এক কুৎসিত চেহারার মানুষকে এক বিদুষী নারী বলেছিল ‘আপনি হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।’ এই একটি বাক্যেই বদলে গেছে তার জীবন। সে ছিল এমন পুরুষ যার সৌন্দর্য দেখার জন্য থাকতে হয় অন্তরের চোখ। একমাত্র সে নারীরই ছিল সেই চোখ। তারপর, জমিদারের বিলাসী জীবন থেকে সে লোকটি নেমে এসেছিল সাধারন মানুষের কাতারে। ভালোবাসা তাকে দিয়েছিল বিদ্রোহের শক্তি। এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হয়েছেন, আর সুবে বাংলা ও বিহার দখল করে নিয়েছে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ইতিহাসে এই অংশটুকু লেখা হয় অনেক বড় করে। কিন্তু যে অংশটার কথা সবাই বিস্মৃত সেটা হলোÑ পলাশী পরবর্তী তিন দশক নবাবের চাকরিচ্যুত সৈন্য, সাধারন কৃষক, মুসলিম সাধক ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের প্রায় ৫০হাজার সদস্যকে সংগঠিত করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন এক মহান সুফি সাধক, তাঁর নামÑ ফকির মজনু শাহ্। শেষ যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু উত্তরপুরুষের জন্য রেখে গেছেন ইনসাফের পক্ষে জালিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক অভূতপূর্ব সাহসের উদাহরণ।
পয়লা বৈশাখের এক কাকডাকা ভোরে জন্ম নিয়েই দেখে, বাংলাদেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ ঘাটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির অবস্থানের ওপর যখন ইন্ডিয়ান মিগ থেকে বোমা ফেলা হচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সঙ্গে বাঙ্কারে বসে শিশুটি বলছিল, 'আল্লাহ্, রক্ষা কর'—গল্পটি শিবলীর মায়ের কাছে শোনা। তখন যুদ্ধ না বুঝলেও নব্বইয়ের দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালেই স্বৈরশাসকের জেল জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে চলে আসেন নাটোর থেকে ঢাকায় । অভিনয়ের উপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষে গ্রুপথিয়েটার নাট্যচক্রের সঙ্গে মঞ্চনাটকে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকেন শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে।অভিভাবকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একদল গানপাগল তরুণ ব্যান্ড সংগীতের মাধ্যমে বাংলা গানের ধারায় যে-পরিবর্তন এনেছে, শিবলী তাদেরই অন্যতম। যুগযন্ত্রণার ক্ষ্যাপামো মজ্জাগত বলেই প্রথা ভাঙার যুদ্ধে শিবলী হয়ে ওঠেন আপাদমস্তক 'রক'। আধুনিক জীবনযন্ত্রণাগ্রস্ত তারুণ্যের ভাষাকে শিবলী উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত সহজসরল 'রক' এর ভাষায়। তাঁর সাফল্য এখানেই । তাই অল্প সময়ের মধ্যেই শিবলী পরিণত হয়েছেন এদেশের ব্যান্ড সংগীতজগতের কিংবদন্তি গীতিকবিতে । শিবলীর লেখা (প্রায় ৩০০) জনপ্রিয় গানের মধ্যে কয়েকটি: জেল থেকে বলছি | কথা-সুর: শিবলী, ফিলিংস /নগরবাউল তুমি আমার প্রথম সকাল | তপন চৌধুরী-শাকিলা জাফর কষ্ট পেতে ভালবাসি | আইয়ুব বাচ্চু (এলআরবি) হাসতে দেখো, গাইতে দেখো | আইয়ুব বাচ্চু কত কষ্টে আছি | জেমস পালাবে কোথায় | জেমস একজন বিবাগি | জেমস রাজকুমারী | আইয়ুব বাচ্চু হাজার বর্ষা রাত । সোলস পলাশী প্রান্তর। মাইলস কী ভাবে কাঁদাবে তুমি (যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে) | খালিদ (চাইম) আরও অনেক অনেক গান......... 'কমপ্লিট ম্যান' খ্যাত ঝুঁটিবাঁধা সেঞ্চুরি ফেব্রিকসের দুর্দান্ত সেই মডেল শিবলী ছিলেন তাঁর সময়ের ফ্যাশন-আইকন।তিনি একজন সফল নাট্যকার। বিটিভির যুগে তাঁর লেখা প্রথম সাড়া জাগানো নাটক 'তোমার চোখে দেখি'(১৯৯৫)। আরও লিখেছেন- রাজকুমারী, হাইওয়ে টু হেভেন, গুড সিটিজেন, নুরু মিয়া দ্যা পেইন্টার, যত দূরে থাকো, বৃষ্টি আমার মা,রান বেইবি রান,আন্ডারগ্রাউণ্ড,শহরের ভিতরে শহরসেকেন্ড চান্স,স্পন্দন,মিলিয়ন ডলার বেইবি,দ্যা ব্রিফকেস।নিজের লেখা নাটক 'রাজকুমারী'তে(১৯৯৭) মির্জা গালিব চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় এখনও অনেকের মনে থাকার কথা।শিবলীর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো 'ইচ্ছে হলে ছুঁতে পারি তোমার অভিমান' (১৯৯৫), 'তুমি আমার কষ্টগুলো সবুজ করে দাও না'(২০১০), মাথার উপরে যে শূন্যতা তার নাম আকাশ, বুকের ভেতরে যে শূন্যতা তার নাম দীর্ঘশ্বাস'(২০১৪)।বাংলা একাডেমী প্রকাশ করেছে তাঁর 'বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন'(১৯৯৭) নামে ব্যান্ড সংগীতের ওপর লিখিত প্রথম এবং একমাত্র গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ।শিবলী'র কাহিনী সংলাপ এবং চিত্রনাট্যে ও গীতিকবিতায় প্রথম পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র 'পদ্ম পাতার জল'(২০১৫)।শিবলী'র প্রথম এবং বেস্টসেলার উপন্যাস- দারবিশ (২০১৭)।স্বভাবজাত বোহেমিয়ান, ঘুরেছেন ইউরোপে সহ পৃথিবীর পথে পথে।।
❛মুসলিমদের জন্য যু দ্ধ ইহকাল ও পরকাল উভয়কালের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের যু দ্ধে কোন পরাজয় নেই। যু দ্ধে বেঁচে থাকলে বিজয় আর মৃ ত্যু হলে নিশ্চিত বেহেশত। এই মানসিকতা নিয়ে যে বাহিনী যু দ্ধ করে, তাদের পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব।❜
পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ বাহিনীর পরাজয়ের মূল কারণ ছিল বিশ্বাসঘা তকতা। ইমান বিসর্জন দিয়ে যখন মীর জাফর ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়েছিল, তখনই অস্তমিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার সূর্য। শেষ হয়ে গিয়েছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস বঞ্চনার, অত্যা চারের, দুর্বলের উপর সবলের শোষণের। বাংলার শাসন পরদেশীদের হাতে যাওয়ার ইতিহাস এবং পরে স্বাধিনতা পুনরুদ্ধারের ইতিহাস যতোটা আলোচিত, ততোটাই বিস্মৃত ১৭৫৭ পরবর্তী তিন দশকের বিদ্রোহের কথা। ইতিহাসে সে বিদ্রোহকে আমরা ফকির-সন্ন্যাসী-কৃষক বিদ্রোহ নামে জানি।
ইংরেজ বাহিনীর ব র্বরতা যেন অন্য এক মাত্রা পেয়েছে হিন্দু জমিদারদের বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাতে। মিলেমিশে তারা অত্যা চার করতে থাকে নিরীহদের উপর। ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে ইংরেজ এবং হিন্দু জমিদারদের কোষাগার। ওপরদিকে জুলুমের শিকার হয় মুসলিমরা। হিন্দু জমিদাররা উপকৃত হলেও দুর্দশায় থেকে যায় গরীব হিন্দুরা।
❛স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায় ? দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।।❜
স্বাধীনতা ছাড়া জীবন, অত্যা চারে জর্জরিত জীবনে যখন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার জনগণ নাভিশ্বাস নিচ্ছে তখন আশার আলো হিসেবে দেখা দিলেন এক সুফি-সাধক। তিনি বাংলার মুসলিম ফকির, সন্ন্যাসী ও কৃষকদের একত্র করলেন। তার সাথে এক কাতারে শামিল হলেন নির্যা তিত হিন্দুরাও। সকলকে নিয়ে কঠিন বিদ্রোহ শুরু করলেন তিনি। এই বিদ্রোহ যেমন স্বাধীনতা রক্ষার, তেমনি ধর্ম রক্ষার। অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ের নেতার নাম ❛ফকির মজনু শাহ্❜। তার দৃঢ় নেতৃত্ব, কোমল-কঠোরতা মিশ্রিত স্বভাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে মানুষ। মূল সংগ্রামে শেষমেষ মজনু শাহ্ পরাজিত হলেও ফকির বিদ্রোহ তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা লাভে অভূতপূর্ব প্রভাব রেখেছিল।
ইংরেজদের খুশি করে নিজের আখের গোছানো এক জমিদার অশোক গুপ্ত। ছত্রিশ পরগনা জেলায় ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। নি ষ্ঠুর, ব র্বর, অত্যা চারীর ওপর নাম যেন অশোক জমিদার। এর মূল্যও চুকাতে হয়েছিল তার পরিবারকে। কথায় আছে, ❛পাপ বাপকেও ছাড়ে না❜। অশোকের পাপের শাস্তি ভোগ করেছে তার পরিবার। আগুনে জ্বলে পুড়ে গেছে তার স্ত্রী, জমিদার মহল। একমাত্র সন্তান সমুদ্র গুপ্তের মুখ ঝলসে দিয়েছে ফকির বাহিনী। আগুনে পোড়া সমুদ্রের মুখ দেখে কেউ তাকে মানুষ হিসেবে ভাবে না। দানব মনে করে। নিজের পরিবারের এই দুর্দশার জন্য অশোক আরও বেপরোয়া, আরও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে যায়। কিন্তু জালিমের বিনাশ তো যুগে যুগেই হয়েছে। অশোকের বিনাশ কবে হবে?
মজনু শাহ্ এর দেওয়া দায়িত্ব নিয়ে ছত্রিশ পরগনায় এসেছেন সোবহান শাহ্। চুপসে যাওয়া জনপদে ফিরিয়ে আনেন আশার আলো। দ্বীনের বাণীর মাধ্যমে সকলকে আগ্রহ দেন অশোক এবং ইংরেজ বাহিনীকে দমনের। তার কথার সম্মোহনী জাদুতে জনগণ নিজের অধিকার আদায়ে সংকল্পবদ্ধ হয়। ❛নূর❜ মানে আলো। সোবহানের কন্যা নূর। দৃষ্টির নূর না থাকলেও অন্তরের নূর দিয়ে নূর যা দেখতে পায় তা দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন কেউও দেখতে পারে না। তার কথার কোমলতা, যুক্তি আর বিচক্ষণতা তাকে আলাদা করে অন্য সবার থেকে। নূর মানুষকে তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য কিংবা সৌন্দর্য দিয়ে বিচার করে না। বিচার করে তার ভেতরের বৈশিষ্ট্য দিয়ে। এটাই নূরের চরিত্রকে অন্য এক আলো দেয়। ছোটো থেকেই সকলের কাছে আতং কের নাম সমুদ্র গুপ্ত। ব্যবহার বা চরিত্রে নয়, পোড়া মুখশ্রী তার কারণ। ছোটো থেকে কখনও নিজেকে দেখেনি সে। তাকে দেখলে সবাই ভয় পায়, কেউ জ্ঞান হারায়। স্বয়ং পিতা অশোকও তাকে দেখে ভয় পায়। সমুদ্র নিজেকে দানব ভেবেই জীবনের ৩২ বছর পার করে দেয়। সমাজের বাইরে থাকা সমুদ্র একদিন সাক্ষাত পায় এমন এক নারীর যে তাকে বলেছিল, সেই পৃথিবীর সবথেকে সুদর্শন পুরুষ। সেই নারীর এক বানীতেই তার জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। নিজেকে সে আর পাঁচজনের মতোই মানুষ ভাবতে শুরু করে। লোকের সাথে মিশতে শুরু করে আর মানুষের দুর্দশার কথা জানে। নিজেকে নিয়ে প্রথমবার সে হীন মনে করা বন্ধ করে। তাই তাকে এক অন্য জীবন দেয়। তার অন্তরের কোমল মানুষটাকে আলো দেয়া নারীটি কে?
সোবহান শাহ্-র নেতৃত্বে আক্র মন চালাবে ফকির-সন্ন্যাসী বাহিনী। শুরু হবে আরেক দামামা। জয় হবে কার?
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ❛নূর❜ এক ঐতিহাসিক উপন্যাস। ইতিহাসের সেই সময়কে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস এটি যে সময় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ধুঁকছে ইংরেজ বাহিনীর তোপে। স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি এ যেন মুসলিমদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। শোষ ণের অবসান করে স্বাধীনতা সূর্য ছিনিয়ে নিয়ে আসতে বদ্ধ পরিকর এক বাহিনীর সাহসিকতার আখ্যান ❛নূর❜। লেখক লতিফুল ইসলাম শিবলী আমার খুব প্রিয়। লেখকের লেখার বিশেষ করে উক্তি দিয়ে গল্পের মমার্থ বুঝিয়ে দেয়ার ভক্ত আমি। প্রতিটা উপন্যাসেই তিনি সংলাপকে মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। যেটা পড়লে অন্তর থেকে একধরনের প্রেরণা তৈরি হয়। ধর্ম নিয়ে কঠিন সব কথাকে লেখক তার লেখায় দারুণভাবে বুঝিয়ে দেন। ❛নূর❜ উপন্যাসেও লেখক সংলাপের মাঝে গল্পকে তুলে ধরেছেন। ধর্ম, অস্তিত্ব, জুলুমের অবসান আর সাহসের সাথে সত্যের জন্য লড়াই করার মানসিকতাকে ইতিহাসের মিশ্রণে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের পাতায় পাতায় প্রেরণামূলক বাণীর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে থাকা সেই আলোর সন্ধান দিয়েছেন যা সঠিক নির্দেশনার অভাবে কখনো ফুটে উঠে না। ভালোবাসা, মায়া আর সঠিক দিক-নির্দেশনা পেলে বিপথে কেউ যেতে পারে না। ১৪০ পৃষ্ঠার স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই উপন্যাস পড়ার প্রতিটা সময় উপভোগ করেছি। সংলাপগুলো নিজেকে ভাবিয়েছে অনেক। উপলব্ধি করিয়েছে ইতিহাসের সেই কঠিন সময়কে। গল্পের থেকে বইতে প্রাধান্য ছিল সংলাপের, বাণীর। তবে সেটা মূল গল্পকে খুব একটা বাঁধা দেয়নি। যু দ্ধের বর্ণনা থেকে ❛নূর❜ উপন্যাসে লেখক যু দ্ধ করতে যে প্রেরণা, সততা আর লক্ষ্যস্থির প্রয়োজন সেটাই মোটা দাগে দেখিয়েছেন। অনেক ভালোলাগার মাঝেও উপন্যাসের শেষটা দুঃখ দিয়েছে। মন ভরাতে পারেনি। সেটা উপন্যাসের শেষ পরিণতির জন্যেও আবার হুট করেই শেষ হয়ে গেলো সেজন্যেও। এ জাতীয় উপন্যাস একটু স্বাস্থ্যবান হলেও পড়তে অত্যুক্তি হতো না। শেষের দিকে বর্ণনা আরেকটু বেশি হলে আরো ভালো লাগতো।
উপন্যাসে ফকির মজনু শাহ্-র উপস্থিতি আরো কিছু জায়গায় থাকলে মনে হয় পূর্ণতা পেতো। উপন্যাসে চরিত্র বেশি ছিল না। তবে যারাই ছিলেন তারা তাদের অবস্থানে ঠিক ছিলেন। বলাই বাহুল্য নূর আর সমুদ্র গুপ্ত চরিত্র মন কেড়েছে।
১৩৯ পৃষ্ঠার বইয়ের অল্প কথায় বিশাল এক ইতিহাসের মূলপাদ্য রচনা, সাথে সুক্ষ্ম মানবিক গুণগুলি নিয়ে বিশ্লেষণ, লেখকের মুন্সীয়ানার পরিচয় দেয়। ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের ধারাপাতে কত শত মর্মবেদনার কাহিনী ইতিহাসের ধুলোয় মিশে আছে তা অনুধাবন করাও কঠিন, বর্তমান এই প্রহেলিকাময় মৃত সমাজে।
কাহিনীতে উঠে আসে পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী তিন দশকের ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এক দীপ্তমূর্তি "ফকির মজনু শাহ", এক মহান সুফি সাধক। তাঁর সুদৃঢ় ইমানী জজবা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমগ্র হিন্দু-মুসলিম অধিকার বঞ্চিত মূলত কৃষক মজলুমদের সংগঠিত করে এক চাদরের নিচে। ঐক্যবদ্ধ হয় হিন্দু সন্ন্যাসী ও ফকির দরবেশ।
বাংলাতে "ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ" ( ১৭৬০-১৮০০ ) যেখানে নির্যাতিত কৃষক, গরীব হিন্দু মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে বিদেশি বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূচনাস্থল।
বই থেকে কিছু ভাললাগা শব্দমালার উদ্ধৃত:
- "আমরা আমাদের মৃত্যুকে শ্বাস-প্রশ্বাসের হাতে তুলে দেইনি বরং আমরা আমাদের মৃত্যুকে তুলে দিয়েছি আল্লাহর হাতে। নি:শ্বাস বন্ধ হলে তোমার মৃত্যু হবে কিন্তু আল্লাহর হাতে তুলে দেয়া জীবন প্রবেশ করবে সসীম জীবন থেকে অসীম জীবনে। যারা মনে করে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়াটাই মৃত্যুর কারণ, শুধু তাদেরই মৃত্যু হবে।..."
- "দানব দেখতে চোখ লাগে, মানুষ দেখতে লাগে অন্তর"।
- "মানুষ ভুল করে অনেক কিছুর ভুল নাম দেয়, মানুষ যেটাকে ভালোবাসা বলে সেটা আসলে- মায়া"।
লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখা সবসময়ই আমার পছন্দ। কিন্তু এ বইটা আমাকে ব্যাপক হতাশ করেছে। আরোপিত, খানিকটা গাজাখুরি এবং অনেকাংশে নিজের দর্শন প্রমাণ এর জন্য পাহাড় ঠেলার প্রয়াস বলে মনে হয়েছে। জানিনা, প্রকাশকের অনুরোধে, পাঠকদের চাহিদায় এই বইটা লেখা হয়েছে কিনা কিন্তু পড়তে গিয়ে ফরমায়েশী কাজ বলে মনে হয়েছে।
❝বাঙালির যদি কোনো লজ্জার বিষয় থেকে থাকে তবে তা হলো বিনা যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে পতন।❞ না উক্তিটি কোনো ইতিহাসবিদ দেননি। উক্তিটি আমার। ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি কম করিনি জীবনে। পড়াশোনা সে লাইনে না হলেও একটা বিপুল আগ্রহ থেকে ইতিহাসের সাথে যুক্ত আমি। এবং সেই ইতিহাস ঘেটে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাকে লজ্জা ছাড়া আর কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। মুঘল শাসনামল থেকে যে বাংলা ১৭১৭ সালের দিকে স্বাধীন হলো এরপর বর্গিদের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে সেই উপাধি পাকাপোক্ত করল সেই উপাধিটুকুকে একদম মুখের কথায় লর্ড ক্লাইভের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল মীর জাফর! এর শাস্তি সে ভোগ করল কি করল না তা দিয়ে কিছু যায় আসে না কারণ লজ্জার কাপর তখন মাটিতে। আর লজ্জা সরে গেলে তার দিকে কুকুরও তাকায় না। ১৭৫৭ সালের আম্রকাননে যে হায়া আমাদের উঠে গিয়েছিল সেই হায়াটুকু ধরে রাখতে কিছু মানুষ উঠে পড়ে লেগেছিল। বলে রাখা ভালো ১৭৬৩ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে ভারতে কিছু দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশরাও এটা ধরে রেখেছিল যে এরকম কিছু একটা হবে। তাই ১৭৫৭ এর পরপর মীর জাফরের হাত ধরে রাজপুতসহ বিভিন্ন জমিদার (নবাব সিরাজ উদ্ দৌলার আগে তথা মুঘলদের পরেও এরাই জমিদার ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা মুঘলদের করা জমিদার প্রথার নিয়ম পালটে দেয়) বাছাই করে এবং তাদেরকে রায় বাহাদুর নামে ঘোষণা করে বিভিন্ন জায়গা তাদের কব্জায় নিয়ে নেয়। তন্মধ্যে বাংলা ছিল অন্যতম। তো সেই মাথাচাড়া দিয়ে দলের মধ্যে ছিল ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীর, সিপাহি বিদ্রোহ ইত্যাদি। কালের ক্রমান্বয়ে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল প্রথম সারির বিদ্রোহ। ১৭৬৩ সালেই ফকির মজনু শাহ্র হাত ধরে এই বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। এই বিদ্রোহের মূলে ছিল মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার এবং আরোপিত কর। এই বিস্তর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার একটা কারণ অবশ্যই আছে। লেখক লতিফুল ইসলাম শিবলী'র নূর বইটি ঠিক এই ফকির মজনু শাহ্র সময়ের কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। চমৎকার এই প্লটের বইটা ঠিক ইতিহাস আশ্রিত রোমান্টিক বলব না থ্রিলার বলব তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। যাক সে বিষয় চলুন ঘুরে আসি আখ্যান থেকে। ★ সার সংক্ষেপ: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ। রাজশাহীর কোনো এক জায়গায় যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহ্। যুদ্ধের পরিকল্পনায় আনেন পরিবর্তন। বিভিন্ন নেতাকে দল দিয়ে ভাগ করে ছড়িয়ে দেন এদিক সেদিক। সেই এদিক সেদিকের ছত্রিশ পরগনা নামক জায়গাতে দায়িত্ব পড়ে সোবহান শাহের। সোবহান শাহের একমাত্র কন্যা নূর। যার আছে এক অদ্ভুত ক্ষমতা। মানুষের মন পড়ার ক্ষমতা। এবং তীব্র ইন্দ্রিয় শক্তির এ নারীকে ঘিরে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি। সেই ইন্দ্রিয় শক্তির নারীর একটা গুণে মোহিত হয়ে পড়ে সেই পরগণার জমিদারের ছেলে। এখন সে মোহ কী ছিল আর কী হলো তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে না কারণ স্পয়েলড হয়ে যাবে বিষয়টা। তবে এটুকু বলছি যা হয়েছে তাতে দানব হয়েছে মানুষ আর মানুষ হয়েছে পশু! ★ মূল রিভিউ: গল্পটি পড়ার সময়েই টনক নড়ে যে ভালো কিছু একটা পড়তে যাচ্ছি নিঃসন্দেহে। যথাসম্ভব ধরে রেখেছিলাম ১৭৭০ এর পরের কোনো প্লট পড়ছি কারণ ১৭৮৭ তে মজনু শাহের মৃত্যুর পরে ফকির আন্দোলনে বিশাল একটা ভাটা পড়ে। যা ব্রিটিশদের এগিয়ে যেতে আরও বেশি ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে পড়তে পড়তে খুঁজে পাই ১৭৭৬ সালের একটা প্লট। এবং সে সময়কার চরম পরিস্থিতি নিয়ে বিদঘুটে সব বর্ণনা ছিল বইতে। এবার আসি ১৭৭০ ভেবেছিলাম তার কারণ হলো 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামের একটা দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল বাংলায়। আর তা ছিল ১১৭৬ বঙ্গাব্দে তথা ১৭৭০ সালে। বইতে ফকির মজনু শাহের বর্ণনা শুনেই বুঝেছিলাম ছিয়াত্তরের মন্বন্তর থাকবে মাস্ট! সে সময়ে প্রায় কোটি সংখ্যক মানুষ মারা যায় না খেয়ে। আর এর পুরোটাই প্রভাব ফেলে সুবাহ বাংলায়। পথে ঘাটে এদিক সেদিকে গণহারে কবর আর লাশের স্তুপ দেখা গিয়েছিল সে সময়। সেই ভয়ার্ত সময়েও ব্রিটিশরা খাজনা, কর, কারচুপি থামায়নি। নীল চাষ অব্যাহত রেখে বাঙালিদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার নামিয়ে দিয়েছিল। নূর বইটিতে এই করুণ বিষয়টুকু খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে কোনো জমিদারের পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই বিষয়টাকে ফুটিয়ে তোলা যায় সেটা দেখিয়েছেন লেখক। এছাড়াও আরও একটা বিষয় তিনি দেখিয়েছেন তা হলো মুগ্ধতা। পুরো বইটা নূরকে কেন্দ্র করে হলেও তা��� বিষয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। ভালোবেসেও যে মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে তার অবসান যে কতটুকু করুণ হতে পারে তাও চোখের সামনে তা বোঝার জন্য কিছু সময় দরকার ছিল কিন্তু তা পাওয়ার আগেই সব শেষ করে দিয়েছেন লেখক। ব্রিটিশদের বর্বরতা, ফকিরদের প্রতিশোধ ছাড়াও বইতে খুব সূক্ষ্ম একটা প্রেম উঠে আসছিল। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস যে হাত দিয়ে তা উঠছিল সেই হাতকে বাঁচাতেই শেষ হয়ে যায় সব। এছাড়াও কোনো মানুষকে বাহ্যিক দিক থেকে সে কীরকম বা বাহ্যিক রূপ দেখে বিচার করাটা কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে একটা মানুষের ওপর তাও দেখিয়েছেন তিনি। বইটা আমার মতে চারটা আঙ্গিকে ভাগ করা যেতে পারে। এক. ব্রিটিশ বনাম ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ দুই. ব্রিটিশদের বর্বরতা এবং মজলুমদের আহাজারি। সাথে ক্ষমা বা মহৎ হওয়ার সে কি উদাহরণ! তিন. দুটো আত্মার মিলন। দেহ তাদের কাছে তুচ্ছই ছিল বলা যায়। চার. ইসলাম অর্থ ইনসাফ এবং ইনসাফের জন্যই সকল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়াও সাবপ্লট হিসেবে ছোটোখাটো যুদ্ধ প্লাস শেষের যুদ্ধটুকু বইটিকে একটা দারুণ সমাপ্তি এনে দিয়েছে। আরও কিছু সাব প্লট ছিল যেমন বিভিন্ন সন্ন্যাসীর মসজিদে একত্র হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নেমে পড়া। আমাদের মধ্যে অনেকেই ধারণা করেন যে হিন্দুরা সবাই বুঝি ব্রিটিশদের সাথী ছিল। আসলে ভুল। বাংলার অধিকাংশ হিন্দুই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ছিল। এবং ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহে সমরাঙ্গনে তারাও অস্ত্র হাতে লড়েছিল। ★ বর্ণনাভঙ্গি: লেখকের ন্যারেটিভ স্ট্যাইল বেশ সুন্দর। গল্পের ফ্লো ধরে রাখতে মাঝে মাঝে লম্বা লম্বা সংলাপ ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন আর তাতে দারুণ কাজ হচ্ছিল। বিশেষ করে ধর্মীয় আঙ্গিকে এরকম একটা বইতে তালিমের মতো বড়ো বড়ো হাদিস, আয়াতযুক্ত সংলাপ ফ্লো কমানোর ঝুঁকি বাড়ালেও আদৌ তা হয়নি। মনে হয়েছে প্রত্যেকটা চরিত্র তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ঠিক যতটুকু জানে ততটুকুকে সংক্ষেপে তুলে ধরছেন। আর এই সংক্ষেপের বর্ণনাটুকু অতি বড়ো হলেও বড়ো মনে হচ্ছিল না। এছাড়া বর্ণনাভঙ্গিও চমৎকার। গল্পটাকে নান্দনিক আকারে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে অন্ধ ব্যক্তিদের যে অন্যান্য ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে থাকে সেটাই সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন। তার বর্ণনার জোরে বইয়ের প্রত্যেকটা বস্তুকে জীবন্ত মনে হচ্ছিল। ★ সমালোচনা: সোবহান শাহ্ এর মেয়ে তথা নূরের আব্বু সম্বোধন করাটা অসংগতি ঠেকেছে। ১৭৮০ সালের একটা প্রেক্ষাপটে 'আব্বু' সম্বোধনটা বেখাপ্পা! সে সময় বাবাকে আব্বা বা বাবা বলে সম্বোধন করা হতো। আব্বু বা আব্বা দুটোই আরবি শব্দ হলেও প্রচলনের ক্ষেত্রে আব্বা ব্যবহৃত হতো যা পরবর্তীতে আব্বু হয়ে যায়। কিছু প্রমিত বানানের অভাব ছিল বইতে। তবে গল্পের ফ্লোতে তা ইগনোরড হয়ে গেছে। এটাকে সমালোচনা বলা যায় না। অসংগতি বলতে পারি। তবে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহে সন্যাসীদের ভূমিকাটাও আরেকটু গভীর ভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত বলে মনে হয়েছে। ★ উপসংহার: যদি আমার কাছে এক বসায় পড়ে ওঠার মত কোনো ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসের নাম জানতে চান তবে আমি এটা তাকে দেব। বইটায় আপনাকে দুঃখ দেবে, ভাবাবে, সেসময়ের মুমিনদের অবস্থা জানতে সাহায্য করবে, জি/হাদের বিষয়ে ধারণা দেবে, দুর্ভিক্ষের বিষয়ে বলবে। অতএব হাতের কাছে থাকলে অবশ্যই বইটি পড়া উচিত। বই: নূর লেখক: লতিফুল ইসলাম শিবলী প্রকাশনী: নালন্দা প্রকাশনা। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রচ্ছদ মূল্য: ৩৫০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪০
#bookreview ১৭৮৬ সালের ডিসেম্বর মাস ইংরেজ বাহিনীর সেনাপতি লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের দল অতর্কিত আক্রমণ করেছে ফকির মজনু শাহের দলকে। মজনু শাহ'র বাম পা ঝলসে গেছে। আহত হয়েও সৈন্যদের সাহস জোগাচ্ছেন মজনু শাহ। যুদ্ধ চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত। হঠাৎ সাদা কুয়াশা ঢেকে দিল যুদ্ধ ময়দান। রাতে ফকির মজনু শাহের লোকেরা নিজেদের মধ্যে মাশোয়ারা করল, কেউ বলল, আজ রাতেই ওদের আক্রমণ করব। কিন্তু মূল সিদ্ধান্তের জন্য সবাই তাকিয়ে আছে ফকির মজনু শাহের দিকে৷ তিনি বললেন, আমরা আজ রাতে আক্রমণ করব না, আমরা বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক ছড়িয়ে পড়ব এবং প্রত্যেকটা অঞ্চলের খলিফা নির্ধারণ করে দিব, তারা স্ব স্ব অঞ্চলে গিয়ে সৈন্য ও জনমত তৈরি করবে আর এদেশীয় দালাল জমিদার এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে৷ _______
ছত্রিশ পরগনার দায়িত্ব দিলেন সোবহান শাহকে৷ সোবহান শাহ তার জন্মান্ধ মেয়ে নূর আর খাদেম আব্দুর রহমানকে নিয়ে পৌছালেন তার ভক্ত মানজুর ইলাহির বাড়ি ছত্রিশ পরগনাতে । ইলাহির বিধবা মেয়ে ফাতিমা।
ছত্রিশ পরগনার জমিদার অশোক গুপ্ত। তার অত্যাচারে সাধারণ কৃষক, জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তার মহল জ্বালিয়ে দেয় কিন্তু অশোক গুপ্ত ব্যবসায়িক কাজে বাহিরে ছিলেন বলে সে যাত্রায় বেঁচে যায়৷ বিদ্রোহীরা তার ছেলে সমুদ্র গুপ্তকে ধরে আনে। জ্বলন্ত মশালের মাথাটা চেপে ধরে সমুদ্র গুপ্তের মুখের উপর। মুখ পোড়ে যায়, সে মুখের দিকে সচরাচর মানুষ তাকাতে পারেনা। সমুদ্র গুপ্ত বেঁচে যায় কিন্তু তার মুখের এই বিকৃতি অবস্থার কারণে তাকে দেখলে যেকেউ ভয় পায়। দানবের সাথে তুলনা করে।
সোবহান শাহ ছত্রিশ পরগনাতে জনমত সৃষ্টি করতে থাকে এবং যুদ্ধের জন্য মানুষকে উদ্ধৃত করতে থাকে। অন্যদিকে সমুদ্র গুপ্ত হয়েছে তার বাবার ঠিক উলটো চরিত্রের ।.....
এই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত কাহিনী ___________ আমরা জানি যে, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলতে মূলত আঠারো শতকের শেষের দিকে (১৭৬০ - ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলাতে ফকির ও সন্ন্যাসী বা মুসলিম ও হিন্দু তাপসদের তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন বিরোধী আন্দোলনকে বোঝানো হয়ে থাকে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন মাদারিপন্থী পীর মজনু শাহ। [উইকি]
এটা মূলত ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস৷ যার মূল বিষয়বস্তু ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে ঘিরে। উপন্যাসে নূরের কথাবার্তায় আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া আছে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে খুব একটিভ দেখতে পাই৷ অন্ধ হলেও তার শ্রবণ শক্তি প্রখর৷ তাছাড়া অত্যাচারী জমিদারের ছেলে যে অত্যাচারী ই হবে এ ধারণাটাকে লেখক পাল্টে দিয়েছে৷ সমুদ্র গুপ্তকে দেখেছি তার বাবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। ভালো একজন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে। ___ আমার কাছে ভালো লেগেছে৷ পড়া শুরু করতে করতেই শেষ হয়ে গেছে। লেখক ইচ্ছে করলে উপন্যাসটাকে বড় করতে পারত ৷ ইতি টানতে তাড়াহুড়ো করেছে। ___ বই : নূর লতিফুল ইসলাম শিবলী নালন্দা প্রকাশন বইমেলা ২০২৩ পৃষ্ঠা : ১৪০ মূল্য : ৩৫০ পার্সোনাল রেটিং: ৮/১০
লতিফুল ইসলাম শিবলী, লেখকের বইয়ের ইন্টারেস্টিং পার্ট বলে যেটা আমি মনে করি— প্রচ্ছদের গায়র একটা কথা লেখা থাকে। এই কথাটা বইয়ের ভেতর কোনো না কোনো চরিত্রের মাধ্যমে বলা হয়েছে বা পুরো বইয়ের বিষয়বস্তু। এই দুইয়ের একটা হবেই। এই ধরুন উল্লিখিত বইয়ের নূর চরিত্রের বলা কথাটা— "দানব দেখতে চোখ আর মানুষ দেখতে লাগে অন্তর" এই কথাটা লেখক যেমন চরিত্রের মাধ্যমে বলেছেন। তেমনি প্রচ্ছদে এনে মূল কাহিনির দিকে পাঠককে অতিসূক্ষ্ম একটা মেসেজও তিনি দিয়ে দিয়েছেন। তো, বলা যায় এই কথাটায় পুরো উপন্যাসের বিষয়বস্ত। শুরু এবং শেষ। এই ধরনটা আমি ইতিপূর্বে দেখিনি, বেশ চমৎকারভাবে লেখক পুরো উপন্যাসের আখ্যানে, গল্পের ভাঁজে ভাঁজে, চরিত্রের মাঝে সেই কথামূলক কথাটা ফুটিয়ে তুলেন, বেশ শক্তিশালী হাতে।
•প্রচ্ছদ, বাঁধাই ও অন্যান্য▪ প্রচ্ছদ শিল্পী, লেখকের পছন্দসই প্রচ্ছদ বানিয়ে দেন। এভাবেই প্রতিটা বইয়ের জন্ম হয়। প্রচ্ছদ শিল্পীও খুব পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে প্রচ্ছদটা তৈরি করেন। তার ব্যাখ্যা ও আনুষঙ্গিক সবকিছু ও বইয়ের প্রচ্ছদে দারুণভাবে ফুটে ওঠে। তেমনি এই বইয়ের বেলাতেও তার ব্যত্যায় ঘটেনি। বইটি ছিলো হার্ড বাঁধায়ের।
•বইটা পড়ে যেমন লাগলো▪ অনুভূতি ব্যক্ত করতে ছোটো একটা শব্দই যথেষ্ট। এতো বড়ো বড়ো লাইনে বললে মানুষ পড়ে দেখে না। এই পড়া না পড়া দেখে নিজের অনূভুতি ছোট করে বা বড়ো করে প্রকাশ করতে হবে বা হবে না। এমন কিছু নেই। অনূভুতি ছোট করে ব্যক্ত করা হোক বা বড়ো বড়ো বাক্যে অনূভুতি ব্যক্ত করা হোক। উভয় পদ্ধতি সমান সমান মূল্য রাখে। এই বই নিয়ে যদি বলি ছোটো করে— অসাধারণ, যে পাঠক পড়েনি। সে এই বইয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত। একজন পাঠককে সুখদায়ক কোনো উপন্যাস পড়তে আগ্রহী হলে তার জন্য মাস্টরিড একটি বই "নূর"।
•লেখকের লেখার মান▪ যদি সাহিত্য শ্রুতিমধুর এবং কানে বাজিয়ে শোনা ও পড়াকে সাহিত্য বলা হয়। তাহলে বইটি সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ।
•বই— নূর। •লেখক— লতিফুল ইসলাম শিবলী। •জনরা— উপন্যাস •প্রকাশনী— নালন্দা।
—আহমদ রাব্বী মা'হাদুস সুন্নাহ, আশকোনা, দক্ষিণ খান, ঢাকা—১২৩০
বইটি ব্রিটিশ আমলের ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহী নিয়ে লেখা একটা উপন্যাস। এখানে ব্রিটিশদের ও জমিদারদের অত্যাচার খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া মুসলমানদের আর গরিব হিন্দুদের প্রতি তাদের বৈষম্যও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া তুলে ধরা কিভাবে আল্লাহর বানী মানুষদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তি যোগায়।
এছাড়া নিজের ছেলের কাছে অত্যাচারী জমিদারের বার বার আক্রমন হওয়া আর নিজের সাম্রাজ্য হারানোর এক অন্যতম কারন যে তার নিজের ছেলে সেটা জমিদারকে অন্য অন্যভুতি দেয়।
এছাড়া নুর চরিত্রটি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। তার মানুষকে বুঝার ক্ষমতা অসাধারণ । সে অন্ধ হয়েও সাধারন মানুষ যেখানে ভয় পায় সেখানে সে সাহসী । তাছারা জমিদার পুত্রের প্রতি তার সহানুভুতি আমায় অভিবুত করেছে। লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখা ৬টি উপন্যাস আমার পড়া হয়েছে। অসম্ভব সুন্দর লেখনী ওনার। ওনার লেখনীতে এক যাদু আছে। তাছারা উনি ওনার লেখায় যে কুরআনের আয়াত যোগ করেন তা আমার যথেষ্ট ভালো লাগে।
ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নিয়ে লেখা উপন্যাসটার শুরু মজনু শাহকে দিয়ে হলেও সোবহান শাহ, তার মেয়ে নূর আর জমিদার অশোক গুপ্ত আর তার ছেলে সমুদ্র গুপ্তকে নিয়েই ঘুরপাক খেয়েছে।
গল্পের গাথুনিটা মোটামুটি। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে একটু দ্রুত বলার চেষ্টা করেছে। আরেকটু বুনট যদি শক্ত হত পড়তে ভাল লাগত।
শেষটা যদিও ভাল লাগেনি তা না হলে হয়তো ৪ স্টার দেওয়া যেত।
শিবলী ভাইয়ের আগের বইগুলোর মত এর দর্শনটাও খুবই ভাল লাগবে সবারই। নূর চরিত্র এই গল্পের শক্ত একটা চরিত্র।
নূরের বলা সংলাপ গুলা আমাদের নতুন দিক দেখাবে। অন্যদিকে তার বাবা সোবহান শাহ আমাদের ধর্মীয় দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
🔰❝ মানুষ ভুল করে অনেক কিছুর ভুল নাম দেয়, মানুষ যেটাকে ভালোবাসা বলে সেটা আসলে–মায়া ❞
পলাশীর যুদ্ধের পরে সংঘটিত ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ অবলম্বনে উপন্যাসটি লিখিত। লেখক সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মানুষের মাঝে আত্মিক ভিন্নতা ও অভিন্নতা ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। সহজপাঠ্য
পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হয়েছেন, আর সুবে বাংলা ও বিহার দখল করে নিয়েছে ব্রিটিশরা। এই টপিক বেশ বড় পরিসরে করে সবাই লিখলেও সবাই বিস্মৃত পলাশী পরবর্তী তিন দশক, যেখানে নবাবের চাকরীচ্যুত সৈন্য, সাধারণ কৃষক, মুসলিম সাধক, হিন্দু সন্ন্যাসীদের পঞ্চাশ হাজার সদস্য সংগঠিত করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন এক মহান সাধক, যিনি ফকির মজনু শাহ্।
শেষ যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু উত্তরপুরুষদের জন্য রেখে গেছেন ইনসাফের পক্ষে জালিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভূতপূর্ব সাহসের উদাহরণ।
'নূর' বইটির প্লট ডালপালা ছড়িয়েছে এর ভিত্তিতেই। পলাশী নিয়ে আমার জানার আগ্রহ ছিল। হাতে এই বইটা আসায় ছটপট বসে গেছি টেবিলে। সাথে ফকির মজনু শাহ্ ও তার সহযোদ্ধাদের উপাখ্যানটা বেশ ভালো লেগেছে। শিবলী ভাইয়ের কয়েকটা বই পড়া থাকার সুবাদে বইটা নিয়ে আগ্রহ যেমন ছিল তা মিইয়ে যায়নি। সহজ সাবলীল বর্ণনায় একটি মেদহীন হিস্টরিকাল থৃলার শেষ করলাম। থ্রিলার পাঠকদের আশাকরি ভালো লাগবে।