটনা যে জীবনের কথা বলছেন নামহীন এক কথক, আর একদিকে আমাদের নামহীন কথকের বাড়িয়ালা বিনয় মজুমদারের ভাষ্যে চলছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। মজার ব্যাপার হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বর্ণনা শুনলেই যেমন দেশাত্ববোধ, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা এসে পড়ে এ গল্পে তা নেই। বরং একজন রাজনীতির সাতে-পাচে না থাকা সাধারণ নাগরিক মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঠিক উদ্দেশ্যহীন, প্রায় পলাতকের মতোন যেভাবে দিনযাপন করেছে তা উঠে এসেছে এ অংশে। 'বিনয় মজুমদার' নামটা শুরুতেই আমাকে ভাবিয়েছিলো এ হয়তো কবি বিনয় মজুমদারের গল্প, গল্পের বিনয়ও কবিতা লেখেন তবে পশ্চিমবঙ্গের যে বিনয়ের কথা শুরতেই মাথায় আসে ইনি সে নন।
ডিস্টোপিয়ান ধাচের যে একমাত্র বইটি আমি এর আগে পড়েছি তা ছিলো সুহান রিজওয়ানের লেখা 'গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে'। এই বইখানাও ডিস্টোপিয়ান ধাচের কিছুটা, এবং অতিবাস্তবতা কিংবা জাদুবস্তবতা আছে আরও অনেকটা অংশজুড়ে। (জাদুবাস্তবতা নিয়ে কমবেশি শুনলেই এ ঘরানার কোনো বই আমার আগে পড়া না হওয়ায় 'চায়ের কাপে সাঁতার' ঠিক 'জাদুবাস্তবতা' জনরায় পড়ে কি-না আমার জানা নেই।)
নামহীন কথকের সাথে দিনেদুপুরে চায়ের দোকানে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাই আমাকে ধাক্কা দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। প্রায় অনেকটা সময় লেগেছে আমার এই ঘটনা হজম করতে (হজম হয়নি)। এবং সমসাময়িক ধারণার বাইরে গিয়ে এমন কিছু লেখক লিখেছেন কিংবা লিখতে পেরেছেন বলে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
বইটাকে একটা নতুন ধাচের লেখা বলা যায়, যা সমসাময়িক উপন্যাসের ধারণার বাইরে। আবার যদি জিজ্ঞেস করা হয় এ বই কি ভালো লাগার মতো? তাহলে বলতে হয় বিষাদ ঘেরা এক শহরের কিংবা একাধিক জীবনের এই বইটা আসলে ভালো লাগার মতো বই না বরং একটা অদ্ভুৎ বই। যে বই পড়ে আপনি ভাবার মতো অনেককিছু পাবেন, এবং অনেক ভেবেও আরও অনেক প্রশ্নের সাথে যে প্রশ্নের উত্তরটা আপনি পাবেন না সেটা হচ্ছে 'কথকের নাম কি?' এবং বই শেষ করেও একগাদা প্রশ্ন আপনার ঝুলিতে থাকবে একথা নিশ্চিত।
বিনয় মজুমদারের পাশাপাশি গল্পের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অসীম সরকার, এবং কথককে ছাপিয়ে গিয়ে পুরো বইজুড়ে সশরীরে উপস্থিত না থেকেও সবচে বেশি করে যার উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে সে হলো এই অসীম সরকার।
অনেককিছু লিখেও যেনো ঠিক কিছুই বলা হয়নি, যেকোনো নতুন জিনিসই গ্রহণ করা একটু কঠিন। আমার জন্যেও সহজ হয়নি। আমি বই পড়ে দু'দিন ধরে ভাবছিলাম আসলে এই বই নিয়ে কি লেখা যায়।
জানাশোনা প্লটের বাইরে লেখা 'চায়ের কাপে সাঁতার'কে গ্রহণ করাটাও সহজ হওয়ার কথা না। কারণ বইয়ের সঠিক কোনো জনরা নেই, গল্প নেই তাও বইজুড়ে অনেক গল্প করে গেছেন লেখক। কাক, কুকুর, দৃষ্টিশক্তিহীন এক ফকির যে কি-না আপনার মাথার ভেতর কি চলছে টের পেয়ে যায়, আপনার স্বপ্ন বুঝে যায়, আর কাকের ভাষা বুঝতে পারে এমন একজন কাকবিশারদ এবং ভয়ানক রকমের প্রেডিকশনের ক্ষমতাধর অসীম সরকার, একদল বেদেকে নিয়ে লেখা বিচিত্র এই উপন্যাসে ডুব দিতে পারেন চাইলেই। এবং সাধারণত যেমনটা দেখা যায়, গল্পের মূল চরিত্র বেশ নায়কোচিত কেউ হন, এই ���ল্পের গল্পকার তার প্রায় উল্টোই বলা চলে।
** লেখকের লেখা বেশ ভালো লেগেছে আমার। গল্প বর্ণনার ভঙ্গির জন্যেই এতো বড় বইটা অনায়াসে পড়া ফেলা গেছে। এবং সমকালীন যেসকল লেখকের লেখায় নিজস্বতার ছাপ রয়েছে তার মধ্যে এনামুল রেজার নাম নিতেই হয়।
লেখকের চিত্তাকর্ষক সাহিত্য প্রতিভা নিঃসন্দেহে আখ্যানের জটিল স্তরগুলির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়েছে, ধীরে ধীরে নিজেকে উন্মোচন করেছে এবং অধীর আগ্রহে অনুসন্ধান ও উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে বইয়ের পাতায় পাতায়। অসীমের সেন্স অফ হিউমার এবং মন্ত্রমুগ্ধকর কবিতার গভীরতা অন্বেষণ করুন, নেজামের চতুর কৌশল এবং ধূর্ত উপায়ে অনুসন্ধান করুন, বিনয়ের প্রাণবন্ত যৌবনের গল্পগুলি উন্মোচন করুন, ইলার কষ্টে ব্যথিত হওন, নিরদের গভীর প্রেমের তীব্রতা অনুভব করুন বা নিজেকে নিমজ্জিত করুন কাকবিশারদের মনোমুগ্ধকর গল্পে। এই আখ্যানগুলির প্রতিটি-ই একটি অনন্য এবং বাধ্যতামূলক ভ্রমণের প্রস্তাব দেয় যা মুগ্ধ করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে। আপনার অ্যাডভেঞ্চার চয়ন করুন এবং গল্পগুলি আপনার সামনে উন্মোচিত হতে দিন। কিসে ডুব দিতে চান? একবার দিয়েই দেখেন।
দর্শন+ফ্যান্টাসি+ রহস্য ✅
বিগত কয়েকদিন ধরে ঘোরে ছিলাম, ঠিক কি লিখলো। হাইলি রিকমেন্ডেড। ★★★★★
"জীবন কখনো চমৎকার শুরু হওয়া সেই বইটার মতো। কয়েক অধ্যায়ের শেষেই যা ঝিমিয়ে পড়ে, তখন বইটা আমরা জানালা দিয়ে ছুড়ে মারতে চাই। এমনকি কেউ কেউ ছুড়েও মারি। জানালা গলে বইটি উন্মুক্ত বাতাসে ভেসে ভেসে নিচে পড়তে থাকে।
বিনয় মজুমদার অবশ্য এ ব্যাপারে উল্টো মতামত সেধেছিলেন। এক শীতের সন্ধ্যায় আমাকে বলেছিলেন, 'জীবন হলো সেই বই, যা গাদা গাদা রিপিটেশনে ভরপুর। বোরিং।'
'ভালো জিনিসের রিপিটেশন কি ভালো না?”
ছোট্ট একটা টুলে বসেছিলাম আমি। হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে উড়ছিল ধোঁয়া। চারদিকে ধীরে ধীরে নামছিল হিম।
বিনয় মজুমদার তার রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নরম কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভালো জিনিসের রিপিটেশন কি হয়? পৃথিবীতে কেবল একই বিষাদ বারবার ফিরে আসে অথচ একটা সুখের দ্বিতীয় জন্ম হয় না"।
গোলকধাম রহস্য। মহাভারত পড়ছে ফেলুদা আর তোপসে। মহাভারত নিয়ে তোপসের মন্তব্য, মহাভারত হচ্ছে ননস্টপ ভূরিভোজ। গল্পের পর গল্পের পর গল্প। এনামুল রেজার চায়ের কাপে সাঁতারকে মহাভারতের সাথে তুলনায় যাব না কখনোই। কিন্তু এইটাতেও সেই গল্পের পর গল্পের একটা আমেজ কিন্তু পাওয়া যায়। নামহীন যে মানুষটি মায়ানগর এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছে ট্রেনে করে, তার আব্বু-আম্মুর গল্প থেকে শুরু করে অসীম-ইলা, কানা নেজাম, বিনয়-লীলা-নীরদ কিংবা মিতিয়ার গল্পের পাশাপাশি কাকবিশারদের কথা, মরা কুকুরের কথা, ছিনতাই-খুন, প্রেম, কাম আর কী কী যে আছে এই উপন্যাসে বলাও একটু কঠিন। পাশাপাশি ইতিহাসের গলিঘুঁজিতে লেখক বিস্তর হেঁটেছেন। কখনো ছদ্মপরিচয়ে, কখনো নিজস্ব চেহারা নিয়েই সেসব পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে। বাংলাদেশের উপন্যাস আমাকে সবসময় খুব আলোড়িত করে এমন না। ইদানীং সুহান রিজওয়ান পড়তে ভালো লাগে, আর এই তালিকায় এখন এনামুল রেজাও থাকবেন, কেবল এটুকুই হয়তো আমি বইটা পড়া শেষে বলতে পারি।
উচ্চ মাধ্যমিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছোট গল্প "অপরিচিতা" পড়েছিলাম।ঐ গল্পে অনুপমের বন্ধু হরিশের সরস রসনার গুণ ছিল।বইটি পড়ার সময় "অপরিচিতা" গল্পের হরিশের কথাই সর্বপ্রথম মনে পড়ে।"চায়ের কাপে সাতার" বইয়ে লেখক অনেক গল্প বলে গেছেন নানা চরিত্রের সাহায্যে তবে কখনোই কোনো গল্প পড়ে একঘেয়েমি লাগেনি বরং প্রত্যেক গল্প পড়েই মনে হয়েছে লেখকের সরস রসনার গুণ রয়েছে এবং তা লেখক ভালোভাবেই ব্যাবহার করেছেন।একইসাথে মূলত টাইমলাইন এগিয়ে গেছে বইয়ে এবং তিনটি টাইমলাইন ই অতি সুনিপুণভাবে লেখক গুছিয়ে এনেছেন বইয়ের শেষের দিকে।যতবার হাতে নিয়ে বইটা পড়েছি ততবার ই হারিয়ে গেছি অসীম সরকার,বিনয় মজুমদার,ইলা রহমান, কানা নেজাম,কাকবিশারদ এর মায়ানগরের মায়ায়!
লেখক এনামুল রেজার লেখালেখির প্রতি বিশ্বাস থেকেই আমি সেই ২০-২১ সাল থেকেই এই দীর্ঘ উপন্যাসটার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলাম। নিয়মিত অনুসরণ করতাম। কবে বের হবে। তখন নামও জানতাম না। যখন নাম জানি আর জেনে যাই কোনোভাবে কোন প্রকাশনী থেকে বের হবে তখন জ্বালানো শুরু করি প্রকাশনীকে। আদর্শ প্রকাশনীর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো আর ওখানের সবাইকে চিনি বলে সমানেই জিজ্ঞেস করতাম কবে আসবে। ওরাও বলত এই তো বের হবে। এভাবে করতে করতে অবশেষে যখন বের হয় তখন এক ফাঁকে সংগ্রহ করি। এটা পড়তেও আমার দীর্ঘ সময় লাগল। পড়া হয়েছে হেঁটে হেঁটে, বাসে বসে বসে। কিংবা রমনা উদ্যানের ভাঙা গাছের গুঁড়িতে বসে।
উপন্যাস সম্পর্কে আর কী বলব? মনে হয় না কিছু বলার দরকার আছে। এত বড় উপন্যাস আর পাতায় পাতায় যার দর্শন, পরিচিত পৃথিবীর মধুর বর্ণনা। অনেক কিছুর সাথে নিজেকেই রিলেট করতে পারছিলাম। গল্পের কথক যেই বয়সে ঢাকা আসে আমিও ওই বয়সেই এসেছিলাম। তাই কখনো মনে হয়েছে গল্পের কথক আমি। আবার কখনো মনে হয়েছে কথকের বন্ধু অসীমই আমি। আবার ওই বিনয় মজুমদারের ছেলে নিরোদই আমি। আমি কানা নেজাম। গল্পের কথকের এখন যে বয়স সে বয়সেই আছি এখন আমি। তাই দৃশ্যগুলো পরিচিত। শুধু পার্থক্য ওভাবে পাখির চোখে দেখতে না পারা। যেটা লেখক দেখিয়ে আমাকে নতুন করে চিনিয়েছেন। মায়ানগর আমাদের এই নানা আনন্দ বেদনার স্বাক্ষী। মায়াকুঞ্জের মতোই একটা বিদ্যাপীঠে আমিও পড়েছি। যে কারণে সেখানকার দৃশ্যগুলোও আমার পরিচিত। আমি যেমন পড়তে চাই তেমন গদ্যে লেখা ‘চায়ের কাপে সাঁতার’। নির্দিষ্ট কোনো আইডিয়া নেই কত কী নেই এমন প্রশ্নও আসে। সবই তো আছে। আমাদের ক্রাইসিসগুলো, আমাদের এক মুহূর্তের আনন্দগুলো। একেই বুঝি বলে ফুল প্যাকেজ। কখনো মনে হয়েছে ঢাকায় আসা গল্পের নামহীন কথক যে অ্যাভিউজের স্বীকার হয়েছে— সেখান থেকেই তার গল্পের ডালপালা ছড়িয়েছে। সম্পর্কের খাতিরে নানান দুনিয়ায় চলে গেছে। কিছু মিথ, ইতিহাসও উপন্যাসকে সত্যি সত্যিই এক স্বার্থক উপন্যাস হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
কাকের প্রতি আমারও দারুণ অবসেশন যেটা এই উ���ন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্ট। লম্বা একটা হাসিখুশি জার্নি শেষ হলো। মাথার মধ্যে এমন ভয়ানক গল্প নিয়ে আমাদের ঢাকায় কত কত মানুষ কেউ জানে না।
আহা! কি ঝরঝরে শব্দচয়ন। পাতার পর পাতা পড়তে পড়তে যখন শেষ পৃষ্ঠায় এসে ঠেকলাম তখন অজান্তেই মনটা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। মনে মনে বললাম- বইটার সাথে যাত্রাটা তবে বুজি শেষ হয়ে গেলো!