“অনেক, অনেক দিন আগের কথা। প্রায় পাঁচশো বছর হতে চলল বইকী! শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের ভরা জোয়ার। আন্দোলনের ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল গোটা ভারতে। চৈতন্যকে গৌড়িয় বৈষ্ণব সাধকরা অবতার আখ্যা দিলেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অখণ্ড ভারতকে যিনি হরেকৃষ্ণ নামে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, সেই মহামানবের আপাত দৃশ্যমান অবয়বের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল মানুষটি আসলে কে ছিলেন? কী ছিল তাঁর উদ্দেশ্য? শুধুই কি আধ্যাত্মিক মতবাদের প্রচার না, অন্য কোনো উদ্দেশে নদের নিমাই উড়িষ্যায় আশ্রয় নিয়েছিলেন? কেন তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে? অনেকে নিমাইকে হোসেন শাহের চর আখ্যা দিয়েছেন। তিনি কি সত্যিই তাই ছিলেন নাকি গোটা ভারতের হিন্দু রাজাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সন্ন্যাসী নিমাই গৃহত্যাগ করেছিলেন? তারপর পুরীতে দীর্ঘ ২৪ বছর বসবাসের পর হঠাৎ তার অন্তর্ধান। কী হয়েছিল সেদিন পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহে? হত্যা না অন্য কিছু? এসব প্রশ্নের উওর খুঁজে দেখার চেষ্টা এই উপন্যাসে। পাশাপাশি উঠে এসেছে চৈতন্যের বড়োদাদা বিশ্বরূপের অন্তর্ধানের ঘটনা, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস, বৈষ্ণব এবং বৌদ্ধতন্ত্র সহ আরও অনেক কিছু।”
১৯৮২ সালের ৯ এপ্রিল জন্ম। লেখিকা গবেষনাধর্মী লেখা লিখতে ভালোবাসেন। লেখালেখির পাশাপাশি নাট্য পরিচালনা এবং অনু-চলচ্চিত্র তৈরি করেন। লেখিকার নিজস্ব একটি নাটকের দল আছে, যার নাম 'অরাম নাটুয়া'। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন। লেখিকার বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ 'লাল চিনার পাতা', 'সেথায় চরণ পড়ে তোমার', 'বিস্মৃতির দর্পনে বিশ্বরূপ', '১৯৩৭ নানকিং', 'মীরা', '১৯৮৪ সর্দার গদ্দার হে', 'ভাঙা শিকারা', 'ধর্ষণের সেকাল ও একাল'।
বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী মৃত্যুরহস্য কে লিখেছেন জানেন? মহাকাল। আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে, সমুদ্রের তীরে সহসা সকলের দৃষ্টি থেকে দূরে চলে গেছিলেন এক দীর্ঘাঙ্গ গৌরবর্ণ বঙ্গসন্তান। কেউ বলে তিনি নীল সমুদ্রে বিলীন হয়েছিলেন। অনেকে দাবি করেন, জগন্নাথের বিগ্রহে মিশে গেছিলেন তিনি। তবে গত এক শতাব্দী ধরে, মূলত দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর 'বৃহৎ বঙ্গ'-তে আভাস দেওয়ার পর থেকে অনেকেই দাবি করছেন যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুরহস্যের কথা বলছি। পাঁচ শতাব্দী পুরোনো কোল্ড কেস। সাক্ষীরা কেউ নেই। সর্বোপরি অজস্র কায়েমি স্বার্থ এই মৃত্যু বা উধাও হয়ে যাওয়ার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতে তৎপর। এর কোনো সমাধান কি আদৌ সম্ভব এখন? নন-ফিকশনে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য হলেন মালীবুড়ো, প্রয়াত জয়দেব মুখোপাধ্যায়, তুহিন মুখোপাধ্যায় এবং (অতি সম্প্রতি) রজত পাল। ফিকশনে কালকূট, শৈবাল মিত্র, রূপক সাহা— এঁদের রচনা যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে নানা কারণে। আলোচ্য বইটি, অন্তত আমার সীমিত পাঠে, এদের থেকে অনেকটাই আলাদা। কেন? প্রথমত, শ্রীচৈতন্যকে কেন বা কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেই নিয়ে আলোচনা এখানে হয়েছে ঠিকই। তবে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁকে নিয়ে চলে আসা নানা ভ্রান্ত ধারণা নাশের চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, লেখনীর দিক দিয়ে এই রচনা আর পাঁচটা ফিকশনের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। রক্তমাংসের চরিত্রগুলোকে আমি তাদের যাবতীয় শক্তি ও দৌর্বল্য নিয়ে যেন আমার সামনেই চলে-ফিরে বেড়াতে দেখছিলাম। তৃতীয়ত, রাতুলের মতো এক স্বপ্নদর্শী পুরুষের চোখে অতীতের কুয়াশা সরিয়ে অনেক কিছু দেখানো হলেও এই কাহিনিকে সঞ্চালিত করেছে ওমকারি। এমন স্বাধীনচেতা, বিদুষী ও সাহসী নারী সাহিত্যে বিরল। তার হাত ধরেই আমরা দেখেছি অনেক কিছু, অনুভব করেছি তারও বেশি। চতুর্থত, সমসাময়িক রাজনীতির মধ্যে সেদিনের ধর্মদ্বেষকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয়। কিন্তু এই কাহিনিতে সেটিকে অত্যন্ত বাস্তবিক রূপ দেওয়া হয়েছে। তার সূত্র ধরেই স্পষ্ট হয়েছে, কেন এই রহস্যের কিনারা হলে এই মুহূর্তে অনেকের অনেক হিসেব এলোমেলো হয়ে যাবে। পঞ্চমত, বৌদ্ধ তন্ত্র থেকে নবদ্বীপের ইতিহাস— কোনোটাই আলোচনা থেকে দূরে রাখেননি লেখিকা। কিন্তু তাঁর গবেষণা গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহকে রুদ্ধ হতে দেয়নি কোথাও। তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আপনি একমত নাই হতে পারেন। তবে তাঁর সঙ্গে প্রায় হাজার বছরের এক সাধনপথ পরিক্রমায় বেরোলে আপনার পদস্থলন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই পাঁচটি কারণের জোরে বইটি স্বচ্ছন্দে পাঁচ তারা-র গৌরবে ঝলমলাতে পারত। সমস্যা ঘটিয়েছে এর বানান ও মুদ্রণপ্রমাদ, যার জন্য একটি তারা ঝরে গেল। এত ভালো বইয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমনভাবে এই প্রমাদগুলো ঘটেছে যা রীতিমতো রসহানিকর বলে মনে হয়েছে। লেখক আগামী সংস্করণে এই প্রমাদগুলো দূর করে বইটিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তুলবেন— এই আশা রাখি। ইতিমধ্যে বইটির নাগাল পেলে অবশ্যই পড়ুন। এই বিষয় নিয়ে আমার পড়া সেরা ফিকশন এটিই।