গল্পটি অর্চনার। যার উঠোনে রোজ বেড়ে ওঠে সন্ধ্যা মালতি। আলস্যে প্রেম পোহায় সকালের রোদ। গল্পটি বোহেমিয়ান মিঠুর। কিংবা একজন বেশ্যা কন্যার। গল্পটি লেখাহীন এক লেখকের দীর্ঘ দিবস ও রজনীর দিনলিপি। গল্পটি এক ব্যর্থ পিতার, এক অভিমানী স্ত্রীর। গল্পটি মনোয়ার হোসেন নামে এক সাতাশ বছরের যুবকের। সেই মনোয়ার হোসেন- যার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। যে খুব চেনা, সাধারণ। সহজেই ভীড়ে মিশে যায়। ঢাকার প্রতিটি মহল্লায়, প্রতিটি গলিতে অবিকল তার মতো অসংখ্য মনোয়ার হোসেন বাস করে। শহরের যান্ত্রিক ও মুখোশপরা মানুষের ভীড়ে যারা রোজ ঠোকর খায়। গল্পটি কিছু গল্পহীন মানুষের। গল্পটি এই শহরের, এই চেনা চলমান ঢাকার। গল্পটি নাগরিক জীবনের। মুখোশ ও মুখোশবিহীন জীবনের। যেই জীবনের আনন্দ ও বেদনা রেললাইনের দুটো সমান্তরাল পাতের মতো চলে। গল্পটি জীবনের সরল অংকে বড্ড অমিলে ভরা সমীকরণের। দিনশেষে গল্পটি আমার। হয়তোবা গল্পটি আপনারও।
বইটা কাহিনী শুরুদিকে অনেক সুন্দর ভাবে আগাছিলো কিন্তু ধিরে ধিরে ঝুলে গেলো। কোন "কিক" নাকি গল্পে। কেনো কি হচ্ছে যার কোন অর্থ নাই। একখানে লেখাক বলেছে কোটা আন্দোলনের কথা আবার বলছে বেন্সন সিগারেটের দাম ১২ টাকা। এই সব টাইম ফ্রেমের অনেক ঝেমাল আছে।
সমীকরণে আছে কতগুলো মানুষের জীবনের নিত্যদিনের গল্প। প্রকৃতি মানুষকে বহুরকম বানিয়েছে। কেউ সাদামাটা,কেউ জটিল কেউ বা আবার খোলা বইয়ের মতো। তাই কেউ না খেয়ে মরে, কেউ বিলাসিতা করে।
গল্পটা হয়তো কোনো এক বেকার যুবকের। যে কি না শত চেষ্টা করেও চাকরির ব্যবস্থা করতে পারছে না। হয়তো কোনো এক জনপ্রিয় লেখকের।যার লেখা শুরু করা মানেই মাথার মধ্যে কতশত প্লট মৌমাছির মতো ভনভন করা। কিন্তু কোনো একটা সময় এসে হারিয়ে যাওয়া। হয়তো বা কোনো এক নারীর উঠোনে বোহেমিয়ান মানুষের জন্য অভিমানের আড়ালে ভালোবাসা তুলে রাখা।
আরও আছে রোজকার হিসেব করে চলার গল্প। ষাট টাকার ডাবে তৃষ্ণা মেটানোর আগে মানিব্যাগের কথা চিন্তা করতে হয়, পরেরবেলা বাকি টাকায় খাবার জুটবে তো? অথবা রাস্তার পাশের ড্রেনের পঁচা দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে চল্লিশ টাকায় এক টুকরা মাংসের মিশ্রনের তেহারী খাওয়া।
প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে বদলায় কিন্তু এসকল মানুষের অসহায়ত্ব যেনো বদলাতেই চায় না। মানুষ ঠিক তখন ই অসহায় হয়ে পড়ে যখন তার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। অসহায়ত্ব একদিন ঘুচে যাবে এই আশায় ছোট্ট চিলেকোঠায় কীটদের সাথে বসবাস করতে হয় দিনের পর দিন। বিয়ের পর প্রিয় বোনের দূর দূরের মানুষের মতো আচরন করা। কিংবা আছে কোনো এক মেয়ে যার কাছে তার বাবাই জ্ঞানী । বাবার সবকিছুই পছন্দের। তাই বাবার শখ করে সাপ পোষাটাও তার ভালোলাগে।
এছাড়া সমীকরণে আছে ২০১৮সালের কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা একত্রে করে একসূঁতোয় নিয়ে আসা।আছে রাজনীতি, আছে আন্দোলন অথবা ধর্ষনের গল্প।
পরীশেষে সমীকরনের মিল হয়েও যেনো চিরচেনা প্রকৃতির দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বাঁধা চলে আসে। যাইহোক শেষ ভালো যার সব ভালো তার। লেখার মাধুর্য ভালো ছিলো প্রথম বই হিসেবে।
প্রিয় উক্তি: অনেকগুলাই আছে তবে এতগুলো বলতে পারবো না। অল্প কয়েকটা বলি-
১.যে কেয়ারফুলি কেয়ারলেস। যে ভুলগুলো ঠিকঠাক নির্ভূল করে। একবার নয় বারবার করে। এইসব মানুষের অপেক্ষায় থাকতে নেই। এরা কখনও কারও হয় না।
২.একজন লেখকের তখনই মৃত্যু হয় যখন শব্দরা তাকে ছেড়ে চলে যায়।
৩. অপমান একটা সময় ঠিকই গিলে ফেলা যায় কিন্তু অবহেলা গেলা যায় না,গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে থাকে।
৪.আমাদের যার প্রতি যতবেশি অভিমান থাকে,আমরা তাকে ততবেশি ভালোবাসতে পারি। যেদিন অভিমান ফিকে হয়ে আসে সেদিন ভালোবাসাও উবে যায়। উল্টো ইগো সম্পর্কগুলো নষ্ট করে।
৫. দুনিয়ায় অধিকাংশ নারীর একমাত্র অপরাধ, প্রকৃতি তাদের দেহে যোনী এবং স্তন নামক দুটি অঙ্গ দিয়েছে।
বই পরিচিতি- বই: সমীকরণ লেখক: তরীকূল মামুন তরী প্রকাশনী: চন্দ্রবিন্দু
জীবনের গল্পে আমাদের নাগরিক আবেগ এর কথা লেখা আছে এখানে। মানুষ একেকভাবে জীবনের গল্প লেখে। সুন্দর ও ব্যার্থ মানুষ সমীকরণ মেলাতে চায় সবকিছুর। থেমে থাকে না সব।
উপন্যাস এর মূল সফলতা সময়, জীবন আর নাগরিক আবেগকে মূল্য দেওয়া। প্রচন্ড সমসাময়িক আবেগ এর উপর মিঠু, অর্চনা, মনোয়ার এর দাড়িয়ে থাকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
কবির আর মিতুর সম্পর্ক ও তাদের আনুষাঙ্গিক মনস্তাত্ত্বিক জীবন বিশেষ মনযোগ এর দাবি রাখে।
ব্যর্থতা বা খারাপ লাগা আছে। কবির কীভাবে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছেন লেখক হিসেবে তার গল্প লিখতে পারলে উপন্যাস পূর্ণতা পেতো। এই সমীকরণ দেখাতে পারলে লেখক হিসেবে তরীকুল মামুন তরী নিজের প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করে দিতে পারতেন। উপন্যাস শেষ এর দিকে ঝুকে থাকে। খুব। লেখক নিজে হস্তক্ষেপ করেন কিছু অধ্যায়ে এটা এড়িয়ে গেলে ভালো লাগতো।