বইঃ ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস লেখকঃ মহাদেব সাহা . "লেনিন, এই নাম উচ্চারিত হলে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে প্রাণ; দেখি ভলগা থেকে নেমে আসে মানবিক উৎসধারা আমাদের বঙ্গোপসাগরে, আমাদের পদ্মা-মেঘনা ছেয়ে যায় প্রাণের বন্যায়; লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি গোলাপ, লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণমুক্ত একঝাঁক পাখি, লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি সমাজ।" . কতো সহজ ভাবে কবিতাগুলো লেখা হলো, যে কোনো মানুষই সহজেই পাঠোদ্ধার করতে পারবে কবিতাগুলো। পাঠোদ্ধারের মাধ্যমেই পাঠকেরা বুঝতে পারবে লেখকের বার্তা একদম পরিষ্কার, আর তা হলো বিশ্বশান্তি। আমাদের বর্তমান বিশ্বে দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে যুদ্ধ লেগেই আছে। আমাদের মানব ইতিহাস জুড়েও শুধু যুদ্ধ আর খুনের ইতিহাসই পাওয়া যায়। বইটির প্রতিটা কবিতাতেই লেখক যে যুদ্ধের তীব্র বিরোধী তা বুঝতে পারা যায়৷ মূলত কবিতাগুলো যুদ্ধ বিরোধী, মানবতাবাদী, সমাজতান্ত্রিক, শান্তিকামী এবং অস্ত্রের ঘোর বিরোধী। আমরা লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে কেনো মারণাস্ত্র কিনছি? কেনো আমরা সেই অর্থ দিয়ে অনাহারে থাকা মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করছিনা? দেশে দেশে যে যুদ্ধ তা তো মানুষে-মানুষ যুদ্ধ, কেনো সভ্যতার এই সময়ে এসেও যুদ্ধে আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি? কেনো অযথাই নিরপরাধ মানুষগুলো নিজের জীবন হারাচ্ছে? কেনো মা সন্তানের জন্য, স্ত্রী স্বামীর জন্য, বোন ভাইয়ের জন্য চোখের অশ্রু ফেলছে! যুদ্ধ কি একান্তই প্রয়োজন? সকল কিছু কি অস্ত্রের মুখেই সমাধান করতে হয়? ফুল দিয়েও তো মীমাংসা করা যায়, মানুষে মানুষে তো ভালোবাসাও সম্ভব।
"...যখন মানুষের শুদ্ধতার কথা ভাবি দেখি দাঁড়িয়ে আছেন/ ব্যথিত বোদলেয়ার/ শহরের রাত্রির দিকে তাকালে মনে হয় জীবনানন্দ দাশ দেখছেন/ লিবিয়ার জঙ্গল,/ যখন একজন বিপ্লবীর দিকে তাকাই দেখি দুচোখে/ মায়াকোভস্কির স্বপ্ন/ আর্ত স্বদেশের দিকে তাকিয়ে আমিও নেরুদার কথাই ভাবি,/ কেউ জানে না একটি ফুলের মৃত্যু দেখে, একটি পাখির ক্রন্দন দেখে/ আমারও হৃদয় পৃথিবীর আহত কবিদের মতোই হাহাকার/ করে ওঠে..."
মহাদেব সাহার কবিতা গাঁয়ের শাপলা ঝিলের মতো। তার পানিতে ডুব দিয়ে এক নিঃশ্বাসে তল থেকে মাটি তুলে আনা যায়। অর্থাৎ বড়াই করার মতো গভীরতা তার নয়। অথচ তার টলটলে পানি শাপলার অপরূপকে ধারণ করে, কিনারের জলে উপবনের ছায়া পড়ে, মেঘের বিম্বের নিচে রঙিন মাছের ঝাঁক সাঁতরায়, রাতের জোছনায় দুধসাদা পরিযায়ী পাখি এসে ঝাঁকে ঝাঁকে নামে, ভোরে আর সন্ধ্যায় রূপনিয়সী প্রেমিকের চোখে সে রূপন্তী প্রেমিকা। মহাদেব সাহার কবিতা আমার ভালো লাগে। ভালো লেগেছে এই বইয়ের বেশ অনেকগুলো লাইন।
"এই কবিতাটি ছিলো যে নিঝুম ঘুমের পুরীতে অলস নিদ্রা/ ছিলো কারো চোখে সুদূর স্বপ্ন রোমাঞ্চকর গাঢ় শিহরন,/ দূর নীলিমায় এই কবিতাটি ছিলো ভাসমান উদাসীন মেঘ/ স্বর্ণচাঁপার বুকে থরো থরো হয়তোবা কোনো শুভ্র শিশির;/ এই কবিতাটি ছিলো পাহাড়ের মৌনতাভরা গূঢ় উদ্ধৃতি/ ছিলো গোলাপের হার্দ্য আলাপ অনুভূতিময় পাখিদের শিস/ আকাশের ছিলো মন্ময় ভাষা এই কবিতাটি নদীর ভাষ্য,/ এই কবিতাটি ছিলো কোনো এক শিশুর হুদয়ে মৃদু স্পন্দন/ মধ্যরাতের ঘুমহীন চোখে এই কবিতাটি জেগে ছিলো একা..."