‘অন্ধকার’ শব্দটার মধ্যে একটা ভয়মিশ্রিত রহস্যময়তা আছে। অন্ধকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে ভয়। সমস্ত যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে লৌকিক-অলৌকিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হতে চাওয়ার এক অমোঘ টান আছে। এ যেন ঠিক হাড় হিম করা অনুভূতি নয়। আলোর পাশাপাশি যে অন্ধকারের রাজত্ব, সেই অন্ধকারের ডাকে সাড়া দেওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে অন্ধকার জগতে হারিয়ে শিরশিরে ভয়ের নিষিদ্ধ রাজ্যে অবগাহন করার নাম ‘এখানে অন্ধকার’। ‘রবার্ট ও সেই মেয়েটি’, ‘রাখালডিহির রেললাইনে’, ‘ছবিতে ছায়া’ এই তিন অলৌকিক মায়াজালের আবহ রয়েছে বইটিতে।
📕 এখানে অন্ধকার ✍️ সাথী দাস মুদ্রিত মূল্য:- ৩৩০ লালমাটি প্রকাশন ২১৬ পাতার একটি বই
লেখিকা সাথী দাসের তিনটি ভৌতিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে আমি একটি মাত্র পড়েছি। আজকে লেখিকার দ্বিতীয় ভৌতিক উপন্যাস এখানে অন্ধকার পড়ে শেষ করলাম। সবাই লেখিকার লেখা সামাজিক বা প্রেমের উপন্যাস পছন্দ করে, আমিও তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু লেখিকা ভয়ের গল্পও দারুন লেখেন। এই বইটিতে একটি ছোটোগল্প, একটি বড় গল্প এবং একটি উপন্যাস আছে। লেখিকা এই বইটি উৎসর্গ করেছেন যারা বই পড়তে খুবই ভালোবাসে তাদের জন্য। লেখিকার কাছে আমি দুঃখিত এই অসময়ে ভৌতিক গল্পের বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি😅😅।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
১)'এখানে অন্ধকার' বৃষ্টির রাতে প্রথম বিবাহবার্ষিকী বাইরে পালন করে ফেরার পথে এক নবদম্পতির বাইকের চাকা স্কিড করে, এরফলে তারা মুখোমুখি হয় এক দুর্ঘটনার। চোট লাগা অবস্থায় বৃষ্টিভেজা শুনশান রাস্তায় পড়ে থাকে তাদের দুটি দেহ। সেইসময় হাজির হয় একটা গাড়ি নিয়ে কয়েকজন লোক। সেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য তাদের কাছে সাহায্য চাওয়ার প্রত্যাশায় নবদম্পতি আরোও বড়ো ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়। এই বিপদ থেকে তাদের উদ্ধার করে এক কুকুর। এরপরে নবদম্পতি কিছুটা সুস্থ হলে সেই কুকুরটিকে খুঁজতে তারা হাজির হয়ে যায় সেই রাতের ঘটনাস্থলে। সেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। গল্পের শেষটা পুরো অন্যরম।
২)'রাখালডিহির রেললাইন' সদ্য গোপনে বিয়ে করে গ্রাম থেকে পালিয়ে শহরে আসে এক নবদম্পতি শান্তিতে সংসার করার উদ্দেশ্যে। ছেলেটির পাতানো এক দাদার সাহায্যে একটি বাড়িতে থাকার বন্দোবস্ত হয়ে যায় তাদের। এর মধ্যে ছেলেটির একটি কাজও জুটে যায়। কিন্তু সেই বাড়িতে থাকা শুরু করার দিন থেকে মেয়েটির জীবনে ঘটতে থাকে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা। এই ঘটনাগুলো দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। মেয়েটি প্রতি রাতে ৩টে বেজে ৩মিনিটে আজব এক স্বপ্ন দেখে এবং সে রোজ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ঠিক সেই একই সময়ে তাদের উল্টোদিকের বাড়ির বাচ্চাটাও কেঁদে ওঠে এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুটো পরিবারের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো থেকে তারা কি মুক্তি পাবে আর কেনোই বা এই ঘটনাগুলো তাদের সঙ্গে ঘটে চলেছে তা জানতে আপনাদের অবশ্যই গল্পটি পড়তে হবে। গল্পে অর্ধেন্দু, পিহু, মৃণালিনী দেবী, বাদলদা আর প্রতিবেশী অবিনাশের চরিত্রগুলো সেরা।
৩)'ছবিতে ছায়া' এই গল্পটি তিনটি আলাদা পরিবারকে নিয়ে লেখা। পরিবার আলাদা বা জায়গা আলাদা হলেও তারা একই সমস্যা বা বিপদের সম্মুখীন হয়। প্রথম:- তিস্তা নামক একটি মেয়ে দিনকয়েক এর জন্য আসে একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখাশোনার জন্য। কারণ সেই বাচ্চার মা ও বাবা যাবে দুদিনের জন্য গ্রামে সম্পত্তির ভাগ আদায় করতে। কিন্তু তিস্তা সেই বাচ্চাকে দেখাশোনা করতে এসে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়।
দ্বিতীয়:- সবেমাত্র মা হতে চলেছেন এক মহিলা। তার স্বামী কিছুদিনের জন্য কাজের সূত্রে বাইরে যাবেন তাই মহিলাটি তার বোনকে ডেকে এনেছেন নিজের কাছে। কিন্তু তারাও নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছে এক ভয়াবহ বিপদের মধ্যে।
তৃতীয়:- দুইজন সমকামী মহিলাকে নিয়ে। তারা দুজনে ঘুরতে যায় এক জায়গায়। সেখানে তারা উপরের দুটো পরিবারের মতো সেম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়।
এই তিনটি ঘটনা ঘটে একটি রাতেই। এই তিনটি ঘটনা ঘটার মূলে আছে একটি ছবি। ছবিটি একটি ঘোমটা দেওয়া মেয়ের ছবি। ছবির মেয়েটি অতীতে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে কাউকে সুখে থাকতে দেবে না। কেন সে এমন প্রতিজ্ঞা করেছিল? তার জীবনের অতীত কী? এই তিনটি পরিবারে কী তার হাত থেকে রক্ষা পাবে?
এতোদিন জানতাম তুমি সামাজিক আর প্রেমের উপন্যাস ভালো লেখো কিন্তু তুমি যে ভয়ের গল্প এতো দারুন লেখো তা এখানে অন্ধকার বইটি পড়া শুরু না করলে জানতেই পারতাম না🙂। তিনটি গল্পই দারুন কিন্তু আমার তৃতীয় গল্পটি বেশি ভালো লেগেছে। যারা ভুতের গল্প পরতে চান তারা অবশ্যই এই বইটি পড়তে পারেন। বইটি পড়তে আমার কোনো বোরিং ফিল হয়নি। একটানে পুরো বইটা শেষ করেছি। বইটিতে ভয়ের পরিবেশ ভালোভাবেই তৈরি করা হয়েছে। যারা ভুতের গল্প কম পড়ে তারা এই বইটি পড়ে ভয় পাবে। লেখিকার অনবদ্য লেখনীর প্রশংসা না করে পারলাম না। যদি কখনো ভুতের বই পড়তে পড়তে কারোর ভয় হয় বা কোনো ভয়ের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়
তখন একমাত্র ভরসাযোগ্য ঠাকুরমা, দিদিমার শেখানো ভূত তাড়ানোর মন্ত্র:-
"ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি রাম-লক্ষণ সাথে আছে করবি আমার কি?""
কালকে মায়ের হাতের তৈরি পায়েস আর তোমার বই একসাথে নিয়ে বসেছিলাম দুটোই খুব ভালো খেয়েছি কারণ দুটোই ভীষণ সুস্বাদু ছিল।