কাহিনিটা এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ সময়ের। তখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। তখনও এ ভূখন্ড পরিচিত পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে। এই কাহিনির কর্তা লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি প্রাপ্ত নেওয়াজ চৌধুরী। নেওয়াজ চৌধুরী মানুষটা একটু বেয়াড়া রকমের অদ্ভুত। জন্ম, বেড়ে ওঠা সব বাংলাদেশে হলেও চিন্তাচেতনা-ধ্যানধারণায় তিনি বিলাতী সাহেব। জীবনযাপন করেন সাহেবদের মতোই। খানিকটা ছিটেল। খানিকটা খামখেয়ালী। আর একটু বেশি মাত্রায় বাতিকগ্রস্ত। তার দুর্বলতা বলতে একটাই। মানুষ নয়, জড়বস্তু। লাল টকটকে টেলিফোন বুথ। ঘটনাক্রমে তাদের শাঁখারীবাজারের বাড়ির নাকের ডগায় একটা টেলিফোন বুথ বসানো হয়। এটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে পাঠানো উপহার। জানা যায় স্বয়ং কিংবদন্তিতুল্য এফবিআই চিফ জে এডগার হুভারের ব্রেনচাইল্ড এই বুথ। শুধু বাংলাদেশেই নয়। বুথ বসানো হয় ভারতে, পাকিস্তানে, নেপালে, শ্রীলঙ্কায়। তারপর নেওয়াজ চৌধুরীর জীবন আমূল পাল্টে যায়। ছিটগ্রস্ততা, বাতিকগ্রস্ততা মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়ে। তেরপল টাঙ্গিয়ে খোলা মাঠে ব্যারিস্টারি শুরু করেন। মানুষজন উপহাস করে তার নাম দেয়ঃ তেরপল ব্যারিস্টার। উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশ গিয়ে হঠাৎই পুরনো ইতিহাস সামনে এসে পড়ে ব্যারিস্টারের পৌত্র জায়েদ চৌধুরীর। আচমকা সাক্ষাৎ হয় ব্যারিস্টারের ছোট বোনের সাথে। কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে পড়ে সাক্ষাৎ কঙ্কাল! অনুসন্ধানে লেগে পড়ে ও। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে রহস্যময় অন্তর্ধান ঘটেছিল ব্যারিস্টার পত্নী সুফিয়ার। তাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যান স্বয়ং নেওয়াজ চৌধুরীও। কোথায় হারান তারা? জানা যায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়টুকুতে আঁতিপাঁতি করে কিছু একটা খুঁজছিলেন দু’জন। দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন, গেছেন দেশের বাইরেও। কী খুঁজছিলেন দু’জন? ইতিহাসের অলিগলি পেরিয়ে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের উত্তালপর্ব মাড়িয়ে যে উত্তরটা সামনে বেরিয়ে আসে তা কি ভাবতে পেরেছিল কেউ?
‘ইথাকা’ আত্নপরিচয়ের এক অনুপম কাহিনি, আত্নঅনুসন্ধানের এক অভিনব যাত্রা। গ্রীক বীর ওডিসিয়াস ট্রয় যুদ্ধ শেষে পর্বতসমান বাঁধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে প্রিয় মাতৃভূমি ইথাকায় পা দিতে পেরেছিলেন। এ উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরাও কি পারবে আত্নঅনুসন্ধানের এ অভিনব যাত্রার সমাপ্তিতে নিজেকে খুঁজে পেতে?
জাহিদ হোসেনের জন্ম সিলেটে, বেড়ে উঠা ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশায় ব্যাংকার হলেও বইপড়ার প্রতি অসম্ভব ঝোঁক থেকেই লেখালেখিতে আগ্রহ। শুরু অনুবাদ দিয়ে। পরপর দু’টি অনুবাদ প্রকাশিত হয় তার - অ্যাম্বার রুম ও ম্যাক্সিমাম রাইডঃ দ্য অ্যাঞ্জেল এক্সপেরিমেন্ট। তারপর তিনি প্রবেশ করেন মৌলিক লেখালেখির জগতে। মৌলিক থ্রিলার হিসেবে তার প্রথম প্রয়াস ঈশ্বরের মুখোশ যা ২০১৫ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর একে একে বের হয় ফিনিক্স, কাদ্যুসেয়াস, একজোড়া চোখ খোঁজে আরেকজোড়া চোখকে, দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেব, গিলগামেশ, নৈর্ঋত, পরশুরামের কঠোর কুঠার, ইথাকা ও স্বর্গরাজ্য। লেখালেখিতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য তিনি আলাদা পরিচিতি লাভ করেছেন।
তার প্রকাশিত বই ওপার বাংলাতেও ব্যাপক সমাদৃত ও প্রশংসিত। কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স ও বুকিকার্ট থেকে ইতিমধ্যে তার কয়েকটি বইয়ের ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
জাহিদ হোসেনের যতগুলো বই পড়েছি তার মধ্যে "নৈর্ঋত" আমার সবচেয়ে পছন্দের। কিন্তু পড়ার সময় আমার একটা আজব অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। বইয়ের সবই ভালো কিন্তু ঠিক যেন "জাহিদীয়" নয়।"নৈর্ঋত" এ সবই হয় থ্রিলারের ফর্মুলা অনুযায়ী। আমি জাহিদ হোসেনের খ্যাপাটে, অদ্ভুত, খামখেয়ালিতে পূর্ণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে গল্পের আখ্যানভাগ আদ্যোপান্ত বদলে দেওয়া মোচড় মিস করছিলাম। তার গল্পের অকল্পনীয় মোচড় যে সবসময় ভালো লাগে তা নয়।কিন্তু এগুলোই লেখকের ট্রেডমার্ক। এসব না থাকলে ঠিক জাহিদ হোসেনের লেখা মনে হয় না। আমার নিজের জন্য সুখবর হচ্ছে "ইথাকা"র মাধ্যমে লেখক তার নিজের স্টাইলে ফেরত এসেছেন। দারুণভাবে। "ইথাকা" ওডিসিয়াসের জন্মভূমি। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে টানা দশ বছর লেগেছিলো তার নিজের বাসভূমে ফিরতে। পার হতে হয়েছিলো দুস্তর বাঁধা। কিন্তু মানুষ তো নিজের ঘরে ফিরবেই। ফিরতে চাইবেই। আর ঘর মানে ঘরের মানুষ। "ইথাকা" উপন্যাসটি তার বিচিত্র পটভূমির আড়ালে ঘরে ফেরার গল্প। "ইথাকা"য় আর কী আছে? লাল টেলিফোন বুথ, ছিটগ্রস্ত তেরপল ব্যারিস্টার, এলিয়েনের গল্প লেখা দাদি, ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, লকেট, লিজি, আগুনে পোড়া ডায়েরি, বদরাগী জন লি ক্যারে, ইথাকা, ওডিসিয়াস, তিব্বত, মানস সরোবর, 500 miles, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব - সব মিলিয়ে "ইথাকা" জমজমাট। গল্পের শাখাপ্রশাখা কোনদিকে বিস্তার লাভ করবে ধরার উপায় নেই। ইংরেজিতে একে বলে, "delightfully whimsical." কার কতোটা ভালো লাগবে জানি না কিন্তু আমি লেখকের এমনসব লেখার জন্য উত্তুঙ্গ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করবো।
গ্রীক বীর ওডিসিয়াস ট্রয় যুদ্ধ শেষে পর্বতসমান বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে তবেই ফিরতে পেরেছিলেন প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিতে। গ্রিসের এক দ্বীপ, যার নাম ছিল 'ইথাকা', সেখানেই বাড়ি ছিল ওডিসিয়াসের। 'ইথাকা' তবে কী? Ithaca means home. সোজা বাংলায় 'বাড়ি'!
সেই সিগনেচার হিউমার, অচেনা-অজানা চরিত্রদের ভিড়, গল্পের ভেতর গল্প, কাহিনীর মোড়, মাথা ঘুরিয়ে দেয়া টুইস্ট- এই সবকিছুর জন্য সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকা; বই প্রকাশের পূর্বে ফ্ল্যাপে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, একেবারেই অজ্ঞাত অবস্থায় পাঠের স্বাদ নেয়ার জন্য তা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া; বই হাতে পাওয়ামাত্র গোগ্রাসে গেলা; এবং আকাশচুম্বী আস্থা ও প্রত্যাশার দুটোই কানায় কানায় পূরণ হওয়া- জাহিদ হোসেনের প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রেই এই ক্রম যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্য প্রকাশিত 'ইথাকা'র ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি একবিন্দুও।
এবার উপন্যাসের আদলে তিনি গল্প বলে গেছেন এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের, যখন এই ভূখন্ড ছিল পরাধীন, পরিচিত ছিল 'পূর্ব পাকিস্তান' নামে। ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে ঢাকার শাঁখারীবাজার, নেপালের কাঠমান্ডু, মানস সরোবর, ভারতের দার্জিলিং সহ জানা-অজানা সব জায়গা অবধি মোড় নিয়ে যে কাহিনী ইথাকায় এসে পাড়ি জমায় শেষমেষ।
দুধ চা খেতে খেতে ঈশ্বরের মুখোশ পড়ার পর একজোড়া চোখের খোঁজে ফিনিক্স পাখি হয়ে উড়ে যাওয়া গিলগামেশের দেশের নৈর্ঋত কোণে ঢুঁ মারার পর এবার যে ফিরতেই হতো ইথাকায়!
ভালো-খারাপের নিক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে 'ইথাকা' নিয়ে আলাপ করতে চাই আরও বৃহৎ এক প্রেক্ষিতে: সমকালের জঁরা লেখকদের সীমানা ভাঙার চেষ্টা।
ঘরানার চেনা জমির আইল ভেঙে অন্য ঘরানার জমি দখল, এমনকি উদ্ভট কিন্তু অভিনব জমি আবিষ্কারের মাধ্যমে তরুণ কিছু লেখক অবিরাম ভাঙচুর করে যাচ্ছেন বাংলাদেশে। সেই চেষ্টাটা প্রায়ই সার্বজনীন একটা সৌন্দর্যে পৌঁছাতে পারে না ঠিক, কিন্তু তবু বইগুলোর একটা বিশাল সাফল্য আছে। তা হলো: এমন একটা বই আরো কিছু চমৎকার বইয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে। উদ্দিষ্ট বইখানা, সে গোত্রের আদর্শ এক প্রতিনিধি।
'ইথাকা' পড়ে তাই আধবুড়ো পাঠকের মাথায় পর্যন্ত এলো কল্পনার একটা পাগলা হাওয়া ফুরফুর করে।
"...পাবলিক দুই ধরনের। এক হইলো, সাধারণ পাবলিক আর দুই, ধুম পাবলিক। সাধারণ পাবলিক তাও মতামত দিতে পারে, সুখ-দুঃখের কথা বলতে পারে। কিন্তু ধুম পাবলিক হইলো অস্তিত্বহীন। আমরা ধুম পাবলিক। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের শহিদদের কথা পেপার-পত্রিকায় বলে না, মনে আছে? সালাম, রফিক, জব্বার এবং নাম না জানা অনেকে?” আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন চাচা ।
আমি মাথা নাড়ি। হ্যাঁ। চাচা কথা চালিয়ে যান। “আমরা হইলাম এই ‘নাম না জানা অনেকে' । নন-এন্টিটি। শাসক যেই হোক, আমাদের শোষিত হয়ে যাইতে হবে, প্রফেসর সাব। কখনো সাদা চামড়ার লোকেরা শোষণ করে, কখনো পাঞ্জাবীরা শোষণ করে, কখনো নিজেদের দেশের লোকেরা শোষণ করে..."
জাহিদ ভাই বড় ক্যানভাসে লিখে অভ্যস্ত৷ বিশেষ করে তার গত দুইটা বই ছিল ঢাউস আকৃতির। তাই এবারে ইথাকার সাইজ দেখে একটু হতাশই হয়েছিলাম। কিন্তু সেই হতাশা দূর হয়ে গেল বই শুরু করার ২০-৩০ পৃষ্ঠার মধ্যেই। লন্ডন থেকে তিব্বত হয়ে দার্জিলিং এবং পুরনো ঢাকার অলিগলিতে এক প্রকার নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরালেন। তৈরি করলেন নিজস্ব মিথ ও বাস্তবতা। একাত্তরের কিছু পরিচিত এলিমেন্ট এমনভাবে গল্পে গুলে দিলেন, চোয়াল না ঝুলে উপায় নেই৷ যা কিছু একদম জাহিদীয়, সব কিছুই উপাদেয় পরিমাণে উপস্থিত ইথাকায়৷ তবে এরকম দুর্দান্ত প্লট, চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ না থাকলেও কেবলমাত্র লেখনীর কারণে বইটা শেষ করতে আমার বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হতো না। এখন একথা বলাই যায়, জাহিদ হোসেনের বাজারের ফর্দও আমি মনোযোগ দিয়ে পড়বো।
বইয়ের যে জিনিসটা সব থেকে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে আগে থেকে কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছে। আজকাল বুদ্ধিশুদ্ধি একটু আধটু বাড়ার ফলে অনেক বইয়ের কাহিনীই আগেভাগে আন্দাজ করে ফেলতে পারি। কিন্তু এই বইয়ের কিছুই আগেভাগে বুঝি নাই। আনপ্রেডিক্টেবল বই পড়ার মজাই আলাদা। একদিনে একটানে পড়ে শেষ করেছি এই বই। বইয়ের কাহিনীটাই এমন যে পুরুটা শেষ না করে হাত থেকে রাখা যাচ্ছিলো না। ভিনগ্রহের প্রাণী নিয়ে, ষড়যন্ত্র নিয়ে, টেলিফোন বুথ রহস্য নিয়ে জমজমাট বই। জাহিদ হোসেনের লেখার নি���স্ব স্টাইল হচ্ছে আউলা-ঝাউলামি কিসের থেকে যে কি বেরুবে বুঝা মুশকিলই নয় না মুমকিন এবং আমি এই স্টাইলের একজন ভক্ত। বইয়ের কাগজ, প্রিন্ট ও বাঁধাই অসামমমম।
আমার ধারণা ছিলো আমি একজন প্লটে বিশ্বাসী গল্পখোর। গল্পের বিষয়বস্তু আর উপস্থাপনা ভালো লাগলেই কেবল সেই গল্প আমার মন জয় করতে পারবে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম গদ্যের মাধুর্যতা বলে একটি বিষয় আছে এবং যেটি চাইলে আপনকে ভ্রমে আশ্রিত করে রাখতে পারে। ভুলিয়ে দিতে পারে আপনার গন্তব্য আসলে কোথায়। এই বইমেলার প্রায় সবগুলো হটকেক বইই আমি প্রায় সংগ্রহ করেছি বা নেড়েচেড়ে দেখেছি। কিন্তু কোনো একটি কারণে 'ইথাকা' ছিলো আমার আগ্রহের কেন্দ্রে। ফ্ল্যাপে কিচ্ছু নেই। শুধু বলা আছে সময়কালটা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের। সস্ত্রীক উধাও হয়ে যাওয়া মাথা খারাপ ক্লস্ট্রোফোবিক এক ব্যারিস্টার, তেরপল ব্যারিস্টার। আর গল্পে আছে একটি টেলিফোন বুথ। লাল ঝকঝকে টেলিফোন বুথ। ব্যস, এটুকুই! এইটুকুই আমাকে আটকে ফেলেছিলো।
লেখক জাহিদ হোসেনকে আমার পাগলাটে গোছের লেখক মনে হয় সবসময় (অবশ্যই ব্যক্তি হিসেবে নয়)। তাঁর প্লটগুলো, মানে মেইন প্লটগুলো খুবই লাগামছাড়া উড়াধুরা গোছের লাগে আমার। তাঁর কিছু বইয়ের আমি ভয়াবহ রকম সমালোচনাকারী, কিছু বইয়ের একপেশে ফ্যান। ভদ্রলোকের সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখা বা কথাও হয়নি। এরপরও বইমেলায় গিয়ে আফসার ব্রাদার্সে তৃতীয়বারের মতো যখন শুনলাম ভদ্রলোক লিখা জমা দেননি, আমি সেই পাগলাটে লেখকের অতিপরিচিত বিজ্ঞ ভক্তের মতো ঠোঁট উল্টে মাথা নেড়ে বললাম, 'উহু, হইছে কাম। এইবার আইবোনা তাইলে!' আমার বলার ভংগি দেখে উপস্থিত দুইজনও তাল মেলালেন, 'হ, হইতে পারে। জাহিদ ভাই তো এমুনই!'
'ইথাকা' আসলে ঘরে ফেরার গল্প। সেই ঘর, সেই অতীত, সেই মায়াভরা প্রাণগুলো। যেকারণে ইংল্যান্ড থেকে শুরু হওয়া এই গল্পটার প্রথম অর্ধেক এতো মায়াময়! বাংলাদেশের জন্মলগ্নের টাইমলাইনে হারিয়ে যাওয়া পুর্বপুরুষের খোঁজে জায়েদ চৌধুরীর ছুটে বেড়ানোটাই এই গল্পের প্রাণ। এই ছুটে বেড়ানোয় কোনো তাড়া নেই। নেই কোনো রগরগে চেসিং! আমাদের নানী দাদি, ফুপা-ফুপি, চাচা-চাচির আদর যারা পেয়েছি, যারা আজও মিস করেন এই সম্পর্ক গুলো, তাদের বোধহয় একইভাবে মায়ায় ফেলবে বইটা। খুবই ট্র্যাজিক এই গল্পটা আসলে মন খারাপ করে দিতে পারে কারো কারো। এমনকি ব্যারিস্টার পত্নী সুফিয়া যখন, রবিঠাকুরের গানের দুটি লাইন... 'তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো আমার পরান যাহা চায়' গেয়ে উঠবেন, তখন শিউরে উঠে চোখ দুটো ভিজে যেতেই পারে কিন্তু।
বইটার জনরার কথা বললেও আসলে একরকম স্পয়লার হয়ে যায়। আমি বলছিলাম আগেই লেখক বেশ পাগলাটে, কেওটিক গল্প বলা মানুষ। আমি সেকারণে জানতামও গল্পটার মোড় এভাবেই নেবে। (এতোটাও নেবে সেটা বুঝেছি বললে আবার বেশি মাতবরি হয়ে যায়।) সেকারণে অবাক হইনি! আমি আসলে গল্প বলাতে, গদ্যের মাধুর্যতায় এতোটাই বিমোহিত হয়ে ছিলাম, আরও উদ্ভট কিছু এলেও গিলে ফেলা কঠিন হতোনা আমার ধারণা। হতে পারে আমার বিচারে কিঞ্চিৎ বায়াসনেস আসতে পারে, কিন্তু যেকোনো পাঠক মাত্রই গল্পের যাত্রাটাকে এঞ্জয় করবেন, এতটুকু আমি জানান দিতে পারি। অনেকদিন এই জনরায় পাঁচ তারা দেইনি কোনো বইকে। এই বইটিকে সলিড পাঁচতারা দেয়া হলো। এবং আমার পক্ষ থেকে রেকোমেন্ডেড জানিয়ে ঘোষণাটি শেষ হলো।
জাহিদ হোসেনের নতুন বই 'ইথাকা'র ফ্ল্যাপে লেখা কথাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো কয়েকটা শব্দ - মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দেশ, মাথায় ছিটগ্রস্ত তেরপল ব্যারিস্টার আর টেলিফোন বুথ। তো বাবা এটুকু পড়ে তো বুঝলামই না বইয়ের জনরা কী, এমন গল্প পড়তে আমার ভালো লাগবে কি না। কি মুশকিল! এটা নিবো কি না সেই সিদ্ধান্তই তো নিতে পারছি না। শেষমেশ রোমেলদার করা সুন্দর প্রচ্ছদটার লোভেই অনেকটা ইথাকা নেওয়া। এবং এ পর্যন্ত বইমেলার নতুন বইগুলোর মধ্যে আমার পড়া সেরা বইটা হলো ইথাকা।
বইয়ের জনরা কী সেটা নিয়ে বেশি কথা বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যায়। সুতরাং সে আলোচনা বাদ দেই। বইয়ের প্রথম অর্ধেক একটা পরিবারের খুব মিষ্টি একটা গল্প বলে। দাদী-চাচা-ফুপু-কাজিন সবার বিচরণে জমজমাট আড্ডা। যেকোনো পারিবারিক আসরে স্মৃতিকাতর বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ফেলে আসা সোনালী অতীতের স্মৃতি রোমন্থন, বাবা-চাচাদের চায়ের কাপে ঝড় তুলে দেশ ও দশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ আর ছোটদের এক কোনায় গিয়ে ফুসুরফাসুর - এই দৃশ্যের সাথে আমরা কে না পরিচিত৷ এই বহুল পরিচিত ঘটনাগুলোকেই লেখক খুব মায়ায় জড়িয়ে তুলে ধরেছেন তার লেখায়। তবে এই পরিবারের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তাদের পূর্বপুরুষ ব্যারিস্টার নেওয়াজ চৌধুরী ওরফে তেরপল ব্যারিস্টার আর তার স্ত্রীর রহস্যময় অন্তর্ধান। বইয়ের পরের অর্ধেক এই রহস্য সমাধানের দুর্দান্ত গতির থ্রিলার। সুন্দর একটা পারিবারিক গল্প আর যুদ্ধ পূর্ববর্তী স্মৃতিচারণা থেকে কখন যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে কোথায় চলে গেলাম টেরই পেলাম না। গল্পের বিষয়াবলির ট্রানজিশন এতোটাই স্মুথ।
কাহিনী ছাপিয়ে এই বইতে যে জিনিসটা সব থেকে বেশি উপভোগ করেছি সেটা হলো লেখনী৷ বইয়ের প্রথম অংশটা পড়তে গিয়ে কোথায় একটা আরাম আরাম অনুভূতি পেয়ে গিয়েছিলাম। এতো সুন্দর সাবলীল লেখনী! গল্পের কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলেও আরামসে পড়ে যেতে পারতাম আরো একশো পৃষ্ঠা। পাগলাটে, ক্যাওটিক গল্প বলার জন্য লেখকের খ্যাতি আগেই শুনেছিলাম। এবার হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। কমফোর্টিং আর ক্যাওটিক- এই দুই এর অদ্ভুত মিশেলে ঘরে ফেলার গল্প এই ইথাকা। জাহিদ হোসেনের আগের বই নৈঋতেও খেয়াল করেছিলাম পুরোনো দিনের ইংরেজি গানের প্রতি লেখকের ট্রিবিউট, এই বইতেও দেখলাম। গানপাগল মানুষ হিসাবে এটাও বাড়তি পাওয়া। ফ্রাঙ্কি ভাল্লির Can't take my eyes off you শুনতে শুনতে চকচকে পাঁচ তারা দিয়ে বইটা রেকমেন্ড করে গেলাম।
জাহিদ হোসেনের অধিকাংশ মাথা আউলানো "আমি কে আমি কুতায়" মার্কা চোয়ালঝুলানো মহাকাব্যিক উপন্যাসগুলো শেষ করলেই আমি সর্বপ্রথম যে মিশ্র-অনুভূতিটা বোধ করি, 'ইথাকা'র ক্ষেত্রেও সেটা খুবই সত্যি, আর তা হলো: পুরো কাহিনি অ্যাতো অসাধারণ সুন্দর ভাবে সুচিন্তিততার সঙ্গে সুকৌশলে সাজিয়ে গুছিয়ে একদম উপযুক্ত একটা সুনির্দিষ্ট পেসিং-এ বিল্ডাপ হয়ে পাঠককে হালকা ছলে গল্পবলার ভঙ্গিতে একটু একটু করে জটিল থেকে মহাজটিলতার মন্ত্রমুগ্ধকর রহস্যের জালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে শেষের দিকে এসে বইটা একেবারে আচমকা এমনই হুড়মুড় করে ঝড়ের বেগে একের পর এক নাটকীয়-অতি নাটকীয়তার মোড় নিতে নিতে রহস্যভেদের উপর সোয়া রহস্যভেদ উন্মোচন করতে করতে পাঠকের মাথায় উপর্যুপরি হাতুড়ির বাড়িতে দিকবিদিক দিশেহারা করে দিয়ে কী হচ্ছে কীভাবে হচ্ছে কেন হচ্ছে (বা এতোদিন হয়ে এসেছে) ঠিক মতো হজম করতে দেয়ার বা বুঝতে দেয়ার আগেই কানফাটানো দুম ফটাস শব্দে টায়ার ফাটার মতো মোটা দাগের কিছু চরম ঘটনা ঘটিয়ে গল্পটা ঠাস করে শেষ করে দেয়া হয়। সেই বই ৪৫০-পৃষ্ঠার, ৬৫০-পৃষ্ঠার বা ২১০-পৃষ্ঠার হোক, একই অবস্থা।
অন্য লেখকদের ক্ষেত্রে যেখানে বিরক্তি জাগে অযথা টেনে ঝুলিয়ে দেয়ায়, এক্ষেত্রে পাঠকের উল্টো কেবল আফসোস হচ্ছে অন্তত আরো ৫০-১০০ পৃষ্ঠা বেশি সময় নিয়ে আরো মসৃণ সহজাত ভঙ্গিতে ধীরস্থিরতার সঙ্গে বইয়ের বাকি অংশের স্টেডি পেসিং-এ সামঞ্জস্যতা রেখে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ শেষাংশটির কাহিনিবিন্যাস ও ক্রমবিকাশ করার খুব প্রয়োজন ছিল। এহেন দারুন সুখপাঠ্য, উদ্ভটকিম্ভুত হৃদয়ছোঁয়া মন খারাপ করে দেয়া অতীতকে খোঁজার আখ্যানের মায়াজালের ঘোরে পুরোটা সময় পাঠককে ডুবিয়ে রাখা উপন্যাসটির আরেকটু ন্যাচারাল প্রগ্রেসনের গোছানো অমোঘ অন্তিম সমাপ্তি প্রাপ্য ছিল। যা ঘটেছে যেকারণে ঘটেছে (আগে বা পরে) সবই ঠান্ডামাথায় বুঝে হজম করে নেয়া সম্ভব, কিন্তু যেগতিতে যেভঙ্গিমায় ঘটেছে সেটা পুরো উপন্যাসের টেনে ধরে রাখা মন-উদাস-করা-নিঝুম-বিষাদময়-নস্টালজিক আবহ পরিবেশটাকে শেষে এসে রীতিমত হলিউড ব্লকবাস্টার স্টাইলে বোম্বাস্টিক বেমক্কা ধাক্কায় অনেকটাই উড়িয়ে দিয়েছে। যাকে বলে টোনাল হুইপ্ল্যাশ।
যাইহোক, রিভিউ বা রিঅ্যাকশনের নামে দুনিয়ার আগামাথাহীন হাবিজাবি কিছু কথা লিখলাম। ব্যাপার না। এই বইটা সকল পাঠকদের সম্পূর্ণ স্পয়লারবিহীন ভাবেই পড়তে রেকমেন্ড করব। জনরা-ফনরাও জানার প্রয়োজন নেই (আমাদের বাস্তবজীবনের জনরা কি আমরা জানি?)। একদম গোড়া থেকে গল্পকথকের সঙ্গে কিচ্ছুটি না জেনে এলোমেলো আপাত:উদ্দেশ্যহীন ঘুরেফিরে একটু একটু করে সুতো ধরে কাহিনির ভেতরে প্রবেশেই প্রকৃত তৃপ্তি। একই কথা আগেও অনুধাবন করেছি আবারো নতুন করে উপলব্ধি করলাম, লেখক জাহিদ হোসেনের উষ্ণ আরামদায়ক হালকামেজাজের সহজাত হাস্যরসমাখা বৃষ্টির দিনে জমিয়ে গল্প বলতে বসা গল্পকথনের কোনো তুলনা হয় না। পুরোটা সময় মনে হয়েছে যেন গল্পকথকের এইরকম এলোমেলো ঘুরাঘুরিতে বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে অজস্র বিক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে দাদা-দাদির অন্তর্ধানের কারণ বের করার ইতস্তত চেষ্টা ও তার পরিবারের নিত্যদিনের অতি সাধারণ সব ঘটনাই আমি যেন হাজার পৃষ্ঠা পড়ে ফেলতে পারব কোন ক্লান্তি ছাড়াই। শেষে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে তাড়াহুড়োর এলোমেলো সমাপ্তির কারণে এই অনুভূতিটাই আরো জোরালো হয়েছে, এই আরকি।
আমার রেটিং: শেষাংশের অতৃপ্তিটুকুর পরে, ৩.৫/৫।
বি:দ্র: একটা জিনিস চিন্তা করে তাজ্জব হয়ে যাচ্ছি, ক্লাসিক ব্রিটিশ সাইফাই সিরিজ ডক্টর হু'র সেই লিজেন্ডারি লাল টেলিফোন বুথের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের খুঁটিনাটি বিস্তারিত সহ ঘটনাপ্রবাহ একসুতোয় সীমলেসলি সমন্বয় করার আইডিয়া কী করে কারো মাথায় আসতে পারে... বাস্তবিকই বলিহারি জাহিদ হোসেনের তারছিঁড়া চিন্তাভাবনার!
বি:বি:দ্র: গল্পকথকের পিএইচডি সুপারভাইজার প্রেমকাহিনির বেস্টসেলার লেখক জন লে ক্যারে আর প্রজেক্ট অপারেশন্স চিফ টিমোথি ডালটনের নামগুলো পড়ে সেই মজা পাইছি! :v
'কেউ উঁচুতে উঠতে ভয় পায়, কেউ তেলাপোকা ভয় পায়, কেউ আলো ভয় পায়, তো কেউ অন্ধকার ভয় পায়। শান্তশিষ্ট মানুষ হঠাৎ হিংস্র হয়ে গেছে। এ ধরনের কেস প্রচুর। সব দোষ টেলিফোন বুথের; আমেরিকার।'
'৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শীতল যুদ্ধ, টেলিফোন বুথ, কমিউনিস্ট ও সাম্রাজ্যবাদ দ্বন্ধ, লন্ডন প্রবাসী সুন্দরী তরুণী লিসি, উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য লন্ডনে যাওয়া জায়েদ চৌধুরী, নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের ভ্রমণ, মানস সরোবব আর ইথাকায় সৃষ্টির রহস্যের আদি প্রাণ অদ্ভুত এক গাছের রহস্য, এলিয়েন, তেরপল ব্যারিস্টার নেওয়াজ চৌধুরী আর তাঁর স্ত্রী সুফিয়ার হারিয়ে যাওয়ার রহস্য, আমেরিকার এফবিআইয়ের সম্পৃক্ততা' সবমিলিয়ে অসাধারণ থ্রিলার পড়ে শেষ করলাম। আমার পড়া জাহিদ হোসেনের প্রথম বই 'ইথাকা'।
প্রথম ৭০ পৃষ্ঠা গল্প একটু ধীরগতিতে এগিয়েছে; ৭০ পৃষ্ঠার পর থেকে গতি বড্ড দ্রুত ছিল। এত দ্রুত কাহিনি না এগোলেই বরং বেশি ভাল্লাগতো। সুখপাঠ্য আর প্রাঞ্জল বইটা গতকাল রাত ২টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত অবিশ্রান্তভাবে পড়ে শেষ করেছি।
রাতে ঘুম হারাম করে দেয়া বইয়ের স্মৃতি মনে থাকবে। লেখকের 'নৈর্ঋত' বইটা পরবর্তীতে পড়ব। লেখকের থেকে এমন আরও থ্রিলার আশা করছি। পরবর্তী বইয়ের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।
সহজ কথাবার্তা। বাড়ি বলতে আমরা কি বুঝি? জড় পদার্থ দ্বারা চারদেয়ালে আবদ্ধ একটা ঠিকানাকে। কিন্তু আসলেই কি তাই? মানুষ জন আসলে ভাবে বাড়ি একটা ফিজিক্যাল প্লেস। বাড়ি হলো বাড়ির মানুষগুলো। বাবা, মা, ভাই, বোম, স্ত্রী, সন্তান। ওরা যদি না থাকে, সেই বাড়ি বাড়ি না।
আরে কি ভাই, কি শুরু করলেন। বাড়ি নিয়ে এত জ্ঞান দেয়ার কি আছে। কাট দ্য ক্র্যাপ অর্থাৎ ফালতু কথা বাদ দেন। আচ্ছা বাড়ির হিসাব বাদ দেই। চলেন টেলিফোন বুথের গল্প করি। লাল টকটকে একটা টেলিফোন বুথ। যেখানে ঢুকলে যোগাযোগ করা যায় দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল বা আন্তনিও মেউচ্চি কি জানতেন তারা দুনিয়া বদল করতে চলেছেন? তারা জানেন বা না জানেন, দুনিয়া কিন্তু বদলে ফেলেছেন। আমাদের ইথাকার টেলিফোন বুথও বেশ কিছু সময়ের জন্য আমাদের মাথার স্বাভাবিক কার্যক্রমের বদল আনতে চলেছেন। কারণ বই শেষ হওয়ার পর ভোঁ ভোঁ শব্দ শুনতে হবে বেশ কিছু সময়ের জন্য। যা হোক, ভয় পেয়েন না। আমার রিভিউ মুন্নাভাই এমবিবিএস এ সার্কিটের বলা লেজেন্ডারি ডায়ালগ “আরে ভাই, ইয়ে তো শুরু হতে হতেই খাতাম হো গ্যায়া” এর মত হয়নি। অর্থাত, পিকচার আভি বাকি হ্যায় ভাইলোগ। পপকর্ণ না পেলেও চানাচুর হাতে নিয়ে বসুন। রাইড বেশ বাম্পি হতে যাচ্ছে।
বইয়ের শুরু আধুনিক সময়েই। তেরপল ব্যারিস্টার নেওয়াজ চৌধুরীর নাতি জায়েদ খান এসেছেন লন্ডনে পিএইচডি করার জন্য। ঘটনাক্রমে তার হাতে আসে একটা ডায়েরি। যেই ডায়েরি ঘুরিয়ে দিতে যাচ্ছে তার জীবনের মোড়।
কাহিনীর কর্তা ব্যারিস্টার তেরপল চৌধুরী লোকটা সম্পূর্ণ অদ্ভুতুরে টাইপের লোক। জন্ম দেশে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত গমন করেছিলেন। শিক্ষার সঙ্গে বিলেতি আদবকায়দা ও নিজের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আজব কোনো এক কারণে টেলিফোন বুথের প্রতি তার ছিলো অন্ধ ভালো লাগা। ঘটনাক্রমে ছিটেল এই ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে লাল রঙের একটা টেলিফোন বুথ বসানো হয়। জানা যায় এই বুথ উপহার পাঠিয়েছে কিংবদন্তি এফবিআই চিফ এডগার হুভার। কেন হুদাই আমেরিকা এত কিছু বাদ দিয়ে টেলিফোন বুথ পাঠালো কেন?
এদিকে শাঁখারীবাজারের মানুষ জন হঠাৎই পাগলাটে হয়ে যাচ্ছে। যে জীবনে একটা মাছিও মারেনি সেও ভায়োলেন্ট হয় যাচ্ছে। অনেকেরই বিভিন্ন ফোবিয়া ট্রীগার করে জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল। এসবের রহস্য কি?
কোথায় হারিয়ে গেলেন তেরপল ব্যারিস্টার আর তার স্ত্রী এলিয়েন রহমান থুড়ি সুফিয়া রহমান? কিই বা খুঁজে ফিরছিলেন গণঅভ্যুথানের সেই উত্তাল, বিক্ষুব্ধ সময়ে? তারা যে জিনিসের সন্ধান করছিলেন, সেটা কী খুঁজে পেয়েছিলেন?
জায়েদ খান কী পারবে এসব রহস্যের সমাধান করতে? নাকি নিজেও হারিয়ে যাবে এসব গভীর রহস্যের চোরাবালির নীচে? ঘটছেটা কি আসলে?
আমার সাধারণত রিভিউ লিখতে খুব একটা পরিশ্রম হয় না। কিন্তু ইথাকা আমাকে ভীষণ বিপদে ফেলে দিয়েছে। কিভাবে কী শুরু করবো, বা কী লিখলে রিভিউটা যুতসই হবে এটা মাথায় কাজ করছে ���া। আর এর পিছনে সম্পূর্ণ ক্রেডিট লেখক সাহেবের৷ প্রথমেই বলতে হয় গল্পের কথা। এরকম সহজ সরল থেকে গরল গল্প লেখকের মাথা থেকে কীভাবে বের হলো এটা আমার জানার ইচ্ছে আছে। শুরুতে মনে হবে সহজ সরল গল্প। হালকা উত্তেজনা দিয়ে শুরু হবে। খুব কঠিন কিছু না। খুনোখুনি রক্তারক্তির ব্যাপার স্যাপার নেই। হারিয়ে যাওয়া দুজন মানুষের গল্প।এক ধাঁচে লিখে গিয়েছেন গল্প। শ’খানেক পেজ অমোঘ এক আকর্ষণে উলটে যাবেন। কিন্তু কি হচ্ছে সেটা সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনো ধারণা পাওয়া যাবে না। যেন কেউ আপনাকে সমুদ্রের তলায় নামিয়ে দিয়েছে, ভীষণ সুন্দর সেসব দৃশ্য উপভোগ করছেন কিন্তু অদৃশ্য একটা চাপও আপনার উপরে কাজ করছে। বইয়ের শুরু হয়েছে যদিও আধুনিক সময়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে নিয়ে যাবে এক ধাক্কায় পূর্ব পাকিস্তানের টালমাটাল ঝঞ্চাবিক্ষুদ্ধ সময়ে। গণ অভ্যুত্থান, আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সবই চলে এসেছে গল্পের ভেতরে। সেই সঙ্গে যুক্ত হবে কোল্ড ওয়ার, বিশ্ব রাজনীতি। একই গল্পের ভেতরে গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, কোল্ড ওয়ার, হারানো মানুষ, কিঞ্চিৎ মিথলজি কী নেই? আরো কিছু রয়েছে যা নিয়ে আলোচনা করলে সম্পূর্ণ স্পয়লার হয়ে দাঁড়াবে। তাই আর ওই রাস্তায় হাঁটলাম না। কিন্তু এত দুর্দান্ত গল্পের জন্য লেখককে মন থেকে সাধুবাদ রইলো।
আমাদের দেশে প্রচুর মৌলিক বই লেখা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গল্পের প্লট ভালো হলেও হয় লেখনী ভালো হয় না, কখনো এক্সিকিউশান ভালো হয়না, বা এন্ডিং দেয়া হয় গোজামিল দিয়ে বা স্রেফ ভাষার মাধুর্যের অভাবেই কিছু বই পড়তে ভালো লাগে না। ইথাকা, এক অদ্ভুত গল্প। এই গল্প ভালো লাগানোর জন্য প্রয়োজন ছিল অসাধারণ লেখনীর। যেখানে যতটুকু শব্দ বা বাক্যের প্রয়োজন, যতটুকু কমিক বা অন্যান্য এলিমেন্টের প্রয়োজন, লেখক সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। শুধু তার লেখায় মুগ্ধ হয়েই এই বই আরামে শেষ করে ফেলা যায়। একই সকয়ে দুটো সময়ের গল্প চলছে, সেটাকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। সেই সঙ্গে তিনি গল্পটা যেভাবে প্রেজেন্ট করেছেন, মারহাবা না বলে উপায় নেই। দুটি সময়ের গল্প, দুটি সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুটি ভিন্ন সময়ের গল্প এক বিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছে, এবং কোনো অভিযোগ ছাড়াই সেই গল্প উপভোগ করা যাচ্ছে এমনটা খুব কম বইতেই পাওয়া যায়। তিনি এইক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সফল।
কোনো একটা মুভিতে ডায়লগ শুনেছিলাম, “পেয়ারমে লজিক নেহি হোতা, স্রেফ ম্যাজিক হ্যায়, ম্যাজিক।“ বা এমনই কিছু একটা। এই হইটা হচ্ছে ম্যাজিক। পুরনো অন্তর্ধান রহস্য যে কখন কোথায় কোন এঙ্গেলে আপনাকে কল্পনার জগতে তুলে ভীষণ একটা আছাড় মারবে আপনি টেরও পাবেন না। ইথাকা নিয়ে অনেক কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, আমার মাথার শব্দসম্ভার সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গিয়েছে। বিচার বিশ্লেষণ বা ভুল ত্রুটি, প্রশংসা জানানোর জন্য মস্তিষ্কের যে অংশ কাজ করে সেটা বোধহয় সিয়েস্তায় ব্যস্ত। তাই আধখামচা রিভিউ আর বড় করতে চাইলাম না। শুধু একটা কথাই বলবো, পড়ুন।
“মানুষজন ভাবে বাড়ি হল একটি ফিজিক্যাল প্লেস। ভুল। বাড়ি হলো বাড়ির মানুষগুলো। বাবা, মা, ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী। ওরা যদি না থাকে তবে সেই বাড়ি বাড়ি না।”
আরেকবার মুগ্ধ হলাম জাহিদ হোসেনের লেখাতে। পুরো গল্পটাই অনন্য, সুন্দর। গল্পের কথা একপাশে সরিয়ে রাখলেও জাহিদ ভাইয়ের লেখা একটানা পড়ে যাওয়াও বেশ আনন্দের ব্যাপার। বইটা ধীরেসুস্থে পড়েছি, যাতে দ্রুত শেষ না হয়ে যায়। তেরপল ব্যারিস্টার নেওয়াজ চৌধুরীর অন্তর্ধান ও পরিণতি কষ্ট পেয়েছি। জায়েদ চৌধুরীর রহস্য সমাধানের জন্য হার না মানা মানসিকতা বেশ লেগেছে। আর শেষে সব রহস্যের সমাধান... বেশ চমক জাগানিয়া। নৈঋত, গিলগামেশের পর আরও একটা দারুণ কাজ ইথাকা।
অতিরিক্ত প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে গল্পটা ভাত রাঁধতে গিয়ে মহাকাশে চলে যাওয়ার মত হয়ে গেল। সহজ কথা সহজ ভাবে বলাটা যে কতটা কঠিন তার পার্ফেক্ট উদাহরণ এই বই। ঝরঝরে ভাষার গুনে তিন তারা দিলাম।
দুর্দান্ত! কাহিনী শুরু করার পর জাহিদ হোসেন সাহেব শেষদিকে এসে যেভাবে মোচড় দিয়েছেন তা ভাবতেই পারি নাই। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণ অভ্যুত্থানের ইতিহাস, নেপাল, তিব্বতের মানস সরোবর, পাগলা তেরপল ব্যরিস্টার, লাল টেলিফোন বুথ, কন্সপিরেসি থিওরি, স্পিরিচুয়ালিটি এবং কিছুটা মিথ সবকিছু এক মলাটে হাজির করেছেন লেখক। আর লেখার মাঝে চিরাচরিত জাহিদীয় স্টাইলে গানের লিরিক্সের ব্যবহার তো ছিলই। মুরাকামি এর ও গানের লিরিক্স আর রেফারেন্স টানার অভ্যেস আছে। তবে, জ্যাজ মিউজিক অত শুনি নাই। তাই মুরাকামির ব্যবহারকৃত গানগুলা হয়ত অতটা গভীরে অনুভব করতে পারি না। কিন্তু, জাহিদ হোসেন সাহেবের ব্যবহৃত গানগুলো একদম নিজেদের গান। বেশ লাগে পড়তে। কাহিনীর মধ্যেভাগে এসে মনে হচ্ছিল যে বইটা শেষ করার বিষয়ে একটু তাড়াহুড়ো করেছেন, ব্যাপ্তি আরেকটু বাড়তেই পারত। শেষ ৪০ পৃষ্ঠা পুরো রকেটের গতিতে এগিয়েছে। প্লট সম্পর্কে ডিটেইলে বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে। তবে এইটুকু বলতে পারি, একটা রোলার কোস্টার রাইড উপভোগ করতে চাইলে বইটা অবশ্যই রেকমেন্ডেড। বইমেলার অপেক্ষা সার্থক!
শুরুর দিকে পারিবারিক কাহিনী। এরপর দেখলাম থ্রিলার। এরপর কী যে শুরু হল। কোল্ড ওয়ার, মুক্তিযুদ্ধ, কনস্পিরেসি থিওরি ও গোয়েন্দাবৃত্তি ছাপিয়ে গল্প শেষমেষ গিয়ে কোথায় ঠেকে তা পড়লেই বুঝবেন। একটা মানুষ কি পরিমাণ কাহিনী একসাথে মাথায় রাখলে এরকম সুন্দর গল্প ফাঁদতে পারেন?
ইথাকা শব্দটা গ্রিস ও ট্রয় যুদ্ধের বীর ওডেসিউস এর কাহিনীতে পড়েছিলাম কয়েক বছর আগে। এটা এই যোদ্ধার ঘর। যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরতে সময় লেগে যায় অনেক বছর। প্রচুর প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে শেষমেষ ঘরে ফেরে সে। এই বইতেও নামকরণের সার্থকতা খুব ভালো লেগেছে।
ভালো লাগল। হিস্ট্রি, থ্রিলার, ফ্যান্টাসি মিশিয়ে জাহিদ সাহেব যে ভিন্ন জনরা তৈরীর এক্সপিরিমেন্ট চালাচ্ছেন তা উপভোগ্যই মনে হলো। ঝরঝরে ভাষার গুনে বেশ দ্রুতই শেষ দিলাম।
জাহিদ হোসেন নির্দ্বিধায় আমার পছন্দের লেখকদের একজন। থ্রিলারের মাঝে এমন করে উৎকৃষ্ট হাস্যরসের সাথে একটা অন্তর্লীন গভীর জীবনবোধ আর কেউ বিঁধিয়ে পারেন বলে আমার মনে হয়না। ইতিহাস, পুরাণ আর পপ-কালচ��র মিশিয়ে দারুণ সব সুস্বাদু গল্প তিনি তৈরী করেন।
'ইথাকা' কে নিয়ে বেশি কিছু বলবোনা। শুধু মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ করতে বলছি- এমনভাবেও যে কেউ কল্পনা করতে পারে তা আমার ভাবনার বাইরে ছিলো। ফ্যান্টাসির উপাদান দিয়ে লেখা বইটি আক্ষরিক অর্থে ফ্যান্টাসটিক হলেও বইটি স্মরণযোগ্য এর মধ্যে নিহিত অনুভবনীয় মানবিকতার কারণে। ইউলিসিসের মতো দিনশেষে আমরা সবাই ঘরে ফিরতে চাই, আমাদের সবার ই মঞ্জিল হোম সুইট হোম অথবা ইথাকা!
"If you missed the train I'm on You will know that I am gone You can hear the whistle blow a hundred miles.."
অনিন্দ্যসুন্দর 'ইথাকা' ছিল গ্রীক বীর ওডিসিউস এর জন্মভূমি। সুদীর্ঘ ট্রয় যুদ্ধের পরে জন্মভূমিতে ফিরতে তার সময় লেগেছিল প্রায় দশ বছর। তাই ইথাকা মানেই যেন ঘরে ফেরার গান, চিরচেনা গন্তব্যে ফিরে আসার সুর...। তবে কি জাহিদ হোসেনের 'ইথাকা'ও কারো ঘরে ফেরার গল্প? হয়তো হ্যাঁ, অথবা না।
থ্রিলার বই ভেবে 'ইথাকা' পড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু বইটা পড়ার পরে, এ বিষয়ে নিজেকে কেমন দ্বিধান্বিত লাগছে। ইথাকাকে ঠিক কোন জনরায় ফেলা যায়? এর পটভূমি তো কেবল থ্রিলারে আটকে নেই, ছড়িয়ে গেছে আরো অনেক জনরার মাঝে, ব্যাপ্ত হয়েছে সীমা থেকে অসীমে, ভূমি থেকে শূন্যে। বাংলায় এরকম ধাঁচের আর কোনো উপন্যাস পড়েছি বলে ঠিক মনে পড়ছে না। দেশভাগের সময়কাল থেকে পাকিস্তানি আমল, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্���ান এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী সদ্য প্রসূত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ; ইথাকা সবকিছুকেই ছুঁয়ে গেছে।
ইথাকার গল্প শুরু হয়েছে ঢাকার শাখারীবাজারের নামজাদা 'চৌধুরী' পরিবারের মধ্য দিয়ে। সেটা তো শুরুমাত্র...তারপর এর ব্যাপ্তি ছড়িয়ে গেছে বহুদূরে। কিছু অজানা রহস্য, কিছু অস্বাভাবিক অন্তর্ধান, কিছু না বলা গল্প, এসবের মাঝে 'প্রশ্ন কিংবা উত্তর' হয়ে দাড়িয়ে থাকে একটা কটকটে লাল রঙের টেলিফোন বুথ। সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে দুলতে থাকা কিছু প্রশ্ন কিংবা রহস্যের গল্প, লেখক সহজভাষায় বলে চলেন নিজস্ব ঢঙে। সরলরেখায় চলতে থাকা সহজ গল্প হঠাৎই মোড় নেয় কিছু জটিল,অবিশ্বাস্য, অস্বাভাবিক চমকে। গল্পের গরু নাকি গাছে ওঠে, কিন্তু ইথাকার গল্পের গরু গাছ ছেড়েও উঠে গেছে আরও ওপরে এবং এই কাজ লেখক করেছেন, বেশ সচেতন ভাবেই। পড়তে পড়তে অস্বাভাবিক সব চমক হজম করতে না পারলেও, গল্পের জোয়ারে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে থামানো বেশ মুশকিল।
ইথাকার গল্প বলার ভাজে, চোখে পড়ে সেই সত্তর দশকের পুরান ঢাকা, শাখারীবাজার, ইসলামপুর এলাকার একটা আবছা,অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি । এসব জায়গার সাথে নিজের একটা নিজস্ব চেনা-জানা থাকায় লেখকের সাথে গল্পের তোড়ে হারিয়ে যেতে কোনো অসুবিধাই হয় নি।
গল্পের কোনো স্বাভাবিক-ফ্লো ধরে না রেখে, কোনো কারণ ছাড়াই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে অযাচিত তথ্য যোগ করে অযথা গল্পকে টেনে লম্বা করার ব্যাপারটা আমার ভারী অপছন্দের। বিশেষত, থ্রিলারের ক্ষেত্রে। বর্তমান সময়ের লেখকদের প্রতি আমার এই অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু ইথাকার ক্ষেত্রে আমার অভিযোগটি উল্টো। ঘটনাপ্রবাহ এতো দ্রুত না হলেই বোধহয় আরও বেশি ভালো লাগতো। বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা হয়তো তাতে বাড়তো, কিন্তু যে সহজ,সুন্দর, স্থির ধারায় গল্প শুরু হয়েছিল , সেটা মনে হলো শেষের দিকে একেবারেই অনুপস্থিত বলে মনে হলো। সবকিছু কেমন যেন খুব দ্রুতই ঘটে চলছিলো। প্লটের কিছু জায়গায় ছোট ছোট 'এরর'ও চোখে পড়েছে। কিন্তু জাহিদ হোসেন জিনিয়াস, পাঠককে গল্পের প্রবাহ ছাড়া হতেই দেন না। একের পরে এক চমক দিয়ে পাঠককে অনেকটা বিভ্রান্ত করে রাখেন। ব্যাপারটা নিয়ে অর্কের ভাষায় চমৎকার একটা শব্দ পেলাম, 'জাহিদীয় ম্যাডনেস'।
আমি থ্রিলারের ভক্ত নই। সবার প্রশংসিত রিভিউ দেখে সিদ্ধান্ত নিই ইথাকা পড়ব। আজকে পড়ে শেষ করলাম। আমি সত্যিই আপ্লুত। অসাধারণ একটা থ্রিলার পড়া হলো।
থ্রিলারের ভক্ত নই বলে একদম যে পড়া হয় না, তা নয়। বেশ কিছু থ্রিলার লেখা আমার পড়া হয়েছে। পড়তে গিয়ে দেখলাম,ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে, তা অনেক আগেই আন্দাজ করে ফেলি। লেখার কোন মাধুর্য নেই। মার মার কাট কাট ব্যাপার। রগরগে ব্যাপার স্যাপার! এসব ঠিক পছন্দ হয় না,ফলে থ্রিলার পড়াও হয় না। এদিক থেকে জাহিদ হোসেন সম্পূর্ণ আলাদা। চমৎকার একটা ভাষা ভঙ্গি। অযথা কোন বাড়াবাড়ি নেই। গল্প নিজের গতিতে এগোতে থাকে। আর মোক্ষম সময়ে এসে একটা একটা মোচড় দেয়। ম্যাডনেস,পিওর ম্যাডনেস।
গল্প যখন শুরু হচ্ছে, কোন ভাবেই মনে হয় নি,এটা একটা চমৎকার থ্রিলার হতে যাচ্ছে। শুরুটা একদম স্বাভাবিক বিলাতে এসে যে ব্যারিস্টার দাদুর খপ্পরে পড়তে হবে তা কে জানত। তারপর আর কিছু দূর পড়ার পর ভাবলাম খানিকটা রহস্যের মিশেল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের একটা উপন্যাস ঘরানার কিছু হয়ত হবে। ওমা! কিসের কি! এটা দেখি অন্য ব্যাপার,সম্পূর্ণ অন্য!! গল্প এমন টার্ন নিসে "ছাগলের ঘাস খাওয়ার দৃশ্য থেকে এক্কেবারে চন্দ্রনাথের পাহাড়ে "। জাস্ট মাইন্ডব্লোয়িং।
জাহিদ হোসেনের লেখার ভাষাটা ও প্রশংসার দাবী রাখে। চমৎকার লেখনী,সহজ সরল ভাষায়। চমৎকার। সবশেষে যে ভালো লাগাটা সেটা হচ্ছে " উৎসর্গ " অংশ। লেখক বইটা বাংলাদেশকে উৎসর্গ করেছেন,এটাই উপযুক্ত ছিল।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে শাখারী বাজারে একটা বাড়ি গড়ে ওঠে। সুন্দর এই বাড়ির নাম ইথাকা।ইথাকাতে বাস করতো চৌধুরী পরিবার। এই চৌধুরী পরিবারের মধ্য মনি তেরপল ব্যারিস্টার নওয়াজ চৌধুরী এবং তার স্ত্রী সুফিয়া।নওয়াজ চৌধুরীর নামের আগে তেরপল শব্দটি যোগ হওয়ার এক অদ্ভুত কারন আছে।
এই ইথাকার কাছাকাছি ফুটপাতে একটা টেলিফোন বুথের স্থাপন করা হয়।এটি ছিল ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদান করা উপহার। এই বুথের প্রতি নেওয়াজ চৌধুরীর এক অদ্ভুত টান ছিল।সেখানে গিয়ে সে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতেও পছন্দ করতেন যা সকলকে অবাক করতো। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই বুথটা ভেঙে ফেলা হলে তিনি খুবই কষ্ট পান। এরপর আবার একটা বুথ নতুন করে স্থাপন করা হলেও তিনি মোটেই খুশি ছিলেন না কারন তার মতে এই বুথটি সবার জন্য অশুভ। এর বেশ কিছু দিন পর শাখারী বাজারের সবাই অস্বাভাবিক ভাবে ফবিয়া আক্রান্ত হতে থাকে।কারো উচ্চতা ভীতি, কারো তেলাপোকা ভীতি,কারো সূর্যের আলোয় ভীতি আবার কারো অন্ধকারে ভীতি। ব্যারিস্টারের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দুইটি জিনিস 'টেলিফোন বুথ' আর 'তার স্ত্রী' একদিন একসাথে নিখোজ হয়ে গেল! তার কিছু দিন পর তিনিও নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। এই সকল রহস্যের সমাধানে আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়ে ব্যারিস্টারের পৌত্র জায়েদ চৌধুরী। সে সম্মুখীন হয় অনেক সত্যের অনেক অজানা রহস্যের।
বইটা বেশ ভাল থ্রিল দিয়েছে।এক বসায় শেষ করার মতো একটা বই।আর কভার টা জোস।
'আমার দাদা আমার দাদীকে খুন করেছিলেন'- লোকমুখে এমনই প্রচলিত। দাদা ব্যারিস্টার নেওয়াজ এরপর থেকে নিখোঁজ। দাদী সুফিয়ার লাশ কেউ দেখেনি কখনো। সালটা ১৯৭১।
আমি জায়েদ চৌধুরী। আমাদের বাসা শাখারীবাজারের এক পুরোনো বাড়িতে। নাম ইথাকা। একদিন ঘটনাচক্রে দাদার ছোটবোনের এক ডায়েরী হাতে পাই। সেখানে বিচিত্র সব কথা বর্ণনা করা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটা লাল টেলিফোন বুথ এর গল্প। আমেরিকা সরকার থেকে উপহার হিসেবে দেয়া। শাখারীবাজার মোড়ে লাগানো ছিল। কমিউনিস্টদের দাবি ছিল এই ফোন বুথ নাকি মানুষের বিভিন্ন ফোবিয়া বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করছে আমেরিকা। আমার দাদার ও ছিল ক্লস্ট্রোফোবিয়া। সে সময় এ এলাকায় অনেকের এমন সমস্যা দেখা যাচ্ছিল। একিরকম আরও ২ টি ফোন বুথ বসানো হয়েছিল নেপাল আর দার্জিলিং এ।সেখানেও একি ঘটনা ঘটে। আমার দাদা দাবি করেন এই ফোন বুথে ঢুকে এক ভোরে আমার দাদী গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন।
আর আমার এই রহস্য উদ্ধার করেছেন জাহিদ হোসেন। একটি বইও লিখে ফেলেছেন 'ইথাকা' নামে। লেখার হাত খারাপ না। ভালোই আছে দেখছি!
বইটা পড়ে খুব বেশী মাত্রায় উচ্ছ্বসিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হলাম না। তার কারন ফেসবুকে কিছু রিভিউয়ার জনরা এবং কাহিনী যে শেষ কোনদিকে যাবে এইটা লিখেই রিভিউ লেখা শুরু করছিল। সেইটা জানার পরে বইয়ের প্রথম থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম কখন বইটার কাহিনী মোড় নিবে। কোন কিছু না জেনে এই বইটা পড়লে কি দারুণ অভিজ্ঞতা হত সেইটা ভেবে আফসোস হচ্ছে।
এরপরও বইটার মূল কাহিনী এতই চমকপ্রদ ছিল যে একটানে পড়ে গেছি। পজিটিভ সবাই যা বলছে তার বাইরে আপাতত বলার কিছু পাচ্ছি না।
তেরপল ব্যারিস্টারকে চেনা আছে কি আপনাদের? ওই যে মাথায় কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্ত এক ভদ্রলোক স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে খোলা মাঠে তেরপল টাঙিয়ে ব্যারিস্টারি করতেন উনার কথাই বলছি। অদ্ভুত একটা মানুষ ছিলেন, স্বামী স্ত্রী মিলে কি যেন একটা খুঁজে বেড়াতেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতেন, বার হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি খুঁজছেন! একদিন ধুম করেই উধাও হয়ে গেলেন এই লোকের স্ত্রী, তার কিছুদিন পর তিনি নিজেও গায়েব হয়ে গেলেন কোথায় যেন। প্রায় ৫০ বছর পর এই খ্যাপাটে ভদ্রলোকের নাতি দাদার অন্তর্ধানের রহস্য উদঘাটনে বের হলো। সেই যাত্রা নিয়েই এই বইয়ের গল্প।
লেখক জাহিদ হোসেনের সাথে আমার পরিচয় পর্বটা খুব একটা সুখকর ছিল না। ঈশ্বরের মুখোশ পড়ার সময়ে যতটা আনন্দ পাচ্ছিলাম, শেষ করে তার দ্বিগুণ রাগ উঠেছিল। অবশেষে প্রায় বছর দেড়েক পর উনার দ্বিতীয় বই হিসাবে হাতে তুলে নিলাম ইথাকা। এবার আর হতাশা নয়, ভালো লাগার পরিমাণটাই বেশী।
আধুনিক লিভারপুল থেকে একাত্তরের পুরোনো ঢাকায়
গল্পের শুরুটা লিভারপুলে। সেখান থেকে আসা নিজের দাদার বোনের ফোন কল থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। শুরুতে গল্প একটু ঢিমেতালে এগুলেও, লেখকের দূর্দান্ত লিখনশৈলীর দরুণ অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতায় টানা পড়ে গিয়েছি। লিভারপুলে থাকাকালীন সময়ে গল্পকথক তথা জায়েদ চৌধুরীর পারিবারিক ঠিকুজির পাশাপাশি গল্পে এসেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ আর অল্প করে ব্রিটিশ পিরিয়ড আর পাকিস্তান আমলের কথাও। এ জায়গার কিছু অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারলাম না।
"পাবলিক দুই ধরণের। এক হইলো সাধারণ পাবলিক আর দুই, ধুম পাবলিক। সাধারণ পাবলিক তাও মতামত দিতে পারে, সুখ দুঃখের কথা বলতে পারে। কিন্তু ধুম পাবলিক হইলো অস্তিত্বহীন। আমরা ধুম পাবলিক। ভাষা আন্দোলনের সময়ে পত্রিকায় আসছে না রফিক, জব্বার এবং নাম না জানা অনেকে? আমরা হইলাম এই 'নাম না জানা অনেকে'। কখনো সাদা চামড়ার লোকেরা শোষণ করে, কখনো পাঞ্জাবীরা শোষন করে, কখনো নিজের দেশের লোকেরা শোষণ করে।"
যাইই হোক, এরপরেই আমরা চলে পুরোনো ঢাকার শাঁখারীবাজারে। পুরোনো ঢাকার মতোই এই পর্বে গল্পও এগিয়ে চলে পুরোনো সময়ের স্মৃতিচারণ নিয়ে। ডায়েরি পড়া থেকে যে রহস্যের সূত্রপাত তা গিয়ে থামে একেবারে অন্তরীক্ষে!! সাথে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য রেফারেন্স, কিছু গান, আর কিছু কাল্পনিক ইতিহাস। যত পাতা এগুতে থাকে, বই তত ভালো লাগতে থাকে। বেশকিছু চরিত্র আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে। তবে সে চরিত্রগুলোর কোনো নিজস্বতা থাকে না। সবটাই যেন জাহিদ হোসেন। যেকোনো বয়সের যেকোনো চরিত্রই হোক, তাদের সংলাপ, চিন্তাভাবনা সবই হয় জাহিদীয়! সব বইয়ের ক্ষেত্রে না হলেও, এই বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আমার ভালোই লাগে। অতীত রোমান্থনের শেষ দিক থেকে গল্পের লেয়ার দ্রুত চেঞ্জ হতে থাকে। ব্যারিস্টারি থেকে লাল টেলিফোন বুথ, রহস্যময় ফোবিয়া, গাছের বীজ, মহাকাশচারী অনেক কিছুই আসতে থাকে একের পর এক। কোন অংশে ভালোভাবে ফোকাস করবো সেটা বুঝে উঠতেই হিমশিম খাচ্ছিলাম!!
এরপর শুরু হয় অভিযান। নেপাল, তিব্বত, দার্জিলিং হয়ে বাংলাদেশে যখন পৌছুই; রহস্য ততক্ষণে ইগড্রাসিল গাছের মতোই শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে! একের পর এক প্রশ্ন মস্তিষ্কে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। কি হবে সমাধাণ? আবারও কি একটা বিদঘুটে এন্ডিং এর সামনে গিয়ে দাঁড়াবো?
রহস্য উন্মোচন আর কিছু ধাক্কা
বইটা শেষ করার পর গল্প যে কোন জায়গা থেকে কোথায় নিয়ে এনে ফেলেছে আমাকে তা ভেবে আমি রীতিমতো হতভম্ব!! লেখক পুরো বইজুড়েই কি হতে পারে তার একটা ধারণা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভেবেছিলাম শেষে এসে বোধহয় সব ওলট পালট করে দিবেন। কিন্তু তেমনটা হয়নি আর সে জন্যেই বোধহয় নেওয়াজ চৌধুরীর পরিণতি জানতে পেরে একটা ধাক্কা খেয়েছি। ধাক্কা খেয়েছি লিজির অংশটুকু পড়েও। শেষে এবার সব প্রশ্নেরই মোটামুটি যৌক্তিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক। একটু তাড়াহুড়ো মনে হলেও, তাই আমার কাছে এন্ডিংটা ভালোই লেগেছে। এই বইয়ের মূল যে থিম, সেটার কাছাকাছি কিছু ইতোমধ্যেই নসিব জিহাদীর অরিত্রিকা আর ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন এ পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে ওই দুইটা বইয়ের চেয়ে এটার এন্ডিং বেটার লেগেছে। এছাড়া জাহিদ হোসেনের খ্যাপাটে কিন্তু মুগ্ধতাময় লিখনশৈলী তো ছিলই। এই লোকের লেখা পড়াটাও একটা ট্রিটের মত।
ব্যক্তিগত রেটিং: ৮.৫/১০ (বইটায় আসলে অনেকগুলো ব্যাপার এনেছেন লেখক। শক্ত গাঁথুনির গল্প যাদের পছন্দ তাদের হয়তো ভালো নাও লাগতে পারে। কারো কারো কাছে এতোকিছুর সম্মিলন পাগলামো মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটাই বরং ভালো লেগেছে )
প্রোডাকশন: আলাদা করে তেমন কিছু বলার নেই প্রোডাকশন নিয়ে৷ সব গতানুগতিক। কিছু বানান ভুল ছিল। প্রচ্ছদটা অসম্ভব সুন্দর লেগেছে। আমার বুকমার্ক ব্যবহারের অভ্যেস নেই, তাই দুশো পাতার বইয়েও ফিতা না দেয়াটা আমার জন্য বেশ সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এখনকার অনেক প্রকাশনীই বইয়ে ফিতার পাশাপাশি বুকমার্কও দেয়। আবার সবকিছুর পর দামট��ও থাকে আফসার ব্রাদার্সের চেয়ে কমই। আরেকটু পাঠকবান্ধব হওয়া উচিত এই প্রকাশনীটার।
অসাধারণ এক বই পড়ে শেষ করলাম। ফ্ল্যাপে লেখা কিছু শব্দ দেখে বুঝতেই পারবেন না বইটি ঠিক কোন জনরায় পরে। প্রোফেসর জায়েদ চৌধুরীর পারিবারিক কাহিনি দিয়ে গল্প শুরু হলেও এ আপনাকে নিয়ে যাবে সম্পুর্ণ ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর অভিজানে। যেখানে উঠে এসেছে নেপাল,তিব্বতের মানস সরোবর,ভারতের দার্জিলিং এবং ঢাকার শাখাঁরীবাজারসহ নানা অজানা জায়গার রহস্যময় সব ঘটনা। এসব জায়গায় স্থাপন করা হয় আমেরিকা সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো অদ্ভুত উপহার। তা হলো টেলিফোন বুথ। কিন্তু কি আছে এই টেলিফোন বুথে? এই বুথের সংস্পর্শে আসা ব্যাক্তিরাই বা কেন একে একে ভয়ংকর সব ফোবিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে? শুধু এখানেই থেমে নেই। জায়েদ চৌধুরীর দাদি অর্থাৎ সুফিয়া রহমানসহ নেপাল ও দার্জিলিং এর দুই ব্যক্তির একই দিনে রহস্যময় ভাবে অন্তর্ধানের ঘটনাও কি নিতান্তই কাকতালীয়?
বইয়ের প্রথম দিকটা কিছুটা ধীরে এগোলেও শেষে গতি বেড়ে যায়। ঘুম হারাম করে শেষ করলাম ইথাকা। গল্পের মাঝে মাঝে এমন সব লোমহর্ষক অবস্থার মুখোমুখি হবেন যা আপনার কল্পনাতেও ছিল না। অনেক দিন পর দারুণ এক থ্রিলার পড়লাম। হাইলি রেকমেন্ডেড।
জাহিদ হোসেন রচিত আমার পড়া দ্বিতীয় বই 'ইথাকা'। ব্রিলিয়ান্ট লেখক / চিন্তক মুরাদুল ইসলামের ওয়েবসাইটে একটা লেখা পড়েছিলাম "ওডিসি কেন বড় হিরো" শিরোনামে। চমৎকার ঐ লেখায় ওডিসিয়াসের শত যন্ত্রণা, প্রলোভন এড়িয়ে নিজ ভূমি ইথাকায় ফিরে যাওয়ার গ্রেটনেসটা আছে।
জাহিদ হোসেনের 'নৈর্ঋত' পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। ভালো লেগেছিলো। তবে যেকোন লেখকের প্রতিটি বই পড়ার সময় আলাদা মূল্যায়ন এবং পুর্ববর্তি বইয়ের সাথে তুলনায় যেতে আমি সাধারণত কম আগ্রহী থাকি।
এক উন্মাতাল সময়ের ক্ষ্যাপাটে কিছু চরিত্র আছে এই আখ্যানে। তেরপল ব্যারিস্টার নেওয়াজ চোধুরী, তাঁর ফোন বুথ নিয়ে রাজ্যের অবসেশন এবং মাস্টারনী স্ত্রীসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গন্ডগোলে সময়ে আকস্মিক অন্তর্ধান, নাতী জায়েদ চৌধুরীর লন্ডন থেকে ফিরে এসে অনেক না পাওয়া উত্তরের পুনরায় প্রশ্ন তুলা এবং কাজিন লিজিসহ রহস্যোন্মোচনে বেরিয়ে পড়াসহ ২০০ পৃষ্ঠার গ্রন্থে আছে অনেক কিছুই।
১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এক উত্তুঙ্গ সময় গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছে এই উপন্যাসে। লাল ফোন বুথের মূল কাহিনি, নর্স পুরাণের মহাগাছের ব্যাপার-স্যাপার, ভিনগ্রহের সত্তা নিয়ে নাড়াচাড়া লেখকের শুধুমাত্র 'টেলিং' এ চলে এসেছে।
তবে বইটির যদ্দুর প্রশংসা শুনেছি সে হিসেবে অতটাও ভালো লাগে নি। জাহিদ হোসেন একজন প্রতিভাবান লেখক। চেনা গল্পের অলিগলি থেকে বেরিয়ে আপনাকে তিনি নিয়ে যেতে পারেন এক ভিন্ন রাস্তায়। যে রাস্তার মোড় শত চেষ্টায়ও খুঁজে পাওয়া কঠিন। লেখকের লেখনিতে ঐ ব্যাপার ভালোই আছে।
ইথাকা আরেকটু বড় পরিসরে রচিত হলে আমার মনে হয় ভালো হতো। আরেকটু ভালো লাগতো যদি নামকরণের দর্শনের সাথে আখ্যানটা সমান্তরাল হতো। কিছু প্রশ্নের ভ্যালিড উত্তর পাই নি। শেষাংশে লেখালেখিতে একটা তাড়াহুড়ার ভাব চোখে পড়েছে। তাঁর চেয়ে বেশি গোলমাল লেগেছে মোটিভ নিয়ে।
নিঃসন্দেহে প্লট, স্টোরিটেলিং এর গতিশীলতা, নভেলের বিভিন্ন সময়রেখা, লেখনি ইন্ট্যারেস্টিং। তরুণ লেখকদের মাঝে অনেকেই যে ট্রেন্ড ভেঙে কিছু করতে চান তাদের মধ্যে জাহিদ হোসেন অন্যতম।
তবে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া, দ্রুত লেখা শেষ করে দেয়া এবং অ্যখ্যানের মূল থিম সেই ওডিসিয়াসের গ্রেটনেসের সাথে বাড়ি ফিরার সাথে 'ইথাকা' উপন্যাস নামকরণে যতটুকু মিলের দেখা দিয়েছে মূল ভাবের সাথে গল্পকথনে এক্সিকিউশনের অভাবের কারণে পারে নি। বরং সরে গেছে বেশ দুরেই।
বই রিভিউ
নাম : ইথাকা লেখক : জাহিদ হোসেন প্রথম প্রকাশ : একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৩ প্রকাশক : আফসার ব্রাদার্স প্রচ্ছদ : রোমেল বড়ুয়া জনরা : সায়েন্স ফিকশন, মিস্ট্রি, থ্রিলার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
‘দাদা-দাদি কী খুঁজছিলেন, কেন খুঁজছিলেন? কেনই-বা এক গাছের খোঁজে তারা তিব্বতে এসেছিলেন? তারা ওই গাছের চারা বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেনে, লাগিয়েছেন। এই গাছের মাহাত্ম্যটা কী? ওই লোকটাই-বা কেন গাছটা পুড়িয়ে ফেলল? এক নিরীহ গাছের প্রতি কেন তার এত আক্রোশ? আর এ সবকিছুর সাথে টেলিফোন বুথের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কী?’
আপাদমস্তক দেখতে গেলে এই হলো ‘ইথাকা’ উপন্যাসের মূল কাহিনি! রহস্যের জালে আবৃত সব প্রশ্নের উত্তর যখন উদ্ধার করে এক জায়গায় জড়ো করা হবে—তখনই গল্পের সমাপ্তি বুক ফুলিয়ে, মাথু উঁচু করে হাঁটু গেড়ে বসবে। আবদার করবে তাকে গ্রহণ করার। বাকিটা অবশ্য আপনার ওপর বর্তাবে। সেই জট খোলা রহস্যকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বুকে জড়াবেন না কি ভেঙচি কেটে মুখ ফিরিয়ে নিবেন।
আমি অবশ্য একেবারে খুশিতে গদগদ হয়ে বুকে টেনে নিয়েছি। ‘মাই টাইপ’ বলে একটা ক্যাটাগরির নির্মাণ করেছি আমি। অস্তিত্বহীন। সেখানে যা পড়ে-দেখে-খেয়ে আনন্দ খুঁজে পাই—ওগুলো জমা রাখি। ‘ইথাকা’ যে অভিজ্ঞতার সঙ্গী আমাকে করেছে, তা এত সহজে ভোলার নয়। যাহোক, পুরো বইয়ে পাজলের ছড়াছড়ি কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো। লেখকের নির্দেশনা শুরু থেকে তা-ই দিয়ে এসেছে। পূর্বের প্রতিক্রিয়ার মতো ধাপে ধাপে প্রতিটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা নেই। কিছু অযাচিত, অসংলগ্ন বাক্য দিয়ে সাজানো লেখা মাঝে মাঝে তুমুল ভালো লাগার জন্ম দেয়। আমি এই লেখাটা তেমনই রাখতে চেয়েছি। কিন্তু আমার এই লেখাটি তেমন হলেও, ইথাকা সেইরকম একদমই নয়। তাহলে কেমন?
ইথাকা কী? আমার মতে লেখক চেয়েছেন এই শব্দটি আমরা বইয়ে পড়তে পড়তে খুঁজি। খুঁজে নিজ লিখনীতে কুলুপ আঁটি। অন্যকে না জানিয়ে তাকে বরং বইটি পড়ার আমন্ত্রণ দিই। কিন্তু সেই লুকানোর ধারাটা এখনও এই দেশের ভাবাবেগের সাথে সামঞ্জস্য তৈরি করতে পারেনি। অত্যাধিক অ্যাড্রিনালিন রাশের ফলে গদগদ করে সেই কথাটা সবাইকে জানিয়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কেউ যখন বলে—‘আপনি মশাই, মূল কেচ্ছার কই তো তেলে ছেড়ে দিলেন। এখন ��মরা আর সেই তেলে কই ভেজে কী করব? যে কই ভেজেছেন, এখন সেটাই দেন। খেয়ে দেখি স্বাদ কেমন।’ এমন মনমরা কথার পিছে আক্ষেপটুকু না বোঝার কিচ্ছু নেই। এই যে, ইথাকা কী—বইটি মানুষ এখন সত্যিকার অর্থে ‘ইথাকা কী?’ জানার জন্য পড়বে না। পড়বে লেখক ওই ইথাকার অর্থে কোন বিচারে লিখেছেন, আর সেই বিচারটা গল্পের সাথে কতটা যৌক্তিক। যদিও বইয়ের ফ্ল্যাপে ইথাকার পরিচয় লেখক খোদ জানিয়ে দিয়েছেন, কেন দিয়েছেন সেটুকু খুঁজে বের করাটাই পাঠক-কর্তব্য।
‘ইথাকা’ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রচুর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু একটা গোপন বিষয় সম্ভবত কেউ ধরতে পারেনি! একটা চরিত্রায়ন ক্লু। বাক্যের কী হাস্যকর মিশ্রণ তাই না? যাহোক, সেই ক্লু-টি খুব সূক্ষ্মভাবে লেখক ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি দুয়েকবার ওটা নিয়ে বাক্য বিনিময় করেছেনও বটে। যদিও এই ক্লু লেখক নিজে সার্টিফাইড করেছেন কি না জানি না। হয়তো-বা আমারই ভ্রান্ত বিশ্বাস বলে উড়িয়ে দিবেন তুড়ি মেরে। গল্পের সব চরিত্রদের সমাপ্তি টানা হলেও, একটি চরিত্রের মৃত্যু এখনও রহস্য হিসেবে থেকে গেছে। আর সেটি হলো আমাদের গল্পের নায়ক জায়েদ চৌধুরীর প্রপিতামহের স্ত্রী’র। বাকিটা আমি আর খোলসা করছি না। এই নিয়ে দুয়েকটি থিউরি আমার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে বটে।
চরিত্রায়নের কথা যখন উঠেছে, তখন বলে নেওয়া ভালো। ঝড়ের মতো চরিত্রদের আনাগোনা রয়েছে পুরো উপন্যাস জুড়ে। জায়েদ চোধুরীর বংশপরম্পরা সদস্য বাদ দিলেও, পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উদিত হয়েছে নানান চরিত্র। তবে কাউকে হেলাফেলা করার উপায় নেই। নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রত্যেকটি চরিত্র ছিল স্বতন্ত্র। শেষ অবধি যা বহাল তবিয়তে ছিল। ‘ইথাকা’ বইয়ের কাহিনি ফিরে আসার না ফিরে যাওয়ার—তা এক রহস্য। এই যেমন, উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশ গিয়ে হঠাৎ-ই পুরোনো ইতিহাস সামনে এসে পড়াতে জায়েদ চৌধুরীকে ফিরতে হয়েছে নিজ দেশে। কী সেই ইতিহাস?
—সংক্ষেপে বললে, তার দাদা নেওয়াজ চৌধুরী ছিলেন ব্যারিস্টার। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। মানুষটা আগাগোড়া বেয়াড়া রকমের অদ্ভুত। যদিও এমনটা তিনি শুরুর দিকে ছিলেন না। এর সূত্রপাত ঘটে যখন তিনি বিলেত থেকে ফিরে আসেন তখন। ঘটনাক্রমে তাদের শাঁখারীবাজারের বাড়ির নাকের ডগায় একটা টেলিফোন বুথ বসানো হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে পাঠানো উপহার। ঠিক যখন থেকে এই টেলিফোন বুথের সংস্পর্শে আসেন ব্যারিস্টার নেওয়াজ চৌধুরী ওরফে তেরপল ব্যারিস্টর—তখন থেকে ওনার বাতিকগ্রস্থের সূচনা। তেরপল ব্যারিস্টার খেতাবে ভূষিত হন এর পরেই। শুরু করেন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড। এর সাথে জড়িয়ে পড়েন ওনার পত্নী সুফিয়া। তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে কিছু একটার সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে থাকেন এখান থেকে ওখানে। আর সেই সময়টা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের। তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। তখনও এ ভূখণ্ড পরিচিত পূর্ব পাকিস্থান হিসেবে। ঝড়ে বক মরার মতো, মুক্তিযুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে রহস্যময় অন্তর্ধান ঘটে ব্যারিস্টার পত্নী সুফিয়ার। তাকে খুঁঁজতে গিয়ে হারিয়ে যান স্বয়ং নেওয়াজ চৌধুরী। কীভাবে আর কেন? —ঠিক এই রহস্যের সমাধান করতে নিজ দেশে হাজির হয় জায়েদ চৌধুরী। রহস্যের সমাধান করতে করতে একে একে জড়িয়ে পড়ে ত্রিকোণ পাতার জটে জড়ানো একটি গাছের শাখা-প্রশাখায়। যেই গাছ নিয়ে আমি শুরুটা করেছিলাম।
এর অর্থ, যতটা ইথাকা গুরুত্বপূর্ণ—ততটা গাছও! কীভাবে? সেই লম্বা ইতিহাস বইয়ে আছে। আমি বরং অন্যকিছু নিয়ে বলি। লেখকের গল্প বুনট মুগ্ধ জাগানিয়া। তরতর করে পড়ে নেওয়া যায়। শুরু কখন আর শেষ কখন হবে, সেই আন্দাজও আপনি করতে পারবেন না। তাড়াহুড়ো? —একদমই নেই। অনেকে লেখকের মোটাতাজা লেখা পড়তে অভ্যস্থ। হুট করে এমন মেদহীন বই দেখে চোখ কপালে ওঠা স্বাভাবিক। তবে যে দুর্ধর্ষ গতিতে তিনি বইটি লিখেছেন, সেখানে হোঁচট খাওয়ার পরিবর্তে জমা হয়েছে একরাশ মুদ্ধতা। বলতে গেলে বাকি রাখেননি কী? এর পূর্বে ‘নৈর্ঋত’-এ দিয়েছিলেন নব্বই দশকের স্বাদ, এইবার ‘ইথাকা’ দিলো উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বৈশ্বিক রাজনীতি, গবেষণার সাথে হালকা এরিয়া ৫১-এর মিশ্রণ। তবে কি কাহিনিতে কল্পবিজ্ঞানের আনাগোনা আছে? আলবত আছে। লেখকের জনরার মিশ্রণ কতটা নিপুণ তা আশা করি অগোচরে নেই। কখনও থ্রিলারের সাথে হরর মিশ্রণ, কখনও-বা রহস্য উদঘাটনে কল্পবিজ্ঞানে ব্যবহার—সবমিলিয়ে বলতে গেলে ‘ইথাকা’ নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন বা জনরা মেনে চলেনি। গল্পের উত্থান-পতনের ডালাপালা রোমাঞ্চিত করার টোটকা নিয়ে হাজির হয়েছে। পড়তে পড়েত শুধু উপভোগ্যতা বাড়বে বই কমবে না।
পূর্বে সমালোচিত ‘গোঁজামিল’ সমাপ্তির ধার ঘেঁষে হাঁটেনি ইথাকা। ভ্রকুঞ্চন ঘটানোর মতো ঘটনার জন্ম এইবার লেখক দেননি। তারপরেও হয়তো কারো কারো মন ভরবে না। যদিও অভিযোগ করার মতো স্পেস লেখক রাখেননি। এই লেখায় নতুনত্ব আর পুরানত্ব মিলেমিলে একাকার হয়েছে। দুই যুগের সময় চলেছে সমান্তরালে। ছোটো ছোটো অধ্যায়ে যা সাজানো। সবমিলিয়ে ইথাকা কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এক বিচ্ছেদ, বিশ্বাসঘাতকতা আর অস্তিত্ব রক্ষার কাহিনি। ক্ষণিকের জন্য ‘ইথাকা’-কে হুমায়ুন আহমেদের একটুকরো কল্পবিজ্ঞানের সংযোজন মনে হয়েছে বই কী। ওনার গল্পের কিছু থট প্রসেস লেখক দারুণভাবে তুলে এনেছেন। এই যেমন, ‘স্রষ্টার মুখোমুখি হতে হলে সৃষ্টিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তবেই স্রষ্টার মুখোমুখি হওয়া সম্ভব।’ আদতে, ডিস্টোপিয়া বা কল্পবিজ্ঞান ধারায় এই উক্তিটি বেশ জনপ্রিয় আর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘ইথাকা’-তে কোনো এক কারণে উক্ত বিষয়টি উঠে এসেছে। আর এখানেই হুমায়ুনী একটা ফ্লেভার লুকানো। তবে ইথাকা স্বতন্ত্র আর দুর্দান্ত।
বইটির প্রচ্ছদ, এ বছরে আমার পড়া বইয়ের সেরা প্রচ্ছদের তালিকায় অনায়াসে থাকবে। গল্পের প্রেক্ষাপট এত নিদারুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রচ্ছদকার রোমেল বড়ুয়া—তা আর না-ই বা বলি। লেখকের অন্যান্য বইগুলোর প্রচ্ছদ আমার সবসময় পছন্দ। এছাড়া আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত ২০৮ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৪৫০ টাকা। প্রোডাকশন বাহ্যিক সবকিছু ঠিকঠাক হলেও, বানানে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে সেটা পড়ার আবহে তেমন একটা ঝামেলা করবে না। গল্প যখন মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন বাকি সবকিছু এমনিতে আড়ালে চলে যায়।
জাহিদ হোসেনের নিয়মিত পাঠকরা ইথাকা পড়ে অল্প-বিস্তর ধাক্কা খেতে পারেন। তার প্রচলিত রাইটিং স্টাইল হতে ভিন্ন মনে হলো। শুরু থেকেই স্লো মনে হচ্ছিল কাহিনী, প্যারানরমাল প্লট কখন যে সাই-ফাই এ রূপ নিল টেরই পেলাম না! সাই-ফাইটা কিন্তু আবার জটিল বিজ্ঞানের থীওরিওয়ালা না, বলা চলে সার্ফেস লেভেল। ঘটনাপ্রবাহ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকবে, মনে হবে জটিল। কিন্তু সামারি করলে প্লটটা সিম্পলই বটে। টুইস্ট কম, প্রেডিক্টেবল ছিল কেন যেন অনেক কিছু। বোধহয় আগের বইগুলোর জন্যেই আরও জটিল এবং মাথার তারে জট পাকানো প্লট এক্সপেক্ট করেছিলাম, কিন্তু পেলাম এক এক্সপেরিমেন্টাল কাজ। ভালো দিকগুলি বলি- লেখকের রাইটিং স্টাইল মনে ধরবে। শ্লথ গতি হলেও পড়ে বিরক্তি আসবে না। রাইটার অনেক গবেষণা করে তথ্য-উপাত্ত এড করে বাস্তব এনভাইরমেন্ট তৈরি করেছেন প্রতিটা অধ্যায়ে, তাই শ্রদ্ধা জেগেছে মনে। প্রথম অর্ধেকে যে রহস্যময় ভাব এসেছিল তা-ই মূলত আমায় আকর্ষিত করেছিল, শেষ অর্ধেকে মোটামুটি চিরচেনা সাই-ফাই কনসেপ্ট দেখে উত্তেজনা খানিকটা হলেও মাঠে মারা গেল। পরিশেষে, জাহিদ হোসেনের অন্য বইগুলো তুলনায় টানটান উত্তেজনার, কিংবা মাথা নষ্ট করা প্লটের না হলেও, "ইথাকা" ওয়ান টাইম হ্যাপি রিডিং হিসেবে মন্দ না। আউট অব দ্য বক্স জিনিসপাতি আরেকটু থাকলে আর এন্ডিংয়ে তাড়াহুড়ো না থাকলে বোধহয় তৃপ্তির ঢেকুর পুরোপুরি তুলতে পারতাম। তবুও, মন্দ না।❤️ যাই, নৈর্ঋত ধরি।