এইটুকুই? সাহিত্য আর কিছু বলে না? আর ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতার অর্থ কি অন্যের সম্মানকে কালিমালিপ্ত করা? লেখক হওয়াটাই কি জীবনের একমাত্র সাফল্য? জীবনের একমাত্র লক্ষ্য? স্ত্রী-সন্তান-পরিবার কি কিছুই নয়?
বইপাড়া থেকে দূরে থাকা ঐশানী বিখ্যাত লেখকের সন্তান হয়েও এড়িয়ে চলে সাহিত্য জগতকে, এড়িয়ে চলে প্রেমের প্রসঙ্গ। এত বিতৃষ্ণা? দেখা হওয়ার কথাই ছিল না। তাও দেখা হল ঐশানী আর ঋদ্ধির। পরিস্থিতি তাদের দুজনকে জড়িয়ে ফেলল।
ঐশানীর হাত ঋদ্ধিকে এক টানে পনেরো বছর আগের অতীতে কেন নিয়ে গেল? ঐশানীর হাতটা শক্ত করে ধরার আগে কি পনেরো বছর আগের ভীতু ঋদ্ধির জন্য দরজা খোলার প্রয়োজন নেই? এই কাজে শিব ছাড়া আর কে সাহায্য করবে!
এই যাত্রাপথ ঋদ্ধির। ব্যর্থতা থেকে লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার যাত্রাপথ।
"সে ঝড় যেন সই আনন্দে চিত্তবীণার তারে সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত নাচাও যে ঝংকারে।" কালের প্রভাবে জীবন নামক সমুদ্রের মন্থন ঘটে অবিরত। কত হলাহল ওঠে তাতে। কিন্তু তা ধারণ করে নীলকণ্ঠ হওয়ার ক্ষমতা ক'জনের হয়? যাঁরা তা করতে পারেন, জীবন তাঁদের "মৃত্যুমাঝে ঢাকা" অন্তহীন প্রাণের সন্ধান দেয়। সে-ই কি সত্যিকারের অমৃত? আলোচ্য উপন্যাসটিতে লেখক এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন। উপন্যাসটি আত্মজৈবনিক তথা স্মৃতিচিত্রণ-ভিত্তিক। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর বিভিন্ন অংশ প্রকাশিত হওয়ার পর তারা বহুলচর্চিত, নন্দিত, আর অবধারিতভাবেই নিন্দিত হয়েছিল। লেখকের অন্যান্য কাজের সঙ্গে পরিচয় না থাকার ফলে আমার ধারণা হয়েছিল, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত লেখাটি লেখকের প্রোফাইলে দেওয়া সেই অংশগুলোরই সাজানো-গোছানো রূপ হবে। কিন্তু... কী ভীষণ ভুল ছিল আমার ধারণাটি! এই উপন্যাসের দু'টি অংশ আছে। তারা পুরোপুরি সমান্তরাল নয়। কোথাও গিয়ে তারা ডাবল হেলিক্সের মতোই একে অপরকে পুষ্ট করেছে, দৃঢ় করেছে, হয়তো বেশি সৃজনশীল করে তুলেছে। একটি অংশের উপজীব্য হল বইপাড়া, সুমেরু সেনগুপ্ত নামক এক লেখকের কীর্তিকলাপ, আর সুমেরু'র ছায়া থেকে অন্যদের মুক্ত করা তথা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা। "বুঝ লোক যে জান সন্ধান" স্টাইলে এই অংশটার মধ্যে অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে বহু কদর্য সত্য। হাতের কাছে সমার্থ শব্দকোশ থাকলে চরিত্রদের সব্বাইকে চিনেও ফেলতে পারবেন পাঠক— সে যতই ডিসক্লেইমার থাকুক যে 'সব চরিত্র কাল্পনিক'। ফেসবুকে সময়ে-সময়ে এই অংশটিরই টুকরো-টাকরা প্রকাশিত হয়ে তুলকালাম ফেলে দিয়েছিল। তাদের কথা আলাদাভাবে লেখা নিতান্তই অনাবশ্যক। সুধী পাঠক বইপাড়া এবং সুমেরু, জলধি, গোধূলি, পাখি প্রমুখের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হতে চাইলে বইটি ঝট করে কিনে ও পড়ে ফেলুন। এটির সঙ্গে লেখকের দিনযাপনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বইকি। মানুষ হিসেবে ভালো-মন্দ মিলিয়ে তিনি কেমন তা কল্পনার আবরণের মধ্য দিয়েও দেখা দেয় এই অংশটিতে। তবে সে-সবই তাঁর ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ। অন্তত আমার মতে, লেখকের সাহিত্যিক রূপটি ধারণ করেছে এই বইয়ের অন্য অংশটি। মুখ্য চরিত্র ঋদ্ধি'র ডায়েরি আকারে লেখা সেই অংশে ধরা পড়েছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, অজস্র টুকরো কথা, ব্যথা, বিভূতিভূষণের লেখার প্রতি মুগ্ধতা, ছোট্ট-ছোট্ট কবিতা। প্রথম ও প্রচারিত অংশটি যদি মসীকৃষ্ণ আকাশ হয়, তাহলে এই অংশের লেখাগুলো তাদের বুকে ভেসে যাওয়া দূরের বলাকা। সেই লেখাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, যেন আমিই পৌঁছে গেছি তুঙ্গনাথে— যেখানে মহাকাল অপেক্ষায় আছেন আমায় নিজের সামনে দাঁড় করাবেন বলে— ঠিক যেমনটি হয়েছিল ঋদ্ধি'র ক্ষেত্রে। মনে হয়েছে, কত দৃশ্য, কত তারা-ভরা রাত, কত বৃষ্টির স্মৃতি যেন আমাকেও স্পর্শ করছে, আমাকেও মনে করাচ্ছে অনেক পুরোনো কথা। বারবার মনে হচ্ছিল, প্রতিদিন ভেসে যাওয়া সহস্র বিস্মৃতিরাশির অন্তত কিছুটা যদি এইভাবে ধরে রাখা যেত...! বইপাড়ার দগ্ধ সম্পর্ক, নানা আকথা-কুকথা, নোংরা মানুষের নোংরামো— সব ছাপিয়ে আমার কাছে এই বইটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই দ্বিতীয় অংশটির জন্যই। বইটির বাঁধাই ও মুদ্রণ চমৎকার। বানান মোটের উপর শুদ্ধ হলেও কিছু জায়গা এবং যতিচিহ্ন ব্যবহার নিয়ে আমার আপত্তি রয়ে গেল। সংলাপের ক্ষেত্রে এম-ড্যাশের পরিবর্তে ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করাই কাঙ্ক্ষিত ছিল। বইপাড়ার নানা অন্ধকার আর তাদের মাঝে আলো-দেওয়া মশালবাহকদের নিয়ে লেখালেখির একটা অদম্য আকর্ষণ আছে— এ-কথা মানি। তাই আমি প্রায় নিশ্চিত যে লেখক এই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড আনবেনই। তাতেও হয়তো নির্মোক ত্যাগ করে দেখা দেবে আরও কিছু ক্রূর, বিষাক্ত মানুষ। তবে আমি অপেক্ষায় থাকব ঋদ্ধির ডায়েরির জন্য। ফেলে আসা গাছ, জল, শঙ্খধ্বনি, তুলসীতলা, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির মতো করে সেই লেখাগুলো আমাকে আবার সন্ধান দেবে হারানো সারল্যের— এটুকুই আশা। ভরসা থাকুক।
একটি সামাজিক উপন্যাসেও কীভাবে প্লটে মোচড় আনা যায়, বিভিন্ন চরিত্রের বিভিন্ন রকম শেড তুলে ধরা যায় লেখিকা সেমন্তী মুখোপাধ্যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন। ফেসবুকে বহুদিন আগে কিছু টুকরো টুকরো পর্ব পড়েছিলাম কিন্তু এই বইকে সেই পর্বগুলোর মাপকাঠিতে মাপলে ভুল হবে। এই বই সেসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে, এই বই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গাথা, এই বই একটি জার্নি।