ইংরেজী ভাষার অভিধানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০০-১০০০ নতুন শব্দ যোগ হয়ে চলেছে। নতুন এই ইংরেজী শব্দগুলোর একটি বড় অংশেরই জন্ম বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহারের বদৌলতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য প্রতিনিয়তই নতুন শব্দ হাতড়ে বেড়ায়। ইদানীংকার যুগের এমনই একটি নতুন উদ্ভাবিত শব্দ স্যাপিওসেক্সুয়্যাল (Sapiosexual), অর্থাৎ কিনা যিনি শারীরিক সৌন্দর্য নয়, বুদ্ধিমত্তাকেই যৌন আকর্ষণের প্রধান উপকরণ হিসেবে গণ্য করেন। বলা বাহুল্য, বুদ্ধিমত্তার দ্বারা ‘যৌনাভাবে’ আকর্ষিত হতে হলে নিজেরও যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা থাকা চাই; পুকুরের পানির গভীরতা মাপতে হলে যেমন দরকার পড়ে শুকনো লম্বা কাঠির। ‘স্যাপিওসেক্সুয়্যাল’ কথাটি বেশ গুরুগম্ভীর এবং এর অর্থটিও মনে হয় সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে আমরা প্রত্যেকেই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কখনো না কখনো ‘স্যাপিওসেক্সুয়্যাল’ হয়েই যাই! কোন আসরে হঠাৎ পরিচয় এমন কোন ব্যক্তির সাথে যদি প্রিয় চলচ্চিত্র, প্রিয় উপন্যাস কিংবা প্রিয় ব্যান্ড/ সংগীতশিল্পীদের তালিকা গুলো মিলে যায়, আমরা তাঁর সাথে একধরণের আত্নিক সম্পর্ক অনুভব করি। মনে হয় “এ মানুষটা আমার কতদিনের চেনা, কত আপন! কে বলবে পরিচয় মাত্র এখনি হলো?” কর্মব্যস্ততার ফেরে পড়ে যদি স্বল্পপরিচিত এই ব্যক্তির সাথে দেখাসাক্ষাৎ একেবারেই কমও হয়, তবুও প্রতিবারেই দেখা হবার বেলায় অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। এখানে বলে রাখা ভালো, ‘স্যাপিওসেক্সুয়্যাল’ ঠিক যৌনাকাঙ্ক্ষা অর্থে খুব কমই ব্যবহৃত হয় (বুদ্ধিমত্তার স্তরবিশেষে যৌনতার স্থান বরাবরই একটু নড়বড়ে!) এবং এটি সমলিঙ্গ-বিপরীতলিঙ্গ নির্বিশেষে সবার প্রতিই হওয়া চলে। বুদ্ধিমান যন্ত্রপাতির বর্তমান পৃথিবীতে আসলে দুজন বুদ্ধিমান মানুষ একত্র হওয়াটাই বিশাল ব্যাপার। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু নারী না কি পুরুষ, লিঙ্গের সীমানা নির্ধারণকারী এই প্রশ্ন বুদ্ধিমত্তার এই ক্ষেত্রে নিতান্তই অগৌণ হয়ে পড়ে। সে যা হোক, বিশেষত প্রেমের ক্ষেত্রে কথিত আছে, ‘আদর্শ জুটি’ বিষয়টি সমাজে অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। দুষ্ট লোকেরা বলেন, চালাক ছেলেরা নাকি প্রেম করে বোকা মেয়েদের সাথে (ফলে বোকা ছেলেদের চালাক মেয়ে ছাড়া আর কোন ‘গতি’ থাকেনা)। কঠিন এক দুষ্টচক্র! সৈয়দ মুজতবা আলী’র প্রেমের উপন্যাস ‘শবনম’ এদিক দিয়ে অত্যন্ত ব্যতিক্রম। উপন্যাসের নায়ক মজনূন ও নায়িকা শবনম, বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে কেউই কারো চেয়ে কম যান না। দুজনই কাব্যরসিক। একজন হাফিজ থেকে দু চরণ উদ্ধৃত করেন তো আরেকজন প্রত্যুত্তোরে রুমী শুনিয়ে দেন। উভয়ই ফার্সী ও ফরাসী ভাষার ওস্তাদি মারপ্যাঁচ দিয়ে কথা বলতে জানেন। প্রেমের উপন্যাস, তায় আধুনিক ভাষায় ‘স্যাপিওসেক্সুয়্যাল' জুটি, অতএব, প্রথম দেখায়ই প্রেম না হয়ে যায় কোথায়?
আমি ‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’ বিষয়টি কখনোই খুব ভালো বুঝে উঠতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয়, ‘প্রেম’ শব্দটি এই বিশেষ ক্ষেত্রে সঠিক অর্থ বহন করছেনা, কিংবা, শিল্প সাহিত্যে প্রেম বিষয়টিকে যত মহান করে চিত্রিত করা হয়, কার্যত তা আসলে অত মহান নয়! ১০৫ পাতার গল্পের ১৬তম পাতায় এসে নায়ক নায়িকার তৃতীয় দেখায়ই (কোনটিই আধ ঘন্টার বেশী দীর্ঘ ছিলো বলে তো মনে হয় না) যখন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা হয়ে যায়, প্রেমের গল্পের ক্ষেত্রে আমার উন্নাসিকতা আরেকটু বেড়েই যায় বটে! শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের ছিচ্ছিকারের পাত্র বাংলা সিনেমাগুলোর সাথে ‘শবনম’ এর পার্থক্য আমার কাছে আরেকটু কমে আসে যখন মজনূন সিনেমার নায়কদের মত বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে ‘কত মেয়েই তো দেখলাম জীবনে, কিন্তু,...... কিন্তু এই মেয়েটি......একেবারেই অন্যরকম’ ভেবে অস্থিরচিত্ত হন। আরো একটি বিষয় আমার কাছে যথেষ্টই দৃষ্টিকটু লেগেছে। সেটি হলো শবনম-মজনূনের বয়েসের তফাৎ। মজনূনের বয়েসের উল্লেখ নেই, তবে বাঙ্গালী ছেলে ভিনদেশ আফগানিস্তানের কলেজের মাস্টারী করছেন, মধ্য বিশ তো ছাড়াবেই অন্তত। শবনমের উনিশ। উনিশ-পঁচিশে ফারাক কম-ই তবে শবনমের অসামান্য বুদ্ধিমত্তার কথা স্বীকার করেই বলছি, উনিশ বছর বয়স্কা তরুণীর প্রেমানুভূতির ব্যাপারে আমি যথেষ্টই সন্দেহবাদী।
‘শবনম’ অত্যন্ত কাব্যময় উপন্যাস। পাতায় পাতায় আছে ফার্সী-সংস্কৃত বয়েৎ। মুজতবা আলী ভিনদেশী বয়েৎ গুলোর অনুবাদও ভালোই করেছেন তবে চরণ গুলোর অন্তর্নিহিত দর্শন ভালো লাগেনি মোটেই। নিতান্ত সাধারণ জীবন দর্শনকে কাব্য করে ভারী ভারী শব্দের প্রয়োগে মহান করে তোলাটাকে আমি মানতে পারিনা কেন যেন; স্বীকার করি, কাব্যরসে আমি অনেকটাই বঞ্চিত।
উপন্যাসটি লেখবার কায়দাও আমার পছন্দ হয়নি। উত্তম পুরুষে বর্ণিত মজনূনের বয়ানে একটা ন্যাকামো আছে যা তীব্রভাবে বিকর্ষণ করেছে আমাকে। ভালো লাগেনি সংলাপ গুলোও। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রায় হাজার খানিক বছরের। এত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি ভাষার সাহিত্যের আধুনিক সময়ের উপন্যাসের সংলাপ যদি সেই শুরুর সময়ের সংলাপের মতই হয়, সেটি দুঃখজনক। নায়িকা শবনমের দুটি সংলাপ এখানে উল্লেখ করছিঃ
“ওগো তুমি কেন ভাবো তুমি অতি সাধারণ জন? তোমার ঐ একটিমাত্র জিনিসই আমার বুকের ভেতর যেন ঝড় এসে আমার বুকের বরফ ধুনরীর মত তুলো-পেঁজা করে দেয়। আমার অসহ্য কষ্ট হয়। তুমি কেন আমার দিকে আতুরের মত তাকাও, তুমি কেন তোমার যা হক্ক তার কণাটুকু পেয়েও ভিখারীর মত গদ্গদ হও? তুমি কেন বিয়ের মন্ত্রোচ্চারণে শেষ না হতেই সদম্ভে কাঁচি এনে আমার জুলফ কেটে দাও না? তুমি কেন আমার মুখের বসন দু হাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেল না? সিংহ যে ���কম হরিনীর মাংস টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খায়?”
“কিন্তু এসব কিছু নয়, কিছু নয়। আসল কথা, সে তোমার মৃত্যুঞ্জয় প্রেম। আমি সুজাতা, সুচরিতা, সুস্মিতা আর আমার প্রেম যেন নব বসন্তের মধু নরগিস – তোমার প্রেম ভরা-নিদাঘের বিরহরসঘন দ্রাক্ষাকুঞ্জ। তারই ছায়ায় আমি জিরবো, তারই দেহে হেলান দিয়ে আমি বসব, সেই আঙ্গুর আমি জিভ আর তালুর মাঝখানে আস্তে আস্তে নিষ্পেষিত করে শুষে নেব। এই যেরকম এখন করছি।“
গল্প হিসেবে ‘শবনম’ খুব খারাপ ছিলোনা। যথেষ্ট আবেগ ও বেদনা আছে কিন্তু লেখনীর ধরণ উপন্যাসটি উপভোগ করবার পথে আমার সামনে চীনের প্রাচীর তুলে দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত যা আমার অগম্যই রয়ে গেলো (স্যাপিওসেক্সুয়্যাল পাঠক নই, সন্দেহ কী?)। ‘শবনম’ বিয়োগাত্নক উপন্যাস, তবে বইটির ১০৫টি পাতা সম্পূর্ন পড়াটাই আমার কাছে বেশী ‘বিয়োগাত্নক’ হয়ে থাকবে।