সুখের সন্ধানে কত পথিক হেঁটেছে কত দূর! তবুও কি তারা পেয়েছে সুখ নামক অমৃতের সন্ধান? কবিগুরু বলেছিলেন, মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,মানবের মাঝে আমি বাচিবার চাই। কিন্তু তিনি কি বাঁচতে পেরেছিলেন? নাহ! তুমি সুখ যদি নাহি পাও তবে সুখেরও সন্ধানে যাও, এই চরণটি পড়ার পরই মনের মাঝে একটা চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পৃথিবীতে কি আদৌ কোনো জায়গা আছে, যেখানে শুধু সুখ আর সুখ ? মরে যাওয়া যেখানে অসম্ভব ? আছে কি? মৃত্যু প্রতি মুহুর্তে আমাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে- উক্তিটি করেছিলেন রেনেসা যুগের দার্শনিক মন্টাগেইন। গিলগামেশের মহাক��ব্যে চার হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার রাজা গিলগামেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর মৃত্যুর পর নিজের নশ্বর জীবন নিয়ে প্রশ্ন করেন , "আমাকেও মরতে হবে?" মৃত্যুকে জয় করবার সাহস তারও ছিল, কিন্তু মৃত্যু নামক চরম সত্যের কাছে তিনিও হেরে যান। মানুষ যদি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ওঠার চেস্টায় সফল হয় তখন তাঁর মন থেকে মৃত্যুভয় অন্তর্হিত হলে কালের পর কাল ধরে হাজারো অভিজ্ঞতা অর্জন, জন্ম, মৃত্যু, সামাজিক পরিবর্তন, সভ্যতার উত্থান ও পতনের হাজারও দৃশ্যও কিন্তু তার মনে তিক্ততার জন্ম দেয়ার ক্ষমতা রাখে। অনন্তকালব্যাপী ঘটনাসমূহ প্রত্যক্ষ করার পরেও সে বেঁচে থাকতে চাইবে এই ভুবনে । তার কাছে সময় নির্লিপ্ত, অভিজ্ঞতা অসীম হবার কারনে সে উপলব্ধি করবে এভাবে বেঁচে থাকার মাঝে কোনো সুখ নেই। তখন সে বেঁচে থাকার সাথে সাথে অনাবিল সুখকে অর্জন করতে চাইবে। আজ পর্যন্ত কত সাম্রাজ্যের উত্থান পতন হয়েছে,কত ক্ষমতাধর চেঙ্গিস খান,মিশরীয় ফারাও, রাজাধিরাজ পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করেছে বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য। কত কালো তুফানের মত অগ্রসর হওয়া যোদ্ধাদের কালে কালে দেখেছে পৃথিবীর বাসিন্দা।আজ তারা কোথায়? মানুষ কোথায় আটকায়, জানেন? মানুষ আটকায় মৃত্যুতে।
মৃত্যু আর সুখের সন্ধানের কথা যখন কালো মেঘের মত জমে যায়,তখনই মনে প্রশ্ন জাগে পৃথিবীতে কি এমন জায়গা আছে যেখানে মরে যাওয়াই অসম্ভব? যেখানে মানুষ বাস করে চরম সুখে। কোথায় সে জায়গা, কীভাবেই বা যাওয়া যায় সেখানে? এতগুলো প্রশ্ন যখন মাথায় আসে তখন সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই একটা বইয়ের নামই সবার প্রথমে প্রকাশ পায়। সাম্ভালা !
সাম্ভালা আসলে কি? কোনো মিথ নাকি সত্য। কেনই বা এত মানুষ নিজেদের জীবনকেও বাজি রাখতে পিছু পা হচ্ছে না? উত্তরগুলো জানার জন্য আপনাকে পড়তে হবে শরীফুল হাসানের সাম্ভালা।
সাম্ভালা মূলত একটা ট্রিলজি। সুতরাং আমি পুরো ট্রিলজিকে তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করে চরিত্রায়ন এর সাথে গল্পের সারসংক্ষেপ এবং পাঠ প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করছি।
★ গল্পের সারসংক্ষেপ :
★ সাম্ভালা :
তিনি পৃথিবীর বুকে বিচরন করছেন হাজার বছর ধরে। তার স্মৃতিতে যুক্ত হয়েছে কত অভিজ্ঞতা। নিজেকেই আবিষ্কার করেন হরেক রুপে। কখনো রাজা সলোমনের বিলাসবহুল প্রাসাদে রানী সেবার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা পরিলক্ষিত করা, নেফারতিতির অপরূপ রূপে মুগ্ধ হওয়া, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, ফরাসী বিপ্লব, দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম - কতকিছুই দেখলেন এই জীবনে। তবুও তার জ্ঞানপিপাসা সামান্যতমও কমেনি। তার নতুন লক্ষ্য বরফে ঘেরা তিব্বত, সেখানে শিখতে চান লামাদের জাদুবিদ্যার কৌশল। সভ্যতার বয়স বাড়লেও আদৌ তার বয়স বাড়বে কীনা হয়তো তারও জানা নেই। তার কাছে গচ্ছিত আছে কিছু মূল্যবান সম্পদ। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। কীভাবে মৃত্যুকে জয় করলেন তিনি ?
ঢাকা শহরে আবির্ভাব ঘটেছে লুসিফারের আনুগত্য করা এক অদ্ভুত ব্যক্তির, যার লুসিফারকে খুশি করার জন্য দরকার রক্তের।নিজের স্বার্থ হাসিল করতে ক্রমে ক্রমে দল ভারী করছে সে। তার লক্ষ্য পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিমান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।এর জন্য নিজের গুরুকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। তার কাছে রয়েছে অদ্ভুত এক বই !
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বিখ্যাত ব্যবসায়ীর চুপচাপ মায়াময় স্বভাবের ছেলে শামীম, মানসিক যন্ত্রনায় আচ্ছন্ন যার মন। তার অন্তরঙ্গ বন্ধু বলতে আছে শুধু রাশেদ আর লিলি। কোনো এক মাঝরাতে রাশেদের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সে। দিন দুয়েক পরেই নিঁখোজ হয়ে যায় ।রাশেদের ঘরে থেকে যায় তার ব্যাগ।সেখানে আছে বিশেষ কিছু ! কিছুদিনের মধ্যে তার মুন্ডুহীন লাশ পাওয়া যায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর থেকে। কে মেরেছে তাকে? সন্দেহের তীরে বিদ্ধ হয় রাশেদ। রাশেদ কি পারবে সত্য প্রমান করতে? সে কি পারবে শামীমের খুনিদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে? তার হাতে আছে শামীমের দেয়া মুল্যবান সম্পদ, যার মুল্য সে নিজেও জানে না।
এশিয়া মহাদেশের আনাচে কানাচে ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা প্রত্নতাত্ত্বিক ব্রিটিশ গবেষক ড. কারসন বাংলাদেশের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কোনো এক রহস্যের খোঁজে। পুরাকীর্তি বিভাগের নিমন্ত্রণে এদেশে আসলেও তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। বড় বড় শহরে ছোট ছোট কান্ড ঘটতেই থাকে,এর সব কান্ড মিলে সৃষ্টি হয় মহাকান্ড ! তিনিও খুঁজে চলেছেন এক অব্যক্ত ইতিহাস,যা বদলে দিতে পারে জীবনকে।
★পাঠপ্রতিক্রিয়া :
লোভে পাপ,পাপে সাম্ভালা। কথাটা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সাম্ভালার খোঁজে রয়েছে কিছু লোভী পথিক। তবে সাম্ভালাকে কি লোভীরা খুঁজে পায়? সাম্ভালা বইটা শুরু করার প্রায় ৭০+ পেইজের পরেই পাঠক বুঝে যাবে সাম্ভালা কি? খুনের রহস্য দিয়ে শুরু হওয়া গল্পটির প্রথম দিকে ধীর গতি লাগলেও লেখকের লেখনী আপনাকে আটকিয়ে ফেলতে বাধ্য। সাম্ভালা বিশাল পরিধির কাহীনি আর সাম্ভালা ট্রিলজির প্রথম অংশটাকে বলতে পারেন ট্রেইলার। এই পর্বেই লেখক সাম্ভালার রহস্যকে ঘনীভূত করেছেন। ইতিহাস আর সময়ের পাশাপাশি চলার পরেও কলিশন দেখা না পাওয়ার দিকটা আমার ভালো লেগেছে। মনে হচ্ছিল আমি সময় ভ্রমণ করতে গিয়ে সময় চক্রে ফেঁসে গিয়েছি। কখনো হারিয়ে গিয়েছি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সাথে, চলে গিয়েছি ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই এর সাম্রাজ্যের অলিতেগলিতে আবার ফিরে এসেছি গ্রামে, গ্রামের চিরায়ত সৌন্দর্য করেছে মুগ্ধ , ফেঁসে গিয়েছি রাজধানীর যান্ত্রিকতায় , কখনো চলে গিয়েছি রাণী শেবার নগরে, গভীর চক্রান্তের অন্তিম পর্যায় স্বচক্ষে দেখতে। হঠাৎ করেই যেনো ফিরে এসেছি আবার চিরচেনা টিএসসিতে। কখনো আবার ঢাকার রাজপথে হেঁটে বেড়িয়েছি একা একা। আলাদা টাইমলাইনের কাহীনিগুলো একই সাথে এগোনোর ফলে দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে সুবিধা হলেও কিছু ঘটনা কাকতালীয় লেগেছে।মনে হয়েছে না থাকলেও তেমন অসুবিধা লাগতো না। লেখকের সুন্দর বর্ননার ফলে ছোটখাটো প্লটহোলগুলোকে তেমন চোখে পড়েনি। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে ফিজিক্সের সূত্র কাজ করেনি। গল্পের পরিসমাপ্তি পাঠকের মনে সাম্ভালা যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন রেখে যাবে। গল্পটা কয়েকটা টাইম লাইনে এগিয়েছে,ইতিহাস বর্নিত হয়েছে প্রচুর, তবে ইতিহাসগুলো যদি লেখক কল্পনার মিশেলে দারুনভাবে উপস্থাপন না করতেন তবে তা হয়তো কিছুটা বিরক্তির কারন হয়ে দাঁড়াতে পারতো।
পার্সোনাল রেটিং :৪.৫০/৫.০০
★ সাম্ভালা দ্বিতীয় যাত্রা-
ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছে সে,তার ঠাই হয়েছে অজানা এক দ্বীপে। তার নাম মিচনার,পর্তুগিজ শত্রুদের থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়েছে অজানার উদ্দেশ্যে। স্বপ্নে অদ্ভুত কিছু দেখার পরই তার মনে জেগেছে অদ্ভুত কিছুর আশা। নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে অনুভব করতে পারে সে। মিচনার খুঁজে চলেছে হাজার বছর ধরে হেঁটে চলা এক পরিব্রাজককে। পাকাপোক্ত প্রতিপক্ষ! কথাটা ভাবতেই আনন্দ লাগে তার। রক্তের নেশায় মাতোয়ারা হয়ে সে ছুটে চলেছে লক্ষ্য পূরনের উদ্দেশ্যে।
ড.আরেফিন যুক্ত হবেন ড. কারসনের সাথে। তাদের সাথে আরও যুক্ত হবেন প্রফেসর সুব্রামানিয়াম প্রভাকর, সন্দীপ চক্রবর্তী। তাদের সাথে গাইড হিসেবে রয়েছে সুরেশ। তাদের লক্ষ্য কি তা তাদের কাছেও ধোঁয়াশার মত। আরেফিন যেনো কোনো রহস্য তার জামার আস্তিনে লুকিয়ে রেখেছেন। তাদের অভিযান পৃথিবীতে কি কোনো প্রভাব ফেলবে? অনিশ্চয়তার মিশনে নেমেছেন তারা। বিপদসংকুল পথে এগোতে হবে তাদের। তাদের অভিযানের শেষ কোথায়?
তার আর কোনো পিছুটান নেই।মায়া বড্ড ভয়ানক জিনিস । তাই এই জগতের মায়া ত্যাগ করেছেন অতিদ্রুত। নিজের নাম পরিবর্তন করে মুছে ফেলেছেন সকল অতীত। তার একমাত্র লক্ষ্য হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাপূর্ন তিক্ত ভ্রমনের ইতি টানা। ভারতবর্ষে আগমণ ঘটেছে তার,এবার জীবন বাজি রেখে হলেও এই ভ্রমনের ইতি টানতে হবে? পারবেন তো?
রাশেদ যেখানে বিপদ সেখানে। এবারেও তার উলটো হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার তাগিদে ভ্রমণ সঙ্গী রাজুকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো বান্দরবানে।পাহাড়ে আর সবুজ গাছপালায় ঘেরা ভূমিতে ঘুরে বেড়াতে গিয়েই দুর্ভাগ্যের ফসল হিসেবে বন্দি হলো মাদকচোরাকারবারিদের হাতে। সেখান থেকে সে পালালেও বন্দী রয়েছে রাজু। সে দ্বিতীয়বার আর কোনো বন্ধুকে হারাতে নারাজ। তার হাতে রয়েছে এক গুপ্তধনের নকশা, যার লোভ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।সে কি গুপ্তধনের লোভের জলাঞ্জলি দিবে নাকি বন্ধুকে বাঁচাবে?
★ পাঠপ্রতিক্রিয়া :
একটি যুদ্ধে জয় অর্জনের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রতিটি পদে পদে সাজানোর আগে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, দ্বিতীয় পর্ব হচ্ছে ঠিক তেমন।থ্রিল ভাবটার চাইতে অভিযান বেশি হওয়ার দিকটি বেশ যুতসই লেগেছে।চারটি কাহিনি একসঙ্গে এগিয়েছে, যা একটি আরেকটির সাথে জড়িত। আগের পর্বের চাইতে এই পর্বে আছে বেশ কিছু ক্লিপহ্যাঙ্গার। তবে রাশেদের সাব প্লটের কাহীনিটা একটু মনে রেশ রেখে গেছে। একটা শক্তিশালী নায়ক ততক্ষণ পর্যন্ত স্বার্থকতা পায় না,যতক্ষণ না পাকাপোক্ত খলচরিত্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়। খলচরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।এই পর্বে হাজার বছর ধরে পরিভ্রমণ করা ব্যক্তির বেশ কিছু ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে। মিচনার চরিত্রটা এই পর্বে সব চাইতে দারুন ছিল তার কাজের জন্য। পুরো দ্বিতীয় পর্ব জুড়ে চরিত্রের উন্নয়নই বেশি ছিল।যার ফলে কিছু অধ্যায়ের গতি মাঝেমধ্যে সামান্য মন্থর হয়ে গেছে আমার কাছে।তবে সবচাইতে দারুন ব্যাপার হলো, লেখক তার লেখনীর জাদুতে আর গল্পের খাতিরে পাঠককে গল্পের শেষে নিয়ে যেতে দারুন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।ট্রিলজির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পর্বগুলোতে গল্পগুলো চরিত্রের আর কাহীনির উন্নয়ন এর খাতিরে সামান্য পানসে হয়ে আসে। তবে এই গল্পে তেমন হলেও ক্লিপহ্যাঙ্গার এর দারুন ব্যবহার এর ফলে পাঠকে অতি সহজেই তৃতীয় পর্ব পড়তে বাধ্য হবে। এই পর্বে আগাম যুদ্ধের জন্য যে ঘুটি সাজানো হয়েছে,তার অপেক্ষাতেই পড়েছি সর্বশেষ পার্ট।
পার্সোনাল রেটিং : ৪.০০/৫.০০
★ সাম্ভালা শেষ যাত্রা :
ড. কারসন ছুটে চলেছেন তিব্বতের পথে। তাকে অসাধ্য সাধন করতেই হবে। হাজারো বাঁধা পেরিয়ে তিনি আজ সেই রহস্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। রহস্য উন্মোচন করেই কি তিনি থামবেন? নাকি এখনো অনেক কিছু দেখা বাকি। প্রফেসর সুব্রামানিয়াম প্রভাকর অভিযান থেকে অব্যাহতি নেয়ায় তার স্থলাভিসিক্ত হয়েছে তার কন্যা লতিকা প্রভাকর। এদিকে ড. আরেফিনকেও আর পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেলেন তিনি। কেউ কি তাদের অভিযানকে থামাতে চায় নাকি প্রতিশোধের বশে ঘটে যাচ্ছে এমন কর্মকান্ড।
রাশেদও রাজুর সাথে এগিয়ে আসছে হিমালয়ের দেশে, তাকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে আরেফিনকে। কিন্তু রাশেদের জীবনে যে বিপদ থেমে থাকে না! কেউ ফিরে এসেছে,যারা চায় তাদের জীবনটাকেই শেষ করে দিতে। কি করবে রাশেদ? ভীতুর মতো পালাবে নাকি যুদ্ধ করবে?
তাদের গন্তব্য এক,কিন্তু উদ্দেশ্য ভিন্ন। তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একজন আলো হলে অন্যজন অন্ধকার। তারা দুজনেই এগিয়ে যাচ্ছেন তিব্বতের দিকে। একজন চায় মুক্তি, অন্যজন রাজত্ব। ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্য থেকে তারা এগোচ্ছে একই দিকে। ভালো আর মন্দ শক্তির এ লড়াইয়ে জয় কার? আলো আর অন্ধকারও কিন্তু একে অপরের পরিপূরক! তাদের দুজনের যুদ্ধে জয় কার?
লুসিফারের সাধকও পিছিয়ে নেই। শত্রুকে দমন করতে সেও এগিয়ে চলেছে সাম্ভালার পথে।হিংস্রতার মুখোশ অতিদ্রুতই সে উন্মোচন করবে। নিজের স্বার্থ হাসিল আর প্রতিশোধের আগুন যেনো তাকে দিচ্ছে অতিমানবিক শক্তি। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।
★ পাঠপ্রতিক্রিয়া :
সাম্ভালায় শুরু হয়েছিল রহস্যের ঘনীভূত হওয়া,দ্বিতীয় যাত্রায় এসে হলো কেন্দ্রীভূত। শেষ যাত্রায় রহস্যের বিক্রিয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, জানার জন্য প্রথমেই বলব সাম্ভালা বিশাল পরিধির বই। ভালো মন্দ সব মিলিয়েই সাম্ভালা। শেষ পর্বের সবচাইতে বিস্ময়কর দিকটি হলো সাম্ভালা আসলে কি তা শিক্ষা দেয় একবারে শেষের দিকে। পুরোটা বই পড়ার পর আমি উপলব্ধি করেছি,সাম্ভালা আসলেই কি এতটা দূরে অবস্থিত , নাকি মানুষ এর মাঝেই সাম্ভালা বিরাজমান। লেখক সাম্ভালা ওরফে সুখ আর অমরত্বের আসল সন্ধান কোথায় তা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা আসলেই দারুণ। ভালোবাসার কাছে অমরত্বও হার মানায়। হয়তো অনেকে বলবেন তার মানে কি সাম্ভালার খোজ পাওয়া যায়নি? এখানেই তো আসল মজা। লেখক গল্পের ইতি টেনেছেন প্রশ্নবিদ্ধভাবে। যেনো শেষ হয়েও হইল না শেষ। প্রথম দিকে যদিও ভেবেছিলাম এত বিশাল পরিসরের বইয়ে আরো কিছু পেইজ বাড়লে কি বা ক্ষতি হতো।এরপর উপলব্ধি করলাম, কিছু অপূর্ণতা থাকুক না। শেষ যাত্রায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর পাবে পাঠক। প্রতিটি চরিত্রই ন্যায্য কারনে আসলেও নারী চরিত্রদের আরেকটু ফোকাস করা যেতো। বিশেষ করে যে নতুন খলচরিত্রের সাথে পরিচিত হলাম এই যাত্রায়,তাকে আরো সময় দিলে মন্দ হতো না। পুরো বইটিতে কিছু অধ্যায়ের উপস্থিতি না থাকলেও ভালো লাগতো। জানেন? আমার উন্মোচিত রহস্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার অপরুপ সৌন্দর্য দেখার খুব ইচ্ছে ছিল অনেক সময় ধরে, তবে লেখক তা দেননি। হয়তো একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন আমাদের, যে সব সৌন্দর্য দেখারই বা কি প্রয়োজন! তবে হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট বিষয়টা আরো বিস্তারিত হলে আরো দারুন লাগতো। তবে নামটাই যেখানে, সাম্ভালা,সেখানে নামের প্রকৃত অর্থ খুঁজতে গিয়েই যে এমন হয়েছে তা ভালোই বুঝেছি। গল্পে এটার দরকার ছিল। স্বর্গ আর নরকের মতো সাম্ভালাও তো মানুষের মনেই বিরাজ করে।তবে সাম্ভালাকে খুঁজতে হলে হতে হবে পাপমুক্ত।
পার্সোনাল রেটিং: ৪.৮০/৫.০০
শরীফুল হাসানের সাম্ভালা বাংলাদেশে ফ্যান্টাসি জনরার মাইলফলক। থ্রিলারের মতো এ জনরাও এগিয়ে চলেছে অতিদ্রুত। আমাদের দেশে জনপ্রিয় এই জনরাকে পরিচিত করার জন্য যারা সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন তাদের মাঝে শরীফুল হাসান অন্যতম। বাংলার পাঠকসমাজ তাকে সাম্ভালার জন্যে মনে রাখবে। প্রথম বই হিসেবে এতোটা অভাবনীয় সাফল্য আসলেই দারূন ব্যাপার। যারা বইটা পড়েছেন বা পড়বেন সবাই সাম্ভালার যাত্রাপথেই হারিয়ে যাবেন না,সাম্ভালা আসলে কি, কেন এর প্রয়োজন এর মর্মার্থ উন্মোচন করুন আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া সুখ আর অসুখের স্মৃতির কথা ভেবে। বইটা শুরু করার সময় ভেবেছিলাম কখন যে শেষ হবে,আর শেষ করার পর ভাবলাম কেন শেষ হলো এত দ্রুত।
মিচেনার,কারসন,লখানিয়া সিং, আরেফিন,আকবর আলী মৃধাচরিত্রগুলো বেশ মনে ধরেছে। তবে লখানিয়া সিং চরিত্রে আরেকটু গভীরতা থাকলে ভালো হত,অন্তত আমার কাছে এমন মনে হয় কারন চরিত্রটি আমার কাছে বিশেষ কিছু। রাশেদ আর রাজুকে দেখার পর ' রেইনকোট ' গল্পের কলিমদ্দি দফাদারের কথাই প্রথমে মনে পরে,যে প্রথমে ভীতু থাকলেও গল্পের শেষে সাহসী হয়ে ওঠে।রাশেদ আর রাজুকে কখনো মনে হয়েছে ভীতু আবার কখনো সাহসী। লেখকের নাটকীয় উপস্থাপনের জন্য পুরো অভিযানটাই কল্পনা করা গেছে,তবে লাস্টে আরো কিছু তথ্য যদি বিস্তারিত থাকতো তাহলেও মন্দ হতো না। এই গল্পে নির্দিষ্ট কোনো নায়ক নেই,সময়ে অসময়ে চরিত্রগুলোর মাঝে কে নায়ক আর কে খলনায়ক তা মারাত্মক ভাবে ফুটেছে। আমি প্রায় অনেক আগে সাম্ভালা অখন্ড পড়েছিলাম, যেখানে বানানে ভুল বিদ্যমান ছিল। এরপর এলো সাম্ভালা লিমিটেড এডিশন ,আর এখন সাম্ভালার ট্রিলজি প্রকাশ পেয়েছে অন্যধারা থেকে।আশা রাখি নতুন এডিশন অতীতের সকল ভুলকে ফুল হিসেবে তুলে ধরেছে।
অন্যধারার প্রচ্ছদ তিনটির বিশেষ দিক হলো, প্রচ্ছদ দেখেই এটা যে মিথ আর অভিযান এর গল্প তার ধরনা পাওয়া যায় সূচালো ভাবে। বইয়ের দিক তাকালে রাজকীয় ভাব লক্ষণীয়। হিন্দু মিথলজির দারুন একটা ভাইব পাওয়া যায় প্রচ্ছদে।তবে বক্সটায় যদি লাল রঙের স্যাচুরেশন আরেকটু কমানো যেত তবে ভালো লাগত।যতদুর দেখেছি,বলতে হবে প্রোডাকশন টপনোচ।
পরিশেষে, ভালো মন্দ মিলিয়েই মানুষের জীবন। যা যত জনপ্রিয়, তার থেকে তত মানুষের আশা। মানুষ বাঁচে আশায় আর সাম্ভালাও কিন্তু আশার কথাই বলে। আশা রাখি শরীফুল হাসানের মত লেখকদের হাতে ধরেই আমাদের সমাজ এগিয়ে যাক এই কামনাই করি।
বইয়ের নাম: সাম্ভালা
প্রকাশনি : অন্যধারা
লেখক: শরীফুল হাসান
জনরা : ফ্যান্টাসি / মিথ/ এডভেঞ্চার / থ্রিলার