সুপ্রিয় চৌধুরীর জন্ম উত্তর কলকাতার সাবেকি পাড়ায়। কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে রেললাইন আর উদ্বাস্তু কলোনি ঘেঁষা শহরতলিতে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের ঠিকানা মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু মহল্লা। পুঁথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরোলেও নানাধরনের পাঠে প্রবল আগ্রহ। শখ: ফুটবল, ফিল্ম আর পশুপাখি পোষা।
বারো নম্বর রেলগেট পেরিয়ে ট্রেন ব্যারাকপুর স্টেশনের দিকে ছুটলেই নজরে পড়ত ছোটো-ছোটো গুমটিগুলো। তাদের সামনে বা পাশে দাঁড়ানো বা বসা মলিন মানুষদের দেখামাত্র ভিড়ে ভরা কামরায় মৃদু কয়েকটা কথা শুরু হয়েই শেষ হয়ে যেত। সাদা শার্ট আর খাকি প্যান্ট পরা এক মিশনের ছাত্র কিছুতেই ওই দুমড়ে যাওয়া চেহারাগুলোর সঙ্গে হলদে মলাটের বইয়ে পড়া চরিত্রদের সঙ্গে মেলাতে পারত না। পরে, নারায়ণ সান্যালের হাত ধরে শুরু হল সত্যিকারের বড়োদের সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া। তারই ফাঁকে 'তেমন' এক নারীর জবানিতে পড়েছিলাম সেই বিখ্যাত লাইনগুলো~ "দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন, দেবতা জাগিলে মােদের রাতি, ধরার নরক-সিংহদুয়ারে জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি।" কিন্তু কেমন করে কাটে সেই 'দিন' আর 'রাতি'? খবরের কাগজ কিছু বলেনি। রোমান্স বা রঙ-চড়ানো আখ্যানের বাইরে তেমন কিছুই পাইনি যা থেকে এই নিষিদ্ধ জগতের কথা জানা যায়। তবে "পথে এবার নামো সাথি" গাইবার যুগে কয়েকজন সিনিয়রের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম, এই তথাকথিত 'আদিমতম' পেশার আসল কথাগুলো গল্প-উপন্যাসে বা ওই বিশেষ ধরনের বইয়ের বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। সেই 'আসল কথাগুলো', বিশেষত এই বিশাল অন্ধকারাচ্ছন্ন অর্থনীতির আসল কাঁচামালের জোগান নিয়েই লেখা হয়েছে আলোচ্য বইটি। বিশুদ্ধ ক্ষেত্রসমীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা বইটিতে এইক'টি অধ্যায় আছে~ * মুখবন্ধ, 'নতুন ইনিংস শুরুর আগে' (প্রাককথন), 'শুরুর আগে'; ১. লালবাতির আজ-কাল-পরশু: কলকাতার রেড লাইট এরিয়ার সমকালীন ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে সম্ভবত একমাত্র বিস্তৃত বিবরণ; ২. চর্ম বিপণি: বিয়ের নামে উত্তর ভারতে গ্রামে-শহরে গণভোগ্যা দাসী বিক্রি; ৩. হংসগিরির মহারানি: এক প্রবল পরাক্রমশালী নারীপাচারকারী নারীর সাক্ষাৎকার; ৪. শীতলা সর্দার বালিকা বিদ্যালয়: নারীপাচারের ক্ষেত্রে 'কিংবদন্তি' হয়ে ওঠা এক নারীর কাহিনি; ৫. আইটেম, আইটেম: মুম্বই এবং অন্যত্র গানের সঙ্গে শরীর মেশানোর 'চ্যানেল'-এর বিবর্তন; ৬. ফারজানা কথা: একরাশ অন্ধকারে এক টুকরো আলো; ৭. রোলপা-র রেশমা: আইনের চক্করে একটি আলো নিভে যাওয়ার মর্মান্তিক কাহিনি; ৮. ত্রাস শীতল: সীমান্তে রাজনীতির হাত ধরে নারীপাচারের প্রাতিষ্ঠানিক 'স্বীকৃতিলাভ'; ৯. ফুলগুলো সব গেল কোথায়? বন্দরের উত্থান ও পতনের সূত্রে বেশ্যাবৃত্তির রূপান্তর এবং তার ফল; ১০. হাই পাওয়ার হাঙ্গামা: সুন্দরবন এবং অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলে বিনোদনের অদ্ভুত ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের বিবরণ; * তথ্যপঞ্জি। এ এক ঘন কালো বই, যার পটভূমি হয়ে আছে রক্তের লাল আর অনেক-অনেক অভাগিনীর শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল। নারীমাংসের যে বিপুল বেসাতি চলে আমাদের চোখের কোণায় তথাকথিত আইন ও প্রশাসনের অলিখিত মদতে, তার এমন স্পষ্ট অথচ সংবেদী বর্ণনা বাংলায় আর একটিও আছে বলে মনে হয় না। এই বইটি পড়ে আপনি আনন্দ পাবেন কি না, তা জানি না। তবু আপনাকে অনুরোধ করব বইটি পড়ার। সোশ্যাল মিডিয়ায় বড়ো-বড়ো কথার ফুলঝুরি আর ফটোশ্যুটের বাইরে আসলে কেমন আছে আমাদের মা-বোনেরা— তা বোঝার জন্য এর চেয়ে ভালো বই আর হয় না। প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই এমন একটি বই আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। আর লেখককে জানাই অপার কৃতজ্ঞতা। বারো নম্বর রেলগেট থেকে অনেক দূরে আর অনেক পরে হলেও, আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনিই দিলেন। এই 'শিক্ষা' আমি ভুলব না; ইনফ্যাক্ট, ভুলতে পারব না।