চলচ্চিত্র এক আলো-ছায়ার জগৎ। সেই জগতে যাঁরা চলে-ফিরে বেড়ান, তাঁদের নিয়ে আমাদের মনে থাকে অনেক কৌতূহল। শুধু কেচ্ছা-কাহিনি নয়; আমরা এও জানতে চাই~ কেন তাঁরা এই পেশায় এলেন? কাজের সময়টা বাদ দিলে তাঁদের দিন কাটে কীভাবে? কোনো বিশেষ শখ-আহ্লাদ কি আছে তাঁদের? বা কোনো হবি? চলচ্চিত্র নামক শিল্পের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা কী ভাবেন? আজ অন্তর্জালের সৌজন্যে অভিনেতাদের জীবনে 'ব্যক্তিগত' বলে বিশেষ কিছু নেই। ছবিতে, সংলাপে, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা পর্দার বাইরেও যেন আরও এক বা একাধিক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমাদের কাছে উন্মোচিত করে দেন সবকিছু। কিন্তু আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে পরিস্থিতি একেবারেই অন্যরকম ছিল। তখন দর্শক তথা পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্ত করার জন্য 'মাসিক বসুমতী' পত্রিকা অভিনেতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করেন। ঠিক কথোপকথন নয়; বরং আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া রিপোর্ট আর সুলিখিত গল্পের মতো করেই পরিবেশিত হত সেগুলো। সেইসব হারিয়ে যাওয়া কথাবার্তার মধ্য থেকে চল্লিশটি আলাপচারিতা আমাদের কাছে ফিরে এল এই চমৎকার বইটির মাধ্যমে।
যে চল্লিশজনের আলাপচারিতা এই বইয়ে স্থান পেয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন সেই আমলের ডাকসাইটে 'স্টার'-রা— যাঁদের অনেকেই আজ বিস্মৃত। আবার সে-সময় যাঁরা সবে উদীয়মান এবং কথায় স্পষ্টভাবেই বলেছেন "আরও দশ বছর অভিনয় করে যাওয়ার ইচ্ছে আছে" তাঁদের নাম দেখলেও বিলক্ষণ চমকে উঠতে হয়। খ্যাতির নশ্বরতা নিয়ে একটা প্রবন্ধই লিখে ফেলা যায় এই বইটি পড়ে! সংকলক প্রত্যেক অভিনেতার কাজের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ দিয়েছেন সাক্ষাৎকারের আগে। সেটি পড়ে পাঠকেরা বেশ কিছু পুরোনো তথা স্বর্ণযুগের সিনেমার নাম নতুন করে জানবেন। আলাপচারিতা পড়ে এই চিত্রতারকাদের অন্তর্জীবনের এক অনন্য ছবি চোখের সামনে ফুটে ওঠে। গুজব, গল্প, স্ক্যান্ডাল— এ-সব ছাপিয়ে দেখা দেয় কারও বই পড়ার নেশা, কারও ছবি আঁকার শখ, কারও আবার ছদ্মনামে কবিতা বা গান লেখার কথা। রক্তমাংসের ওই মানুষেরা স্বপ্নলোক থেকে নেমে এসে উল্টোদিকের চেয়ারে বসেন— হালকা, কিছুটা আড্ডার মেজাজে। তাঁদের সান্নিধ্যে সময়টা দারুণ কাটে কিন্তু!
বইটির ছাপা ও বাঁধাই চমৎকার, মুদ্রণ শুদ্ধ এবং ছবি-সহ বর্ণসংস্থাপন নয়নসুখকর। বাংলা ছায়াছবির ইতিহাস বা তার কুশীলবদের ব্যক্তিগত, কিছুটা অনালোচিত মনোজগতে আগ্রহী হলে এই বইটিকে উপেক্ষা করবেন না।