পুনর্পাঠ
রক্তে নক্ষত্রের আগুণ নিয়েই ঢাকা চষে বেড়িয়েছেন সৈয়দ হক। আর দিনে দিনে সেই আগুণের তাপ শতগুণে ঠিকরে বেড়িয়েছে তার প্রবল ইচ্ছা শক্তিতে কতো না ধারায়। শুধু এই এক স্মৃতিকথা পড়লে বোঝা যায় ইচ্ছা শক্তি আর তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মানুষ কোথায় না পৌঁছাতে পারে! সেই ১৯৪৮ ঢাকায় ক্লাস নাইনে পড়তে আসলেন, ডেরা করলেন লক্ষ্মীবাজারে-ঠিক যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির আনন্দ দেশ জুড়ে- মানুষের মনে নতুন দেশ আর নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কেমন এক ঘোর লাগা সময়- স্বাধীনতার সময়। কতো কিছু যে তখন প্রথম, আর তাই কত তরুণের কাঁধে তখন প্রৌঢ়ের দায় আর আকাশ ছোঁয়ার প্রেরণা। সৈয়দ হকের স্মৃতির সেলুলয়েডে দেখা যায় পঞ্চাশের পুরো একটি দশকে- ঢাকা আর ঢাকার স্বপ্নচারী কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রকাশক, শিল্পী, বই, বইয়ের দোকান, খানা-পিনা, রেস্টুরেন্ট, দাপিয়ে বেড়ানো ঢাকার অলিগলি এমনকি বোম্বের রুপালী জগত। কোন রকমের পূর্বনির্ধারিত ছকে না বেঁধে বরং স্মৃতি আর স্মৃতির স্রোতে ভেসে-গুড়িয়ে ঢাকা আর ঢাকার মানুষের টুকরা টুকরা ছবি। হালকা সুরে হলেও আঁচ পাওয়া গেছে পাকিস্তান প্রাপ্তির প্রাথমিক সুখ- যা কিনা ছিল পূর্ব বাংলার মুসলমানের যৌক্তিক দাবী, একটা সফল রাজনৈতিক প্রকল্প এবং শেষমেশ সফলভাবে বাস্তবায়িত একটা প্রকল্প। আবার অল্প দিনেই পাকিস্তান নামক এক কিম্ভূতকিমাকার রাষ্ট্রে বাঙালী মুসলমানসহ সমগ্র বাঙালী জাতির গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। খেয়াল রাখতে হবে এটা সৈয়দ হকের লেখক হবার বয়ান, শুধুই লেখক হবার প্রবল ইচ্ছার বয়ান। এই বয়ানে অনায়াসে উঠে এসেছে কতশত সম্পর্ক! আবার নিজের চরিত্রের খামতিগুলোও কবুল করেছেন পাঠকের সামনেই। অল্প বয়েসে শুধু লেখক হবার প্রবল ইচ্ছায় যে আরেকজন গল্পকারকে অনুকরণ করেছেন তাও অকপটে স্বীকার করেছেন। কারণ, সবাই দেবদূত হয়ে জন্মায় না। বরং হয়ে উঠতে হয়। ধীরে ধীরে পাখা গজায়। তারপর, সবচেয়ে কাছের অগ্রজসম বন্ধু ফজলে লোহানি, যে বোহেমিয়ান-উদ্দাম লোহানি সৈয়দ হকের প্রেরণা, উপদেষ্টা, খানাপিনা সঙ্গী, যে কিনা হাতে ধরে তাকে শিখিয়েছেন কত কিছু-সেই লোহানির চরিত্রের খামতিগুলোও এড়িয়ে যাননি। তাই এই স্মৃতি লেখন এতটা অন্তরঙ্গ-অকপট। অ-কপট সোজাসুজি উদ্দাম অথচ স্নিদ্ধ তিন পয়সার জ্যোছনা।