নিক পিরোগের লেখা থ্রি এ এম সিরিজ পড়েছেন? পড়লে নিশ্চয়ই হেনরি বিনসের কথা মনে আছে? যে ২৪ঘন্টায় মাত্র এক ঘন্টা জেগে থাকতে পারতো। বলুন তো সেই সিরিজের সবথেকে বেশি থ্রিল দেয় কোনটা? আমার মতে গল্পের পাশাপাশি তার ১ঘন্টা জেগে থাকার অদ্ভুত রোগই আমাদের বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে সিরিজটির প্রতি। তার সেই এক ঘন্টা জেগে থাকার সেই অদ্ভুত রোগের লেখক নাম দিয়েছেন হেনরি বিনস।
এমন রোগ কী আদৌ আছে বাস্তবে! সেই খবর আমার জানা না থাকলেও তেমনই আকর্ষণীয় আর অদ্ভুত সব রোগ নিয়ে যদি পড়তে চান, জানতে চান তবে ডা. ফুয়াদ আল ফিদাহ লেখা 'কাদামাটির গোলকধাঁধায়' চমৎকার একটা বই হবে। লেখক এখানে এমনই সব অদ্ভুত রোগের আলোচনা করেছেন যার পৃথিবীতে অস্তিত্ব আছে।
মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এই রহস্যময় মানবদেহ, যা তৈরি কাঁদামাটি থেকে। কত কী যে এই দেহ নামক যন্ত্রটি ধারণ করে আছে তা বলার বাইরে। অথচ চিকিৎসকদের প্রায়শই হারিয়ে যেতে হয় কাদাঁমাটির গোলকধাঁধায়। সেই গোলকধাঁধার অসংখ্য রহস্যময় বাসিন্দা থেকে লেখক তুলে এনেছেন কিছু গল্প, রোগের, সেই রোগে আক্রান্ত মানুষদের, কিছু আবিষ্কারের, কয়েকজন মহান ব্যক্তিত্বের।
রোগবালাই এর আলোচনা আসলেই আমার মতো আমজনতার প্রথমেই চোখে ভেসে উঠে কঠিন কঠিন সব নাম, বর্ণনা আর সেখানে বইয়ের কথা বললে ভাষা নিয়ে তো সন্দিহান হতেই হয়। বইটা পড়া শুরুর আগ পর্যন্ত আমার মাঝেও তার ব্যতিক্রম ছিলো না, কিন্তু পড়া শুরু করার পর দেখলাম, না লেখক জটিল জটিল থিওরি তো কপচাইনি, উপরন্তু আলোচনা করেছেন একেবারে সহজ সাবলীল ভাবে, কিছুটা গল্পের ছলে। অনেক রোগির কেস স্টাডি গুলোও তুলে ধরেছেন ফিকশনের আদলে।
সম্পূর্ণ বইটি তিন ভাগে বিভক্ত। যেখানে প্রথম ভাগে স্থান পেয়েছে জেরুজালেম সিন্ড্রোম, কনজেনিটাল অ্যানালজেসিয়া, মরজেলনস ডিজিজ, অ্যাকুয়াজেনিক আর্টিকারিয়া, কুরুর মতো আমার মতো আমজনতার না জানা রহস্যময় আকর্ষণীয় রোগের বর্ণনা, উৎপত্তি, কেসস্টাডি, ইতিহাস। তেমনই আছে আমাদের পরিচিত ডায়বেটিস নিয়ে নানান জানা অজানা তথ্য, কিংবা প্লাসিবো ইফেক্টের মতো অদ্ভুত চমকে দেওয়ার মতো চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা।
দ্বিতীয় পর্বে লেখক আলোচনা করেছেন চিকিৎসা শাস্ত্রের সাথে জড়িত মিথের চরিত্র, আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক, চিকিৎসা শাস্ত্রে ইসলামি সভ্যতার অবদান, টাইফয়েড মেরির রোগ ছড়ানোর গল্প আর নিউটনের বিষণ্ণতার বর্ণনা। এই অংশের চিকিৎসা শাস্ত্রে ইসলামি সভ্যতার অবদান শিরোনামে লেখাটা আরো বিস্তারিত তথ্য সংবলিত হলে ভালো হতো।
আর শেষ পর্বে লেখক আলোচনা করেছেন কিছু আমাদেরই পরিচিত রোগ আর তার চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে, কিছু আবিষ্কারও যে রোগের সৃষ্টি করে তার বর্ণনা, আর সর্বশেষ আমাদের দেশেরই আবিষ্কার ওরস্যালাইনের গল্প, যে ওরস্যালাইন ৫ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
কাদামাটির গোলকধাঁধায় বইটি নন-ফিকশনের আদলে সর্বশ্রেণীর পাঠক যাতে বুঝতে পারে সেই ভাবেই চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের এক অন্যন্য সংযোজন, যা পড়তে গিয়ে সময় কোনদিক দিয়ে পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। বইটার জুলিয়ানের প্রচ্ছদটা দৃষ্টিনন্দন, আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। প্রোডাকশন ভালো হলেও খুলে পড়তে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল।