অবধূত (১৯১০ - ১৩ এপ্রিল, ১৯৭৮) বা কালিকানন্দ অবধূত ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক ও তন্ত্রসাধক। তাঁর প্রকৃতনাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। পুত্র অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস (অবধূত) গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসজীবনে তাঁর নাম হয় কালিকানন্দ অবধূত। সন্ন্যাসজীবনে তাঁর ভৈরবী স্ত্রীও ছিল। হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় স্বপ্রতিষ্ঠিত রুদ্রচণ্ডী মঠে তাঁর মৃত্যু হয়। অবধূত ছদ্মনামে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে মরুতীর্থ হিংলাজ নামক উপন্যাস রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসটি অবলম্বনে একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন বিকাশ রায় ও উত্তমকুমার। তাঁর অপর বিখ্যাত গ্রন্থ উদ্ধারণপুরের ঘাট (১৯৬০)।
করাচি থেকে প্রায় ২৫০ মাইল দূরে বেলুচিস্তানের কাছাকাছি মাকরান মরুভূমিতে অবস্থিত হিন্দুদের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা তীর্থস্থান, হিংলাজ মাতার মন্দির। এবারে ভাবুন! একদল লোক পায়ে হেঁটে তীর্থ করতে যাচ্ছে সেই রুক্ষ-শুষ্ক মরুভূমির মাঝে দিয়ে। কেমন হবে সেই অভিজ্ঞতা? সেই অভিজ্ঞতার কথাই লিখে রেখে গেছেন কালিকানন্দ অবধূত। এককালে তিনি ছিলেন গৃহী ব্যক্তি। গৃহী নামও ছিল তার.. দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সন্ন্যাসী হয়ে গেলেন। আর সেই তান্ত্রিক সাধু ১৪ দিন পায়ে হেঁটে ধূষর মরুভূমি পারি দিয়ে মাতা হিংলাজের দর্শন করবার পর হয়ে গেলেন সাহিত্যিক। অই এক ভ্রমণ কাহিনি তাকে সারাজীবন মনে রাখার জন্য যথেষ্ট।
প্রায় ত্রিশ জনের একটা দল। দলে তীর্থ যাত্রী ছাড়াও আছে ছড়িদার, উটওয়ালা প্রভৃতি। তীর্থ করতে যাচ্ছেন এক ভৈরবীও। গোটা দলটার দায়িত্বে আছেন লেখক অবধূত মহাশয়। হাব নদীর তীর থেকে শুরু হয় তাদের বিপদসঙ্কুল পথে এক নিরলস যাত্রা। ও হ্যা! যাবার আগে হুঁশিয়ার সঙ্কেত দেয়া হয়েছে.. এ যাত্রা পথ খুব ভয়ংকর, অনেক কঠিন। এক জনের কুজোর জল অন্য জনকে দেবেন না, তা সেই ব্যক্তিটি আপনার যে-ই হোক না কেন! কারণ এতে দুইজনেরই জলতেষ্টায় মৃত্যুর আশংকা থেকে যাবে। এ হেন হুঁশিয়ারি সংকেত পেলে অতি বড় সাহসীরও বুক দুরুদুরু করে উঠবে। শুরু হলো হন্টন। ভাগ্য ভালো হলে ১৪ দিন পর যাত্রীরা পৌঁছবে অঘোর নদীর তীরে, পরদিন দেবী দর্শনের মাধ্যমে শেষ হবে তীর্থ। বিপদসঙ্কুল পথ, ডাকাতের ভয়, রাস্তা চিনতে না পারার ভয়, পানি শেষ হয়ে যাবার ভয়... পদে পদে বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আবাল্য পরিচিত এলাকা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতির এই রুক্ষ-কঠোর দেশে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার আদ্যোপান্ত বিচিত্র ভাবনা-জীবনাদর্শন আর হিউমারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক (ডেব্যু হিসেবে জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। সিরিয়াসলি!) বাইরে গ্রীষ্মকাল চলছে বটে! কিন্তু নিরাপদ গৃহকোণে বসে ফ্যানের হাওয়া খেতে খেতে আসলে মরুর আসল রুক্ষতা, ভয়াবহতা কল্পনা করা যায় না। বর্ণনা পড়ে যতোটুকুই বা কল্পনায় আসে.. গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবার জন্য যথেষ্ট।
বি.দ্র. আমি বাদল বসু আর সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। ভাগ্যিস তারা আত্মজীবনী লিখেছেন! আর তাতে অনেক অনেক অনেক বই প্রকাশের গল্প বলার মাধ্যমে পরিচয় করে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অনেক মণিমাণিক্যের। ধন্যবাদ ❤️
মনে করুন আপনার কোনো এক অ্যামেচার বন্ধু শখের বসে বা ঠেকায় পড়ে রান্না করতে বসলো। বেচারা আবার এর আগে কোনোদিন রান্নাঘরেই ঢুকেনি। আপনিও তেমন আহামরির কিছু আশা করলেন না। কিন্তু যখন দেখলেন বন্ধুটি গরম গরম ফ্রাইড রাইসের সাথে চিলি চিকেন রেঁধে এনেছে,অবাক হলেও আপনি প্রমাদ গুণবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু মুখে দিয়ে দেখলেন, এটা রীতিমতো একজন মাস্টারশেফের রান্না!
অবধূত মশাইয়ের বইটি পড়ে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। রীতিমতো হেলায়ফেলায় শুরু করা একটা ভ্রমণকাহিনীতে যে এমন টানটান থ্রিল,দর্শন,হিউমার পাবো কে ভেবেছিল! সরেস লেখনীতে ডুবে ছিলাম কদিন। লেখকের বর্ণনা এতোই প্রাণবন্ত যে,হিংলাজ যাত্রার প্রত্যেকটা জিনিস,স্থান চোখে ভাসছিল। যে মানুষটা সাহিত্যিক হিসেবে আগে কখনো কলম হাতে নেননি তার পক্ষে এমন একটা 'ক্লাসিক' পেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর না তুলে পারিনি।
মরুতীর্থ হিংলাজ মনে দাগ কেটে রাখলো। এই যাত্রার কথা কখনো ভুলা সম্ভব নয়। এরপর কখনো ভ্রমণসাহিত্য নিয়ে কথা বললে,সৈয়দ মুজতবা আলীর সাথেসাথে অবধূতের নামটাও সর্বদা উচ্চারিত হবে।
প্রায় ৮০ বছর আগের ভ্রমণকাহিনী। প্রায় সাধু ভাষায় রচিত অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী যে এতটা থ্রিল দিতে পারবে, আশা করিনি :) মাঝে মাঝে রম্যের ছোয়া স্বাদ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলায় আত্মস্মৃতিমূলক ভ্রমণকাহিনীর এক অনন্যসাধারণ নির্দেশন। একেবারে জীবন্ত মরুভূমির বর্ণনা, এত দিলখোলা, সহজ সরল, আকাশের মত উদার সব মানুষ, ভয়ঙ্কর ডাকাত, চির রহস্যময় প্রেম, দর্শন, তুফান, সূর্য, রাত আর তীর্থ। ভাষায় মাঝে মাঝে হিউমারের ছোঁয়া মুগ্ধ করে। গুলমোহাম্মদ, দিলমোহাম্মদ, কুন্তী, থিরুমল, শেরদিল, রুপলাল, সুখলাল, ভৈরবী আর পোপটলালের কথা মনের মধ্যে এমনভাবে নাড়া দেয় যেন কতদিনের আপনজন। মাঝেমধ্যে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অসংলগ্ন দার্শনিক আলাপ একটু কম হলে সোনায় সোহাগা হত।
সবুজে বসে দূরের এক মরুতে তীর্থ ভ্রমণের গল্প পড়ে শেষ করলাম।অবধূত, যাঁর প্রকৃত নাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তন্ত্রসাধক এবং সন্ন্যাসী হিসেবেও খ্যাতিমান ছিলেন।
'মরুতীর্থ হিংলাজ' তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। 'হিংলাজ' পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে অবস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান। করাচী থেকে যাত্রা শুরু করে উট,শুকনো খাবার-দাবার, লটবহর সমেত দলবেঁধে হিংলাজ অব্দি যাত্রার কাহন বুনেছেন অবধূত।সময়টাও মনে রাখি,বাংলা ১৩৫৩ তার মানে আজকের সময় থেকে আরো সত্তর-আশি বছর আগেকার ঘটনা। তাই পদব্রজে পাপস্থলনের উদ্দেশ্যে তীর্থপথের কষ্ট বা 'তপঃ' এর প্রতি তীব্র বিশ্বাস থেকেই পাহাড়-মরুভুমির ঊষর পথের গ্লানিও নৈমিত্তিক হিসেবেই তুলে এনেছেন।
গতানুগতিক ভ্রমণ কাহিনীর চাইতে লেখক তার লেখনীকে আলাদা করতে চেয়েছেন,প্লটে ভ্রমণ অ্যাডভেঞ্চারের সাথে রম্য এবং থ্রিলারের সন্নিবেশ ঘটিয়ে এবং ঘটমান পরিস্থিতি এবং নেপথ্যের চারিত্রিক বিশ্লেষণ নিয়ে তাঁর সন্ন্যাসী মনের দার্শনিক উপলব্ধি দিয়ে।
কিছু কিছু অতি নাটকীয়তা বিরক্তির উদ্রেক করলেও দুঃসাহসী যাত্রার বর্ণনা, মানবিকতার জয়কার এবং যাত্রার শেষটার অসম্পূর্ণতার আক্ষেপের রেশ...সব মিলিয়ে 'স্টেইং হোমের' সময়টা মরুতীর্থ ভ্রমণ বেশ উপভোগ্য ছিল।
ভ্রমণকাহিনি আর থ্রিল! এক ডিশে দুটি টেস্ট মিশানোর ক্ষেত্রে অবধূত মশাই রীতিমত মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন-বলতেই হয়। বাংলা ১৩৫৩, অর্থাৎ মোটামুটি ৭০ বছর আগেকার ভ্রমণকাহিনি। এখনকার দিনে পাহাড়ে পাহাড়ে ট্রেকিং করে আর রাতে ট্রেকার্স হাটে ঘুমিয়ে সেই এডভেঞ্চারের স্বাদ পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব না। পুরোটা পথে খলচরিত্র হিসেবে ছিলেন প্রচন্ড বৈরীরূপ ধারণ করা "মার্তন্ডদেব"। গল্প বলতে বলতে লেখক মাঝে মাঝেই ট্র্যাক ছে��়ে অন্য পথে চলে গেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে এই বিচ্যুতি পাঠককে দিয়ে যাবে রম্যগল্পের ছোঁয়া। ৭০ বছর আগেকার রচনাভঙ্গী সময়ভেদে সাধু ভাষাকেও মন�� করাবে।
আপশোষ একটাই, করাচী থেকে হিংলাজ-পুরো পথটাই পড়েছে পাকিস্তানে! হিংলাজের এই কঠিন পথ(এতদিনে আর তখনকার মত কঠিন নেই নিশ্চয়ই) পাড়ি দেওয়ার সাহসটা কোনক্রমে যদি কোনদিন সঞ্চয় করতেও পারি, পাসপোর্টে পাকিস্তানের ভিসা লাগানোর দুঃসাহস বোধ করি কখনোই হবে না।
অবধূত রচিত বাংলা সাহিত্যের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চকর এবং দার্শনিক গভীরতাসম্পন্ন উপন্যাস পড়ার বহু আগেই আমি উত্তম-সাবিত্রী অভিনীত ছবিটি দেখেছিলাম ছেলেবেলায়। এই বইটি কেবলমাত্র এক অরণ্যপথে যাত্রার বর্ণনা নয়, বরং মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সংঘাত এবং আত্মপরিচয়ের সন্ধানও বটে।
‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ মূলত একদল তীর্থযাত্রীর কাহিনি, যারা পবিত্র হিংলাজ মাতার মন্দিরে পৌঁছানোর সংকল্পে এক অনিশ্চিত মরুপথে পা বাড়ায়। পাকিস্তানের বালুচিস্তানে অবস্থিত হিংলাজ মন্দির হিন্দুদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এই তীর্থযাত্রা কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিতে নয়, চরিত্রগুলোর জন্য এক অভ্যন্তরীণ উপলব্ধির পথও হয়ে ওঠে।
যাত্রাপথে নানা প্রতিকূলতা, দুর্যোগ, মরুর নিষ্ঠুর রূপ এবং তীর্থযাত্রীদের মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষা উপন্যাসটিকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়। প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মিক জিজ্ঞাসা লক্ষ্য করা যায়।
অবধূতের গল্প বলার দক্ষতা এবং চরিত্রচিত্রণের সূক্ষ্মতা উপন্যাসটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের মানুষ—কেউ ধর্মে গভীর বিশ্বাসী, কেউ সংশয়বাদী, কেউ নিছক অভিযাত্রিক, আবার কেউ আত্মগবেষণার পথিক। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংঘাত ও ভাবনাচিন্তা মানবসমাজের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
তীর্থযাত্রার পথের প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এবং মানবিক সম্পর্কের ওঠাপড়া আসলে মানুষের জীবনের নানা সংগ্রামের প্রতীক। উপন্যাসে মরুভূমির প্রতিকূলতা শুধুমাত্র ভৌগোলিক বাধা নয়, বরং তা মানুষের মানসিক ও আত্মিক পরীক্ষাও।
এই উপন্যাস কেবলমাত্র ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং তা এক দার্শনিক আলোচনাও বটে। অবধূত এখানে ধর্ম, বিশ্বাস, নিয়তি, মনের শক্তি, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দুর্বলতার গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। যাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে চরিত্ররা নতুন উপলব্ধি লাভ করে, যা পাঠকের জন্যও এক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। অবধূতের ভাষা সহজ-সরল, অথচ ব্যঞ্জনাময়। বর্ণনার বিশদতা এবং চিত্রকল্পের ব্যবহারে মরুভূমির নিষ্ঠুর সৌন্দর্য, ক্লান্ত তীর্থযাত্রীদের মানসিক অবস্থা এবং সময়ের নির্মমতা অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের গতি কখনো মন্থর, কখনো দ্রুত—যা একে বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আজ এই ২০২৫ সালে এসেও কেন পড়বেন এই বই? পড়বেন কেননা ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রার বর্ণনা নয়, এটি এক আত্মসন্ধানের প্রতিচিত্র!! আরও পড়বেন কারণ:
১. এটি ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
২. মানুষের মানসিক সংকট এবং অস্তিত্বের প্রশ্নকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
৩. ধর্ম, বিশ্বাস, এবং যুক্তির সংঘাতে এক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
৪. ভ্রমণসাহিত্য এবং দার্শনিক কথাসাহিত্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।
এই উপন্যাস পাঠকের মনোজগতে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিচ্ছবি এঁকে দেয়। এটি সেই বিরল উপন্যাসগুলোর মধ্যে পড়ে যা একদিকে যেমন কাহিনির রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে তেমন গভীর দার্শনিক ভাবনায় নিমগ্ন হতে বাধ্য করে। যারা আত্মজিজ্ঞাসা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, এবং অভিযানের রোমাঞ্চ ভালোবাসেন, তাদের জন্য এ এক অপরিহার্য পাঠ।
১৯৪৬ এ ১৪ দিনের এক সফরে কালিকানন্দ বাবাজী ওর্ফ অবধূত তার ভৈরবী সমেত বেলুচিস্তানের মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তীর্থস্থান হিংলেজে যান -এই হিংলাজ ভ্রমণের কাহিনী নিয়েই "মরুতীর্থ হিংলাজ"
এ বই ভ্রমণকাহিনী কম, থ্রিলার বেশি মনে হয়েছে।কালিকানন্দ অবধূত বাবাজী থ্রিলার+সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে ভুলবশত ভ্রমণকাহিনী লিখে ফেলেছেন।
উল্লেখ্য,এই বই নিয়ে সিনেমাও নির্মিত হয়েছে।
জয় বাবা অবধূতের জয়!! ভ্রমণকাহিনীর ছদ্মবেশে থ্রিলার লেখক বাবার জয়!!! সবই বাবা অবধূতের মহিমা!!!
মরুতীর্থ হিংলাজ - যেখানে মা সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র বিরাজমান। বর্তমানে অবস্থিত পাকিস্তানে।
১৩৫৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে লেখক কালিকানন্দ অবধূত যাত্রা শুরু করেন মোট ৩০ জনের দলে করাচি শহর থেকে হাব নদী পেরোবার উদ্দেশ্যে, সঙ্গে দু'জন ছড়িওয়ালা আর দু'জন উটওয়ালা এবং দু'টি উট। সেই নদী পেরিয়ে যেতে হবে শোনবেনী শহরে যেখানে মানুষের বাস হয়েছে শেষ। এরপর থেকে শুধু তপ্ত বালি আর স্বয়ং মার্তণ্ডদেবই হবেন তাদের সঙ্গী। সেই ভয়ঙ্কর মরুভূমি পেরিয়ে পৌঁছতে হবে বাবা চন্দ্রকুপের কাছে হিংলাজ দর্শনের অনুমতি চাইতে। অনুমতি মিললে তারপর যাওয়া যাবে মায়ের দর্শনে। তখনও হিংলাজ দর্শন সম্পূর্ন হবে না - কারণ সতীপীঠ দর্শন সম্পন্ন হয় ভৈরব দর্শনের পরে। তাই এর পরে যেতে হবে মা হিংলাজের ভৈরব - কোটেশ্বরের দরবারে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানটি আজও মুখে মুখে শোনা যায় -
মরুতীর্থ হিংলাজ সিনেমাটি আমার দেখা নেই, তবে এই গানটির অর্থ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছি বইটি পড়ার সময়। এতই সুন্দর ছিল সেই পুরো জায়গাটির বর্ণনা। হয়তো লেখক নিজে সেই দুর্গমের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন বলেই এত সুন্দর বর্ণনা দিতে পেরেছেন।
এই তীর্থযাত্রার কালে নিজের দলের লোকেদের বিভিন্ন কার্যকলাপ দেখে তিনি যে মন্তব্যগুলি করেছেন, সেগুলি কখনও হাস্যরসের উদ্রেক ঘটায়, আবার কখনও চরম বাস্তবতার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করার, আবার কখনও মানুষের চিরপরিবর্তনশীল আচরণ আমাদের সামনে তুলে ধরে। এর ওপর রয়েছে পরিত্যক্ত কবরস্থানসম মরুভূমির করাল রূপের বর্ণনা। যেখানে নেই মানুষ, নেই সবুজ, নেই জল। কে জানে কত মানুষ যুগে যুগে শিকার হয়েছে এই মরুভূমির কবলে। এই অত্যন্ত প্রাণবন্ত বর্ণনাগুলি পড়তে পড়তে আমিও চলে গিয়েছিলাম সেই অজানার দেশে। কিন্তু বই বন্ধ করতেই আমি ফিরে আসতে পেরেছিলাম আমার ছোট্ট ঘরটির পাখার তলায়। কিন্তু আর ফিরে আসতে পারবে না সেই তিনজন - থিরুমল, কুন্তী এবং পান্ডে মহারাজ।
বইটি সংগ্রহ করেছিলাম কলেজ স্ট্রীটের একটি পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে মাত্র ৫০ টাকায়। কি অমূল্য একটি জিনিসই না হাতে পেয়েছি এই সামান্য দামে।
বাংলা ভ্রমণকাহিনীর এক অনবদ্য নিদর্শন। অবধুতের এই বইটি নিসন্দেহে কালজয়ী, ক্লাসিক। যদিও উত্তমকুমারের সিনেমা না হলে লেখকের নাম বা বইটার নাম কজন শুনেছে তাও সন্দেহ আছে। অবধূতের আরো অনেক রচনা আছে। সেগুলোর নাম জিজ্ঞেস করলে তো একগাল মাছি হয়ে যাবে। আজ্ঞে যারা যারা এখানে রিভিউ দেন তাদের কজন জানে সেও সন্দেহ আছে।
‘লোকে সংসারের জ্বালায় অস্থির হয়ে শান্তির মুখ দেখবার আশায় তীর্থযাত্রায় পা বাড়ায়। আমরাও চলেছি হিংলাজ, উদ্দেশ্য ঐ শান্তিলাভ। জানি না শান্তিটা কী বস্তু— তবে আজ এই ক’টা দিনে যে তার ছায়াও দেখতে পাইনি তাতে আর সন্দেহ নেই। শেষ পর্যন্ত পৌঁছে হিংলাজ-দর্শনটা ভাগ্যে ঘটবে কি না কে বলতে পারে।’’ সারাটি পথে যেখানে আছে শুধু ভয়, মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ। কিছুদূর যাওয়ার পরে যেখানে মনে হতে বাধ্য, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। আপন প্রানটা নিয়ে ফিরতে পারলেই রক্ষে। অবশ্য এখনকার সাথে গুলিয়ে ফেললে হবে না। তখন যাত্রা শুরু হতো করাচী থেকে। সঙ্গী উট, পথ প্রদর্শক তাদের চালক।-কাহিনীর শুরু এইভাবে। লেখকের এই হিংলাজ দর্শন শুধুই ভ্রমণ কাহিনী বললে কম বলা হবে। পথের বিবরণ , ঘটনার ক্রম এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা জানতে গেলেই পড়তে হবে মরুতীর্থ হিংলাজ।