পাঠ প্রতিক্রিয়া: রিগা থেকে সারায়েভো
লেখক সঞ্জয় দে এঁর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, বলকান, বাল্টিক অঞ্চলের ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে বই রিগা থেকে সারায়েভো।
আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই টালমাটাল সময়ে লেখক ব্যক্তিগত জীবনে যে কৌতূহলে আবৃত ছিলেন, সেই সূত্র ধরে লেখক চষে বেড়িয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া দেশগুলোতে। ইতিহাসের পথে ধরে তিনি হেঁটেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার অলিগলিতে। পোল্যান্ডের আউসভিতজ, বিরকানাও ক্যাম্প, মায়দানেক ক্যাম্প।
পোল্যান্ডের ক্রাকভ শহরের অদূরে আউসভিতজ গ্রামে নাৎসিরা গড়েছিল গত শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ শব তৈরির কারখানা। পোলিশ, রাশান যুদ্ধবন্দী আর ইহুদি নিধনের জন্য কুখ্যাত এই ক্যাম্পে প্রায় এগারো লাখ মানুষের প্রাণ হরণ করে।
জার্মান কেমিক্যাল কোম্পানি জাইক্লন বি গ্যাস ( সায়ানাইড কীটনাশক) তৈরি করত ইঁদুর মারার কাজে। স্ফটিকদানার মতো কীটনাশক বাতাসের সংস্পর্শে এলেই গ্যাসে পরিণত হয়। আর এক কৌটা জাইক্লন বি গ্যাস দিয়ে খুন করা সম্ভব কয়েকশো মানুষ। আর এই গ্যাস চেম্বারে নিধনের পরে মৃতদের নিয়ে যাওয়া হতো দহন ভবনে। আর দাহ করার আগে প্রতিটি মৃতদেহে সোনায় বাঁধানো দাঁত আছে কিনা, আর তা থাকলে উপড়ে ফেলা হতো। এমনকি মৃতদের অঙ্গহানি করেও খোঁজা হতো লুক্কায়িত সম্পদ। এরপরে সেখানে পুড়িয়ে ভস্ম করা হতো তাদের।
নৃশংসতা শুধু এখানেই থেমে ছিল না, ক্যাম্পের হাসপাতালে বন্দীদের ওপরে করা হতো কুখ্যাত পরীক্ষামূলক প্রকল্প। জোসেফ মেঙ্গেলে/ ওঙ্কেল মেঙ্গেলে নামে পরিচিত এই দানব শিশুদের ওপর চালাত গবেষণার নামে বিকৃত মস্তিষ্ক প্রসূত অত্যাচার। খুঁজে খুঁজে জমজ শিশুদের ওপর প্রয়োগ করত তার প্রকল্প। কালো চোখের মণিতে তরল প্রবেশ করিয়ে দেখত চোখের মণিতে গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে কিনা।
লেখক আউসভিতজ ভ্রমণের সময় দেখতে পান ক্যাম্পের সামনে ঝুলানো আছে ‘আরবাইটজ মাক্ট ফ্রাই’ অর্থাৎ কর্মেই মুক্তি। এ যেন বন্দীদের সাথে করা নাৎসিদের এক পরিহাস। আউসভিতজের ক্যাম্পে সারি সারি লালচে ইটের ব্যারাক। এই ক্যাম্পে এখনও আছে গ্যাস চেম্বারের নমুনা। করিডরে লাগানো আছে শত শত মানুষের ছবি যারা এখানে যুদ্ধবন্দী ছিল৷ ফ্রেমবন্দী সারি সারি ছবির মাঝে শিশুদের হাসিমাখা মুখের ছবি হৃদয়কে টুকরো টুকরো করে দেয়৷ হয়তো এই শিশুরা জীবনে প্রথম বারের মতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আর তারা বুঝতেও পারেনি কি অপেক্ষা করে আছে তাদের সামনে।
আউসভিতজের মুল ক্যাম্পের দূরে দ্বিতীয় ক্যাম্প ‘বিরকানাও’। এই ক্যাম্পটি বানানো হয়েছিল হিট * লার ঘোষিত ইহুদিদের সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে।
‘Schindler's List’ মুভিতে বিরকানাও ক্যাম্প দৃশ্যায়িত হয়েছিল। আরেকটা ব্যাপার লেখক উল্লেখ করেছেন এই শিন্ডলারস লিস্ট সিনেমা নিয়ে। শিন্ডলার নামের এক সাহেব কারখানা তৈরি করে ইহুদিদের নিয়ে আসতেন তার কারখানায় কাজ করানোর জন্য, তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল আউসভিতজ ক্যাম্প থেকে তাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্য। এভাবে তিনি বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বহু ইহুদির প্রাণ।
লোকচক্ষুর আড়ালে আরেকজন যিনি ইহুদিদের জন্য কাজ করেছেন, তিনি হলেন পানকিভিজ৷ ক্রাকভ শহরে এক ফার্মেসি'র মালিক। ফার্মেসির নাম হলো আপটেকা পড অরলেম, যার বাংলা অর্থ হলো ইগল ফার্মেসি। পানকিভিজ মশাই নাৎসিদের বলে কয়ে এই শহরে দোকান চালানোর পাস জোগাড় করে ফেলেছিলেন। তো, এই ঘোর অমানিশায় তিনি যেন ছিলেন এক আলোকবর্তিকা। বিনা মূল্যে ঔষধ সরবরাহ, খাবার, শত্রুদের খবরাখবর পৌঁছে দিতেন ইহুদিদের নিবাস ঘেটটোতে।
লেখক খোঁজ পেয়েছেন পোল্যান্ডের এক লবণখনির। সেই লবণখনির যাওয়ার পথে বাসে চড়বার অভিজ্ঞতাটা বেশ দারুণ। বাসে উপচে পড়া ভীড়, আর এক বুড়ো সিট না পেয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে দাঁড়িয়ে রইলে। কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, হয়তো ওদেশে এসব আদবকেতার বালাই নেই। কিন্তু লেখক তো চর্চা লব্ধ সংস্কৃতি ভুলে যেতে পারেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জায়গা ছেড়ে দিতেই সেই বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়ে মৃদু স্বরে বললেন, জিঙ্কুয়ে, জিঙ্কুয়ে।
লেখক ক্রাকভ শহরে তার হোস্টেলের কাছে পেয়ে যান এক বাংলাদেশির বিরিয়ানির রেস্তোরাঁ। পোল্যান্ডের ক্রাকভ শহরে বাঙালি বিরিয়ানি! আহা!!
আউসভিতজ ক্যাম্পে নির্যাতনের অনেক চিহ্ন লোপাট হয়ে গেলেও পোল্যান্ডের আরেক শহর লুবলিন এ আরেকটা ক্যাম্প আছে। মায়দানেক ক্যাম্প। এ ক্যাম্প ধ্বংস করার সময় পায়নি পলায়নপর জার্মান বাহিনী। মায়দানেক ক্যাম্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল রাশান যুদ্ধবন্দী রাখার জন্য। পরে রাশান, ইহুদিদের ঢল নামে এই যুদ্ধবন্দীদের তালিকায়।
১৯৪৩ সালের ৩রা নভেম্বর নাৎসিরা ১৮ হাজার ৪০০ জন বন্দীকে গুলি করে খুন করা হয়। কী ভয়াবহ নৃশংসতা!
এই ক্যাম্পেই এক লাখ ইহুদি আর প্রায় দুই লাখ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীভুক্ত মানুষকে খুন করা হয়।
লেখক ভ্রমণ করেছেন বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়ার শহর ভিলনুসে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে স্বাধীন হয় লিথুয়ানিয়া। তবে এই স্বাধীনতা বিনা রক্তে আসেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত পঞ্চাশটি বছর ধরে লিথুয়ানিয়ার ভিলনুস শহরে দুই নম্বর, অকু গাতভ সড়ক পরিচিত ছিল যমালয় হিসেবে। এখানেই কেজিবি'র কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই পঞ্চাশ বছরে অসংখ্য লিথুয়ানিয়ানদের যাদের মনে করা হতো সোভিয়েত আগ্রাসনের পথের বাঁধা, তাদের পাঠানো হতো সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে, কিংবা কিরগিজস্তানের বিরান স্তেপে৷ হতভাগা মানুষেরা এটাও জানতো না কি তাদের অপরাধ! এই জাদুঘরে পরিদর্শনের সময়ে লেখক পরিদর্শন খাতায় লিখে এসেছেন, ‘মনুষ্যত্বের জয় হে’।
লেখক ভ্রমণ করেছেন হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে। দানিয়ুব নদীর এপার ওপার দুই ভাগে বিভক্ত এই শহর- বুদা এবং পেস্ট। এই শহরেই এসেছিলেন রবিঠাকুর। বুদাপেস্ট শহরের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। রোমান, রেঁনেসা, বাইজেন্টাইন, ক্ল্যাসিজম, গথিক, রোমান্টিক, আর্ট নুভহ- এই স্থাপত্যরীতির বিবর্তন যেন মেলে ধরেছে শহরের ভবনের স্থাপত্য নকশা।
তাই তো এই শহরে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন কবিগুরু,
❝আমার লিখন ফুটে পথধারে
ক্ষণিক কালের ফুলে
চলিতে চলিতে দেখে যারা তারে
চলিতে চলিতে ভুলে।❞
তবে শুধু সৌন্দর্য নয়, অসৌন্দর্যের তিলকও আছে এ শহরে। কেজিবি'র বিভীষিকার জাল এখানেও ছড়িয়ে রেখেছিল। আন্দ্রেসি স্ট্রিটে রয়েছে হাউজ অব টেরর। নামেই যার পরিচয়। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে অন্যায়ের জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল এই ছোট্ট দেশটির ওপরে।
লেখক বাল্টিক দেশ লাটভিয়াতে দুভাগা নদীর তীরের শহর রিগাতে ভ্রমণ করেছেন। এই দেশেই ত্রিশ বছর আগে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে রিগা শহরে এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁকে সহ অন্যান্য সাহিত্যিকদের দেখানোর চেষ্টা করেছেন সোভিয়েত সরকারের দয়ায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াতলে তারা কতটা ভালোভাবে বেঁচেবর্তে আছে।
আরেকটা ব্যাপার হলো, হলোকাস্ট নিয়ে আমরা জানি, পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া - এই তিন দেশের নামই সামনে আসে। কিন্তু লাটভিয়ায় যে কতবড় হলোকাস্ট হয়েছিল, এটা অনেকেই অজানা। ১৯৪১ সালে জার্মান বাহিনী লাটভিয়ার ৯০ ভাগ জনসংখ্যা ইহুদি, সংখ্যায় ৮০ হাজার ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়!
লেখক ঘুরে দেখেছেন যুগোস্লাভিয়ার দেশগুলো। দেখেছেন তুঁতরঙা সাগর অ্যাড্রিয়াটিকের কোলঘেঁষে বসনিয়ার শহর মোস্তার। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে চষে দেখেছেন ১৯৯২ এর উত্তাল সময়ের যুগোস্লাভিয়া ভাঙনের দেশগুলো। বসনিয়া গণহত্যার ইতিহাস, সেই সারায়েভো শহর, এখনো ক্ষতের ওপরে প্রলেপ পড়েনি সেই শহরে। সেই শহরের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। জেনেছেন সেই বিভীষিকার কথা।
বই পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যেই আমি দুম করে বই বন্ধ করে দেই, চিন্তা করি, আনমনা হই। কিন্তু এই বইটা পড়তে যেয়ে বারবার বই বন্ধ করতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় শূন্যতা নিয়ে, বিষণ্নতা নিয়ে পড়ে যেতে হয়েছে। রেমার্কের গল্পের মতো শূন্যতা নামে পাঠজুড়ে। লেখক শুধুমাত্র ইতিহাস আর স্থানিক বর্ণনা দেননি, জেনেছেন ঐ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা৷ তাদের গল্পে এই বই হয়ে উঠেছে ডকুমেন্টারি হিসাবে। লেখার অন্যতম গুণ হলো পরিমিতিবোধ। এজন্য গল্পগুলো তড়তড় করে পড়ে গেছি এক রাশ বিষণ্ণতা নিয়েও। প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে লেখক জয়গান গেছেন মানুষের।
বিগত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া দুটো বিশ্বযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ- আর এতো এতো মানুষের প্রাণনাশ। আসলে এত যে ইজম, তা আসলে কার জন্য? মানুষের জন্য? না কি মানুষ ইজমের জন্য??
এই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় কোনো 'বাদ' নেই। মানুষই সবচেয়ে বড় ইজম। না হলে এত ইজমের কোন্দলে পড়ে মানবতাবাদের গলা কাটা যাবে।
বই পরিচিতি:
বইয়ের নাম: রিগা থেকে সারায়েভো
লেখক: সঞ্জয় দে
প্রকাশনী: নটিলাস - Nautilus
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২১৫
ঘরানা: ভ্রমণ গল্প সংকলন
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা।