পাবলিক লাইব্রেরিতে শাহাদুজ্জামানকে আবিষ্কারের ঘটনা এখনো স্মৃতিতে জাগরুক। "কয়েকটি বিহবল গল্প"র পাতা উল্টেই সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি,
"যে আমার নীরবতা বুঝবে না সে আমার ভাষাও বুঝবে না।"
একযুগ পার হয়ে গেছে, লেখকের প্রতি আগ্রহ এখনো অটুট। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও লেখায় তাঁর জীবনের নানান অধ্যায় সম্বন্ধে বিচ্ছিন্নভাবে অনেককিছু জানা গেলেও লেখক সাজ্জাদ হুসাইন প্রথমবারের মতো শাহাদুজ্জামানের জীবনের আদ্যোপান্ত নিয়ে হাজির হয়েছেন "শাহাদুজ্জামানের আত্মকথন : জ্যোৎস্নালোকের সংবাদ" বইতে।শাহাদুজ্জামানের ছেলেবেলা, ক্যাডেট জীবন, লেখক হওয়ার প্রস্তুতি, মেডিকেল কলেজে পড়া, আত্মপরিচয়ের সংকট, চাকরি ও লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ -এসব বিষয় নিয়ে সাজ্জাদ হুসাইন সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সিলেটের শাহজীবাজারে শাহাদুজ্জামানের বেড়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধ, ক্যাডেট স্কুলে ভর্তি হওয়া, ক্যাডেট জীবনের সাথে নিজের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক শাহাদুজ্জামান অকপটে ব্যক্ত করেছেন। তবে ক্যাডেট জীবনের শৃঙ্খলা তাকে পরবর্তী জীবনে একের সাথে অন্যটার সম্পর্কহীন কাজ পরপর করে যেতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষত পেশাগত কাজ সমাপ্ত করেই লেখালেখি করার ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছে। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে লেখক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং চিকিৎসক হবেন নাকি অন্য পেশায় যুক্ত হবেন তা নিয়ে তুমুল দোটানায় পড়ে যান। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতার সাথে যে কেউ নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবেন। একটা দুঃখজনক ব্যাপার, সে সময়ের মেডিকেল কলেজে জামায়াতে ইসলামের রাজত্ব ও অরাজকতা এবং নিজের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখক আগেও কিছু বলেননি। সাজ্জাদ হুসাইনও সে সুযোগ হেলায় হারিয়েছেন (মাত্র এক অনুচ্ছেদ ব্যয়িত হয়েছে এ ব্যাপারে।)
লেখক কর্মজীবনের শুরুতে ব্র্যাকে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান যা তার লেখকজীবনে চিরস্থায়ী ছাপ রাখে।সাধারণ ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের সাথে মিশে এক বিচিত্র জগতের সন্ধান পান তিনি।তার নিজের ভাষায়,
"এইসব এক্সপেরিয়েন্স আমাকে বলা যেতে পারে নতুন করে প্রস্তুত করেছে। আমি তো এতকাল এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল জীবন যাপন করেছি। বইপত্র পড়া... অক্ষরকেন্দ্রিক জ্ঞান। বইয়ের ভিতর দিয়ে জীবনকে জেনেছি। ফিল্ম... গদার, ব্রেখট্, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, মার্ক্স, ফুকো এগুলোর ভিতরে থেকেছি। কিন্তু এই কাজ করতে এসে জীবনের ভিন্ন জঙ্গমতার অভিজ্ঞতা হলো। সেই সময়ে আমার কাছে মনে হল যে, আসলে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানার বাকী আছে। অনেক কিছু বোঝার বাকী আছে। আমি তাদেরকে দেখে আমার নিজের জীবনকেও নতুন করে বুঝলাম। গ্রামকে দেখে আমি শহরকে বুঝতে পারলাম। আমি যে গ্রামকে খুব ভালো বুঝতে পারলাম, সেটা বলব না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের দুর্বলতার পাশপাশি শক্তিগুলোও বুঝতে পারলাম ।"
কথাসাহিত্যিক হিসেবে শাহাদুজ্জামান সতত নিরীক্ষাপ্রবণ ও কিছুক্ষেত্রে দুর্বোধ্য হলেও মানুষ হিসেবে তিনি বরাবরই সরল। এই সারল্য আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি অবলীলায় বলতে পারেন,
"এই জীবনে যা সত্য, সুন্দর, শুভ বলে বুঝেছি- সেটা নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলতে চাই। আমার অভিজ্ঞতাটাকে, আমার যে বেদনা আছে, সেই বেদনাকে কোনোভাবে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা হতো। এর সাথে সাহিত্যিক হওয়া, সাহিত্যিক নেটওয়ার্ক রাখা, কারও সাথে মিলেটিলে... চল ভাই আমরা সাহিত্য করি । একে অন্যকে ভালো বলি । তুমি বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখক। ও বেস্ট গদ্যকার। একে অন্যকে নাম্বার দেয়া- এসবে আমার আগ্রহ ছিল না । আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নিজের কাছে অনেস্ট থেকে সাহিত্য করে গেলে মানুষকে সেটা স্পর্শ করে। দলাদলি করা লাগে না।"
এইবার বলি বইয়ের লেখক ও সাক্ষাৎকার গ্রহীতা সাজ্জাদ হুসাইন সম্বন্ধে। তার লেখায় উপমা ও কাব্যের ছড়াছড়ি বিরক্তিকর। কিছু কিছু লাইনের অর্থ উদ্ধার করতে কয়েকবার পড়তে হয়েছে। যেমন- "এবারে চোখে একপশলা স্থিরতার ছটা আবছা আলোর রজ্জু টেনে দিলো। " ভাগ্যিস উনার নিজের অংশ বইতে খুবই কম। না হয় পড়তে কষ্ট হয়ে যেতো। প্রশ্ন করার ধরনও বিশেষ ভালো লাগেনি। শুধু শাহাদুজ্জামানের কথার জোরেই বইটা উতরে গেছে।
শাহাদুজ্জামানের লেখার মতোই তাঁর কথোপকথন গভীর মননশীল। উনি খুব ভেবেচিন্তে কথা বলা মানুষ। উনার জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গভীর ভাবনা আমাদের সমৃদ্ধ করে। তাছাড়া প্রিয় লেখকদের জীবন সম্পর্কে জানার কৌতূহল তো প্রবল হবেই। সেই কৌতূহল থেকে শাহাদুজ্জামানের সাক্ষাতকার যখন যা পেয়েছি শুনেছি কিংবা দেখেছি। সশরীরে উনার ঋদ্ধ আলোচনা শুনবার সুযোগও একবার পেয়েছি। প্রিয় লেখক ও প্রিয় পাঠকের একসাথে দেখা পাওয়ায় সেদিনটি ছিলো আমার জন্য অবিস্মরণীয়।
শাহাদুজ্জামানের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা দর্শন রয়েছে। জীবনের নানান উত্থান পতনে তিনি কখনো বিহ্বল হয়েছেন, কখনো নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে দিশেহারা, অতল গভীর জীবন জিজ্ঞাসার তড়পেছেন। সেসবের অভিজ্ঞতা তাকে দিয়েছে নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি। আসলে পৃথিবী তে নতুন গল্প বলতে কিছুই নেই, একই গল্প একাধিক গল্পকার কাছে ভিন্ন গল্প হয়ে উঠে। শাহাদুজ্জামানের সাহিত্যিক অন্তর্দৃষ্টি তাকে বিশেষ করে তুলেছে। সাধারণত যে কোন সাক্ষাৎকারেই সাক্ষাৎপ্রদানকারী কে গৎবাঁধা কিছু প্রশ্ন করেন, এবং দেখা যায় একজন লোক একেকসময় এক প্রশ্নের নানা উত্তর দেন। কিন্তু শাহাদুজ্জামানের উত্তর আমি সবসময় এক দেখেছি। এটা প্রমাণ করে যে তিনি নিজ সাহিত্যিক আদর্শের কথা যখন তিনি বলেন, সেটাতে স্থির প্রতিজ্ঞেয় হয়েই তা বলছেন।
উক্ত বইটিতে আমি শাহাদুজ্জামানের ব্যাপারে যা জানি তা ই ঘুরেফিরে এসেছে। এবং এই রিপিটেশন আমার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি বরং ভালো লেগেছে। মতি মিয়ার রেফারেন্স টেনে বলতে হয় যে প্রিয় কথা দিনে দশবার শুনা যায়। তবে সাজ্জাদ হুসেইনের প্রশ্ন করার ধরণ ভালো লাগেনি। বইয়ের দাম এত বেশি যে আমার মতো বেকার সাহিত্যপ্রেমীদের হাতের নাগারের বাইরে। অথচ শাহাদুজ্জামানের লেখার চর্চা সার্বজনীন হওয়া উচিত। বাঙালি তরুণদের কাছে শাহাদুজ্জামান সহজলভ্য করা উচিত বলে আমি মনে করি।
আমি আজীবন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে ফ্যাসিনেটেড ছিলাম। ভদ্রলোক তার জীবনে তিন গুরুকর্ম অতি সফলতার সাথে করেছেন - আড্ডা, বইপড়া ও ঘোরাঘুরি। যখন "অর্ধেক জীবন" পড়ি তখন আমি কলেজের ছাত্র। গল্পের বই পড়ায় বিশাল রেস্ট্রিকশন। ছেঁড়াফাঁটা বইটার অংশ আমি পকেটে নিয়ে ঘুরতাম। আশেপাশে নজর বুলিয়ে যখন দেখতাম কেউ নাই, তখনই টুক করে পকেট থেকে বের করে পড়া শুরু। সেই তালিকায় শাহাদুজ্জামানও যোগ হলো।
কথাসাহিত্যিকদের জীবনই কি এত বৈচিত্র্যময় নাকি তাদের শব্দের জাদুবলে তা বৈচিত্র্যময় দেখায় তা নিয়ে আমি সন্দিহান। হুমায়ূনের জীবনের কাহিনীগুলো পড়তে গিয়ে আমার বার বার মনে হয়েছে - নাহ! কাহিনীগুলো নির্ঘা�� বানোয়াট। জীবন কি আসলেই এত সুন্দর! শাহাদুজ্জামানের জীবন সম্পর্কেও আমার অনুভূতি ঠিক তাই! শাহাদুজ্জামান হালের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক। তাই ত���র জীবন নিয়েও কিছুটা আগ্রহ ছিলই বৈকি। বিশেষ করে, মেডিকেল থেকে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে যাওয়ার যাত্রাটুকু তা নিয়ে আগ্রহী ছিলাম বেশি।
প্রকৃতির কোল ঘেঁষা পাওয়ার প্ল্যান্টের কোয়ার্টারে শৈশব কাটে শাহাদুজ্জামানের। সেখানকার ভিন্নধর্মী স্কুল, প্রকৃতির বিবরণ কিংবা পাহাড়ের সন্ন্যাসী বাবা - সব কিছুই বেশ লেগেছে জানতে। এরপর যুদ্ধ এবং যুদ্ধের পর ক্যাডেট কলেজের আখ্যান। এই পার্ট টুকুতে কিঞ্চিৎ নস্টালজিয়ায় ভুগেছি। কলেজের প্রতি ভালবাসাকে তিনি স্টকহোম সিনড্রোমের সাথে তুলনা করেছেন।
কলেজ থেকে বেরিয়ে বন্ধুর সাথে ইন্ডিয়া ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তারপর চট্টগ্রাম মেডিকেলে পড়ার সু্যোগ হয় লেখকের। যদিও ভেবেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। মেডিকেল জীবনে শাহাদুজ্জামান অনেক দ্বিধায় ভুগেছেন। মেডিকেলের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইলেও পরবর্তীতে বাবার অনুরোধে শেষ করেন।ফিল্মমেকার হয়ত হয়েই যেতেন কিন্তু গান শেখার গুরু যখন শিল্পের যন্ত্রণার বিষয়টা আঁচ করান তখন তিনি আস্তে ধীরে লেখালেখিতে নজর দেন। বামপন্থী রাজনীতি থেকেও দূরে সরে আসেন। মেডিকেল জীবনের সঙ্গী যারা ছিল তাদের জীবনে পাওয়া আসলেই সৌভাগ্যের ব্যাপার। যেমন, সিনিয়র ডাক্তার বাবু। ভদ্রলোকের ছিল বই সংগ্রহের বাতিক। সমসাময়িক একাডেমিক কিংবা থিওরেটিক্যাল সকল বইয়ের জোগান থাকত ভদ্রলোকের কাছে। সেই বাড়িতেই ডিসপেন্সারি বন্ধ করে বইয়ের উপর ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয়ার বিষয়টা ভেবেই ভাল লাগে। জীবন বড় অদ্ভুত। জীবনের মোড় কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় বলা মুশকিল। তবে আমরা খুশি হতেই পারি, জীবনের মোড় শাহাদুজ্জামান কে লেখক হওয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
মেডিকেল থেকে ব্র্যাকে কাজ করার অংশটুকু অভিনব ও বইয়ের সবচেয়ে দুর্দান্ত অংশ। মায়ের ফজলে হাসান আবেদের সাথে যোগাযোগের দরুন ব্র্যাকে কাজ করার সুযোগ হয় শাহাদুজ্জামানের। সেই ব্র্যাকে কাজ করার অভিজ্ঞতাটুকুই তৈরি করেছে আজকের শাহাদুজ্জামানকে। শাহাদুজ্জামানের যা কিছু মুগ্ধকর তা এসেছে তার জনজীবনের সাথে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতার ফলে। জনজীবনের গল্প বলেছেন তিনি। তাদের কাছ থেকে অনুভব করেছেন। বাংলাদেশের যে শক্তিশালী একটা দিক রয়েছে সেটাও তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। একটা ঘটনা পড়ে ব্যাপক মজা পেয়েছি, একদিন তিনি পুকুরপাড়ে বসে একজনের সাথে গল্প করছিলেন। লোকটি হঠাৎ পুকুড়ে ঢেউ দেখেই বলে উঠলেন, আর এটা তো শইল মাছ। ঢেউ দেখে মাছ চেনার ক্ষমতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
নিজ স্ত্রী পাপড়ীনের সাথে পরিচয় ব্র্যাকে কাজ করার মারফতেই। স্ত্রীর সাথেই নিজের রুচির মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। পাপড়ীন ছিলেন স্বল্পভাষী, কথা বলতেন কম। তাই শাহাদুজ্জামান একদিন অভিমান করে বলেছিলেন, এত কম কথায় মনের কথা বুঝব কিভাবে! জবাবে পাপড়ীন বলেছিলেন, যে নীরবতা বুঝে না, সে আমার ভাষাও বুঝবে না। হা হা!
শাহাদুজ্জামান এই লাইন লিখে একটা বই উৎসর্গ করেন। এই লাইন তখন অনেক হিট খেয়েছিল। অনেক যুবক গেঞ্জিতে প্রিন্ট করে ঘুরে বেড়াত।
ব্র্যাকে কাজ করার মাঝে মাঝেই সাক্ষাৎকারের কাজগুলো করেন। ইলিয়াস সাহেবের সাথে পরিচয় হয় লেখকের। ইলিয়াস সাহেব কিভাবে খোয়াবনামা লেখার জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন সেই গল্পও উঠে এসেছে। মাওলা ব্রাদার্সে ৯৬ সালের দিকে নতুন লেখকদের পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতা হয়। শাহাদুজ্জামানের আগে অনেক লেখা পত্রিকা, লিটল ম্যাগে ছাপলেও পুস্তাকারে ছাপা হয় নাই কখনো। স্ত্রী এবং বন্ধুর উৎসাহে লেখাগুলো একত্র করে জমা দেন শাহাদুজ্জামান। এখানেও রয়েছে চমকপ্রদ কাহিনী, যে কম্পোজারের লেখক কম্পোজ করাতেন উনি টাইপ করতে করতে নিজেও গল্পের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলেন। গল্প লেখার মাঝে মাঝে মুচকি মুচকি হাসতেন আর বলতেন, এই গল্পটা খুব মজা লাগছে। পরবর্তীতে তাঁর পান্ডুলিপি নির্বাচিত হয় এবং লেখকের জগতে তিনি পূর্ণরূপে প্রবেশ করেন। বইয়ের প্রোডাকশন দুর্দান্ত কিন্তু দাম মাশাল্লাহ। আর সাক্ষাৎকার নেয়ার তরিকাটা ভাল লাগে নি। শাহাদুজ্জামানের মুগ্ধ করা সহজিয়া বয়ানের পর খটমটে ভাষায় প্রশ্নকর্তার বিবরণ কিংবা প্রশ্ন দুটোতেই তাল কেটেছে বার বার। কিন্তু, তবুও পড়তে ভাল লেগেছে কেননা শাহাদুজ্জামান মানেই মুগ্ধতা।
শাহাদুজ্জামান একুশ শতকের অন্যতম চমৎকার গল্পকার। এই বই সাক্ষাৎকার আকারে তার আত্মকথন বা লেখক হয়ে উঠার গল্প। বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে তার প্রকাশিত প্রথম গল্পের নামানুসারে। বইটাকে মোটাদাগে চারটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।
প্রথমেই শাহাদুজ্জামানের ছেলেবেলা। এই সময়টা কেটেছে তার বাবার কর্মস্থল সিলেটের শাহজীবাজারে। সাহিত্যের অধ্যাপিকা মা ও ইঞ্জিনিয়ার বাবার প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই তিনি সংস্কৃতিমনা ও বইপড়ুয়া হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করেন। ঠিক স্পষ্ট না হলেও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই সময়টাতেই। ওই প্রেক্ষিতেই পরে "মাজার, টেবিল টেনিস ও আসলি মোরগ" গল্পটা লিখেছিলেন। পরিবার, পরিবেশ এবং শিক্ষকেরা তার পরবর্তী জীবনে বেশ গুরুত্ববহ ভূমিকা রেখেছে।
দ্বিতীয় অংশ তার ক্যাডেট জীবন নিয়ে। মির্জাপুর ক্যাডেটে কাটানো সময়গুলো ছিলো তার জীবন গড়ে তোলার সোপান। সেখান থেকে তিনি জাতীয় মঞ্চে বিতর্ক করেছেন, দাবা খেলেছেন। তার সংস্কৃতি প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য দারুণ প্লাটফর্ম ছিলো এই ক্যাডেট কলেজ। এই সময়কালের স্মৃতিচারণে তিনি লেখেছেন "খাকি চত্বরের খোয়ারী" বইটি।
এরপরই আসে তার জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়া অংশ, মেডিকেল জীবন। আগে থেকেই সংস্কৃতিমনা শাহাদুজ্জামান এসময়ে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন পুরোদস্তুর শিল্পী হিসেবে। বেতারে গান করতেন, গান শেখার জন্য গুরুর বাসায় সারাদিন পড়ে থাকতেন। আবার অন্যদিকে ফিল্ম বানানোর ভূত চেপেছিল মাথায়। এতোদিকের এতোকিছুর ভীড়ে মেডিকেলের পড়ায় মন বসেনা। ড্রপ দিলেন ইয়ার। তাকে নিয়ে দুঃশ্চিতায় আশেপাশের সবাই। আসলে কী করা উচিত এই দ্বিধায় কেটে যেতে লাগলো সময়। তার জীবনের এই সময়টাকে ভীষণ দুর্বিষহ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। অতঃপর একসময়ে তিনি নিজের অস্তিত্ব খুজে পেলেন লেখালেখির জগতে। যে লেখালেখির বদৌলতে আজকের শাহাদুজ্জামানকে আমরা পেয়েছি। নিরুদ্দেশ, হতাশ শাহাদুজ্জামানের এই অংশটা কেন জানি বেশিই পছন্দ হলো। হয়তো নিজের সাথে মিলে গেল বলেই!
মেডিকেল শেষ করার পর ব্রাকের হয়ে কাজ করার সময় তিনি বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এসময়ে তিনি মাটি ও মানুষের জীবনকে দেখলেন খুব কাছ থেকে। প্রত্যেকটা ব্যাপার তিনি নতুন করে ভাবতে শিখলেন। তার গল্পগুলোতেও আনলেন নতুন মাত্রা। এরপর তার প্রবাস জীবনে বিশাল একটা সময় কাটালেও সে আলোচনাটা বইতে আসেনি খুব একটা। পুরোটা সময় তিনি দেশের ব্যাপারেই মোহাচ্ছন্ন হয়েই কথা বলেছেন।
এই বইয়ের চোখে দিক বলতে গেলে শুরুতেই আসবে দাম। ১৬০ পাতার একটা বইয়ের গাত্রমূল্য ৭০০ টাকা! বইয়ের শেষদিকে বেশকিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। সাজ্জাদ হুসাইনের সাক্ষাৎকার নেয়ার ক্ষেত্রে কাঠখোট্টা শব্দচয়নও বিরক্তির উদ্রেক করেছে। বিপরীতে শাহাদুজ্জামানের ভাষ্যে তার গল্পগুলো বেশ ঝরঝরে। পড়তে এমনিতে বেশ লাগলো।
শাহাদুজ্জামানের সাথে প্রথম পরিচয় কেশের আড়ে পাহাড়, সম্ভবত। দ্বিতীয় পাঠের নাম অবশ্যই খাকি চত্বরের খোয়ারি নহে, তবে রেললাইনে মাথা দিয়ে জীবন বিসর্জন দেয়া মিলনের সেই উপন্যাস আমার বিশেষ পছন্দের। পার্টনার ক্যাডেট ছিল বলে পরবর্তীতে মিলনের নানা বিষেদগার এবং বিষাদ মেলানোর চেষ্টা করেছি কৌতুহলে। অবশ্য আইয়ূবের আমলে এলিট বানানোর আঁতুড়ঘর হিসেবেই যে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসের সূচনা, সে তো সত্যিই৷
এই কথোপকথনের সূচনা কিংবা সমাপ্তি অবশ্য শুধু লেখকের মির্জাপুর ক্যাডেট জীবন নিয়ে নয়, সমস্তটাই। রবিবুড়ো লিখে গিয়েছিলেন-- 'বোঝা যায় আধোপ্রেম, আধখানা মন/ সমস্ত কে বুঝেছে কখন'! সামগ্রিক জীবনও অন্যের জবানীতে বোঝা কিংবা বোঝানো কঠিন, বিশেষত অনুলেখক যদি সাজ্জাদ হুসাইনের মতো নাটুকে ভাষায় স্বছন্দ হন!
ব্র্যাকের পাবলিক হেলথ স্কুলের সাথে শাহাদুজ্জামানের সংশিষ্টতা বহু বছরের। বেশ ক'বছর আগে চাকরিসুত্রে নিজে যখন সংশ্লিষ্ট ছিলাম সেখানে, এক ওয়ার্কশপে স্যারের সাথে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। অটোগ্রাফ নেওয়ার সময় গড় গড় করে অনেকগুলো বইয়ের নাম বলতে পারায় বেশ প্রসন্ন হাসি দিয়েছিলেন মনে পড়ে।
শাহাদুজ্জামানের ছেলেবেলার নাম শাহজীবাজার। ইন্টারেস্টিংলি মাত্রই শেষ করা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন জোবেদা রহমান লিনুর আত্মজীবনী 'জীবন-জালের এপার ওপাড়ে'ও সিলেটের একই এলাকার নাম শুনেছি৷ দুটো বইতেই জানা গেল, অতি ঘনিষ্ঠ ছিল দুই পরিবার, উচ্চ পদস্থ এবং তখনকার আমলের তুলনায় কর্মসুত্রে সরকারি বাংলো, গাড়ি আর জাপান কিংবা ফ্রান্স থেকে সফরসুত্রে নিয়ে আসা ইম্পোর্টেড ইলেকট্রনিক গ্যাজেটসে সামর্থ্যবান, সংস্কৃতিমনা বাবারা ছিলেন সহকর্মী৷ তবে লিনুর জবানীতে স্বাভাবিকভাবেই ছিল না, শাহাদুজ্জামান-ও বাল্যে ভালোই খেলতেন।
ভালো করতেন আরো অনেককিছুই। বিনয়ী ভাষায় গড়পড়তা ছাত্র ছিলাম, কখনোই কলেজে খুব চোখে পড়ার মতো ফলাফল করতে পারিনি বলে শৈশবঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাধ্যমিকে বোর্ড স্ট্যান্ড করার খবরে চলে গেলেও এতটুকু বোঝাই যায়, অন্তত শেষদিকের ছাত্র ছিলেন না কখনোই। নয়তো দূর্বল দৃষ্টিশক্তির খামতিকে ক্যাডেটের কঠোর এডমিশন কমিটি এড়িয়ে যেতো না ভর্তি যুদ্ধের ময়দানে। ছিলেন সু-তার্কিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর চেনা মুখ, আকন্ঠ গ্রন্থকীট এবং অন্তর্মুখী৷ সেকারণেই পরবর্তীতে অনিচ্ছুক মেডিকেল জীবনে ছাত্র রাজনীতি, ফিল্মমেকিং, থিয়েটার, বেতারের তালিকাভুক্ত সংগীত জীবন --সব ছেড়ে থিতু হয়েছেন অধ্যাপনায়, লেখার জগতে। যেখানে অপ্রকাশ্য ভাবে ভাবপ্রকাশের সুযোগ অনিবার, নিজের মতো করে!
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে যৌবন কেটেছে বলে পরবর্তীতে শাহাদুজ্জামানের কথায় বারবার ভেসেছি নস্টালজিয়ায়। কারণ নন্দনকাননের সেই প্রাচীন সংগীত পরিষদ, চেরাগী পাহাড় কিংবা জামাল খান, নাসিরাবাদ হাউজিং -- এসব আমার ভীষণ চেনা পথ। সেকেন্ড প্রফেশনাল অব্দি তাক লাগানো নাম্বার তুলতে তুলতেই আচমকা চিকিৎসা বিদ্যার পুঁথিগত পাঠে অনাগ্রহী হয়ে ঝুঁকে পড়েন থিয়েটার, ফিল্মমেকিং, আলোকচিত্র নানা বিষয়ে৷ সংগীতেও আগ্রহ ও দখল দুটোই থাকায় বেতার বাংলাদেশ চট্টগ্রামেও সংগীতপরিবেশনকারী হিসেবে তাঁকে এ সময়েই পাওয়া যাবে৷
তবে জীবন, জীবিকা ও পরিবারের চাপে পরবর্তীতে ঘরের ছেলে ঘরে ফেরে, মানে মেডিকেলে৷ দু বছর গ্যাপের পর সসম্মানে ইন্টার্নিশিপ শেষে লেখক বিয়েও সারেন চট্টগ্রামের পরিচিতি সুত্রেই৷ এরপর চাকরি ব্র্যাকে, এনজিও কর্মী এবং পরবর্তী মেডিকেল এনথ্রোপলজিস্ট হিসেবে দীর্ঘ এবং সুবিখ্যাত ক্যারিয়ারের গোড়াপত্তন যার মাধ্যমেই৷ লেখকের নিজের ভাষার বক্তব্য-ই যদি হুবহু তুলে দেই-
এইসব এক্সপেরিয়েন্স আমাকে বলা যেতে পারে নতুন করে প্রস্তুত করেছে। আমি তো এতকাল এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল জীবন যাপন করেছি। বইপত্র পড়া... অক্ষরকেন্দ্রিক জ্ঞান। বইয়ের ভিতর দিয়ে জীবনকে জেনেছি। ফিল্ম... গদার, ব্রেখট্, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, মার্ক্স, ফুকো এগুলোর ভিতরে থেকেছি। কিন্তু এই কাজ করতে এসে জীবনের ভিন্ন জঙ্গমতার অভিজ্ঞতা হলো।
সেই সময়ে আমার কাছে মনে হল যে, আসলে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানার বাকী আছে। অনেক কিছু বোঝার বাকী আছে। আমি তাদেরকে দেখে আমার নিজের জীবনকেও নতুন করে বুঝলাম।
ব্র্যাক এবং ব্রিটেনের উচ্চতর শিক্ষা এবং পরবর্তীতে গবেষণাসুত্রে শাহাদুজ্জামান ঘুরে বেড়িয়েছেন অসংখ্য দেশ, প্রায় সমস্ত আফ্রিকা। পুত্রেরা প্রবাসে সেটেল হয়েছে কিন্তু খুব গতানুগতিকভাবেই অন্য অসংখ্য বাংগালী অভিবাসী পরিবারের সন্তানের মতোই পিতার সাহিত্যকর্ম সন্তানদের কাছে অপরিচিত-ই রয়ে গেছে। লাইফ ইজ অল এবাউট অপরচুনিটি কস্ট, এই সার সত্যকে মেনে নিয়ে লেখক মনোনিবেশ করেছেন নিজস্ব লেখালেখি আর আনুষ্ঠানিক গবেষণায়৷ পেছনে ফেলে আসা সবুজ পাসপোর্টের যে দেশ, তার সাথে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক যোগসূত্র রয়েছে সবর্দাই৷
বইয়ের একমাত্র ত্রুটি, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা নিজেই। গিমিক যখন ভাঁড়ামোর সীমা ছুঁইছুঁই করে, তখন পাঠকের পক্ষে সুশীল ভাষা ধরে রাখা মুশকিল। নিজের প্রকাশনা থেকে মৌলিক গ্রন্থ লিখে জুত করতে না পেরে যখন বিখ্যাত লোকজনের আত্মকথন লিখছেন-ই, তখন ছাপার ভুলে অন্তত আরেকটু মনোযোগ রাখা উচিত ছিল।
শাহাদুজ্জামান নিজে লিখলে চোখ বুঁজে ৫ দিতে পারতাম, তাতে সন্দেহ নেই। মাঝে মধ্যস্বত্বভোগীর জ্বালায় রাগী হেডমাস্টারমশাইয়ের মতো ১ কাটতে হলো। ৪/৫
কোথায় যেন পড়েছিলাম ‘লেখক হতে হলে এক বুকপকেট শৈশব থাকা চাই’। লেখাটির সত্যতা যাচাই করতেই কি-না জানি না, কোনো লেখকের লেখা ভালো লেগে গেলে আমি তার অদৃশ্য বুক পকেট খুঁজতে থাকি। ঠিক কতটা শৈশব বুকপকেটে রেখে তিনি লেখক হয়ে উঠেছেন সেটা জানার চেষ্টা করি। শাহাদুজ্জামানের লেখার সাথে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০১৬ এর পর। ততোদিনে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়ে গেছেন। আমার মনে পড়ে, কোনো এক সকালে শাহাদুজ্জামানের একটি গল্প পড়ে বিহ্বল হয়ে বসে ছিলাম। পরদিন একপ্রকার ঘোরগ্রস্থ হয়ে কিনে এনেছিলাম লেখকের আরো কয়েকটি বই। এরপর নানা সময়ে বন্ধুদের, প্রিয় মানুষদের উপহার দেয়ার সময় তালিকার উপরের দিকে সবসময় রেখেছি শাহাদুজ্জামানকে। একেকটা বই কয়েকবার কেনা হয়েছে। ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’র পর এখন অব্দি কোনো ফিকশন বই বের হয়নি শাহাদুজ্জামানের। আগের লেখাগুলো রচনা সমগ্র আকারে বের হচ্ছে। ফলে একই লেখা একাধিক বইতে চলে যাচ্ছে। নতুন বই মনে করে পড়া শুরু করার পর, ‘ওহ এটাতো পড়েছিলাম কোথায় যেন...’ বলে রেখে দিতে হচ্ছে। ‘জ্যোৎস্নালোকের সংবাদঃশাহাদুজ্জামানের আত্মকথন’ শিরোনামে সাজ্জাদ হুসাইনের একটি বই দেখে চোখ আটকে গেলো। নতুন মোড়কে পুরনো বই ভেবেই হাতে নিয়েছিলাম। তবে পাতা উল্টাতেই ভুল ভাঙলো। নতুন বই তো বটেই, এতকাল আমি যেই অদৃশ্য বুকপকেটের সন্ধান করছি, সেই বুকপকেট ঘাপটি মেরে বসে আছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়। এই বইতে যে শাহাদুজ্জামানকে পেলাম সে যতটা না লেখক শাহাদুজ্জামান তারথেকে বেশি শাহজীবাজারের মুন্না, ডাক টিকেট সংগ্রহ করা যার হবি। নিখাদ অরণ্য ঘেরা এক টিলায় যার বসবাস। শাহজীবাজার ওয়াপদা স্কুলে যুদ্ধের ঠিক আগে আগে যে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত একটি নীল শার্ট পরে হেঁটে বেড়ায়। মায়ের বানিয়ে দেয়া লাল মলাটের খাতার পোস্ট করে রাখে পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়া সব বরেণ্য মানুষের ছবি। শাহজীবাজারে মুন্না ওরফে শাহাদুজ্জামান বড় হচ্ছে গোটা বিশেক মুরগি পালন করতে করতে। স্কুলের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দিচ্ছে তার ইঞ্জিনিয়ার বাবা এবং বাংলার অধ্যাপিকা মা। যুদ্ধের একদম শেষদিকে সপরিবারে তারা পালিয়ে যাচ্ছে পাশের গ্রামে, আশ্রয় নিচ্ছে এক প্রাক্তন জমিদারের বাড়িতে। শাহাদুজ্জামান তার বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে নিজের শৈশবের কথা লিখেছেন। নানা গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে তার নিজের বৈচিত্রময় জীবন। কিন্তু কতটুকু গল্প আর কতটুকু আত্মজীবনী? সাজ্জাদ হুসাইনের মুখোমুখি হয়ে শাহাদুজ্জামান নিজেই উত্তর দিয়েছে এই প্রশ্নের। ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্ন গল্পের চরিত্র। দেখিয়ে দিয়েছেন শৈশব বা কৈশোরের কোন কানাগলি নেমে এসেছে এসব গল্প। পুরো বইটা জুড়ে আমি মূলত একটি প্রশ্নের পিছনে ছুটেছি, একটি উত্তর খুঁজেছি... কেন এতকিছু বাদ দিয়ে লেখার টেবিলে আসলেন শাহাদুজ্জামান। ক্যাডেট কলেজে এসে যে কিশোর স্বপ্ন দেখেছিল দাবাকে ক্যারিয়ার হিসাবে নিবে। ডাক্তারি পড়তে বসে এনাটমির বই দূরে সরিয়ে রেখে যে চিন্তা করেছিল হয়ে যাবে পুরোদস্তুর ফিল্মমেকার, সে কেন শেষমেশ লেখক হিসাবে থিতু হলেন? এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন শাহাদুজ্জামান। বলেছেন, ‘এই জীবনে যা সত্য, সুন্দর শুভ বলে বুঝেছি- সেটা নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলতে চাই।’ এই কথাবার্তা বলার জন্য বারবার একটি স্থায়ী ঠিকানা খুঁজেছেন তিনি। ডিবেটের মঞ্চ কাঁপিয়েছেন, ফিল্ম বানানোর জন্য দিনের পর দিন ঘুরেছেন, মঞ্চ নাটক করেছেন, নিয়েছেন সমকালীন সেরা লেখকদের সাক্ষাতকার। সবকিছুর শেষে এসে থিতু হয়েছেন আপদমস্তক ফিকশন রাইটার হিসাবে, নাকি সবকিছুতে ব্যর্থ হয়ে? সাজ্জাদ হুসাইনের এই বইতে আমি নতুন এক শাহাদুজ্জামানকে আবিষ্কার করেছি। খুঁজে পেয়েছি শাহাদুজ্জামানের অদৃশ্য বুকপকেট।
শাহাদুজ্জামানের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ক্রাচের কর্ণেল এর মাধ্যমে। এরপর আরো নানা বইয়ের মাধ্যমে পরিচয়টা মোটামুটি পাকাপোক্ত হওয়ার পর আমার হাতে আসে কথা পরম্পরা। আমার অন্যতম পছন্দের এই সাক্ষাৎকার সংকলনে আমি সাক্ষাৎকারগ্রহীতা হিসেবে শাহাদুজ্জামানকে দেখি নতুন আলোয়। তাঁর জিজ্ঞাসাগুলোর মধ্য দিয়ে মানসিক মিল পাই। একজন লেখকের সাথে মানসিক একাত্মতা অনুভব করতে পারলে তিনি যে প্রিয় হয়ে উঠবেন এ তো জানা কথাই। জ্যোৎস্নালোকের সংবাদ তাঁর প্রথম দিকে বের হওয়া একটি ছোট গল্পের নাম, সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত। সেই নাম থেকেই সাজ্জাদ হুসাইন এই আত্মকথনটির নামও রেখেছেন একই, সম্ভবত। কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শাহাদুজ্জামানের গড় জীবনটা উঠে এসেছে এই বইতে। আমরা শাহাদুজ্জামানের শৈশব থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটা ছবি দেখতে পাই। আরণ্যক আর স্বাধীনতায় ভরপুর একটা জীবন কাটিয়ে 'খাকি চত্বরের খোঁয়ারি'তে প্রবেশ করেন লেখক। ওই বইটা পড়লে তাঁর ক্যাডেট জীবন সম্পর্কে যে ধারণাটা হয় তা প্রায় নব্বই শতাংশই ঠিক। কিছুটা গল্পের প্রয়োজনে পরিমার্জিত হয়েছে, নাম পাল্টেছে এতো স্বাভাবিকই। মেডিকেল জীবনের শুরুতে সিরিয়াস থাকলেও এরপর কালচারালি অতিরিক্ত ইনভলভড হয়ে পড়েন, যার ফলে মেডিকেল শেষ করতে দু বছর দেরি হয়। কিন্তু দেরি হলেও তিনি তখনো বুঝতে পারেননি জীবনের উদ্দেশ্য। মেডিকেলে রাজনীতির প্রশ্নে বামঘরানার দীক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছেন, এদিকে সময়টা টালমাটাল, সমাজতন্ত্র বিরাট ধাক্কা খেয়েছে, এই সময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন এনজিওতে কমিউনিটি মেডিসিন বেইজড কাজ করবেন। ব্র্যাকের হাত ধরে কর্মজীবন শুরু, সাধারণ গড়পড়তা চিকিৎসক এর জীবন কাটাতে চাননি৷ তাই রোগী দেখা ডাক্তার না হয়ে চলে গেলেন পাবলিক হেলথ, পরে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে। কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে পরিচয় পাপড়ীন এর সাথে, যিনি প্রগলভা নন এবং বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁর বলা একটি কথাই বিপুলভাবে আলোড়ন তোলে পাঠকসমাজে, ' যে আমার নিরবতা বোঝে না, সে আমার ভাষাও বুঝবে না।' ঔপনিবেশিকতার নিগড় থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন, অথচ থাকেন ইউরোপে, এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স। তাই সচেতনভাবেই চেয়েছেন অন্তত টাই না পড়তে, কাঁটাচামচ পারতপক্ষে ব্যবহার না করতে। এ এক গোপন প্রতিবাদ তাঁর। এই ভাবনাটা আমার একটা ব্যক্তিগত ভাবনাকে একটু নতুন চোখে দেখাতে সাহায্য করল। আমি গয়নাগাঁটি কম পরি, সাজগোজ করি না। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এও আমার এক ধরনের গোপন প্রতিবাদই। শাহাদুজ্জামানের দুই ছেলের নাম সায়র আর নিয়র, আঞ্চলিক নাম৷ একটির অর্থ সাগর, পরেরটি শিশির। বাংলা বা আরবি বাদ দিয়ে এই লোকনাম নেয়াটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। ছোটবেলায় আরণ্যক জীবনের পাশাপাশি বাবা এবং মায়ের প্রভাবে প্রচুর বই পড়া শাহাদুজ্জামান ব্র্যাকের কাজ করতে গিয়ে বের হয়ে এসেছেন মিডল ক্লাস কমফোর্ট থেকে। জীবনকে দেখেছেন নতুন চোখে। ব্যক্তিগত দু:খবোধ রয়েছে সবারই, তাকে শক্তিতে পরিণত করেই এগিয়ে চলেছেন৷ যোগাযোগ রেখেছেন সবসময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে। শাহাদুজ্জামানের সাথে সাজ্জাদ হুসাইন এর সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের এই আলাপচারিতাটা একটা সুন্দর এবং ভাবুক সময়ের সন্ধান দেয়৷ ছাপাখানার ভূত নাম বলেই কি না কে জানে, ছাপায় কিন্তু বেশ ভুল! নামের সাথে কাজের মিল এই ক্ষেত্রে না থাকলেই খুশি হতাম।
দুর্দান্ত। ২০২৩ সালে আমার পড়া বেস্ট বই।শাহাদুজ্জামানের জীবন যে এত বৈচিত্র্যময় তা ভাবনার বাহিরে ছিলো।সাজ্জাদ হুসাইন দারুনভাবে শাহাদুজ্জামানের জীবনের ঘটনাগুলোকে লিপিবদ্ধ করেছেন।