শত বছর ধরে দেওয়াল ঘেরা অঞ্চলে বন্দী একটি জনপদ। কী আছে? কী হচ্ছে ঐ দেওয়ালের ওপারে? পুরোহিতবৃন্দ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কেউ যেনও কিছুতেই দেওয়াল পার হয়ে যেতে না পারে। এই দেওয়াল-ঈশ্বরের কৃপাতেই যে তারা বেঁচে আছে! এক বিক্ষুব্ধ তরুণ বারবার চেষ্টা চালায় দেওয়াল টপকে যেতে। তার যে জানতেই হবে কী আছে দেওয়ালের ওপারে!
পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন কী আসলেই তৈরি করা সম্ভব? এমনই কিছু একটা বানিয়ে বসেছেন একজন বিজ্ঞানী। তবে কি পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনের মাধ্যমেই মানব সভ্যতা প্রবেশ করলো “টাইপ-টু” সিভিলাইজেশনের? না কী মুখ থুবড়ে পড়বে সভ্যতার অগ্রগতি? প্যানহাল কোহেনের আতংক কি তবে সত্যিই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে?
টু টুদ্যা পাওয়ার ফিফটিন বিটের কোড উদ্ধারের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। মহাবিশ্বের প্রতিটি ইলেকট্রনকে কম্পিউটারে রূপান্তরিত করলেও কেটে যাবে অযুত-নিযুত বছর। তাহলে কী এখানেই রচিত হচ্ছে সভ্যতার কবর? অন্তিম সময়ে এতো কম লোক নিয়ে বিশাল আকারের ইঞ্জিন কী করে বানিয়েছে তারা? এর পেছনে কী উদ্দেশ ছিলো তাদের?
ত্রিশ কোটি অশিক্ষিত-মূর্খ-অনগ্রসর মানুষকে নির্মূল করে ফিরে আসতে আসতে চাইছে আধুনিক ত্রিশ কোটি মানুষ। এটাও কী সম্ভব? ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকরতম গণহত্যার হাত থেকে কি মুক্তির কোনও উপায় নেই? কে হবে শেষ-অংকের বিজয়ী? ... …
মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম এর জন্ম ১৯৮১ সালে নরসিংদী জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশে-বিদেশে। একজন সফল উদ্যোক্তা ও স্বপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সিইও হিসেবে বর্তমানে প্রবাসজীবন যাপন করছেন লিবিয়াতে। শিক্ষাজীবনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে ২০০৩ সালে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক। লিখছেন দীর্ঘদিন থেকে। 'শান্তির দেবদূত' ছদ্মনামে সামহোয়ারইনব্লগে সায়েন্স ফিকশন লিখে যথেষ্ট জনপ্রিয়। অনলাইন জগতে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দুই ডজন বিপুল পঠিত ও আলোচিত সায়েন্স ফিকশন গল্প-উপন্যাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার। লেখকের প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল যথেষ্ঠ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘ও-টু’ লেখকের দ্বিতীয় সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস। বিজ্ঞান, মানবতা, প্রেম আর প্রখর রসবোধের মিশেলে অনবদ্য লেখনিবৈশিষ্ট্য লেখককে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তার লেখাগুলো সুখপাঠ্য ও চুম্বকধর্মী। লেখকের সায়েন্স ফিকশনগুলো বিজ্ঞানের নীরস কচকচানি নয়, বরং জীবনের প্রেম-কাম ও হাসি-কান্নার রসে সিক্ত। -- By Tasruzaman Babu
৩.৫/৫ মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের লেখার প্রতি এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছে।গত কয়েক বছরে "লোলার জগৎ" বা "ও টু"র মতো ভালোমানের সাইফাই খুব কমই পড়েছি। এজন্য "পার্পেচুয়াল আতঙ্ক" বের হওয়ার সাথে সাথেই পড়ে ফেলেছি। এবারের প্লটও কৌতূহলোদ্দীপক এবং পুরোটা সময় লেখক টানটান উত্তেজনা ধরে রাখতে পেরেছেন।শেষদিকে গল্প এগিয়েছে ঝড়ের গতিতে।আরেকটু ধীরেসুস্থে গল্প এগোলে বেশি আনন্দ পেতাম।তারপরও লেখকের কল্পনাশক্তি, মৌলিকত্ব, জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপনে পারদর্শিতা ও নিজের লেখার প্রতি আত্মবিশ্বাসের কারণে বইটি সুখপাঠ্য এবং পাঠকের মনোযোগ দাবী করে। যারা বাংলাভাষায় মৌলিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনি খুঁজছেন, তারা নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন।
লেখকের বড্ড প্রেমে পড়ে গেলাম আবার। আবার কেন? কারণ ঐ যে 'লোলার জগৎ' । লোলার জগৎ পড়ার পর এবছর বই কেনার তালিকায় সবার আগে স্থান পেয়েছিল এই 'পার্পেচুয়াল আতঙ্ক' । প্রচুর কল্পবিজ্ঞান পড়া হলেও অভিনব প্লট খুব কমই থাকে তার মধ্যে। কিন্তু সাইফূল ইসলাম ভাই, রীতিমত কাপিয়ে দিয়েছেন তার এই অভিনব, মৌলিক মনোমুগ্ধকর প্লট নির্মাণ করে। অভিনব হলেও মজার ব্যপার তিনি কিন্তু প্রচলিত বিজ্ঞানের ব্যাত্বয় ঘটাননি এখানে। আর বিজ্ঞানটাকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন এটা ডালভাত। বিজ্ঞান না জানলেও তরতরিয়ে পড়ে ফেলতে পারবেন আপনি।
এবার আসি গল্প নিয়ে। বইটিতে গল্পের দুটো টাইমলাইন আছে। যেটা এক পরিচ্ছেদ পরপর সমান তালে এগিয়ে গেছে। চলুন সেই দুটো টাইমলাইনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
আকাশছোঁয়া এক দেয়ালের ভেতর শত শত বছর ধরে বন্দী হয়ে আছে একটি জনপদ। এই দেয়ালটিকে তারা মনে করে তাদের ঈশ্বর। তারা মনে করে এই দেওয়ালের অপর পাশে আছে দৈত্য, দানো। তারা বিশ্বাস করে এই দেওয়াল-ঈশ্বর তাদেরকে নিরাপদ রাখে এবং রাখছে। তাই দেওয়ালকে রীতিমত পুজো করে তারা। দেওয়ালের ওপাশে যাওয়ার চিন্তা মানেই ঈশ্বরের বিরোধীতা করা, শয়তানকেই অনুসরণ করা। পুরোহিতরাও তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রটেক্ট করে যাতে এই জনগোষ্ঠীর কেউ ওই দেওয়াল পার হয়ে যেতে না পারে। কিন্তু এক তরুণ ছেলে 'রুমি', সে পুরোহিতদের এসব গালগপ্প একদম বিশ্বাস করে না। সে জানতে চায় দেওয়ালের ওপাশে কি আছে! সে মনে করে তাদেরকে একটা দেওয়ালের ভেতর বন্দী করে রাখা হয়েছে। এবং এটা নিশ্চয়ই কারো একজনের পূর্বপরিকল্পিত।
অপর টাইমলাইনে পাবেন আমাদের মহান বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেন কে। তিনি তার যুগের চেয়েও এগিয়ে থাকা জ্ঞান আর বিজ্ঞানশক্তি দিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন আজীবনের আকাঙ্ক্ষিত 'পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন'। যা দিয়ে আমরা পেতে পারি জ্বালানিবিহীন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ শক্তি। যার মাধ্যমে নিমেষেই সমাধান হয়ে যায় সভ্যতার জটিল সব সমস্যার। পরিবেশ দূষণ থাকবে না, দৈহিক পরিশ্রম কমে আসবে অনেকাংশে, অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না ফলে মানুষ সৃজনশীল সব কাজে মনোনিবেশ করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকেই যায় সবার মনে। তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রানুসারে শক্তির বিনাস কিংবা সৃষ্টি নেই, শক্তি কেবল একরূপ থেকে আরেক রূপ ধারণ করে মাত্র। তাহলে কিভাবে তিনি এটি সম্ভব করলেন? অথচ তিনি কিন্তু থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রের ব্যত্যয় না ঘটিয়েই সভ্যতার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করে ফেলেছেন। এবং তৈরির কৌশল রেখেছেন সবার অগোচরে। কিন্তু তিনি এর সাইড এফেক্ট সম্পর্কেও অবগত ছিলেন।
তার মতে ঠিক চার পাচশ বছর পর এই ইঞ্জিনগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে। নাহলে পৃথিবী পতিত হবে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে। আর এই ইঞ্জিনগুলো ধ্বংস করার সম্পূর্ণ নীল নকশাও তিনি তৈরি করেন। কেননা সাধারণ কোন কৌশলে এটা ধ্বংস করা যাবে না। ধ্বংস করলে চেইন রিয়াকশনের মাধ্যমে পৃথিবী সেই ধ্বংসের মূখেই পতিত হবে। আর এজন্য ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ তিনজন ব্যক্তির জন্যও তিনটা গোপন বার্তাও রেখে যান।
এটা মাত্র গল্পের শুরু। এরপর একদিকে চলতে থাকে ডানপিটে বিজ্ঞানমনষ্ক রুমির গোপন পরিকল্পনা, কিভাবে দেওয়াল টপকানো যায়। অপরদিকে দেখতে পাওয়া যায় পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনের সুফল ও কুফল দিকগুলো। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে একের পর এক রহস্য। আসতে থাকে নতুন নতুন সব চরিত্র। বিশেষ করে শ্যাপা আর বহ্নি দুই বিপরীত মেরুর দুইজন চরিত্রকেও ভালোবেসে ফেলতে পারেন।
সব মিলিয়ে আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে বইটা। বই সম্পর্কে আরো গভীরে যাওয়া মানেই স্পয়লার দেওয়া। সেটা আমার একদম পছন্দ না।
এখন প্রশ্ন বইটির কমতি কি ছিল? আমার কাছে সেটার পরিমাণ খুব কম। শেষ অংশটা রোলারকোস্টারের মতো মারাত্মক দ্রুত এগিয়েছে। আরেকটু রহে সহে হলে বেশি উপভোগ্য হতো। এই তাড়াহুড়োইটুকুই যা কমতি। টাইমলাইনের সময়কালটা উল্লেখ করলে পাঠকদের একটু বুঝতে সুবিধা হতো। তবে আমার কাছে এটা খানিকটা টুইস্টের মতোই লেগেছে। আর দু একটা বানান ভুল আমি কখনোই ধর্তব্যের মধ্যেই নি না। কেননা ওটা সম্পাদনার অংশ। গল্পে এফেক্ট পড়ে না।
বই: পার্পেচুয়াল আতঙ্ক লেখক: মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম প্রকাশনি: বাতিঘর জনরা: সায়েন্স ফিকশন
পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনের সাথে পরিচিত ছিলাম না। তবে থিমটার সাথে পরিচিত ছিলাম: কোনো যন্ত্র থেকে বিরামহীন ভাবে শক্তির সরবরাহ পাওয়া। শক্তি সাধারণত সৃষ্টি করা যায় না, রুপান্তর করা যায়। যেমন রাসায়নিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ শক্তি। তবে পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন হলো সেরকম একটা ইঞ্জিন যেটা থেকে অবিরাম শক্তি পাওয়া যায়।
কীভাবে সম্ভব? বিষয়টা বাস্তবে ঘটিয়ে দেখিয়েছেন সাইফূল ইসলাম ভাই। সেটা জানার জন্য বইটা পড়তে হবে।
একাডেমিক ফিজিক্স পড়ি না আজ তিন বছর হয়ে গেলো। বিজ্ঞান বই পড়ি না দেড় দুই বছর থেকে। তবে পার্পেচুয়াল আতঙ্কের সায়েন্টিফিক বিষয়গুলো বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি। মোটামুটি সহজবোধ্য ভাষাতেই লিখেন সাইফূল ভাই।
বইটা কোনো অংশে থ্রিলারের থেকে কম নয়। এখানে থ্রিলা আছে, ভালোবাসা আছে, মানবীয় সম্পর্কের টানপোড়েন আছে, বিজ্ঞান তো আছেই।
সায়েন্স ফিকশন খুব একটা পড়িনি। তবে বইয়ের গ্রুপগুলোতে থাকার সুবাদে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সাইফূল ভাই ইউনিক থিম নিয়ে লেখেন।
পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন সময়ের সবথেকে নামী বিজ্ঞানী। অচিরেই বুঝতে পারেন পৃথিবীর বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে ফেলবে এই ইঞ্জিন। কারণ এ থেকে পাওয়া যাবে অবিরাম বিদ্যুৎ শক্তি। থেমে যাবে। দেশে দেশে বিদ্যমান শত্রুতা।
কিন্তু বিজ্ঞানী এটাও জানেন, পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন বয়ে আনবে ধ্বংস। নিকট অতীতে না হোক, আগামী কয়েকশ বছরে এটি ধবংস করে দেবে মানব সভ্যতা।
কী করে ধবংস করবে সেটা জানতে হলে পড়তে হবে বইটি। এছাড়াও পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন কী করে কাজ করে সেটা জানতেও বইটি পড়তে হবে।
এই পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনকে ঘিরে তৈরি হয় ষড়যন্ত্র। ত্রিশ কোটি মানুষকে মুছে ফেলে ফিরে আসতে চায় আরও ত্রিশ কোটি মানুষ।
উপন্যাসের শেষের ঘট���া এটি। এই জায়গাটা মোটামুটি দুর্বোধ্য লেগেছে আমার কাছে।
তা বাদে বাদবাকি সবকিছুই টপনচ। সাইফূল ভাইয়ের আরও একটা বই লোলার জগৎও ফার্স্ট ক্লাস সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার। বই দুটি পড়ার রিকমেন্ডেশন থাকলো।
এই বইটার একটা সমস্যা আছে! এইবইটা জোস হলেও সবাই এটা ধরতে পারবে না। এই বইটার চিপা গলি গুলো বুঝতে হলে এটলিস্ট আপনার ইন্টারের ফিজিক্সের কন্সেপ্টগুলো ক্লিয়ার থাকতে হবে। না থাকলে মনে হবে যা মনে চায় তাই বলতেছে রাইটার। যুক্তিগুলো ধরতে পারবে না অনেকেই।
শেষ লোলার জগৎ পড়েছিলাম এই রাইটারের। জোস লেগেছিলো। এই বইটার কন্সেপ্ট অনেক মৌলিক। এইবার এইটাও জোস লাগলো।
এবারে লেখকের ফ্যান হয়ে গেছি। অবশ্য আগেই হয়েছিলাম। দুটো টাইমলাইনে এগিয়েছে গল্পটা। একটা অংশ অতীত, আরেকটা ভবিষ্যত। প্রথমদিকে অতীতের পার্টটা ভালো লেগেছে বেশি, আর ভবিষ্যৎতের অংশটা খানিকটা কিশোর উপন্যাসের মতন লেগেছে। পরে যখন দুটো টাইমলাইন একত্র হয়ে গেলো তখন ঝড়ের গতিতে এগিয়েছে গল্প, যদিও এত দ্রুত গল্পকথনের ফলে ওয়ার্ল্ডবিল্ডিংয়ের অনেক অংশ বাদ পড়ে গিয়েছে। লেখক অংশটায় আরেকটু সময় দিলে বোধ হয় ভালো হতো।
ভাই এই লেখক ক্রেজি লিখে!! লোলার জগৎ পড়ে আমিতো অবাক। এরকম সাই-ফাই বাংলাতে কোনো লেখক লিখসে? মাইন্ডব্লোয়িং একটা বই ছিল। আর এটা পার্পেচুয়াল আতঙ্ক - এটাও ক্রেজি একটা বই। বাংলাদেশে সাই ফাই এর নামে বিশিষ্ট একজন লেখক(নার আর নাই বলি) যা লিখে গেছে ওগুলা বস্তা পচা কিছু জিনিস সেগুলা কোনো জাতেরও না। অথচ সে নাকি বিজ্ঞানি। যাই হোক সাইফূল সাহেবের সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে উনি সাই-ফাই এর নামে যা ইচ্ছা তাই লিখে না। প্রোপার একটা গল্প থাকে, হার্ডকোর সাইন্স থাকে, ভাল চরিত্র থাকে, প্রোপার এমাউন্ট থ্রিল থাকে, লেখার গতি থাকে এবং সহজ পাঠ্য হয়। মাস্ট রিড।
জ্বালানির সংকটে যখন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকে তখন জনগণের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ থাকবে না? এ কেমন কথা? তেমনই চিন্তা করতে হয় জ্বালানির কথা। এই পৃথিবীতে জ্বালানির পরিমাণ অফুরন্ত নয়। অধিক ব্যবহারে হয়তো একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে পৃথিবীর বুকে থাকে সবশেষ জ্বালানিও। তখন কী হবে? তাছাড়া এই জ্বালানি পুড়ে যখন বর্জ্যের দেখা মেলে, তখন পরিবেশেরও তো ক্ষতি হয়। জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পৃথিবীর তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। বিলুপ্ত হচ্ছে অগণিত প্রাণী। তাই জ্বালানিবিহীন কোনো এক উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা যে করতেই হয়। পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য শেষ চেষ্টা করতে যে হবে।
পৃথিবীর কোনো এক অংশের বিশাল জনপদকে বেঁধে রাখা হয়েছে নিয়মের বেড়াজালে। এক অদ্ভুত দর্শন দেয়ালে ঘেরা সে অঞ্চলে দেয়ালের নামে প্রার্থনা হয়। সেই দেয়াল-ই তাদের ঈশ্বর। এর বাইরে যাওয়া পাপ, ঘোরতর অন্যায়। যেই চেষ্টা করেছে তার জীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। এমন বিশ্বাস, ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে। কী আছে এর বাইরে? কেন এভাবে বেঁধে রাখা? সত্যিই কি ধর্মীয় কোনো ব্যাপার এখানে আছে? বলা হয়, এ দেয়াল ভেদ করে ওপারে গেলেই দৈত্য দানোর কবলে পড়ে প্রাণটাই চলে যাবে। এসব বিশ্বাস হয় না রুমির। সে তাই অন্য কোনো পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। যে করেই হোক এই দেয়াল সে পার হবেই। দেখবে ওপারের বিশাল দুনিয়া। যে দুনিয়ার স্বাদ এর আগে কেউ পায়নি। রুমিকে তার অঞ্চলের মানুষেরা বেশ পছন্দ করে। জীবনকে সহজ করে তোলার জন্য একের পর এক যন্ত্র দিয়ে এলাকাবাসীর অনেক উপকার করেছে। তাই সে যখন ধর্ম বিরোধী কাজ করে, সেখানে অবাক না হয়ে পারে না। কীভাবে পারল রুমি? এই দেয়াল পার হলে ঈশ্বর রুষ্ট হবেন। নেমে আসবে অভিশাপ। এ তো হতে দেওয়া যায় না। রুমিকে থামাতেই হবে।
জ্বালানির ব্যবহার নিরসনের জন্য বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেন এক অসাধ্য সাধন করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রগুলো বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছেন এমন এক ইঞ্জিন, যা অনেক বিজ্ঞানী চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ। পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনের এই আবিষ্কার রাতারাতি বদলে দিয়েছে বিশ্বকে। আর লাগবে না জ্বালানি। বিদ্যুতের জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে না। সারা বিশ্বে এখন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে নামমাত্র মূল্যে। সারা বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার সুযোগ বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেনের সামনে। চাইলে খুব দ্রুত বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ধনী হতে পারে সে। কিন্তু তার সে ইচ্ছে নেই। মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে সে এই অবিস্কার বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে এসেছে। তাই বলে সবাই তা মানবে কেন? প্যানহালের বড়ো ছেলের লক্ষ্য আরও বড়ো। সে বিশ্ববাসীর কাছে ঈশ্বর হতে চায়। চায় এই আবিষ্কার থেকে প্রচুর টাকা কামাই করতে। তবে তো বাবার বিরুদ্ধে যেতে হবে। নাহলে যে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ধনী হওয়া আটকে যাবে।
বায়ুকথন নামের এক অদ্ভুত যন্ত্র আবিষ্কার করেছে রুমি। যা দিয়ে কথা বলা যায় দূর থেকে। এমনই এক রাতে কোনো এক মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো তার বায়ুকথন থেকে। মেয়েটির নাম বহ্নি। বহ্নির কাছ থেকে রুমি জানতে পারে এমন দেয়ালে ঘেরা আবদ্ধ অঞ্চল শুধু একটা নেই, আরও আছে। বহ্নিও বন্দী হয়ে আছে সেখানে। আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে পালানোর উপায় খুঁজতে লাগল রুমি। যেই নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ সারাজীবন, সেই প্রথা ভেঙে এগিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। রুমি কি পারবে এই বাঁধার দেয়াল ভেঙে ফেলতে? পেছনে এগিয়ে আসছে বাঁধ দিতে। রুমিও ছুট লাগিয়েছে। সঙ্গী হয়েছে শ্যাপা। ওদিকে বহ্নিও বের হয়েছে তার ভাইকে নিয়ে। কিন্তু ওরা জানে না কীসের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে। ওদের উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যত। পুরো পৃথিবীতে যে দেয়াল উঠে ওদেরকে বন্দী করেছিল, সেই দেয়াল ভাঙার পাশাপাশি আরো অনেক সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। পৃথিবীকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার গুরু দায়িত্ব কাঁধে। পারবে কি ওরা?
প্যানহাল কোহেনের স্বপ্নের পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু সবকিছু সহজতর হয়ে উঠলে মুদ্রার উল্টো দিকে ক্ষতিকর কিছু থাকলেও থাকতে পারে। প্যানহাল বুঝতে পেরেছে পৃথিবীবাসী আজ এই আবিষ্কারের সুবিধা ভোগ করলেও শতশত বছর পর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে পৃথিবীতে। তাই একটি কোড ভেঙে তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে কুরিয়ার পাঠিয়েছে প্যানহাল। যদিও শত বছর পেরিয়ে সেই কুরিয়ার পৌঁছে সেই তিনজনের কাছে। যা চমকে দেয় তাদের। বিপদ মাথায় নিয়ে কাজ করে তারা। কিন্তু পৃথিবীর মানুষকে বাঁচানোর যে তীব্র প্রয়াস, সেই চেষ্টায় কতটা সফল হবে ওরা? না-কি পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মানব সম্প্রদায়?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
"পার্পেচুয়াল আতঙ্ক" সাইন্স ফিকশন ঘরানার লেখা। দারুণ অনুভূতি দিয়ে গিয়েছে। লেখক গল্পের মধ্য দিয়ে যে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন, তা অসাধারণ। লেখকের কল্পনার তারিফ করতে হয়। সেই সাথে গল্পের যে উপস্থাপন সেটাও মনে রাখার মতো। প্রতিটি অংশ খুব যত্ন নিয়ে, হিসাব করে তৈরি করা।
বিজ্ঞানকে মানুষের কাজকে সহজ করে তুলেছে। জীবনযাত্রা হয়ে ওঠেছে সরল। ফলে কায়িক শ্রম কিংবা মানসিক শ্রমের পরিমাণ দিন�� দিনে কমছে। লেখক যে প্রযুক্তির আবিষ্কার করেছেন, সেই প্রযুক্তির ফলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে গিয়েছে। অফুরন্ত বিদ্যুতের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে ওঠেছে বিদ্যুৎ নির্ভর। সবকিছুই বিদ্যুতের দ্বারা পরিচালিত। জ্বালানিবিহীন এই বিদ্যুতের ব্যবহারের কারণে কমেছে জ্বালানির ব্যবহার। কিছু সময় পর এই জ্বালানির ব্যবহারও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ফলে জ্বালানি পোড়া কালো ধোঁয়া, যা পরিবেশের ক্ষতি করত; তাও আর হবে না। পরিবেশ হয়ে উঠবে সতেজ। জলবায়ু হবে স্বচ্ছ। হারিয়ে যাওয়া অনেক পশুপাখি ফিরে আসবে নিজেদের ঠিকানায়। মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয়ে যাওয়ার কারণে কাজের ক্ষেত্র যাবে কমে। নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় মানসিক শ্রম আর দেওয়া লাগবে না। শুধু ফুর্তি আর জীবনকে উপভোগ করা। এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? একসময় এর ফল সামনে আসে। প্রযুক্তি যতই মানুষের জীবনে প্রভাব বিস্তার করুক, সবকিছু সহনীয় পর্যায়ে ঠিক আছে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো ফল বয়ে আনে না।
মানুষের মধ্যে সর্বেসর্বা হওয়ার প্রবণতা বেশি। অন্যের মাথার উপর থেকে নিজেকে ঈশ্বর মনে করা নতুন কিছু নয়। আর ঈশ্বরের নাম নিয়ে কিছু করলে সহানুভূতি পাওয়া যায়। সেই চেষ্টা তাই যুগে যুগে অনেকেই করে আছে। ধর্মের নামে প্রতারণা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর মানুষও ধর্মীয় আক্রোশের ভয়ে সব মেনে নেই। মিথ্যের জয় হয় এখানেই। সত্য থেকে যায় আড়ালে।
মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া, যা হয় হোক বলে সাহসী পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার মানুষের হয়তো অভাব হয় না। কিন্তু মৃত্যু যখন সামনে তখন হয়তো বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি ফুটে ওঠে চোখেমুখে। যতই মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করা হয়, মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া হোক; যখন যমদূত সামনে আসে তখন হয়তো মানুষ বেঁচে থাকতেই চায়। এই পৃথিবীর অনেক কিছুই হয়তো কারো দেখা হয় না। কেউ কেউ চায় সবটা দেখতে। মৃত্যুর আগে কেউ মরতে চায় না। কিন্তু কখনো কখনো হার মানতে হয়। মানব জাতির উপকারের জন্য মৃত্যুকে মাথা পেতে নিতে হয়।
লেখক বইটিতে ভিন্ন সময়কাল নিয়ে গল্প রচনা করেছেন। কখনো বর্তমান, কখনো অতীত আবার কখন একশ, দেড়শ বা দুইশ বছর পরের ঘটনাও লিপিবদ্ধ করেছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়। লেখক খুব সচেতনভাবে সময় কালের উল্লেখ করা এড়িয়ে গিয়েছেন। ফলে মাঝেমাঝে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল আসলে কোনটা অতীত আর কোনটা বর্তমান। আমার মনে হয়েছে অধ্যায়ের শুরুতে সময়কাল লিখে দিলে মন্দ হতো না। এছাড়া ভাষাগত একটি সমস্যা লক্ষ্য করেছি। যেমন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকে যারাই আসছে সবাই একই ভাষায় কথা বলছে। সবাই সবার কথা বুঝছে। বিষয়টা কেমন যেন লেগেছে। এখানে একটা জিনিস করা যেত। কোনো ডিভাইস বা যন্ত্রের বর্ণনা দেওয়া যেত, যার মাধ্যমে সবাই সবার কথা নিজ ভাষাতে অনুবাদ করে বুঝবে। যেহেতু একটি ভিন্ন জামার কথা বলা হয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি থাকতেই পারত। তাছাড়া রুমির ঘটনা বর্ণনায় কিছু যন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর আকার আকৃতির ব্যাখ্যা দিলে মনে হয় ভালো হতো।
লেখকের ভাষাশৈলী ও বর্ণনাশৈলী চমৎকার। এই জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে সহজভাবে বর্ণনা না করলে বুঝতে অসুবিধা হয়। বেশ কিছু খটমটে বৈজ্ঞানিক শব্দের ব্যবহার ছিল। বিজ্ঞানের ছাত্র না হলে কিছু তত্ব উপাত্ত বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। তবে লেখক যেভাবে গল্পের গতিপ্রকৃতি পরিচালনা করেছেন তাতে হয়তো অনেক কিছুই সহজ হয়ে গিয়েছে।
চরিত্র নিয়ে লেখক খুব একটা কাজ করেননি মনে হয়েছে। শুধু রুমিকে নিয়ে যতটা পারা যায় লেখক সেই চেষ্টাই করেছেন। লেখক পুরোটা সময় ঘটনা প্রবাহের মধ্যেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ফলে চরিত্রগুলোর দিকে তেমন নজর দেননি। বিশেষ করে বহ্নি শেষ দিকে যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। তবে যে জিনিসটি লেখক তুলে ধরেছেন, সেটি বন্ধন। কাছের মানুষ হোক বা না হোক, একসাথে থাকতে গিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। সেই বন্ধনের জোরেই হয়তো মানুষ মানুষের মধ্যে টান অনুভব করে। যেমনটা রুমি আর বহ্নির ক্ষেত্রে হয়েছে।
শেষটা অদ্ভুত সুন্দর। ভালো লেগেছে। যদিও একটা কিছু জানত তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারপরও কিছু বিষয় জানতে হয় না। কারো জন্য অপেক্ষা এভাবেই করতে হয়। সেই অপেক্ষা পূরণ হবে কি না কে জানে?
▪️সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন :
সম্পাদনার কিছু ত্রুটি ছিল। বানান ভুল, ছাপার ভুল নিয়মিতভাবেই বাতিঘর প্রকাশনীর পুরনো রোগ। যদিও সংখ্যার আধিক্য কমছে। হয়তো এক সময় জিরোতে নেমে আসবে। প্রোডাকশন কোয়ালিটি আগের চেয়ে অনেক ভালো। তিন হাত ঘুরে এসেও কোনো রকমের সমস্যা হয়নি।
এই প্রচ্ছদ আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। সাইন্স ফিকশন জাতীয় বইয়ের এমন প্রচ্ছদই তো মানানসই।
▪️পরিশেষে, বিজ্ঞান আশীর্বাদ, কখনো কখনো অভিশাপ হয়েও দেখা দেয়। এই মহাবিশ্ব সাম্যাবস্থা পছন্দ করে। সেই অবস্থান হারিয়ে গেলে হয়তো নেমে আসতে পারে ঘোর বিপদ। প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষের জীবনযাত্রা যতটা সহজ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হলে হয়তো জীবনের শেষ সময় এসে উপস্থিত হতে পারে।
▪️বই : পার্পেচুয়াল আতঙ্ক ▪️লেখক : মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম ▪️প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
আধুনিক সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের মাঝে এক ধরণের আতঙ্ক কাজ করে আসছে। সেই মনের গহীনে লুকোনো আতঙ্ক হলো প্রযুক্তি নিয়ে। কোন টেকনোলজী মানবসমাজকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করলে একই সাথে সেটির মারাত্মক সাইড ইফেক্টের ভয় বা আতঙ্ক মানুষজনকে সবসময় ভাবিয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের মহাস্থপতি প্যানহাল কোয়েন। ভেবে দেখুন তো যদি পুরো পৃথিবী জ্বালানীতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে তাহলে কী হতে পারে? আবার সেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা কোন কর্পোরেট পুঁজির দাস না হয়ে মানবসমাজে সাম্যের সাথে মিলিয়ে দেয়া হলে ফলাফল কিরূপ হবে?
মহামতি প্যানহাল কোয়েনের আবিষ্কার রহস্যময় পার্পেচুয়াল মেশিন পৃথিবীকে করে ফেলে প্রায় দূষণমুক্ত। রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি লোপ পায়। কিন্তু কোয়েনের মনে বাস করছে এক উদ্বিগ্নতা। ভালো করে বললে আতঙ্ক।
বিশ্বে কার্বণ নিঃস্বরনের মাত্রা প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি চলে আসায় পরিবেশ সুন্দর চেহাড়া পেয়েছে। আবার অনেক কাজ থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষজন শিল্প-সংস্কৃতি-জ্ঞান-বিজ্ঞান-বিনোদনের বিভিন্ন শাখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার অভাব এবং সম্পদের বন্টনের যে সাম্যতা, তা বৈজ্ঞানিক মৌলিক আবিষ্কার অথবা ট্রাবলসুটিং থেকে মানবজাতিকে একটু তফাতেই নিয়ে আসে।
রুমী এমন এক জগতে বাস করে যেখানে একটি দেয়ালই ঈশ্বর। সেই দেয়াল অতিক্রম করা সম্ভব নয় কারণ ঐ পাশে আছে দৈত্য-দানব। বিজ্ঞানমনস্ক রুমী পুরোহিতদের চোখ-রাঙানী এবং মায়ের নিষেধ অমান্য করে সে ওয়ালের অন্যপ্রান্তে যেতে চায়, যেকোন মূল্যে। একের পর এক দরকারী আবিষ্কারে নেমে পড়ে রুমী, প্রচুর রিস্ক নিয়ে।
মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের হার্ডকোর সায়েন্স-ফিকশনের ফ্যান হয়েছি আমি 'লোলার জগৎ' উপন্যাস পড়ে। বাংলা মৌলিক সাই-ফাইয়ে লেগে থাকলে সাইফূল সামনের কয়েক দশক রুল করতে পারবেন। তাঁর প্লটের মৌলিকত্ব এবং এ উপন্যাসেরও সেই 'পার্পেচুয়াল' ফিলিং বরাবরের মতই আছে। রিডারকে ধরে রাখার যে একটা ক্ষমতা অনেক লেখকের থাকে তা সাইফূল ইসলামের মাঝেও আছে।
এ বৈজ্ঞানিক কল্পউপন্যাসে বরাবরের মতোই লেখক সন্ধান করেছেন মানুষের রাজনৈতিক অভিলাষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। বিজ্ঞান এবং ধর্ম প্রায় বেশিরভাগ সময় ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য সাধনে কাজ করে সেই চিরাচরিত বিষয়টিও দেখা গেছে 'পার্পেচুয়াল আতঙ্ক' এ�� আরো কিছু সায়েন্স-ফিকশন তত্ত্বের সহজ রূপে পাওয়াটাও আছে এখানে। সায়েন্স ফিকশনে রহস্যরোমাঞ্চ রাখার প্রবণতাও আছে লেখকের।
বইটির অপেক্ষাকৃত কম ভালো লাগা বিষয়গুলো হলো,
১) শেষের দিকে একটু বেশিই দ্রুত বা রাশড লেগেছে। এত বিষয়-আশয় একসাথে এত ফাস্ট পেইসড হয়ে যাওয়াতে একটু ছন্দপতন হয়ে গেছে শেষের অংশে।
২) স্পয়লার দিতে চাই না তবে এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে একটা চরিত্র অভাবনীয় কিছু করে ফেলেছে বা হয়ে গেছে, ধরে নেন থরের মতো য়োর্দি হয়ে গেছে, সেই জায়গাটার বর্ণনা খানিকটা সাদামাটা লেগেছে।
৩) সেই মহাক্ষমতা পাওয়ার পর আচার-আচরণ বা ডিসিশন মেকিং এ অতিমানবীয় কিছু ঘটানোর দৃষ্টান্তগুলো আরো ভালো হতে পারতো মনে হয়।
সব মিলিয়ে ভালো একটা সায়েন্স ফিকশন নভেল পড়া হলো। যদিও 'লোলার জগৎ' পাঠের পর এক্সপেক্টেশন স্কাই-হাই হয়ে গিয়েছিলো। তবে প্রতিটি বইয়ের আলাদা আলাদা মূল্যায়ন হওয়া দরকার। গ্রন্থে ৬২ পৃষ্ঠা থেকে ৭২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মাইকেল এবং সেরাফিনের মধ্যকার আলোচনাটি দারুন লেগেছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট রাজনীতি ও হাইপোথিসিস বিষয়ে মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের কল্পনাশক্তি চমৎকার।
বই রিভিউ
নাম : পার্পেচুয়াল আতঙ্ক লেখক : মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রকাশনা : বাতিঘর প্রকাশনী প্রচ্ছদ : বাপ্পী খান ( দুর্দান্ত কাজ হয়েছে ) জঁরা : সায়েন্স-ফিকশন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে সবুজ শ্যামল প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে এক কাপ চা খেলাম। আজ ছুটির দিন না তবে কোনো রুটিন কাজ নেই। যেটা ভালো লাগে সেটাই করি প্রতিদিন। শখের কাজ আরকি। বাইরে হাঁটতে গেলে এখন খুব ভালো লাগে। দূষণ নেই, গাছপালায় ভরপুর চারদিক। প্রকৃতি ফলে-ফুলে, পাখির কলকাকলীতে সমৃদ্ধ। ৯-৫টা অফিসের নিয়ম আর নেই। যার যা ভালো লাগে সেটা নিয়েই মেতে থাকি। চিন্তামুক্ত, ভারমুক্ত আর অবশ্যই ক্লান্তিহীন জীবন। অফুরন্ত সময়...............
কী ভাবতেই কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে না? সকালে ঘুম থেকে উঠে দৌঁড়ে কর্মস্থলে যাওয়ার ঝক্কি নেই, আবার নাকি পরিবেশ দূষণ বলতেও কিছু নেই! এমনটা তো স্বপ্নেই সম্ভব।
কিন্তু না, বাস্তবেই তা সম্ভব হয়েছে। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মহান বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেন। থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রমতে ❛পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন❜ বানানো সম্ভব নয়। বিজ্ঞানী প্যানহাল এখানেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তৈরি করেছেন ❛পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন❜ আর তাও থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র মেনেই। একবিংশ শতাব্দীতে তিনি একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আর যার ফলে মানবজাতি প্রবেশ করে ❛টাইপ-২ সিভিলাইজেশন❜ এ। এই ইঞ্জিনের বদৌলতে পৃথিবীর মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে নিত্যদিনের কর্মযজ্ঞ থেকে। প্রকৃতি বেঁচে যায় দূষণ থেকে। ধীরে ধীরে প্রকৃতি ফিরে পায় তার হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য। প্যানহাল মেধাবী বিজ্ঞানীর পাশাপাশি একজন বড়ো মনের মানুষও। তাই অভাবনীয় এই আবিষ্কারের নামমাত্র মূল্য দিয়ে শুরু করে একসময় তা বিনামূল্যে ছড়িয়ে দেন বিশ্ববাসীর কাছে।
তবে সব ভালোও ভালো নয়। চা❜য়ে অতিরিক্ত চিনি যেমন দিনের পর দিন গ্রহণ করলে শেষে ডায়াবেটিসে পড়তে হয় তেমন-ই প্রকৃতি একদম সুন্দর, নির্ভার দীর্ঘদিন থাকলে একসময় ঝামেলা হতেই পারে। আর এই ❛পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন❜ যেমন প্রকৃতি আর মানুষকে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল তেমন-ই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এক বিপর্যয়ের দিকে। আর প্যানহাল তা আগে থেকেই অবগত ছিলেন। কীভাবে সমাধান করতে হবে তার একটি নীল নকশাও তিনি তৈরি করেন। আর তা তিনটি পার্সেল আকারে পাঠিয়ে দিলেন অদূর ভবিষ্যতের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কাছে। সভ্যতার দ্বার খুলে দেওয়া এই ইঞ্জিনের ফলে আসন্ন বিপদ থেকে ভবিষ্যতের মানুষেরা কি রক্ষা পাবে? না-কি মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবে?
পৃথিবীর অন্য কোন এক দিকে বিশাল দেওয়াল দিয়ে ঘেরা একটি জনপদ। ধর্মানুরাগী তারা। চারপাশে ঘেরা এই দেয়াল-ই তাদের ঈশ্বর। দেয়ালের বাইরে যাওয়া মানা। আর আদৌ কি দেওয়ালের বাইরে যায়া না-কি তাই তো জানা নেই। হাজার বছর ধরে এই ঘেরা দেওয়ালের মাঝেই বসবাস তাদের। এখানে বিজ্ঞানও তেমন উন্নত নয়। কিন্তু যা মানা তার প্রতি মানবের অসীম আগ্রহ। সেই জনপদের উন্নত চিন্তাধারার, বিজ্ঞানমনষ্ক এক ছেলে রুমি। পুরোহিতদের মানা কিংবা সভ্যতার শুরু থেকেই মেনে আসা এই দেওয়ালেশ্বরকে সে একদিন্দু বিশ্বাস করে না। তার মন পড়ে থাকে দেওয়ালের ঐ পারে। কী আছে সেখানে? আসলেই কি দৈ ত্যদানো বা পানির নিচে জলদা নব আছে? না ঐপারে আছে নতুন কোন জায়গা, আরো উন্নত কোন সভ্যতা? রুমিকে যেতেই হবে নীল নদীর ঐপারে।
রুমি দারুণ সব মেশিন বানাতে পারে। গ্রামবাসীও তার বানানো মেশিন ব্যবহার করে বেশ উপকার পায়। তবে তার এই অবিশ্বাসী মনোভাবটাই যত সমস্যা। তাতে রুমির কিছু আসে যায় না। সে আছে নিজের লক্ষ্য নিয়ে। বেশ সময় নিয়ে একটা যন্ত্র বানিয়েছে, যার নাম দিয়েছে ❛বায়ুকথন❜। এ যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে একসময় যোগাযোগ হয়ে যায় রুমির জনপদের মতো-ই আরেকটা প্রায় একই রকম দেয়াল দিয়ে ঘেরা জনপদের এক মেয়ের সাথে। যার নাম বহ্নি। সেও রুমির মতোই দেয়ালের ওপারে কী আছে জানতে উৎসুক। দুজনে মিলে পরিকল্পনা করে দেয়াল পেরিয়ে কী আছে তারা দেখবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
সময় ঘনিয়ে আসার আগেই রুমির গ্রামে এক অঘটন ঘটে যায়, তাই পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হয়। রুমি ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হয়ে যায় সাথে সঙ্গী হয় ছোটোকালের বান্ধবী শ্যাপা। নানা কঠিন পথ আর গ্রামের মানুষের রোষানল পেরিয়ে রুমি-শ্যাপা দেয়াল পারি দেয় সাথে যোগ দেয় বহ্নি ও তার ভাই। চারজনে মিলে সম্মুখীন হয় নতুন এক পরিবেশের। জানতে পারে অবাক করে দেওয়া সব তথ্য। সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের। রুমি-বহ্নির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে সামনের মানবসভ্যতা। কোটি প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা হবে আরো কোটি প্রাণ। এই ভয়াবহতাকে কীভাবে সামাল দিবে তারা?
পাঠ প্রতিক্রিয়া: অনবদ্য, এক কথায় পাঠ প্রতিক্রিয়া এটাই। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ভক্ত হিসেবে এই জাতীয় বই একদম হটকেকের মতো গিলি। তবে এ বিষয়ে সকল বই-ই যে তৃপ্তি দেয় এমনটা নয়। যেমনটা দিয়েছে ❛পার্পেচুয়াল আত ঙ্ক❜। সুদূর ভবিষ্যতের বিজ্ঞান উন্নত সভ্যতা নিয়ে পড়তে খুব ভালো লাগে। সাথে যদি একটু রহস্যের গন্ধ পায়া যায় তবে তো কথাই নেই। এই বইটিতে লেখক রহস্য আর বিজ্ঞানের সুমধুর এক জোড় তৈরি করেছেন। দুটি ভিন্ন সময়ের বর্ণনা এতো নিপুণভাবে করেছেন যেখানে অতীত আর বর্তমান কোনটা প্রথমে সেটা বোঝাই যায়নি। এক অংশে টাইমজাম্পের সাথে বর্ণনা করেছেন, পরিচয় করিয়েছেন মেধাবী সব চরিত্রের সাথে। বিজ্ঞানের কলকাঠি নাড়িয়েছেন নিদারুণভাবে। সভ্যতার উন্নয়নে বিজ্ঞানের ব্যবহার যেমন আশীর্বাদ তেমন-ই মাঝে মাঝে আশীর্বাদ-ই বয়ে আনে অভি শাপ। এই নিপাট সত্যকে লেখক পরতে পরতে চমৎকার সব তথ্য আর আলোচনার মাধ্যমে সাজিয়েছেন। চরিত্রদের মাঝের বোঝাপোড়া, একে অপরের সাথে বিজ্ঞানের আলোচনা বা যুক্তিতর্কগুলো ছিল দেখার মতো। প্রতিটি দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছিল। চোখের সামনেই যেন পার্পেচুয়াল ইঞ্জিনকে দেখছিলাম। আর উপলব্ধি করছিলাম সৃষ্টির শুরুতে সুজলা সফলা প্রকৃতি যেমন ছিল তেমন-ই প্রকৃতি বিরাজ করছে একবিংশ শতাব্দীতে। ভাবলেই একধরনের শিহরণ বয়ে যায়! রুমি আর বহ্নি চরিত্র দুটো বেশ স্মার্ট করে সাজিয়েছেন লেখক। সাথে সাধারণ মেয়ে শ্যাপা। শ্যাপা চরিত্রের স্নিগ্ধতা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভারে কোথাও মলিন লাগেনি। বরং লেখক তাকে দিয়ে মাঝে মাঝে দারুণসব বুদ্ধি বের করিয়ে এনেছেন। বৈজ্ঞানিক অনেক (সব বলছি না আবার!) কল্পকাহিনিতে দেখা যায় ক্ষ্যা পাটে বিজ্ঞানী তার আবিষ্কার দিয়ে দুনিয়াতে নতুন দাড় উন্মোচনের পাশাপাশি নিজেই ভি লেন হিসেবে প্রকাশ পায়। এখানে প্যানহালকে লেখক যেমন মেধাবী হিসেবে দেখিয়েছেন তেমন তার মানবিকতা, উদারতাও ফুটিয়ে তুলেছেন। যা এই চরিত্রকে পছন্দ করতে ইন্ধন জুগিয়েছে। মানব জাতির ক্রান্তিলগ্নে বা বিপদে নেতাকে মাথা ঠান্ডা রেখে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা কখনও তার নিজের ক্ষতি ডেকে আনে। দক্ষ নেতা মাত্রই এই কঠিন সময় তার গুণাবলী দিয়ে সমাধান করেন। বৈজ্ঞানিক দিকের পাশাপাশি এখানে সুন্দরভাবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণও সামনে থেকে শক্তি জোগানোর ব্যাপারটা তুলে ধরেছেন। বই সমাপ্তির অনেক আগেই সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে যায় তবুও শেষ পর্যন্ত লেখক মনোযোগ ধরে রেখেছিলেন। পুরোটা কীভাবে শেষ হয়, না জানা পর্যন্ত বই থেকে চোখ সরছিল না। বইতে লেখক রুমি-শ্যাপা-বহ্নি-বহ্নির ভাইয়ের দারুণ একটা দলের পাশাপাশি দেখিয়েছেন ঐক্য, আবেগ আর বিশ্বাস রেখে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার ফলাফল। রুমি-শ্যাপার খু নসুটিও উপভোগ্য লেগেছে। বৈজ্ঞানিক কিছু টার্ম বা এর কিছু বর্ণনা নিয়ে একটু দ্বিধায় থাকলেও সেটা ফিকশন আর লেখকের একান্ত চিন্তাপ্রসূত হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া যায়। বাদ বাকী গল্পের প্লট আর এক্সিকিউশন লেখক এতো নৈপুণ্যের সাথে করেছেন তাতে তিনি প্রশংসা পাবার যোগ্য।
বইটার প্রচ্ছদ আমার খুব খুবই পছন্দ হয়েছে। কাহিনির সাথে একেবারে খাপে খাপ।
ভাবুনতো আসলেই যদি পৃথিবী তার হারানো রূপ ফিরে পায়, ভারসাম্য আসে আর মানুষ নিজের পছন্দের কাজ চিন্তামুক্তভাবে করতে পারে তবে কেমন হয়?
দশ বছর অতিগোপনে নিরলস গবেষণা চালিয়ে মহান বিজ্ঞানী প্যানহাল কোহেন আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানের আজীবনের আকাঙ্ক্ষা, সভ্যতার হলি গ্রেইল, সেই ফিলোসফার স্টোন : জ্বালানীবিহীন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎস 'দ্য পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন'। তিনি নিশ্চিত করেন, প্রথমে নামমাত্র মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও একটা সময় পরে পুরো পৃথিবীবাসি বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে। একরাতেই প্যানহাল মানবসভ্যতার প্রায় সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো বাধা থাকবে না, কায়িক শ্রমিকের পরিমাণ কমে আসবে ৩০% এ, মানুষ সৃষ্টিশীল কাজে অধিক মনোনিবেশের সুযোগ পাবে, সভ্যতা খুব দ্রুত 'টাইপ-২ সিভিলাইজেশনে' প্রবেশ করবে। তবুও জনমনে এক প্রশ্ন, তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রানুসারে শক্তির বিনাস কিংবা সৃষ্টি নেই, শক্তি কেবল একরূপ থেকে আরেক রূপ ধারণ করে মাত্র। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে হলে সমপরিমাণ শক্তি ব্যয়ে যে খরচ হবে তাতে বিদ্যুৎ এর দাম অনেক হওয়ার কথা কিন্তু প্যানহাল এখানেই বাজিমাত করেন। তিনি থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে সভ্যতার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেন।
তিনি এটাও ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এভাবে চললে দেড়-দুইশো বছর পর পৃথিবীর ইলেকট্রনের পরিমাণ এতো বেশি হয়ে যাবে যে পৃথিবীর চার্জের সমতা নষ্ট হয়ে যাবে। মোটামুটিভাবে চার-পাঁচশো বছর পর সেই ইঞ্জিনগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে। তাই তিনি মৃত্যুর আগে দেড়-দুইশো বছর ভবিষ্যতের পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ তিনজন ব্যক্তির জন্য তিনটা বার্তা রেখে যান। যা ছিল সর্বোচ্চমাত্রায় এনক্রিপ্ট করা, এনক্রিপ্টেড ডিস্কের ২১৬ বিটের ডিক্রিপশন কি-সহ উদ্ভূত সমস্যা থেকে উত্তরণের এক প্রতিযোগিতামূলক সমাধান।
অন্যদিকে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বাস করে এক ধার্মিক জনগোষ্ঠী যাদের কঠোরভাবে ধর্ম পালন করতে বাধ্য করা হয়। হাজার হাজার বছর ধরে তারা বিশাল দেয়াল ও সমুদ্রদ্বারা বন্দি। সেখানকার কোনো মানুষই দেয়াল টপকে অন্যপ্রান্তে যাওয়ার চেষ্টাও করেনি। পুরোহিতগণ তাদের বুঝিয়েছে, দেয়ালের অপর প্রান্তে স্রষ্টা বসবাস করে, কেউ যদি এই অধর্ম করে তবে সে শয়তানের শামিল হবে। আর সৃষ্টিকর্তা বিমুখ হলে, শান্ত ধরায় নেমে আসবে বিপর্যয়। যুগ যুগ ধরে বাপ দাদার ধর্মকে তারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে, পুরোহিতগণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক পথের নিশানা দিয়েছে। আজতক কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি।
কিন্তু সেখানে বাস করে কট্টর ধার্মিক রুলতা। তার ছেলে ছোট্ট এক কিশোর নাম রুমি। রুমির ডিএনএতে সৃষ্টিকর্তা সেঁটে দিয়েছে এক অদম্য পাঞ্চলাইন, 'যা বাছাধন যা, দেয়াল টপকা। আরে ব্যাটা, কোনো শাহীন *টিরপোলা তোকে ধরতে পারবে না'। ছোটোখাটো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে রুমি বাল্যকাল থেকেই মাতিয়ে রাখতো রাজ্যটাকে। এরমধ্যে বায়ুকথন নামে এক আবিষ্কার করে বসে, এই যন্ত্র দিয়ে দূরের কারো সাথে কথা বলা যায়। মা রুলতা অনেক খুশি কিন্তু কয়েকদিন আগেই ধর্মপালেরা শাসিয়ে গেছে, তর পোলা এসব ভুগিছুগি কীসব বানায়? মানা করিস, নইলে পরেরবার মাঝনদীতে দৈত্যের কোলে দিয়ে আসব। কিন্তু শাহীন দৌড়ে আসার আগেই রুমি বায়ুকথন ব্যবহার করে ঐপারের বহ্নির সাথে সফল যোগাযোগ সম্পন্ন করে। তারা জানতে চায় কারা এর নেপথ্যে? কেনই বা এই বন্দিদশা? জগৎ বলতে কি আরো কিছু আছে?
পৃথিবীর একপাশ বাস করছে বিজ্ঞানের উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে, আরেকপাশ অন্ধকারের ডোবায়। একপাশে রয়েছে সভ্যতার জ্ঞানের চরম ব্যবহার, অন্যপাশে আছে জ্ঞানকে দাবিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস? এই কি নতুন সভ্যতার সূচনা, নাকি ধ্বংসযজ্ঞে আরো একধাপ আগানো? কোন প্রান্তে থাকবেন আপনি?
পিউর হার্ডকোর সাই-ফাই। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম। লেখকের কনসেপ্টগুলা বেশি ইউনিক, বেশি জোস। পদার্থবিজ্ঞান না উল্টিয়ে বাস্তবতার কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করেন, সেই দাবি এই বইটাতেও করেছেন। সংলাপ আর থিংকিংগুলা মাইন্ড হান্টিং। গল্পের বুননে কবে যে আটকে গিয়েছি, একদিনেই পড়া শেষ। আবারো অপেক্ষায় আছি, নেক্সট বইয়ের।
পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন, মানব সভ্যতার জন্য এক অকল্পনীয় আবিষ্কার হলেও বিজ্ঞানী প্যানহাল দাবি করেন যে তিনি এরকম একটি ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছেন। সেই আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর ইতিহাস কীভাবে পাল্টিয়ে যায় তা নিয়েই লেখক মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের 'পার্পেচুয়াল আতঙ্ক' বইটির বাকি অংশ লেখা। - পার্পেচুয়াল আতঙ্ক সায়েন্স ফিকশন ঘরানার একটি বই। নন লিনিয়ার স্টাইলে চলা গল্পের পার্পেচুয়াল ইঞ্জিন আবিষ্কারের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আর আরেকদিকে একটি দেয়াল ঘেরা জনপদের দেখা পাওয়া যায়; যা পাঠককে প্রথমদিকে অ্যাটাক অন টাইটান কিংবা মেইজ রানার সিরিজের কথা মনে করে দিলেও আস্তে আস্তে এর আসল রহস্য বোঝা যায়। প্রথমদিকে বইটি বেশ ভালোভাবে আগালেও মাঝে মনে হয়েছে একটু সাইডট্রাক হয়ে গিয়েছে আর ফিনিশিংটাও রাশড, সেখানে কিছু ব্যপার আরো ডিটেইলে বর্ণনা করা যেত। চরিত্রায়নের দিক থেকে রুমি চরিত্রকে মোটামুটি ভালোই লেগেছে, তার সাথের শ্যাপা চরিত্রটিকে অবশ্য একটু বেশি ন্যাকা লেগেছে। বইয���ের সায���েন্টিফিক পার্টগুলো বেশ বিশ্বাসযোগ্য ভাবে লেখা হয়েছে। বইয়ের প্রোডাকশন এবং প্রচ্ছদ প্রকাশনীর গতানুগতিক প্রোডাকশনের মতোই হয়েছে। তবে বইয়ের প্রথমদিকে অনেকগুলো টাইপিং মিস্টেক রয়েছে দেখলাম যা কিছুটা বিরক্তিকর ছিলো। যাই হোক, এ সকল ছোট খাট ব্যাপার বাদ দিলে সায়েন্স ফিকশন পড়ুয়ারা একবার পড়তেই পারেন বইটা।