দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্য (Dipen Bhattacharya) জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক। জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেছেন।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারিল্যান্ড-এ নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা রশ্মি জ্যোতি জ্যোতিঃপদার্থবিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশূন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজে; এছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজে। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় ‘অনুসন্ধিৎসু চক্র’ নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ফুলব্রাইট ফেলো হয়ে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান আন্দোলন ও পরিবেশ সচেতনতার প্রসারে যুক্ত।
পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও বাংলা ভাষায় তাঁর বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের বেশ কয়েকটি ফিকশন বই প্রকাশিত হয়েছে।
প্রায় প্রতিবারই দীপেন ভট্টাচার্যের কোনো বই পড়ে আমি গর্বিত হই আর ভাবি, "আমাদের একজন দীপেন ভট্টাচার্য আছেন!" "শ্যাতোয়ান্ত"র গল্পগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো বর্গে ফেলা যায় না। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির উপাদান আছে; সাথে পরাবাস্তবতা আর জাদুবাস্তবতার ঘোরলাগা মিশেল। আর সবকিছুর ভেতরে আটকে থাকে বিপুল বিপন্ন বিষণ্ণতা। খুব সাদামাটা গল্পেও এই বিষণ্ণতা এক ধরনের অনুরণন তৈরি করে। কিছু গল্প থেমে যায় মাঝপথে। এই থেমে যাওয়ারও এক ব্যঞ্জনা আছে। পুরনো গল্পগুলোর মধ্যে "মাউন্ট শাস্তা" আর "নিয়ন বাতি" আমার অত্যাধিক প্রিয়। নতুনগুলোর মধ্যে "মেইনের বিষণ্ণ ঋতুগুলি", "ইসাবেল সিমোনের সাক্ষাৎকার", "শবাধার" সবচেয়ে বেশি ভালো লাগলো। ভূমিকায় দীপেন লিখেছেন, "ধরুণ যদি বলি কখনো অবহেলায় এই বইয়ের দু একটি গল্প যদি আপনার পড়া হয়ে যায়, আপনার মনে হতে পারে সেই গল্পটি আপনার অতি চেনা, আপনি আগে কোথাও দেখেছেন বা পড়েছেন, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছেন না কোথায় বা কবে । স্মৃতির সীমান্তে, বহু দূরের লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয় আপনার মনে হতে পারে সেই গল্পটি আপনার মনের মধ্যে ছিল বহু আগেই । আসলে আপনি জানেন – পৃথিবীতে কোনো কিছুই নতুন নয়, প্রতিটি সৃজনই পুরাতন কাঁসার থালায় বাস্তবের এক অপূর্ণ প্রতিফলন।" সেই প্রতিফলন যদি এমন হীরকদ্যুতিময় হয়, তবে তার ঔজ্জ্বল্যের কাছে ফিরতেই হবে বারবার।
দীপেন ভট্টাচার্য সুন্দর কিছু উপন্যাস উপহার দিয়েছেন আমাদের। ঈদের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে তাঁর গল্প সংকলন খুলে বসলাম। অভিভূত। হারুন ভাইয়ের মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করে, "ভাগ্যিস! আমাদের একজন দীপেন ভট্টাচার্য আছেন!!!"
আঠারোটা ছোট গল্প নিয়ে "শ্যাতোয়ান্ত"। (এদের মাঝে কয়েকটা "বার্ট কোমেনের ডান হাত" বই থেকে সংযোজিত) প্রায় প্রতিটা গল্পই আলাদা করে ভাবাবে কিছুক্ষণ। একদিকে শেষ হয়েও রেশ থেকে যাওয়ার রাবীন্দ্রিক সমীকরণে গল্পের বুনন। আরেকদিকে একদম এক দুই পাতার ছোট্ট গল্পেও বিশাল পরিধির চিন্তার খোরাক যোগানোর মত কাজ করেছেন, অনেকটা বনফুলের ছোটগল্পের মতো। এই বইয়ের ভূমিকা, বই পড়ার আগে একবার আর পরে একবার পড়বেন। ওটাই এর যথার্থ রিভিউ।
আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প সংকলনগুলোর মাঝে জায়গা করে নিলো "শ্যাতোয়ান্ত"।
বেশ কিছু ছোট গল্প নিয়ে সংকলন, শ্যাতোয়ান্ত। সায়েন্স ফিকশন বলা ঠিক হবে না, কেননা গল্প গুলো সমকালীন, মনস্তাত্ত্বিক আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনির সমন্বয়ে। বেশ কিছু গল্প আগেই পড়া ছিল বার্ট কোমেনের ডান হাত আর নিস্তার মোল্লার মহাভারত বই থেকে, তাও আবার পড়তে খারাপ লাগলো না। নতুন গল্পের মধ্যে মেইনের বিষন্ন ঋতুগুলো, আমেনহোতেপের সময়, আর নাম গল্প শ্যাতোয়ান্ত চমৎকার লেগেছে। পুরোনোদের মধ্যে মাউন্ট শাস্তা আর নিয়ন বাতি তো বরাবরই পছন্দের ছিল।
নির্দিষ্ট করে 'শ্যাতোয়ান্ত' নয়, বরং লেখকের গল্প-জগত নিয়েই এই সাধারণ মন্তব্যঃ
চমৎকার গল্প ফাঁদতে জানেন দীপেন ভট্টাচার্য। বিজ্ঞান বিষয়ক তার বোঝাপড়া, একই সাথে সাহিত্যের প্রতি তার প্রেম খুব স্পষ্ট হয়ে ফোটে সেই গল্পে। তবে গল্পের বুনন যেন তার হাতে সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে ফোটে না।
বইটা পড়ার মাঝপথে আমি গুডরিডসে ঢুকে কারেন্ট রিডে এড করতে গিয়ে দেখি হারুন ভাইয়ের রিভিউের প্রথম লাইন-- "প্রায় প্রতিবারই দীপেন ভট্টাচার্যের কোনো বই পড়ে আমি গর্বিত হই আর ভাবি, "আমাদের একজন দীপেন ভট্টাচার্য আছেন!"
মানে বইটা শেষ করার পরে হুবহু আমার মতামতটাই ভাইয়া বলে দিল। এই বইটা কার রেকমেন্ডেশনে কেনা আমার ঠিক মনে নেই, কিন্তু যেই করেছেন তাকে অনেক ধন্যবাদ। দীপেন বাবুর সাথে আমার পরিচয় ২০১৬/১৭ সালে সম্ভবত, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো দিয়ে। তাও আমার আরেক বন্ধুকে সফটকপি খুঁজে হেল্প করার মাধ্যমে। ভাগ্যিস করেছিলাম! পরে উনার দিতার ঘড়ি, অদিতার আঁধার পড়া হয়েছে। এই বইটা মূলত গল্পের, গল্পগুলো যে জনরার-ই হোকনা কেন, প্রতিটি গল্প শেষেই আপনি ভাবনার খোরাক পাবেন। সাই-ফাই, সুররিয়েলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজম সবকিছুর সংমিশ্রণই রয়েছে এই ১৮ টা গল্পে। মাউন্ট শাস্তা, নিয়ন বাতি, মেইনের বিষণ্ণ ঋতুগুলি, শবাধার, শ্যাতোয়ান্ত, বার্ট কোমেনের হাত আমার ভীষণ প্রিয়।
লেখকের ভাষায়-- "ধরুণ যদি বলি কখনো অবহেলায় এই বইয়ের দু একটি গল্প যদি আপনার পড়া হয়ে যায়, আপনার মনে হতে পারে সেই গল্পটি আপনার অতি চেনা, আপনি আগে কোথাও দেখেছেন বা পড়েছেন, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছেন না কোথায় বা কবে । স্মৃতির সীমান্তে, বহু দূরের লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয় আপনার মনে হতে পারে সেই গল্পটি আপনার মনের মধ্যে ছিল বহু আগেই । আসলে আপনি জানেন – পৃথিবীতে কোনো কিছুই নতুন নয়, প্রতিটি সৃজনই পুরাতন কাঁসার থালায় বাস্তবের এক অপূর্ণ প্রতিফলন।"
আচ্ছা, বইপড়ার মজা কি শীতকালে বেশি পাওয়া যায়? বৃষ্টি, হালকা শীত শীত ভাবের মাঝে বইটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছে।
গল্পসংখ্যার দিক দিয়ে এটাই সম্ভবত লেখকের সবচেয়ে বড় গল্পগ্রন্থ। এই বইয়ে স্থান পাওয়া আঠারোটি গল্পের প্রায় প্রতিটাই এর আগে পুস্তকাকারে অন্য কোনো বইয়ে প্রকাশিত, কিংবা অন্তর্জালে। 'বার্ট কোমেনের ডান হাত', 'মাউন্ট শাস্তা' ও 'নিয়ন বাতি' আগেই পড়া ছিল। বলা বাহুল্য, গল্প তিনটি আমার অসম্ভব প্রিয়। নতুন পড়া গল্পগুলোর মধ্যে নামগল্পসহ 'মেইনের বিষণ্ন ঋতুগুলি', 'একটি পারুল গাছ', 'ইসাবেল সিমোনের সাক্ষাৎকার', 'বেলা ও রেশমি' খুবই ভালো লেগেছে। বাকি গল্পগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়নি।
একেবারে ভিন্ন ধরনের একটা বই পড়লাম। প্রথমবারের মত পড়লাম দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা। এককথায় খুবই ভালো লাগল। গল্পগুলো একেবারেই ভিন্নধর্মী। বেশিরভাগ-ই সায়েন্স ফিকশন, তবে অনেকাংশে জাদুবাস্তব ও পরাবাস্তবতার ছাপ রয়েছে, সেইসাথে অস্তিত্ববাদেরও। শিবব্রত বর্মনের পর একই ধাঁচের আরেকজন লেখকের লেখা পড়তে পেরে ভালো লাগল। এই বইয়ে আমার প্রিয় গল্পগুলো হল ইসাবেল সিমোনের সাক্ষাৎকার, মেইনের বিষণ্ণ ঋতুগুলি, মাউন্ট শাস্তা, আমেনহতেপের সময়, মনোনকে এক্সপেরিমেন্ট,শবাধার, শ্যাতোয়ান্ত ও বার্ট কোমেনের হাত। প্রত্যেকটা গল্পই শেষে আপনাকে একটা ধাক্কা দেবে। এগুলো বাদে বাকি গল্পগুলো একটু সাদামাটাই লেগেছে। তবে এই গল্পগুলোই বইটাকে বিশেষ বানিয়ে ত��লেছে।
মাঝেমধ্যে গল্প পড়তে ইচ্ছে করে। বিচিত্র পড়াশোনা শেষে মনে হয়, এই অবসর দরকার। পড়ার মধ্যে স্নিগ্ধ অবসর। এই শান্ত, স্নিগ্ধ, নির্জনতার জন্য গল্প-উপন্যাস পড়ার তুলনা নেই।
"শ্যাতোয়ান্ত" মানে মণি-প্রতিফলিত উজ্জ্বলতা। গল্পগুলো পড়ে মনে হচ্ছিল, আমি বাস্তব আর কল্পনার অদ্ভুত দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াই। আনন্দ-বেদনার কাব্যের পরে আসে ধূসর বিষন্নতা। পুরান ঢাকার রিকশাময় গলি পেরিয়ে তুষরাবৃত আমেরিকার কোনো এক স্টেটে।
বই : শ্যাতোয়ান্ত লেখক : দীপেন ভট্টাচার্য প্রকাশনী : বিদ্যাপ্রকাশ
❛আপনি যদি মনে করেন আমার এই রিভিউটি আপনি মাত্রই পড়ছেন তবে হয়তো এটা আপনার ভুল ধারনা। ভবিষ্যতের কোনো সময়ে যে সময়কে আপনি অতীত মনে করছেন তখন এই লেখা পড়লেও পড়তে পারেন। তাই লেখাটা নতুন না পুরোনো কে বলতে পারে!❜
দীপেন ভট্টাচার্য আমার অন্যতম প্রিয় একজন লেখক। কল্পবিজ্ঞানের লেখা তিনি মনস্তাত্বিক এবং অদ্ভুত জাদুর মহিমায় লিখেন। যেখানে বিবেকবোধ সামনে আসে। আবার কখনো বিষন্নতা ছেয়ে যায়। আবার আশার আলো জাগায়। খুবই সাধারণ গল্পগুলো পড়তে গেলেও কেমন অসাধারণ লাগে।
❝শ্যাতোয়ান্ত❞ দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা ১৮ টি গল্পের সংকলন। বেশিরভাগ গল্পই কল্পবিজ্ঞানের ছোঁয়ায় লেখা। কিছু আছে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া। গল্পগুলো পড়তে গিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হবে। লেখক যেভাবে পাঠককে সম্বোধন করে তার লেখা আগেও পড়েছে নাকি বা পড়লেও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে নাকি এমন দ্যোতনায় ফেলেছেন যে আসলেই ভাবছিলাম পড়েছি নাকি? অথবা এই লেখা পড়ছি মানে আমি আদতেই আর ধুলির পৃথিবীতে নেই!
এই যেমন ধরা যাক, ❛ইসাবেল সিমেনের সাক্ষাৎকার❜ গল্পটি। মুখবইয়ের ছবিগুলো বই আকারে পেয়ে লেখক একটি ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এটা কে? এরপর বার্তা অনুরোধে যে চিঠি পেলেন তার রহস্য সমাধানের সময় তিনি কীভাবে পাবেন?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে আমাদের জীবনকে ডোমিনেট করছে আর আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে সেটা এই গল্পে অদ্ভুতভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
অমল একটু শান্তির খোঁজে এসেছিল মেইনে। কিন্তু ❛মেইনের বিষণ্ণ ঋতুগুলি❜ তার জীবনের এমন এক রহস্যকে সামনে এনে দিলো যার ঘোর সে কাটাতে পারছে না। গল্পের মধ্যেও গল্প থাকে।
খুব সাধারণ ভাবে শুরু হওয়া গল্পের মধ্যে যে টুইস্ট ছিল সত্যিই দারুণ।
❛মাউন্ট শাস্তা❜ তে অমল গিয়েছিল পাওলোর সাথে। তেমন ইচ্ছে না থাকলেও গিয়েছিল। বিপত্তি হলো পাথরে পা আটকে। উপর থেকে যাকে নেমে আসতে দেখলো সে কি তারই দ্বিতীয় সত্ত্বা? তবে এভারেস্টের চূড়ায় সেই আগ্নেয়গিরির ব্যাখ্যা কীভাবে দিবে? সব উত্তর আছে সেই ডায়েরিতে। যার সূত্র ধরে পাওলো অমলের খোঁজ করছে। সময় কি আসলেই এমন উল্টো চলতে পারে?
কল্প বিজ্ঞানের সাথে বিষণ্ণতার অদ্ভুত এক আবেশ ছিল এই গল্পে। আপনি এই ধারায় ঢুকে গেছেন মানে আপনারও তবে নিস্তার নেই।
❛বেলা ও রেশমি❜ একজন মালিক আরেকজন ঘোড়া। তারা এমন একজনের জন্য অপেক্ষা করছে যে কি না অতীতের সাথে একমাত্র সংযোগ। তারা জানেনা অতীতের মানুষ কেমন ছিল। অতীতের সে মানুষটাও জানেনা সে কোথায় এলো। সবথেকে অবাক করা কথা কেউ কি আসলেই পঁয়তাল্লিশ হাজার বছর বেঁচে থাকে?
ডিস্টোপিয়ান ধাঁচের গল্পটা পড়লে কেমন একটা হাহাকার লাগে। সামনের সময় কেমন আসছে? এইযে আমাদের বসতি, এত স্মৃতি সবই কি মুছে যাবে? ভবিষ্যতের কেউ জানবে না আমরা কেমন করে জীবন কাটাতাম? ঠিক যেমন আমরা জানিনা হাজার কোটি বছর আগে পৃথিবীতে জীবন কেমন ছিল!
আচ্ছা যদি চাই আমি আর বুড়ো হবো না, বাড়বে না বয়স। আর সেই আশা যদি সত্যিই কেউ পূরণ করে দেয় কেমন হবে? যদি আমার পরিবারের সবার ক্ষেত্রেই এটা ফলে যায় তখন কি লোকে আমাদের উপর অভিশাপ আছে ভাববে? ❛আমেনহোতেপের সময়❜ সে এমনই এক আশা করেছিল। আশা ফলেছিল। কিন্তু বিপাক হয়ে গেল তার গর্ভবতী স্ত্রীর সময়ও থমকে গেল। গর্ভাবস্থার নিদারুণ কষ্ট নিয়ে সে সময় পার করতে থাকলো, তেমনি মৃ ত্যুপথযাত্রী মায়ের মৃ ত্যুও থমকে গেল। কষ্টের মাত্রা বাড়লো। এর থেকে পরিত্রাণ কে দিবে?
ফা রাওদের সময়ের এক গল্প। এক পরিবারের জন্য থমকে যাওয়া সময় তাদের কেমন বিপাকে ফেলে সেই নিয়ে লেখক বেশ ভালো উপস্থাপন করেছেন। শেষটা তৃপ্তি দিবে।
❛দেয়াল❜ এর ওইপারে সর্বসুখ। রেবা সবকিছু থেকে মুক্তি চায়। অভীক চায় রেবার সাথে চলে যেতে। দিলু বোঝে না দেয়ালের ভেতর থেকে যে জবাব আসে সেই কি তার বান্ধবী? তবে প্রজাপতি হয়ে কে উড়ে গেল। এত উঁচু দালানে কি প্রজাপতি উড়তে পারে?
মুক্তির আস্বাদনের বিষণ্ণ বেদনার এক গল্প। জাদুবাস্তবতার সাথে বেদনার নীলে মিশেছে এই গল্প।
মনে আছে দিলুর বান্ধবী নাকি প্রজাপতি হয়ে গেছিল। সে কি বেঁচে আছে? একটা প্রজাপতি আর কয়দিন বাঁচে? সেদিন ভিড় ঠেলে বাসে ওঠার পর যে ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেল তার নির্মমতার সাথে তুলনা আর কিছুর হয়? তবে সেদিন ❛মেডুসা❜ হয়ে যে এসেছিল তার পরিণতি কী হয়েছিল? মেডুসার মাথায় একটা প্রজাপতি উড়ছিল। আর সব ঝাপসা।
বাসে গ্যাং রে পের নির্মম এক গল্পকেও এমন আবছাভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন যে সত্যি না কল্পনা ভেবে সন্দেহ হয়।
❛একটি পারুল গাছ❜ যার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রিশ ভাবছে কতো বছর পর সে কোনো প্রকৃতি দেখছে। তার সামনে ষাট আছে। দেখে অবাক লাগছে। একসময় তারা একই বয়সী ছিল প্রায়। এরপর মহাশূন্যের নিবিড় অন্ধকারে তার সময় ধীর হলেও পৃথিবী পার করেছে প্রায় আড়াই যুগের বেশি! আবার ফিরে এসে কাউকেই সে পাবে না।
মহাশূন্যের নভোচারীর এক করুণ গল্প। মহাশূন্যের একাকীত্বে যে সময় পার করে আসে। যার আর কেউই নেই। আছে পারুল গাছের সামনে তিনটে ক বর।
অদ্ভুত এক গাঁয়ে ঘুরতে গিয়ে অমলের ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়। আদৌ কি সত্য? কেউ না থেকেও কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। এ কি শুধুই ❛মনোনকে এক্সপেরিমেন্ট❜ নাকি এর ভেতরের সত্য আরো গভীর?
আসলেই মনে হয় কখনো যদি আমি অদৃশ্য হয়ে যেতাম। সবাইকে আমি দেখব কিন্তু কেউ আমাকে দেখবে না। গল্পের মূলটা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। মোটামুটি ছিল।
পৃথিবীতে কী হয়েছে এই মহাশূন্যে বসে এরা কেউ বুঝছে না। সেইযে এক সন্ধ্যায় পৃথিবী থেকে এটাই জানা গেছে, কী এক অদ্ভুত মাথাব্যথায় আক্রান্ত সবাই। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পৃথিবী কি তবে বিলীন হয়ে গেল? নিজেরাই দেখতে যখন পৃথিবীতে নেমে এলো অবাক হওয়ার তখনো বাকি। অতীতে এসে পড়লো নাকি পৃথিবী এমন হয়ে গেছে? কাউকে কেন চিনছে না। এ কেমন ❛বিস্মরণ❜ এর খেলা?
আরেকটি ডিস্টোপিয়ান ধাঁচের গল্প। কল্পবিজ্ঞানের মিশেল আছে। উপভোগ্য।
কোভিড টেস্ট করতে গিয়ে মায়ের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে ❛মা'র সঙ্গে - ট্রেনে❜ যাত্রার একটা স্মৃতি ভেসে আসলো। সম্বিত ফিরে পেয়ে যে অভিজ্ঞতা গুলো হলো সেগুলো কী অতীতেই হয়েছিল না ভবিষ্যতে। বর্তমান কোনটা তবে?
গল্পটা অদ্ভুত। কিন্তু বেদনা ধরিয়ে দেয়।
কালামের ঘটনা শুনে বৈজ্ঞানিক মন যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল তার প্রতিফলন কেমন হতে পারে সে বোঝেনি। আসলেই কি ঐ ❛শবাধার❜ দিয়ে অন্য কোথাও পৌঁছানো যাবে? মনির কোথায় গেল?
কল্পকাহিনি ধাঁচে শুরু হয়ে গল্পের শেষটা পারফেক্ট অপরাধের অবাক করা এক দৃষ্টান্ত দিয়ে গেল।
❛ক্যামেলট - এক দূরসময়ের কাহিনি❜ তে অমল বলেছিল তার প্রেমিকার কথা। যে প্রেমিকা কখনোই তার প্রেম নিবেদন সাড়া দেয়নি। পৃথিবী তার বলয় শক্তি হারিয়ে দূরে সর যেতে যেতে বিলীন হয়ে গেল। ক্যামেলটে সে একা কী করে থাকবে?
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ধাঁচের এই গল্পটা ভালো লেগেছে। ভবিষ্যত কেবলই এক অকল্পনাযোগ্য ডিস্টোপিয়া!
দক্ষিণের শহরকে গিলে ফেলেছিল। উত্তরের লোকেরা দক্ষিণের সেই ধ্বংস থেকে দূরে থাকতে সব ঢেকে দিয়েছিল। তবুও একদিন এক ❛পদ্মগুলঞ্চ❜ লতার আবির্ভাবে সবাই কেমন আগের কথা মনে করে নির্জীব হয়ে যেতে লাগলো। এবার কি তবে উত্তরও শেষ?
ঘোর লাগা এক গল্প। যার শেষটা বিষণ্ণ।
❛শ্যাতোয়ান্ত❜ মানে হলো মণি-প্রতিফলিত উজ্জ্বলতা। সে এমন এক সময়ের বাসিন্দা যেখানে কাগজের ব্যবহার বন্ধ হয়েছে। অচল হয়েছে কলম। ঘনক তথা কম্পিউটারে এখন আর কোনো কিবোর্ড নেই। সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মুখের কথায় চলে। এমন কি হতে পারে যে পৃথিবীতে কেউ লিখতে পারছে না, পড়তে জানে কিন্তু জানেনা কীভাবে লিখে। হায়ারোগ্লিফের মতো লেখ্য রূপও সে পৃথিবীতে ইতিহাসের এক অংশ। কেমন হবে কবি এ কবিতা লিখছে না। সাহিত্য চর্চা নেই। কারণ, এই শহরে এখন কেবল ঘনকেরাই উপন্যাস লিখে!
এই গল্পটা দারুণ। লেখার ব্যবহার বন্ধ, কাগজ বন্ধ , কখন বন্ধের সাথে কারো গল্প লেখার অদম্য ইচ্ছার কথা যেন হাহাকার রূপে প্রকাশ হচ্ছিল। এরপরের টুইস্ট যেন আবেগকে দুমড়ে দিবে।
❛বার্ট কোমেনের ডান হাত❜ আসলেই কি মস্তিস্কের সাথে সংযোগ ছিল? নিউরো সায়েন্সের সেই বিজ্ঞানীর সাথে ফ্লাইটের স্মৃতি আর ঘরে যাওয়া ঘটনা গুলো আসলেই মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার?
এই গল্পটা বেশ উপভোগ্য। শেষের দিকে চমক থাকলেও ধরা গেছে।
আমরা কি সবাই ইচ্ছার অধীনে বাস করি? নাকি আমাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা তাদের ইচ্ছাকেই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়। রেবাকে বিয়ে করতে না চাওয়ার যে ইচ্ছা তার সত্যতা কি শুধু দুটো চিরকুট নির্ধারণ করতে পারে? এ কেমন ❛অবাধ অভীপ্সা❜?
সম্মানের বস্তুও যদি কঠিন সত্যের সামনে আসে সেটা কেমন করে ভেতরকে নাড়িয়ে দেয় তার প্রমাণ ছিল গল্পটি।
উত্তরাধিকার পেতে তরুণ হয়ে যাচ্ছে বর্ষীয়ান আর বর্ষীয়ান কেমন তরুণী হয়ে যাচ্ছে। সেটা এই ❛নিয়নবাতি❜ র শহরে রাত না কাটালে বোঝা যায় না।
এই গল্পটা দারুণ। উত্তরাধিকারের গল্পকে এমন মোহ নীয় করে লিখতে পারেন লেখকই। শেষটা দারুণ।
গল্পগুলো হালকা হলেও এর গভীরতা অনেক। ভাবতে হয়। লেখক যেভাবে পাঠকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলছেন তার সাথে তাল মেলাতে গেলে রকেট গতিতে এই বই পড়া যাবে না। লেখক যদি চায় ভাবাতে তবে সেই চাওয়াকে মূল্য দিয়ে ধীরে ধীরে কল্পনার জগতের জাদুতে হারাতে হবে। তবে সেই জগতের গল্পগুলো উপভোগ করতে হবে। ভাবনার অতলে হারালেও হঠাৎ কোনো চমক এসে ঘর ভাঙিয়ে দিতে পারে। ততক্ষণে গল্প শেষ। থাকবে শুধু চিন্তার গভীরতা।
❛মনে করতে পারলেন? আদতেই এ লেখা কখনো পড়েছেন নাকি? মনে না পড়লেও সমস্যা নেই বৈকি। হয়তো পড়েছেন কিন্তু পৃথিবীর সেই বিস্মরণ রোগের মতো আপনিও সব ভুলে যাচ্ছেন!❜
এখন গভীর রাত। মনে হয় না খুব বেশি মানুষ জেগে আছে। শীতের এই গভীর রাতে বই পড়ার মজাই আলাদা। সেই মজা নিতে নিতেই শেষ করে ফেললাম দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা বই 'শ্যাতোয়ান্ত'। 'শ্যাতোয়ান্ত' শব্দটা একদম নতুন লাগছে না? আমার কাছেও লেগেছিলো। আপনাদের জানানোর জন্যেই জানিয়ে রাখি, এর অর্থ হচ্ছে, মণি প্রতিফলিত উজ্জ্বলতা।(এটা আমি খুঁজে বের করিনি, বইয়েই লিখা আছে)
বই সম্পর্কে বলতে গেলে বলবো, একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের একটা বই শেষ করলাম। ১৮ টা ছোট গল্প নিয়ে এই সংকলনটা তৈরি। গল্পগুলো বিভিন্ন জনরার সমন্বয়েই তৈরি। বেশিরভাগ গল্পই আপনার কাছে ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। আর, যেগুলা ভালো লাগবে না সেগুলা একদমই সাদামাটা লাগবে। এইটাও আমার বিশ্বাস। সেজন্য কোনগুলা আমার ভালো লেগেছে সেটা সামনে আনলাম না। নিজেই পড়ে সিদ্ধান্ত নিয়েন।
সবমিলিয়ে বলবো, দীপেন ভট্টাচার্যের লেখায় একটা চমৎকার আকর্ষণ আছে। পড়ার সময় ঘোর কাজ করে। শ্যাতোয়ান্তর গল্পগুলাকে যে ঠিক কোন জনরায় ফেলা যায় তা বলা মুস্কিল। পাঁচমেশালী বলেই চালিয়ে দেয়াটা ভালো হবে। আমার মতো যাদের গল্প সংকলন পড়তে ভালো লাগে তাদের এই বই অনায়াসে ভালো লাগবে। চমৎকার একটা বই। পড়ে ফেলুন।
‘শ্যাতোয়ান্ত’ মূলত দীপেন ভট্টাচার্য এর ১৮টি ছোটগল্পের সংকলন যার বেশিরভাগই সায়েন্স ফিকশন ঘরানার। সেই সাথে কিছু গল্পে জাদুবাস্তবতা আর মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার স্বাদ পাওয়া যাবে। বইয়ের বেশিরভাগ ছোটগল্পই আমার ভালো লেগেছে, যার ভেতরে উল্লেখযোগ্য হলো আমেনহোতেপের সময়, মেইনের বিষণ্ণ ঋতুগুলি, বার্ট কোমেনের বাম হাত আর মাউন্ট শাস্তা। তবে পুরো সংকলনে আমার কাছে সেরা গল্প 'শ্যাতোয়ান্ত' কেই লাগলো। এই সংকলনের আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে এর বিভিন্ন গল্পে সায়েন্স ফিকশনের কমন ট্রোপগুলোর সাথে চিন্তার খোরাকও পাওয়া যায়। তাই যাদের এ ধরনের ছোট গল্প সংকলন পড়তে ভালো লাগে তাদের জন্য আদর্শ একটি সংকলন হচ্ছে ‘শ্যাতোয়ান্ত’।