১৯৮৩। তরুণ এস আই কানাইচরণ সদ্য যোগ দিয়েছেন লালবাজারের হোমিসাইড বিভাগে। নিজেকে গোয়েন্দা বলতে বাধো-বাধো ঠেকে। সিনিয়ার ইন্সপেক্টর মতি লাহিড়ীর শিষ্য বনে কানাই গোয়েন্দাগিরির পাঠ নিচ্ছেন কিন্তু তার সময় কাটে অফিসের ডেস্কে ঘুমিয়ে, গড়ের মাঠে, ক্রাইমসিনে মতিদার লেজুড় হয়ে, এবং প্রেমিকার সঙ্গে রেস্তোরায়। বৃষ্টিস্নাত এক রাতে কানাইচরণের সামনে সুযোগ এল প্রত্যক্ষ গোয়েন্দাগিরি করবার। শহরতলীর কলোনিতে দুই মহিলা খুন হয়েছেনন। সম্পর্কে তারা শ্বাশুড়ি আর পুত্রবধু, পুত্রটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা। নিহতেরা এক পাড়ায় কিন্তু পৃথক বাড়িতে থাকতেন। পাড়ার লোকজনের সঙ্গে পরিবারটির সদ্ভাব নেই। শহর পালটাচ্ছে, রাজনীতি পালটে যাচ্ছে, পুলিশ, পুলিশী রীতিনীতি ও ধ্যানধারণাও পালটে যাচ্ছে-- এমন এক সময়ে কানাইচরণ কী পারবেন, না খুনিকে ধরতে নয়, এস আই থেকে মগজে-মননে গোয়েন্দা হয়ে উঠতে!
রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের জন্ম ১৯৮৭ সালে কলকাতায়। সাত বছর বয়েসে যৌথপরিবার থেকে আলাদা হয়ে বাবামায়ের সঙ্গে মফস্বল শহর বারাসাতে চলে আসা। বাবা-মা সরকারী কর্মচারি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন বারাসাত মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। কবিতা লেখার শুরু ক্লাস এইট থেকে, প্রথম কবিতার বই সতেরো বছর বয়েসে। এঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন শিবপুর বিই কলেজ থেকে, পরবর্তীতে আই আই টি কানপুরে। পিএইচডি নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। গবেষণার বিষয় জলসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরের ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থানে অধ্যাপনা করছেন। প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সঙ্গে পাঁচ; একটি বাদে সব কবিতাবই স্বউদ্যোগে প্রকাশিত। গল্প-উপন্যাসের বই এযাবত আটটি; তিন প্রকাশক সৃষ্টিসুখ, বৈভাষিক এবং একতারা। গোয়েন্দা কানাইচরণ চরিত্রটির স্রষ্টা। কানাইচরণের উপন্যাসিকা 'চড়াই হত্যা রহস্য' অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ওয়েবসিরিজ 'ব্যাধ'। সম্প্রতি কয়েকটি বইয়ের ইংরিজি অনুবাদের কাজ শুরু হয়েছে।
কানাইচরণ যে কারণে আমার প্রিয় ঠিক সেভাবে তাকে এ বইতে পাওয়া গেলো না। "বর্ষণ অধিক" মূলত সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া অনভিজ্ঞ কানাইচরণের গল্প। লেখক বরাবরই নিখুঁতভাবে গল্পের পরিবেশ ফুটিয়ে তোলেন। আর এ বই পুরোটাই বর্ষণসিক্ত। সরকারিভাবে গোয়েন্দাগিরির সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মাধ্যমে লেখক গল্পের ইতি টেনেছেন। এতে কাহিনি একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে বটে কিন্তু কিঞ্চিৎ অতৃপ্তি রয়েই গেলো।
ব্যাস, পরপর দুটো বই হিট করেছে, এবার শুরু হয়ে গেছে আলতুফালতু লেখা।
ভাবলাম, অনেক দিন পরে নতুন একজন ভালো গোয়েন্দা চরিত্রের আগমন ঘটেছে বাংলা সাহিত্যে। ও বাবা, এই বইতে দেখি কাহিনিটাও পুরোপুরি গুছিয়ে শেষ করবার গরজ দেখাননি লেখকমশাই, রহস্যের অর্ধেক সমাধান করেই বই খতম! এরকম কাণ্ড জীবনে এই প্রথমবার দেখছি।
আশাহত!
(আরও কিছু কথা। "নোয়াপাতি ভুঁড়ি" কথাটা বেশ কয়েকবার ব্যবহার করা হয়েছে। নোয়াপাতি নয়, "নেয়াপাতি"। হোটেলের রেজিস্টার খাতাকে একাধিকবার লেখা হয়েছে "রেজিস্ট্রার খাতা"। একই ভুল বারবার হলে সেগুলো স্রেফ "ছাপার ভুল" বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং আয়ান রশীদ অনূদিত "গালিবের কবিতা" বইটির অনুবাদ করা হচ্ছে ১৯৮৩ সালে— এমনটা দেখানো হয়েছে। ১৯৮৯ সালের কলকাতার স্টোনম্যান হত্যার ঘটনাও চলে এসেছে ১৯৮৩ সালে। যদিও ক্রিকেটার কপিল দেব-এর নাম যথাযথ সময়েই উল্লেখ করা হয়েছে। সাল তারিখ সংক্রান্ত এই বিচ্যুতিগুলো কি সব "অ্যানাক্রনিজম"-এর কাঁধে চাপিয়ে দেবো?
কাহিনি নির্মাণ, ভাষার ব্যবহার, ডিটেইলিং— সবদিক দিয়েই অযত্নের ছাপ। কবীর সুমনের গানের লাইন আছে : "সাহিত্য মরে পুজো সংখ্যার চাপে"। এই উপন্যাস তো পুজো সংখ্যায় বেরোয়নি, তাহলে কীসের চাপে মরলো? প্রকাশকের চাপে? নাকি "ব্যাধ"-এর চাপে?)
হোমিসাইড বিভাগে সদ্য যোগ দেওয়ার পর এস.আই কানাইচরণের কাছে একটা কেস এল। নিজের বাড়িতেই এক গৃহবধূকে গুলি করে খুন করেছে কেউ। আত্মীয় বলতে কাছাকাছি থাকেন সেই মহিলার শাশুড়ি। তাঁকে খবর দিতে গিয়ে দেখা গেল তিনিও নিহত— তবে এবার আঘাত হানা হয়েছে ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে! জোড়া খুনের এই তদন্তে জড়িয়ে গেল কানাইচরণের ব্যক্তিগত জীবন, পুলিশ বিভাগের নিজস্ব নীতি ও রাজনীতি। সবকিছুর পটভূমি হয়ে রইল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা এই শহর। তাই 'বর্ষণ অধিক!'
রাজর্ষি দাস ভৌমিকের গোয়েন্দা কানাইচরণ সিরিজ পড়ার পর থেকে এপার বাংলার অন্য লেখকদের রহস্যভেদের গল্প পড়াই কঠিন হয়ে গেছে। এতটা মিউটেড অথচ বাস্তবানুগ পোলিস প্রোসিডিওরাল অন্য কেউ লেখেন না। তার চেয়েও বড়ো কথা, বিভাগীয় উত্থান-পতনে ক্রাইম আর পানিশমেন্ট নামক দু'টি বিমূর্ত ধারণা যে কীভাবে বদলায়, তাও এই সিরিজের চেয়ে ভালোভাবে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। ছোট্ট-ছোট্ট সংলাপে, আপাতভাবে রৈখিক কাঠামোর মধ্যেই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ, অতীতচারণ ও ঘটমান বর্তমান মিশিয়ে এক অদ্ভুত নন-লিনিয়ার ভঙ্গিতে গল্প বলেছেন রাজর্ষি। নিতান্ত সহজ ভাষাতেই তা চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলেছে সবকিছু— যেভাবে শান্ত লোহার নল সময় এলে উদগীরণ করে আগ্নেয় মৃত্যু। কিন্তু এই বইয়ের সবই কি ভালো? নাহ্, সব ভালো নয়। একটি গ্লেয়ারিং অসঙ্গতি তো আমা-হেন মামুলি পাঠকের চোখেই পড়েছে। ১৯৮৩ সালে স্টোনম্যান কোথায়? তার কীর্তি তো দেখা দিয়েছিল হোয়াইটচ্যাপেল হত্যালীলার শতবার্ষিকী শেষ হওয়ার লগ্নেই— অর্থাৎ ১৯৮৯-এ। রাজর্ষি'র ঘোরতর রিসার্চ এই ব্যাপারটা কেন চিহ্নিত করল না, বুঝলাম না। অবশ্য এও হতে পারে যে "সকল চরিত্র ও ঘটনাবলি কাল্পনিক" সতর্কীকরণের আড়ালে আত্মগোপন করার জন্য তিনি সচেতনভাবেই এই ব্যাপারটি করেছেন। "বুঝ লোক যে জান সন্ধান" বলে আমিও প্রসঙ্গটা এখানেই ছেড়ে দিলাম। এমন চমৎকার বইটা শেষে এসে একেবারে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল। অন্তিম হত্যার যুক্তি হিসেবে যা দেওয়া হল তা একেবারেই অবিশ্বাস্য এবং অযৌক্তিক। সর্বোপরি, সত্যানুসন্ধানের চেষ্টায় খাড়া করা তত্ত্ব বা ভাবনাই গ্রহণযোগ্য কি না— সেটুকু ছাড়া রইল বিচারব্যবস্থা তথা ভবিষ্যতের হাতেই। তাছাড়া অমন একটা ভাবালু, ত্রিশঙ্কু ছবি দিয়ে শেষ... মানে কেন? হোয়াই?
কিন্তু, আই রিপিট, এই গল্প আরও একবার প্রমাণ করে দিল, কেন রাজর্ষি ও তাঁর কানাইচরণকে ছাড়া আমাদের মতো রহস্যপ্রেমীদের চলে না। নিতান্ত সহজ মানুষের জীবন যখন হত্যা ও পুলিশি তদন্তের ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যায়, তখনকার অবস্থাটা তাঁর মতো করে কেউ বোঝাতে পারে না। তাঁরই সঙ্গে আমরা ঘুরি এঁদো পুকুরের কিনারা থেকে পাইস হোটেলে, ছোট্ট সংসারের একফালি স্বপ্ন থেকে রক্ত আর ঘামের বাস্তবে। আমাদের চেতনা, মালিন্য, দগ্ধ প্রাত্যহিকতা ভিজিয়ে দেয় বর্ষণ অধিক।
গোয়েন্দা কানাইচরণকে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হইচই-এর ব্যাধ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। ব্যাধ সিরিজটা ভাল্লাগসিল খুব, সেই সাথে কানাইচরণকেও। কলকাতা নুয়া বইয়ের কানাইচরণ রিটায়ারমেন্টের দিকে হাঁটাহাঁটি পা পা করছেন.. আর এই বই বর্ষণ অধিক-এ কানাইচরণ নিতান্তই তরুণ অফিসার। এই কেসের হাতে ধরে গোয়েন্দা হিসেবে অভিষেক ঘটেছে তার। পুলিশি বর্ণনাগুলো ভালো লেগেছে খুব। মনে হচ্ছিল খুব কাছ থেকে একজন পুলিশ অফিসারের জীবনকে দেখছি। মোটের উপর বেশ ভালো ছিল।
গোয়েন্দা কানাইচরণের আগের বই দু'টোকে যারা খুব প্রশংসা করেছিলেন, তারা দেখলাম এই ৩য় বইটা নিয়ে খুব হতাশ হয়েছেন। সেজন্য একটু ভয়ে ভয়েই শুরু করেছিলাম। বা বলা যায়, শুরু করতে বাধ্য হয়েছিলাম, কারণ এই ভিনদেশে বাংলা বই এতই দুর্লভ যে, বেছে বেছে বাংলা বই পড়ার বিলাসিতা পোষায় না। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম, পাঠকভেদে প্রত্যাশা একদম ভিন্ন থাকে বলেই কোন বই একজনের কাছে রাবিশ আরেকজনের কাছে ভাল লাগে। কানাইচরণের আগের বইগুলো কোন জমজমাট রহস্যের কারণে আমার ভাল লাগেনি, বরং কলকাতার পরিবেশ আর প্রেক্ষাপট গড়ে তোলার জন্যই ভাল লেগেছিল। আগেই বলেছি, রাজর্ষীর বর্ণনাভঙ্গী অনেকটা শীর্সেন্দুর মত। কাহিনী যা-ই হোক, লেখার মাঝে এমন একটা টান আছে যে চরিত্রগুলো কাছের হয়ে যায়, আর পরিবেশটা একদম জীবন্ত হয়ে ওঠে। এজন্য, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতূড়ে সিরিজের এলোমেলো বইগুলোর আবেদন এই বুড়ো বয়সেও আমার কাছে একইরকম থেকে গেছে। এই ব্যাপারগুলো কানাইচরণের আগের দু'টো বইতে যেমন ছিল, এবারেরটাতেও সেরকমই আছে। বরং বলা যায়, এবার আরো বেশি করে আছে। বইটার নামই 'বর্ষণ অধিক', এবং নামের সাথে মিল রেখে পুরো গল্পটাই এগিয়েছে সপ্তাহভর বৃষ্টির মাঝে। কখনো মুষলধারে বৃষ্টি, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, আর যখন বৃষ্টি নেই তখন থমথমে মেঘলা আকাশ। আর বর্ণনা এতটাই দারুণ ছিল যে, এই কয়েকটা ঘণ্টা আমি বাংলার বর্ষার মাঝেই ডুবে ছিলাম। এই বৃষ্টিতে ডুবে থাকার কারণে অপরাধীর চিন্তা খুব একটা মাথায় আসেনি; শেষদিকে অনেকটা সাইড ডিশ হিসেবে অপরাধী ধরা পড়ে। সব মিলিয়ে, আমার কাছে রেটিং সাড়ে তিন। যদি আপনি কোন গল্পের কাহিনী বা চরিত্রের চেয়ে আবহনির্মাণে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন, এই বই আপনার জন্য অবশ্যপাঠ্য।
মার্কিন সাহিত্যিক এবং হার্ডবয়েল্ড ডিটেকটিভ ফিকশনের অন্যতম প্রণেতা, রেমন্ড চ্যান্ডলার ১৯৪৪ সালে লেখা ওঁর একটি চিঠিতে গোয়েন্দাগপ্পের লেখকদের একটা শ্রেণিবিভাগ করেছিলেন - প্রথম কোঠায় রেখেছিলেন সেই লেখককে, যার লেখার উপাদেয় গুণটি হল একধরণের coolly-thought out puzzle - হেঁয়ালির অর্থ খুঁজে বের করাতেই যত আনন্দ; আরেক কোঠায় ফেলেছিলেন সেই (তখনও) বিরল লেখকদের, যাদের গল্প উপন্যাস ভাষার কারিকুরিতে ঝলমল করছে, তথাকথিত পাল্প ফিকশন হলেও তাতে সাহিত্যগুণের ঘাটতি নেই। চ্যান্ডলার এই দুই ঘরানার মাঝামাঝি একধরণের দোআঁশলা গোয়েন্দা গপ্পোর জন্য মুখিয়ে থাকতেন, যদিও তিনি স্বীকার করে নেন যে তেলে জলে যেমন মিশ খায় না, তেমনই ঠান্ডা মাথায় হিসেব করে লেখা পাজল-সলভিং প্লটের সাথে তাল মিলিয়ে লিখনের কেরামতি দেখানো বেশ দুষ্কর কাজ - তাতে সাফল্যের চাইতে ব্যর্থতাই বেশি।
রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের 'বর্ষণ অধিক' পড়তে গিয়ে চ্যান্ডলারের এই প্রতিপাদ্য মনে পড়ে গেল। আমি রাজর্ষিবাবুর লেখা এর আগে কখনও পড়িনি, বহুদিন যাবৎ ওঁর লেখার সুনাম শোনা সত্ত্বেও - সেজন্য আমার স্বভাবসুলভ আলস্যই দায়ী। তাছাড়া পড়তে শুরু করে হতাশ হওয়ার ঝুঁকিও ছিল, বাছবিচার না করে আজকালকার বাজারখ্যাত লেখকদের বই পড়তে গিয়ে যেটা হামেশাই হচ্ছে। রাজর্ষিবাবু টানটান গদ্য লিখতে পারেন, দৃশ্য বর্ণনার ক্ষমতা অধিকাংশ জঁরলেখকদের চাইতে অনেক বেশি, যেটা গোয়েন্দা বা হরর উপন্যাসের জন্য বাধ্যতামূলক, নচেৎ ভয় বা রোমাঞ্চের উপযুক্ত আবহ তৈরি করা যায় না, বা হলেও তাতে নতুনত্ব থাকে না, একই ক্লিশের বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তি হতে থাকে কেবল। বর্ষণ অধিকের প্রথম পরিচ্ছেদেই লেখক তাঁর কলমের জোর বুঝিয়ে দেন, বৃষ্টিভেজা রাতে হলুদ আলো জ্বলা লালবাজারের কুঠুরি বা শহরের গায়ে ঝুলের মত লেগে থাকা অন্ধকার ঘুপচি মফসসলের বিবরণ দিতে গিয়ে।
বর্ষণ অধিকের সময়কাল আশির দশক, ষাট সত্তরের নকশাল আন্দোলনের তুঙ্গ উত্তেজনা অংশত থিতিয়ে গেছে, ওদিকে নব্বই দশকের আগলখোলা বিশ্বায়নের বাতাসও পুরোদমে আসতে শুরু করেনি - এই দুয়ের মাঝে কবরচাপা পড়ে যাওয়া একটা আপাত-অকিঞ্চিৎকর সময় এবং সেই সময়ে পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ততোধিক অকিঞ্চিৎকর খুনের তদন্ত ঘিরে এই উপন্যাস। যদিও ধ্রুপদী গোয়েন্দা গল্পের মত এখানে শুধুই খুনের তদন্ত নিয়ে একটা টানটান প্লট লেখা হয় না, গল্পে এমন অনেক দৃশ্যের অবতারণা হয় যার সাথে খুনের সম্পর্ক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখলেও ঠাহর করা যাবে না। তবু তারা চলে আসে। গল্পের কাঁচামাল হিসেবে লেখক যেমন পুলিসি বৃত্তান্তের (বাংলায় অনেককাল ধরেই এরকম একটি স্বল্পালোচিত ননফিকশন জঁর রয়েছে, সেই ধীরাজ ভট্টাচার্য থেকে সাম্প্রতিক নজরুল ইসলাম, সুপ্রতিম সরকার অবধি) কাছে হাত পাতেন, তেমনি মুখাপেক্ষী হন সমাজবাস্তববাদী উপন্যাস এবং প্রণয়ধর্মী আখ্যানের কাছে। ফলে এমন অনেক দৃশ্য (হাওড়ার বাজেশিবপুরের অংশ) পাওয়া যাবে যা পড়ে হয়তো জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বা মতি নন্দীর উপন্যাস মনে পড়বে, আবার কিছু উপাদান রয়েছে যা সরাসরি সুনীল, শীর্ষেন্দু, শংকর, স্মরণজিৎ বা প্রচেত গুপ্ত থেকে ধার করা। এই পাঁচরকম জঁরের খিচুড়ি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? এর একটি কারণ হয়তো এই যে লেখক গোয়েন্দা গল্পকে স্রেফ ক্রাইম সিন আর ইন্টারোগেশনের মধ্যে বেঁধে রাখতে চাননি। তাঁর গোয়েন্দা কানাইচরণও হোমস বা ফেলুদার মত দোর্দন্ডপ্রতাপ ডিটেকটিভ নন, নেহাত পুলিশের নিচুতলার টিকটিকি, মাইনে যৎসামান্য, বাস কলকাতার বাইরে শহরতলির এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। তার আখ্যান কেবল ক্রাইমের তদন্ত করার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে গেছে ব্যক্তিগত জীবনে। কাজের বাইরে শার্লক বা ফেলুদার জীবন কীরকম ছিল তা আমরা বড় একটা জানি না। ব্যোমকেশের গল্পে গোয়েন্দার দাম্পত্যজীবন দুএকটা ব্যতিক্রমী গল্প বাদে নগণ্য, অভিঘাতবিহীন। বাকিদেরও তাই। কিন্তু কানাইচরণের বৃত্তান্তে তদন্ত, জেরা, খুনির পিছনে ধাওয়া করা - এসবের মাঝে মাঝে ঢুকে পড়েছে একেকটি গোটা পরিচ্ছেদ, যার সাথে খুনের মীমাংসার কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। এমনকি তদন্ত চলাকালীন এমন সব ঘটনাও ঘটে, যা নাটকীয়তায় এবং উত্তেজনায় মূল রহস্যকে ছাপিয়ে যায়, বিশেষ করে কলকাতা পুলিশের সাথে সিআইডির রেষারেষির সাবপ্লটটি।
এসব আনুষঙ্গিক কান্ডকারখানার তুলনায় উপন্যাসের শেষে মূল রহস্যের মীমাংসা যেভাবে হয়, সেটা যারপরনাই ম্যাদামারা এবং আকস্মিক ঠেকে। সেটাই লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না এমনটা বলা যায় না। হার্ডবয়েল্ড ফিকশনের ইতিহাসে এমন অনেক নজির রয়েছে যেখানে রহস্যের মীমাংসা আকস্মিকভাবেই হয়, এবং তার সাপেক্ষে গল্পের বাকি অংশে ঘটে যাওয়া বিস্তর নাটকীয় এবং রোমাঞ্চকর ঘটনার কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকে না। হত্যা, সে অর্থে, গোটা প্লটের একমাত্র ভরকেন্দ্র থাকে না। বরং সব মিলিয়ে গোয়েন্দা উপন্যাস হয়ে ওঠে একটি বিশেষ সময়ের, এবং তার চেয়েও বেশি, একটি নির্দিষ্ট পরিসরকে ছানভিন করার মাধ্যম। কলকাতা, যাদবপুর, বাজেশিবপুর, মালদা - প্রশাসনিক মানচিত্রে খোপবন্দি কয়েকটা ভূখন্ড, উন্নয়নের বিভিন্ন কোঠায় থাকা আলাদা আলাদা এলাকা, শহর-শহরতলি-জেলা-মফসসল, এদেরকে একসূত্রে একটি সূচসুতোয় গেঁথে ফেলার জন্য যে বাহানাটা দরকার, সেটা হল খুন। বাজেশিবপুরের আটপৌরে বাসাবাড়ি, লালবাজারের পুলিশদপ্তর, আর যাদবপুরের এক্সনকশাল আর্মস ডিলারের আড্ডা - ক্রাইম এবং পুলিশি তদন্ত ছাড়া যেন এই বিচ্ছিন্ন স্পেসগুলোকে কানেক্ট করাই সম্ভব নয়। আর স্বয়ং প্রশাসনের যে হায়ারার্কি, পদাধিকারবলে যেখানে একজন আরেকজনের ওপরে বা নিচে থাকার দরুণ তাদের মধ্যে সহজ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না - সেই স্পেসটাকে উলটে পালটে দেখার জন্যও হয়তো একটি অমীমাংসিত খুন এবং তার তদন্তের উপলক্ষ বিনা উপায় নেই। এভাবে দেখলে ডিটেকটিভ নভেল স্রেফ দুরূহ রহস্যের সমাধান আর তুখর বুদ্ধিপ্রয়োগের মেদবর্জিত ন্যারেটিভ হয়ে থাকে না, একটা ভার্টিকাল-হরাইজন্টাল স্পেস - যেটা ইতিহাসের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে এসে ভঙ্গুর হয়ে গেছে - তার জোড়াতালি-দেওয়া সামগ্রিক ছবি তুলে ধরারও মোক্ষম উপায় হতে পারে। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ভরা গাঙে এরকম লেখা এর আগে এসেছে কিনা আমি জানি না। তাই রহস্যকাহিনি হিসেবে 'বর্ষণ অধিকে'র অনেক দুর্বলতা-সত্ত্বেও, এর এই বিশেষ অভিনবত্বটি অস্বীকার করতে পারছি না।
এমন হঠাৎ করে জোড়াতালি দিয়ে শেষ করা বলে ভালো লাগলো না। কিন্তু লেখা চমৎকার টানটান। যতদূর গল্প এগিয়েছে প্রায় ততটাই আরো এগোতে পারত। অদ্ভুত একটা নৈর্ব্যক্তিক কথকতা গল্পের সময়ের দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠকমহলে গোয়েন্দা হিসেবে কানাইচরণ অত্যন্ত সমাদৃত হওয়ার যোগ্য কিন্তু গল্পের শেষটাও এরকম ঘোরলাগা ভাবেই শেষ করা দরকার ছিল।
রাজর্ষি দাস ভৌমিক গোয়েন্দা কানাইচরণ লিখে বাঙালি পাঠকের চোখের মণি হয়ে উঠেছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু মুশকিল হল, লেখক গোয়েন্দা গল্প আর ক্রাইম লিটের একনিষ্ঠ ভক্ত হলেও আদপে দীর্ঘকাল ধরে চমক লাগানো 'গোয়েন্দাকাহিনি' লেখার ইচ্ছে তাঁর সম্ভবত ছিল না, গোয়েন্দা কানাইচরণের চেয়ে তিনি ব্যক্তি কানাইচরণকে নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী, অনেক বেশি ইমোশনাল। একজন মাঝবয়সী মানুষ, যার বর্তমান চরিত্রের সঙ্গে কলকাতা আর তার শহরতলির স্পেস আর টাইম জড়িয়ে আছে। মেঠো মফস্বল, ঘেমো রোজনামচা, ধমকধামক আর কেতা দেখানোর ব্যালেন্স শীট মেশানো পুলিশ জীবন। শহরের ঋতুবদল--গ্রীষ্মের একঘেয়েমি, বর্ষার ভাপ, শীতের মার্ক করা উৎসব-- যেখানে জীবনের বদলের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সময় যেভাবে বদলায়, শহরও বদলায়, বদলে যায় শহরে থাকা সেই মানুষও। রাজর্ষি সেই মানুষের গল্প বলতে কলম ধরেছেন, গোয়েন্দা কাহিনির চমক, প্লটের অভিনবত্ব বা পুলিশ প্রসিডেরালের সুক্ষ্ণতা দেখানোর পালা তাঁর শেষ। এইবার লেখক কানাইকে নিয়ে যে পথ ধরেছেন, তা দিন দিন আরো ধোঁয়াশা হয়ে উঠবে বলে আমার ধারণা। মনে রাখবেন, এই কাহিনি গোয়েন্দার নয়, এই কাহিনি কানাইয়ের। এবং, কানাই ইজ কলকাতা। কলকাতা ইজ কানাই।
কানাই শুধুই কলকাতা অবশ্য নয়, কানাই আসলে ১৯৮৩ সাল। কানাই আশির দশকের মধ্যনিম্নবিত্ত সমাজের সেই সমস্ত দীর্ঘশ্বাস, যার চিন্তাধারা ও ভাবনাকে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধরা কঠিন। কানাই কমিউনিস্ট সরকারের থিতিয়ে আসা বিপ্লবের সেই সব ভেঙে যাওয়া প্রেম, যারা জাঁতাকলে পিষে প্রেমিকাকে হারাবে বলে মানসিকভাবে তৈরি থাকে। কানাই সেই সব সম্পর্কের দলিল, যেখানে দমবন্ধ করা জীবনের মাঝে কাঁচি সিগারেট ধরিয়ে নিজেকে সব ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে শত শত যুবক। কানাই পুলিশও বটে, যে পুলিশ নিজেও এক এক্সিস্টেন্সিয়াল ক্রাইসিস নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেস আসে, কেস যায়! কখনও অপরাধী ঠিক করে ক্রাইম সিন তৈরি হয়, কখনও ক্রাইম সিন সাজিয়ে অপরাধীর মাথায় মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়! জাস্টিস সিস্টেমের নিকুচি, কেস ফাইল ক্লোজ হোক! জোড়াতালি দিয়ে কোর্টে ম্যানেজ করে নিলেই হল! কানাই তিরাশির বর্ষায় মতিদার শিক্ষানবিশি করা এমন এক যুবক, যার আপাতত হাতেখড়ি চলছে।
ক্রাইম গল্পে ন্যাকাপনা আমার পছন্দ নয়, আমি ক্রিস্প লেখা ভালোবাসি। প্লট জোরালো না হলে বা আদ্যিকালের প্লট হলে আমি প্রথম থেকেই হাই তুলি, সে আমার পছন্দের লেখক হলেও এর হেরফের বিশেষ হয় না। খোদ কানাইয়ের প্রথম বই পড়তে গিয়েই আমি এই কথা বলেছি। অথচ, এই গল্পে না জোরালো প্লট আছে, না এমন কিছু নতুনত্ব আছে, না চমক আছে, তবুও আমি যাকে বলে বোল্ড আউট বাই ইট। এর পিছনে একটাই কারণ, লেখক আমাকে কলমের ম্যাজিকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন যে আমি নিছক একটা গোয়েন্দা গল্প পড়ছি না, আমি একটা ভালো লেখা পড়ছি। রহস্য গল্প নয়, আসল রহস্য হল লেখকের ভাষা, ন্যারেটিভের বর্ণালীগত সৌন্দর্য! ব্লিক, অথচ ডিটেল্ড! চিরাচরিত, অথচ নতুন। সহজ, অথচ গভীর। মুচমুচে, কিন্তু বিষাদময়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
একটু সহজ কথায় লিখি। লেখক 'কলকাতা নুয়া' থেকে 'বর্ষণ অধিক'-এ আসতে যে পথ ধরেছেন, তাতে বোঝাই যায়, তাঁর গোয়েন্দা গল্প আর গোয়েন্দা গল্প শুধু নেই। 'অজ্ঞাত পরিচয়..' এর যে প্লটে প্লটের অভিনবত্ব মুছে এক মেলানকলিক, বহুস্তরীয়, রাত্রিকালীন কমপ্লেক্সিটি ঢুকে পড়েছিল, 'বর্ষণ অধিক'-এ সেটা আংশিক ভাবে বিমূর্ত রূপ নিয়েছে। মেঘ বৃষ্টি রোদ্দুরের মোড়কে বন্দি জোড়াখুনের কেস আসলে স্পেসটাইমকে অতিক্রম করে একটা প্রজন্মের জীবনদর্শন তুলে ধরেছে। লেখক ইচ্ছাকৃত ভাবে টাইমলাইন তছনছ করে এমন একটা সময়কে তুলে ধরেছেন, যেখানে এই অপরাধ সম্ভব, এই অপরাধের উদ্দেশ্য জাস্টিফায়েড, এই অপরাধের ডিটেকশন আর ফয়সালাও ভ্যালিড। হয়তো আজকের সময়ে নয়, হয়তো আশির দশকে নয়, হয়তো কানাইয়ের অন্য কোনও কাহিনিতে নয়, কিন্তু 'বর্ষণ অধিক' এর টাইমলাইনে এই গল্প জাস্টিফায়েড। (এবং, বাস্তব টাইমলাইন মেন্টেন করার কোনও দায় লেখকের নেই।)
এই বইয়ে গল্পের চাল আরো ছন্দময়ী, আরো পোয়েটিক, আরো বেশি অভাজার্ভেন্ট, কিন্তু ক্লাইম্যাক্সের চমক বা রহস্য সমাধানের ব্যাগেজ কলমকে থমকাতে দেয়নি। যদি কারো মনে হয়, কী হল? কিছুই তো তেমন হল না? তাহলে উত্তর, যা হল, তাই হয়ে থাকে! সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, পুলিশের গোয়েন্দারাও নস্যি টিপে মাঝেমধ্যে লেখকের মতো কল্পনা করে ফুটোফাটা বুজিয়ে নেন। এই সেই অতিবাস্তব পুলিশ কাহিনি, যা কোনোদিন কেউ বাংলায় লেখেনি। এই কাহিনি পুলিশ প্রসিডেরালের মোড়কে সাহিত্যের এমন একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল (অন্তত আমার কাছে) যা ঘুরেফিরে পড়ে মনে করব, বাংলায় এমন একটা বই লেখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
'কলকাতা নুয়া' পড়ে কানাইচরণের ফ্যান হয়েছিলাম, এসি হয়েছিলাম 'অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির দেহাবশেষ উদ্ধার' পড়বার পরে। বস্তুত, বাংলায়, অত ভাল এবং বিস্তারিত পুলিশ প্রোসিডিওরাল এর আগে, আমি অন্তত পড়িনি। শুধু পুলিশি কচকচি তো নয়, সেসিল বার থেকে মদের চাট, সৌভিক এবং রেকর্ড সেকশানের ম্যাদামের সঙ্গে ওভার-দ্য-পেগ ইন্টার্যাকশন গুলো, বা পুলিশের অন্দরমহলের কোন্দল, শহর কলকাতার বর্ণনা - সব মিলিয়ে গল্পগুলো শুধুমাত্র রহস্য গল্প-উপন্যাস হয়ে থাকেনি, কিছুটা সামাজিক গল্পও হয়ে উঠেছে বইকী!
তাই, সচরাচর আমি যেটা করিনা, 'বর্ষণ অধিক'-এর ক্ষেত্রে, সেটাই করে বসলাম। একটা আগাম প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করলাম বইটা।
শুরুটা দারুণ ছিল। ১৯৮৩ সালের ঘটনা, কানাইচরণ তখন সবেমাত্র লালবাজারের হোমিসাইড বিভাগে যোগ দিয়েছেন, এবং মতি লাহিড়ীর কাছে কাজ শিখছেন। সেই বছর কলকাতায় বেশ বৃষ্টি হয়েছিল, তাই গোটা ঘটনাক্রমের মধ্যেই একটা সেপিয়াটোন রয়েছে, খানিকটা আলস্য, কিছুটা মেদুরতা, ভেজা-ভেজা ব্যাপার, সোঁদা-সোঁদা গন্ধ - সব মিলিয়ে দারুণ পরিবেশ।
সব রহস্য নিপাট, গোল হয়না, তার সমাধানও সবসময় নিখুঁত হয়না। খানিকটা গোঁজামিল দেওয়া যেতেই পারে, পুলিশ অনেক সময়েই অন্য জরুরী কেসের দোহাই দিয়ে চলতি কেসকে গোঁজামিল দিয়ে মিলিয়ে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এই গল্পের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, এবং স্বয়ং ডিসিসাহেব উপন্যাসের শেষ বাক্যে সেটা প্রকারান্তরে স্বীকারও করে নিয়েছেন।
কিন্তু, আমার অভিযোগ সেখানে নয়। একটি উপন্যাস পড়ার সময়, কেবলমাত্র শেষটুকুই আমার লক্ষ্যে থাকেনা। বস্তুত, পথটাই আমার বেশি ভাল লাগে, গন্তব্যের চেয়ে। কানাইচরণের প্রথম দুটো বই পড়ে সেই ধারণা আরো পোক্ত হয়েছিল।
কিন্তু, এই উপন্যাসের পথটা বড় বন্ধুর, বড্ড বেশি খানাখন্দ। হাবিলদার দেবদূত পাকড়াশী, যিনি প্রৌঢ়, তাঁকে আপনি-তুমি সম্বোধনের কনফিউশ্যানে বারংবার উপন্যাসের তাল কেটেছে। দেবদূতকে দিয়ে শুরু হলেও, পরে সেটা প্রায় সব ব্যক্তির ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে।
ব্রজেন দত্তের বয়স বলা হয়েছে ষাট-পঁয়ষট্টি, তিনি কেমন করে বছর ষাটেকের লালিমা ভট্টাচার্যকে 'মাসিমা' সম্বোধন করবেন?
এতকাল জানতাম যে, ব্ল্যাকমেলারকেই খুন করা হয়। তবে এক্ষেত্রে জানলাম যে, ব্ল্যাকমেলার নিজেই ভিক্টিমকে খুন করে দিল! অবশ্য অনেক কিছুই আমার অজানা।
'আজকাল' পত্রিকা শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে, গৌরকিশোর ঘোষের হাত ধরে। 'সান্ধ্য আজকাল', যদ্দূর জানি, প্রকাশ হতে থাকে অনেক পরে। তবে ১৯৮৩ সালেই পাওয়া যেত কিনা, জানা নেই।
স্টোনম্যান ১৯৮৩ সালের ঘটনা নয়, আরো পরে ঘটেছে। লেখক হয়তো অন্য স্টোনম্যান মীন করেছেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে 'পেব্লম্যান' নামটা যথাযথ হত, বা 'রকম্যান'। শাহরুখ খানের মতনই, স্টোনম্যানেরও কোনো শাখা নেই।
খানাখন্দের তালিকা আর বাড়াবো না...
কাজেই, এত খানাখন্দ পেরোতে হলে, পথ কি আর মসৃণ থাকে? তখন মনে হতে বাধ্য, ওরেবাবা রে, শেষ হলে বাঁচি!
কিন্তু রাজর্ষি লিখতে জানেন। যে অধ্যায়ে কানাইয়ের সঙ্গে কল্যাণীর আলাপ হয়, সেই অধ্যায়টা বড়ই মধুর, ভীষণ ভাল লেগেছে। এরকম আরো ভাল-লাগার জায়গা আছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বইয়ের জায়গায় জায়গায়।
তাহলে, এই খানাখন্দগুলো? সেগুলো কি তবে যত্নের অভাব? মনোযোগের অভাব?
গত বছর রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের "কলকাতা নুয়া" নিয়ে একটা বেশ ভূয়সী প্রশংসা-মূলক রিভিউ দিয়েছিলাম, ও গোয়েন্দা কানাইচরণের ভবিষ্যৎ কার্যকলাপ পড়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম।
বলতে খারাপ লাগছে, বিশাল প্রত্যাশা তৈরী করার পর থেকে কানাইচরণ যারপরনাই হতাশ করেছে।
এই বইমেলায় দেখলাম কানাই-সিরিজের তৃতীয় বই বেরিয়েছে, "বর্ষণ অধিক"। সিরিজের তিনটে বইয়ের মধ্যে এটার কভার ডিজাইনটা সবথেকে চিত্তাকর্ষক, আর ভালো কভার আর্টের প্রতি আমার কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে, তাই কিনে ফেললাম । গল্পের সেট-আপটা ভালোই করেছেন লেখক। ১৯৮৩ সালের এক ঘোর বর্ষার রাতে ওপরমহলের নির্দেশে যাদবপুরে একটি খুনের প্রাথমিক তদন্তে গিয়ে তরুণ কানাইচরণ আবিষ্কার করে খুন একটি নয়, দুটি। প্রথম খুনটি এক গৃহবধূর, ও দ্বিতীয় খুনটি একই পাড়ায় পৃথক বাড়িতে থাকা তাঁর শাশুড়ির। এর মধ্যে গৃহবধূটির স্বামী বেপাত্তা। প্রাথমিক তদন্তেই দুই মৃতব্যক্তির চরিত্রও মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়।
ব্যস... ঘ্যাঁচ করে ব্রেক। তা-না-না-না করে পুলিশের অনুসন্ধান চলতে থাকে। আর ন্যারেটিভের সিংহভাগ দখল করে বসে কানাইয়ের দরিদ্র পরিবার, হাওড়ার তস্য-গলির মধ্যে তাদের ছোট্ট বাড়ি, বড়োলোক সুন্দরী প্রেমিকার সঙ্গে বাড়তে থাকা ব্যবধান ও শেষমেশ বিচ্ছেদ। এর মধ্যে আরও একটি খুন হয়, ও তার অনুসন্ধানে গিয়ে কানাই কাজের কাজ বিশেষ কিছুই করে উঠতে পারে না; বরং এরই মধ্যে তার হবু বৌয়ের সঙ্গে তার আলাপ হয়ে যায় কাকতালীয় ভাবে। যখন এটাও শেষ করতে পারবো কি না ভাবছি, তখনই deus ex machina প্রয়োগ করে লেখক দুর্বল একটি মোটিভ ও ততোধিক দুর্বল ও জোড়াতাড়া দেওয়া একটা সমাধান খাড়া করেন। গৃহবধূর শাশুড়িকে খুনের মোটিভটা তবু মেনে নেওয়া যায়, গৃহবধূকে খুনের একটা পরিষ্কার মোটিভ চোখের সামনে জ্বলজ্বল করা সত্বেও লেখক একটা হাবিজাবি মোটিভ গুঁজে দিলেন। মাইরি বলছি, জীবনে বহু জালি গোয়েন্দা-কাহিনী পড়েছি, কোনোদিন এই অভিজ্ঞতা হয়নি যে আমি পাঠক হিসাবে স্পষ্ট মোটিভ দেখতে পাচ্ছি, অথচ লেখক দেখতে পেলেন না। আর তৃতীয় খুনের মোটিভটা একেবারেই দাঁড়ায় না।
সমাধানে যে অনেক ফাঁক-ফোকর রয়ে গেলো, তা লেখক এক চরিত্রের মুখ দিয়ে স্বীকার পর্যন্ত্য করিয়ে নিলেন। তাহলে এই পুরো গল্পটা লেখাই বা হলো কেন? বইমেলার চাপে? রাজর্ষিবাবুর লেখার হাত মন্দ নয়, তবে উনি হয়তো সামাজিক উপন্যাস লেখায় বেশি স্বচ্ছন্দ; "কলকাতা নুয়া"-র সাফল্যের পর কিছুটা বাধ্য হয়েই গোয়েন্দা গল্প লিখছেন।
সম্প্রতি শেষ করলাম রাজর্ষির লেখা "বর্ষণ অধিক" উপন্যাসটি। এটিকে ডিটেকটিভ উপন্যাস না বলে একজন পুলিশ সাব ইনস্পেক্টরের একটি কেস সংক্রান্ত আত্মকথন বলা যেতে পারে। এবং বলতেই হবে, এ বিষয়ে রাজর্ষি একদম সৎ একটি চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশের কাজের নানারকম প্রসিডিওরের বাঁধা বিপত্তি, নানাবিধ ব্যক্তিগত সমস্যা এমনকি বেশ কিছু জায়গায় অক্ষমতাও সামনে এসেছে আমাদের। পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন, এস আই কানাইচরণ বা তার ঊর্ধ্বস্থন মতিদার দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিলে, কানাই পুলিশের প্রোফাইল নিতান্ত সাদামাটা। তাকে এমনকি "মতিদার চ্যালা" ভাবলেও খুব একটা ভুল ভাবা হয় না। জোড়া খুনের কেসে তার ভুমিকা কম না হলেও অপরিহার্য কিছু না। বরং বহু জায়গায় দেখা যায়, তার অজান্তেই মতিদা কেস নিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। কানাইচরণ প্রেমে বাঁধা খায়, ক্রাইম সিনে এলোমেলো হাঁটে, মাঝে মাঝে চা দিয়ে সুজি বিস্কুট খায় এবং অদরকারী জায়গায় গিয়ে নিতান্ত কপালের জোরে মুল্যবান লিড পেয়ে যায়। কিন্তু ছেলেটা লেগে থাকে, হেরে গেলেও হারিয়ে যায় না সহজে। প্রসঙ্গত, মিশ্রাকে তার খারাপ লাগলেও, নিরপেক্ষ ভাবে ভাবলে মিশ্রা বেশ দক্ষ অফিসার বলেই মনে হয়। হতে পারে সে কিছুটা "ruthlessly efficient" এবং টিমম্যান নয়। কিন্তু সেরকম তো হয়েই থাকে।
আর বলতে হবে রাজর্ষির eye for detail এবং ইতিহাস সচেতনতার কথা। তার লেখায় এই গুণগুলি দুর্দান্ত এক কথায়। গল্পের টুইস্ট আছে, কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় টুইস্ট লেগেছে "বাবাজীবন"।
বন্ধু রাজর্ষিকে অভিনন্দন, আরও দারুণ লেখা আসুক তোমার কলম থেকে।
রাজর্ষি বাবুর লেখা আমার বেশ ঝকঝকে লাগে। ওনার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ আমার মতে হলো গিয়ে, কলকাতা পুলিশের কাজের পদ্ধতির একটা বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দেওয়া। আমরা ওপর থেকে শুধু পুলিশ দেখি, কিন্ত ডিপার্টমেন্ট এর ভিতরের মেকানিজমটা অজানা থেকে যায়, যেটি রাজর্ষি বাবু বেশ ভালো ফুটিয়ে তোলেন। এবার আসি প্লটের কথায়। রহস্যের জাল তৈরি করা আর তাকে ছাড়ানো, এই দুটিই main স্তম্ভ mystery বইয়ের। এখানে প্রথমটা বেশ ভালো হলেও, মানে রহস্য যেটা পাকানো হয়েছিলো সেটি বেশ জটিল, দ্বিতীয় ভাগ মানে রহস্য ছাড়ানোর পার্টটা আমার মতে বেশ ঢিলেঢালা লেগেছে। যে ফ্যাক্টগুলোর ওপরে ভিত্তি করে কেস সাজানো হবে সেগুলো খুব circumstancial। যিনি কালপ্রিট তার মোটিভও বড়ই ঢিলে। বই এর শেষে একটা "যা বোঝার বুঝে নিন" মার্কা ব্যাপার থেকে যায়। তাই বলতে দ্বিধা নেই যে বেশ উৎসাহ নিয়ে শুরু করলেও শেষে আশাহতই হতে হয়েছে। কয়েকটা ব্যাপার খটকাও লেগছে, ১. ৮৩ সালে কি packaged drinking water পাওয়া যেতো? কানাইচরণ শিয়ালদহ স্টেশনে একটা জলের বোতল কেনেন। ২. ১৩০ নম্বর পাতায়, ছাপাই গণ্ডগোল এর জন্য কি শিয়ালদহ স্টেশন, হাওড়া স্টেশন হয়ে গেছে? আর সেই আবার, এখনকার থ্রিলার বই এর প্রচ্ছদ এতো cliched আর বাজে হয় কেনো???????
অত্যন্ত সাবলীল বর্ণনা আশির দশকের কলকাতা ও পুলিশের কর্ম পদ্ধতির। এক রাতে পড়ে শেষ করলাম। কিন্তু শেষটা ছোট গল্পের মতো খাপছাড়া রয়ে গেল। তাই একটা তারা কাটা গেলো।
অসামান্য আবহ। শেষের হুড়োপাটি সাংঘাতিক রকম বাস্তব, কেস শেষের আবছাভাব, সব বুঝেও কিছু না করতে পারার/চাওয়ার ভাব খুব চেনা আর দেখা। এই সিরিজের সবচেয়ে ভাল বই আমার কাছে।
একটু অন্যরকম গোয়েন্দা কাহিনী হিসাবে এই বইটিকে দেখা যেতে পারে। যদিও গোয়েন্দা কানাইচরণ এর হাইপ বিরিয়ানির মতন কিন্তু এই গল্পটিকে আলুকাবলি ছাড়া আর কিছু বলা যাচ্ছে না