এই পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য আছে, যা এখনো মানুষের নাগাল পায়নি। মানুষ জন্মগত কৌতূহলী প্রাণী। নিজের কৌতূহল নিবারনের জন্য দূর দূরান্তে ছুটে চলে। অজানাকে জানার চেষ্টায় বিপদে ঝাঁপ দিতে পিছপা হয় না। এভাবেই আবিষ্কার হয় এমন কিছু সত্য, নানান ঘটনা; যা চমকে যেতে বাধ্য করে। এর মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যায় কোনো এক জাতি, কিংবা পুরো পৃথিবী। আবিষ্কার হয় আড়ালে থাকা কোনো এক উপাখ্যান।
আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের মধ্যে বিচরণ করি। ঘুমের মধ্যে দেখা এই স্বপ্ন ঘুম ভেঙে গেলে হারিয়ে যায়। আমাদের অবচেতন মন স্বপ্নের ভিত খুঁজে বেড়ায়। স্বপ্ন কখনও আনন্দদায়ক, কখনও বেদনাদায়ক। আবার কখনও বিভৎস। এই স্বপ্নের উৎপত্তি খুঁজতেই যেন গোটা দল নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে ড. আমান্ডা মেরন। নতুন কিছু আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি সে, যা বদলে দিবে মানুষের স্বপ্ন দেখার ইতিহাস। যে স্বপ্ন মানুষ দেখছে, তাকে রেকর্ড করে উপস্থাপন করা বড় আবিষ্কারই বটে।
কিন্তু সমস্যাটা হলো অন্যখানে। স্বপ্ন রেকর্ড করতে গিয়ে দেখা গেল, বেশ কয়েকজনের স্বপ্নে একই অবয়ব ঘুরেফিরে আসছে। স্বর্ণে মোড়া সেই মানুষকে ওরা নাম দিয়েছে স্বর্ণমানব। কিন্তু এই স্বর্ণমানবের রহস্য কী? যাদের স্বপ্নে এই রহস্যময় অবয়ব দেখা যাচ্ছে, তাদের সেই স্মৃতিটুকু নেই। যেন তাদের অবচেতন মন এই রহস্যকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
এই গবেষণার জন্য ড. আমান্ডা মেরনকে যারা ইনভেস্ট করছে, তাদেরও আছে এক অন্যরকম রহস্য। প্রকাশ্যে আসছে না তারা। আমান্ডা নিজেও তাদের পরিচয় জানে না। আড়াল থেকেই টাকা ঢালছে ওই সংগঠন। কিন্তু কেন? সন্দেহ হয় আমান্ডার। তাই এই রহস্য সমাধানের জন্য বন্ধু পাউলিনহোকে স্মরণ করে সে। পাউলিনহো ডাক দেয় জুলি ও তার বয়ফ্রেন্ড হার্ভি বেনেটকে।
পুরোনো এক ঘটনা যেন হার্ভিকে স্থির থাকতে দেয় না। ওরা ছুটি কাটাতে যাচ্ছিল। তার মধ্যে এই তলব। কিন্তু এমন একটা নাম বেনেটের কানে আসে, সব ছেড়েছুঁড়ে তার পেছনে ছুটতে ক্লান্তি আসে না। “ড্রাচ গ্লোবেল”! কী এই ড্রাচ গ্লোবেল? এর রহস্য কী? কেন বেন খুঁজছে এর মূল? কোন শত্রুতার মুখোমুখি হবে এবার?
এর সাথে এল ডোরাডোর সম্পর্ক বা কোথায়? প্রাচীন মিথ? না-কি সত্যি আছে এরূপ কোনো শহর। আসলেই কি এক ডোরাডো কোনো শহরকে বর্ণনা করে? না-কি এল ডোরাডো মানে অন্যকিছু। যা সামনে আসবে, বিশ্বাস হবে তো?
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও রহস্যময় বন আমাজন। যার ভিতরে একবার প্রবেশ করতে পারলে আর ফিরে আসার আর উপায় নেই। আমান্ডাদের গন্তব্য এই রহস্যময় বন। নিজেদের অজান্তেই হয়তো এমন কিছু আবিস্কার করেছে সে, যার জন্য পিছে লেগেছে একদল মার্সিনারী। সেই দল থেকে ওদের উদ্ধার করতে জুটে গেছে রিজ্জি নামের সাবেক মিলিটারি স্নাইপার। সবাই মিলে চলেছে আমাজনের গহীন বনে।
কিন্তু পেছনে ছুটে আসছে মৃ ত্যুদূত। সামনে ম রণ ফাঁদ। কী তাদের উদ্দেশ্য? কেন এভাবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওদের তারা করছে? আমাজনের জঙ্গলে বিপদ বরাবরই ওঁৎ পেতে থাকে। প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে লড়তে হয়। জলে, স্থলে— সবখানেই যেন ভয়ংকর সব প্রাণীর আবাস। আছে আদিবাসীদের ভয়। এই মৃ ত্যুকূপ থেকে ওরা কি বেঁচে ফিরতে পারবে?
না-কি আমজনের এই ভয়াল এক রহস্য একে একে গ্রাস করে নিবে সবাইকে…
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“দ্য আমাজন কোড” বইয়ের ভূমিকা থেকে জানতে পারি, লেখক জেমস রোলিন্সের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বইটি লিখেছেন। যদি জেমস রোলিন্সের বইয়ের সাথে তুলনা করতে হয়, তাহলে এই বইটি আমাকে ভীষণ হতাশ করেছে। জেমস রোলিন্স মানে বিজ্ঞান, ইতিহাসের সাথে আক্রমণের এক অনন্য মিশেল। এই বইতে আক্রমণের বিষয়আশয় তো ঠিকই ছিল কিন্তু বিজ্ঞান আর ইতিহাসের সেই পূর্ণরূপ পাইনি। লেখক পুরোটাই অ্যাকশন দৃশ্যের উপর নির্ভর করে গল্প লিখেছেন।
বইটির শুরুটা আগ্রহ জাগানিয়া। বিজ্ঞানের পূর্ণ এক প্রতিফলন ছিল এখানে। মনে করেছিলাম, এর মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে যাবে। শুরুটা গল্পের ভিত্তি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু চালিকাশক্তি হতে পারেনি। যখন থেকে শত্রুপক্ষ গল্পে প্রবেশ করেছে, তখন থেকে বিজ্ঞান বলি বা ইতিহাস; পুরোটাই পার্শ্ব চরিত্র হয়ে ওঠেছে। অথচ উপন্যাসের মূল চরিত্রে একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন। তারপরও সেই দিকটা ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন লেখক।
অথচ বইয়ের নামানুসারে বিজ্ঞান বা কোড ভেঙে অভিযান পরিচালনা করার গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই বিষয়টা আর হয়ে ওঠেনি। হ্যাঁ সূত্র ধরে আমাজনের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনার বিষয় এলেও আমার কাছে পুরোটা বোধগম্য হয়নি। বরং বেশিরভাগ বিষয়টা কাকতালীয় লেগেছে।
আক্রমণের বিষয়টাও এমন। এত এত আক্রমণ হয়েছে, গোলাগুলি চলেছে, রকেট লঞ্চার মারা হয়েছে; তবুও হতাহতের সংখ্যা নেই বললেই চলে। এমন হতো যদি সবাই অভিজ্ঞ, ট্রেনিংপ্রাপ্ত। কিন্তু রিজ্জি ছাড়া কেউ অভিজ্ঞ না থাকার পরও এভাবে বারবার বেঁচে যাওয়া কাকতালীয় বটে। কিন্তু অভিজ্ঞ মার্সেনারী দল ঠিকই হতাহত হচ্ছে। আবার আমাজন অভিযানের সময় যে সবাই বেঁচে গিয়েছে এমনও না। যারা আমাজনের জঙ্গলে লড়াই করে টিকতে পারেনি। তারা ওদের দলের কেউ না। মূল দল অক্ষত রেখে দুয়েকজনকে লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন, যে এই জঙ্গলে টিকে থাকা কঠিন।
তবে পাউলিনহো ঠিকই আঘাত পেয়েছিল। এখানে এত দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া কোনো একজনকে লেখক ঠিক ফুটিয়ে তোলেনি। এতগুলো চরিত্র, বিভিন্ন দৃশ্যে লেখক সবাইকে জায়গা দিতে পারেননি। হয়তো মনে ছিল না তার। হুটহাট মনে পড়লে তখন একজন দুইজনকে লেখক নিয়ে আসতেন। যেমন, দুর্গম পথে পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে পাউলিনহো যে আঘাত পেয়েছিল, সেটা খুবই গুরুতর। কিন্তু সেই আঘাতে তার যে কষ্ট হবে, সেটা অনেকগুলো দৃশ্যে অনুপস্থিত ছিল। পাউলিনহো নামের কেউ যে উপন্যাসে আছে, সেটাই একসময় ভুলে গিয়েছিলাম। পরে হয়তো লেখকের মনে পড়েছিল, তখন মাথা ব্যথা দিয়ে পাউলিনহোকে গল্প নিয়ে এসেছিলেন গুরুত্বপূর্ণভাবে।
আমাজনের প্রকৃতি লেখক ভালোভাবেই বর্ণনা করেছেন। কত বিপদ যে সামনে এসে দাঁড়ায়, কত কষ্ট করতে হয়; সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যার খোঁজে ওদের এই অভিযান, কাকতালীয়ভাবে তা পেয়ে যাওয়া ঠিক পছন্দ হয়নি। যেন লেখক কিছু করতে না পেরে জোর করে সমাধান করে দিয়েছেন। চরিত্রগুলোর মাথা খাটাতে হয়নি। এছাড়া প্রতিটি আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া, ঘটনাক্রম যেন কাকতালীয় কিছুর উপর ভিত্তি করেই ছিল।
আমি একটা বিষয় ঠিকঠাক বুঝিনি, এই অভিযায়ের কারণ কী? কেবলই স্বর্ণমানব খোঁজা? সেটা নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু শত্রুপক্ষ কীসের ভিত্তিতে আক্রমণ চালাচ্ছে? তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়নি। হ্যাঁ, লেখক ব্যাখ্যা দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাও যে গোঁজামিল মনে হয়েছে। কোনো সুসংগত যুক্তি সেখানে ছিল না। খলচরিত্রের পক্ষ থেকেও পুরোপুরি ঘটনা তুলে ধরা হয়নি। একটা বা দুইটা দৃশ্য ছিল কেবল। তাদের কার্যক্রমও ধোঁয়াশায় ঘেরা। এর দৌড়ঝাঁপ, মানুষের মৃত্যু, হত্যাযজ্ঞ যে কারণে ঘটেছে; তার কারণ সম্পূর্ণ অজানা এখানে।
তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে দলটার লড়াকু মনোভাব। হারার আগে হেরে না যাওয়ার প্রচেষ্টা। টিকে থাকতে হলে প্রকৃতির কাছে নিজেকে বিসর্জন দিতে হয়। প্রকৃতির মতো করে গড়ে উঠতে হয়। তবেই না প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। বইতে এল ডোরাডো সম্পর্কে যে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়েছে, সেটা ভালো লেগেছে। প্রচলিত চিন্তাধারায় না গিয়ে লেখক ভিন্ন ভাবনায় সাজিয়েছেন এই রহস্য।
চরিত্রগুলো এখানে একটু দূর্বল। বেশ কিছু চরিত্রকে গুরুতে দেওয়া হলেই রিজ্জির ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। সবই ভাসাভাসা। চরিত্রগুলোকে ঠিকঠাক গুরুত্ব দিয়ে গভীরে যাওয়া হয়নি। আরেকটি বিষয় দৃষ্টিকটু লেগেছে, চারিদিকে গোলাগুলি হচ্ছে আর বেন ও জুলি সবার সামনে রোমান্স করছে। এটা তো পরেও করা যেত। এটা লেখকের দুর্বলতা প্রকাশ করে। তিনি স্বাভাবিকতা আনতে ব্যর্থ হয়েছেন এখানে। যেন আগে থেকেই জানতেন তার চরিত্রগুলোর কিছু হবে না।
▪️অনুবাদ, বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
অনুবাদক হিসেবে আহমেদ সাদকে পাশ মার্ক দেওয়াই যায়। প্রথম অনুবাদ হিসেবে তিনি দারুণ করেছেন। সহজ, সাবলীল। একবারের জন্যেও মনে হয়নি এটি তার প্রথম অনুবাদ। তবে কিছু জায়গায় উন্নতির সুযোগ আছে। যেমন শুরুর দিকে ড. য়ুকে একবার য়ু, আরেক জায়গায় উ বলে সম্বোধন করছিলেন। ব্রাজিলকে এক জায়গায় সাউথ আফ্রিকার বলা হয়েছে। আমি জানি না বই প্রকাশের আগে প্রকাশক প্যানেল থেকে পড়া হয় কি না, হলে তো এগুলো চোখে লাগার কথা। না-কি তাও বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত নন?
আরেকটা বিষয় অনুবাদকের জানা উচিত। স্প্যানিশ ভাষায় Carvajal-কে কারভাহাল উচ্চারণ করা হয়, কারভাজাল নয়। এক জায়গায় দেখলাম অনুবাদক ফার্মাসিউটিক্যালকে ফার্মাটিক্যাল আবার আরেক জায়গায় ফার্মাসেটিক্যাল লিখেছেন। অনুবাদকের প্রবাদ নিয়েও একটু পড়াশোনা করা জরুরি। তিনি প্রমাদ গুণে-এর পরিবর্তে, প্রলাপ গুণে লিখেছেন। আবার ঘোঁট পাকানো-কে ঘুঁট পাকানো লিখেছেন।
কিছু অংশে এক দুইটা শব্দের অনুপস্থিতি অর্থ বিভ্রাটের সুযোগ করে দিয়েছে। সবটা তো মনে নেই। এক জায়গায় লেখা ছিল, নাম জানা অসংখ্য নদী। যেখানে হওয়ার কথা ছিল, নাম না জানা অসংখ্য নদী। এই ছোটখাট কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ভুল অনুবাদের মান কমিয়ে দেয়। এর দায় অনুবাদকের চেয়ে প্রকাশনীর বেশি অবশ। সম্পাদনা ঠিকঠাক না করালে এগুলো বেশ চোখে লাগে। অথচ প্রকাশনী থেকে একবার পান্ডুলিপি পড়লেই ঠিকঠাক করে ফেলা সম্ভব। বানান ভুল বা ছাপার ভুলের কথা তো বাদই দিলাম।
প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। যদিও আমার একটা প্রশ্ন আছে। প্রচ্ছদে একটি হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পুরো গল্পে হেলিকপ্টারের ব্যবহার নেই। তাহলে?
▪️পরিশেষে, আমাজন এমন এক জঙ্গল যেখানে রহস্যের সংখ্যা অগণিত। মানুষ মনে করে মানুষ পৃথিবীর সব রহস্য সমাধান করে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃতি নিজের রহস্য নিজেই গোপন রাখতে পছন্দ করে। চেষ্টা করলেও এর নাগাল পাওয়া যাবে না। কিছুতেই না।
▪️বই : দ্য আমাজন কোড
▪️লেখক : নিক থ্যাকার
▪️অনুবাদ : আহমেদ সাদ
▪️প্রকাশনী : সফা প্রকাশন
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩/৫