ইতিহাস সুরভিত এই উপন্যাসের সময়কাল পনেরো ও ষোলো শতক, পটভূমি বিস্তীর্ণ বঙ্গদেশ ও উড়িষ্যা। গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ। নবদ্বীপের সেই ছেলেটি শৈশব থেকেই অন্যরকম। সেই মধ্যযুগে, যখন জাতপাত, অস্পৃশ্যতার অভিশাপে বাঙালি হিন্দু সমাজ অন্ধকারে ডুবে আছে, ছেলেটা একরোখা, প্রতিবাদী। সে চায়, জাতপাত ধর্মের বেড়া ভেঙে চুরমার করে দিতে, চায় ভালোবাসা দিয়ে শূদ্র চণ্ডাল যবন সকলকে কাছে টেনে নিতে। … কে হতে পারেন সেই পরমপ্রভু, যুগন্ধর পুরুষ, যাঁর নামের ছত্রছায়ায় সকলকে সে একত্রিত করতে পারবে? তারপর?…
ছেলেটি বেরিয়ে পড়ে ঘর ছেড়ে। নিশ্চিন্ত গার্হস্থ্য জীবন তার জন্য নয়। প্রভু তাকে ডাক দিয়েছেন, তার প্রথম গন্তব্য নীলাচল, এরপর গোটা ভারতবর্ষ। একমাত্র লক্ষ্য তার, মানুষে-মানুষে প্রেম, ভেদাভেদ হিংসা-দ্বেষহীন আনন্দময় সমাজ প্রতিষ্ঠা। সে কি পারবে?… হিন্দু উচ্চবর্ণ মানুষরা যে তার চরম শত্রু।… হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল সে?
বিশ্বম্ভর, নিমাই হয়ে চৈতন্যদেব…এ কাহিনী জীবনী নয়, প্রেম-বিরহ- নিবেদন-উত্তরণের এক সম্পূর্ণ উপন্যাস।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এসসি। শিশু কিশোর ও প্রাপ্তমনস্ক সাহিত্যের ইতিহাস, বিজ্ঞান, রহস্য, হাসিমজা...নানা শাখায় বিচরণ। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালিখি। প্রকাশিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। জনপ্রিয় চরিত্র বিজ্ঞানী জগুমামা ও টুকলু। ১৯৯৫ থেকে কিশোর ভারতী পত্রিকার সম্পাদক। ২০০৭ সালে পেয়েছেন শিশু সাহিত্যে রাষ্ট্রপতি সম্মান। শিশু-কিশোর সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত। মধ্যবর্তী সময়ে পেয়েছেন রোটারি বঙ্গরত্ন, অতুল্য ঘোষ স্মৃতি সম্মান, প্রথম আলো সম্মান ও নানা পুরস্কার
ঠিক কোত্থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। কিছু কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে মনের ভেতরে প্রথম থেকেই একটা সাইরেন বাজতে থাকে। আলোচ্য বইটি, তেমনই এক গ্রন্থ। শারদীয়া কিশোর ভারতীতে যখন ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাপ্রভুকে কেন্দ্রে রেখে একটি কিশোর উপন্যাস লিখে ফেললেন, তখনও ব্যক্তিগত পর্যায়ে খুব একটা আগ্রহ বোধ করিনি। লেখক রচিত ফিকশনের প্রতি ইদানিং আগ্রহ হারিয়েছি বলেই বোধহয় এহেন উদাসীনতা।
তারপর, সে জিনিসের, মার্কেট নিয়মে বই-রূপে প্রত্যাবর্তন। লেখক নিজেই যেখানে প্রকাশনীর কর্ণধার। তখন, এটাই তো স্বাভাবিক। হয়তো লোভ সম্বরণ করে এ জিনিস কিনে ফেলতাম না। হয়তো কি? না কেনারই কথা ছিল আমার। কিন্তু বাধ সাধলো ওই কালান্তক প্রচ্ছদ! সুব্রত মাজির অমন মিষ্টি, স্নিগ্ধ প্রচ্ছদের টান এড়ানো চাট্টিখানি কথা না। আমিও পারিনি, যথারীতি। উইলপাওয়ার বস্তুখানা আমাতে বরাবরই কম। তার ওপর যদি কভার হতে এমন রঙিন কমনীয় পজিভিটি ঠিকরে বেরোয়, তাহলে আর কি...
উপন্যাসটি কলেবরে খুব বড় নয়। প্রায় একশো আশি পাতার পরিধিতে চৈতন্যদেবের বৃহৎ জীবনখানি তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন লেখক। লেখাটিকে দুটি অংশে ভাগ করেছেন তাই। প্রথম পর্যায়ে নবদ্বীপ সংবাদ। বিশ্বম্ভর থেকে নিমাই পন্ডিত হয়ে ওঠার কাহিনী। আন্দোলিত সব পরিচিত মুখ। জগন্নাথ মিশ্র। শচীমাতা। লক্ষী। বিশ্বরূপ, প্রভৃতি। দ্বিতীয় অংশে, পরিব্রাজক চৈতন্যদেব। শ্রীক্ষেত্রে ভক্তিমার্গ নিদর্শন। বাঙলা-উড়িষ্যা রাজনীতির ঐতিহাসিক কোন্দল। রূপ-সনাতন'দ্বয়। সম্ভাব্য মৃত্যু-রহস্য, ইত্যাদি।
তবে দুঃখের বিষয়, চূড়ান্ত অসাবধানতা ও অসংলগ্ন গল্পকথনের ব্যবহার এই বিভাজন নীতিকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলস্বরুপ, লেখাটি দাঁড়িয়েছে এমন একটি ঘরের মধ্যিখানেতে, যার প্রতিটি দেওয়ালে একটি করে আয়না বিদ্যমান। কয়েকশো প্রতিচ্ছবির অধীনে কেবল একটাই অনুরণন। বিভ্রান্তি! কথায় বলে, চিবুতে না পারলে, বুঝেশুঝে কামড়াও। লেখক নিজের কলমের যাবতীয় দুর্বলতা বেমালুম অদেখা করে যা সব করতে চেয়েছেন এখানে, তাতে পাশ করা দুরস্ত, গোটা উত্তরপত্রই বাতিল না হওয়াটা ভাগ্যের সহায়।
লেখকের গদ্য বরাবরই সহজ। (নিন্দুকেরা বলবেন, কিঞ্চিৎ বেশীই সহজ যেন।) যা হয়তো বা কোনো ঐতিহাসিকের ক্ল্যাসিকাল কাঠামোয় খাপ খেতে চায় না। তবে বলতে ক্ষতি নেই, এই বইটির ক্ষেত্রে, ওনার লেখা আমার একেবারে মন্দ লাগেনি। বিশেষত ওই প্রথম অংশখানিতে। সহজ সরল লাগামহীন গদ্যে, নবদ্বীপ-নিবাসী তরুণ দামাল নিমাইয়ের রেখাচিত্রটি একেবারে খারাপ আঁকেননি লেখক। উপন্যাসের শুরুটা তাই বেশ মায়াটে। কোথাও গিয়ে, বইয়ের সমস্ত দোষ-ত্রুটি সামান্য হলেও মাফ করতে মন চাইছিল হঠাৎ।
বাচ্চা নিমাইয়ের মুখে সমাজ ও বর্ণ সংস্কারের কঠিন সব কথা অমন বুড়ো-বুড়ো সংলাপে আচমকা উপস্থাপনা করার অপরাধও ক্ষমা করে দিচ্ছিলাম, একটু হলে। হাজার হোক, তিনি ছিলেন মুক্তমনা যুগপুরুষ। একটু অবিশ্বাস ট্রাংকে তুলে রাখলাম নাহয়? এই পর্যায়ের নিমাইকে এক লৌকিক রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে রচনা করতে চাওয়াতেও সাহসের প্রক্ষেপণ দেখি। পাঠক হিসেব পাই তাকে প্রেমিকপুরুষ হিসেবে। রতিক্রিয়ারত। শৃঙ্গার রসের আবেশে কৃষ্ণ অন্বেষনে ন্যস্ত! কুণ্ঠা এড়িয়ে দেখলে, ভালোই লাগে এটুকু।
তবে ঐযে বিভ্রান্তি! এরই সাথে সমান্তরালই গৌরাঙ্গের আচার বিচরণে অবিশ্বাস্য রকমের সব দৈবী-অলৌকিকতা দেখিয়ে নিজেই নিজের সমস্ত আর্গুমেন্টে জল ঢেলেছেন লেখক। যেন মন বানিয়ে উঠতে পারেননি...উপন্যাস লিখছেন নাকি সরল হেজিওগ্রাফি! সকল ক্ষেত্রেই নিয়েছেন ইজি ওয়ে আউট। লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা অন্তরালে রেখে পাতা ভরিয়েছেন কীর্তনের লাইন দিয়ে। যা শুরুতে চমৎকার লাগলেও ক্রমশ হয়ে দাঁড়ায় পুনরাবৃত্তিমূলক। উপচে ওঠে কলমের আলসেমি।
মনটা খারাপ হওয়া তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
প্রথম অংশটি দৈর্ঘ্যে একশো পাতা। দ্বিতীয়খানি আরও ছোট! মাত্র সত্তর পৃষ্ঠার এক ত্বরান্বিত প্রহসন। যার প্রতিটি লাইনে আলগা ফাঁকি। ইনফরম্যাল অর্থে বললে, নিদারুণ বাধনহীন এই অংশে সবটাই 'শর্ট-এ সেরেছেন' লেখক। পুরীতে এসে মহাপ্রভুর প্রথম রথযাত্রাকে 'অফস্ক্রিন'-এ সেরে, মানুষটির মুখ দিয়ে বিসমিল্লাহ বলিয়েছেন মহানন্দে। আবার বঙ্গসুলতান হোসেন শাহ-এর লিপে চৈতন্যকে আল্লাহর আরেক স্বরূপ ডাকিয়ে, সেকুলারিজমের কেক কেটেছেন সাগ্রহে।
খারাপ ভাবে নেবেন না, দয়া করে। এতে কোনো উগ্র-ধাঁচের সাম্প্রদায়িক খোঁচা খাইনি আমি। কেবল এমন একটি বইয়ের মধ্যে আরেকটু বাস্তবানুগ নুয়ান্স আশা করেছিলাম বোধহয়। তার ছিটেফোঁটাও না পেয়ে, এখন বেজায় ক্লান্ত লাগছে আরকি। কেমন? নিতাই মহারাজের কথাই ধরুন না কেন। নিত্যানন্দের উল্লেখ প্রায় গোটা বইয়ে নেই বললেই চলে। গৌড়-নিতাইকে একত্রে পেতে গেলে অনেকটা অপেক্ষা করতে হয় পাঠকের। প্রায় শেষ-লগ্নে উপন্যাসে সক্রিয় চরিত্র হিসেবে নিত্যানন্দের আবির্ভাব। তবে সেও এক অতিরঞ্জিত খলস্বরূপে। লোলুপ, ভোগী, মদ্যপ এক ক্যারিকেচার।
যা হয়তো বা উপন্যাসের স্কোপের ক্ষেত্রে সৎ। তবুও এহেন দ্বিমাত্রিক পরিবেশনা বেজায় দৃষ্টিকটু। আরেকটু নুয়ান্স সহিত, বাস্তববোধ বনাম রোমান্টিসিজমের এই দ্বন্দ্বখানি তুলে ধরা যেত। ভক্তিরস সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মহাপ্রভুর ছবিকে সামনে রেখে, কতকটা স্ট্র্যাটেজিকালি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার অনন্বেষিত কাহিনী চাইলেই লিখতে পারতেন লেখক। তাতে হয়তো বা স্থান করে নিত ষড়গোস্বামী বৃত্তান্ত। নিত্যানন্দ-অদ্বৈতাচার্য মতভেদ বৈরী। বা অযাচিত গডম্যান ফুঁড়ে ওঠার চিরায়ত গপ্পো। যা আজকের এই ইসকন ইনফ্লুয়েন্সড গোড়া পৃথিবীতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করত, বলেই আমার বিশ্বাস।
পাঠকের লোকসান, লেখক সে পথে সবিস্তারে হেঁটে দেখেননি।
উড়িষ্যার রাজদরবারের অভ্যন্তরীণ অসুয়া নিয়ে সামান্য সরব হয়েছিলেন যদিও, তবুও সে জিনিস বেজায় গতে-ধরা। টেমপ্লেট ফলো করার সমান। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চৈতন্যের মুখে দরকারি কূটনীতিও বলিয়েছেন দু-এক জায়গায়। তবে, সেসব সংলাপের ধরণ পূর্বকথিত ডায়ালগের তুলনায় এতো ভিন্ন, যে পাঠক হিসেবে অবাক হতে হয়। যেন লেখক পৃষ্ঠা ফাঁকা রেখে আহার সারতে গিয়েছিলেন, সেই ফাঁকে চ্যাট-জিপিটি নামক কোনো কলমচি এসে লাইন ভরাট করে পগার পার!
আপনি বলবেন, এত ফালতু বকেন কেন বলুন তো? এক অঙ্গে অনেক রূপ, এমনটা হতে পারেনা? আমি বলব, নিশ্চই হতে পারে। নিশ্চই হয়েও ছিল। চৈতন্যদেব আর যাই হোক কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি সাধক, তিনি পন্ডিত, তিনি ক্ষুরধার সমাজ সংস্কারক। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তানেদের অন্যতম, এক অবিশ্বাস্য পার্সোনালিটি! মুক্তমনা এক আলোর মানুষ! কিন্তু এমন বহুমাত্রিক মানুষটিকে বইয়ের পাতায় আবদ্ধ করা এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। সবাই পারে না। সবার সেই ক্ষমতা নেই। এই ক্যালাইডোস্কোপ আঁকতে লাগে সূক্ষ্ম সংযমগুণ। আলোচ্য বইটিতে যা একেবারেই নেই।
যাই হোক। এত কথা বেকার বলি। এ আমার চিরকালীন বদ-অভ্যাস। বইটিকে দুটি-তারা তাও দেবো। কঠিন হতে চাইলে দেড় দিতাম হয়তো। তবে, পরম-সুন্দর সেই মানুষটির খাতিরেই রাউন্ড-আপ করে দিচ্ছি আজ। চরিত্র-চিত্রায়ণে বিশেষ অসামঞ্জস্য থাকলেও, ভক্ত-বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে, সকলের প্রতি মানুষটির মুখে মিষ্টি সংলাপগুলো মনে থাকবে অনেকদিন। যা আদুরে, দরদী ও প্রেমে টইটম্বুর। বাকিটা রইল, প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ ও পরিবেশনার খাতিরে। বইটি আমার বুকশেলফের শোভা-বৃদ্ধি করবে অনেক বছর ধরে। এটাও এক ধরনের পাওনা, তাই না?
বড্ড ভালো লাগলো। বড্ড আদুরে লেখকের লেখার ভংগি৷ কিছুক্ষণের জন্য যেন চলে গিয়েছিলাম চৈতন্যদেবের সন্নিধানে। নিমাই থেকে নিমাইপন্ডিত, সেখান থেকে শ্রীচৈতন্য। এক যুগপুরুষের জীবনের সব ঘাতপ্রতিঘাত বড় মায়াময় ভাষায় তুলে ধরেছেন লেখক।
পড়লাম। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে পড়তে বসিনি, একটা সহজ, সরল চৈতন্য বিষয়ক বই পড়ব বলেই পড়তে বসেছিলাম। কিন্তু তাতেও চূড়ান্ত হতাশ ও বিরক্ত হতে হল। চৈতন্য বিষয়ক বই বলেই গোটাটা পড়তে পারলাম। নইলে ৩০-৪০ পাতা পড়েই বন্ধ করে দিতাম।
লেখকের ইতিহাস জ্ঞান নেই বললেই চলে। লেখক গবেষণা ছাড়াই এরকম বই লিখতে বসে গর্হিত কাজ করেছেন। এমন উদ্ভট কথা বলেছেন যে শুনে কাঁদব না হাসব বুঝতে পারিনি। লেখকের জন্য Schadenfreude হয়েছে।
সবকিছুর তালিকা করে লেখা দীর্ঘায়িত করব না। কিছু বলছি। প্রথমত লেখকের তো ইতিহাস জ্ঞান একেবারেই নেই। সমাজচিত্র পরিষ্কার নয়। আবার চৈতন্যকে মানবিক রূপ দিতে গিয়ে একেবারে সাধারণ মানুষ করে ফেলেছেন কিছু জায়গায়, আবার কোথাও কোথাও অলৌকিকত্ব দেখিয়েছেন, যেগুলো খাপছাড়া লেগেছে। আবার, চৈতন্যকে বেশি উদার দেখাতে গিয়ে বারবণিতাকে আলিঙ্গন করার ঘটনাও দেখিয়েছেন। আবার হোসেন শাহের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন চৈতন্য না কি আল্লারই আরেক রূপ। এটা খুবই মূর্খের কথা। একজন মুসলিম খুব উদার হলে, চৈতন্যের বড় ভক্ত হলে তাকে পীড় মানতে পারেন, বড়জোর নতুন নবী মানতে পারেন, কিন্তু আল্লার নতুন রূপ কেউই বলবেন না। লেখকের ইসলাম সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান নেই। নিত্যানন্দকে চরিত্রহীন লম্পট দেখিয়েছেন ও ইউরোপীয় মদ্যপান করিয়েছেন লেখক।
গদ্য খুবই বাজে। অপরিণত, বালখিল্য মানের গদ্য। লেখক ক্ষমতাশালী লোক না হলে এ বই কেউ ছাপাতো না। আর উদ্ভট প্রচুর যুক্তি, ঘটনা দেখানো হয়েছে। সংলাপের জায়গায় এমন এমন চরিত্রকে দিয়ে এমন এমন কথা বলানো হয়েছে, পড়ে হাসি পেয়েছে।
এই বই টাকা দিয়ে কিনে টাকা নষ্ট হয়েছে।
প্রসঙ্গত আমি দীক্ষিত বৈষ্ণব নই বা চৈতন্যদেবকে ঈশ্বর বলে মনে করি না। এই ঋণাত্মক সমালোচনা ভক্তির জায়গা থেকে উদ্ভূত নয়। এই বই সাহিত্য হিসেবে নিম্ন মানের বলা যাবে না, বরং এই বই সাহিত্যই নয় বলা উচিত।
তথ্যে ঠাসা বই মানেই সেই ছোটবেলার ভয়ঙ্কর ইতিহাস বিষয়টার কথা মনে পড়ে, কিন্তু সেই বিষয়টাকে যদি গল্পের আকারে পড়া হয় তাহলে সেটা অসাধারণ লাগতে বাধ্য , সেরকমই এক তথ্য ভরপুর বই " আলোর মানুষ"। বিশ্বম্ভর , নিমাই হয়ে চৈতন্যদেব....এ কাহিনী জীবনী নয়, প্রেম-বিরহ-নিবেদন- উত্তরণের এক সম্পূর্ণ উপন্যাস। ফাল্গুন মাসের চন্দ্রগ্রহণের দিন জগন্নাথ মিশ্র এবং শচীদেবীর দ্বিতীয় সন্তান নিমাই ভূমিষ্ঠ হয়। মাতামহ নাম রাখলেন বিশ্বম্ভর। নিমাই ছোট থেকে কাউকে ভয় পায় না , বেপরোয়া, তেজী এবং একরোখা। দূরন্ত দামাল ছেলের অত্যাচারে প্রতিবেশিরা অতিষ্ঠ । বাবার মৃত্যুর পর নিমাই পড়াতে শুরু করলো , পড়ানোর সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল । তারপর এল প্রেম, লক্ষ্মী'র সাথে বিবাহ। তিনি আসলে একজন বীরযোদ্ধা। জাতপাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বিপ্লবী । তিনি পিতৃভূমি দর্শনের সাথে পথে যেসব স্থান আসবে বহু ছাত্র তার কাছে অধ্যয়ন করতে চায়। শিক্ষাদানের পর নিজের বাড়িতে এসে জানতে পারেন তার স্ত্রী -প্রেমিকা লক্ষ্মীর মৃত্যুসংবাদ। তাঁর মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে। যে নিমাই রীতিমতো ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছেন বৈষ্ণব গোষ্ঠীকে। দাদার সন্ন্যাসী হয়ে ঘর ছাড়ার পর মায়ের কষ্ট তাঁকে পীড়িত করেছে। সেই তিনি স্থির করেছেন কৃষ্ণ নামের নীচেই জড়ো করতে হবে ধনী গরীব, উঁচু নিচু , স্পৃশ্য অস্পৃশ্য সব মানুষকে । শচীদেবী নিমাইয়ের সাথে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়ে দেন বিষ্ণুপ্রিয়ার সাথে । কিন্তু তিনি বেরিয়ে পড়েন ঘর ছেড়ে প্রভুর ডাকে , নীলাচল হয়ে ভারতবর্ষে ঘুরে ঘুরে তিনি আনন্দময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন। তারপর শেষ জীবন তাঁর কেটেছে বিষ্ণু মন্দিরে - ' সেব চৈতন্য গাহ চৈতন্য....লহ চৈতন্যের নাম রে ....'। সবকিছু শেষে মাথায় চলছে " সময় অতি বড় ক্ষতও মিলিয়ে দেয় , তার চেয়ে বড় চিকিৎসক কেউ নেই " ।
🌿 সম্প্রতি শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস "আলোর মানুষ" পড়লাম। সংক্ষেপে পাঠ অনুভূতি ব্যক্ত করছি। ইতিহাস নির্ভর এই উপন্যাসের সময়কাল পনেরোশো এবং ষোলোশো শতক। নবদ্বীপে জগন্নাথ মিশ্র এবং শচীদেবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করলেন বিশ্বম্ভর মিশ্র। ছোটবেলাতে তিনি এতটাই অশান্ত ছিলেন যে তাঁর চারপাশের লোকজন রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠতো। এই দুরন্ত বিশ্বম্ভরই কিভাবে হয়ে উঠলেন মহামানব শ্রীচৈতন্যদেব সেটাই আমরা এই উপন্যাসটি পড়লে জানতে পারি।
🌿 শ্রীচৈতন্যদেবের ছোটবেলার নাম ছিল নিমাই। তাঁর প্রথমে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা হয় স্বামী ঈশ্বরপুরী এবং পরে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা হয় স্বামী কেশব ভারতীর কাছে। কৈশোরে নিমাইয়ের পিতৃবিয়োগ হয়। প্রথম বিবাহের কিছুকাল পরে তিনি তাঁর পৈতৃক আদিবাড়ি পূর্ববঙ্গে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখলেন তাঁর স্ত্রী লক্ষীপ্রিয়া দেবী সর্প দংশনে মারা গেছেন। এরপর তিনি তাঁর মাতা শচীদেবীর অনুরোধে বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। কিন্তু সংসারে তিনি মন দিতে পারলেন না, বরং তাঁর মন সদা সর্বদাই ধাবিত হত পরমপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণর দিকে। এই সময় তিনি গয়াতে যান তাঁর পিতা এবং প্রথম স্ত্রীর নামে পিন্ড দান করার জন্য। এই সময় গয়াতে অলৌকিক ভাবে তাঁর সঙ্গে গুরু কেশব ভারতীর দেখা হয় এবং তৎসময়ে নিমাই সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হন।
🌿 এরপর তিনি পুরোপুরি সংসারত্যাগ করেন এবং নিমাই হয়ে ওঠেন তৎকালীন যুগের বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক শ্রীচৈতন্যদেব। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের পরম উদ্দেশ্য। পচিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, দাক্ষিনাত্যের বিভিন্ন স্থানে তিনি তাঁর মতবাদকে ছড়িয়ে দেন। ধীরে ধীরে সমাজের মানুষজনের কাছে হয়ে ওঠেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।
🌿 শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সমাজের বেশিরভাগ মানুষজন পছন্দ করলেও সমাজের অল্প কিছু মানুষ, বিশেষ করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ��ান্ডাদের কাছে তিনি রাগ এবং বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠেন। বিভিন্নভাবে তাঁরা শ্রীচৈতন্যদেবের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। কথিত আছে এক সময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীজগন্নাথদেবের শ্রীদেহে বিলীন হয়ে যান।
🌿 শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। একাধারে তিনি যেমন ছিলেন সন্ন্যাসী এবং ধর্মগুরু, অন্যদিকে তিনি তেমন ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে শূদ্র এবং মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষজনও বৈষ্ণবধর্মে যোগদান করেন। এর ফলে সমাজে ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র অধিকার ক্রমাগত লোপ পেতে থাকে। তখন ব্রাহ্মণরাও ক্ষুব্ধ হতে থাকেন মহাপ্রভুর উপরে।
🌿 "আলোর মানুষ" উপন্যাসটি শুধুমাত্র মহাপ্রভুর জীবনীআলেখ্য নয়, বরং বলা যায় ওনার জীবনীর উপর আশ্রয় করে লেখা একটি ইতিহাসনির্ভর এবং মানবিক উপখ্যান যা মহাপ্রভুকে নতুন করে চিনতে সহায়তা করে। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বারবার হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র এবং রাধাকৃষ্ণ লীলার কীর্তনের বিভিন্ন অংশ বারবার আসে যা পড়তে গিয়ে বারংবার চোখে জল চলে আসে এবং একাত্মবোধ করতে পারি মহাপ্রভু পরমপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে। এখানেই এই উপন্যাসটির পরম সার্থকতা। পাঠক বন্ধুরা অবশ্যই "আলোর মানুষ" উপন্যাসটি পড়বেন।
সুখপাঠ্য চৈতন্য উপন্যাস। এটিকে ফিকশনাইজড্ ইতিহাস বলা চলে। কিছু ইতিহাস, কিছু কাল্পনিক মালমশলা দিয়ে বানানো একটি কাহিনি। চৈতন্য বিষয়টির প্রাবল্য হোক কিংবা লেখকের সুলেখনীর জোরেই হোক, বইটি এক সিটিংয়েই পড়ে ফেলার মতোন। আমি নিজে এসব বিষয়ে একটু রক্ষণশীল মনস্কতা পোষণ করি তাই - নিমাই ও তার স্ত্রীর সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ, নিত্যানন্দের ব্যাভিচারিতা ---- এই দুই জিনিস আমার একদমই ভালো লাগেনি। এই দুটো বিষয় না থাকলেই আরো ভালো লাগতো। কাহিনির মাঝে মাঝে filler element হিসেবে রয়েছে কিছু কীর্তনের কয়েক লাইন। কিছু কিছু তো একাধিকবার রিপিট করেছেন লেখক, যা একটু বিরক্তিকর। একটু অপছন্দের বিষয় যোগ করা এবং কীর্তনের লিরিক্স ভরানোর জন্য দুটি তারা বাদ গেল।
part 1 was tolerable. part 2 felt flat... hurried and uninterested... insipid and sudden in parts... this had so much scope.. wasted. the first star is for the part 1 of the book and 2nd star is for the cover art... beautiful (by Subrata Maji).