📚 বই নিয়ে আলোচনা
" লুডুর বোর্ড যেন জীবনের কথা বলে। কখন মই আসবে আর কখন সাপ আসবে কিছুই বলা যায় না। ভাগ্য ছক্কা হয়ে গড়ায় জীবনের বোর্ডে। কখনো সবচাইতে বড়ো মইয়ের গোঁড়ায় নিয়ে যায়, আবার কখনো নিয়ে যায় সবচেয়ে বড়ো সাপের মুখে"
একদম ঠিক। জীবনটা আসলে এমনই। জীবন নামের গ্যাঁড়াকলে পড়ে কোন মানুষ কিসে পরিনত, পরিবর্তন হয় তা কে বলতে পারে? তাইতো গল্পের রবিউল, তার বড় ভাই, বাবা, বীরুদা, অমল বোস, এবং নিখিল কেউই সে গ্যাঁড়াকল টপকাতে পারেনি।
রবি, মানে আমাদের রবিউল। সে তো দিব্যি সুখেই ছিলো। কোনো জটিলতা, কুটিলতা তার মাথায় ছিলো না। সখীকে মাঝে মাঝে বাড়ির পাশে ডেকে এনে দেখা করা, দুটো লজ্জা মাখা কথা বলা। এটার চেয়ে আর কিসে আনন্দ পেতে পারতো রবি? বা কখনো সখনো উদাস হয়ে গাছের নীচে বন্ধুর পাশে বসে সিগারেটে দুটো সুখটান দেয়া, বা দার্শনিকের মত টুকটাক কথা বলা, ব্যাস এটাইতো। রবীর মত ১৭/১৮ বয়সের গ্রাম্য ছেলেদের চিন্তা এর থেকে কঠিন আর কী হতে পারে?
কিন্তু না, ঐ যে শুরুতে লেখক "দিবাকর দাসের" উক্তি বললাম না, জীবনটা যেন সাপ লুডু খেলার মত। কখন যে কী আসবে তা কে বলতে পারে?
জীবন সহজ হোক আর কঠিন, পেটতো তা বুঝবে না। আর এই পেটের চাহিদা মেটাতেই জীবনে মানুষ কী না করে।
রবির বাবা ভাইরাও সেই পেটের তাগিদে ইন্ডিয়ার সীমানা দিয়ে অবৈধ ভাবে গরু পাচারের কাজ করে। জানে এই কাজে নিশ্চিত মৃত্যু প্রতি পদক্ষেপে। মৃত্যু যেন বীক্রমের বেতালের মত সব সময় কাঁধের উপর চড়ে থাকে। তবু করতে হয় এই কাজ অভাবী মানুষ গুলোকে। কারন সরকারি ভাবে আনা নেয়া করলে যে তাদের শুধু ঐ কষ্ট করাটাই সার, পকেটে আর কিছুই আসে না।
এরকমই এক গরুর চালান আনতে রবির বাবা এবার ইন্ডিয়া যাবে, কিন্তু হঠাৎ করে সেই দলে রবির ডাক পরে। কারন তাদের একজন কোনো কারনে তাদের সাথে এবার যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে এবার এবং প্রথমবারের মত রবির যাত্রা শুরু হয় অনিশ্চিতের পথে।
গভীর অন্ধকারে সীমানা অতিক্রম করে রবিরা রাণীহাটের অমল বোসের বাড়ি যায়। অমল বোস এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় গরু ব্যবসায়ী। তারচেয়ে বেশি গরু আর কারো কাছে নেই। অমায়িক আচরণের অধিকারী অমল বোস, তাদের খুব খাতির করে। সবশেষে গরুও বিক্রি করেন। দুই পক্ষই খুশি।
গরু নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য ফিরতি যাত্রা করে রবিরা। কিন্তু এবার জীবন নামের ছক্কার ডায়ালটা তাদের খুব বড় সাপের মুখে এনে ফেলে।
সীমানা রক্ষির হাতে প্রান হারায় রবির বাবা, ভাই আর তাদের সাথের মাধব চাচা।
ভাগ্য দোষে বা গুনে যে কারনেই হোক, রবি বেঁচে যায়।
শুরু হলো রবির পরাভূমিতে এলোমেলো পথচলা। তবে বিধাতা সব যায়গায়ই আছেন, তা না হলে কেন নন্দুর সাথে রবির পরিচয় ঘটাবেন?
নন্দু দয়াগঞ্জে তার কাকার ছোট্ট চায়ের দোকানে পেটে ভাতে থাকে। দয়াগঞ্জ, রাণীহাটের পাশের গ্রাম। নন্দু সহজ সরল এক গ্রাম্য ছেলে। রবিরই সমবয়সী।
এক সকালে ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত অবস্থায় রবি, নন্দুদের দোকানের সামনে চলে আসে, সেখান থেকেই শুরু তাদের ঘনিষ্ঠতা।
অচিনপুরে রবি থাকতে আসেনি। তার বাড়িতে আছে মা। এবং আছে তার সখী। যে করেই হোক তাকে আবার সীমানা পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে। কিন্তু সেটা বললেইতো আর যাওয়া যায় না। তার জন্য দরকার টাকার।
কিন্তু পরিচয় জানাজানি হলেতো বিপদ, তবে উপায়? বাধ্য হয়ে রবির অন্ধকার পথে চলা।
অন্ধকার জগতের সম্রাট বীরুদা। ঠান্ডা মাথায় যে কিনা সব কিছু সামাল দিতে সিদ্ধহস্ত । দৃঢ়তা সম্পন্ন এক মানুষ বীরুদা। বীরুদা অন্ধকারের মানুষ হলেও তার অন্তরে আছে বীবেকের আলো। নন্দুর কল্যানে রবির পরিচয় ঘটে বীরুদার সাথে।
কাজ করতে থাকে বীরুদার সঙ্গে, এবং খুব সফল ভাবে।
তেমনই এক কাজ করতে তারা চলে যায় সীমানার ওপারে বাংলাদেশে । রবির মনে আনন্দের যেন অন্ত নেই। বিনা কষ্টে সে আবার বাড়ি ফিরতে পারবে। শুধু দলের সাথে একটু চালাকি করতে হবে।
কিন্তু খেলাতো এখনো শেষ হয় নি। বীরুদার সারগেদ নিতাইয়ের মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার পরই রবির সকল চিন্তা চেতনা পাল্টে যায়।
রবি এতো দিন জানতো তার বাবা, ভাই অন্য সবার মতো ধরা পরেছিলো। কিন্তু আজ সে কি শুনতে পেলো? তারা সবাই পরিকল্পিত এক জঘন্য খুনের শিকার!!!
রবি এখন তার লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণই তার এখন ধ্যান জ্ঞান, "প্রতিশোধ"
কিন্তু ১৭ বছরের রবি বিশাল এক চক্রের বিরুদ্ধে কীইবা করতে পারবে?
রবির মা রবির জন্য পথ চেয়ে আছে। আরো পথ চেয়ে আছে রবির সখী। যে কিনা চলে আসার আগেরদিন পরন্ত বিকালে পুকুর পাড়ে হঠাৎ করে রবির মুখে চুমু খেয়ে বসে। যার আর্কষণ রবিকে এখনো টানছে। কিন্তু রবি…
…
"অভিমন্যু" বইটির নাম। অভিমন্যু নামটার মানে আমি জানতাম না। মানে জানার ইচ্ছে ছিলোনা আরকি। কিন্তু বই পড়ছি, আর অর্থ জানবো না তাকি হয়?
"সৈয়দ ফাতেমা বানু" তিনিও এই বইয়েরই রিভিউ দেন। সেখান থেকে কিছুটা জানতে পারি।
অভিমন্যু হলো অর্জুনের পুত্র, আর শ্রী কৃষ্ণের ভাগিনা। অভিমন্যু দারুন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বীরের মত যুদ্ধ করেন। একের পর এক শত্রু সেনা বধ করতে থাকেন, এক পর্যায় সেখানেই যুদ্ধ করতে করতে মারা যান অভিমন্য।
তাহলে আমাদের অভিমন্যুর কী হবে? আমাদের অভিমন্যু কী পারবে শত্রু ডেরা থেকে শত্রু বধ করে ফিরে আসতে?
…
অসংখ্য ধন্যবাদ লেখক "দিবাকর দাস" কে এত সুন্দর একটি বই পাঠকদের উপহার দেয়ার জন্য।
বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ উপাদানই এখানে বিদ্যমান।
প্রকৃতির বর্ননা, মানুষের আচার ব্যবহার, চারপাশের পরিবেশ খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি প্রতিটা চরিত্র এতটা যত্নে সৃষ্টি করেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয় চরিত্র গুলো বাস্তব।
যেমন সহজ সরল নন্দু তার অপরিচিত বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন পড়তে পড়তে একসময় নিজের বুকেই একসময় চাপ অনুভব করি। আবার মন্দিরের ভিতরে রবির সহজ সরল মন থেকে যে ভয়ংকর রূপটা লেখক বের করেছেন তা এক কথায় প্রশংসার দাবিদার। আর বীরুদা যতই মহৎ সাজুক না কেন, দিনশেষ তাকে তার স্থান ঠিকই দিয়েছেন। তবে বীরুদার চিন্তা করার শক্তি দেখে আমি মুগ্ধ।
গল্পের সবচেয়ে এই জিনিসটা বেশি প্রয়োজন থাকে, চরিত্রের সক্ষমতা। এ কাজটা লেখক খুব দক্ষতার সাথে করেছেন।
প্রথম দিকে পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কাহিনীটা সামাজিক জনরার। কিন্তু অর্ধেকের পর থেকেই যেন প্লাটে যায় সব কিছু। একের পর এক টুইস্ট। তারপর আর সেটাকে শুধু সামাজিক বলা যায় না। বলতে হয় "সামাজিক অপরাধ" জনরা।
তবে সব পাঠক এক না। তাই সবার চিন্তাও ভাবনাও সমান না।
লেখকের লেখার প্রতি পূর্ন শ্রদ্ধা রেখে আমার নিজের মতপ্রকাশ করছি-
গল্পের একটা বিষয়ে আমার খারাপ লেগেছে। সেটা হলো চরিত্র গুলোর নিজেদের চিন্তা বা পরিকল্পনা একে অন্যর সাথে হুবহু মিলে যাওটা।
এই বিষয়টা যদি আরেকটু ঘোরের মধ্যে রাখতো পাঠককে তাহলে আরো বেশি উপভোগ্য হত।
তবে লেখক লেখবেন নিজ ইচ্ছায়, অন্যর কথা শুনে নয়।
বইটা আমাকে ভিষণ রকম নাড়া দিয়েছে। এটাই লেখকের দিন শেষে প্রাপ্তি।☺
বইটা পড়ে আমার একটাই কথা মাথায় ঘুরছিলো-
"১৬ থেকে ২০ বছরের একটা ছেলে বা মেয়ে পেট্রলে চুবানো ন্যাকড়ার বলের মত। শুধু একটু আগুন পেলেই হলো। সব কিছু জ্বালিয়ে ছারখার করে দিবে।"
ধন্যবাদ।
© মোঃ কামরুল হাসান
সময় - রাত ১.৩০ মিনিট - ৩১/০৮/২০১৯
📚 বই হোক আপনার, আপনি বইয়ের 📚