‘বামপন্থা ব্যর্থ, লিবারাল হিউম্যানিস্ট অ্যাপ্রোচ ব্যর্থ পৃথিবীর মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য ঠেকাতে। কেউ কিচ্ছু করেনি, শিল্পী সাহিত্যিকেরা বোঝেইনি যে কী করতে হবে, কী লিখতে হবে। উল্টো তারাও লিবারালিস্ট, “মানবতাবাদী” লেখাকে পূজনীয় গণ্য করে বিরাট জনগোষ্ঠীকে সাহিত্য বিচ্ছিন্ন করে বসেছে। এটা একটা এন্টায়ার আউটলুকের ব্যর্থতা। টোটালটা ইতিহাসের বিগেস্ট ফেলিওর এই আমাদের লেখকদের মৃত, “মানবতাবাদী ওয়ার্ল্ডভিউ”।”
‘কারও বাণী শোনার আশা ও অপেক্ষায় থাকলে আমরা ভুল করব। যার বাণী শুনব, তাঁর হাতেই সিস্টেম এক্সপ্লয়েটেড হবে, যেভাবে এত শত বছর হয়েছে “জ্ঞানী”দের হাতে।
‘ক্ষমতাকে ইতিহাসের ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে ফেলে দেখতে হবে। আধুনিক এই সময়ে ক্ষমতা মানে মোড়লের হাতে গ্রামবাসী জরিনার মৃত্যুই শুধু না । কোনো সাহিত্যিক মোড়ল মেরে তাঁর লেখায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে দিলেন, ব্যাপারটা আর তেমন নেই। সাহিত্যে “মানবতাবাদী” অবস্থানের কথা যখন লেখক নান্দনিক প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে বলেন, তখন সেটা সাহিত্য যেমন হয় না, তেমন ক্ষমতাকে সাপোর্ট করে বসাও হয়ে যায়।
— এই প্রগতি সেলফ-ডেস্ট্রাকটিভ। সে নিজেকে নিজে খেয়ে ফেলেছে, কারণ উইপোকারা বানিয়েছে এই পরিমাণ বৈষম্যের এই সিস্টেম।
‘বিদ্যমান দার্শনিক ক্যাটেগরিতে ফেলে জীবনকে মূল্যায়ন করা ভুল, কারণ পশ্চিমা দার্শনিক ট্র্যাডিশন আমাদেরকে খুবই সাদা-কালো এবং অতিরিক্ত সিমপ্লিফায়েড একটা ওয়ার্ল্ডভিউ দিয়ে গেছে।'
জন্ম- ১৯৬৯ অক্টোবরে, খুলনা। পড়াশুনা করেছেন বরিশাল ক্যাডেট কলেজ এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন-এ।
প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ: ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প (২০০১)। বইটি সে বছর প্রথম আলোর নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় মনোনীত হয়েছিলো।
'রাষ্ট্র ফ্যান্টাসিকে ভয় পায় । রাষ্ট্র নতুন ভাষাকে ভয় পায় । রাষ্ট্র কল্পনাকে, ব্যাকরণ না মানা স্টাইলিস্টিক ইনোভেশনকে ভয় পায়। ' - মাশরুর আরেফিন
অনুবাদক ও উদীয়মান সাহিত্যিক মাশরুর আরেফিন দীর্ঘসময় নিয়ে কথা বলেছেন ইকতিজা আহসানের সাথে। দেশীয় ও বিশ্বসাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি ও দর্শনের সংমিশ্রণ 'মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিন'। ২শ ৯৬ পাতার বইটির প্রকাশক 'কথাপ্রকাশ'।
আলাপচারিতা সবার সাথে সবার জমে না। দু'জনের মনের অমিল থাকলে কথোপকথনের বদলে বাহাসের সৃষ্টি হয়। আবার, ভক্তশ্রেণির কেউ গুরুতুল্য কারো সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তা স্তুতিগাথা ও নিজের ঢোল নিজে পেটানোর একখানা সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। মাসরুর আরেফিন বেসরকারি একটি ব্যাংকের এমডি। বেশ পদস্থ ব্যক্তি। মনে হতো তিনি ধনাঢ্য। শখের বশে লেখালিখিতে এসেছেন। কিন্তু ইকতিজা হাসানের সাথে আলাপে ভুল ভাঙল। এত বেশি পড়াশোনা জানা, বিশেষত সাহিত্যে এমন প্রগাঢ় দখল নিঃসন্দেহে খুব কম লেখক ও পাঠকের থাকে৷ তবে সহজভাবে কথা বলতে পারেননি মাসরুর আরেফিন। নিজে কত বেশি পড়েছেন, সেই প্রমাণ দেওয়ার একটি কোশিস চোখ এড়ায় না৷ তাই কথাবার্তা পাঠক হিসেবে আমাকে তত টানেনি।
অসামান্য কিছু বইয়ের নাম পেয়েছি। জেনেছি অপূর্ব কিছু সাহিত্যিকের নাম। সেইসব বইগুলো পড়বো। এত ভালো ভালো বইয়ের তালিকার জন্য পাঠক হিসেবে কৃতজ্ঞতা রইল। ফুকো ও সাঈদকে নিয়ে বেশ চমৎকার বলেছেন।
ইকতিজা হাসান হলেন মাসরুর আরেফিনের গুণমুগ্ধ ও তার মতো পড়াশোনা জানা নন। মুগ্ধ নয়নে ও খালি মগজে করা যে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ দিনশেষে অপাঠ্য হয়ে ওঠে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। মাসউদ আহমাদ ও স্বকৃত নোমান যথাক্রমে দু'জন সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও আবদুশ শাকুরের সাক্ষাৎকার নিয়ে দু'খানা চমৎকার বই লিখেছেন। পড়ে দেখুন৷ তাতে হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবধর্মী সারল্য পাবেন, দেখবেন প্রাজ্ঞ আবদুশ শাকুরের বয়ান কত মোহনীয়। অথচ পাণ্ডিত্যের ভারে বিরক্ত হবেন না। এগুলোর কোনোটিই নেই এই বইটিতে৷ স্রেফ বইয়ের নাম জানার জন্য এত টাকা দিয়ে বইটা কিনবেন কি না, ভেবে দেখতে হবে।
এই সাক্ষাৎকারগ্রন্থ পড়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র।মাসরুর আরেফিন বিশ্বসাহিত্যের একজন বিদগ্ধ পাঠক। কঠিন বিষয় সহজভাবে উপস্থাপনে তার দক্ষতা সহজাত। এডওয়ার্ড সাঈদ ও মিশেল ফুকোকে নিয়ে অধ্যায় দুটো তো সেরা! এই তিনিই যখন নিজের উপন্যাস নিয়ে অতিমাত্রায় উচ্ছ্বাস ও আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করেন তখন বিরক্ত হতে হয় (নিজেকে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য হিসেবে দাবি করেছেন এক জায়গায়।)নিজের লেখা নিয়ে এইভাবে কেউ অহংকার করতে পারে তা তার সাক্ষাৎকার না পড়লে বিশ্বাস করা শক্ত। মাসরুর আরেফিন শুধু বিশ্বসাহিত্য নিয়ে কথা বললে নির্দ্বিধায় সবাইকে বইটা পড়তে বলতাম।
"মূল কথা, আগেই বলেছি, লেখকেরা নিজেরাও সমাজের শাসকগোষ্ঠীর অংশ। তারা পঞ্চায়েতের মাঝখানে চেয়ার টেবিল পেতে টেবিল নিয়ে বসে সমাজ নিয়ে লেখেন, তারপর নিজেকে মহীয়ান মানুষ করে দেখিয়ে সমাজের ওপরের দিকে উঠে যান। তারা সিস্টেমের অংশ। তারা এবং তাদের শাসকশ্রেণী, দু দলই তাদের নিজের দেশের মানুষের উপরে সওয়ার হওয়া নতুন 'কলোনি'।" পৃষ্ঠা - ৫২
মাসরুর আরেফিন। উপরের কথাগুলো তাঁর। ইকতিজা আহসানের সাথে আলাপের সময়। মূলত 'মানবতাবাদী' সাহিত্যের বিপক্ষে কথা বলে গেছেন এই সাক্ষাৎকারে তিনি।
অনেকে চোখ সরু করে তাকাতে পারেন। অথবা ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে অনেকেরই। কেন 'মানবতাবাদী' সাহিত্যের বিপক্ষে অবস্থান মাসরুরের?
মাসরুর আরেফিনের সাথে ইকতিজা আহসানের এই আলাপচারিতা বিশ্বসাহিত্যভাষণের কাছাকাছি কিছু বললে খুব একটা বাড়িয়ে বলা হয় না। কারণ মাসরুর দেশে-বিদেশের প্রায় ৫০ জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকের কর্ম নিয়ে আলাপ করে গেছেন। ইকতিজা একজন বর্ষীয়ান সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর মত প্রশ্ন করে গেছেন।
মাসরুর আরেফিনের মতে 'মানবতাবাদী' সাহিত্য শেষপর্যন্ত সিস্টেমকে সার্ভ করে। তাহলে কী উপায়ে শাষক-শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লিখে গেছেন খ্যাতিমান লেখকেরা?
সেই উপায় জানানোর জন্য মাসরুর-ইকতিজার আলাপে চলে এসেছে অনেক অনেক কথা, প্রাসঙ্গিকভাবেই। এ বই শুধুমাত্র প্রচুর বিখ্যাত গ্রন্থের মোক্ষম অংশের মনোমুগ্ধকর ডিটেইলিং জানার জন্যও পাঠ করা যায়। বুকিশ পিপলদের জন্য একটা বইয়ের লিস্ট এবং অনেকগুলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর রিভিউ হিসেবেও পড়া যায়।
সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-সমাজ-ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে জানা যায়, মাসরুরের জবানিতে এবং দৃষ্টিকোণ থেকে। সমসাময়িক বেশ ক'জন গুরুত্বপূর্ণ লেখক / অনুবাদক / কবি সম্পর্কে জানা যায়। একইসাথে পাওয়া যায় সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী এক ছাত্র, মাসরুর আরেফিনকে।
তাহলে কী প্রতিবাদ করবে না লেখক? লেখক কী মানবতাবাদী হবেন না? লেখকের কী কোন দায় নেই? অনেক কথার মাঝে মাসরুর মনে করেছেন লেখকের ধারণ করতে হবে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন আঙ্গিক। যার মাধ্যমে সিস্টেমকে দেয়া যেতে পারে ক্রমাগত উস্কানী। সেই অন্যরকম ভাষার দর্শনের সন্ধান দিয়েছেন মাসরুর বিভিন্ন উদাহরণ টেনে এবং সেসবের নিজস্ব বিশ্লেষণ দিয়ে।
তাহলে মূল বার্তা মনে হয় 'মানবতাবাদী' থেকে ' ' সাইন উঠে গিয়ে মানবতাবাদী সাহিত্যের পক্ষে বলতে চেয়েছেন মাসরুর।
সেই ক্ষেত্রে এক ধরণের প্যারাডক্সই তৈরি হয়। সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তির। অবশ্য এক প্রশ্নের উত্তরে পৃষ্ঠা ৬৩ এ মাসরুর বলছেন,
"কনফিউশনই সাহিত্য। অনিশ্চয়তাই সাহিত্য।"
বই রিভিউ
নাম : 'মানবতাবাদী' সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : ইকতিজা আহসান প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রকাশনা : কথাপ্রকাশ প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল জনরা : সাক্ষাৎকার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
৪.৫/৫ সম্ভবত এই বইয়ের পরবর্তী খণ্ড হবে, এমনই আভাস দেওয়া আছে শেষের দিকে। অপেক্ষায় থাকলাম। বইয়ের প্রধান যে ব্যাপারটা তা হলো মাসরুর আরেফিনের কথা বলার বোল্ডনেস। এমন না যে, তিনি লেখক কবি একেকজনকে ধরে ধরে মাথায় তুলছেন কিংবা খারিজ করছেন। তিনি নিজের মতো করে সাহিত্য, রাজনীতির ব্যাপারগুলো বলেছেন অ্যাবস্ট্রাকশনের মাধ্যমে ঠিকই, কিন্তু ভাষাটা মোটেই অ্যাবস্ট্রাক্ট না, আর এখানেই এই সাক্ষাৎকার অনন্য। চোখে পড়ার ব্যাপার হলো, সাক্ষাৎকারে ইকতিজা আহসান যেন ছিলেন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। মাসরুর আরেফিনই নিজের মতো করে প্রিয় কথাসাহিত্যিক, কবি, উপন্যাস, বইপত্র এসব নিয়ে বলে গেছেন। লেখকের ভেতরকার কোন চেতনার নীরব উন্মেষ ঘটাতে সাক্ষাৎকার গ্রহনকারীর তীর্যক এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নবাণের বিকল্প নেই। অবশ্য এই কমতির অনেকটা মাসরুর আরেফিন নিজেই পূরণ করে দিয়েছেন। পুরো বইয়ে অনেক সাহিত্যিক, দার্শ���িকের নাম এসেছে। তন্মধ্যে মিশেল ফুকো, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বোর্হেস,এডওয়ার্ড সাঈদ, কমলকুমার এদেরকেই ভরকেন্দ্র ধরা যায়। জীবনানন্দ নিয়েও কম বলেন নি। তার কবিতা নিয়ে। কিন্তু আমার অন্যতম আগ্রহ জীবনানন্দের কথাসাহিত্য। এ ব্যাপারে কিছুই পেলাম না। 'মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে' নামটা ভাল লাগে নি। বইয়ের কনটেন্ট হিসেবে আরও নাম করা যেত। প্রচলিত মানবতাবাদী সাহিত্যকে নাকচ করতে গিয়ে এর অপজিটে বিবিধ ঘরানার অনেক সাহিত্যিক এবং সাহিত্যকর্মকে নিয়ে আসলেও এবং প্রয়োজনীয় অ্যাবস্ট্রাকশন ঘটালেও, মানবতাবাদী সাহিত্য হিসেবে তিনি চিহ্নিত করলেন শুধু একটি আইডিয়াকেই। অর্থাৎ নিজে নানাবিধ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করালেন কল্পিত সেই পুরোনো তালপাতার সেপাইকে। যারা লেখালেখি করেন, নিজেকে 'লেখক' ভাবেন কিংবা সামনে লিখবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বই। আর মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস, কবিতা, অনুবাদের যারা আগ্রহী, অনুসন্ধিৎসু পাঠক, তাদের জন্য তো অবশ্যই।
মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিনের এই সাক্ষাৎকারমালা নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বইটির একটি দুর্বল দিক আছে। সাক্ষাৎকার সাধারণত তাৎক্ষণিক হয়, এখানে কিন্তু সেরকম নয়। এখানে অনেক কথা, লেখা হওয়ার সময় পরে বসানো হয়েছে। বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক এবং সাহিত্যের রেফারেন্স পরে এডিটিং টেবিলে যুক্ত করা হয়েছে, ফলত পুরো ব্যাপারটায় একটা কৃত্রিমতা চলে এসেছে। এই সময় ধারণা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক, ইকতিজা আহসানের মুখে বসানো কিছু প্রশ্নও তার না হতে পারে। আত্মপ্রচারের লোভ সংবরণ করা সম্ভব হয়নি।
ফলত বইটার যে মূল প্রতিপাদ্য, মাসরুর মননকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা তা গোড়াতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু বইতে অনেক বিশ্বাসাহিত্যের বই এবং লেখকের উল্লেখ রয়েছে যাদের সম্পর্কে নবীন পাঠকরা একটু কমই পড়ে, বা জানে। তাদের রচনাবলি পাঠের একটা হদিশ এই বই থেকে পাওয়া যাবে বলে বইটা ভালো লেগেছে। পাশাপাশি এরকম ধারার বই, কিন্তু জেনুইন সাক্ষাৎকারের, বাংলায় আরও প্রকাশিত হলে খুব ভালো হয়।