সৃষ্টির আদি থেকেই নিজের আজন্মলালিত স্বপ্নকে জয় করতে দুঃসাধ্য পথ পাড়ি দিয়েছে মানুষ। গ্রীক কল্পলোকে যেমন মোমের ডানা পিঠে লাগিয়ে আকাশ জয় করতে উদ্যত হয়েছিলেন ইকারুস। কিন্তু সূর্যদেবতার চোখরাঙানিতে খরতাপে পুড়ে সেই মোম গলে ভূপতিত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। স্বপ্নজয়ের প্রয়াসে এমন অসমসাহসী দৃষ্টান্ত বাস্তব জীবনেও কম নেই। পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরি তেমনই এক দুঃসাহসী চরিত্র।
ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এই কিংবদন্তির স্বল্প পরিসরের জীবনে পর্বতারোহণই ছিল একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। উইনচেস্টারের স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র আঠারো বছর বয়সে আল্পসের কিছু কঠিন রুট আরোহণ করতে গিয়ে শুরু হয় পর্বতের সাথে তাঁর সখ্যতা। সময়ের আবর্তনে পরবর্তীতে একমাত্র সদস্য হিসেবে অংশ নেন মাউন্ট এভারেস্টের ইতিহাসের প্রথম তিন অভিযানে। ১৯২৪ সালে এভারেস্টের তৃতীয় অভিযানটিতেই তাঁর এবং সতীর্থ স্যান্ডি আরভিনের মৃত্যু হয়।
দুই পর্বতারোহীর মর্মান্তিক পরিণতির পরও যুগের পর যুগ ধরে পর্বতারোহণ মহলের রথী-মহারথীরা বারবার উল্টে গেছেন ঐ অভিযানের পাতা। কিন্তু সেই গল্পের উপসংহার লেখা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। অমীমাংসিত সেই রহস্য, অসমসাহসী জর্জ ম্যালরির জীবন, তাঁর মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান এবং ১৯৯৯ সালে তাঁর দেহ উদ্ধার অভিযানের গায়ে কাঁটা দেয়া সব গল্প উঠে এসেছে কনরাড অ্যাংকার এবং ডেভিড রবার্টসের লেখা "The Lost Explorer: Finding Mallory on Mount Everest” বইটির পাতায় পাতায়। বাবর আলী এবং সুদীপ্ত দত্ত এর ভাষান্তরিত "ম্যালরি ও এভারেস্ট" উক্ত বইটিরই বাংলা অনুবাদ। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বাঙালি পাঠকদের সামনে পর্বতারোহণ ইতিহাসের রোমহর্ষক এই উপাখ্যানকে মাতৃভাষায় তুলে ধরেছেন এই দুই তরুণ অনুবাদক।
১৯২৪ সাল মানে এভারেস্ট বিজয়ের প্রায় ৩০ বছর আগেই কি ম্যালরি ও আরভিন এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন? ম্যালরির মতো স্বপ্নবাজ ও সাহসী পর্বতারোহী ইতিহাসে খুব কমই আছে। ১৯২৪ এ তৃতীয় এভারেস্ট অভিযানে তিনি নিখোঁজ হন। তার অন্তর্ধানের ব্যাপারটা যে রহস্যের জন্ম দিয়েছিল তা আজও চলছে। তার সহযাত্রী ওডেল শেষবার যখন ম্যালরি ও আরভিনকে দেখেন তখন সামিট থেকে মাত্র পাচশো বা হাজার ফুট নীচে। তবে তখনো তাদের বিভীষিকাময় সেকেন্ড স্টেপ পার হওয়া বাকি ছিলো। ম্যালরি কিংবা আরভিন সেই অভিযান থেকে বেচে ফেরেননি কেউই। আমরা জানতে পারিনা তারা চূড়ায় পৌছার পথেই বিপদের মুখে পড়েন নাকি সামিটের পর নামার সময়ে হারিয়ে যান এভারেস্টের কোলে।
ম্যালরির অদম্য জীবনের গল্পের পাশাপাশি আমরা আরেকটা গল্পের অংশ হয়ে পড়ি। গল্পটা লেখকদ্বয়ের। ম্যালরির অন্তর্ধানের প্রায় ৭৫ বছর পর। ১৯৯৯ সালে এভারেস্ট অভিযানে কনরাড এংকার ও ডেড এর দল ম্যালরির দেহ খুজে পান। বহুবছর পেরিয়ে আবারও উঠে আসে পুরোনো বিতর্ক। আদৌ কি ম্যালরি চূড়ায় পৌঁছেছিলেন? তবে পক্ষে বা বিপক্ষের জোরালো প্রমাণ হতে পারত ম্যালরির সাথে থাকা ক্যামেরাটা। চূড়ায় গেলে সেখানের ছবি অন্তত থাকার কথা। আর তাতে করে সমস্ত বির্তকের অবসানও করা যেত। কিন্তু ম্যালরির দেহের সঙ্গে ক্যামেরা পাওয়া যায়নি। বিতর্কের অবসান ঘটল না। তবে আমরা লেখকদ্বয়ের এভারেস্ট সামিটের গল্প পেয়ে যাই বোনাস হিসেবে।
ম্যালরির জীবনী ঈর্ষা জাগানিয়া। প্রায় এক শতাব্দী আগে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই যেভাবে এগিয়েছেন তা আমাদের মুগ্ধ করে। ইতিহাসের প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ম্যালরিকে দেখতে সেক্ষেত্রে আনন্দিতই হবার কথা।
"Why do you want to climb Mount Everest?" "Because it's there."
পর্বত সুন্দর, একই সাথে রোমাঞ্চকর ও প্রাণ*সং*হারী। পর্বত নিয়ে আমার একটু ভ*য়ই কাজ করে। ম্যালরি বা এভারেস্ট নিয়ে তাই আমার মাথাব্যথা ছিল না, তাও বইটা কিনে নেওয়ার কারণ এক বন্ধুর সাজেশন।
কনরাড এংকার ও ডেভিড রবার্টস এর "The Lost Explorer" বাবর আলী ও সুদীপ্ত দত্তের কলমে প্রতিবর্ণায়ন হয়েছে "ম্যালরি ও এভারেস্ট" নামে। ৭৫ বছরের ব্যবধান হওয়া দুটো ভিন্ন এভারেস্ট অভিযান নিয়ে এই বই। মানুষের এভারেস্ট জয়ের তোড়জোড় শুরু ১৯২১ সালে। সেবার অবশ্য রংবুক গ্ল্যাসিয়ার থেকে আরো উপরে ওঠার সম্ভাব্য রুট খুঁজে পাওয়ার সফলতার সুরে শেষ হয় অভিযান। সেবারই এভারেস্টের সাথে জুড়ে যায় ম্যালরির নাম। ১৯২২ সালে আরো দুইবার এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা চালান ম্যালরি। ওই বছরের ২১ মে নরটন, সামারভেল ও ম্যালরির কল্যানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬০০০ ফুট উচ্চতায় মানুষের পদচিহ্ন পড়ে। এর দুইদিন পর অবশ্য তার দলের জিওফ্রে বুশ ও জন ফিঞ্চ কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্যে উঠেন ২৬৫০০ ফুট। জুন মাসের বর্ষায় আরেকবার সামিট পুশের চেষ্টা করলেও অ্যাভালঞ্চের মুখে সাতজনকে এভারেস্টের কাছে ব*লি দিয়ে শেষ হয় সেই অভিযান।
"মাউন্ট এভারেস্টের পুরো সামিট রিজ আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম-সেই সাথে পর্বতের চূড়াও। চূড়া থেকে খানিকটা নিচে একটা বরফঢাকা ঢাল চোখে পড়ল যেটা পিরামিডের দিকে এগিয়েছে। সেই ঢালের উপরে একটা ছোট্ট বিন্দু যেন পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের পাথুরে ফলকের দিকে। এরপর সেই বিন্দুকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেল আরেকটি বিন্দু।"
৮ই জুন, ১৯২৪ সালে ১২:৫০ নাগাদ ২৬০০০ ফুট উচ্চতা থেকে শেষবার ম্যালরি আর আরভিনকে দেখেছিলেন নোয়েল ওডেল। এরপর তাঁরা হারিয়ে যান চির তুষারের দেশে। আর জন্ম দিয়ে যেন এক অমীমাংসিত রহস্যের-হারিয়ে যাওয়ার আগে কি এভারেস্টের চূড়া ছুঁয়েছিলেন এই জুটি?? ১৯৩৩ সালে চুড়ার ২৫০ গজ নিচে পাওয়া একটি আইস এক্স বা ১৯৭৫ সালে এক এভারেস্ট অভিযানে ওয়াং হংবাও এর দাবী করা পুরানো ইংরেজ ক্লাইম্বারের মৃ*ত*দেহ রহস্যে জ্বালানি দেয় আরো। ১৯৮৬ সালে টম হোলজেল চেষ্টা করেছিলেন এই রহস্যের কিনারা করতে। তবে প্রকৃতি তাতে বাঁধ সাধে। তারপর ইয়োখেন হেমলবের ইচ্ছেতে ১৯৯৯ সালে তৈরি হয় আরেকটি অভিযান দল।
বইটি দুইজনের লেখা, অনুবাদও দুইজনের। কনরাড লিখেছেন উত্তম পুরুষে আর রবার্টসের নাম পুরুষে। দুইজনের লেখনীর পার্থক্য বইয়ে স্পষ্ট। কনরাড যেহেতু নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তাই তার অংশটা বেশ প্রাণবন্ত। ম্যালরির ১৯২৪ এর অভিযানের সময় ছিল না কোন কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা। সেই সামিট টিমের অন্যদের অভিজ্ঞতাকে টুকরো টুকরো ম্যালরির অভিযানকে বর্ণনা করেছেন রবার্টস। তাই, কনরাডের তুলনায় তাঁর লেখা একটু নীরস। এই ধরণের বইয়ে মানচিত্র না থাকাটা একটা ক্রাইম৷ অনুবাদকদ্বয় চাইলেই বইয়ে মাউন্ট এভারেস্টের উত্তরদিকের রুটের একটা মানচিত্র জুড়ে দিতে বইটাকে আরো সহজবোধ্য করতে পারতেন।
কনরাড ১৯৯৯ এ এভারেস্ট সামিট করেন। এভারেস্টের দ্বিতীয় স্টেপ ফ্রি ক্লাইম্বিং এর চেষ্টা করে অনুমান করতে চেয়েছিলেন ম্যালরি-আরভিনের সামিটের সাফল্যের সম্ভাবনা। তারা খুঁজে পেয়েছিলেন ম্যালরির দেহাব*শেষও। দুই সময়ের প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে কনরাড দাবি করেন ম্যালরিদের অভিযান শেষ হয়েছিল ফার্স্ট স্টেপেই। অবশ্য এই ধাঁধার মীমাংসা তাতেও হয় নি। কারণ, অকাট্য প্রমাণ ম্যালরির কোডাকের ভেস্টপকেট ক্যামেরা এখনো চাপা পড়ে আছে এভারেস্টের তুষারের তলে।
(সংযোজন: গতবছর বুটসহ আরভিনের পায়ের একটি অংশ পাওয়া গিয়েছিল)
This entire review has been hidden because of spoilers.