২০০৮ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সরকারি হিসেবে তা ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যা মোট প্রদত্ত ঋণের দশ ভাগের বেশি। অর্থাৎ জনগণের আমানতের ১ শ টাকা ব্যাংক ঋণ দিলে ৯০ টাকার বেশি ফেরত আসছে না। এটা ছিল শুধু সরকারি তথ্য। বিশ্বব্যাংকসহ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট খেলাপি ঋণ ইতোমধ্যে চার লাখ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকব্যবস্থাকে বলা হয় অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ। তার যদি এত বেহাল দশা হয় তাহলে দেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থার সঙ্কট কত গভীরে তা সহজেই বুঝতে পারা যায়।
এদেশের বেসরকারি ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল খেলাপি ঋণের সংস্কৃতির মাধ্যমে। অর্থাৎ, নব্বইয়ের দশকে যারা প্রথম এদেশে বেসরকারি ব্যাংক গড়ে তুলেছিলেন, তারা মূলধন জোগাড় করেছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়ে।
আবার, বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা আইনানুযায়ী তাদের মোট প্রদত্ত মূলধন চাইতে অন্তত বিশ গুণ টাকা নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেননি। এভাবেই ব্যাংক মালিকরা ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন এবং ব্যাংকখাত হয়েছে দুর্বল থেকে দুর্বলতর।
ঋণ খেলাপিদের পরিচর্যা করা এদেশের ক্ষমতাসীন দলগুলোর বড় দায়িত্ব। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঋণ খেলাপিদের সুযোগ দিতে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। ফলে আন্তর্জাতিক রীতি বাদ দিয়ে 'বাংলাদেশ স্টাইল' অনুসরণ করতে শুরু করি আমরা। এতে দুটো লাভ হয় সরকারের। এক. খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা যায় এবং দুই. ঋণ খেলাপিদের আর্থিক পুনর্বাসনে সহায়তা করা সম্ভব হয়।
অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে একটি ব্যাংকিং কমিশন করা হয়েছিল প্রায় আড়াই দশক আগে। এই কমিশন সুপারিশ করেছিল, কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া যাবে না, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে ইত্যাদি। সেই কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলো আমলে নেয়নি কোনো সরকার। বরং ২০০৮ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হিড়িক পড়ে যায়। ফলে ঘটতে থাকে হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, আ্যনোনটেক্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের ঋণ কেলেঙ্কারি।
দেশের অন্যতম ব্যবসাসফল ব্যাংক ছিল বেসিক ব্যাংক। আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাগেরহাটের জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে নিয়োগ দেয়। অতঃপর বাকিটা ইতিহাস। প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে আজকে দেশের অন্যতম খারাপ ব্যাংকের নাম রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক।
আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, একই পরিবারের দুইজনের বেশি কোনো ব্যাংকে পরিচালক থাকা ঠিক নয়। অথচ বাংলাদেশে একই পরিবারের চারজন সর্বোচ্চ নয় বছরের জন্য ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারবেন। যা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। আবার, ন্যাশনাল ব্যাংকে সেই নিয়ম ভেঙে একই পরিবারের পাঁচজন পরিচালনাপর্ষদের সদস্য হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি! একসময়ের ভালো ব্যাংকের তালিকায় থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে এখন বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে কৃত্রিম শ্বাসনালীর মাধ্যমে।
দেশে মোট তফসিলি তথা বাণিজ্যিক ব্যাংক ৪৩টি। তন্মধ্যে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকের সংখ্যা এখনপর্যন্ত সাতটি। ব্যাংক দখলের ধারাপাতে পিএইচডি করা এই গ্রুপের মালিকানায় আসার আগে দেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক। বর্তমানে তারা সরকারের থেকে টাকা ঋণ নিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখছে।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীরের ফারমার্স ব্যাংক তো ঋণ দেওয়া কোনো টাকাই ফেরত পাচ্ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে সরকার ব্যাংকটিকে টাকা ধার দেয় এবং বাঁচিয়ে রাখে। একই দশা আওয়ামীপন্থি মালিকের ইউনিয়ন ব্যাংকেরও।
ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে শওকত হোসেনের লেখা এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অর্থনীতিকে সহজভাবে বোঝাতে শওকত হোসেনের জুড়ি মেলা কঠি। যে কোনো পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করবে তার লেখা।
এই বইয়ের দ্বিতীয় সেরাটি লিখেছেন সাংবাদিক ইসমাইল আলী। তিনি কুইক রেন্টালের নামে গত দেড় দশকে এক লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই করতে চেয়েছেন।
বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ভাড়ায় চালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং তাৎক্ষণিক টোটকা হিসেবে কাজে লাগে কুইক রেন্টাল। কিন্তু ২০০৮ সালের পর এদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে কুইক রেন্টাল। ইসমাইল আলী লিখেছেন, পাশের দেশ ভারতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে তার নির্মাণব্যয়ের পুরো খরচ দেওয়ার পর তা সরকারের হয়ে যায় এবং বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এদেশের তুলনায় কম। কিন্তু, বাংলাদেশে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্পূর্ণ খরচ বছরের পর বছর জনগণের পয়সায় বহন করা হয়। কিন্তু মালিকানা সরকার পায় না। উপরন্তু, বারবার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর ফলে লাভবান হয় মালিকপক্ষ। জনগণের বাড়ে ব্যয়। উৎপাদনকাজে ব্যবহার না করেও কেন বছরের পর বছর সাদা হাতি পোষার মতো সরকার কুইক রেন্টাল পোষে তা আকেলমান্দ কোনো ব্যক্তির বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বিদ্যুৎখাত নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেক টার্মিনোলজি ব্যবহার করেছেন ইসমাইল আলী। তাই পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে আমার মনোযোগচ্যুতি ঘটছিল। লেখার বিষয়বস্তু দুর্দান্ত। আরও সহজভাবে লিখতে পারলে ভালো হতো।
মেগা প্রকল্প নিয়ে লিখেছেন আলী রীয়াজ। বইয়ের অন্যতম দুর্বল লেখা এটি। ঠিকমতো নিজের কথা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভালো লাগেনি।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নিয়ে জিয়া হাসানের রচনা কোনো লেখাই হয়নি। সহজভাবে লিখলে না পারলে লেখার দরকার কী? একেবারে যা-তা ধরনের লেখা। বইয়ের সবচেয়ে খারাপ প্রবন্ধটি জিয়া হাসানের লেখা। এত এত পরিভাষার ব্যবহার লেখাটিকে ভীষণ অপাঠ্য করে তুলেছিল। অথচ বিষয়বস্তু অত্যন্ত দরকারি।
তারিক চয়নের প্রবন্ধ 'অর্থ পাচারের সাতকাহন' মোটামুটি মানের লেখা। কীভাবে অর্থপাচার হয় ও কারা করে এবং সরকার কেন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয় না - তা নিয়ে গড়পড়তা ধরনের লেখা। বরং শওকত হোসেন অর্থপাচার নিয়ে ঢের ভালো লিখতে পারতেন। প্রথম আলো'তে এই নিয়ে একাধিক সুপাঠ্য লেখা তাঁর রয়েছে। আগ্রহীজন পড়তে পারেন।
'লুণ্ঠিত ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের চালচিত্র' বইটির বিষয়বস্তু নির্বাচন যথেষ্ট সময়োপযোগী। কিন্তু আলী রীয়াজ সম্পাদক হিসেবে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনিসহ জিয়া হাসানের লেখা তো সংকলনে স্থান পাওয়ার যোগ্য নয়। তারিক চয়নের হালকা চালের লেখার চাইতে অর্থপাচার নিয়ে ভালো লিখতে পারতেন এমন লোক একাধিক রয়েছে। জিয়া হাসান ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন তা হয়তো একমাত্র তিনিই জানেন। এই ধরনের বইয়ের পাঠককে সহজভাবে বুঝিয়ে লিখতে হয়। পরিভাষার পণ্ডিতি ফলিয়ে লেখাটিকে আবর্জনায় পরিণত করেছেন। ইসমাইল আলী চেষ্টা করেছেন বেশ। তিনিও অধিক পরিভাষা ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারেননি।
প্রথমা কর্তৃক প্রকাশিত মাত্র এক শ ছাব্বিশ পাতার বইটি কিনেছি দুই শ ত্রিশ টাকা দিয়ে। লেখার মান বিবেচনায় দাম বেশ চড়া এবং অপচয় করার মতো অঢেল টাকা ও সময় না থাকলে এটি একটি লোকসানি প্রকল্প হতে বাধ্য।