বইটিতে গোপাল ভাঁড়ের সম্বন্ধে তথ্য বলতে আছে এইক'টি কথা~ ১. 'নবদ্বীপ কাহিনি' ছাড়া গোপালের সম্বন্ধে আর একটিও লিখিত ঐতিহাসিক উপাদান নেই। ২. কিংবদন্তি এবং প্রচলিত গল্প (যার অধিকাংশই বীরবল, তেনালি রামা, নাসিরুদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের প্রসঙ্গেও চলে) ছাড়া গোপালের কোনো অস্তিত্ব নেই। ৩. গোপালের জন্মস্থান হিসেবে ঘূর্ণি বা তাঁর দাদা'র বংশধর হিসেবে কলকাতার একটি পরিবারকে ভাবা স্রেফ ইচ্ছেমতো কল্পনার ফসল। এই বইয়ের বাকি সবটাই একই কথার পুনরাবৃত্তি, গোপালের নামে প্রচলিত নানা গল্প, আর বিদূষক বা Jester সম্প্রদায়ের তথা হাসির সমাজতাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যায় ভর্তি। এর তুলনায় 'তবুও প্রয়াস' পত্রিকার 'গোপাল ভাঁড় সংখ্যা'-টি অনেক বেশি ভারসাম্যযুক্ত এবং বৈচিত্র্যময় আলোচনায় সমৃদ্ধ। এটা 'ঠিকাছে' গোছের।
এই বইটি যেন সেই ছাত্রের মত, যিনি ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়েছেন, অথচ মাথায় ঘুরছে “গোপাল ভাঁড়” সিরিয়ালের চিত্রনাট্য! লেখকের অনুসন্ধান-পিপাসা যেন এক মুনিঋষির হাতে GPS তুলে দিয়ে বলা— “চলো, স্বর্গলোক খুঁজে বের করি!” বইয়ের ৮০% কনটেন্ট আমরা আগে থেকেই চিনি—স্কুলের পাঠ্যবই, ঠাকুরমার গল্প বা শিশুসাহিত্যের পাতায়। নতুন কিছু নয়, পুরোনো গল্পগুলোকেই শব্দ সাজিয়ে, নাম বদলে আবার পরিবেশন করা হয়েছে। পাঠকের কাছে তা 'ওভেনে গরম করা' চিঁড়ে-বাতাসার মত—না তাতে নতুন স্বাদ, না তাতে নতুন ভাবনা। বইয়ের শিরোনাম যেভাবে এক ‘সন্ধান’-এর প্রতিশ্রুতি দেয়, তার চরম বিপরীত ঘটেছে ভিতরে। নতুন কিছু নয়, পুরনো কিছুই ফিরিয়ে আনা হয়েছে—তাও আবার তথ্যসূত্রহীন, গবেষণাবিহীনভাবে। গোপাল ভাঁড়ের জন্মস্থান ঘূর্ণি, কোনো “দাদার দাদার ভাইয়ের পুত্র” হয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে নাম জানা পরিবার—এসব ইতিহাসের খোলসে ঢুকিয়ে কল্পনাকে সত্যি রূপে প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা। যেন কেউ প্রমাণ করছে, “রূপকথার রাজপুত্র ছিলেন বাস্তবে, কারণ এক রাতে স্বপ্নে দেখা গিয়েছিল!” এই বই ইতিহাসের অনুসন্ধান নয়, বরং একধরনের কল্পনামিশ্রিত, পুনরাবৃত্তিময়, রেফারেন্সবিহীন প্রচেষ্টা। হাসির বই হয়েও নিজেই হয়ে উঠেছে হাস্যরসের বস্তু। বই পড়ে পাঠক শুধু বলেন— “আহা, যদি সত্যিই সন্ধানটা হতো!”