চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রৌমারির কোনো টং দোকানে বসে আছে অদ্ভুত চারটি মানুষ। রাতের এই অমানিশায় সময় যেন কাটছেই না। সাঁঝের আলো ফোটার আগে খুলে বসল তারা গল্পের ঝাঁপি। এরপর...গল্পগুলো ফুরালো, শুরু হলো তাদের উত্তরের পথে যাত্রা। গল্পকথক সেই যাত্রার সূত্র ধরে একে একে ঘুরে ফেলল রৌমারি, কুড়িগ্রাম, রংপুর, সৈয়দপুর, দিনাজপুর সর্বোপরি ঠাকুরগাঁও। গল্পটা উত্তরের। সেই গল্পের সাথি ছিল হাদি, ইসমাইল, রাফি আর গল্পকথক নিজেও। এখানেই কি গল্পের শেষ! নাহ, মাত্র তো অর্ধেক পথ পাড়ি দিলো গল্পকথক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্বেষণে এবার পাড়ি দিলো সে উত্তর থেকে দক্ষিণে। এবার সাথি হলো বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ইমরান রশীদ খান। সেই আখ্যান শোঁনাতে গল্পকথক আপনাদের কাছে এসেছে। উত্তরবঙ্গের আছে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস। তো পাঠক দেরি কেন? শব্দের বুননে এবার তৈরি করা যাক উত্তরের পাঁচালি।
শেষ করলাম আমার প্রিয় জনরা ভ্রমণ কাহিনীর উপর আরেকটা বই "উত্তরের প্যাঁচালি"।যাযাবরের চোখে বাংলাদেশের পর আরেকটা সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী উত্তরের প্যাঁচালি।
পুরো বইটি উত্তরবংগের উপর।শেষে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের কিছু বর্ণনা রয়েছে ঠিক ই বাট পুরো বইটির মূল থিম ছিল উত্তরবংগ ভ্রমণ নিয়েই।হ্যাঁ আমাদের চিরপরিচিত সেই উত্তরবংগ যা শুনলেই মনে পড়ে হিম হিম ঠান্ডা আবহাওয়া,কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি।লেখক বইটিতে যেন আমার কল্পনাকেই যেন পুরোপুরি দুই মলাটের ভিতর নিয়ে আসছে।
দুইটি অধ্যায়ে বিভক্ত পুরো বইটা।একটা হল " উত্তরের পথে ঘাটে প্রান্তরে" এবং এই অধ্যায়ে পুরোপুরি উত্তরের জেলাগুলোর বর্ণনা,দর্শনীয় স্থান,ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।শুরু হয়েছিল কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজিলা থেকে।এরপর রংপুর,দিনাজপুজ,নীলফামারি হয়ে ঠাকুরগাঁও এ এসে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।সবচেয়ে জোস লাগছে সৈয়দপুরের বর্ণনা শুনতে এই অধ্যায়ে।দারুণভাবে সবকিছু তুলে ধরার জন্য লেখককের ধন্যবাদ প্রাপ্য।
পরের অধ্যায়টি হচ্ছে "উত্তর থেকে দক্ষিনের যাত্রা"। এই অধ্যায়টি তে চাপাইনবয়াবগঞ্জ থেকে শুরু করে রাজশাহী,মেহেরপুর,চুয়াডাংগা হয়ে কুষ্টিয়া তে এসে সমাপ্তি হয়েছে এবং বলা বাহুল্য প্রতিটি জেলার বর্ণনা ছিল দুর্দান্ত।তবে অধ্যায়টির সেরা পার্ট এটা ছিল না,ছিল রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কথা,মেহেরপুরের ইতিহাস।পুরো বইটির বেস্ট পার্ট ছিল এটিই। তবে বই শুরুর আগে আমার ৩ জেলার দর্শনীয় স্থান নিয়ে পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল সেই তিন জেলা হক বগুড়া,লালমনিরহাট এবং পঞ্চগড়।তবে আশা করি কোন একদিন এই তিন জেলার দুর্দান্ত বর্ণনা নিয়ে বই পাব একটা।
৫ স্টার দেওয়ার ইচ্ছে ছিল।কিন্থ শুধুমাত্র দিলাম না একটা কারণেই সেটা হচ্ছে সব জেলার ভ্রমণ কথা শেষ করার পর যাত্রা সম্পর্কে ছোট একটা ধারণা পরের পেইজে দিলে ভাল হত।যা লেখকের পূর্বের বই যাযাবরের চোখে বাংলাদেশের কিছু কিছু জায়গায় ছিল।যেমন ঢাকা টু রৌমারি অমুখ বাসে করে এইভাবে আবার রৌমারি থেকে কুড়িগ্রাম& কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর এভাবে।এরকম শর্ট ধারণা দিলে আমার মত ভ্রমণ পিপাসুদের পড়তে সুবিধা হত। বাট ওভারল দারুণ তৃপ্তিদায়ক এক বই।
'Man has the curiosity to know the unknown and see the unseen. Travelling is the best way to satisfy this curiosity.' নতুন কিছু জানতে, দেখতে কিংবা শেখার আগ্রহ থেকেই মানুষ ভ্রমণে বের হয়। বাঙালির ভ্রমণ সম্পর্কে জনপ্রিয় একটি কথা আছে সেটা হলো, বাঙালি ঘরের দরজা অতিক্রম করতে পারলেই অর্ধেক ভ্রমণ হয়ে যায়। কারণ বাঙালির ভ্রমণের প্রতি অনীহা বা পারিবারিক ঝক্কি-ঝামেলা যাই বলুন না কেন, ভ্রমণ সেই অর্থে সহজে হয়ে উঠে না। ইচ্ছা, সময় ও অর্থ ব্যাটে-বলে মেলাতে পারলেই ভ্রমণ সফলতা লাভ করে। অন্যথায় একই বৃত্তের মাঝে আমাদের জীবন কাটিয়ে দিতে হয়। তো যারা ভ্রমণ করতে পারছেন না তারা কীভাবে ভ্রমণের স্বাদ নিতে পারবেন? উত্তর একটাই; একজন ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা শোনা বা পড়া।
লেখক আশিক সারওয়ার বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ভ্রমণ করেছিলেন। সেই ভ্রমণের দুইটি অংশ ছিল। প্রথম ভাগে লেখক কুড়িগ্রামের রৌমারি থেকে যাত্রা শুরু করে রংপুর, দিনাজপুর হয়ে ঠাকুরগাঁও এসে থেমেছেন। উত্তরবঙ্গে ভ্রমণের সময় লেখক দেখেছেন প্রকৃতির নিসর্গ ছবি, অবলোকন করেছেন মানুষের জীবন। পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া নদীর দশা যেন পাঠকের মনেও পীড়া দেয়। বাংলাদেশের নদীগুলো দিন দিন মরে যাচ্ছে, তারই একটি নমুনা জিঞ্জিরাম নদীতে দেখা যায়। কুড়িগ্রাম থেকে লেখক এসেছেন বাহের দেশ রংপুরে। বিখ্যাত কারমাইকেল কলেজ দেখার পর তাঁরা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মস্থানে এসে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে বাড়িঘরের নিশানা কোনোরকম টিকে রয়েছে। এছাড়া তাজহাট জমিদার বাড়িতেও লেখক গিয়েছেন। সৈয়দপুরকে রেলওয়ে স্টেশনের শহর বলা হয়; পাঠ্যবইতে দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের নাম পড়ে থাকবেন, সেখানেও পদচারণা করেছেন লেখক ও তাঁর বন্ধুরা। সেখান হতে চলে গিয়েছেন ঠাঁকুরগাঁও এবং সেখানে সীমান্তের চা বাগানও দেখা হয়েছে তাদের। এখানেই রয়েছে নাগর নদী, যা ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে পুনরায় ভারতে ফিরে গিয়েছে। নদীও যেন তার মন পালটে ফেলে!
ভ্রমণের দ্বিতীয় অংশে লেখক চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ভ্রমণ শুরু করে রাজশাহী, মেহেরপুর, কুষ্টিয়ায় গিয়ে থেমেছেন। মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় ভ্রমণের মাধ্যমে লেখকের ৬০ টি জেলা ঘোরাঘুরি সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এপ্রিলের কাঠফাটা গরমের মাঝে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গিয়ে তাদের বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে । এবার লেখকের সঙ্গী হয়েছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাঁকে নিয়ে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে প্রবেশ করতে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল এবং পরে প্রবেশ করে যে সম্মান পেয়েছিলেন তা আনন্দের বিষয়। এখানেই দেখা হয় তিন মাস্কেটিয়ার্স খ্যাত তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে। উনাদের থেকে ঐ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনেন এবং পাঠকও সেই গল্পে শিহরিত হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মেহেরপুর জেলা। মুজিবনগরে ভ্রমণের সময় লেখকের সাথে পাঠকেরাও মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতিবিজড়িত স্থানে পা রাখবে। এরপর কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ভ্রমণ শেষ।
ভ্রমণকাহিনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো একইসাথে ঐ অঞ্চলের ইতিহাস, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ননা ও ভ্রমণকারীর চোখে এলাকাগুলোর জীবন-চিত্র ফুটে উঠে। কথা প্রসঙ্গে অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। ভ্রমণকারীর চোখে দেখা যায় প্রকৃতিকে। এই বইটির সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো লেখক যে জায়গাগুলো ভ্রমণ করেছেন তার সাথে প্রাসঙ্গিক ইতিহাসগুলো তুলে ধরেছেন এবং দর্শনীয় স্থানগুলোর ছবি বইটিতে যুক্ত করে দিয়েছেন। এই জায়গাটাতে লেখক ভ্রমণ গাইডের মতো দারুণ কাজ করেছেন। বইটি পড়লে নতুন জায়গা ও তার ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বইটির নাম আসলে কোনটা সঠিক? প্রচ্ছদে লেখা 'উত্তরে প্যাঁচালী' অথচ বইয়ের ভেতরে লেখা 'উত্তরের পাঁচালি'। একটি বইয়ের নাম নিয়েই এমন ভুল অবশ্যই প্রকাশনীর অবহেলা। দ্বিতীয়ত লেখক কিছু কিছু জায়গায় স্থূল কৌতুক করেছেন যা আমার ভালো লাগেনি এবং বন্ধুদের এমনিতে নিজেদের সার্কেলে যে নামেই ডাকুক কিনা বইয়ের পাতায় তাদের 'হাতি-ঘোড়া' সম্বোধন সমীচীন মনে হয় নি। আবার ঝোপ ঝাড়ের ব্যাপারগুলাও ঠিক মানানসই না। সচরাচর যেমন ভ্রমণকাহিনী পড়ে থাকি এটা তার চাইতে ব্যতিক্রম ছিল কারণ এখানে ইতিহাসটাই বেশি রয়েছে। হ্যাপি রিডিং।
রবি ঠাকুরের এই কবিতার চার লাইন যেন আমাদের সবারই মনের আক্ষেপ। যেন সবকিছু দেখেও দেখা হয়নি আমাদের কিছু। সবই যেন আবার সেই অদেখাই রয়ে গেলো। তেমনই সফর শেষ হলেও পথ শেষ না হওয়া নিলে লেখক আশিক সারওয়ার এর লেখা 'উত্তরের প্যাঁচালী'।
লেখক সময় পেলেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান এই বইটা ঠিক তারই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। মূলত তিনি দেশের উত্তরাঞ্চল হতে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণে এসে যাত্রার যে সমাপ্তি টেনেছিলেন তারই বিভিন্ন স্মৃতি উঠে এসেছে 'উত্তরের প্যাঁচালী' বইতে। যাত্রা শুরু হয় ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি থেকে যেখানে আমাদের বড়াইবাড়ি বিজিবি ক্যাম্প দখল করতে বিএসএফ ঢুকে গিয়েছিলো বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে। তুমুল যুদ্ধ হয়েছিলো সেসময় এই এলাকাজুড়ে। এখান থেকেই যাত্রা শুরু এরপর লেখক তার তিন সঙ্গীর সাথে ঘুরে বেড়ান রৌমারি ঘাট,কখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা কারমাইকেল কলেজ,কখনো তাজহাট জমিদার বাড়ি। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে বাহের দেশের ভ্রমণ শেষ হয় তাদের।
এরপর শুরু হয় আরেক যাত্রা যার শুরু হয় রেলওয়ের শহর সৈয়দপুর হতে। সেখানে টুকরো কিছু ভ্রমণের পর সর্বশেষ সৈয়দপুরের বিখ্যাত চিনি মসজিদ দেখার। ধীরে ধীরে যাত্রা বদলে যেতে থাকে ধুলোজমা পথ পাড়ি দিয়ে কখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো স্থাপনার দিকে কখনোবা অবহেলায় পড়ে থাকা কোনো স্থাপনার ভগ্নাবশেষের দিকে।
এভাবেই যাত্রা আস্তে আস্তে আসে দিনাজপুর তারপর পথ ধরে রাজশাহীর। বলে রাখা ভালো রাজশাহীর এই পার্ট টা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল বলতে গেলে লেখকের মত পাঠকেরাও গল্পে ডুবে যাবেন। এবং রাজশাহীর পর লেখক আবার যাত্রা ধরেন দক্ষিণের যা মেহেরপুর মুজিবনগর ঘুরে আলমডাঙা বধ্যভূমিতে এসে ইতি টানে।
বইতে যেই জিনিসটা সবথেকে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে লেখক ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সাথে সংক্ষেপে সেখানের তথ্য দেবার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই বইয়ের সাথে যাত্রা করতে করতে আর টুকরো টুকরো ইতিহাস জানতে জানতে বইয়ের পৃষ্ঠাও শেষের দিকে চলে আসতে থাকে। একসময় দেখি ৯৬ পৃষ্ঠায় চলে এসেছি। আরো জানার ইচ্ছা থাকলেও বই আর জানাতে চায়নি। আর বেশিদূর এগোয়নি। হয়ত আবার নতুন কোনো যাত্রা নিয়ে এগোবে।
এই বইটা পছন্দের আরেকটা দিক হচ্ছে এর সম্পাদনা। ভেতরে সম্ভবত শেষের দিকে 'দিয়েছেন' কে 'দিয়েছেম' লেখা হয়ছে। এ বাদে আরেকটা বানান ভুল বা টাইপো চোখে পড়েনি। অত্যন্ত আরাম নিয়ে পড়তে পেরেছি 'উত্তরের প্যাঁচালী'। শেষ করে বলতেই হয়েছে খুব যত্ন নিয়ে বইয়ের ভেতরেও কাজ করা হয়েছে তবে একটা জায়গায় একটু অযত্ন হয়ে গেলো মনেহয় সেটা হচ্ছে বইতে সংযুক্ত করা ভ্রমণের বেশ কিছু ছবি। সাদাকালো হওয়ায় ছবিগুলো দেখে আরাম পাইনি কেন যেন। পিছনে দুই তিনটা পৃষ্ঠা এড করে যদি কালার ছবি দেয়া হতো আরো উপভোগ করতাম কেননা নদীর ছবি প্রকৃতির ছবি এগুলো সাদাকালো দেখে পোষায়না।
ভ্রমণ কাহিনী কার না পছন্দ? শীতের সকালে এককাপ চায়ের সাথে উত্তরের প্যাঁচালী নেহাৎ মন্দ নয়।
এই সবুজ শ্যামল দেশটা প্রেমিকার মতো শতবার দেখার পরও সামান্য অন্তরাল হলেই মনে হয় হাজার হাজার বছর ধরে তোমায় দেখা হয়নি দুচোখ ভরে। এ কথা চিরসত্য। নিজ শেকড়ের তৃপ্তি, চঞ্চল মনের স্থবিরতা শুধু প্রকৃতির ডাকই আনতে পারে। কর্মচঞ্চল জীবনে একটু শান্তির পরশ পেতে খোলা প্রকৃতির মাঝে মিশে যাবার ইচ্ছে সবার মধ্যেই দেখা যায় । অচেনাকে চেনা ও অজানাকে জানার জন্যই তো মানুষ বেরিয়ে পড়ে। তেমনি এক ভ্রমণ গল্প “ উত্তরের প্যাঁচালী”।
উত্তরের প্যাঁচালী নিছক কোন গল্প নয়। উত্তরের পথে আমাদের দুর্নিবার ছুটে চলার এক পশলা সুখস্মৃতি। কোনো মলিন দিনে সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণে নস্টালজিক হয়ে যাওয়া। পুরো বইটিতে আদতে দুটো গল্প রয়েছে। “ উত্তরের পথে ঘাটে প্রান্তরে” ও “উত্তর থেকে দক্ষিণের যাত্রা”। বইটিতে “রৌমারির ভ্রমণ ” গল্প দিয়ে শুরু হলেও বিস্তীর্ণ হয়েছে পুরো দক্ষিনাঞ্চল। পুরো বইতে একে এক বর্ণনা করা হয়ে দিনাজপুর, নিলফামারীর, রাজশাহীর ক্যাডেট কলেজ, মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প। বিজিবির ক্যাম্প সহ নানা তথ্য। কখনও বাসের ভ্রমণে, কখনও পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাবেন লেখকের সাথে আপনিও সে সমস্ত জায়গায়। কালক্রমে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সভ্যতা বা কোন অবহেলিত স্থান গুলো কল্পনায় ভেসে উঠবে নিজের অজান্তেই। কখনো কখনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল, কখনো ঐতিহ্যের ধারক-বাহক, কখনও প্রকৃতির আপন খেয়ালে বড়ো হয়ে আজও ইতিহাস সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা রুপকথার গাছ। আপনার জীবনানন্দ দাসের "আবার আসিবো ফিরে" দরাজ গলায় আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করবে।
আবার আসিবো ফিরে….. হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিক নবান্নের দেশে, কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিবো এ কাঁঠাল ছায়ায় হয়তোবা হাঁস হবো……….!!
এখানেই কি গল্পের শেষ? নাকি লেখকের সাথে নিজেকেই জরিয়ে ফেলবেন উত্তরের এই পথের প্যাঁচালীতে??
পুরোনো এই বাড়ি, বুনো লতায় ঘেরা, দাঁড়িয়ে নির্জনে; পড়ছে খসে ছাদ, পলেস্তারা আর নকশা করা ইট; কে ছিলো এই বাড়ি-জানে না কেউ আজ, কারো তা নেই মনে; সেখানে বাস করে এখন ভূতপ্রেত, সর্প আর কীট।
শেষ করলাম আশিক সারওয়ারের লেখা ভ্রমণ কাহিনি ‘উত্তরের প্যাঁচালি।’ ভ্রমণ জনরার বইয়ের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই ধরনের বইগুলোতে কখনও একঘেযেমি আসে না। বয়সে তরুণ হলেও লেখকের অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃ্দ্ধ। চমৎকার বৈঠকি ঢঙে উত্তরাঞ্চল ভ্রমণের বিবরণ দিয়েছেন লেখক। উপরি পাওনা হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন স্থানের উল্লেখযোগ্য কিছু ছবি। লেখক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেও নিজের জ্ঞান জাহিরের কোনো প্রচেষ্টা নেই এই ছিপছিপে শরীরের বইটিতে। কিছু কিছু বিষয়ের বর্ণনা এতটাই চমৎকার আপনি আবেগাপ্লূত না হয়ে পারবেন না। বিশেষ করে বীরপ্রতীক কর্নেল আব্দুর রশিদ খানের মর্মান্তিক পরিণতি আপনাকে আবেগাপ্লুত না করে পারবে না। বিশেষ করে অদেখা পিতার স্মৃতির সন্ধানে পুত্রের করুণ আকুুতি হৃদয় ছুঁয়ে যাবে যে কারও। যারা ভ্রমণ বিষয়ক বই পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হতে পারে বইটি। উত্তর বঙ্গ সম্পর্কে বেশ ভালো একটা ধারণা পেয়ে যাবেন মুফতে অর্থাৎ ওখানে না গিয়েও। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন Abul Fattah Munna ভাই। প্রকাশক- নটিলাস।
আপনি যদি কখনো ভ্রমণ বই না পড়ে থাকেন। বা আপনি যদি মনে করেন যে ভ্রমণ বই মানেই গাদি গাদী তথ্য দেয়া কিছু তাহলে সেই ভুল ধারণা দূর করতে এবং ভ্রমণকে ভালোবাসতে আপনাকে পড়তে হবে আশিক সারওয়ার ভাই এর লেখা। মনেই হবে না আপনি ভ্রমণ বই পড়ছেন বরং আপনি স্বয়ং ঐ স্থানে আছেন এমন অনুভব হবে।
লেখক তার উত্তরে প্যাঁচালী বইতে তার উত্তর থেকে দক্ষিণে ভ্রমণের সব কিছু গল্পের মাঝে তুলে ধরেছে।শুরু হয় উত্তরের কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর,রংপুর থেকে সৈয়দ পুর , সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর এসে শেষ হয়। আর দক্ষিণের চাঁপাইনবাব গঞ্জ থেকে শুরু করে রাজশাহী যেয়ে শেষ হয়। এমন নয় যে এখানে শুরু ভ্রমণ গল্পটাই লেখক তুলে ধরেছেন বরং লেখক গল্পের মাধ্যমে ইতিহাসকে তুলে ধরেছে।