‘শীতকালে তখন মাঝে মাঝে দুপুরের খাবার খেতে ছাদে উঠতাম। উত্তরে গরমে গরম বেশি, শীতে শীত। নিচে তখন হাড় কাঁপে । দুপুরেও। ছাদে রোদ থাকলে সপ পেতে খাবারের আয়োজন...'
বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসে আবির্ভূত হওয়ামাত্রই পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছেন এমন গল্পকারের সংখ্যা হাতেগোনা। এই স্বল্পসংখ্যক গল্পকারের মধ্যে অন্যতম এক নাম আহমেদ খান হীরক। বিষয়বস্তু কিংবা বর্ণনাশৈলীতে তাঁর গল্প গতানুগতিক ধারার বাইরে অবস্থান নেয়। সূক্ষ্ম রসবোধ ছড়িয়ে তিনি পাঠককে টেনে নেন গল্পের গভীরে । প্রচলিত এবং অপ্রচলিত বিষয়ের ভেতর দিয়ে অনায়াসে তিনি পৌঁছে যান গল্পের চূড়ান্ত সীমায় । পাঠকের ভাবনায় থেকে যায় বিস্ময়ের অনুরণন ।
হীরকের জাদু-কলমে লেখা পঞ্চাশটি ছোটোগল্প আর অণুগল্প মিলিয়ে এই গল্পগ্রন্থ একটা রোদের গল্প । প্রতিটি গল্পই যেন ছড়াচ্ছে হীরকদ্যুতি ।
আহমেদ খান হীরকের জন্ম ১৯৮১ সালের ৮ নভেম্বর। এক যুগের লেখালেখির জীবনে প্রধান ক্ষেত্র বিভিন্ন পত্রপত্রিকা। বর্তমানে কর্মরত একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে।
প্রত্যাশা খুব বেশি ছিলো না। বইমেলায় পাঞ্জেরীর স্টলে দাঁড়িয়ে এ বইয়ের প্রথম দুটো গল্প পড়ে মনে হোলো বইটা কিনে ফেলা উচিত। কিনলাম। মাত্র ৯৬ পাতার বই। এতে আছে মোট ৫০টা গল্প যার বেশিরভাগের দৈর্ঘ্য এক পৃষ্ঠা বা তারও কম। কয়টা আর ভালো হবে? পড়া শেষ করে দেখি অসাধারণ গল্পের সংখ্যাই বেশি। এতো স্বল্প পরিসরে এমন চমক জাগানিয়া ও চিন্তা উদ্রেককারী গল্প লিখে ফেলা দুঃসাধ্য কাজ। গল্পকার আহমেদ খান হীরক সে কাজটিই করেছেন অনায়াস দক্ষতার সাথে।তার ভাষা সাবলীল ও দ্যুতিময়।লেখকের রূপক, শ্লেষ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে সমকাল ও মানবমনের বিচিত্র অলিগলি। "একটা রোদের গল্প" আরো অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছে যাক, এই শুভকামনা রইলো।
( বই থেকে পছন্দের একটা গল্প "এটা সম্ভবত একটা প্রেমের গল্প" সংযুক্ত করে দিলাম-
"নিজেকে বেচতে চললাম হাটে— কী নেই আমার! চোখ, কান, নাক, হাত, মাথা এবং আশ্চর্যজনকভাবে একটা হৃদয় ! নিলাম উঠল আমার। দশ বিশ পঞ্চাশ... হাজার লাখ কোটি... কী নেই আমার! মানুষের কাড়াকাড়ি... আমাকে নিয়েই! কোটি টাকা দিয়ে আমাকে কিনল অপরূপা সুন্দরী! অথচ আমাকে প্যাক করার আগেই ঘটল ছোট্ট দুর্ঘটনা। অনিন্দ্য সুন্দরীর কাছ থেকে আমাকে কিনে নিল ভোঁতা এক বিজ্ঞানী। দাম কোটিরও ওপর। সুন্দরীর মন ভেঙে গেল। হৃদয় তো ভাঙল আমারও। আমি তাই বিজ্ঞানীর কাছ থেকে আমাকে কিনে নিতে চাইলাম । কিন্তু এত দাম উঠে গেছে আমার... নিজেকে কেনার সাধ্য আর নাই!"
পঞ্চাশটি ছোট ছোট গল্প, বেশ প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। গল্পের বিষয়বস্তু সামাজিক স্যাটায়ার থেকে শুরু করে হররধর্মী পর্যন্ত। লেখকের গল্প বলার ভঙ্গি খুবই ক্যাজুয়াল। সহজ কথা সহজে বলতে পারা বিশাল গুণ। লেখকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর সূক্ষ্ম হিউমার গল্পগুলোকে উপভোগ্য করেছে। ভালো লেগেছে পড়তে।
৫০টা এক পাতার গল্প সংকলন। কিছু কিছু গল্প মনে রাখার মতো। যেমন— প্রতিমূল্য, চমকদার দাঁতের মাজন, আমরা সবাই রাজা, একটি অদেশি রূপকথা, সার্থকতা।
'প্রতিমূল্য' গল্পটা শৈশবের ঈদের কথা মনে করিয়ে দিল। তখন ঈদে একশ টাকা সালামি পেয়ে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী মনে করতাম। এত টাকা দিয়ে কি করব তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে করতে চিন্তায় পড়ে যেতাম। ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়ে আইসক্রিম আর সেভেন আপ খেতাম। পটকা আর বেলুন কিনতাম। ছোট ভাইদের জন্য লজেন্স কিনতাম। তবুও টাকা শেষ হতো না। আর এখন!
এ বছর ১০ টার মতো এক পাতার গল্প সংকলন নামে কিছু অখাদ্য পড়েছি। তবে আহমেদ খান হীরকের 'একটা রোদের গল্প' যথার্থ এক পাতার গল্প সংকলন।
আমাদের দেখা চিরচেনা ঘটনাগুলোকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করেছেন লেখক। যেহেতু লেখাগুলোর আকার বেশ ছোট তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। শুরুর দিকের কয়েকটা গল্প মুগ্ধ করে দিয়েছে। এক পাতার গল্প অথচ তার গভীরতা বিশাল।
আহমেদ খান হীরকের আগের বইটা পড়েছি। এত দারুণ গল্প আমি বহুদিন পড়িনি। স্বাভাবিকভাবেই এই বইটা আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। খুবই আকস্মিকভাবে বইমেলায় একটি কিশোরী আমাকে এই বইটা উপহার দেয়। বাসায় ফেরার পর মেয়েটার নাম মনে করতে পারছিলাম না, সেই কিশোরীকে আর খুঁজে পাইনি। বালিকা, তোমার জন্য ভালোবাসা।
এই বইটার গল্পগুলো খুবই ছোট। বেশিরভাগই প্রতীকিতে ভরপুর। আহমেদ খানের হীরকের মুন্সিয়ানা এখানেও অব্যহত।