কবির মুখে সৃষ্টিশীলতার পরশ আছে৷ প্রাপ্তির সুখ আর অপ্রাপ্তির বেদনার বলিরেখাও দীর্ঘ। বহুবছর পেরিয়ে এসে কবির মুখে শ্রান্তির চিহ্ন দেখা দিয়েছে।নিজেকে যতটুকু মেলে ধরেছেন, ভ্রান্তির অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তাতে প্রশংসা পাওয়ার দাবি করতেই পারে 'কবির মুখ'-এর রচয়িতা আল মাহমুদ।
'যেভাবে বেড়ে উঠি'কে যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখানে থেকেই শুরু 'কবির মুখ'৷
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে নামলেন এক যুবক। ঢাকা তখনও নিজেকে গুছিয়ে উঠতে পারে নি। অগোছালো ঢাকায় কবি হওয়ার বাসনায় পদার্পণ আল মাহমুদের। আশ্রয় জুটলো এক হোটেলে। চাকরি হলো 'কাফলা'নামে লুপ্ত হওয়া এক পত্রিকায়। কাব্যদেবির সাধক আল মাহমুদ। নতুন ঢাকার পত্তন হয়নি। ঢাকা মানে আজকের পুরাতন ঢাকা। এখানেই 'গাঁইয়া' আল মাহমুদের সাথে পরিচয় হলো নাগরিক কবিদের সাথে। শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমানরা ঢাকার কাব্যজগতের প্রাণপুরুষ। আল নিতান্তই নতুন পাখি।
শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরদের নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের আলোকে মন্তব্য রয়েছে আল মাহমুদের। কবি এবং কবিতা - এই দু'টিকেই আমরা অকবির দল অত্যন্ত ভিন্নদৃষ্টিতে দেখি। ব্যক্তিভেদে সেই চোখে যেমন থাকে অকৃত্রিম মুগ্ধতা ; তেমনি নিদারুণ অবহেলাও যে কবিতা আর কবিদের জন্য বরাদ্দ থাকে না একথা হলফ করে বলতে পারব না। আল মাহমুদের ভাষ্য পড়লে কবিতার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ এমনকি আগ্রহ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের কবিকূলের যেই সার্বিক চরিত্র আল মাহমুদের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে পূর্ণ করেছে তা পাঠকের জন্য আনন্দের নয়। কারণ কবিদের জগতের নীচতা, হীনতা এবং অপরকে অসম্মান করবার যে প্রবণতার উল্লেখ এই গ্রন্থে পাই তাতে পূর্বেকার ভালোভালো ধারণার সবই মাটি হয়ে যাবে।
এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দরতম এবং শক্তিশালী দিক কবির অকপটে বলে যাওয়ার ন্যূনতম ক্ষমতা। আত্মজীবনী লিখতে বসলে সবাই নিজের অজান্তেই পবিত্রতার এক প্রলেপ এঁকে দেওয়ার বৃথা প্রচেষ্টা চালান। নিজেকে প্রমাণ করতে চান শুদ্ধতমদের দলে। আল মাহমুদ নিঃসন্দেহে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। আল মাহমুদ এবং যৌনতা - যেন একে-অপরের পরিপূরক! নিজের কৈশোর থেকে নারীর সান্নিধ্যের সুযোগ। যৌবনের সোনালি সময়ে কাম ও প্রেমের অতীতের হাতছানির কথা আধো আধো বুলিতে স্মরণ করতে চেয়েছেন কবি। সব কথা মনে রাখতে চাননি। বলেওনি সকল ইতিবৃত্ত। তবুও বারবার তাঁকে কামের দোলাচলে পড়তে হয়েছে এই সত্যটাই ক'জন বিখ্যাত বলবার সাহস রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় অবস্থান, ফিরে এসে জাসদের মুখপত্র 'গণকন্ঠ'র সম্পাদক হিসেবে যোগদানের ঘটনাকে টেনে বলে গিয়েছেন৷ জাসদ নেতৃবৃন্দের হঠকারিতার জন্যই 'গণকন্ঠ' বন্ধ হয়েছে। সম্পাদক আল মাহমুদকে একবছর কারাবাস করতে হয়েছে - এমন দাবি কবির।
ঢাকা জেলে এসে মনোভাবের আমূল পরিবর্তন। ধর্মের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি। এরপর আদর্শের জায়গাটি ধর্ম দখল করলো। মনে হয়নি আল মাহমুদ ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়বার আগেও কখনো মার্কসবাদে আস্থাশীল ছিলেন। বরং ধর্মীয় ভাবাদর্শই ছিল তাঁর প্রথম কোনো আদর্শে চূড়ান্তভাবে দীক্ষিত হওয়া।
কলকাতার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কিছু গভীর পর্যালোচনা আছে। তা হয়তো অনেকের ভালো লাগবে না পড়তে। যেমনটি আনন্দ দেবে না পশ্চিমবঙ্গ বনাম বাংলাদেশের সংস্কৃতির তুলনামূলক গভীর আলোচনা।
নিজের শিল্পকলা একাডেমিতে কর্মজীবন, কবিতার জগতে ভ্রমণের কথার পাশাপাশি অনেককে নিয়েই অনেকইকিছু লিখেছেন কবি আল মাহমুদ। সবকিছু গ্রহণ করার প্রয়োজন মনে করিনি। ইচ্ছে হয় নি কবি আল মাহমুদের সকল দাবি, কথা এবং বর্ণিত ঘটনাকে ফুৎকার দিয়ে উড়িয়ে দিতে।
কবিদের গদ্যে এক আলাদা, অনির্বচনীয় আস্বাদ পাই আমি। আল মাহমুদ নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রম নন।