সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে প্রতিটি ধর্মেরই অবদান রয়েছে। প্রাচীন গ্রীক-রোমান, মিশরীয় সভ্যতাগুলো অনেকাংশেই চালিত হয়েছে এ সমাজগুলোর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো দ্বারা। এ ধর্মগুলোর বরাত দিয়েই আমরা পেয়েছি গ্রীক, নর্ডিক, মিশরীয়, হিন্দু ইত্যাদি পুরাণগুলো; পেয়েছি ধর্মীয় সদুপদেশের নানা চমকপ্রদ কাহিনী, দেবতাদের স্তুতিগান। তবে শিল্প-সাহিত্যের এ বড় ধাপগুলো আসলে ধর্মীয় সমাজের ‘বাই-প্রডাক্ট’ মাত্র। এক ধর্মবিশ্বাসের প্রসারের তাড়নায় অন্য ধর্মবিশ্বাসের অন্য জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক বৃহৎ পরিবর্তনগুলো আসে। এই পরিবর্তনের ল্যাজ ধরে ধরেই আসে নতুন নতুন পৌরাণিক কাহিনী, স্তুতিগান; সংশোধিত হয় আগের জামানার ধর্মীয় সাহিত্য। ধর্মের লড়াইয়ে হেরে যাওয়া জনগোষ্ঠীর ঈশ্বরের গুণগুলো অর্পিত হয় বিজয়ী জনগোষ্ঠীর ঈশ্বরের স্কন্ধে। মানবসমাজের ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে ধর্মবিশ্বাসের এ পালাবদলটাকেই মূল চালিকাশক্তি বলে মনে হয়, অনেকটা গাড়ীর ইঞ্জিনের মতো। এক মডেলের ইঞ্জিন দিয়ে বেশীদূর যাওয়া চলেনা। কয়েক দশক কি শতক পেরিয়ে গেলেই ইঞ্জিনে নতুনত্ব আনতে হয়, গতি, মসৃণ যাত্রা ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে। হালের সময়ে চোখ রাখলে যে দেশগুলোকে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়, যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে উৎকর্ষ সাধন করেছে, যেসব দেশে জননিরাপত্তা সর্বাগ্রে, সে দেশগুলোর প্রতিটিই সময়ের সাথে সাথে তাদের ধর্মীয় ইঞ্জিনটিকে পাল্টে নিয়েছে, সংশোধন করেছে পুরনো মডেলের ভুলগুলোকে। বিপরীতে, পৃথিবীর সবচেয়ে অনুন্নত, গেঁয়ো, শিক্ষাহীন, বর্বর দেশগুলোতে ধর্মবিশ্বাসটা আসে সবকিছুর আগে; এরা তাদের পুরনো মডেলের ধর্মের ইঞ্জিনটিকে হালনাগাদ করে নেয়নি, এমনকি হালনাগাদ করবার কথাটিও শুনতে তারা নারাজ। তাদের পুরনো মডেলের অচল ইঞ্জিনটি দিয়ে পথ চলবার এই গোঁ ধরে থাকাটাই যে তাদের পিছিয়ে পড়বার মূলে সেটি বোঝার জন্য বিদ্যাসাগর হতে হয়না।
ইহুদী জাতির ইতিহাসের ওপর লেখা বইয়ের আলোচনায় ধর্মবিশ্বাসের পুরনো মডেল নিয়ে কচকচানিতে অনেকের ধৈর্য্যহানি ঘটতে পারে, তাই এখানে বলে রাখা প্রয়োজন ইহুদীবাদের ইতিহাস মূলত সময়ের সাথে সাথে ক্রমাগত পরিবর্তনের ইতিহাস, নতুন মডেলে হালনাগাদ হবার ইতিহাস। বর্তমান বিশ্বে ইহুদীদের নিয়ে একটি জনশ্রুতি পৌরাণিক পর্যায়ে চলে গেছে, তা হলো, ইহুদী মাত্রেই ‘জিনিয়াস’। বিজ্ঞান ও সাহিত্য মিলিয়ে ১৪৩টি নোবেল ইহুদীদের দখলে। পৃথিবীর সেরা সব চিত্র পরিচালক, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিকদের তালিকা করতে বসলেও ইহুদীদের প্রাধান্যই চোখে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে ধর্মটির হালনাগাদ হবার বিষয়টিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন র্যাবাই কাইম পটোক তাঁর এ বইয়ে বিবৃত করেছেন হাজার বছর ধরে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে ইহুদীবাদ কিভাবে আজকের একটি দৃঢ় কাঠামো-সম্বলিত ধর্মবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে তার ইতিহাস। সময়ের পরীক্ষায় এ কাঠামোটি এতটাই মজবুত প্রমাণিত হয়েছে যে এর ওপর ভর করেই খ্রীষ্টবাদ এবং ইসলাম এ দু’টি বৃহৎ বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশ অব্দি বারবার তাড়া খেয়ে ফেরার হয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতেই ইহুদীবাদের বড় পরিবর্তনগুলো এসেছে, এ ব্যাপারটির দিকে ইঙ্গিত করেই পটোক তাঁর এ ইতিহাসের শিরোনাম দিয়েছেন ‘ওয়ান্ডারিংস’ বা উদ্দেশ্যহীন মিছিল। প্রচুর তথ্যে ঠাসা-যার অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়-বইটি যে ইতিহাস জানবার খুব ভালো উৎস তা বলা যায়না। অনেকটাই এলোমেলোভাবে ধর্মীয় আবেগের আতিশয্যে লেখা বইটি অবশ্য অন্যান্য সূত্রের পথে হাঁটার সুতো কিছুটা যোগায়, এটুকুই যা প্রাপ্তি।
আব্রাহামিক ধর্মগুলোর প্রধান তিনটি (ইহুদীবাদ, খ্রীষ্টবাদ ও ইসলাম) হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে বিশ্বাসগুলোর দৃঢ় কাঠামোর জন্য। ধর্মগুলোর অনুসারীরা নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের ফুটানি মারাবার সময় এই দৃঢ় কাঠামোটির কথাই তুলে আনেন বারবার। এই কাঠামোটির ভিত্তিপ্রস্তর যেহেতু ইহুদীবাদের মাধ্যমেই স্থাপিত হয়েছে, তাই আব্রাহামিক ধর্মগুলোর ক্রমবিবর্তন বুঝতে হলে ইহুদীবাদের জন্মবৃত্তান্তের দিকে চোখ ফেরানোটা আবশ্যক। ইহুদীবাদের সূচনা কিভাবে হলো সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে পটোক ফিরে গেছেন ৬০০০ বছর আগের প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতায়। বাইবেলমতে, আব্রাহামের আদি নিবাস দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার উর অঞ্চলে। এই উর থেকে মাইল চারেক দূরে আল-উবায়েদ গ্রামের উবায়েদ জনগোষ্ঠীর হাতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৩০০-৩০০০ সালের দিকে সুমেরীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার (ইরান, ইরাক, সিরিয়া) এ সভ্যতাকে অনেক পণ্ডিত পৃথিবীরই প্রথম সভ্যতা বলে মনে করেন। ভাষা, কৃষিকর্ম, মৃৎশিল্প ইত্যাদির শুরুও এ সময়েই। এ সময়ের ব্যাবীলনীয় অধিবাসীদের অনেকে অ্যাকাডিয়ান বলে অভিহিত করেন এবং খুব সম্ভবত এই অঞ্চলের অ্যাকাডীয় এবং অ্যাসিরীয় ভাষাই আজকের সেমেটিক (হিব্রু, আরবী ইত্যাদি) ভাষাগুলোর পূর্বপুরুষ। পটোক ইঙ্গিত করেছেন সুমেরের ইরিদু, উর, এরেক, লাগাশ, নিপুনর, কিশা প্রভৃতি গ্রামগুলো থেকেই পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সব সভ্যতার হাঁটা শুরু। সুমেরীয়রা অবশ্য নিজেদের সুমেরীয় বলতোনা, এ নামটি অ্যাকাডিয়ানদের দেয়া। নিজেদের অঞ্চলটিকে তারা বলতো ‘কেঙ্গিয়ে’। এই সুমেরীয়রাই লেখালেখির বিদ্যা উদ্ভাবন করে যার হাত ধরে লোকমুখে প্রচলিত রাজা-রাজড়াদের কেচ্ছা, আইনের বিধান, ধর্মীয় গল্প-ইত্যাদি লিখিত রূপে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে যায়।
সভ্যতার অন্যতম লক্ষণ দলগতভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে কোন কাজে নামা। এ বিদ্যাটি যখন মানুষ রপ্ত করে, তখনই বিভিন্ন দেব-দেবী, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদির আমদানীর প্রয়োজন হয়। সুমেরীয় সভ্যতা যেহেতু সবচেয়ে পুরনো সভ্যতাগুলোরই একটি, ধর্মবিশ্বাসের উদ্ভাবনটিও তাদের হাতেই হবে এটিই স্বাভাবিক। সুমেরীয়দের প্রাচীন সে বিশ্বাস কেন্দ্রীভূত হতো প্রাকৃতিক নানা উপাদানকে ঘিরে; চন্দ্র, সূর্য, গাছ, পাথর এগুলোকেই ঈশ্বর মানতো তারা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, শীত, বসন্ত-ইত্যাদি প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলোর জন্য নানা আচার-অনুষ্ঠান ও পূজার মাধ্যমে এই দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে হতো। প্রার্থনায় দেবতার মন আদৌ টললো কি না তা বোঝা অবশ্য সাধারণ্যের সাধ্যের বাইরে। ইঙ্গিতে ভরা রহস্যময় সে ঐশ্বরিক ভাষা বুঝতে পারতো শুধু বিশেষ শক্তি সম্পন্ন হাতে গোণা অল্প ক’জন পুরোহিত, যাদের উত্তরসূরীরা পরবর্তীতে হাজার বছরের পরিক্রমায় নিজেদের পেশাটা অবিকৃত রেখে, ভোল পাল্টে নবী উপাধি ধারণ করে পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঈশ্বরের সাথে কথা বলে এসে নিজের নিজের আব্রাহামিক ধর্মগুলোকে স্থাপন করবেন (এঁরা সংখ্যায় অল্প বলে বাঁচোয়া! এই ক’জন নবীর প্রচারিত ধর্মের পীড়নেই শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ জেরবার হয়ে চলেছে, সাধারণ জনগণের সব্বাই পাহাড় চূড়ায় ঈশ্বরের আতিথ্য গ্রহণ করে এলে কি হতো ভাবা যায়না!)। সভ্যতার প্রাথমিক যুগের বহুঈশ্বরবাদী এই বিশ্বাসগুলোই ধীরে ধীরে সংশোধিত হয়ে, অন্যান্য অঞ্চলের অন্যান্য বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন গল্প ধার করে এনে দিয়ে থুয়ে শেষ পর্যন্ত একেশ্বরবাদী শক্ত কাঠামো সম্বলিত একটি বিশ্বাসে পরিণত হয়, ইহুদীবাদকে যার চূড়ান্ত রূপ বলা চলে।
সুমেরীয় সভ্যতার অন্যতম অবদান ‘এপিক অফ গিল্গামেশ’ (খ্রীষ্টপূর্ব ২৭০০-২৫০০), যা এখন অব্দি সবচেয়ে পুরনো সাহিত্যের নমুনা হিসেবে স্বীকৃত। এই মহাকাব্যটি মূলত উরুকের রাজা গিল্গামেশের নানা অভিযানের বিবৃতি। ঐতিহাসিক মূল্য তো আছেই, তবে গিল্গামেশের এই কেচ্ছার মাহাত্ন্য অন্য জায়গায়। হিব্রু বাইবেলের বেশ কিছু গল্পের সাথে গিল্গামেশের গল্পের হুবহু মিল রয়েছে; ইডেনের বাগানের ফিরিস্তি, সাপের ছলনা, নূহের মহাপ্লাবন-বাইবেলের এই গল্পগুলোর উৎস সম্ভবত গিল্গামেশের এই মহাকাব্য। বাইবেল ও কোরানের বয়ান মতে, ঈশ্বরের নির্দেশে নূহ বিশাল এক নৌকা তৈরী করে পৃথিবীর সকল জাতের পশু ও পাখি নিয়ে সে নৌকায় চেপে বসেন। বাইবেল রচিত হবার হাজার খানেক বছর আগেই লেখা এপিক অফ গিল্গামেশে দেখা যায় ঈশ্বরের নির্দেশ পেয়ে উতনাপিশতিম একইভাবে সকল প্রকার পশু-পাখি নিয়ে তার নৌকায় আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও, ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলমান মাত্রেই আদম এবং ইভ বা বিবি হাওয়ার জন্মের যে কাহিনী পড়েন, তার উৎস হিসেবেও এই কাব্যটিকে চিহ্নিত করা যায়। গিল্গামেশের কাব্যমতে, সৃষ্টির দেবী আরুরু মাটি ও পানি দিয়ে এনকিদুকে তৈরী করেন; আর জীবনের দেবী নিন্তিকে তৈরী করা হয় পানির দেবতা এনকি’র পাঁজরের একাংশ থেকে। রিলে-রেস কিংবা পিলো পাসিং খেলার মতো একই গল্পের ব্যাটন (কিংবা বালিশ!) পরবর্তী ধর্মের হাতে আরেকটু সংশোধিত হয়ে পাচারকৃত হয়েছে; ইহুদীবাদ, খ্রিষ্টবাদ ও ইসলাম-এই তিন স্তরের ছাঁকনি পেরোবার পর গিল্গামেশের দেব-দেবী সম্বলিত প্রাথমিক পর্যায়ের গল্পটি পেয়েছে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য একটি রূপ।
মেসোপটেমিয়ার পশ্চিমাঞ্চল (বর্তমানের সিরিয়া) সে সময়ে দখলে ছিলো আধা-যাযাবর এক বাহিনীর হাতে, সুমেরীয়রা যাদের আমুরু নামে জানতো। সুমেরীয়দের মতে এরা পাহাড়ে তাঁবু গেঁড়ে বাস করা বর্বর বিশেষ যারা মাংস রান্না করার বিদ্যা রপ্ত করে উঠতে পারেনি তখনো। বাইবেলে এদের অ্যামোরাইট বলে অভিহিত করা হয়েছে। আব্রাহাম সম্ভবত অ্যামোরাইট ছিলেন। আব্রাহামের কয়েক পুরুষ দূরবর্তী এক পূর্বপুরুষ শেম-এর নামানুসারেই তাঁর বংশধরদের ‘সেমাইট’ বলা হয়। হিব্রু বাইবেলের ভাষ্য মতে, আব্রাহাম তাঁর স্ত্রী (সারাহ), পিতা (তেরাহ) ও ভাইপোকে (লুত) নিয়ে উর ছেড়ে হারান নগরীতে (বর্তমান তুরস্কের অংশ) এসে সাময়িক ঠাঁই গাঁড়েন। আব্রাহাম এখানে ৭৫ বছর বয়েস পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং এরপর ঈশ্বরের আদেশে তাঁর বাণী ছড়িয়ে দেবার জন্য কেনানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। আব্রাহামিক ধর্মগুলোর প্যাট্রিয়ার্ক বা স্থপতি যাঁরা, আন্তঃপারিবারিক সম্পর্ক তাঁদের মাঝে বড় একটি ভূমিকা পালন করেছে। বাইবেল মতে, সারাহ আব্রাহামের স্ত্রী, এবং একই সাথে তাঁর আপন অথবা সৎ বোনও বটেন। সারাহ ও আব্রাহামের ভাই-বোনের সম্পর্কটি বাইবেলে দু’বার উল্লিখিত হয়েছে (জেনেসিস ১২:১০-১৩:১ এবং জেনেসিস ২০), দ্বিতীয়বারের বয়ানে আব্রাহাম বলেছেন সারাহ তাঁর পিতার কন্যা, তবে দু’জনের মাতা এক নন (প্রথমবারের বয়ানে আব্রাহাম জীবন রক্ষার তাগিদে মিশরের রাজার কাছে সারাহ’র মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলেন বলে একটি ব্যখ্যা দাঁড় করানো যায়; আব্রাহামের আশঙ্কা ছিলো নিজেকে সারাহ’র স্বামী বলে পরিচয় দিলে মিশররাজ তাঁকে হত্যা করে সারাহকে হারেমে রেখে দেবেন)। অপরদিকে আব্রাহামের ভাইপো লুত তিনটি ধর্মেই বিখ্যাত সডোম ও গমরাহ গ্রামের সমকামীবাসীদের ধ্বংসের গল্পটির জন্য। বাইবেল মতে, এই গ্রাম দু’টির ধ্বংসের পর লুত ও তাঁর দুই কন্যা পালিয়ে এক গুহায় বসবাস করতে থাকেন। সেখানে কন্যাদ্বয় মদ খাইয়ে লুতকে বেহুঁশ করে যৌনক্রিয়া করে এবং উভয়েই পরে লুতের সন্তান ধারণ করে। জেষ্ঠ্য কন্যার পুত্রের নাম রাখা হয় ‘মোয়াব’ (পিতার কাছ হতে প্রাপ্ত); কনিষ্ঠা কন্যার পুত্রের নাম রাখা হয় ‘বেন-আম্মি’ (আমার গোষ্ঠীর পুত্র)। মোয়াব ও বেন-আম্মিকে যথাক্রমে মোয়াবীয় ও অ্যামোনিয় গোষ্ঠীর পিতা বলা হয়। ইসলামে অবশ্য আব্রাহাম-সারাহ’র ভাই-বোন সম্পর্ক অথবা লুতের দুই কন্যার ব্যাপারে কোন আলোচনা করা হয়নি। ইহুদীবাদ ও ইসলামের মাঝে সময়ের পার্থক্য কয়েক হাজার বছরের; আন্তঃপারিবারিক সম্পর্কের ব্যাপারটি তদ্দিনে ছিছিঃকারের ব্যাপারে পরিণত হওয়ায় সম্ভবত কুলপতিদের বিতর্কিত এই অধ্যায়গুলো ইসলামে সতর্কতার সাথে কর্তন করা হয়েছে।
বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে কেনান নামে যে স্থানটির কথা বলা হয়েছে তা আজকের দিনের ফিলিস্তিন, ইজরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া ও মিশরের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। এ অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে নূহ নবীর এক দৌহিত্রের নামানুসারে। নূহের তিন পুত্র যথাক্রমে, হাম, শেম ও যেফৎ। বাইবেলে বর্ণিত আছে, নূহ একদিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র হাম তা দেখতে পেয়ে অপর দুই ভাইকে জানায়। শেম ও যেফৎ এরপর পেছন ফিরে হেঁটে বাবার কাছে গিয়ে তাঁকে চাদরে ঢেকে দেয়। পিতার উলঙ্গমূর্তি তাদের দেখতে হয়নি। নূহ ঘুম ভেঙ্গে উঠে নিজের এ অবস্থা দেখে হামকে অভিশাপ দেন হামের পুত্র কেনান আজীবন হামের ভাইদের দাসানুদাস হয়ে থাকবে। এই কেনানই কেনান অঞ্চলের অধিবাসী কেনানাইটদের আদিপিতা। পটোক অবশ্য ধারণা করেছেন কেনান নামটি এসেছে হারিয়ান শব্দ কিনাহু থেকে, যার অর্থ বেগুনী। কেনান বিখ্যাত ছিলো বেগুনী রঙের উলের জন্য, এই বেগুনী রঙটি আসতো কেনানের সাগরতীরে বাস করা বিশেষ এক জাতের শেলমাছের খোল থেকে। প্রাচীন গ্রীকরা কেনানের অধিবাসীদের বলতো ফিনিশিয়ান যার আদি রূপ ফৈনিক্স, এই শব্দটির অর্থও বেগুনী। বাইবেলে কেনানের গুরুত্ব এই যে, ঈশ্বর প্রথমে আব্রাহামকে ও পরে তাঁর পুত্র এবং দৌহিত্র ইসহাক ও ইয়াকুবকে যথাক্রমে প্রতিশ্রুতি দেন কেনানের মালিক করবার। সেই থেকে কেনান ইহুদীদের কাছে 'প্রতিশ্রুত ভূমি'। বাইবেলের এই সূত্র টেনে এনেই ইজিরায়েলীয়রা ফিলিস্তিনের একাংশ দখল করে রেখেছে, এবং ফিলিস্তিনের ওপর যে কোন হামলার ন্যায্যতা তারা প্রতিপাদন করে এই গল্পটির মাধ্যমে; ঈশ্বরের খাস মুখে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে তো! কার্ল মার্ক্স ধর্মকে আফিম বলেছিলেন। আফিম মানুষের মুখ্য খাদ্যবস্তু নয়, ওতে ক্ষিধে মোচন হয়না, শক্তিও বৃদ্ধি পায়না। ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারটা বহু জাতির জন্যই ভাতের মতো ‘স্টেপল ফুড’, ওটা চিবিয়েই অস্তিত্বটা রক্ষা করতে হয়, তেমন দরকার পড়লে পঁচিয়ে মদ বানিয়ে বিশ্বাসের নেশায়ও মজে থাকা যায়।
মেসোপটেমিয়ার সে সময়ের রীতি ছিলো কোন স্ত্রী যদি স্বামীর সন্তান ধারণে অসমর্থ হয়, স্বামীকে সে ক্ষেত্রে একজন দাসী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে হবে, এবং দাসীর সন্তান হলে স্ত্রীর সে সন্তানের ওপর পূর্ণ অধিকার থাকবে। বাইবেল মতে, সারাহ’র দীর্ঘ বন্ধ্যাত্বের পর সমাজের রীতি মেনে আব্রাহাম হাজেরাকে দাসী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের সন্তান ইশমায়েল (ইসমাইল) জন্ম নেয়। বয়ানের এ পর্যায়ে এসেই বাইবেলে সারকামসিশন বা লিঙ্গাগ্রের চর্মছেদনের বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয় (জন্মের ৮ম দিনে)। এই রীতিটির চল ইহুদীবাদ প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই ছিলো, বাইবেলে এটিকে ঈশ্বরের সাথে আব্রাহামের চুক্তির অংশ হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়। ইতোমধ্যে সারাহ’র নিজেরও একটি পুত্রসন্তান হয় (আইজ্যাক বা ইসহাক), তবে ইশমায়েলের আবির্ভাব সারাহ’র মনে হিংসার জন্ম দেয়। সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে সন্দেহে দোদুল্যমান সারাহ চাপ প্রয়োগ করে আব্রাহামকে বাধ্য করেন হাজেরা ও ইসমাইলকে ত্যাগ করতে। সে সময়ের প্রেক্ষিতে কোন দাসীকে এভাবে দলচ্যুত করার অর্থ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করা, যার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। শিশু ইশমায়েলকে নিয়ে মহা বিপদগ্রস্ত হাজেরা যখন মুমুর্ষ, তখন ঈশ্বর সে কষ্ট সইতে না পেরে তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। বেঁচে যায় শিশু ইশমায়েল যাঁকে ঈশ্বর মহান এক জাতির পিতা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। আরবীয়রা নিজেদের ইশমায়েলের উত্তরসূরী দাবী করেন। এই একই গল্পটি মুসলমান বিশ্বেও প্রচলিত, তবে অবশ্যই, আব্রাহামের দাসী গ্রহণ ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তিজনক অন্যান্য উপাদান সেখানে সযত্নে অনুপস্থিত। ইসলামিক বয়ানে হাজেরা আব্রাহামের দ্বিতীয় স্ত্রী।
আব্রাহামের অনুসারী সেমাইটরা মিশরে ছড়িয়ে পড়বার পর একসময় মিশরের ফারাওদের ক্ষমতাচ্যুত করে তখতের দখল নেয়। কালের পরিক্রমায় রামেসিস ডাইন্যাস্টির হাত ধরে সিংহাসনের দখল আবারো মিশরীয়দের হাতে আসে। ভিনদেশী সেমাইটদের হাতে যেন আর কখনো ক্ষমতা না যায় তাই সম্রাট প্রথম সেতি নির্দেশ দেন ভিনদেশী নতুন যেসব শিশুর জন্ম ঘটেছে তাদের যেন নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বহু বিবাহবহির্ভূত 'অবৈধ' সন্তান এবং লালন পালনে অক্ষম দরিদ্র পিতামাতার সন্তানরাও এভাবে নদীর জলে ভেসে গেছে। এই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পটোক দাবী করেছেন ইহুদীবাদের প্রতিষ্ঠাতা মূসাকে জন্মের পর নদীতে ভাসিয়ে দেবার গল্পটিতে তাই সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বাইবেলের সূত্রমতে, ফারাওয়ের রাজপ্রাসাদে রাজপুত্র রূপে বড় হওয়া মূসা একদিন তাঁর স্বগোত্রীয় হিব্রু এক দাসের ওপর অত্যাচাররত এক মিশরীয়কে হত্যা করেন এবং ফারাওয়ের আক্রোশ থেকে বাঁচতে মিদিইয়ানে পালিয়ে যান। এখানে তিনি জেথরো নামক এক পুরোহিতের কন্যা জিপ্পোরাহকে বিয়ে করেন। এই মিদিইয়ান অঞ্চলের নারীরা পৌত্তলিকতা এবং ‘অবাধ যৌনাচার’-এ লিপ্ত হওয়ায় ঈশ্বর ক্ষুব্ধ হন এবং মূসাকে মিদিনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবার নির্দেশ দেন। বাইবেলে এই প্রথম ঈশ্বর ‘ইয়াহওয়াহ’ (YHWH) নামে মূসার কাছে হাজির হন; এর আগে আব্রাহাম, আইজ্যাক, ইয়াকুব-এঁদের কাছে ঈশ্বর ‘এল-শাদ্দাই’ বা সর্বশক্তিমান নামে নিজেকে পরিচিত করেন। এখানে উল্লেখ্য, মিশরীয়কে হত্যা, মিদিইয়ানে পালিয়ে আসা এবং মূসার বিবাহের এই আখ্যান কোরানেও আছে, সূরা আল-কাসাসে, তবে বাইবেল ও কোরানের বয়ানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী জিপ্পোরাহরা সাত বোন; কোরানে শুধু দু’জনের কথা বলা হয়েছে। কোরানে জিপ্পোরাহ এবং মূসার শ্বশুর এ দু’জনের কারোর নামেরই উল্লেখ নেই এবং কোরানের বয়ান অনুসারে মূসার শ্বশুর মূসাকে আট বছর তাঁর অধীনে কাজ করবার শর্তে তাঁর মেয়ের সাথে মূসার বিয়ের প্রস্তাব দেন (আল-কাসাস, ২৭)। বাইবেলে এমন কোন শর্তের উল্লেখ নেই। অনেক পণ্ডিতই জেথরোকে ইসলামের নবী শুয়াইব বলে চিহ্নিত করেছেন, তবে এ নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি আব্রাহামিক ধর্ম দ্রুজ-এর অনুসারীরা জেথরোকে তাঁদের ধর্মগুরু বলে মানেন এবং নিজেদের জেথরোর বংশধর দাবী করেন। হিব্রু বাইবেল বা ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম যে পাঁচটি বই-জেনেসিস, এক্সোডাস, লেভিটিকাস, নাম্বারস ও ডিউটেরোনমি-যেগুলোকে একত্রে তোরাহ বা তাওরাত বলা হয়, ইহুদী বিশ্বাস মতে মূসার ওপর নবীত্বের দায়িত্ব অর্পিত হবার পর তিনি এই পাঁচটি বই লেখেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা অনেকে অবশ্য মূসাকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে না দেখে পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখবার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এমনিতে একে অপরকে বিপথগামী ভূয়া ঈশ্বরের উপাসক হিসেবে দেখা ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের অবশ্য মূসা চরিত্রটির এহেন অবনমনে যথেষ্ঠই গাত্রদাহ হবে; মূসার পবিত্রতা পুণরোদ্ধারের লক্ষ্যে নিজ নিজ ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ব্যাস্ত লড়াকুবাজ পূজারীরা তখন সক্কলে এক চাদরের নিচে।
পপ-কালচারের বদৌলতে টেন কম্যান্ডমেন্টসের কথা এখন সর্বজনবিদিত। তাওরাতের দু’টি বইয়ে (এক্সোডাস ও ডিউটেরোনমি) এই দশটি নির্দেশাবলীর কথা এসেছে যা প্রধান তিনটি আব্রাহামিক ধর্মের মূল স্তম্ভও বটে। এক ঈশ্বরের আনুগত্য স্বীকার করা, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, মূর্তিপূজা, হত্যা, পরকীয়া, চুরি, অসততা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা-এই হচ্ছে ডেকালগের সারকথা। ইহুদীবাদ, খ্রীষ্টবাদ ও ইসলামে ঘুরে ফিরে এই বিষয়গুলোর ওপরই জোরারোপ করা হয়। বাইবেলের সূত্রানুসারে মূসা ৪০ দিন ৪০ রাত ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিরম্বু উপবাস থেকে এই টেন কম্যান্ডমেন্টস লেখেন। এরপর মূসা তাঁর অনুগত অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগর ভাগ করে ৪০ বছর সফর করে কাদিশ-বার্নিয়া নামক স্থানে তাঁবু গাঁড়েন। রোমান আমলের ইহুদী ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাবিয়াস জোসেফাস বর্তমানের জর্ডানের পেট্রা নগরীকে কাদিশ-বার্নিয়া বলে চিহ্নিত করেছেন। এই কাদিশ-বার্নিয়া থেকে মূসার নেতৃত্বে ইহুদীরা কেনান পূনর্দখলের চেষ্টা চালিয়ে যুদ্ধে বড় পরাজয় স্বীকার করে। ইজরায়েলীয় জাতির শুরু এখান থেকেই। মূসার জীবদ্দশায় ইহুদীদের কেনানে ফেরত যাওয়া হয় নি। মূসার মৃত্যুর পর ইহুদীদের হাল ধরেন জশুয়া যিনি অসামান্য নিষ্ঠুরতার সাথে শত্রুপক্ষকে দমন করেন ও কেনানের ৩১টি শহর অধিগ্রহণ করেন। জশুয়া দেহরক্ষা করেন খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০ সালে তবে কেনানের দখল নিয়ে ফিলিস্তিনদের সাথে মারামারির শুরু আরো কয়েক শতাব্দী আগে। বাইবেলে গাজা, আশদোদ, আশকেলন, এক্রোন ও গাথ-এই পাঁচটি নগরের অধিবাসীদের ফিলিস্তিন (Philistine) বলা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে আজ অব্দি এই যুদ্ধ চলছে। বাইবেলের বয়ানের এমনই শক্তি, ইংরেজী অভিধানে আজ Philistine শব্দটির অর্থ খুঁজলে পাওয়া যাবে ‘শিল্প-সাহিত্যে ভীষণ নিম্ন রুচির ব্যাক্তি’-অর্থ্যাৎ, এক কথায় একটি বর্বর, গেঁয়ো ভূত বিশেষ!
ইজিরায়েলীয়দের সাথে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষের বিষয়টি বাইবেলে এবং কোরানে নানাভাবে বারবার বিবৃত হয়েছে। বাইবেলের বয়ান মতে ইজরায়েলের প্রথম রাজা সল (সম্ভবত ইসলামে এঁকে তালূত বলা হয়েছে) ডেভিডকে (ইসলামের নবী দাউদ) তাঁর জামাতা বানাতে রাজি হন, কিন্তু যৌতুক হিসেবে দাবী করেন একশজন ফিলিস্তিনের লিঙ্গাগ্রের চর্ম। সিংহাসনের দখল হারাবার ভয়ে ভীত সলের আশা ছিলো মূলত এই যৌতুক যোগাড় করতে গিয়ে ডেভিড ফিলিস্তিনদের হাতে নিহত হবেন। তবে ডেভিড, বলাবাহুল্য, জয়ী হন এবং ফিলিস্তিন বাহিনীর মূল ভরসা দানব সদৃশ বিশাল দৈহিক আকৃতির গোলিয়াথকে সম্মুখযুদ্ধে হত্যা করেন। কোরানের সূরা বাকারাতেও দাউদের এই জয়ের কথা এসেছে, গোলিয়াথকে সেখানে জালূত বলা হয়েছে (বাকারা ২৫১)। ডেভিড বা দাউদ বিখ্যাত তাঁর অসামান্য গায়কী প্রতিভার জন্য। কথিত আছে তিনি ঈশ্বরের স্তূতিগান গাওয়া শুরু করলে জলস্থলের পশু-পাখি, মাছ ইত্যাদি নিজ নিজ কাজ ভুলে মুগ্ধ হয়ে সে গান শুনতো। তাঁর গানের সংকলনের বইটি মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের কাছে যথাক্রমে জাবুর ও সামস (Psalms) নামে পরিচিত। রাজা-রাজড়ারা, যতই তাঁরা শিল্পী-স্বত্তার অধিকারী হোন, দিনশেষে মনোযোগটা কেন্দ্রীভূত থাকে তাঁদের হিংসা, সম্পত্তির দখল নিয়ে খেয়োখেয়ি, যুদ্ধ, খুনোখুনি নিয়ে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনুভূত ডেভিডের আপাতঃ পবিত্র শাসনামলও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা। ডেভিডের জেষ্ঠ্য পুত্র অ্যামন তার সৎ বোন তামারকে ধর্ষণ করে, যার প্রতিশোধ নিতে তামারের ভাই আবসালোম অ্যামোনকে হত্যা করে। আবসালোম পরবর্তীতে তার পিতা ডেভিডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রাজা হবার বাসনায় এবং ডেভিডের বাহিনীর হাতে এফ্রেইম-এর বনে যুদ্ধে নিহত হয়। জেরুজালেমে আবসালোমের কবর বলে পরিচিত স্থাপনাটিতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মুসলমানেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাথর মেরেছেন ঘৃণায়, দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের সন্তানদের শিখিয়েছেন পিতার অবাধ্য হলে কিরূপ শাস্তি পেতে হয়। ডেভিডের পুত্রদের এই কীর্তিকলাপের কাহিনী মুসলমান বিশ্বে প্রচলিত নয় কারণ ইসলামের ইতিহাসের প্রতিটি নায়কসুলভ চরিত্রকে সাদা চোখে দেখেই অভ্যস্ত মুসলমানরা। আবসালোমের কবরে পাথর মেরে ঘৃণা প্রকাশ করা মুসলমানেরা সে এলাকার স্থানীয় বলেই সম্ভবত ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের মুখে মুখে আবসালোমের গল্পটি জেনেছেন। তাঁরা তাঁদের নবীর পুত্রদের এহেন হঠকারী আচরণকে বাকী মুসলমান বিশ্বের মতো অস্বীকার না করে গল্পটিকে মেনে নেবার মতো মনের জোর কি করে পেলেন সেটি বেশ ভাবাবার মতো প্রশ্ন বটে।
কালের বিবর্তনে প্রতিটি ধর্মেই কিছু না কিছু পরিবর্তন এসেছে; জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলবার নিমিত্তে ধর্মের অনুসারীরা প্রায়শয়ই নিজেদের সুবিধে মতো ধর্মের বয়ানগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, তৈরী করেছেন নতুন নতুন মতবাদ। পরিবর্তনের এই পথ ধরে খ্রিষ্টানরা ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট, ইস্টার্ন অর্থোডক্স ইত্যাদি ভাগ ভাগ হয়েছেন, মুসলমানেরা তৈরী করেছেন শিয়া, সুন্নী, আহমাদী ইত্যাদি মতবাদগুলো। এই প্রতিটি মতবাদের ভেতরই আবার কয়েক কিসিমের ঘরানা আছে। নিজের ঘরানা বা মতবাদের বাইরে বাকি সবাইকে এঁরা ভ্রান্ত বলেন। আব্রাহামিক ধর্মগুলোর পালের গোদা যেহেতু ইহুদীবাদ, নানা মুনির নানান মতে ভাগ হয়ে থাকবারও তাই কমতি নেই সেখানে। ধর্মগ্রন্থের বয়ানগুলোকে কতটা গোঁড়া ভাবে ব্যখ্যা করছেন সে প্রেক্ষিতে ইহুদী ধর্মের অনুসারীদের মোটামুটি দু’টি বৃহৎ দলে ভাগ করা যায়, সেফার্ডিক ও আশকেনাজি। কোন ইহুদী গোত্রটি বেশী গোঁড়া, ধর্মীয়ভাবে অসহিষ্ণু ও তুলনামূলক অনুন্নত আর কোন গোত্রটি উদারপন্থী এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বেশী অবদান রেখেছে? সরাসরি উত্তরটি দেবার চেয়ে বরং এঁরা কে কোন অঞ্চলে বাস করেন সেটি বললেই সেফার্ডীয় ও আশকেনাজি ইহুদীর পার্থক্যটা বহু গুণে বড় হয়ে ধরা পড়বে। সেফার্ডীয়রা থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে, আশকেনাজিরা ইওরোপে। শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানে ‘জিনিয়াস’ বলে পরিচিতি পাওয়া, নোবেলের বরমাল্য গলায় ঝোলানো ইহুদীদের সিংহভাগই আশকেনাজি, যাঁরা অনেকাংশেই আদৌ ধর্ম পালন করেন না। এই উন্নতিটা তাঁদের কতটা ইওরোপীয়ান বলে হলো আর কতটা ইহুদী বলে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা আমাদের দেশের ধর্মবাদীরা অবশ্য করবেন না, কারণ তাঁদের আদর্শের খুঁটিটি গাঁড়া অনুন্নত মধ্যপ্রাচ্যে। একটি আস্ত অঞ্চলকে এভাবে অনুন্নত, গেঁয়ো বলে দেয়াটা সমীচীন নয় বলছেন? ধর্মগ্রন্থগুলোর যে টুকরো গল্পগুলো এখানে টুকে রাখলাম সে গল্পগুলোর পবিত্র চরিত্রগুলোর জায়গায় আপনাকে আমাকে বসিয়ে দেখুন চরিত্রগুলোর প্রতি আগের সেই সম্মানবোধটুকু অটুট থাকে কিনা? সেই সাথে এই প্রশ্নটিও করে নিন নিজেকে, পৃথিবীর কোন অঞ্চলগুলোতে এই চরিত্রগুলোকে নিয়ে উন্মাদনা, অসহিষ্ণুতা, খুনোখুনিটা সবচেয়ে বেশী?