বইটা পড়ার পর ছোটবেলার একটা বহুল আলোচিত ঘটনার কথা মনে পড়ে গেছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাস, সবেমাত্র ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। এরই মধ্যে বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল আর পত্রিকায় হট কেক নিউজ চলছিলো যে, মায়ান ভবিষ্যদ্বানী অনুযায়ী আসন্ন ২১শে ডিসেম্বর বিকাল ৫ টা ৩২ মিনিটে ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী (অবশ্য তখন এই ঘটনার সাথে মায়ান মিথের কোনো সংযোগ আছে কিনা জানতাম না)। সারা পৃথিবী থেকে ১ কোটি দশ লক্ষ মানুষ এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে কিংবা মায়ান ভবিষ্যদ্বানী উপভোগ করতে আনুমানিক মায়ান আদিভূমি মেক্সিকোতে পারি জমায়। তখন আর পাঁচটা বাঙ্গালী পোলাপানের মত আমিও তেমন মনোযোগ দেইনি এই ঘটনায়। কিন্তু সমস্যাটা হলো গিয়ে ২১ ডিসেম্বর বিকেলে। সারাদিন সুন্দর, ভালো হলেও বিকেল ৫টা বাজতেই শুরু হলো ঝড়, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই। এরপরের ভয়ের চোটে খুব সম্ভবত তিনদিন জ্বরে ভুগছিলাম 🥱
এই বইটাও ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা হইছে। প্রফেসর ম্যাককার্টার গবেষণা করে জানতে পারেন যে, আমাজন থেকে উদ্ধারকৃত পাথরের মত আরোও তিনটা পাথর ছড়িয়ে রয়েছে সারা পৃথিবীতে। সবগুলো পাথর একটা সিগনাল পাঠাচ্ছে কারোও উদ্দেশ্যে, যেটা থেমে যাবে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে। সেই সিগনালের ওপর নির্ভর করছে সারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। আর পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে বের করতে হবে বাকি পাথর গুলো।
সিরিজের প্রথম বই দ্য মায়ান কন্সপিরেসি (Black Rain) এ যেখানে কাহিনী ছিলো শুধু আমাজন বনের ভেতরই সীমাবদ্ধ, সেখানে এই বইটা পুরো ওয়ার্ল্ডওয়াইড। চীন, রাশিয়ার পাশাপাশি চলেছে আমেরিকা আর মেক্সিকোতে কাহিনী প্রবাহ। এখানে লট অফ কন্সপিরেসি ছিলো, কিন্তু ছিলো না তাদের ঠিকমতো চরিত্র উত্তোরন। মেইন এন্টাগনিস্ট ক্যাং চরিত্রকে পুরোপুরি ধোয়াশায় রেখেছে, ঠিকমতো পরিচিতও করেনি। হকার, ড্যানিয়েল, ম্যাককার্টার, মুর চরিত্রগুলো আগের মতই — স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তবে এই বইয়ে একটা অন্যরকম চরিত্র আছে, ইউরি। চরিত্রটাকে লেখক একেবারেই কাজে লাগাতে পারে নি। তার ম্যাগনেটিক ওয়েভ ক্যাচআপের ক্ষমতা দেখে ভাবছিলাম যে সুপারহিরো একশন এডভেঞ্চার পড়তে যাচ্ছি। তবে, এটাকে এতটা বাজেভাবে চরিত্রায়ন আর ফোকাসে এনেছে যে, সুপারহিরো এডভেঞ্চার মাঠে মারা গেছে। এই বইয়ের তিনটা জিনিস আমাকে সবচেয়ে ভুগিয়েছে:
১. অসংলগ্নতা।
২. কাকতালীতা।
৩. একপাক্ষিকতা।
আসলে প্রতিটা ঘটনাই আমার অসংলগ্ন লেগেছে। এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় যাবার যে মোটিভ, তা একেবারেই দেখায়নি লেখক। আর বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কাকতালীয়তা আর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে এডভেঞ্চার হয়েছে, এটা খুবই দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। আর এডভেঞ্চার হয়েছে একেবারে একপাক্ষিক। বিলিয়নার হিসেবে ক্যাং'কে শেষের দিকে একেবারে চুনোপুঁটি বানিয়ে ফেলেছে। কোনো ঘাত প্রতিঘাত আসেনি। তবে এটাতে মায়ান মিথ নিয়ে প্রচুর প্রচুর আলোচনা হয়েছে। পুরো মায়ান মিথ, popul vuh এর সারসংক্ষেপ যেন তুলে দিয়েছে এতে লেখক। তাছাড়া বিজ্ঞান, তেজস্ক্রিয়তা, প্রযুক্তি নিয়েও প্রচুর আলোচনা হয়েছে। এর প্রভাব অবশ্যই প্লটে পড়েছে — মন্থর গতি।
অনুবাদক অসীম পিয়াসের অনুবাদ বরাবরের মত সাবলীল। প্রযুক্তি আর মিথ দুদিকই বেশ মুন্সিয়ানার সাথে সামলিয়েছে। একশন এডভেঞ্চার প্রেমীরা ট্রাই করতে পারেন, মায়ান মিথলজি আর একশন এডভেঞ্চারে খুব একটা মন্দ কাটবে না।।