ঠিক কোত্থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। কিছু কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে মনের ভেতরে প্রথম থেকেই একটা সাইরেন বাজতে থাকে। আলোচ্য বইটি, তেমনই এক গ্রন্থ। শারদীয়া কিশোর ভারতীতে যখন ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাপ্রভুকে কেন্দ্রে রেখে একটি কিশোর উপন্যাস লিখে ফেললেন, তখনও ব্যক্তিগত পর্যায়ে খুব একটা আগ্রহ বোধ করিনি। লেখক রচিত ফিকশনের প্রতি ইদানিং আগ্রহ হারিয়েছি বলেই বোধহয় এহেন উদাসীনতা।
তারপর, সে জিনিসের, মার্কেট নিয়মে বই-রূপে প্রত্যাবর্তন। লেখক নিজেই যেখানে প্রকাশনীর কর্ণধার। তখন, এটাই তো স্বাভাবিক। হয়তো লোভ সম্বরণ করে এ জিনিস কিনে ফেলতাম না। হয়তো কি? না কেনারই কথা ছিল আমার। কিন্তু বাধ সাধলো ওই কালান্তক প্রচ্ছদ! সুব্রত মাজির অমন মিষ্টি, স্নিগ্ধ প্রচ্ছদের টান এড়ানো চাট্টিখানি কথা না। আমিও পারিনি, যথারীতি। উইলপাওয়ার বস্তুখানা আমাতে বরাবরই কম। তার ওপর যদি কভার হতে এমন রঙিন কমনীয় পজিভিটি ঠিকরে বেরোয়, তাহলে আর কি...
উপন্যাসটি কলেবরে খুব বড় নয়। প্রায় একশো আশি পাতার পরিধিতে চৈতন্যদেবের বৃহৎ জীবনখানি তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন লেখক। লেখাটিকে দুটি অংশে ভাগ করেছেন তাই। প্রথম পর্যায়ে নবদ্বীপ সংবাদ। বিশ্বম্ভর থেকে নিমাই পন্ডিত হয়ে ওঠার কাহিনী। আন্দোলিত সব পরিচিত মুখ। জগন্নাথ মিশ্র। শচীমাতা। লক্ষী। বিশ্বরূপ, প্রভৃতি। দ্বিতীয় অংশে, পরিব্রাজক চৈতন্যদেব। শ্রীক্ষেত্রে ভক্তিমার্গ নিদর্শন। বাঙলা-উড়িষ্যা রাজনীতির ঐতিহাসিক কোন্দল। রূপ-সনাতন'দ্বয়। সম্ভাব্য মৃত্যু-রহস্য, ইত্যাদি।
তবে দুঃখের বিষয়, চূড়ান্ত অসাবধানতা ও অসংলগ্ন গল্পকথনের ব্যবহার এই বিভাজন নীতিকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলস্বরুপ, লেখাটি দাঁড়িয়েছে এমন একটি ঘরের মধ্যিখানেতে, যার প্রতিটি দেওয়ালে একটি করে আয়না বিদ্যমান। কয়েকশো প্রতিচ্ছবির অধীনে কেবল একটাই অনুরণন। বিভ্রান্তি! কথায় বলে, চিবুতে না পারলে, বুঝেশুঝে কামড়াও। লেখক নিজের কলমের যাবতীয় দুর্বলতা বেমালুম অদেখা করে যা সব করতে চেয়েছেন এখানে, তাতে পাশ করা দুরস্ত, গোটা উত্তরপত্রই বাতিল না হওয়াটা ভাগ্যের সহায়।
লেখকের গদ্য বরাবরই সহজ। (নিন্দুকেরা বলবেন, কিঞ্চিৎ বেশীই সহজ যেন।) যা হয়তো বা কোনো ঐতিহাসিকের ক্ল্যাসিকাল কাঠামোয় খাপ খেতে চায় না। তবে বলতে ক্ষতি নেই, এই বইটির ক্ষেত্রে, ওনার লেখা আমার একেবারে মন্দ লাগেনি। বিশেষত ওই প্রথম অংশখানিতে। সহজ সরল লাগামহীন গদ্যে, নবদ্বীপ-নিবাসী তরুণ দামাল নিমাইয়ের রেখাচিত্রটি একেবারে খারাপ আঁকেননি লেখক। উপন্যাসের শুরুটা তাই বেশ মায়াটে। কোথাও গিয়ে, বইয়ের সমস্ত দোষ-ত্রুটি সামান্য হলেও মাফ করতে মন চাইছিল হঠাৎ।
বাচ্চা নিমাইয়ের মুখে সমাজ ও বর্ণ সংস্কারের কঠিন সব কথা অমন বুড়ো-বুড়ো সংলাপে আচমকা উপস্থাপনা করার অপরাধও ক্ষমা করে দিচ্ছিলাম, একটু হলে। হাজার হোক, তিনি ছিলেন মুক্তমনা যুগপুরুষ। একটু অবিশ্বাস ট্রাংকে তুলে রাখলাম নাহয়? এই পর্যায়ের নিমাইকে এক লৌকিক রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে রচনা করতে চাওয়াতেও সাহসের প্রক্ষেপণ দেখি। পাঠক হিসেব পাই তাকে প্রেমিকপুরুষ হিসেবে। রতিক্রিয়ারত। শৃঙ্গার রসের আবেশে কৃষ্ণ অন্বেষনে ন্যস্ত! কুণ্ঠা এড়িয়ে দেখলে, ভালোই লাগে এটুকু।
তবে ঐযে বিভ্রান্তি! এরই সাথে সমান্তরালই গৌরাঙ্গের আচার বিচরণে অবিশ্বাস্য রকমের সব দৈবী-অলৌকিকতা দেখিয়ে নিজেই নিজের সমস্ত আর্গুমেন্টে জল ঢেলেছেন লেখক। যেন মন বানিয়ে উঠতে পারেননি...উপন্যাস লিখছেন নাকি সরল হেজিওগ্রাফি! সকল ক্ষেত্রেই নিয়েছেন ইজি ওয়ে আউট। লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা অন্তরালে রেখে পাতা ভরিয়েছেন কীর্তনের লাইন দিয়ে। যা শুরুতে চমৎকার লাগলেও ক্রমশ হয়ে দাঁড়ায় পুনরাবৃত্তিমূলক। উপচে ওঠে কলমের আলসেমি।
মনটা খারাপ হওয়া তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
প্রথম অংশটি দৈর্ঘ্যে একশো পাতা। দ্বিতীয়খানি আরও ছোট! মাত্র সত্তর পৃষ্ঠার এক ত্বরান্বিত প্রহসন। যার প্রতিটি লাইনে আলগা ফাঁকি। ইনফরম্যাল অর্থে বললে, নিদারুণ বাধনহীন এই অংশে সবটাই 'শর্ট-এ সেরেছেন' লেখক। পুরীতে এসে মহাপ্রভুর প্রথম রথযাত্রাকে 'অফস্ক্রিন'-এ সেরে, মানুষটির মুখ দিয়ে বিসমিল্লাহ বলিয়েছেন মহানন্দে। আবার বঙ্গসুলতান হোসেন শাহ-এর লিপে চৈতন্যকে আল্লাহর আরেক স্বরূপ ডাকিয়ে, সেকুলারিজমের কেক কেটেছেন সাগ্রহে।
খারাপ ভাবে নেবেন না, দয়া করে। এতে কোনো উগ্র-ধাঁচের সাম্প্রদায়িক খোঁচা খাইনি আমি। কেবল এমন একটি বইয়ের মধ্যে আরেকটু বাস্তবানুগ নুয়ান্স আশা করেছিলাম বোধহয়। তার ছিটেফোঁটাও না পেয়ে, এখন বেজায় ক্লান্ত লাগছে আরকি। কেমন? নিতাই মহারাজের কথাই ধরুন না কেন। নিত্যানন্দের উল্লেখ প্রায় গোটা বইয়ে নেই বললেই চলে। গৌড়-নিতাইকে একত্রে পেতে গেলে অনেকটা অপেক্ষা করতে হয় পাঠকের। প্রায় শেষ-লগ্নে উপন্যাসে সক্রিয় চরিত্র হিসেবে নিত্যানন্দের আবির্ভাব। তবে সেও এক অতিরঞ্জিত খলস্বরূপে। লোলুপ, ভোগী, মদ্যপ এক ক্যারিকেচার।
যা হয়তো বা উপন্যাসের স্কোপের ক্ষেত্রে সৎ। তবুও এহেন দ্বিমাত্রিক পরিবেশনা বেজায় দৃষ্টিকটু। আরেকটু নুয়ান্স সহিত, বাস্তববোধ বনাম রোমান্টিসিজমের এই দ্বন্দ্বখানি তুলে ধরা যেত। ভক্তিরস সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মহাপ্রভুর ছবিকে সামনে রেখে, কতকটা স্ট্র্যাটেজিকালি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার অনন্বেষিত কাহিনী চাইলেই লিখতে পারতেন লেখক। তাতে হয়তো বা স্থান করে নিত ষড়গোস্বামী বৃত্তান্ত। নিত্যানন্দ-অদ্বৈতাচার্য মতভেদ বৈরী। বা অযাচিত গডম্যান ফুঁড়ে ওঠার চিরায়ত গপ্পো। যা আজকের এই ইসকন ইনফ্লুয়েন্সড গোড়া পৃথিবীতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করত, বলেই আমার বিশ্বাস।
পাঠকের লোকসান, লেখক সে পথে সবিস্তারে হেঁটে দেখেননি।
উড়িষ্যার রাজদরবারের অভ্যন্তরীণ অসুয়া নিয়ে সামান্য সরব হয়েছিলেন যদিও, তবুও সে জিনিস বেজায় গতে-ধরা। টেমপ্লেট ফলো করার সমান। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চৈতন্যের মুখে দরকারি কূটনীতিও বলিয়েছেন দু-এক জায়গায়। তবে, সেসব সংলাপের ধরণ পূর্বকথিত ডায়ালগের তুলনায় এতো ভিন্ন, যে পাঠক হিসেবে অবাক হতে হয়। যেন লেখক পৃষ্ঠা ফাঁকা রেখে আহার সারতে গিয়েছিলেন, সেই ফাঁকে চ্যাট-জিপিটি নামক কোনো কলমচি এসে লাইন ভরাট করে পগার পার!
আপনি বলবেন, এত ফালতু বকেন কেন বলুন তো? এক অঙ্গে অনেক রূপ, এমনটা হতে পারেনা? আমি বলব, নিশ্চই হতে পারে। নিশ্চই হয়েও ছিল। চৈতন্যদেব আর যাই হোক কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি সাধক, তিনি পন্ডিত, তিনি ক্ষুরধার সমাজ সংস্কারক। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানেদের অন্যতম, এক অবিশ্বাস্য পার্সোনালিটি! মুক্তমনা এক আলোর মানুষ! কিন্তু এমন বহুমাত্রিক মানুষটিকে বইয়ের পাতায় আবদ্ধ করা এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। সবাই পারে না। সবার সেই ক্ষমতা নেই। এই ক্যালাইডোস্কোপ আঁকতে লাগে সূক্ষ্ম সংযমগুণ। আলোচ্য বইটিতে যা একেবারেই নেই।
তবুও ভেবেছিলাম, গল্পের ছলে মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টক রচনাটুকু সৃজনশীল পন্থায় পড়তে পাবো এখানে। সে গুড়েও (পুরী সৈকতের স্বর্ণালী) বালি...
যাই হোক। এত কথা বেকার বলি। এ আমার চিরকালীন বদ-অভ্যাস। বইটিকে দুটি-তারা তাও দেবো। কঠিন হতে চাইলে দেড় দিতাম হয়তো। তবে, পরম-সুন্দর সেই মানুষটির খাতিরেই রাউন্ড-আপ করে দিচ্ছি আজ। চরিত্র-চিত্রায়ণে বিশেষ অসামঞ্জস্য থাকলেও, ভক্ত-বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে, সকলের প্রতি মানুষটির মুখে মিষ্টি সংলাপগুলো মনে থাকবে অনেকদিন। যা আদুরে, দরদী ও প্রেমে টইটম্বুর। বাকিটা রইল, প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ ও পরিবেশনার খাতিরে। বইটি আমার বুকশেলফের শোভা-বৃদ্ধি করবে অনেক বছর ধরে। এটাও এক ধরনের পাওনা, তাই না?
এসব বলেই মনকে সান্তনা দি।
(২/৫ || জানুয়ারি, ২০২৫)