"মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স"
এখানে মানুষ মা রা হয়।"
একটি জীবন! কত রং ছড়ায় এ জীবন। যে জীবনের গল্প বলে শেষ করা যায় না। কিছু না করেও কখনো কখনো দায় নিতে হয়। কিংবা দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। হয়তো ফাঁসিয়ে দেওয়া একেই বলে। তখন? পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া কি আর উপায় থাকে? যে জীবন একবার পালিয়ে বেড়ানোর স্বাদ পেয়েছে, সেই জীবন কোথাও থিতু হতে পারে না। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, ছুটে বেড়ানো জীবন নিয়ে এক সময় ক্লান্ত লাগে। সেই ক্লান্তির বিশ্রাম অবশেষে শেষ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
তেমনই এক জীবন যেন অতিবাহিত করছে মতি মিয়া। খুনের দায় মাথায় নিয়ে ঘুরছে, যেই খুন নিজে করেনি। নিজ চোখে দেখা সেই খু নের দায় মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো জীবন শুরু। গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসা। জুলহাস নামের এক রিকশাচালকের আশ্রয়ে যেন নতুন জীবন পাওয়া। মতি মিয়া হয়ে ওঠে জিতু মিয়া। কিন্তু, এখানেও যেন সেই অতীত তারা করে বেড়ায়। আরও একটি খুন। এবার বস্তাবন্দী লাশ ফেলে দেওয়া হয় মতি মিয়ার সামনে। ভয়, শঙ্কা, পুরনো অতীত... মিতু মিয়া কী করবে এখন? আবারও কি ছুটবে নতুন জীবনের খোঁজে? তাতেও কি শেষ রক্ষা হবে?
বাবার প্রচুর অর্থ থাকলে সন্তানের বখে যাওয়া অসম্ভব কিছু না। আর একমাত্র সন্তান হলে তো কথা-ই নেই। সব কিছুর উত্তরসূরি যখন নিজে, তখন পড়াশোনা করে আর কী হবে? মারুফ তাই পড়াশোনা ছেড়ে বখে গিয়েছে। সারাদিন মদ, গাঁজা নিয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু তার মনের কথা কেউ জানে না। ভালোবাসা এমনই এক জিনিস যার জন্য মানুষ বদলে যায়। কেউ ভালো পথে ছুটে, আবার কেউ অমানুষ হয়ে যায়। জিনিয়াকে ভালোবাসা কি মারুফের দোষ? বান্ধবীকে কি ভালোবাসা যায় না? তাহলে কেন এত দূরে চলে যাওয়া? জিনিয়া কি বোঝে না, তার জন্যই মারুফের এই অবস্থা? মারুফ চায় জিনিয়াকে, একই সাথে চায় নিজেকে বদলে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতি সবসময় অনুকূলে থাকে না। মারুফ কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? আর জিনিয়া?
সবুজবাগ বস্তির পাশে বস্তাবন্দী লাশ মিলেছে। এভাবে মানুষ মা রা যায়? কী বিভৎস! পুরো শরীর কে টে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। কেন? কোন প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছে খু নি? মাথাটাও উধাও। এমন অবস্থায় সবুজবাগ থানার ওসি মোয়াজ্জেম জোয়ার্দারের ঘুম উধাও। কোনো সূত্র নেই, কিছু নেই। কীভাবে এ সমাধান হবে?
রহস্য সমাধান করতে গিয়ে সহকারী পুলিশ অফিসার আসাদ পৌঁছে গেল এক নির্জন নির্মাণাধীন কমপ্লেক্সে। কে জানত, নিজের মৃত্যুকে এভাবে ডেকে আনছে নিজে। সহকর্মী হারিয়ে মোয়াজ্জেম জোয়ার্দার যেন আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে। কিন্তু সামান্যতম সূত্র নেই। একের পর এক সন্দেহভাজনদের তুলে আনা হচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পুলিশ প্রশাসন যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আছে।
বাধ্য হয়েই যেন নাক গলানো শুরু করল পিবিআই। আসিফ আলী ও তার দল এবার সর্বক্ষেত্রে। কিন্তু সেখানেও কোনো সূত্র নেই। লাশের দেখা মিলল আরেকটা। এরপর আরেকটা। কিন্তু খুনি? এতটা নির্ভুলভাবে, পরিকল্পিতভাবে কেউ খুন করতে পারে? দিশেহারা ভাব সবার মাঝে! আর কতটা মৃত্যুর কারণ হওয়ার পর থামবে খুনি? সূত্রবিহীন এই রহস্যের সমাধান হবে কীভাবে?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
"মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স" বইটিকে কোন জনরায় ফেলা যায়? সিরিয়াল কিলিং? না পুলিশ প্রসিডিউয়াল? প্রথাগত সিরিয়াল কিলিংয়ের তুলনায় ভিন্ন লেগেছে আমার কাছে। লেখক মনোয়ারুল ইসলাম অতিপ্রাকৃত জনরায় জনপ্রিয় হলেও, থ্রিলার সাহিত্যে দারুণ কাজ করছেন। "অতঃপর কবি মঞ্চে উঠিলেন" বইটির পর আরো একটি দারুণ বই। আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।
লেখকের লেখায় একটা ফ্লো আছে। সেই ফ্লো-এর কারণে খুব সাধারণ লেখাও দারুণ গতি পায়। যেমন, এই বইটির শুরু হয়েছিল সাদামাটাভাবে। মতি মিয়ার জীবন দিয়ে শুরু। ধীরগতির কাহিনি। তারপরও খুব দ্রুত পড়া গেছে লেখকের লেখার কারণে। এরপরই ধীরে ধীরে লেখক সুতো ছাড়তে শুরু করেন। গল্প একটু একটু করে এগোতে থাকে আর রহস্য যেন ঘনীভূত হতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে কাহিনি।
লেখক মাথা নষ্ট করার মতো চমক দেননি। তারপরও যেন বইটি ছেড়ে ওঠার উপায় নেই। এর কারণ ধারাবাহিকতা আর লেখনশৈলী। সেই সাথে গল্প বলার ধরন ভালো লেগেছে। একটি পুলিশি তদন্ত কেমন হতে পারে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বইটি। সেই সাথে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ভালো লেগেছে। রহস্য সমাধানে পলিগ্রাফ টেস্টসহ অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন ভালো ছিল।
খুন, খুনি, তদন্ত... বইটি কেবল এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে জীবনের গল্পও উঠে এসেছে। বাস্তবতা মিশে ছিল। যেমন মতি মিয়ার জীবন। মূল গল্পের এগিয়ে যাওয়ার সাথে লেখক আশেপাশের অনেক চিত্র তুলে ধরেছেন। যেগুলোর কিছু প্রয়োজন ছিল। আবার কিছুটা না এলেও ক্ষতি ছিল না। তবে পড়তে খারাপ লাগেনি। গল্পে প্রেম ছিল, ভালোবাসা ছিল, আবেগ-অনুভূতি ছিল। পুরো এক কমপ্লিট প্যাকেজ।
একজন লেখকের সবচেয়ে বড়ো গুন, তিনি যখন পাঠকের অনুভূতিতে জায়গা করে নিতে পারেন। মনোয়ারুল ইসলামের সেই গুন খুব ভালো মতোই আছে। খুন হওয়ার সময় যখন পাঠক প্রার্থনা করে, এমন যেন না হয়। কিছু একটা হবে জানার পরও, যে এই চিন্তা; এখানেই লেখকের স্বার্থকতা। শেষ খুনের সময় আমি নিজেও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কেন এমন হলো? এমন না হলেও তো পারত।
আমার শেষটা ভালো লেগেছে। যদিও কিছু জায়গায় তাড়াহুড়ো ছিল। যেন খুব দ্রুত শেষ করার তাড়না। তারপরও খারাপ লাগেনি। কিছু অসমাপ্ত গল্পের রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ। সে কারণে সমাপ্তি নিয়ে আমি তৃপ্ত।
তবে বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে আমার মনে খটকা রয়েছে। সেগুলো একে একে তুলে ধরছি।
০ গল্পের শুরুতে মারুফকে নিয়ে বলা হয়েছিল, সে কবিতা পছন্দ করে। তার উপন্যাস ভালো লাগে না। তার ঘর জুড়ে শুধু কবিতার বই। কিন্তু গল্পের এক পর্যায়ে মারুফকে "তোমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে" বইটা পড়তে দেখা যায়।
০ মারুফ যখন নূরকে কল দেয়, তখন ফোন বারবার বন্ধ বলে। কিন্তু নূরকে যখন দেখানো হয় তখন সে ফোন রিং পাচ্ছিল কিন্তু রিসিভ করছিল না। পরে সাতাশবার মিসড কল দেখায়।
০ আমার মনে হয়েছে লেখক কিছু গল্পের অবতারণা করেছেন পাঠককে চমক দেওয়ার জন্য। তার আসলে কোনো প্রয়োজন ছিল না। যেমন, সুবলের যে চারিত্রিক গুণাবলী (বা দোষ) লেখক ব্যাখ্যা করেছেন। অথবা সুজনের ব্যাগে করে কা টা মাথা নিয়ে যাওয়া ও শাকিলের সাথে ওভাবে দেখা হওয়া।
০ রাস্তার মাঝে তিনটি কুকুরকে গুলি করে মেরে ফেলার কারণ বোধগম্য হলো না। এই কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। শুধু কি পুলিশদের ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এমন কান্ড?
০ আসাদকে মারার যে অস্ত্র, সেই চুরিটা কীভাবে হয়েছে সেটাও ব্যাখ্যা করা হয়নি।
০ বেশ কিছু রগরগে বর্ণনা ছিল, যা আমার পছন্দ হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে বইয়ে এগুলো আমার পছন্দ হয় না। না থাকলেও ক্ষতি হতো না।
ছোটখাটো ভূলত্রুটি বাদ দিলে বইটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে তদন্ত প্রক্রিয়ার জন্য।
▪️চরিত্রায়ন :
লেখক মনোয়ারুল ইসলামের বইয়ে সবচেয়ে দিক ভালো লাগে, তা হচ্ছে চরিত্র গঠন। এই দিকে তিনি কার্পণ্য করেন না। ছোটো, বড়ো সকল মিল চরিত্র তার লেখনীর মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেমন এই গল্পে মতি মিয়া, জুলহাস, জুলেখা, মদিনা, তাহেরদের মতো চরিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, একইভাবে ফুটে উঠেছে মারুফ, জিনিয়ারাও।
সবচেয়ে বেশি যে দিক ভালো লেগেছে, সবাইকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়াস। পুলিশি তদন্তের অনেক বইয়ে দেখা যায়, মূল চরিত্রকে অতিমানবীয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এখানে সেই চেষ্টা করা হয়নি। তারাও মানুষ, তাদেরও আবেগ অনুভূতি আছে। লাশ দেখায় ভয়ভীতি আছে।
আরেকটি জিনিস ভালো লেগেছে, কেউ একা মহামানব হওয়ার চেষ্টা করেনি। সবুজবাগ বা খিলগাঁও থাকার পুলিশেরা বা পিবিআই অফিসাররা, সবাই একযোগে রহস্য সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। উল্লেখ না থাকলে বোঝার উপায় নেই, কে প্রধান আর কে সহকারী। সবাই যেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবার কাজ ভিন্ন, যে যার কাজে দায়িত্ববান।
উপন্যাসে খুনির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু দেখানো হয়নি। লেখক তাকে আড়াল করেছিলেন হয়তো শেষ চমক দেওয়ার জন্য। তবে এত ভয়ংকরভাবে যে খুন করতে পারে, তার মনস্তত্ত্ব ফুটে ওঠেনি। এই জায়গাটায় একটু কমতি লেগেছে আমার। এছাড়া মতি মিয়া আর মারুফকে শুরুতে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, শেষে এসে তারা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যদিও মতি মিয়া একটি জায়��ায় এসে থেমেছে।
▪️বানান, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও অন্যান্য :
লেখকের শব্দচয়ন চমৎকার। তারপরও হুটহাট করে কিছু ইংরেজী শব্দের ব্যবহার যেন বিরিয়ানিতে এলাচির মতো অনুভূতি দিয়ে যায়। যেখানে বাংলা পরিভাষা আছে, কেন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে হবে? এমন না যে লেখক নিয়মিত লেখায় ইংরেজি ব্যবহার করছেন।
কয়েকটি বানান ভুল বেশ পীড়া দিয়েছে। বিভৎস শব্দকে প্রতিটি জায়গায় ভীবৎস লেখা ছিল। প্রথমে ছাপার ভুল মনে হলেও পরে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বারবার দেখা গেছে। একইভাবে ঘুটঘুটে হয়ে গিয়েছিল গুটগুটে, দুরুদুরু ছিল ধুরুধুর... এমন বেশ কয়েকটা বানান ভুল লক্ষ্য করেছি। যার কারণ আমার জানা নেই। বেশ কিছু ছাপার ভুল থাকলেও তা আমলে না নিলেও চলে।
প্রচ্ছদ পছন্দ হয়নি। কেমন যেন! গল্পটাও ঠিক ফুটে হয়নি। অনেকে হয়তো আমার সাথে দ্বিমত হবেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগেনি। আরেকটু বেটার হতে পারত। যেমনটা "অতঃপর কবি মঞ্চে উঠিলেন" বইয়ের ছিল। এছাড়া বাঁধাই ভীষণ শক্ত লেগেছে। খুলে পড়তে অসুবিধা হয়েছে। ফন্টও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা ছোটো। হয়তো পৃষ্ঠা কমানোর প্রয়াস। একদিক দিয়ে ভালো। তবে চোখের উপর চাপ গিয়েছে কিছুটা।
▪️পরিশেষে, এই বইটির সিকুয়্যাল আসা সম্ভব? হয়তো সম্ভব। লেখক একটি ধারণা দিয়ে রেখেছেন। যদিও আমি চাই, এখানেই গল্পের শেষ হোক। তারপরও লেখক চাইলে সিরিজ করতে পারেন, সবার নাও করতে পারেন। আমি এভাবে সমাপ্তিতে তৃপ্ত
▪️বই : মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স
▪️লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
▪️প্রকাশনী : অন্যধারা
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৪০
▪️ মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫