এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে বইটা শেষ করার পর মনে হলো, এখানে আশ্চর্য সব গল্পও আছে। পুরো বই পড়ার পর একটা জিনিস স্পষ্ট, লেখক নিজস্ব ইউনিভার্সে লিখেই স্বস্তিবোধ করেন। কিন্তু তার এই স্বস্তিবোধের জায়গাটাই কিনা অস্বস্তির সৃষ্টি করে পাঠক মনে। কিছু কিছু গল্প প্রবল মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। যেমন 'ধারালো' গল্পটা। এটাকে অতিপ্রাকৃত, হরর বা জাদুবাস্তব কোন জঁরে ফেলব আমি জানি না। উইয়ার্ড ফিকশন বলা যায়। পুরো গল্পগ্রন্থে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প এটা। গল্পটা পড়ার সময় একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি দলা পাকিয়ে ছিল গলার কাছে। আরো দু'টো গল্পে এরকমটা অনুভূত হয়। ছোঁয়া আর কুনয়ে। ট্র্যাডিশনাল হরর গল্প কবরী টি স্টলও ভালো লেগেছে। লেখকের পূর্বপরিচিত চরিত্র রাসেলকে দেখা যায় একটা গল্পে। আবরার আবীরের গল্পগুলোয় ঘুরে ফিরে আসে মানব মনের অন্ধকার দিক, অজানার আতঙ্ক, ক্রোধ এবং প্রতিশোধ। কয়েক পাতা ওল্টানোর পরেই আপনি বুঝতে পারবেন, লেখক এখানে আপনাকে 'ফিল-গুড' ধাঁচের গল্প শোনাতে আসেননি। আরেকটা বিষয় ভালো লেগেছে, তার লেখায় একটা সিগনেচার টোন আছে। তার কোন বই লেখকের নামধাম ঢেকে আমাকে পড়তে দিলেও বুঝতে পারব সেটা কার লেখা। যারা, পরিচিত স্বাদের বাইরে কিছু পড়তে চান, তাদের আমন্ত্রন থাকলো আশ্চর্য সব মানুষের আশ্চর্য সব গল্পের জগত থেকে ঘুরে আসতে।
গরম কেটলি থকে কাপে চা ঢালছেন। চায়ের রঙ একদম মনমত, ঘ্রাণেও পুরো ঘর ভরে গেছে। ধুপ করে চায়ের কাপ হাত ফসকে পড়ে গেলো আর আপনি 'হা' হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তো.. এই বই পড়া শেষে আমার প্রতিক্রিয়াটা ঠিক এমনই ছিলো!
মিক্সড জনরা, ভয়ের আবহ জুড়ে গল্পগুলো। গল্পের শক্তপোক্ত প্লট সাজানো থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে রহস্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া, থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি সবকিছুই ওয়েল ব্যালান্সড! তবে ওই যে গরম গরম চা না খেতে পারার মত একটা অপূর্ণতা থেকে গেলো কয়েকটা গল্পের এন্ডিং এর জন্য!
'গেরুয়া' ও 'কুলয়ে' ব্যাতিক্রমধর্মী এ দু'টো গল্প সবচেয়ে ভালোলেগেছে। 'ধারালো', 'কোলাহল নেই', 'কবরী টি স্টল' গল্পটা পড়লে বোঝা যায় ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে লেখক কতটা পারদর্শী! পুরোটা সময় থমথমে একটা পরিবেশ বিরাজ করেছে, পুরো দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছিলো। তবে লেখকের 'হুরপতঙ্গ' পড়ার পরে এই বইয়ে আরেকটু বেশি এক্সপেকটেশন ছিলো। সেক্ষেত্রে, সামান্য আশাহত হয়েছি।
যারা হরোর পড়তে ভালোবাসেন আমি হলফ করে বলতে পারি এই লেখকের লেখনী, তার ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করার ব্যাপারটা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। যে অবস্থাতেই থাকেন না কেন নড়ে চড়ে বসবেন। লোডশেডিং এ, ঝড়ের রাতে হারিকেন এর আলোতে একটা সময় প্রচুর ভয়ের গল্প শুনেছি। সেই সময়টা বারবার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
এখানে ১২টা ছোটগল্প আছে। জনরা মিক্সড। 'হুরপতঙ্গ' ধাঁচের বই, কিন্তু ওটা পুরোটাই হরর গল্প সংকলন ছিল। গেরুয়া গল্পটি খুব ভালো লেগেছে। হালকা মেজাজের বই। পড়াশোনায় অনেকদিন গ্যাপ ছিল, টানা পড়তে পেরেছি আগ্রহের কারণে। ভালো লাগে লেখকের বর্ণণার ধরণ। খারাপ লেগেছে কিছু গল্প একটু বেশিই অসমাপ্ত থেকে গেছে, আর পরিচিত টপিক। ছোটগল্পে কবিগুরুর মতে অসমাপ্ততা একটা গুণ, কিন্তু মাঝপথে ছেড়ে দিলে ভালো লাগেনা আসল। শুধুমাত্র গেরুয়া'র মতো দু চারটা গল্প থাকলেই বইটা মাথায় তুলে রাখতাম। লেখক ভালো লেখেন, আরেকটু গভীর গল্প আশা করছি।
তুলনা করবার কোনো যুক্তিগত কারণ নেই, তবু দুটোর মাঝে হুরপতঙ্গ কে বেশ এগিয়ে রাখছি আমি।
এমন ধাঁচের গল্প এই প্রথম পড়া। প্রচ্ছদ দেখে আমি বোধহয় মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম বইটা ভয়ের হবে। আমি ভুল ছিলাম না অবশ্য। তবে ভয়টা ভূতের না অশরীরীদের ভয় না। একা থাকলে ধুম করে একটা ভয়ের বাতাস ভেসে বেড়ায় না? ঠিক তেমন। বলে বুঝানো যায়না।
ভালো লাগল গল্পসংকলনটা। গল্পগুলো ভিন্ন ধাঁচের। গল্পের বৈচিত্র্যই এই সংকলনের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য। একই ধরনের গল্প হলে একঘেয়েমি চলে আসে। এখানে সেই সুযোগ নেই। প্রত্যেকটা গল্পেরই একটা কমন সূক্ষ্ম থিম হল “আশ্চর্য মানুষ”। গল্পগুলো সমকালীন, ভৌতিক, থ্রিলার বা বিমূর্ত ধারণার মিশেল। তবে সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে কুনয়ে, কোলাহল নেই, কুদরতখানা আর কবরী টি স্টল। বিশেষ করে কোলাহল নেই রাতে পড়ে অন্যরকম এক ভয়ের ফিল পেয়েছি। গল্পটিতে ভূত নেই তবে ভয় আছে, এখানেই লেখকের মূল সার্থকতা।
এই বইটা আমি লিস্টে তুলেছিলাম গত বছর মেলায় দেখে। আর সংগ্রহ করলাম শেষমেশ এবারের বইমেলায়। কেনার পরপরই পড়তাম, কিন্তু অন্য আরেকটা অসমাপ্ত বই শেষ করে এটায় হাত দেবার ব্যর্থ চেষ্টা শেষেই এটা ধরা হলো। এবং বেশ ভালো লাগলো। লেখকের কাজের সাথে আমার পরিচয় ছিলো না, এই বই দিয়েই যাত্রা শুরু হলো। ভূমিকা হিসেবে একটা বেশ ভালো এন্ট্রিই এই বইটা, তাই লেখকের জন্য একটা জোরালো অবস্থানই তৈরি হয়ে গেলো। তার পরবর্তী বই ধরবার সময় এই এক্সপেকটেশন বিদ্যমান থাকবে।
বইয়ের শিরোনামের মতোই, আশ্চর্য সব মানুষদের নিয়েই ১২টা গল্প সাজানো। সত্যি বলতে গেলে, বাস্তবের মানুষ আশ্চর্য তো বটেই, হয়তো কল্পনার মানুষদের চেয়ে কম নয়, বেশিই বলা যেতে পারে। যাইহোক, সেটা ভিন্ন আলোচনা। লেখক সেই আশ্চর্য মানুষদেরকেই বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তুলে এনেছেন তার গল্পগুলোতে।
"ছোঁয়া" থেকে শুরু করে "কবরী টি স্টল" পর্যন্ত লেখকের প্রখর কল্পনাশক্তি আর ভালো লেখনীর সম্মিলনে ১২টা বেশ উপভোগ্য গল্প পাওয়া যায়। কিছু গল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য আমার মনে হয়েছে শেষটা বেশ abrupt। হয়তো আমারই বুঝতে সমস্যা হয়ে থাকবে। তবে, "গেরুয়া", "ধারালো", " কোলাহল নেই", "কবরী টি স্টল" ইত্যাদি গল্পগুলো এতটাই ভালো লেগেছে, যে ওটা নিয়ে বেশি অভিযোগও করার ক্ষেত্র নেই আর।
লেখকের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কাজগুলোও চেক আউট করার ইচ্ছা রাখি।
এই বইয়ে আশ্চর্য সব গল্প রয়েছে। না আসলে আশ্চর্য মানুষের গল্প। অনেকগুলো ছোট গল্প ছিল বইতে। যেগুলো বেশ ভালো লেগেছে তা হলো কবরী টি স্টল, কোলাহল নেই, কুনয়ে। এই তিনটি গল্পে একটা কিছু ছিল যেটা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। বাকি গল্পগুলো খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেছে লাগল। ঠিক যখন জমে উঠছিল তখনই শেষ হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। তবে এগুলোর মাঝে আঙুল গল��পটা সবচে কম ভালো লেগেছে এখানে হুট করে ভৌতিক বিষয় টানা হয়েছে তাও একদম শেষে। কুনয়ে গল্পটা ভিন্ন ধাঁচের। আমার মতামত যে এই ধরনের লেখনী লেখক আরো ভালো লেখতে পারেন৷ একটা পুরো গল্প বা উপন্যাস টাইপের কিছু হলে এই ধাঁচের তাহলে বেশ জমত। কবরী টি স্টল আর কোলাহল নেই এই ক্ষেত্রে সবচে ভালো ছিল। দুটোর মাঝে কোনটাকে এগিয়ে রাখব জানিনা। বইয়ের প্রচ্ছদ অনেকটা হরর থ্রিলার টাইপের। বেশ ভালো লেগেছে।
এখানে বিচিত্র সব গল্প আছে। একটা সামাজিক, একটা থ্রিলার, একটা ভৌতিক, একটা বেদনার, একটা ভাবনার। কিছু গল্প আপনার মন খারাপ করে দিবে, কিছু আপনার মস্তিষ্কের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিবে। যাই বলি গল্পগুলো ভাল লাগবে। এইটুকু বলা যায় আমার ভাল লেগেছে। ধারালো গল্পটা পড়ার পর মৃত মানুষ দেখলে আপনি নিজের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি পাবেন। এই অন্যরকম এর ব্যাখা নেই। গল্পটা পড়ুন বুঝবেন। গল্পটা এক নজরে আহামরি নাও লাগতে পারে। কিন্তু শান্ত নিরিবিলি যায়গায়, রাতের বেলা পড়েন আমার মনে হয় দীর্ঘদিন স্মৃতিতে গল্পের কথাগুলো থাকবে। জীবনের মূল্য নিয়ে সন্দেহ হবে। নিজের অন্তিম পরিণতি ভেবে ভয় হবে। গল্পটা আপনাকে আবদ্ধ করে রাখবে। বইয়ের প্রথম গল্পটা সবার ভাল লাগবে না। তাই শুধু প্রথম গল্পটা পড়ে বিচার করবেন না, আরো ২ টা গল্প পড়েন। এরপর ভাল না লাগলে দু:খিত, সবার ভাল লাগা এক না। লেখকের গল্প বলার ধরণ ভাল। হোক তা ভৌতিক অথবা থ্রিলার। হ্যাঁ, এখানে কোনো প্রেমের গল্প নেই। সামাজিক গল্প আছে, কিন্তু প্রেমের নেই। শেষের গল্পটা একটা ভৌতিক গল্প। সেখানে গা ছমছমে অনুভূতি পাবেন না, সুক্ষ্ণভাবে ভাল লাগার অনুভূতি পাবেন। পড়ার পর তৃপ্তি পাবেন। আদর্শ ছোটগল্প যেমন হয় "শেষ হয়েও হইলো না শেষ", এখানে আবার সবগুলো গল্পও তেমন না। তো টুকটাক ঘাটতির পরেও এক দু'টা গল্প বাদে বাকিসব গল্পই আমার বেশ ভাল লেগেছে এবং সন্তুষ্ট হয়েছি বইটা পড়ে।