ছোটোবেলা মানে ঠিক কী, বলুন তো?
ওই সময়টার অর্থ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পাল্টে যায়। কোথাও সুখের পাল্লা ভারি হয়, আবার কোথাও জেতে অসুখ। তবে একটা জিনিস একইরকম থাকে।
ছোটোবেলায় প্রচুর গল্প শোনা যায়!
রাজা ভট্টাচার্যকে আমরা ইতিহাস আর মহাকাব্যের অঙ্গনে স্বচ্ছন্দ পদচারণার জন্য জানি। গান, কবিতা, মায় বড়োদের জন্য লেখা সামাজিক গল্প-উপন্যাসেও তিনি গত কয়েকবছরে 'স্বীয় কীর্তির ধ্বজা ধরে' অগ্রসর হয়েছেন। কিন্তু ছোটোদের জন্য গল্প লেখার ক্ষেত্রেও যে তাঁর লেখনী একেবারে সোনায় বাঁধানো, সেটি আমার জানা ছিল না। সেটা জানতে পারলাম আলোচ্য বইটি পড়তে গিয়ে— যা এক ঝটকায় আমায় নিয়ে গেল নিজের গল্পময় ছোটোবেলায়।
এই বইয়ে যে গল্পগুলো আছে তারা হল~
১. গন্ধ;
২. শিমুলতলার শিউনারায়ণ;
৩. আশ্চর্য সেই টেলিফোন;
৪. কুয়োতলার চাঁদ;
৫. পোর্ট্রেট;
৬. অতীত;
৭. অরণ্য নিশীথ;
৮. ধাঁধা;
৯. সেই ভূত নেই ভূত;
১০. বাড়ি;
১১. কণ্ঠস্বর;
১২. খেলা;
১৩. একটি রূপকথার গপ্পো;
১৪. মাথা;
১৫. ছোটো-বড়ো;
১৬. শিক্ষা;
১৭. দাচিগাঁওয়ের রাত;
১৮. তেপাই।
এই গল্পগুলোর মধ্যে আমাদের সবার ছোটোবেলা লুকিয়ে আছে।
এদের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, আর পুরোনো মানুষদের জন্য চাপা কষ্ট।
বেশ কিছু গল্প মজা আর রোমাঞ্চ, কখনও বা মৃদু রহস্যের মধ্য দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছে মূল্যবোধ।
ভারি সুন্দর ভাষা, স্বপ্নময় বর্ণনার মধ্য দিয়েও কয়েকটি গল্প ভয় পাইয়েছে— যাদের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ঠেকেছে 'কুয়োতলার চাঁদ'। ভয়ের গল্প লিখে পাঠকের হৃৎকম্প ঘটাতে ইচ্ছুক লেখকেরা এই গল্পটি পড়লে অনেক কিছু শিখতে পারবেন।
আর কয়েকটি গল্প স্রেফ কাঁদিয়ে ছেড়েছে অমলিন শৈশবের উত্থান ঘটিয়ে। তাদের পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, যেন এই বয়স্ক, কোলকুঁজো চেহারা থেকে আমি পৌঁছে গেছি ছোট্টবেলায়— যেখানে সাংঘাতিক সব অ্যাডভেঞ্চারের সম্ভাবনা দানা বাঁধে আঁধার ঘনালেই। নতুন করে টের পেয়েছি বন্ধুত্বের মহিমা। বন্ধুকে হারানোর কষ্ট পেয়েছি নতুন করে।
আর এদের মধ্য দিয়ে কখন যেন নিজের জং-ধরা, ক্লান্ত মনটা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে ঝকমক করে উঠেছে নতুন আলোয়।
আর কী চাইতে পারি, বলুন?
বইটিকে রঙিন প্রচ্ছদ আর ভারি মনোলোভা অলংকরণ দিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য।
বইটির ছাপা একেবারে ঝকঝকে ও শুদ্ধ হলেও বানানের ব্যাপারে একটি অনুযোগ রইল। 'ছোটো' বানানটি সংসদ-অনুসারী করেও 'বড়ো' বানানটি আনন্দ-র মতো করে লেখার কারণ বুঝলাম না।
তবে মস্ত বড়ো নালিশ রইল গল্পগুলোর প্রথম প্রকাশকালীন তথ্য না-থাকা নিয়ে। এমন সব বই আমাদের স্থায়ী সম্পদ। তাতে এই ধরনের ডকুমেন্টেশনের অনুপস্থিতি কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়।
সব মিলিয়ে এ এক অসামান্য বই। নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা এই গল্পগুলোকে দু'মলাটের মধ্যে এনে দেব সাহিত্য কুটির কর্তৃপক্ষ আমাদের মস্ত বড়ো উপকার করলেন। ভরসা রাখি যে তাঁদের এই বইটি পাঠকদের আনুকূল্য পাবে।
আশা করি, লেখকও এরপর নতুন একগুচ্ছ লেখা নিয়ে ছোটোদের, আর আমাদের মতো মাঝবয়সী, এমনকি বুড়োদের আনন্দ দিতে তৎপর হয়ে উঠবেন।
অলমিতি।