অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত চিত্রশিল্পী হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়।
"অবনীন্দ্র-প্রতিভার মহিমাময় বিকাশ চিত্রশিল্পে সে-কথা সত্য; কিন্তু লেখনীর ব্যবহারে সে-প্রতিভা হৃতমান হয়নি।"
-'লেখক অবনীন্দ্রনাথ'
~অমলেন্দু বসু
বাংলা শিশুসাহিত্যের তিনি অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উৎসাহেই তিনি ছোটদের জন্য লেখা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছিলেন, "তুমি লেখ না, যেমন করে তুমি মুখে মুখে গল্প কর, তেমনি করেই লেখ।"
আর সত্যিই তিনি তেমনি করেই লিখেছিলেন। খুব সহজ করে তিনি গল্প লিখতেন। না, না, শিক্ষাদানের জন্য লেখা গল্প নয়। আনন্দদানের জন্য লেখা গল্প! তার মতে শিশু সাহিত্যের দায়িত্ব আনন্দদান। তার বক্তব্য:
"এ-কালে যেন শখ নেই, শখ বলে কোনও পদার্থই নেই। এ-কালে সবকিছুকেই বলে "শিক্ষা"। সব জিনিসের সঙ্গে শিক্ষা জুড়ে দিয়েছে। ছেলেদের জন্য গল্প লিখবে তাতেও থাকবে শিক্ষার গন্ধ…এখন কেউ গল্প বলে না, বলতেই জানে না।"
এই বই লেখার প্রেরণা তিনি নিয়েছেন সুইডিশ লেখিকা সেল্মা লাগেরলফের Adventure of Nils থেকে। অনেকেই বলেন তিনি বইয়ের কাহিনী সূত্র যথাযথভাবে উল্লেখ করেননি। কিন্তু প্রকাশকের নিবেদন অংশে মূল বইয়ের প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছিল।
বইয়ের মূল চরিত্র রিদয়। নামে যদিও হৃদয়, কিন্তু দয়ামায়া বলতে তার কিছু ছিল না। মানুষ থেকে শুরু করে জীবজন্তু, সবাইকে এমন জ্বালাতন করেছিল যে কেউ তাকে দু চোখে দেখতে পারত না। বয়স বারো বছর। কিন্তু না শিখল লেখাপড়া, না শিখল চাষবাস। শেষে তার বাবা-মা বাইরে যাবার সময�� তাকে তালাবদ্ধ করে রাখত। এমনি একদিন তালাবদ্ধ হয়ে ছিল সে। হঠাৎ দেখল কুলুঙ্গিতে থাকা গণেশ ঠাকুরের মূর্তি জ্যান্ত হয়ে উঠল। রিদয় কখনো জ্যান্ত গণেশ দেখেনি। আজ দেখে তার কি যে মতিভ্রম হলো, বুড়ো আঙুলের সমান গণেশকে সে বন্দি করতে চাইল চিংড়ির জালে!
তার এহেন কীর্তিতে রিদয় হয়ে গেল বুড়ো আংলা যক! এরপর শাপ থেকে মুক্তি পেতে রিদয় সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের পিঠে চড়ে চলল গণেশের খোঁজে কৈলাস। পথে তারা মিলল বালিহাঁসের দলের সাথে।
সেই হাঁসের দল কিন্তু যে সে হাঁসের দল নয়। এ দলের সর্দার চকা নিকোবর, যার ডানহাত পাপড়া নানকৌড়ি, বাঁহাত নেড়োল-কাটচাল। আর আছে লালসেরা আন্ডামানি, চোক-ধলা ডানকানি!
নামগুলো কি সুন্দর, না? আর এবইয়ে যে শুধু হাঁসের কথা বলা হয়েছে তা নয়। আরো নানা পশুপাখির কথা এসেছে এ বইয়ে। ইঁদুর, চিংড়ি, পাঁঠা, বোলতা, কুবোপাখি, গোখরো সাপ, কাদাখোঁচা, সজারু, গঙ্গাফড়িং, শালিক, শেয়াল, পেঁচা, কাক, ভাল্লুক, কাঠবেড়ালি, শকুন, খাটাশসহ চেনা-অচেনা কত কত প্রাণি।
তবে এই যে এতো এতো প্রাণি তার বেশিরভাগই তো আজকাল দেখাই যায় না। এর দায় তো আমাদেরই। সে বিষয়েও খানিকটা কথা আছে।
আর স্থানের বর্ণনাগুলোও দারুণ।
"হলদে ছকগুলো সরষে ক্ষেত – সোনার ফুলে ভরে গিয়েছে! মেটে ছকগুলো খালি জমি — এখনও সেখানে ফসল গজায়নি। রাঙা ছকগুলো শোন আর পার্ট। সবুজ পাড় দেওয়া মেটে-মেটে ছকগুলো খালি জমির ধারে-ধারে গাছের সার। মাঝে মাঝে বড়-বড় সবুজ দাগগুলো সব বন। কোথাও সোনালি, কোথাও লাল, কোথাও ফিকে নীলের ধারে ঘন সবুজ ছককাটা ডোরা-টানা জায়গাগুলো নদীর ধারে গ্রামগুলি - ঘর-ঘর পাড়া-পাড়া ভাগ করা রয়েছে। কতগুলো ছকের মাঝে ঘন সবুজ, ধারে ধারে খয়েরি রঙ - সেগুলো হচ্ছে আম-কাঁঠালের বাগান - মাটির পাঁচিল ঘেরা। নদী, নালা, খালগুলো রিদয় দেখলে যেন রুপোলি ডোরা নক্সা - আলোতে ঝিকঝিক করছে। নতুন ফল, নতুন পাতা যেন সবুজ মখমলের উপরে এখানে-ওখানে কারচোপের কাজ! – যতদূর চোখ চলে এমনি! আকাশ থেকে মাটি যেন শতরঞ্জি হয়ে গেছে..."
আকাশ থেকে শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের কি দারুণ বর্ণনা! পড়তে পড়তে মনে হয় আমিও যেন ওদেরই সঙ্গে সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের পিঠে চড়ে তাদের সাথে চলেছি মানস সরোবর।বর্ণনা তো নয়, এ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা নিখুত ছবি। অবশ্য অবন ঠাকুর তো শিল্পীই ছিলেন। অনেকে তো পুরো বইটাকেই রংতুলি দিয়ে আঁকা একখানা ছবির সাথে তুলনা করেন।
যদিও এটা ছোটদের জন্য লেখা, তবুও এ বইয়ে ভাববার, চিন্তা করবার অনেক রসদই আছে। ছোটদের জন্য লেখা বই হলেও এতে হেলাফেলার ভাব নেই মোটেও।
"চোখ দিয়ে দেখাই হল আসল দেখা, ঠিক দেখা, আর চোখ বুজে ধ্যান করে দেখবার মানে খেয়াল দেখা বা স্বপন দেখা। খেয়ালিদের বিশ্বাস কোরো না, তা তাঁরা ঋষিই হন, কবিই হন, যা দুই চোখে দেখছি তাই সত্যি, তা ছাড়া সব মিছা, সব কল্পনা, গল্পকথা, খেয়াল!"
রামছাগলের এ কথায় সুবচনীর খোঁড়া-হাঁস বলল,
"চোখে না দেখলে কোনও জিনিসে বিশ্বাস করা শক্ত। কিন্তু এই পাহাড় পর্বত কুয়াশায় যখন দেখা যায় না, তখন কি বলতে হবে কুয়াশার মধ্যে কিছু নেই? না বলতে হবে, সূর্য চন্দ্র আকাশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ঠিক জিনিস সব সময়ে চোখে পড়ে না, সেইজন্য এই দুই চোখের উপরে নির্ভর করে থাকি বলে আমরা কোনওদিন মানুষের সমান হতে পারব না। মানুষের মধ্যে যাঁরা ঋষি, যাঁরা কবি, তাঁরা শুধু দুই চোখে দেখলেন না, তাঁরা ধ্যানের চোখে যা দেখতে পেয়েছেন সেগুলো ধ্যান করে কেতাবে লিখেছেন..."
তিনি যদিও আনন্দদানের জন্য লিখেছেন, তবুও এ কথাগুলোয় কি শেখার বা ভাবার কিছুই নেই?
সে শিক্ষা থাকুক আর না থাকুক এ বইয়ে আনন্দ কিন্তু ষোলো আনাই আছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটা যেন আগাগোড়াই আনন্দ দিয়ে মোড়া। বইটায় অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব আছে, আবার খানিকটা ফ্যান্টাসিরও ছোঁয়া আছে। শিশুকিশোর পাঠকদের জন্য দারুণ একটা বই।
রেটিং: ৪.৭/৫ (শেষটা এমন কেন?)