নয় রাজ্যের রাজারা যখন নিজেদের মাঝে যুদ্ধে লিপ্ত, তখনই সেই ভূমিতে আগমন ঘটে ড্যারন সিয়াসের। লোকে বলে, সে নাকি কোনো এক দেবতা। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের প্রতিপালনই যার কাজ। ড্যারন অবশ্য কখনোই নিজেকে দেবতা দাবি করেনি, তবে সে এমন একটি কাজ করেছে যা হাজার বছরেও কেউ করতে পারেনি। একে একে কলহপ্রিয় এই নয়টি রাজ্য জয় করে তৈরি করেছে একটি একক সাম্রাজ্য। কিন্তু ড্যারনের মৃত্যুর পর আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বিদ্রোহ। একে একে স্বাধীন হতে থাকে রাজ্যগুলো। এদিকে বর্তমানে ড্যারন রাজ্যের সিংহাসনে নতুন রাজা বসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর যখনই আগুনের সিংহাসন নতুন অধিপতি দাবি করে, তখন তার হাত ধরে আসে রক্তপাত, যুদ্ধ আর নৃশংসতা। এই গল্পে আরো উঠে এসেছে তরোয়ার নামক এক প্রাচীন গুপ্ত সংগঠনের কথা, যার নেতৃত্ব দেন প্রাচীন দেবতা খুমাসের প্রাক্তন সেনাধ্যক্ষ তরোয়ার। এদের একমাত্র লক্ষ্য সিয়াস বংশকে মিশকাওয়াতের বুক থেকে মুছে ফেলা। আরো আছে সাইরাস রাজ্যের কথা, যার ক্ষমতায় আছে ছয়শো বছর ধরে অপরাজিত দ্রিমন বংশ। আরো আছে অসহায় কিশোর অ্যারাইস, হরিয়াল বনের বাসিন্দারা আর এক রাজকুমারের গল্প। বিদ্রোহীদের উত্থান-পতনের পাশাপাশি রহস্যময় এ জায়গায়, রাজকুমারদের ক্ষমতাবদল আর শক্তির উত্থানের সাক্ষী হতে পড়ুন 'রাজকাহন- প্রথম খন্ড'।
অসম্পূর্ণ একটা বই। ওয়ার্ল্ড বিল্ডআপ আর চরিত্র নির্মাণ করতেই পাতা শেষ। অসংখ্য চরিত্র। হিমশিম খাওয়ার যোগাড়। টুইস্ট নেই তবুও লেখকের সাবলীল আর ঝরঝরে লেখা আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। গতবছর সতীর্থ থেকে প্রকাশিত 'যুদ্ধের সহস্র বছর পর' দারুণ লেগেছিল। সেই জায়গা থেকেই এই বইটির প্রতি এতো আগ্রহ। এখন ওটার মতো এটার জন্যও হা পিত্যেশ করে বসে থাকা লাগবে। 'যুদ্ধের সহস্র বছর পর' সিঙ্গেল বই হিসেবে স্বয়ং সম্পূর্ন। তাই আশা থাকবে 'রাজকাহন' টার ২য় খন্ড আগে পাওয়ার। ২য় খন্ড ভালো লাগলে এটার রেটিং তখন বাড়িয়ে দিব।
"প্রতিটি মানুষ তার নিজের জীবনের গল্পের নায়ক। আর হিসেব অনুযায়ী, গল্পের নায়করা সব ন্যায়সঙ্গত কাজই করে। প্রকৃতপক্ষে, বাস্তব জীবনে লক্ষের দিকে যখন প্রবল বাসনা কাজ করে, তখন ভালো-মন্দ শব্দ দুটো আর বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না। শুধু লক্ষ্যই অর্থ রাখে মাত্র।"
~ ডিওন সিয়াস ---------------------------------------------------------- . মিশকাওয়াতের বুকে সেদিন সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছিলো। তখনই হঠাৎ দূরে পাখির মতো সাতটা ছায়াকে দেখা যায়। ছায়াগুলো যতই কাছে আসছিলো, সাইরাস রাজ্যের আকাশ ততোই অন্ধকার হয়ে আসছিলো। সেখানে দেখা যায় মাঝের মানুষটা একটা পঙ্ক্ষীরাজ ঘোড়ায় বসে আছেন। আর তার দুই পাশে তিনটা করে ছায়ামূর্তি অদ্ভুত একটা জন্তুতে বসে আসছে। জন্তুগুলো বড় বড় হরিণের আকৃতির, উজ্জ্বল সবুজ রঙের। রঙটা নাকি আলো ছড়াচ্ছিলো। সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল সেদিন কারণ নয় রাজ্যের কোথাও কেউ কোনোদিন পঙ্ক্ষীরাজ ঘোড়া দেখেনি। পঙ্ক্ষীরাজ ঘোড়া থেকে সেদিন নেমেছিলেন ড্যারন সিয়াস। . যিনি পরবর্তীতে একে একে মিশকাওয়াতের কলহপ্রিয় নয়টি রাজ্য জয় করে তৈরি করেছিলেন একটি একক সাম্রাজ্য। ড্যারন সিয়াস নয় রাজ্য জয় করার পর প্রধান রাজ্যের নাম হয়ে যায় ড্যারন রাজ্য। সহস্র বছর পূর্বে প্রাচীন দেবতা কর্তৃক নির্মিত সুউচ্চ প্রাসাদ "শ্বেত পালক" এর "আগুনের সিংহাসন" অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি শাসন করতে থাকেন নয় রাজ্য। এরপরে কেঁটে যায় প্রায় দুইশো বছর। ড্যারনের মৃত্যুর পর থেকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে বিদ্রোহ। একে একে স্বাধীন হতে থাকে রাজ্যগুলো। এদিকে বর্তমানে ড্যারন রাজ্যের সিংহাসনে নতুন রাজা বসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর যখনই আগুনের সিংহাসন নতুন অধিপতি দাবি করে তখনই তার হাত ধরে আসে হত্যা আর যুদ্ধ। আর তাই রাজনীতির খেলায় মুখরিত হতে শুরু করে ড্যারন রাজ্যের প্রাসাদ শ্বেত পালক। সুযোগ বুঝে সৈন্যবাহিনীর হর্তা-কর্তারাও সিয়াস বংশের অন্য রাজকুমারদের সাথে দলবদল শুরু করে। রাজনীতির এই খেলায় কে জয়ী হতে যাচ্ছে? কে হতে যাচ্ছে আগুনের সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার? . গল্পটা তরোয়ার নামক প্রাচীন গুপ্ত সংঘঠনের। যাদের একমাত্র লক্ষ্য মিশকাওয়াতের বুক থেকে সিয়াস বংশকে মুছে ফেলা। কথিত আছে এই দলের নেতৃত্ব দেয় অমর গুরু তরোয়ার; যিনি প্রাচীন দেবতা খুমাসের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। গল্পটা সাইরাস রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা দিম্রন বংশের। গত ছয়শো বছরের ইতিহাসে যে দিম্রন বংশ কোনো যুদ্ধে পরাজিত হয়নি। গল্পটা অসহায় কিশোর অ্যারাইস মিলয়ের, ক্ষমতা লাভের এই নোংরা রাজনীতিতে যার পরিবারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। গল্পটা একজন রাজকুমারের, যিনি সন্ন্যাসী হবার বাসনায় রাজ্য ত্যাগ করেছেন অনেক আগেই। গল্পটা হারিয়াল বনের বাসিন্দাদের। যারা ছিল এক সময়ে ড্যারন রাজ্যের ক্ষমতায়; কিন্তু এখন দিন কাটায় লুকিয়ে অন্ধকার বনে। নয় রাজ্যের কোনো রাজাই যাদের আশ্রয় দেননি। . ঘটনা এগিয়ে যেতে থাকে, নয় রাজ্যের আকাশে ভেসে বেড়াতে থাকে ঝড় ডেকে আনা অন্ধকার কালো মেঘ। আসছে, মহা প্রলয় আসছে... . ◑ পাঠ প্রতিক্রিয়া: . রাজকাহন আমিনুল ইসলামের লেখা পলিটিক্যাল এপিক ফ্যান্টাসি। মিশকাওয়াত নামক সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে এই বইয়ের কাহিনি। মূলত মিশকাওয়াতের মোট নয়টা রাজ্য ও রাজ্যগুলোর অভিজাত মহলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কূটকৌশল, ষড়যন্ত্রকে ঘিরেই রাজকাহনের ঘটনা প্রবাহ এগিয়েছে। . সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড ভিত্তিক ফ্যান্টাসি হওয়ায় লেখককে সম্পূর্ণ নতুন একটা ওয়ার্ল্ড ক্রিয়েট করতে হয়েছে। ফলে বাস্তবে যেমন হয় তেমনই নয় রাজ্যের প্রত্যেকটা রাজ্যের মিথ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মবিশ্বাস রয়েছে। যেমন ড্যারন সিয়াস কে? কীভাবে সে এসেছিল? কেনই বা সবাই তাকে দেবতার আসনে বসিয়েছে? ছয়শো বছরের ইতিহাসে সাইরাস রাজ্য শাসন করা দ্রিমন বংশ কেন কখনো কোনো যুদ্ধে পরাজিত হয়নি? কীভাবে হরিস রাজ্যের নাম মুছে গেল মিশকাওয়াত থেকে? রক্ত রাজ্যের নাম কেন রক্ত রাজ্য? উত্তর রাজ্য আর হারিয়াল বনের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদীর নাম কেন 'রিয়াইন' নদী? আবার হারিয়াল বনের নামই বা হারিয়াল বন কীভাবে হলো? এছাড়াও আগুনের সিংহাসন, জমজ ফিনিক্স তরবারি নামকরণের কারণ এর পেছনের ইতিহাস ইত্যাদি। নয় রাজ্যের, রাজ্যের মানুষদের এসব ইতিহাস, মিথ উঠে এসেছে রাজকাহনে। . এসব কারণে বইয়ের শুরুর দিকের অংশ কিছুটা মন্থর গতিতে এগিয়েছে। যেহেতু এটা সিরিজের প্রথম বই তাই ওয়ার্ল্ড বিল্ড আপ এই বইয়ে করতেই হতো। এতোকিছু সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য এই সময়টার প্রয়োজন ছিল। এখানে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। পলিটিক্যাল ফ্যান্টাসির মধ্যে এ সং অব আইস এন্ড ফায়ার এবং কুইন্স থিফ সিরিজের প্রথম বইগুলা যারা পড়েছেন তারা দেখবেন এগুলোও শুরর দিকে বেশ ধীর গতিতে এগিয়েছে; এর কারণও এটাই। এতোগুলো রাজ্য, রাজ্যগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক, রাজনীতি, ইতিহাস সবকিছুকে জায়গা মতো সেট করা একটু সময়সাপেক্ষই বটে। সবকিছু মিলিয়ে লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ওয়ার্ল্ড বিল্ডাপ করেছেন। যদিও কিছু রাজ্য সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্যই ছিল না, এগুলো আশা করি পরবর্তী বইয়ে জানা যাবে। . এছাড়া রাজকাহনে খুব শক্তিশালী ম্যাজিক সিস্টেম ছিল না। এই গল্পটায় জাদুবিদ্যার থেকে রাজনীতি, কূটনীতি, মনঃস্তত্ত্ব, আগুনের সিংহাসনকে ঘিরে ষড়যন্ত্রই প্রাধান্য পেয়েছে। তারপরেও বইয়ে হালকা ম্যাজিক সিস্টেম, ম্যাজিকাল ক্রিয়েচার, অতিপ্রাকৃত সত্ত্বার উপস্থিতি ছিল। যেহেতু এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা জুড়ে দেব-দেবীর প্রভাব রয়েছে সেহেতু পরবর্তী বইগুলোতে জোরালো ম্যাজিক সিস্টেম দেখা যেতেও পারে। . এতোগুলো রাজ্য, দেব-দেবী, প্রত্যেক রাজ্য শাসন করা ভিন্ন ভিন্ন রাজবংশের মানুষ, উচ্চপদস্থ রাজ কর্মকর্তা সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মিলিয়ে অনেক চরিত্র রয়েছে বইয়ে। আবার স্থান, কাল, পাত্রভেদে বাহারি নাম তাদের। তবে প্রতিটা চরিত্রই লেখক যত্নের সাথে তৈরী করেছেন। কোনো মানুষই একদম ভালো কিংবা খারাপ নয়। প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে আলোকিত এবং অন্ধকার এক সত্ত্বা। মানুষ মাত্রই যে আলো-আঁধারি, ভালো-খারাপের সংমিশ্রণ, এই বিষয়টা লেখক দেখাতে চেয়েছেন চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে৷ চমৎকার চরিত্রায়নের কারণে কখনো পাঠক সন্যাসী রাজকুমার রুদ্রাসা মাহাতার সাথে অমরত্বের সন্ধানে যাবে, নেমিয়ার সাথে যাবে গোপন কোনো অভিযানে আবার কখনো বা ছোট্ট শিশু এরিসার নিয়তির জন্য ব্যথিত হবে; চরিত্রগুলোর সাথেই প্রত্যক্ষদর্শী হবে প্রতিটি ঘটনার, হেঁটে বেড়াবে মি��কাওয়াতের বুকে। তবে যেহেতু সিরিজের প্রথম বই আর এতোগুলো চরিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাই একদম মনে দাগ কাটার মতো কোনো চরিত্র এখনো তৈরী হয়নি। দেখা যাক পরবর্তী কী হয়। খেলা তো মাত্র শুরু... . প্রথম দিকে ঘটনা প্রবাহ ওয়ার্ল্ড বিল্ডাপ, ক্যারেক্টারাইজেশনের জন্য কিছুটা ধীর গতিতে এগোনোর পরে গতি বৃদ্ধি পায় এবং এর পরের পুরোটা সময় মোটামুটি একই গতিতে এগিয়েছে বইয়ের কাহিনি। বইয়ে তেমন কোনো টুইস্ট না থাকলেও কিছুক্ষণ পরপরই ছিল এমন কিছু বাঁক যার জন্য হয়তো পাঠক প্রস্তুত থাকবে না। সবমিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। বর্তমানে ফ্যান্টাসি জনরা নিয়ে আগের থেকে বেশি কাজ হলেও আমার জানামতে বাংলা সাহিত্যে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পলিটিক্যাল এপিক ফ্যান্টাসি লেখা হয়নি। রাজকাহন পড়ার পর পরবর্তী বইয়ের জন্য আগ্রহবোধ করছি, এখন দেখার পালা পরবর্তী বইয়ে লেখক রাজকাহনের ইম্প্রেশন বজায় রাখতে পারে কিনা। . ◑ লেখনশৈলী: . লেখক আমিনুল ইসলামের প্রায় সকল বই আমার পড়া হয়েছে৷ প্রতিটা বই পড়ার সময় লক্ষ করেছি লেখক প্রত্যেকবারই নিজের লেখনীকে আগের থেকে আরো ধারযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকবারই লেখনীতে আগের থেকে অধিক যত্নের ছাপ দেখতে পেয়েছি। রাজকাহনও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন পর্যন্ত লেখকের যতগুলো বই পড়েছি, দেখা গেছে প্রত্যেকটা বইয়ের লেখা সাবলীল, মেদহীন হলেও কিছু কিছু শব্দচয়ন, বাক্যগঠন নিয়ে ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে এই বই পড়তে গিয়ে আমি নিজেই অবাক হয়েছি। এই বইয়ের প্রতিটা শব্দ, বাক্যের প্রতি লেখক অনেক যত্নশীল ছিলেন। কিছু জিনিস তেমন চোখে না লাগলেও এখনও পরিবর্তন করা যেতো তবে এটা বিরাট কিছু না। লেখনীতে এতো পরিবর্তন যেহেতু এসেছেই আশা করাই যায় যে পরবর্তী বইগুলোর শব্দচয়ন, বিন্যাস আরো দারুণ হবে। . ◑ বানান, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন ও অন্যান্য: . বইয়ের সম্পাদনা করেছেন ফ্যান্টাসি লেখক আশরাফুল সুমন। ফলে সম্পাদনা নিয়ে অভিযোগের যায়গা নেই তেমন। বানান ভুলও ছিল না, দুয়েকটা টাইপো ছিল। আর দুই-তিন জায়গায় নামের অদলবদল হয়েছে। যেমন: প্রিয়তার জায়গায় মেহেরিয়া, রিতুহানের জায়গায় ভীনা সেদান। এছাড়া বইয়ে দেওয়া ম্যাপে মেবাবিল রাজ্যের জায়গায় সেবাবিল রাজ্য হবে আর সেবাবিল রাজ্যের জায়গায় সাইরাস রাজ্য। . বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন আরেক ফ্যান্টাসি লেখক এবং প্রচ্ছদশিল্পী লর্ড জুলিয়ান। প্রচ্ছদটাও বেশ দৃষ্টিনন্দন। আর বইটার প্রোডাকশন নিয়ে কিছু বলার নেই। বেনজিন প্রকাশন এর সিগনেচার প্রোডাকশনে রাজকাহন প্রকৃতপক্ষেই রাজকীয় হয়ে উঠেছে। . ◑ প্রিয় অংশ: . "যদি সবকিছু বিপক্ষে থাকে, জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে, তবুও কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। যদি করো, তাহলে সেই অন্যায়টা একসময় আর অন্যায় থাকবে না। সেটাই দুনিয়ার নিয়ম হয়ে যাবে। দুনিয়া হবে অপবিত্র। দুনিয়া খারাপ মানুষের জন্য নষ্ট হয় না, দুনিয়া নষ্ট হয় ভালো মানুষদের জন্য। ভালো মানুষের দায়িত্ব ভালো কাজ করা কিন্তু যখন সে তার দায়িত্ব ভুলে জগতের সব অন্যায় মেনে নিতে থাকে, তখন দুনিয়া বদলে যেতে শুরু করে।" . ~ রাজকাহনে সন্তানকে দেওয়া বাবার উপদেশ . ◑ ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৫/৫ . ◑ বই পরিচিতি: ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬ ➠ বইয়ের নাম: রাজকাহন ➠ লেখক: আমিনুল ইসলাম ➠ জনরা: পলিটিক্যাল এপিক ফ্যান্টাসি ➠ প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ➠ প্রকাশনী: বেনজিন প্রকাশন ➠ প্রচ্ছদশিল্পী: লর্ড জুলিয়ান ➠ পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২৯৬ ➠ মুদ্রিত মূল্য: ৫৫০ টাকা
কথাটি সত্য। রাজা বাদশাদের যুদ্ধ হয় ক্ষমতা দখলের নিমিত্তে। কে কত শক্তিশালী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে, তার চেষ্টায় এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে চলা! সামনে কে এলো দেখার বিষয় না। সব তছনছ করে লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে চলা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ মানুষ। রাজা বাদশাদের কী হয় জানি না, মৃত্যুর এই খেলায় সাধারণ সে সব প্রজাদের জীবন প্রদীপ একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে আসে।
আমাদের গল্পের চিত্রকল্প একটু ভিন্ন। এখানে উলুখাগড়ার ভূমিকা তেমন নেই বললেই চলে। যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়। কিংবা বলা রাজক্ষমতা দখলের চেষ্টায় প্রাণ হারায় রাজ বংশ। একজন একজন করে তলিয়ে যায় মৃত্যুর অতল গহ্বরে। টিকে থাকে শুধু সে-ই, রাজ্যের সিংহাসন যাকে ইশারা দিয়ে ডাকে। এর সহজেই কি সিংহাসন আয়ত্ত করা যায়? এই সিংহাসনের জন্য এর রক্তপাত, মৃত্যুর খেল; সেই সিংহাসন কখনো কখনো ফিরিয়ে দেয়। এই সিংহাসন অনেকটা মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো। স্থির হয়ে বসা যায় না। শত্রুপক্ষ ছুটে আসে। ষড়যন্ত্রের ডালপালা ছড়িয়ে এগিয়ে আসে নতুন কোনো বিভীষিকা। তারপর.... কিছুদিন সুস্থির! আবারো একই খেল, একই পরিণতি।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
একটু দুইশ বছর পেছনে ফিরে যাওয়া যাক। কোথা থেকে এক যুবকের আগমন যেন পুরো ইতিহাস বদলে দিলো। এমন যোদ্ধাকে কেউ দেখেনি আগে। যার পদতলে লুটিয়ে পড়ছে একের পর এক রাজ্য। যুদ্ধের ময়দানে যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। ভয়ডরহীন, কাউকে পরোয়া না করা সেই যোদ্ধার নাম ড্যারন সিয়াস। কোথা থেকে সে এসেছিল কেউ জানে না। কেনই বা এসেছিল? শুধু রাজ্য জয় করতে? না-কি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? সে যাই হোক! ড্যারন সিয়াস যেন নিজেকে তুলে ধরেছে অনন্য উচ্চতায়। তাকে সবাই দেবতা জ্ঞান করে। দেবতাই তো! নাহলে এভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো করে একে একে নয় রাজ্য জয় করা সম্ভব? নিজের নামে সেই রাজ্যের নাম হয়ে যায় ড্যারন রাজ্য। সব রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই রাজ্য বাকি আট রাজ্যের উপর ছড়ি ঘোড়ায়। একসময় জীবনের অবসান ঘটে। ধীরে ধীরে শিকলে বাঁধা জীবনে ক্লান্তি আসে। মুক্ত হতে চায় মানুষ। তাই হয়তো ড্যারন রাজ্যের ছায়া থেকে মুক্ত হতে চাওয়া রাজ্যের সংখ্যা নেহাতই কম নয়। স্বাধীন হতে চাওয়া কি দোষের?
ড্যারন রাজ্যের বর্তমান রাজা চাওন সিয়াস। একটি যুদ্ধে পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা নিমার সিয়াসের স্থলাভিসিক্ত সে। কিছুদিন পর নিমারের সন্তান ডিওন বসবে আগুনের সিংহাসনে। সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু একবার ক্ষমতার লোভ ধরলে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? ড্যারন রাজ্যে ষড়যন্ত্রের গল্প লেখা হয়ে গিয়েছে। এক বিশাল ঝড় ঘনিয়ে আসছে। কে হবে পরবর্তী রাজা? যোগ্য কেউ কি সিংহাসনে বসতে পারবে?
প্রাচীন মিশকাওয়াতের অধ্যায় শেষ হয়েছিল প্রাচীন দেবতা খুমাসের হাতে। সেই খুমাসের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন গুরু তরোয়ার। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও, কেউ কেউ বলে গুরু তরোয়ার এখনো বেঁচে আছে। সত্য, না মিথ; কেউ জানে না। সত্য হোক বা না হোক, তরোয়ার নামের এক গুপ্ত সংগঠনের অস্তিত্ব ঠিকই আছে। যবে যবে মানব জাতি হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে, তখনই তাদের আবির্ভাব। এই মানব জাতি রক্ষার ভার যেন তাদের উপর। আরও একটি দায়িত্ব আছে। এই মিশকাওয়াতের বুক থেকে সিয়াস বংশের নাম ও নিশানা মুছে ফেলা। কিন্তু কেন? কী এমন গোপন রহস্য আছে, যে একটি বংশের প্রতি তীব্র ঘৃণা জন্ম নেয়? মানুষ যেই বংশকে দেবতা জ্ঞান করে, এত সহজে তাদের হারিয়ে ফেলা যাবে?
মেয়েটির নাম নেমিয়া। সাধারণ এক মেয়ের মাথায় ঠিক কী ঘটেছিল জানি না, হুট করেই যেন কারাগারে বন্দী হতে ইচ্ছুক। কিন্তু এভাবে তো কারাগারে যাওয়া যায় না। তবে উপায়? ট্রিও রাজ্যের এক সৈন্যকে খুন করে সেই সুযোগ নিলো সে। খ���ন একজনকে নয়, সময়ে সময়ে একাধিক সৈন্যকে খুনের দায়ে ভয়ংকর এক অপরাধী চিহ্নিত হয়ে উঠল সে। ফলাফল? এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ। নাহ, সে সাধারণ কোনো মেয়ে নয়। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থাকে। নেমিয়ার নিজেরও এক লক্ষ্য আছে। সেই লক্ষ্য পূরণে সে সবকিছু করতে পারে।
এই গল্প অ্যারাইস মিলয় নামের এক বালকের। কৃষক পরিবারে জন্ম তার। এক বিভীষিকায় ওলট পালট হয়ে গেল তার জীবন। বাবা-মাকে নির্দয়ভাবে খুন করেছে কয়েকজন সৈন্য। একমাত্র ছোটো বোন লাপাত্তা। কোথায় যাবে অ্যারাইস? বোনকে কোথায় খুঁজবে? সে প্রতিশোধ চায় না। শুধু নিজের বোনকে খুঁজে পেতে চায়। বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে ড্যারন রাজ্যে হাজির হয় শেষ আশা নিয়ে। একজন কৃষক বালকের কথা কে শুনবে? চারিদিকে শত্রু বিদ্যমান। সেখানে বেঁচে থাকাটাই যে কঠিন! এক বৃদ্ধ ছায়া হয়ে রয়েছে ছেলেটার। কে সে? কেন অ্যারাইসকে সাহায্য করছে সে?
মুদ্রার এপিঠে সুখ থাকলে ওপিঠে থাকে দুঃখ। ড্যারন সিয়াসকে সবাই দেবতা মনে করলেও কারো কারো কাছে এসে অপদেবতা ছাড়া কিছুই নেই। যার জন্য ভিটেমাটি হারাতে হয়, সে কখনো দেবতা হতে পারে না। ড্যারন রাজ্যের পুরনো নাম ছিল হরিস রাজ্য। হ্যারি অ্যাল সেই রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন। উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো করে সেই রাজ্য দখল করে নেন ড্যারন সিয়াস। রাজা সমেত অনেকেই তখন রাজ্য ছাড়া। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেই হরিয়াল বনে। বিপজ্জনক সে বনেই বসবাস গড়ে তোলে। তারপরও পুরনো দিনের কথা ভুলতে পরে না। সেই বনে নতুন সর্দার নির্ধারণের প্রতিযোগিতা চলছে। দাবির অ্যাল যোগ্য হলেই চাচাত ভাই শিতাশ যেন ছেড়ে কথা বলবে না। দুই ভাইয়ের লড়াই মৃত্যু পর্যন্ত গড়িয়েছে। কে কাকে মেরে বনের সর্দার হবে?
উত্তর রাজ্যের রাজকুমার রুদ্রাসার সিংহাসনের প্রতি কোনো লাভ নেই। পুরনো এক ক্ষত তাকে জীবনের প্রতি উদাসীন বানিয়ে রেখেছে। সন্ন্যাস জীবনের খোঁজে ছুটছে এদিক ওদিক। একদিন থমকে দাঁড়ায় সে। জীবনে নতুনের খোঁজ পায়। কিন্তু সামনে যে বড়ো বাঁধা!
এই গল্পে আছে রাজকুমারী প্রিয়তা। আছে এক কাঠুরিয়ার মেয়ে মেহেরিয়া। ভালোবাসার জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে থাকা দুই তরুণী। ওদের ভাগ্যে কি ভালোবাসা জুটেছিল? কিংবা বলা যায় ফাহিম দ্রিমণের কথা। সাইরাস রাজ্যের রাজকুমার বিয়ে করে নতুন জীবন গড়ার সামনে। তখনই এল এক ঝড়! যে ঝড়ে লণ্ডভণ্ড তার জীবন। রক্ত রাজ্যের রাজা ইরু সেদান নিজ সন্তানের কাছে রাজ্য হারিয়ে পথে পথে ঘুরছে সাথে বিশ্বস্ত এক সহচর রিতুহান। রিতুহান পেয়েছে নতুন আলোর সন্ধান। সেই আলো খুঁজে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
এই গল্প ষড়যন্ত্রের, বিশ্বাসঘাতকতার, ক্ষমতা দখলের.... কারো উত্থান, কারো বা পতনের। রাজ্যের পথে পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেসব গল্পে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত "রাজকাহন"!
▪️বই পর্যালোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়া :
"রাজকাহন" আসলে কী? একটি রাজ্যের গল্প, কিংবা একাধিক রাজ্য! রাজ্যে রাজ্যে রেষারেষি চলে। এক রাজ্যের সাথে আরেক রাজ্যের খুনোখুনি। রাজনীতি চলে অভ্যন্তরীণও। কাছের মানুষ যাদের মনে করা হয়, তারা কি সত্যি কাছের? হয়তো কাছের, নয়তো না। রাজনীতির এ গল্পে কেউ কাছের না। বইটি পড়তে পড়তে একটা সময় ভাবছিলাম, আচ্ছা পারিবারিক বন্ধন কি এতটাই ঠুনকো? নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা যায়?
ফ্যান্টাসি গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। একটি ভিন্ন জগতের গল্প বলেছেন লেখক আমিনুল ইসলাম। উপন্যাসে নয়টি রাজ্য আছে। রাজ্যগুলো হলো : ড্যারন রাজ্য, সাইরাস রাজ্য, সেবাবিল রাজ্য, রক্ত রাজ্য, ট্রয় রাজ্য, উত্তর রাজ্য, কিটিয়াস রাজ্য, মিয়াস রাজ্য, পূর্ব রাজ্য। এছাড়াও একটি বন রয়েছে। রাজ্য না হলেও হরিয়াল নামের সেই বনটি রাজ্যের মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সীমানা, নদী পেরিয়ে পাহাড়ের গল্প, এর ইতিহাস উঠে এসেছে সুন্দরভাবে।
লেখক খুব দারুণভাবে প্রতিটি রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। সময় নিয়ে প্লট সাজিয়েছেন। "রাজকাহন" যেহেতু সিরিজ হচ্ছে, প্লট বিল্ডিং এখানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। লেখক সেই কাজটি করেছেন দক্ষতার সাথে। রাজ্য, রাজ কাহিনির মাঝে গল্পটি গড়ে উঠে একটি ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। যেই ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রাচীন হলেও তার ছাপ বর্তমানেও উপস্থিত। ইতিহাস যখন বর্তমানে আসে, তখন অতীত বর্তমানের সাথে সমান্তরালে চলে।
ঠিক এমনটিই যেন ঘটেছে "রাজকাহন" উপন্যাসে। অতীত কখনো মস্তিষ্ক থেকে দূর হয় না। সেই ইচ্ছেকে পুঁজি করেই যেন বর্তমান সংঘাত। রাজনীতি তো চলছেই, সেই সাথে অভ্যন্তরীণ কুট কৌশলে বিদ্ধ হচ্ছে গোটা রাজ্য। প্রতিটি রাজ্য যেন সেই ইতিহাসের অংশ। এভাবেই এক একটি রাজ্য যেন নিজেকে প্রচার করছে। লেখক এখানে বর্ণনা দিয়ে নয়, ইতিহাসের সাথে সংযোগ স্থাপন করে প্রতিটি রাজ্যকে তুলে ধরেছেন। যার ম্যাপ আছে বইটির ডাস্ট কভারে।
উপন্যাসের শুরু কিছুটা ধীর গতির। কেননা, লেখক শুরুটা করেছেন প্রাচীন ইতিহাস দিয়ে। সেই সাথে মূল চরিত্রগুলোর সাথে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রাজ্যগুলোকেউ ধীরে ধীরে সামনে এনেছেন। ফলে শুরুর সময় অনেক কিছু মাথায় রাখার চেষ্টা করতে হয়। এরপর গল্প এগোনোর পাশাপাশি দারুণ গতি পেয়েছে গল্পটা। যদিও "রাজকাহন" সিরিজের প্রথম বইয়ে সবগুলো রাজ্য ঠিক ফুটে না উঠলেও, কিছু রাজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হয়তো পরবর্তী সিরিজে বাকি রাজ্যগুলো সামনে আসবে।
যেখানে রাজতত্ব নিয়ে আলোচনা, সেখানে রাজনীতির ভূমিকা মুখ্য। মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ড্যারন রাজ্য যে সবার পছন্দের হবে তাও নয়। কেউ মিত্র হলেও আবার অনেকে শত্রুতা বজায় রাখবে। তবে একটা জিনিস ভালো লাগেনি। কারো বিপক্ষে থাকলেই কেবলমাত্র খুন করা সহজ সমাধান নয়। প্রতিপক্ষও জানে যে তাকে খুন কত হতে পারে। যেই ষড়যন্ত্র প্রতিপক্ষ বুঝে যায়, সেই ষড়যন্ত্র করে লাভ কী? এই জায়গায় লেখক আরও ভালো কাজ দেখাতে পারতেন। যদিও বেশ চমক ছিল পুরো বই জুড়ে। সেগুলো উপভোগ করেছি।
শেষটা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে গেল। খুব বেশি চমক না থাকলেও মূল কাহিনি থেকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে গিয়েছে মূল গল্প। বিষয়টা আসলেই অবাক করেছে। শুধু এই কারণে এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। আশা করি অনেক প্রশ্নের উত্তর সেখানে পাবো।
▪️চরিত্রায়ন :
ফ্যান্টাসি জাতীয় এ সকল বইয়ে প্রচুর চরিত্রের আনাগোনা থাকে। এখানেই তার ব্যতিক্রম নেই। একটা সময় এমন অবস্থা হয়েছিল, চরিত্রগুলোর নাম মনে রাখতে আর তার কর্মকাণ্ড হিসাব করতেই বেগ পেতে হয়েছিল। চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে লেখকের যত্নের ছাপ স্পষ্ট। অনেক ভেবেচিন্তে তৈরি করা যেন! সবাই যে খুব বেশি সময় গল্পে ছিল, তেমন না। তারপরও যারা ছিল, যখন ছিল; প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল।
একটা বিষয় ভালো লেগেছে। একজন মানুষ কখনো সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ খারাপ হতে পারে না। ভালো-মন্দের মিশেলে একজন মানুষ। অনেক বইয়ে দেখা যায় প্রধান চরিত্রকে অতিমানবীয় হিসেবে দেখানোর প্রবণতা আছে। এখানে তেমনটি ছিল না। সবার মধ্যে কিছু না কিছু ভালো গুণের পাশাপাশি কিছু মন্দ কর্মও ছিল।
উপন্যাসের শুরুতে ডিওনকে বদমেজাজি রাগী হিসেবে দেখানো হলেও মাঝের পুরোটা সময় আমার তা মনে হয়নি। বরং বিনয়ী, কোমল হৃদয়ের একজন মনে গিয়েছে। তাহলে কেন লেখক জোর করে রাগী দেখানোর প্রয়াস করেছেন জানা নেই।
কিংবা রুদ্রাসার সাথে পথে পথে হেঁটে জীবনকে জানার চেষ্টা অথবা নেমিয়ার মতো নিয়তি বরণ করে নেওয়া। বইয়ের চরিত্রগুলো বললে হয়তো শেষ করা যাবে না!
▪️লেখনশৈলী :
লেখকের বর্ণনাশৈলী পুরো বই জুড়ে ভালো ছিল। তিনি যেভাবে তার তৈরি পৃথিবী তুলে এনেছেন, যেন আমিও সেই পৃথিবীর এক অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। তবে আমার মনে হয় লেখকের শব্দচয়নে ঘাটতি রয়েছে। লেখক কিছু জায়গায় এর দারুণ শব্দের ব্যবহার করেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে শব্দের ব্যবহার আরও বেটার হতে পারত। এই জাতীয় উপন্যাসে শব্দের খেলা বইটিকে প্রানবন্ত করে তোলে। লেখকের লেখা সোজাসাপ্টা। সেই সোজাসাপ্টা গল্প বলার ধরনে কিছু শব্দচয়ন যদি যথাযথ হতো, উপন্যাসটি আরও উপভোগ্য হতো।
▪️সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও বাঁধাই :
বানান কিংবা সম্পাদনা নিয়ে অভিযোগ নেই। প্রোডাকশন কোয়ালিটি বেনজিন প্রকাশনীর ট্রেডমার্ক। তবে প্রচ্ছদ বেশি আকর্ষণীয় করতে গিয়ে একটি হযবরল লেগেছে। আরেকটু সাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত হয়তো!
▪️পরিশেষে, ক্ষমতার এই লোভে যুগে যুগে ধ্বংস হয়েছে কত সম্রাজ্য। কত মানুষ হারিয়েছে জীবনীশক্তি। তবুও এই লোভ কমে না। যেন যুগে যুগে বেড়েছে, আর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
▪️বই : রাজকাহন ▪️লেখক : আমিনুল ইসলাম ▪️প্রকাশনী : বেনজিন প্রকাশন ▪️প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৯৬ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫
দুনিয়ার সমস্ত রাজ্যের সমস্ত ইতিহাস সাক্ষী, আজ পর্যন্ত যত বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে, তার সবই মানুষকে অতিরিক্ত সম্মান, বিশ্বাস ও ভালোবাসা ও ক্ষমতার লোভের কারনেই হয়েছে। যুগে যুগেই এমন হয়ে এসেছে, এ এক অমোঘ বিধান। ক্ষমতার দখল কার না চাই? রাজা থেকে প্রজা সবাই এই গন্ডিতে আবদ্ধ।
দেবতার দেবত্ব,রাজার রাজত্ব সবকিছু একই চক্রে আবৃত। ক্ষমতার লোভো দেবতা কিংবা মানুষ হোক তার চরণতলে আশ্রিত হয়েছে কালক্রমে সমগ্রধরণী। নতুন দেবতা কিংবা শাসক যেই আসুক ক্ষমতাবলে, তখন তার উত্তাপে হারিয়ে যায় পূজা পেয়ে আসা পুরোনো দেবতা কিংবা শাষক শ্রেণী। এ পুরোটাই ক্ষমতার রদবদল। বলছিলাম আমিনুল ইসলামের পলিটিক্যাল হাই ফ্যান্টাসি উপন্যাস “রাজকাহন” এর কথা।
গল্প সংক্ষেপঃ “যুগে যুগে যখনই অন্ধকার এসে গ্রাস করে নিতে শুরু করে,সভ্যতায় তখনই এক দেবতা নেমে আসেন, অন্ধকারকে বিতাড়িত করে এনে দেন পবিত্র আলো।” অনেকের মতে ড্যারন আসার আগের সময়টা অন্ধকার যুগ ছিলো। আর তার আগমনেই অন্ধকার কেটে আলো নেমে এসেছে সভ্যতায়। যে আলোয় প্রজারা তাঁকে নিয়ে গেছে দেবতার স্থানে। নয়টি রাজ্য জয় করে নিজেকে নয়টি রাজ্যর প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেবতা ড্যােন। যার নাম দিয়েছিলেন ড্যারন রাজ্য!
সময় পেরিয়েছে,,
এখন রাজত্ব দেবতা ড্যারনের সিয়াস বংশের। রাজা নিমার সিয়াসের সিংহাসনের উত্তরাধিকার সুযোগ্য একমাত্র পুত্র ডিওন সিয়াস। রাজকুমার ডিওন অপেক্ষমান কবে আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু রাজনীতির খেলায় মুখরিত ড্যারন রাজ্যের প্রাসাদ শ্বেত পালক। সৈন্যবাহিনীর প্রধান কর্তা (চার ঘোড়া) সিয়াস বংশের অন্য রাজকুমারের সাথে লিপ্ত হচ্ছে নানা ষড়যন্ত্রে। শুরু হয়েছে আগুনের সিংহাসনে বসার এক লড়াই।
তবে নয় রাজ্যর পশ্চিম রাজ্য সাইরাস রাজ্য, যার ক্ষমতায় আছে দিম্রন বংশ। যাদের ইতিহাসে কখনো পরাজয় নেই। সেই ক্ষমতার ইতিহাস কি তবে এবার বিচ্যুত হবে? নয় রাজ্যর আকাশে ষড়যন্ত্রের ঝড় ডেকে আনা অন্ধকার কালো মেঘের পাশাপাশি আছে এক ভালোবাসার আলো। যার হাত ধরে ঘুরে যাবে ড্যারন বংশের উত্তরাধিকার!! “ক্ষমতার অনেকগুলো কেন্দ্র থাকে। ক্ষমতার এ কেন্দ্রগুলোর বিনাশ হয় না,কিন্তু প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হয়।” আর এই রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রে কে জয়ী হতে যাচ্ছে? কে হচ্ছে আগুনের সিংহাসনের একমাত্র দাবিদার! ভালোবাসার জয় কি হবে সময় পেরিয়ে??
রাজকাহনঃ রাজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ষড়যন্ত্রের এক আখ্যান
❝ইতিহাস হলো খনিতে পাওয়া স্বর্ণের মতো, তাতে অপজাত মেশানো থাকে। সেই অপজাত ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানুষ সেটাকে বিশুদ্ধ রূপ দিতে পারে, সেই হয় সমৃদ্ধ। ❞ লেখক আমিনুল ইসলামের সেই স্বর্ণের খনিতে পাওয়া ইতিহাস কে গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসিতে রূপদান করে এক অসাধারণ গল্প সংযোজন করেছেন “রাজকাহন” নামকরনে।
উপন্যাসটি পুরোপুরি রাজনৈতিক পটভূমিতে লেখা। এখানে রাজনীতির খেলা ও মারপ্যাঁচ দিয়েই পুরো ঘটনাকে মাকড়সার জালের মত বুনতে চেষ্টা করেছেন লেখক। ফ্যান্টাসি উপন্যাসের মতো যদি আপনি এখানে বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত প্রাণীর ম্যাজিক সিস্টেমের বদলে “রাজনীতির ভূতে ধরা” সিস্টেমকে তুলে ধরেছেন। যে আলোতে শুধুই আমাদের অধিকার, আজ সেই আলোতেই আমাদের স্থান নেই। আমরা কাপুরুষের মত পড়ে আছি অন্ধকারে, লুকিয়ে। -দাবির অ্যাল
উপন্যাস শুরু হয় দেবতা ড্যারনের হাত ধরে। দেবতা ড্যারন মারা যাবার কয়েক দশক পর কেউ বিরুদ্ধে না গেলেও পঞ্চাশ বছর পর পবিত্র ছিয়ানব্বইতে কিটিয়াস রাজ্য, মিয়াস, সেবাবিল ও সর্বশেষ ট্রিও রাজ্য যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন ঘোষনা করে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং প্রত্যেকটা রাজ্যের সাথে আরেকটা রাজ্যের দূরত্ব তৈরি হয়। শুরু হয় ক্ষমতা দখলের নিরবচ্ছিন্ন নিরব যুদ্ধ। লেখক এতো এপিক স্কেলে উপন্যাসের এ প্লট সাজিয়েছেন যে এক বসায় বইটা শেষ করার মত না। এ কথা বলার কারণ, রাজকাহন উপন্যাসে পরপর নয় রাজ্যর বর্ণনা ও ঘটনা গুলো আপনাকে বুঝতে হবে এবং তার সাথে প্রত্যেকটা চরিত্রের বিন্যাস ও আপনাকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অসংখ্য চরিত্র,অজস্র স্থান আর লম্বা লম্বা ইতিহাসের সুঁতো গুলো একত্রে মাথায় পেঁচিয়ে যেতে পারে । তবে একটু সময় নিয়ে পড়লেই পুরো উপন্যাসের মজ্জা উপভোগ করতে পারবেন।
ফ্যান্টাসি জনরার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং। লেখক আমিনুল ইসলাম তার রাজকাহন উপন্যাসে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং দ্বারা সমৃদ্ধ প্লট ভালোভাবেই উপস্থাপন করতে পেরেছেন। কাহিনী যত আগাবে তত বুঝতে পারবেন যে পুরো ঘটনাটা একে অপরের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই বিষয়ের সাথে বিভিন্ন ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট নিয়ে এসেছেন, সেগুলার উপস্থিতি কম হলেও যে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং এর ক্ষেত্রে লেখকের কাজ যথেষ্ট সুন্দর হয়েছে,তা মানতে বাধ্য।
ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং দ্বারা সমৃদ্ধ এই ফ্যান্টাসি উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চরিত্র। লেখকের লেখনী প্রতিটা চরিত্রের সাথে পাঠকের যখন সামঞ্জস্যতা তৈরি হবে কাল্পনিক ভাবে, তখনই লেখকের সফলতা বিরাজ করবে। এক্ষেত্রে লেখক সেই সফলতা যথেষ্ট পেয়েছেন।
শুরু থেকেই ছোট ছোট চরিত্র গুলোর উল্লেখ ও পরবর্তীতে এমন ভাবে কাহিনীর কাঠামোতে মিশিয়েছেন যা নিখাঁদ প্রশংসাযোগ্য।
প্রতিটা চরিত্রের নিজস্ব স্বার্থ, লুকায়িত চাহিদা বাবা-ছেলে, চাচা-ভাতিজার রক্তের সম্পর্কের উথান-পতন দেখিয়েছেন। সিয়াস বংশের ডিওন সিয়াস, নিমার সিয়াস,চাওন, সিংহ ইমরান। দিম্রন বংশের নিলয় দিম্রন, ফাহিন দিম্রন, হারিয়াল বনের দাবির অ্যাল। রক্ত রাজ্যের রিতুহান, উত্তর রাজ্যের রুদ্রাসা মাহতা, ট্রিও রাজ্যের রাওস ইরমাইল সহ নয় রাজ্যের প্রতিটা রাজা ও সেনাসদস্যের এত সুন্দর বিবরণ ফুটিয়ে তুলেছেন ধাপে ধাপে শুধু তাই নয়, নারী চরিত্রের ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন একই সাথে। রাজকুমারী প্রিয়তা,মেহেরিয়া,নেমিয়া সহ প্রতিটা চরিত্রও যথেষ্ট মজবুত গাঁথুনিতে তৈরি হয়েছে।
“প্রতিটা মানুষ তার নিজস্ব জীবনের নায়ক। গল্পের নায়করা সব ন্যায়সঙ্গত কাজ করে, প্রকৃতপক্ষে বাস্তবজীবনে লক্ষের দিকে যখন প্রবল বাসনা কাজ করে তখন ভালো-মন্দ দুটি শব্দ বিশেষ অর্থ বহন করেনা। শুধু লক্ষ্যই অর্থ রাখে মাত্র।”
আশরাফুল সুমন ভাইয়ের সম্পাদনায় লেখায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি সুস্পষ্ট । আমাদের দেশের বই গুলো সাধারণত সম্পাদনা করা হয় না। সেক্ষেত্রে রাজকাহনের সম্পাদনের জন্য এই বইটা অনেকাংশেই ভালো একটা উপন্যাসে রুপ নিয়েছে। লেখকের নিজের লেখনশৈলীর ধারা আগের থেকে বেশ পরিমার্জিত ও সাবলীল মনে হয়েছে। প্রতিটা অধ্যায় শুরু করার আগে নিজস্ব ভঙ্গিমায় কিছু উক্তি উপস্থাপন খুব সুন্দর লেগেছে। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি ও ভালো ছিলো। যারা নয় রাজ্যর বুকে হাঁটতে চান, সেসময় রাজাদের ক্ষমতাবদল আর বিদ্রোহীদের উথান পতন,রাজকুমারদের ক্ষমতাবদলের সাক্ষী হতে চান তাঁদের জন্য মাস্ট রিড রাজকাহন!!!
'রাজকাহন' নয় রাজ্যের রাজাদের গল্প, যেই রাজা, রাজ্যের সাথে মিশে আছে অতীতের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের, যেখানে শান্তির বার্তা বয়ে এনেছিলো ফিনিক্স পাখির মতো আগুন থেকে জন্ম নেওয়া দেবতা ড্যারন, সূর্যের দেবতা আকিমিয়াস কিংবা দেবতা খুমাস। যেখানে অন্ধকারের করাল গ্রাসের মতো ছোবল এনেছিলো অপদেবতা মিশকাওয়াত, রক্তসাগর বয়েছে দেবতাদের লড়াইে। সেই লড়াইয়েরও কয়েকশ বছর পেরিয়ে গেছে, আর এখন এতো গুলো বছর পর আবারও ড্যারান দেবতার ফিনিক্স পাখির আগুন সিংহাসনে কে বসবে, তা নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে ড্যারান দেবতার প্রাসাদের সিয়াস বংশ, ক্ষমতার দৌড়ে কে জিতবে? শুধু কি তাই! সেই আগুন সিংহাসনের উপর লোভ জেগে উঠছে নয় রাজ্যের রাজাদেরও।
এই গল্প রাজনীতির, ক্ষমতার, যেখানে উঠে এসেছে রাজাদের উত্থান পতনের, যেখানে আততায়ী বসে আছে পিছনে অন্ধকারে তরবারি হাতে। ওতপেতে আছে সঠিক সময়ের, বিদ্রোহীরা কড়া নাড়ছে দরজায়। নয় রাজ্যের প্রাসানে, রাজ্যের আনাছে কানাছে ঘনিয়ে আসছে ভয়াল এক ঝড়, সময় ঘনিয়ে এসেছে, আসছে মহাইশ্বর আসিয়ার দূত,তবে কী অপদেবতা মিশকাওয়াতের দেওয়া ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হতে যাচ্ছে!
'রাজকাহন' আমিনুল ইসলামের লেখা ফ্যান্টাসি বই যা সাম্প্রতি বইমেলাতে প্রকাশিত হয়েছে। বরাবরই ফ্যান্টাসি আমার প্রিয় একটা জনরা যার ফলে বইটা শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে এই অনূভুতিটার ফলে দারুণভাবে উপভোগ করে গিয়েছি। তাছাড়া লেখকের সাবলীল, গতিশীল, মেদহীন আকর্ষণীয় গল্প বর্ণনার ফলে বইটি শেষ করেছি দ্রুতই।
'রাজকাহন' নয় রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটা গল্প, যা পড়তে গিয়ে প্রথমদিকে গল্পের সাথে তাল মিলাতে একটু অসুবিধা হলেও গল্প যত এগিয়েছে, তত মিশে গেছি গল্পে। নয় রাজ্যের ড্যারেন, সিরান, দাবির, রুদ্রাসা, তিরি, নেমিয়া সহ আরো অনেক চরিত্র গুলোর সাথে মিশে গিয়েছিলাম। লেখক অদ্ভুত সব নাম আর পরিবেশে নিজস্ব এক আবহ তৈরি করেছেন যা প্রভাব ফেলেছিলো মনেও।
বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই লেখক একটা সেকেন্ড ওয়ার্ল্ডে ক্ষমতার অদলবদল, রাজনৈতিক নানান সব টানাপোড়েনের পাশাপাশি মিশেল করেছেন মিথকে। যার ফলে গল্পের আবহ বদলে গিয়েছে।
বইটা শেষ করার আগ পর্যন্ত প্রতি মূহুর্তে মস্তিষ্কে চিন্তা করছিলাম গল্প কোনদিকে এগোচ্ছে, এই জিনিসটা উপলব্ধিতে আনতে অনেক সময় লেগেছে, অনেক দূর পড়তে হয়েছে। মাঝে মাঝে এতো অদ্ভুত নাম, এতো এতো চরিত্রের কারণে খৈ হারিয়ে ফেললেও শেষ পর্যন্ত দারুণ ভাবে উপভোগ করেছি। অবশ্য লেখক তাঁর গল্পের বিস্তৃতি এতো বিশাল করেছেন যে এটা সাধারণই ধরে নেওয়া যায়।
বইটির নামকরণও আমার কাছে সার্থক লেগেছে, বইটির নাম রাখা হয়েছে রাজকাহন যার আমি অর্থ ধরে নিয়েছি, রাজাদের গল্প। আসলেই পুরো বইটাই আবর্তিত হয়েছে নয় রাজ্যের রাজাদের ঘিরে, যেখানে তাদের ক্ষমতার লোভ, রাজনীতি, প্রেম-ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধ সেই সাথে লেখকের সৃষ্ট আলাদা এক পরিবেশে অল্প ম্যাজিক্যাল ইলিমেন্ট সমেত চমৎকার এক গল্প উঠে এসেছে। যেখানে প্রতিটি দৃশ্যপটেই বদলেছে চরিত্র, বদলেছে রাজনীতির প্রেক্ষাপট, বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, ধেয়ে আসছে ঝড় ফিনিক্সর পাখির আগুনের সিংহাসনের দিকে। এ যেনো বাংলা সাহিত্যের বাঙালি লেখকের লেখা গেম অফ থ্রোনস। বইটির পরের খন্ডের অপেক্ষায় থাকবো, যেখানে বাজতে চলেছে এক বিশাল যুদ্ধের দামামা।
রাজকাহন রাজকীয় এক দারুণ এক উপাখ্যান, আশাকরি আপনারও ভালো লাগবে।
প্রথমতো লেখকের প্রথম বই যুদ্ধের সহস্র বছর পর পড়ার পর এক্সপেকটেশন অনুযায়ী স্লো লাগবে শুরুর দিকে আর বইয়ের চরিত্র অনেক বেশি আর উদ্ভট নাম সব 😑 একটু মনে রাখা ডিফিকাল্ট। তবে লেখক একটু সময় নিলেও প্রথম খন্ড হিসেবে ভালো রকমের সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড তৈরী করেছে। স্যাটিসফাইড। ২য় পার্টের অপেক্ষায় থাকবো।
রাজনীতি, সিংহাসনের জন্যে চাপা লালসা, তারই ফলশ্রুতিতে সম্মিলিত ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ, রাজাকে উৎখাত ইত্যাদি আমাদের ইতিহাসে কম নেই। সেসব নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক উপন্যাসও লেখা হয়ে গেছে। তবে ফ্যান্টাসীতে এসব বিষয় ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটে ওঠে। বাস্তব জগতেরই কিছুটা অবাস্তব উপাখ্যান বলা যায় ফ্যান্টাসীর এই অন্যতম ধারা পলিটিকাল ফ্যান্টাসীকে। এই জনরার অন্যতম সংযোজন আমিনুল ইসলামের ‘রাজকাহন’।
সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডভিত্তিক ফ্যান্টাসী যেহেতু, সেহেতু প্রথমেই আসি রাজকাহনের ওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ে। বইয়ের জগতটা বেশ বিস্তৃত। আগ্রহীরা নিশ্চয়ই জানেন ‘যুদ্ধের সহস্র বছর পর’ বইয়ের ওয়ার্ল্ডের সাথে রাজকাহনের একটা লিংক আছে। মিশাকাওয়াত নামের একটা গ্রহের নয়টা রাজ্য নিয়ে রাজকাহনের গল্প। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ের জন্যে ফ্যান্টাসী বইয়ে লেখকদের কিছুটা সময় নিতে দেখা যায়। এতে গল্প কিছুটা ধীর হয়ে যায় কখনো কখনো। এই বইয়ে যে এমনটি হয়নি তা না। লেখক সময় নিয়েছেন। তবে তা খুবই কম এবং গল্পও ধীর মনে হয়নি। চরিত্রদের আনাগোণার সাথে সাথেই রাজ্যগুলোর বৈচিত্র্য, সমাজব্যবস্থা, ভূ-রাজনীতি কিংবা কখনো কখনো ইতিহাসও উঠে এসেছে। ফলে প্রত্যেকটা রাজ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবে তাতে গল্প পড়ার মজা কোনো অংশেই কমে না। বরঞ্চ শ’খানেক পেজ পড়ার পর আপনার মনে হতে পারে আপনি নেমিয়ার সাথে ট্রিও রাজ্যে এক গোপন মিশনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে আছেন, কিংবা রুদ্রাসা মাহতার সাথে অমরত্ব অর্জনের পরীক্ষা দিচ্ছেন। রাজ্যের বর্ণনায় ডিটেইলিংটা কম লাগতে পারে। তবে আমার কাছে ভিজুয়ালাইজ করার মতো যথেষ্ট ডিটেইলিং আছে বলেই মনে হলো। চাইলে অবশ্যই বাড়ানো যায়। সেসব হয়তো পরবর্তী বইগুলোয় আসবে! পার্সোনালি আমার পড়া ফ্যান্টাসী বইয়ের সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ডগুলোর মধ্যে নয় রাজ্য অন্যতম পছন্দের হয়ে থাকবে। সিরিয়াসলি লেখকের লেখার সাথে কল্পনায় নয় রাজ্যের আনাচে কানাচে ঘুরোঘুরিটা আমি পুরো উপভোগ করতে পেরেছি।
গল্পটা শুরু হয় একটুখানি ইতিহাস দিয়ে। মহামান্য রাজা ড্যারনের বীরগাঁথা ছোট পরিসরে তুলে ধরেন লেখক। তার পরপরই মূল গল্পে প্রবেশ। চাপ্টার শেষে ক্লিফ হ্যাঙ্গার খুব একটা পাইনি। তবে নাটকীয়তা ছিল মোটামুটি। এই বইয়ের প্রত্যেকটা সাব-প্লটই এতো ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছিল যে ক্লিফ হ্যাঙ্গারের পর্যাপ্ত অনুপস্থিতি স্বত্তেও পরবর্তী অধ্যায়ের প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি। গল্পের গতিও এই ক্ষেত্রে বড় একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। বইয়ের শুরু থেকেই গল্পটা সমবেগে এগোচ্ছিল। একবারের জন্যেও কোথাও ধীর হয়ে গেছে বলে মনে হয়নি। পাশাপাশি লিখনশৈলীতে সাবলীলতা স্পষ্ট হলেও শব্দচয়ন ও উপমার প্রয়োগ ভালো লেগেছে।
বইয়ে চরিত্রদের আনাগোণা ছিল চোখে পড়বার মতো। প্রথমদিকে তো দুই একটি অধ্যায় পরপরই পাঠক নতুন চরিত্রের দেখা পাবেন। একেকটা চরিত্র নিয়েই একেকটা সাব-প্লট। আর সাব-প্লট গুলোতে লেখক যত্নের ছাপ রেখে গেছেন। চরিত্রের সংখ্যা কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। এখন নয়টা রাজ্য, তার ওপর ইতিহাস পাতিহাঁস সবমিলিয়ে চরিত্রের সংখ্যা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক বটে! ত���ে ওই যে বললাম, যত্নের ছাপ রেখে গেছেন লেখক। প্রতিটি চরিত্রই ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পে উপস্থিতি কারোরই খুব একটা বেশি না। তবে নিজ নিজ স্থান থেকে ছোট বড় সবগুলো চরিত্র নিজেদের যথাযথ গুরুত্ব তুলে ধরতে পেরেছে। যদিও কারো সাথেই মেন্টালি অতোটা কানেক্টেড হতে পারিনি। মানে, প্রিয় কোনো চরিত্রের খোঁজ পাইনি বইয়ে। চরিত্রায়ণ টপ নচ কিছু না হলেও গল্প এগিয়ে নেওয়ার মতো চলনসই ছিল।
বইয়ে বেশ কিছু অ্যাকশন সিকোয়েন্স আছে। তার মধ্যে নেমিয়ার সাথে বাহুবলির একটা চরিত্রকে অনেক কানেক্ট করা যাচ্ছিল। বইয়ের শেষ দিকে রাওস ইরমাইলের অ্যাকশনের যে বর্ণনাটা পাওয়া যায় সেটা কোনো মুভির ধুন্ধুমার একশন সিন থেকে কম ছিল না!
বইয়ের এন্ডিং নিয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তার কারণ এন্ডিংয়ে তেমন একটা টুইস্টের দেখা না মিললেও কাহিনী ব্যাপক টার্ন নেয়। অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন প্লট এক হতে শুরু করে। তবে এক হতে হতেও হয় না। শেষ অবধি এমন একটা পয়েন্টে এসে থেমে যায় যে কৌতুহলের পারদ তুঙ্গে উঠে যায়। পরবর্তী বইয়ের এক্সিকিউশনের উপর এই বইয়ের সফলতা নির্ভর করবে। তাই সে অবধি অপেক্ষাই শ্রেয়।
সবমিলিয়ে বইটি নিয়ে পরিতৃপ্ত আমি। লেখকের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় সব দিক দিয়েই এইটা বেশ এগিয়ে থাকবে। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাক!
পলিটিকাল ফ্যান্টাসি জনরার একটি বই। বইটি একটু জটিল এবং স্লো লেগেছে। এর থেকে লেখকের প্রথম ফ্যান্টাসি বই 'যুদ্ধের সহস্র বছর পর' বইটি আমার বেশি প্রিয়। যাই হোক নয় রাজ্য নিয়ে গল্পটা। আমিনুল ভাইয়ার লেখনী অনেক সাবলীল। যার কারণে জনরা টা ফ্যান্টাসি হবার পরেও পড়তে কোনো সমস্যা হয়নি। ফিনিক্স রাজ্যের বংশধরেরা নয় রাজ্য পরিচালনা করে। নয় রাজ্যের প্রধান রাজ্য ড্যারন রাজ্য। এটার বংশধরই ফিনিক্স রা। আগুনের সিংহাসন পাওয়ার জন্য সবাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই গল্পে আসলে ভিলেন কে ওইটাই বুঝলাম না। এই সিরিজের পরর্বতী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
সিরিজের প্রথম বই হিসেবে মোটামুটি। লেখক ওয়ার্ল্ডবিল্ডিংয়ে বেশ নিপুনতা দেখিয়েছেন, কিন্তু চরিত্র নির্মানে ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। অনেক বেশি চরিত্র এবং পরপর ঘটে চলা ঘটনার ভারে গল্পের খেই হারিয়েছি কয়েক জায়গায়। আশা করি পরবর্তী খন্ডগুলিতে আরো ভালোভাবে পরিচিত হতে পারবো চরিত্রগুলির সাথে।
🔺প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজের জীবনের গল্পের নায়ক। বাস্তব জীবনে লক্ষের দিকে যখন প্রবল বাসনা কাজ করে, তখন ভাল-মন্দ শব্দ দুটো আর বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না। শুধু লক্ষই অর্থ রাখে মাত্র।🔻 🟥বইয়ের কাহিনী মূলত ৯টা স্বাধীন রাজ্য এবং একটা বিধ্বস্ত রাজ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। একসময় সবগুলো রাজ্যই সিয়াস বংশের শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালক্রমে ড্যারন রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করে তারা একে একে নিজেরা স্বাধীন হয়ে যায়। রাজকাহনের মূল বিষয় হলো এখানে ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট থেকে রাজনীতির নোংরা খেলা আর মানুষের মজ্জাগত ক্ষমতার লোভ বর্ণিত হয়েছে বেশি। গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসির আদলে লেখা বাংলা এই প্রথম কোনো মৌলিক পড়লাম। 🟥 গ্রিমডার্ক ফ্যান্টাসিগুলার একটা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হল এখানে ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট নির্ভর সেকেন্ডারি ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং কম, বরং উপন্যাসে কাহিনীর ঘনঘটায় চরিত্রগুলোর নিজেদের ভিতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব,কোন্দল,ষড়যন্ত্রের মিশেলে সুবিশাল প্লটে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং গড়ে ওঠে। আর এ ধরনের ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং গড়ে তোলা বেশ কঠিন কাজ, কারণ এখানে অনেক ঘটনা এবং চরিত্র একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। রাজকাহনের পুরো অংশ জুড়ে ছিল এই ক্ষমতার দখল, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর খুনাখুনির খেলা। 🟥 উপন্যাসের কয়েকটা বিষয় আমার কাছে খটকা লেগেছে সেটা হচ্ছে রুদ্রাসা দীর্ঘদিনের তপসা করা একজন রাজকুমার। এমনকি দেবী ঈশিকার সাথে ও সে শারীরিকভাবে মিলিত হয়নি। অথচ প্রিয়তার মতো সামান্য একটি মেয়েকে দেখে তার মুহূর্তেই ভালোলাগা এবং সেই ভালোলাগা থেকে রীতিমতো বিধ্বংসী একজন রাজকুমারে পরিণত হওয়াটা। এবং এর সাথে আর একটা বিতর্কিত পয়েন্ট ছিল নিলয় দিম্রনের সাথে সিরান এবং ড্যারনের শেষ কাহিনীটা। যেহেতু সিরিজের বই নিশ্চিতভাবে এই বিষয়গুলা এখনি বোঝার উপায় ছিল না। উপন্যাসে একে অন্যের রাজনৈতিক কূটচালগুলা বুঝতে পারছে এই বিষয়টাও সাসপেন্স কমিয়ে দিয়েছে অনেকটা। 🟥 উপন্যাসের সাথে দেয়া ম্যাপে মেবাবিল রাজ্যের জায়গায় হবে সেবাবিল আর সেবাবিল রাজ্যের জায়গায় হবে সাইরাস রাজ্য। লেখক উপন্যাসের উত্তর দক্ষিণ দিকের সেটিং আমাদের দুনিয়ার মত রাখলেও, পূর্ব ও পশ্চিম এর সেটিং উল্টে দিয়েছেন। এটা অবশ্য কোন ভুল নয় কারণ তার পুরো লেখাতেই এভাবেই ঘটনাটা বর্ণিত হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই দিকটা পরিবর্তন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের আসল কারণ আমি নিজেও বুঝতে পারিনি তবে একটা কারণ হতে পারে যে পূর্ব রাজ্যের কৌশলগত অবস্থান। 🟥 অন্য উপন্যাস থেকে এখানে লেখকের লেখনশৈলীর পরিবর্তন ও চোখে পড়ার মত। লেখকের জন্য একটাই অনুরোধ থাকবে, এরকম উপন্যাসে আরো ভারি ও অর্থপূর্ণ সংলাপ ব্যবহার করার যাতে কাহিনির সাথে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। রাজকাহনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর সমাপ্তি। কাহিনির শেষাংশে ঘটনা এত বড় টার্ন নিয়েছে কারো আগে থেকে আন্দাজ করাই সম্ভব না। আসল খেলা তো মাত্র শুরু হয়েছে🔥
ছোট বেলায় হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের বই পড়ে আমি লেখার চেষ্টা করতাম। আমার লেখা অত্যাধিক অখাদ্য হওয়ায় নিজেই ছিড়ে কুটি কুটি করতাম। এই বই এর লেখকের মত মনোবল থাকলে আজ আমি কোথায় পৌচ্ছে যেতাম। এক লাইন, এক প্লট ১০০ বার লিখে রেখে পৃষ্ঠা বাড়ানো হয়েছে। এক জায়গায় বললেন শ্বেত পাখি তার শ্বেত পালক কিন্তু তার পাখা পান্না রং এর। পালক পাখা থেকে ঝড়ে। পান্না রং এর পাখা দিয়ে শ্বেত পালক কিভাবে ঝরে? এটাতো ক্ষুদ্র একটা প্লট হোল। আপনি যত আগাবেন প্লট হোল বাড়তেই থাকবে। আপনার মনে হবে আপনি তামিল অথবা বলিউডের কমার্শিয়াল ধুম ধারাক্কা কোন সিনেমার প্লট পড়ছেন। যে বই আমাকে কল্পনা করার রসদ দিতে পারে না, সে বই পড়ার যোগ্য না। বই কিনে কখনো টাকা নষ্ট হয় না। কিন্তু এই অখাদ্য পড়ে আমার সময় নষ্ট হয়েছে।
এইরকম জনরা আমার পছন্দের নয়।তবুও পড়া শুরু ��রছিলাম কারণ আমিনুল ইসলাম এর লেখা ভালো বলে।কিন্তু অনেক বেশি চরিত্র ছিল বইটিতে৷ মনোযোগ দিয়ে পড়লে অনেক ভালো একটা বই ছিল এটা
নামেই বোধহয় গল্পের কাহিনী কি নিয়ে সেটা বুঝা যাচ্ছে। রাজাদের কাহিনী। আর রাজদের কাহিনী মানেই সিংহাসন নিয়ে টানাটানি। নয়টি রাজ্যের মধ্যে প্রধান বা কেন্দ্রীয় রাজ্য হলো ড্যারন রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড্যারন সিয়াসের নামেই রাজ্যের নাম। কেউ উনাকে দেবতা মেনে পূজো করো আবার কেউ বলে ড্যারন অপদেবতা। ড্যারনের রাজ্য প্রতিষ্ঠার ২০০ বছর পরের গল্পে আগুন সিংহাসন বা ড্যারন রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে চাল-কূটচাল, ষড়যন্ত্র, প্রতিহিংসা আর একের পর এক বিশ্বাসঘাতকার উদাহরণ নিয়েই রাজকাহন।
এল ডোরাডো ট্রিলজির পর আমিনুল ইসলামের চতুর্থ বই পড়লাম। ট্রিলজির দ্বিতীয় বই এল ডোরাডো কার্স মৌলিক ফ্যান্টাসির অন্যতম সেরা বই। এই বইটিও সেই কাতারে যেতে পারতো। ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সৃষ্ট দুনিয়ার সাথে পাঠককে পরিচিত করা এবং পরিচিত হতে সময় দেয়া। এজন্য অনেকেই বলেন ফ্যান্টাসি বই স্লো বার্ন হয়। তবে পাঠক একবার আপনার দুনিয়ার সাথে পরিচিত হয়ে গেলে তারপরে আপনি পেস বাড়াতে পারেন। আমিনুল ইসলামের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। উনি লিটারেলি কোনো টাইম নেননা। না ওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ে না ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে না স্টোরি ম্যাচিউর করায়। একজন ভালো স্টোরি টেলার আর একজন ভালো লেখকের মাঝে পার্থক্য আছে।
ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট আমার কাছে অন্তত একটা বইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফ্যান্টাসিতে আরো বেশী। সানবার্ডের হুই বেন আমন কিংবা সদ্য পড়া প্রাননাথ হৈও তুমি'র মন্দিরাদেবী'র কারণে বইগুলো আমি কখনোই ভুলতে পারবোনা। সেই দিক থেকে কি ড্যারন সিয়াস কিংবা ডিওন সিয়াস এতোটুকু দাগ ফেলতে পেরেছে? একদমই না। আমিনুল ইসলাম ভালো স্টোরিটেলার নিঃসন্দেহে। রাজকাহন হাতে নিলে ফেলে রাখার যো নেই। এজন্য হয়তো অনেকেরই ভালো লাগবে। কিন্তু পার্সোনালি আমার লাগেনি। ফাস্ট পেস ছাড়াও একটা বইয়ের আরো অনেক গুণ থাকে। যেগুলো এল ডোরাডো ট্রিলজির প্রথম বইতে খুব চোখে পড়ছিলো। এই বইতে আরো বেশী পরেছে।
দুইশত বছর আগে ড্যারন সিয়াস নামের এক যুবক যাকে সবাই নীল রক্তের মানব বলে সম্বোধন করে, পুরো নয়টি রাজ্য নিজের দখলে আনে। সেই থেকে তার নাম অনুসারে মূল রাজ্যের নাম "ড্যারন" রাখা হয় যা পূর্বে ছিল হরিস রাজ্যের হারিয়াল বংশের দখলে। ড্যারন রাজ্যের অধীনে বাকি রাজ্যগুলো থাকলেও ড্যারন রাজ্যের আগের জৌলুস তেমন একটা নেই বললেই চলে তবে এই রাজ্যের প্রাসাদ "শ্বেত পালক" ও হবু রাজার বর্বরতা অবাক করে সকলকে। নামমাত্র রাজার ভূমিকায় থাকা পঙ্গু নিমারের পুত্র ডিওন সিয়াস খুব শীঘ্রই রাজা হতে যাচ্ছে। ডিওন কেবল তেইশ বছর হওয়ার অপেক্ষায় আছে তবে তার ও সিংহাসনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনজনের দ্বারা পরিকল্পিত নানা ষড়যন্ত্র। সিংহাসন দখলের এই খেলায় ইতিমধ্যে রক্তের ধারা বয়ে চলতে শুরু করেছে ড্যারন রাজ্যে।
বাকিসব রাজ্যগুলোর মধ্যে রক্ত রাজ্যে চলছে বিশাল তাণ্ডব, ক্ষমতার লোভে ছোট ভাইকে হত্যা ও বাবাকে কারাদণ্ড দেয় ভীনা। বর্তমানে তার দখলেই পুরো রক্ত রাজ্য। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী রাজ্য "ট্রিও" এ নেমিয়া নামের এক কিশোরী স্বেচ্ছায় বন্দি হয়।বিশ বছরের সাজা দেওয়া হলেও তার মূল পরিকল্পনা বিশেষ এক ব্যক্তিকে মুক্ত করা। যখন অন্য রাজ্যগুলোতে বছরের পর বছর চলছে ক্ষমতা অদলবদলের নৃশংস খেলা, তখন কেবল "সাইরাস" রাজ্যে শান্তির ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায় কারণ এই রাজ্যের রাজা নিলয় দিম্রন সর্বদা শান্তিপ্রিয় একজন মানুষ ছিলেন যদিও এ যাবৎকালের কোনো যুদ্ধ তার রাজ্য হারেনি। পূর্বে "সেবাবিল" রাজ্য ও "সাইরাস" রাজ্য একসাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে এই দুই রাজ্যে চলছে সাপে নেউলে সম্পর্ক যার যের ধরে রাজা নিলয় ও তার পুত্র ফাহিনকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। এর মাঝে আরেকজন ব্যক্তি আছে যার সিংহাসনের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্ৰহ নেই। "উত্তর" রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজা রুদ্রাসা সাত বছর আগে সব কিছু ত্যাগ করে সাধু হওয়ার জন্য বেরিয়ে আসে রাজমহল থেকে। তার রাজ্য হঠাৎ দানবের আক্রমণে লাশে পরিণত হয়। এর বাহিরে বনে বাস করে " হারিয়াল"রা যাদের কোনো রাজ্যে জায়গা হয়নি। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারাও নিজেদের তৈরি করতে শুরু করে কিন্তু সর্দার হওয়া নিয়ে ভাইদের মধ্যে চলছে ঠান্ডা লড়াই যা খুব শীঘ্রই রক্তারক্তি কান্ডে পরিণত হবে। রাজ্যগুলোর নানা চরিত্র, তাদের জয়-পরাজয়, বিশ্বাসঘাতকতা, দেবতাগণের গল্প নিয়েই মূলত পুরো বইটি।
গল্পের প্লট নিয়ে কোনো অভিযোগ না থাকলেও ইতিহাস আশ্রিত কিংবা রাজ্য সম্পর্কিত বইগুলো বড় পরিসরে হলে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। কেবল রাজ্য সম্পর্কে এবং চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করতেই পুরো বই শেষ কারণ " দ্বিতীয়" অংশ আছে বা হতে পারে এমন করে তিন থেকে চারটা অংশ বের হবে। তবে এতে করে যা হয় পরবর্তী বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে আগ্রহটা কোথাও মিলিয়ে যায় বিশেষ করে প্রথম অংশই যখন ছোট যা তেমন একটা ছাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। আরেকটি বিষয় হলো বইয়ের একটা অধ্যায় শেষ হওয়ার পর, পরবর্তী পেইজ থেকে নতুন অধ্যায় শুরু করার মাঝে খালি অংশগুলো চোখে পড়ে যা থেকে বোঝা যায় বইটি টেনেটুনে তিনশো পেইজের কাছাকাছি নেওয়া হয়েছে যা আড়াইশো পেইজে শেষ করা যেত। এটা বোধ হয় এখনকার বইগুলো টেনেটুনে একটু বড় করার চমৎকার কৌশল। এছাড়া বইয়ে আছে বানান ভুল, নামের গড়মিল, ম্যাপে ভুল নাম ( সাইরাস রাজ্যের পরিবর্তে ম্যাপে আছে মেবাবিল রাজ্য) , একই ঘটনার ভিন্ন বর্ণনা ( এক জায়গায় লেখা কালোঘোড়া বিরুনামা নিমারকে যুদ্ধে বাঁচায়, আবার আরেক জায়গায় রূপালি ঘোড়া রত্নাসা বাঁচায়) যা আমাকে হতাশ করেছে বলা চলে কেননা বেশ দাম দিয়ে বই কিনে এই দশা হলে হতাশ হতেই হয়।