অনন্ত আকাশের মতো বিস্তৃত আর অতল সমুদ্রের মতো রহস্যময় প্রাচীন এপিক মহাভারত ।দেশে -বিদেশে বিবিধ পাঠান্তরে বিধৃত ও অজস্র প্রক্ষেপে আকীর্ণ এই মহা আখ্যান , যার স্তরে -স্তরে বিছানো আশ্চর্য সব ইঙ্গিত -প্রকট বা অস্ফুট । সেই মহাকাব্যেরই একটি গুরুত্ব পূর্ণ প্রবাহ নিয়ে উপন্যাস দৈবাদিষ্ট । এর ববিষয় -পরিধি বিস্তৃত : কুরুকুমারদের বয়:প্রাপ্তি ,হস্তিনায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ও তার সমান্তরালে বৃহত্তর ভারত-রাজনীতিতে সমাসান্ন এক বৃহত্তর ঝড়ের আভাস , যার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দ্বারকার তরুণ নায়ক। অস্ত্রের ঝনঝনানি রুদ্ধশ্বাস আর কূট চক্রান্তে ভরপুর এ কাহিনীতে অনেক চেনা চরিত্র কেও অচেনা আলোয় উদ্ভাসিত হতে দেখা যাবে । এই উপন্যাস নানা আকারগ্রন্থের ইঙ্গিতপুষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত কল্পনায় সমৃদ্ধ এক বাস্তবানুসন্ধানী পুনর্কথন। ধ্রুপদী ভাষাসৌকর্যে আর চৌম্বক গল্পকথনে , শিহরণ -জাগানিয়া ঘটনাক্রমের তুরঙ্গগতি পাঠক কে দম ফেলতে দেয় না।
'বাক্যহারা হয়ে বসে আছি' জাতীয় কোনো অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেবো না আজ। কেবল বলবো, আমি মুগ্ধ। বছর শেষে একখানি যথার্থ ভালো বই পড়বার অভিজ্ঞতায় তৃপ্ত। বলাই বাহুল্য, কৌতুকপ্রদ ব্যাপার। আমায় যারা স্বল্প হলেও চেনেন, তারা জানবেন, মহাকাব্যের এরূপ পুনঃকথন নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা ঠিক বাজারের জনপ্রিয় পালে হাওয়া দেয় না। আমি মশাই, গোঁড়া মানুষ। প্রচলিত চিন্তাধারার প্রতি অগাধ আস্থা রাখতে বেশ ভালোবাসি। তবুও এই বইটি নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করতে আমার বাধ সাধছে না।
এমন মজবুত ও সংযত লেখনীর পাল্লায় পড়লে, উচ্ছাসিত না হয়ে উপায় কী?
পাঠককুলের গুটি-কয়েকজন, যারা সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের যাবতীয় গ্রন্থপঞ্জির সাথে এযাবৎ পরিচিত হননি। বাংলা সাহিত্যের এক ভীষণ শক্তিশালী, অথচ আলোচনা-বিমুখ ব্যক্তিত্বের কাজ হতে বঞ্চিত হয়ে রয়েছেন। লেখক নিজ-ইচ্ছায় কম লেখেন, বলেই জানি। তবে যাই লেখেন, যতটুকুই লেখেন, তার সবটাই প্রায় অবশ্যপাঠ্য হয়ে দাড়ায়। এই বইটিও সেই ঘরানার। হয়তো বা লেখকের শ্রেষ্ঠ কাজের নিদর্শন? মহাভারতের বহুল-প্রচলিত তবুও বিক্ষিপ্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে ভিন্নমার্গী এক উপন্যাস।
মাপা গদ্য, তৎসম শব্দের নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ এবং যথাযত সংলাপ। এহেন লেখাটি, বাজারে লভ্য মুড়ি-মুড়কি ন্যায় অজস্র পৌরাণিক বইপত্রের জটলায়, তফাতে দাড়ানোর পূর্ণাঙ্গ দাবি জানায়। মহাভারতের অসংখ্য চরিত্র-ভিড়ে, কে ভালো বা কে খারাপের অন্তর্জাল-ঘেঁষা শিশুতোষ বাকবিতন্ডায় না জড়িয়ে, মহাকাব্যের আশ্রয়ে প্রকৃত সাহিত্য-চয়নের এক মর্মস্পর্শী পন্থা হয়ে দাঁড়ায়। এই তো কাম্য! এখানেই তো এরূপ লেখার যথার্থ সার্থকতা! নইলে কেনোই বা বছরের পর বছর, বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন ভাবে কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের দরজায় বারংবার করাঘাত করা?
বইয়ের মলাট-বিবরণে উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে তেমন কোনো বিস্তৃতি নেই। কোনো একক চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে গোটা মহাভারতের পুনরাবৃত্তির পথে হাঁটেননি লেখক। বরং, হস্তিনাপুরে ভারদ্বাজ দ্রোণ-এর আগমন থেকে বারণাবতে জতুগৃহ দহন অবধিই এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। প্রথাগত যুদ্ধ বিবরণের ধারেকাছে না ঘেঁষে, প্রাসাদ রাজনীতি, যুগোপযোগী কূটনীতি ও চরিত্র-প্রতি স্বার্থকায়েমের ধূসর প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন তিনি। যার কেন্দ্রে ভীষণ চাতুরী সহিত উপস্থাপিত দ্রোণ ও একলব্য সম্পর্কের এক অভিনব তর্কযোগ্য পরিণতি। যা 'হোয়াট ইফ্' বা 'এমনটাও হতে পারতো' ঘরানার এক দীপ্ত নিদর্শন! এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সমীচীন নয়। পাঠক-মাত্রই আবিষ্কারের রোমাঞ্চ ভিন্ন, বলাই বাহুল্য।
মহাকাব্যের লৌকিক বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে সৎ থেকে কোনো চরিত্রকে অহেতুক গৌরবান্বিত করেন না লেখক। পাশাপাশি, খল-চরিত্রদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সহানুভূতি দেখানো থেকে বিরত থেকে, বইটিকে আর-পাঁচটা 'মিথো-ফ্যান্টাসি' থেকে স্বতন্ত্র করে তোলেন যেন। তার চরিত্রেরা ধূসর, সাদা ও কালোর মিশেলে, রক্তমাংসের ত্রিমাত্রিক জীব। আর্যাবর্তের ললাটে ষড়রিপুর রক্তিম দংশন! ভালো লাগে, সময় নিয়ে, চেনা চরিত্রদের মনের গহীনে অচেনা মনস্তত্ত্বের পাঠ। এক কেবল, দ্বারকাধীশ বাদে। বুঝিয়ে বলা কঠিন। কারণ, উপন্যাসে বাসুদেব কৃষ্ণ 'কিংমেকার' রূপে অনেকাংশেই উপস্থিত। তবুও যেন বাকি চরিত্রদের তুলনায় তিনি কম অন্বেষিত। আছেন, তবুও তাকে ছোয়া যায় না। এতে আদতে কোনো ক্ষতি দেখি না। প্রতিভা বসু ঘরানায় হেঁটে, কৃষ্ণকে খল-কুচক্রী প্রতিপন্ন না করাতেই আমার সন্তুষ্টি। ভালো লাগে, অবতারবাদ বিশ্লেষণে বৈষ্ণব-শৈব বৈরিতার প্রক্ষেপণ। দিনের শেষে, কৃষ্ণস্তু ঈশ্বরঃ স্বয়ম্!
ঠিক একই ভাবে, অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা সহিত পৌরাণিক যুগের নানান দিব্যাস্ত্র ও অলৌকিক ঘটনাপ্রবাহের লৌকিক ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। স্বল্প পরিসরে, রসায়নশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, জ্যামিতি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহচর্যে মহাভারতের পৃথিবীকে দিয়েছেন এক বাস্তবসম্মত রূপ। মাঝেমধ্যে, এরূপ সচেতন খোদকারি দিব্যি উপভোগ্য হয়ে দাঁড়ায়। কেবল, কয়েকবার এই অলৌকিক খন্ডানোয় সামান্য অতি উদগ্রীবতা চোখে লাগে, এই যা। সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপিত এরূপ কথোপকথনের মধ্যে হঠাৎ বক্তার মুখে "মন্ত্র-তন্ত্র ইত্যাদি অলৌকিক কিছু নয়!" জাতীয় তাচ্ছিল্য স্বরূপ বক্তব্য। অনেকটা, সিনেমার পর্দায় চতুর্থ দেওয়াল ভেঙে সরাসরি দর্শকবৃন্দের প্রতি ইঙ্গিত করবার সমান। অসাধারন একটি বইয়ে, প্রগলভ কটা মন্থকূপ যেন।
অসাধারন, তবুও পাঁচ-তারা কেন নয়?
এই ক্ষেত্রে আমার অক্ষমতাই দায়ী। রবিবাসরীয়তে ধারাবাহিক প্রকাশকালেই, উপন্যাসের দ্বিতীয় তথাকথিত বিতর্কিত অঙ্গ, মহামতি বিদুর ও কুন্তীর সম্পর্ক নিয়ে, ফেসবুকে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। সত্যি বলতে, এ জিনিস আমায় আশ্চর্য করেনি। সূত্রখানি আমি আগেও বেশ কয়েকবার বিভিন্ন লেখায়, বিভিন্ন ভাবে পেয়েছি। এবং ক্রুদ্ধ ও আহত হয়েছি যথারীতি। বেশ কিছু স্রষ্টার সৃষ্টি এতটাই নিম্নমার্গী ও পঙ্কিল চিন্তাধারার পরিচয় ধারণ করে যা খোলা মনে গ্রহণ করা দায়। সেই নিরিখে, সৌরভ মুখোপাধ্যায় কতকটা অন্যভাবে এই সম্পর্কের রুপায়ন করেছেন। এ জিনিস অনেক বেশী বাস্তবধর্মী ও মানবিক। অনেক বেশী গ্রহণযোগ্যও, হয়তো বা। তবুও, এই একটি ক্ষেত্রে আমি অপারগ।
গোঁড়ামি মাফ করবেন। আমার এই কাঠিন্য, অন্ধভক্তি নয়। বরং মহাকাব্যের প্রতি অকপট ভালোবাসার ভ্রান্ত নিদর্শন কেবল। আমার এই যৎসামান্য উপেক্ষা, এমন অবশ্যপাঠ্য একটি বইয়ের মানহানী করবে না বলেই, আমার বিশ্বাস। কৌতূহলী পাঠক মাত্রই অনুরোধ, ভারত যুদ্ধের অমৃত-সাগরে বিন্দুমাত্র আগ্রহী হলে, অবিলম্বে বইটি সংগ্রহ করুন।
"...মহান দ্বৈপায়ন ব্যাস তাঁর প্রস্তাবিত মহাগ্রন্থে কি এই তথ্য স্বীকারের সাহস পাবেন? পাবেন না, সে জানি। তাঁর জয়কাব্য তো প্রকৃত প্রস্তাবে রহস্যকুটিল কুরু - রাজনীতিরই একটি প্রচারপত্র হবে... সুবিধার জায়গাটুকু উন্মোচন, অসুবিধার অংশগুলিতে প্রলেপন... "
বিতর্কে না গিয়ে যদি শুধুমাত্র সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে চান তাহলে এই বই আপনার জন্য। অনন্ত আকাশের মতো বিস্তৃত আর অতল সমুদ্রের মতো রহস্যময় প্রাচীন এপিক মহাভারত। এই মহাকাব্য কে ঘিরে সেই বহুকাল আগে থেকেই বিভিন্ন লেখকের নিজস্ব নিজস্ব টীকা, ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়ে বিনির্মাণ হয়েই চলেছে। দৈবাদিষ্ট তারই নতুন আরেক সংযোজন।
এই কাহিনীর বিস্তৃতি অনেক বড়ো। উপন্যাসের শুরু গুরু দ্রোণের আবির্ভাব দিয়ে। আর শেষ কোথায়? সেটা পাঠকই পড়ার পরে ঠিক করবেন।
মহাভারতের প্রথম দিকে আমরা জরাসন্ধ প্রেরিত একলব্য কে পাই। যে গুরুদক্ষিণা স্বরূপ তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি তার গুরুদেবকে প্রদান করে। কিন্তু এর পরে আর তার খোঁজ মেলেনা। লেখক এই উপন্যাসে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা, নিজস্ব যুক্তি দিয়ে একলব্যকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন। একলব্যের তারপরে কি হলো বিস্তারে বর্ণনা করেছেন এখানে। যেটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে সেটা হলো অলৌকিকতাগুলো কে লৌকিক কারণ, যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা। পঞ্চপান্ডব যারা নাকি দেবপুত্র। কিংবা পুত্র কামনায় অগ্নিযজ্ঞ করা, যেখান থেকেই দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদুন্মের আবির্ভাব, একজন হবে কুরুবংশ বিনাশের কারণ অন্যজন দ্রোণ বধের কারণ। এরকম মহাভারতের ভিতরে প্রচুর অলৌকিক ঘটনা আছে যেগুলোর বেশ কিছু এখানে লেখক তার নিজস্ব লৌকিক যুক্তি দিয়ে প্রমান করেছেন। তাহলে এই অলৌকিকতা গুলো সেই সময়ে কিভাবে প্রচলিত ছিলো? বইয়ের একটি বিশেষ অংশে তার উত্তর আছে। ব্রাহ্মণ - তপস্বী - ঋষি - মুনিদের বাক্যের প্রকাশ্য বিরোধ অসম্ভব। তারা যে বিধান দেবে সমস্ত নাগরিক এমনকি রাজাকেও সেটাই মেনে নিতে হবে। স্বর্গ আসলে কোথায়, ইন্দ্রের অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা, কিভাবে স্বর্গ থেকে এসে মর্তনারীর গর্ভাধান করেন দেবতাদের রাজা - এ বিষয়ে প্রশ্ন নিষেধ।
এই বই নিয়ে যতই বলব কথা বেড়েই যাবে। পড়েছি বেশ কয়েকদিন হলো মুগ্ধতার রেশ এখনো ছাড়েনি। লেখকের লেখা "প্রথম প্রবাহ " পড়ে যে মুগ্ধতা গ্রাস করেছিল এই নতুন আখ্যানটি পড়ে সেটা আরও বেড়ে গেলো। অপূর্ব লেখা। ভাষার ব্যবহার খুবই সুন্দর, তবে একেবারে সহজ সরল বলব না সাধারণ যেমন ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক আখ্যাণ যেমন ভাষায় লেখা হয় সেরকমই তবে ভীষণই সাবলীল। পড়তে পড়তে হোঁচট খাবার জায়গা নেই কোথাও। উপন্যাসটি কিন্তু বেশ বড়ো, তাও পড়ার সময়ে শুরু করে কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। আরও একটু থাকলে মন্দ হতোনা খুবই তাড়াতাড়ি যেন শেষ হয়ে গেল। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি অসাধারণ। পেজ কোয়ালিটিও খুবই ভালো। খারাপ লাগা কোথাও নেই একটি জায়গা ছাড়া, বইয়ের ভিতরে কোথাও অলংকরণ নেই। উপন্যাসটি যখন রবিবাসরীয় তে বেরোচ্ছিল খুব সুন্দর সুন্দর ছবি ছিলো প্রত্যেকটাতে, সবগুলো না হলেও ওরকম কয়েকটা ছবি আশা করেছিলাম যখন বই হিসাবে আসবে তখন।
যাইহোক, দ্রোণ, একলব্য কে নিয়ে লেখা যারা এরকম কোনো বই খুঁজছেন এই বইটা তাঁদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। এছাড়া আমার মতো যারা মহাভারতের উপরে লেখা ফিকশন পড়তে ভালোবাসেন তাঁদের জন্যও অবশ্য পাঠ্য। আবারও সেই অনুরোধ আপনার মনে যদি বিতর্ক করার বাতিক থেকে থাকে তাহলে এই বই থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। কারণ লেখক এখানে অলৌকিকতার বিরুদ্ধে যে মোক্ষম যুক্তি দিয়েছেন সেগুলোকে লৌকিক প্রমানের জন্য, সেগুলো হয়ত আপনি ঠিক ভাবে নিতে পারবেন না।
আনন্দবাজার রবিবাসরীয়-তে প্রকাশের সময়ই তুমুল জনপ্রিয় হওয়া, পরে বইমেলার বেস্টসেলার হওয়া এই উপন্যাসটা পড়ে তিনটি জিনিস মনে হল। তারা হল, ১) অদ্বিতীয় ভাষা এবং অনুরূপ পটভূমি থাকা সত্বেও এই লেখা প্রথম প্রবাহ-র অবিশ্বাস্য স্তর স্পর্শ করতে পারেনি; হয়তো করতে চায়ওনি। সেটি ছিল আদিপর্বের এক অত্যন্ত চর্চিত এবং আজও বিতর্কিত অধ্যায়ের বিনির্মাণ ও নবনির্মাণ। এটি ততটা বৈপ্লবিক কিছু করতে চায়নি। ২) 'প্রথম প্রবাহ' ছিল এক নারীর কাহিনি— যে দেহ ও মনের সাহায্যে ভারতের ইতিহাসকে নিজের অভীপ্সিত অভিমুখে চালিত করার সাহস ও সক্ষমতা দেখিয়েছিল। এই উপন্যাস বরং কিছু ঘটনাকে অলৌকিকের আবরণ থেকে মুক্ত করে, প্রায়শ আলোচিত কিছু যৌক্তিক সম্ভাবনার আলোতেই তুলে ধরেছে। এটির কেন্দ্রে থাকা প্রতিটি নারী ও পুরুষ শেষ অবধি নিয়তি বা ঘটনাক্রমের হাতে ক্রীড়নকেই পরিণত হয়েছে। ৩) আমরা অনেকেই মহাভারতকে একটি ক্ষুরধার পলিটিক্যাল থ্রিলার হিসেবে দেখতে ও ভাবতে অভ্যস্ত। আমাদের কাছে এই উপন্যাস, ম্লেচ্ছ ভাষা ধার করে বলতে হয়, 'ওয়েট ড্রিম।' ক্ষমতার লোভ, ক্রোধ এবং প্রতিহিংসা কীভাবে একে অপরকে পুষ্ট করে ইতিহাসকে বাধ্য করে নানা সম্ভাবনার মধ্য থেকে মাত্র কয়েকটিকেই বেছে নিতে— তারই এক অসামান্য নিদর্শন এই উপন্যাস।
স্পষ্টভাবেই বলি, এই উপন্যাসে যে ধরনের বাস্তবানুগ সমাধান দিয়ে মহাভারতের অনেকগুলো আপাতদৃষ্টিতে অলৌকিক অধ্যায়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার সবগুলো (অধিকাংশ, এমনকি একটিও) আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু লেখনী তথা বর্ণনা, সংলাপ এবং চরিত্রচিত্রণের সমন্বয়ে যেভাবে এই আখ্যানটিকে পরিবেশন করা হয়েছে, তা সত্যিই কুর্নিশযোগ্য।
প্রচ্ছদটি অত্যন্ত ঢ্যাবঢেবে। উপন্যাসের শেষটাও হয়েছে রীতিমতো দুম্ করে, যার ফলে মনে হয় যেন আমরা এই অতিপরিচিত কাহিনিরও শুধু একটি অংশই দেখতে পেলাম। সর্বোপরি, এই উপন্যাসে কৌরবেরা তো বটেই, কুন্তী ও তাঁর সন্তানেরাও যেভাবে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন, তা পড়ে মনেই হচ্ছিল, এঁদের বাদ দিয়েই না হয় উপন্যাসটা লিখে ফেলতেন লেখক। সত্যি কথা বলতে কি, জরাসন্ধ ও তাঁর প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বীটি কি আরও একটু বেশি স্থান দাবি করতেন না এতে? আর একটিও অলংকরণ নেই কেন?? এইসব ক্ষোভের বশে একটি তারা কমিয়েই দিলাম।
যদি পুরাকথা ও ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে থাকেন, তাহলে এই বইটি পড়তেই অনুরোধ করব। সম্ভবত আপনারও ভালো লাগবে।
দৈবাদিষ্ট – সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের একটি সাহসী মহাভারতীয় পুনর্কথন
‘দৈবাদিষ্ট’ উপন্যাসটিকে যদি একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে বলা চলে—এটি এক অনন্য তর্কাত্মক পুনর্গঠন, যেখানে মহাকাব্যের অলৌকিক কুহেলিকা সরিয়ে রেখে, সৌরভ মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেছেন এক চেতনাপ্রবাহে গাঁথা, যুক্তিনির্ভর, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ।
এই উপন্যাস নিছকই কোনো “মহাভারত রিটেলিং” নয়—এ এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ, যেখানে অলৌকিকতার স্থলে হাজির হয়েছে বিজ্ঞানের শীতল যুক্তি, রাজনীতির প্রখর বুদ্ধি, এবং চরিত্রের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাস। দ্রোণ, একলব্য, কুন্তী কিংবা বাসুদেব কৃষ্ণ—কেউই এখানে অলৌকিকতার মোড়কে বাঁধা ভাস্কর্য নন; এরা প্রত্যেকেই বাস্তব ও লৌকিক রাজনীতির খেলোয়াড়, এঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে লুকিয়ে আছে একক মানসিক অভিঘাত, ঐতিহাসিক ক্ষতচিহ্ন।
এক্ষেত্রে ‘দৈবাদিষ্ট’ ঠিক কোথায় দাঁড়ায় বিশ্বসাহিত্যের মহাভারত পুনর্বিন্যাসের ধারায়?
চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘The Palace of Illusions’ কিংবা প্রতিভা রায়ের ‘Yajnaseni’ যেখানে দ্রৌপদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নারীকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার কাহিনি—সেখানে সৌরভের রচনা সরাসরি ক্ষমতা-রাজনীতির কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়।
ইরাবতী কারভের ‘Yuganta’-র মতো মনস্তাত্ত্বিক খোঁজখবর এখানে আছে, তবে সেটা চরিত্রবিশ্লেষণের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার স্তরযুক্ত ফিকশনাল রিডিং।
শশী থারুরের ‘The Great Indian Novel’ যেখানে মহাভারত একটি বিদ্রুপাত্মক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হয়ে ওঠে, ‘দৈবাদিষ্ট’ তার তুলনায় অনেক বেশি সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং ধারালো। এটি ঠাট্টা নয়, এটি সরাসরি এক শ্লেষাত্মক পুনর্বিবেচনা, যেখানে কল্পনা ও যুক্তির সহাবস্থানে জন্ম নেয় নতুন এক বাস্তবতা।
রামেশ মেননের বা বিবেক দেবরায়ের বিশাল পরিসরের মহাভারত অনুবাদ যেখানে সরল পুনর্কথনেই সীমাবদ্ধ—‘দৈবাদিষ্ট’ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে rewriting করে reimagination নয়।
এ উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক? পুনর্গঠনের সাহস। ‘দৈবাদিষ্ট’ ধর্মকে মিথে গেঁথে রাখে না, বরং সময়ের কূটনীতিকে ধর্মে রূপ দেওয়ার চেষ্টার রক্তাক্ত কাহিনি হয়ে ওঠে। এখানেই এটি পিটার ব্রুকের মহাভারত-এর মতোই থিয়েট্রিক্যাল অথচ দার্শনিক, কেভিতা কেনের ‘Karna’s Wife’-এর মতোই আন্তরিক, আবার কার্তিকা নায়ারের ‘Until the Lions’-এর মতো মার্জিনাল ভয়েসগুলোকে কেন্দ্রের দিকে টেনে আনতে চায়।
শেষ কথা? “The Mahabharata is not one story—it is a thousand voices.” সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘দৈবাদিষ্ট’ এই সহস্র কণ্ঠের মাঝে একটি ঝলমলে, তীক্ষ্ণ, প্রখর যুক্তির কণ্ঠস্বর, যার সাহসিকতা অনেকের অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যিক শুদ্ধতায় সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখে না। এটি সেই মহাভারতের কণ্ঠস্বর, যা অলৌকিক নয়, অথচ তবু বিস্ময়কর।
গৌরবের পুনর্গল্পনা: দ্রোণ ও একলব্য—এক অনতিক্রম্য দ্বৈতবিন্যাস
সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘দৈবাদিষ্ট’ উপন্যাসের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে দুটি পরস্পরবিরোধী অথচ পরস্পরনির্ভর চরিত্র—দ্রোণ ও একলব্য। এই দ্বন্দ্বময় সম্পর্কই উপন্যাসের প্রাণরসায়ন, যার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ক্ষমতা, বঞ্চনা, এবং পরিচয় নির্মাণের সূক্ষ্ম অথচ বিস্ফোরক নাটক।
একলব্য—যিনি আমাদের চেনা আখ্যানের সেই “গুরুদক্ষিণা দিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হারানো” নিষাদপুত্র—এই উপন্যাসে তিনি শুধু ‘হারানো এক বালক’ নন। তিনি এখানে পুনর্গঠিত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাঁর ভবিষ্যৎ গড়েছে চক্রান্ত, কৃষ্ণনীয় পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক অঙ্ক কষার প্রেক্ষিতে। একলব্যের প্রতিশোধস্পৃহা এখানে কোনো রক্তচক্ষু নয়, বরং ধীরে ধীরে মহৎ উপলব্ধির দিকে যাত্রা—এক রূপান্তরের কাহিনি, যা তাঁকে এক ‘দৈবাদিষ্ট’ বানিয়ে তোলে।
অন্যদিকে, দ্রোণাচার্য—পুরাণে যাঁকে এক মহারথী গুরু হিসেবে দেখা হয়, এখানে তিনি মূর্তিমান মানবদ্বিধা। অহং, কৃতজ্ঞতা, আশাভঙ্গ, আর নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্তে ক্লিষ্ট এক মানুষ। লেখক তাঁকে দেবসম করেননি—বরং একরোখা, প্রতিহিংসায় জর্জর, অথচ ভেতরে ভেতরে আত্মবিধ্বস্ত এক চরিত্রে পরিণত করেছেন। দ্রোণ এখানে শুধু অস্ত্রশিক্ষক নন, তিনি ক্ষমতা কাঠামোর হাতিয়ার ও ভুক্তভোগী উভয়ই।
এই উপন্যাসে তাদের দ্বন্দ্ব—অস্ত্র নয়, মনস্তত্ত্বের যুদ্ধ। একদিকে দ্রোণের মানসিক সংকীর্ণতা, বর্ণবাদী প্রথার আঁচ, অন্যদিকে একলব্যের নীরব জেদ, দার্শনিক পরিণতির দিকে এগোনো যাত্রা। এই দুই মেরুর মাঝে পাঠক বুঝতে পারেন—যে দ্রোণ একদিন একলব্যকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, সেই একলব্য-ই হতে পারেন দ্রোণের শেষ চিত্রকরের নাম।
একটি অসাধারণ সংলাপ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায় (পরোক্ষভাবে উদ্ধৃত):
“আমি চেয়েছিলাম শ্রেষ্ঠ শিষ্য, কিন্তু নিজেই হয়ে উঠেছিলাম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অসমাপ্ততা।”
এই উক্তি যেন একসাথে দুজনেরই কণ্ঠস্বর—এক যে হারিয়েছে সুযোগ, আরেক যে হারিয়েছে চরিত্র।
বিশ্বসাহিত্যে এই ধরণের সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয়:
আবেলার ও হেলোয়েজের (Abelard & Heloise) মধ্যেকার সংঘর্ষ—যেখানে ভালোবাসা, শিক্ষা, ক্ষমতা ও আত্মপীড়ার চক্র মিশে যায়।
ডক্টর ফস্টাস ও মেফিস্টোফেলিসের সম্পর্কের ছায়াও এখানে পড়ে, যেখানে জ্ঞানের বিনিময়ে আত্মার দাম চোকাতে হয়।
এবং অবশ্যই, Othello ও Iago—যেখানে বিশ্বাস আর বঞ্চনার রাজনীতিই চরিত্রদের পরিণতির লেখক হয়ে ওঠে।
‘দৈবাদিষ্ট’ এইসব সম্পর্ককে ভারতীয় পুরাণের ভিতরে এনে বসিয়েছে এক রাজনৈতিক ও দার্শনিক আলোচনার টেবিলে। এই উপন্যাসে দ্রোণ ও একলব্য দুজনেই হেরে যান। অথবা বলা যায়—এই হেরে যাওয়াই তাদের ইতিহাসে জয়ী করে তোলে।
এই দ্বন্দ্বই ‘দৈবাদিষ্ট’-এর হৃদয়স্পন্দন। এবং এখানেই তার অতুলনীয়তা।
অলৌকিকতা নয়, যুক্তির রোশনাই—‘দৈবাদিষ্ট’-এর নির্ভীক নবনির্মাণ
সাহিত্য যখন সত্যের অন্তরালে প্রবেশ করে, তখনই সে ইতিহাস নয়—মিথ্যাকে প্রশ্ন করার, পুনর্গঠনের সাহসী শিল্প হয়ে ওঠে। সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘দৈবাদিষ্ট’ তেমনই এক সৃষ্টিসম্ভব বিস্ময়, যেখানে অলৌকিকতার প্রাচীন মোড়ক খুলে ফেলে, প্রতিটি ঘটনাকে বিচার করা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, বাস্তব বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক কৌশলের লেন্সে।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বিপ্লবী প্রয়াস হল—আদ্যন্ত অলৌকিককে রূপান্তর করা লৌকিকে, মন্ত্রতন্ত্রকে মোচড়ানো যুক্তির রোশনাইতে। কুন্তীর দেবপুত্র ধারণা, দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদ্যুম্নের যজ্ঞাবির্ভাব, গুরু দ্রোণের অস্ত্রজ্ঞান, দ্রোণাচার্য কর্তৃক অর্জুনের প্রশিক্ষণের সূক্ষ্ম কৌশল—সবই এসেছে একটি জটিল, সংযত অথচ সাহসী যৌক্তিক গঠনে।
লেখক আমাদের বলছেন না যে “এগুলো ভুল”, বরং তিনি জিজ্ঞেস করছেন—“এইসব ঘটনাকে যদি অলৌকিক বলেই ধরে নিই, তাহলে কেমন করে বাস্তবকে বোঝব?” এই প্রশ্নই ‘দৈবাদিষ্ট’-এর আত্মা।
এক জায়গায় একজন চরিত্র বলেন:
“অলৌকিক কাহিনির মধ্যে বাস্তব রক্তপাত ঢেকে রাখা হয়। সমাজকে চালাতে গেলে অলৌকিকতা দরকার পড়ে—যাতে জনতা প্রশ্ন না তোলে। প্রশ্ন তোলে সে, যে জানে অলৌকিক বলে কিছু নেই।”
এই বক্তব্য শুধু উপন্যাসের অন্তর্জাল নয়, বরং সমগ্র মহাভারতের এক নতুন পাঠ।
বিশ্বসাহিত্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় Mary Renault-এর ‘The King Must Die’-কে—যেখানে গ্রিক মিথের থিসিয়াসকে দেখা হয় দেবতার দূত হিসেবে নয়, বরং এক রাজনৈতিক খেলোয়াড়, সামাজিক বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এক তরুণ বীর হিসেবে। সেই উপন্যাসেও, দেবতার অলৌকিক লীলার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শ্রেণীসংগ্রাম, ধর্মীয় কৌশল, আর গণমানসের উপর আধিপত্য বিস্তারের শাসকীয় ছক।
ঠিক তেমনই ‘দৈবাদিষ্ট’ দেখিয়ে দেয়—স্বর্গীয় অস্ত্র আসলে কী রসায়ন-নির্ভর প্রযুক্তি হতে পারে, কুন্তীর ‘মন থেকে আহ্বান’ কীভাবে এক প্রাচীন অনুরোধ প্রথা বা জৈবিক বণ্টনের কৌশল হতে পারে, যজ্ঞাগ্নির মধ্য থেকে উঠে আসা সন্তান কীভাবে রাজনৈতিক নাটকীয়তা এবং জনমতের নিয়ন্ত্রণের এক অভিনব কৌশল হতে পারে।
এখানে মিথ নয়, বাস্তব। অলৌকিক নয়, রাজনৈতিক। বীরত্ব নয়, কৌশল। এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিই ‘দৈবাদিষ্ট’-কে আলাদা করে দেয় অন্যান্য মহাভারতভিত্তিক উপন্যাস থেকে।
এই উপন্যাস পড়ার পর আপনি আর ‘অলৌকিক বিশ্বাসী’ থাকবেন না—আপনি হবেন ‘সন্দেহকারী পাঠক’, যে মিথকেও সত্য বলে মেনে নিতে চায় না, বরং তাকে খুলে দেখতে চায়—এক একটা স্তরে, এক একটা যুক্তিতে। এবং এটাই, সাহিত্যের চূড়ান্ত জয়।
চরিত্রের গভীরতা ও অন্তর্দৃষ্টির স্বচ্ছতা: মানুষ হয়ে ওঠার মহাকাব্য
সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘দৈবাদিষ্ট’ কেবল এক মহাকাব্যিক ক্যানভাসের পুনর্বিন্যাস নয়—এটি চরিত্রদের অন্তর্জগতে গভীর ডুব দিয়ে তাদের অতিমানবিকতা ভেঙে ফেলে মানুষ হয়ে ওঠার আখ্যান। লেখকের কলম এখানে শুধুই নির্মাণ করে না, সে যেন চরিত্রদের শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করে তাদের হৃদস্পন্দন ধরার চেষ্টা করে।
কুন্তী, যিনি বহু পাঠে কেবল এক নিষ্পাপ জন্মদাত্রী, এখানে ভেসে ওঠেন এক অপরাধবোধে দীর্ণ, ক্ষমাপ্রার্থী অথচ দৃঢ় এক নারীর প্রতিমূর্তি হয়ে। মাতৃত্ব এখানে কোনও পবিত্রতার অলঙ্কার নয়, বরং এক জৈবিক, রাজনৈতিক ও আত্মগ্লানিমূলক টানাপোড়েন।
আর বিদুর—মহাভারতের বহু উপাদানে যিনি প্রায় একটি নোটিশবোর্ডের মতো ব্যবহারিত, এখানে তিনি হয়ে ওঠেন নৈতিকতা, অন্তর্দৃষ্টি আর ধূসর রাজনৈতিক চাতুরীর এক তীক্ষ্ণ ব্যালেন্স পয়েন্ট। তাঁর সঙ্গে কুন্তীর সম্পর্কের ব্যাখ্যা লেখকের পক্ষ থেকে এক সাহসী অথচ পরিমিত মেটান্যারেটিভ—যা অশ্লীলতাকে অতিক্রম করে মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম রেখায় হেঁটেছে। এটি সেই লেখককেই মানায়, যিনি জানেন “সাহসিকতা কখনও চিৎকারে নয়, নিস্তব্ধতার সূক্ষ্মতায় ধরা দেয়।”
দ্রোণ-দ্রুপদ দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে প্রতিশোধ নয়, রা��নৈতিক ব্যর্থতার ফলস্বরূপ এক মানবিক পতন হিসেবে। দ্রোণ এখানে গুরু হিসেবে নয়, বরং এক সমাজ-নির্মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিকটিম, যিনি নিজের ছাত্রের হাতে নিজের সর্বনাশ রচনা করে ফেলেন।
কর্ণের আত্মপরিচয়ের সংকট—যা বহুবার সাহিত্যে এসেছে কেবল মর্মান্তিকতার প্রতীক হয়ে, এখানে এসেছে এক অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের খনন হিসেবে। "আমি কে?"—এই প্রশ্নটা কর্ণকে মহাভারতের সবচেয়ে দুঃখী চরিত্র করে তোলেনি, বরং ‘দৈবাদিষ্ট’-এর পাঠে সে হয়ে উঠেছে নিজের সমাজ, নিজের পরিচয় এবং নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে শেখা এক সচেতন মানুষ।
যুধিষ্ঠিরের জন্মরহস্য যে ভাবে এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা নিছক কৌতূহল নয়—এ এক ধর্ম বনাম দায়বদ্ধতার দার্শনিক সংঘাত। যুধিষ্ঠির কেবল ধর্মরাজ নন, তিনি ভূমিষ্ঠ হওয়া এক সিদ্ধান্তের ফল, এক নীতিবোধ ও প্রয়োজনে কৌশলের সমন্বয়ে জন্মানো রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল—তিনি চরিত্রদের ‘মহাজন’ করেননি, মানুষ করেছেন। এই মানুষগুলোর ভয় আছে, ইচ্ছা আছে, ঘৃণা, আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও অসহায়তাও আছে।
এই লেখার চরিত্ররা যেন বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
“A character is never complete unless he bleeds when cut and shivers when alone.” — Truman Capote
আর এই মানবিক রক্তপাতই ‘দৈবাদিষ্ট’-এর সবচেয়ে আলোড়নকারী অর্জন।
কাঠামো ও ভাষার সংযম—সাহিত্যের নীরব শৌর্য
“Where every word counts”—এই কথাটির প্রকৃত রূপায়ণ যদি কোনও সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসে দেখা যায়, তবে ‘দৈবাদিষ্ট’ নিঃসন্দেহে তার প্রথম সারির দাবিদার। সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস ভাষায় নয়, নীরবতাতেও কথা বলে—যেন শব্দেরা উচ্চারণের চেয়ে অর্থে বেশি পূর্ণ।
বাক্যগঠন, সংলাপ ও বর্ণনার ক্ষেত্রে লেখকের সংযম ঠিক ততটাই প্রখর, যতটা একটি মহাকাব্যিক পুনর্বিন্যাস দাবি করে। তাঁর লেখায় একটা শৈল্পিক আত্মসমাহিতি আছে—যা একইসাথে পাঠককে টানে, আবার ‘তাঁর মতো’ হতে বাধ্য করে না। চরিত্রের মুখে যে সংলাপ তিনি বসিয়েছেন, তা কোনও ‘writerly showing off’ নয়—বরং প্রেক্ষাপটের এক নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি, যা আর্তনাদ নয়, আত্মনাদ।
এবং এই নিখুঁত পরিমিতির কারণেই ‘দৈবাদিষ্ট’ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় Margaret Atwood-এর The Penelopiad কিংবা Colm Tóibín-এর House of Names–এর মতন রূপান্তর-সাহিত্যকে, যেখানে মহাকাব্যের মুখোশ খুলে তার নীরব সংলাপগুলোকে শোনা যায়। সেইসব লেখায় যেমন নান্দনিকতা আসে অন্তর্জাগতিক ভার থেকে, বাহ্যিক ফুলঝুরি থেকে নয়, তেমনই ‘দৈবাদিষ্ট’-এ প্রত্যেকটি শব্দ যেন প্রাসঙ্গিকতার খরচ মিটিয়ে জায়গা নিয়েছে।
সৌরভের গদ্য এই জায়গাতেই পৃথক: ❝তীক্ষ্ণধী পৃথা নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য পুরুষদের নির্বাচন করেছেন মাত্র। মরালীগাত্রে শীকরবৎ, কোনও সংসর্গই তাঁর অন্তর স্পর্শ করেনি,...❞
এই ধরনের বাক্য আবেগে ভাসে না, অনুধাবনে ডুবে থাকে।
লেখক অলঙ্কারের দাস নন, ভাষার কারিগর। তাঁর প্রতিটি বাক্য যেন ইস্পাতের মতো, ঝলমলে নয়, কার্যকরী। না কোথাও অতিরিক্ত নাটকীয়তা, না কোথাও 'উচ্চ' সাহিত্যিক ভণিতা। ঠিক যেমন গুরু দ্রোণের শিখিয়ে দেওয়া অস্ত্র—কেবল লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য।
তাই ‘দৈবাদিষ্ট’ পড়তে পড়তে মনে হয়—এ শুধু একটি আখ্যান নয়, এটি শব্দ ব্যবহারের একটি পাঠ্যপুস্তক। যেখানে প্রতিটি শব্দই একটি দায়িত্ব পালন করে, যেখানে লেখকের নীরবতাও প্রাসঙ্গিক, এবং যেখানে “less is more”—এটা কেবল একটা স্টাইল নয়, এক আত্মানুশাসন। এটাই, হয়তো, প্রকৃত সাহিত্যিক সংযম।
উপন্যাসটি চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে কিছুটা হঠাৎ ও সংক্ষিপ্ত মনে হয়। যে রকম উজ্জ্বল ও স্থিতধী নির্মাণ উপন্যাসের প্রথম দুই-তৃতীয়াংশে ছিল, শেষ অংশে তেমন ধৈর্য ও গতি বজায় থাকে না। বিশেষ করে, জতুগৃহ দহন-পর্বে এসে যেভাবে কাহিনি থেমে যায়, তা অনেক পাঠকের মনে হয় যেন একটি বৃহৎ অভিপ্রায় হঠাৎ গুটিয়ে নেওয়া হল।
আমি ব্যক্তিগত অপুর্ণতাগুলি বললাম:
১) জরাসন্ধ ও বাসুদেব দ্বন্দ্বের সীমিত পরিসর: ‘প্রথম প্রবাহ’-এর মত এই গ্রন্থেও বাসুদেব কৃষ্ণ একটি মৌলিক চরিত্র হলেও, এখানে তিনি স্পষ্টতই “off-stage presence”—নেপথ্যের চালক, অথচ দৃশ্যে অনুপস্থিত। তাঁর এবং জরাসন্ধের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপড়েন ও আদর্শগত বিরোধ—যা ঐতিহাসিকভাবে ভারতবর্ষের রাজনীতি পুনর্গঠনের অন্যতম ধ্রুব বিন্দু—এই উপন্যাসে আরও বিস্তারে উপস্থাপিত হতে পারত।
২) পাণ্ডব ও কৌরবদের তুলনামূলক অনুপস্থিতি: এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে দ্রোণ, একলব্য, কুন্তী, বিদুরের উপর আলো বেশি, এবং এটিই লেখকের উদ্দেশ্য বলে ধারণা করা যায়। তবে পাণ্ডব ও কৌরবদের ক্রমবিকাশ—বিশেষ করে অর্জুন, যুধিষ্ঠির বা দুর্যোধনের নৈতিক দ্বিধা, শৈশব রাজনীতি, কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্ব—আরও সংক্ষিপ্তভাবে হলেও, আখ্যানের ঐকান্তিকতা বাড়াতে পারত।
৩) বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির কিছু সীমিততা: অলৌকিকতার বদলে যুক্তি-ভিত্তিক পুনর্ব্যাখ্যা লেখকের অন্যতম সাফল্য, তবে কখনো কখনো তা অতিরিক্তভাবে ব্যাখ্যামূলক হয়ে পড়ে, বিশেষত সংলাপে। এতে কিছু ক্ষেত্রে চরিত্রদের স্বাভাবিক সংলাপচর্চা থমকে গিয়ে বক্তব্যধর্মী লাগে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু স্থানে চরিত্ররা যেন পাঠকের উদ্দেশে ধারণা বোঝাচ্ছেন—যা আখ্যানের অন্তঃপ্রবাহে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
৪) প্রচ্ছদ ও অলংকরণের সম্ভাব্যতা: উপন্যাসের কাহিনির বৈভবের তুলনায় প্রচ্ছদ কিছুটা সাদামাটা ও অনুপ্রাণিত মনে হয় না। রবিবাসরীয় সংস্করণে প্রকাশিত অলংকরণগুলোর অনুপস্থিতিও পাঠকের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা দৃশ্যরস বঞ্চিত করে।
উপসংহার: ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে নতুন পাঠ
সব শেষে বলি, এই সব পর্যবেক্ষণ কোনওভাবেই লেখকের প্রয়াসকে খাটো করার উদ্দেশ্যে নয়—বরং তাঁর দুঃসাহসিক চিন্তার বিস্তারকে সম্মান জানিয়েই, যেসমস্ত দিক ভবিষ্যতের লেখায় আরও গাঢ় হয়ে উঠতে পারে, সেগুলিকে বিনয়ের সাথেই তুলে ধরা। পাঠক হিসেবে আমরা কৃতজ্ঞ, এমন একটি কাজ বাংলা সাহিত্যে আজ জন্ম নিয়েছে, যার অস্তিত্ব শুধু সাহিত্যে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিসরেও অনস্বীকার্য।
‘দৈবাদিষ্ট’ একটি ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণের সাহসী প্রয়াস। এটি ‘প্রথম প্রবাহ’-এর মতো বিস্ফারিতভাবে বৈপ্লবিক না হলেও—তথ্য, যুক্তি, ভাষা, গদ্য এবং ন্যারেটিভ সৌন্দর্যে নিঃসন্দেহে এক অনন্য সৃষ্টি। এটি কেবল মহাভারতের পরিচিত চরিত্রগুলির পুনর্বিন্যাস নয়—বরং আমাদের সমাজের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং নৈতিক চেতনার প্রতিচ্ছবি, যা বারবার ফিরে আসে প্রশ্নের মুখে।
যারা মহাভারতকে কেবল ধর্মীয় কাব্যগ্রন্থ বলে ভাবেন, তাঁদের জন্য এই উপন্যাস এক আত্মপীড়ক চ্যালেঞ্জ। আর যারা বিশ্বাস করেন সাহিত্য মানেই অলীক কল্পনা—তাদের জন্য ‘দৈবাদিষ্ট’ হল রক্তে লেখা কূটনীতির একটি জাগ্রত দলিল। এখানে দেবতা নেই, আছে দেবত্বের মানবিক পুনর্নির্মাণ—যেখানে আলোর থেকেও বাস্তব হয়ে ওঠে ছায়া।
সৌরভ মুখোপাধ্যায়কে কুর্নিশ, এই সাহসী সাহিত্যিক কৌতুক, বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্য এবং যুক্তিময় শ্লেষের জন্য। ‘দৈবাদিষ্ট’ কেবল পাঠ নয়—এ এক চিহ্ন, এক মনস্তাত্ত্বিক আন্দোলন, যা যুগের কাছে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু উত্তর দিতে চায় না। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সে করে—ভাবতে শেখায়।
অবশ্যপাঠ্য। ভক্তির জন্য নয়—জিজ্ঞাসুদের জন্য। সন্দেহপ্রবণদের জন্য। এবং যারা সাহিত্যে সত্যের উন্মোচন খোঁজেন, তাদের জন্য।
“যে পাঠ প্রশ্ন তোলে, সেই পাঠই স্থায়ী।” — এই দর্শনেই জন্ম নেয় দৈবাদিষ্ট।
নাম : দৈবাদিষ্ট লেখক : সৌরভ মুখোপাধ্যায় প্রকাশনা : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা সম্প্রতি সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস দৈবাদিষ্ট পড়া শেষ করলাম। সেই প্রসঙ্গে পাঠ অনুভূতি জানাচ্ছি। মহাভারতের প্রথমদিকে আমরা একলব্যর উল্লেখ পাই যে গুরুদক্ষিণা হিসাবে তার ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে কেটে তার গুরুদেব দ্রোণাচার্যকে উপহার দিয়েছিল। একলব্য গুরুদক্ষিণা দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার পরে একলব্যর কি পরিণতি হয়েছিল সেই বিষয়ে আমরা অনেকেই অবগত নই। দৈবাদিষ্ট উপন্যাসটিতে অত্যন্ত যুক্তিনির্ভরভাবে একলব্যর জীবনের ঘটনাবলীকে তুলে ধরেছেন। দৈবাদিষ্ট কথাটির আক্ষরিক অর্থে বোঝায় যে ব্যক্তি অথবা যে পরিস্থিতি দৈবের দ্বারা আদিষ্ট। এই উপন্যাসে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কিছু ঘটনাপ্রবাহকে এমন সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে যার অন্তিম পরিণতিকে সত্যি দৈব দ্বারা নির্ধারিত হিসাবেই মনে হয়। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে শ্রীমদভাগবত গীতার কিছু কথা মনে পরে যায় যখন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যুদ্ধের ফলাফল পূর্বনিধারিত হয়ে গেছে। দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ প্রভৃতি বীরগণ ভগবানের দ্বারা ইতিমধ্যে হত হয়েছেন, এখন শুধু অর্জুনকে নিমিত্তমাত্র হয়ে শুধুমাত্র তাদের মৃত্যুর কারণ হতে হবে। ঠিক সেইভাবে উপন্যাসটিতে এটাই দেখতে পাই যে গুরুদেব দ্রোণাচার্যকে যে আক্ষরিক মৃত্যুর পূর্বেই অনুশোচনাতেই তাঁর হৃদয় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। এরপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রৌপদের কাছে আক্ষরিক মৃত্যু শুধুই সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই না। গীতাতে বলা আছে আত্মাকে সৃষ্টি অথবা ধ্বংস করা যায়না। অজেয়, অমর আত্মা শুধুমাত্র একটি ���েহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয়। এখানে একলব্যর ক্ষেত্রেও তার অঙ্গুলিকর্তন যা কিনা একপ্রকার মৃত্যুরই নামান্তর সেটা তার জীবনের প্রথমদিকেই সংঘটিত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে তার দেহ অর্থাৎ বাহ্যিক পোশাক, আচার ব্যবহার পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আত্মার ইচ্ছা অর্থাৎ গুরুদেব দ্রোণাচার্যের উপর প্রতিশোধস্পৃহা সেই একইরকম রয়ে গেছে। এইভাবে গীতার সঙ্গেও এই উপন্যাসটির বক্তব্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। উপন্যাসটির ভাষার গঠনশৈলী অসাধারণ। বইটি পড়ার পরে বারবার এটাই মনে হচ্ছিল যে আহা, বড় তাড়াতাড়ি যেন শেষ হয়ে গেল। আরও পড়তে পারলে ভালোলাগতো.. লেখকের মহাভারত সম্পর্কিত আরও দুটি উপন্যাস প্রথম প্রবাহ এবং যুগ সম্ভাবিনী পড়ার পরে ঠিক একইরকম ভাবে মুগ্ধ এবং বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। উপসংহারে এটুকু বলতে পারি যে প্রথম প্রবাহ এবং যুগ সম্ভাবিনী উপন্যাস দুটির মতো দৈবাদিষ্ট উপন্যাসটিও বাংলা সাহিত্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। সমস্ত সুধী পাঠকবৃন্দকে দৈবাদিষ্ট উপন্যাসটি পড়ার অনুরোধ করলাম।
লেখকের গুণ মুগ্ধ পাঠক আমি আর এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 'প্রথম প্রবাহ' পড়ার পর থেকেই এই জনরা অর্থাৎ পৌরাণিক কাহিনীর প্রতি আমার আকর্ষণ অনেক বেড়ে গেছে আর তাতে বাণী বসু ও সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের লেখার অবদানই বেশি। মহাভারতের মূল গল্প বা বেসিক স্টোরি লাইন আমরা কমবেশি সকলেই পড়েছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে DD National এ সম্প্রচারিত " মহাভারত " নামক সিরিয়ালটিতে দেখানো ঘটনাবলীই সবাই বেশি মনে রেখেছেন বা বিশ্বাস করেন। 'দৈবাদিষ্ট' নিয়ে বহু বিতর্ক হতেই পারে কারণ কিছু চরিত্র নির্মাণ নতুনভাবে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। গুরু দ্রোণ এর গুপ্ত অভিসন্ধি হোক বা বাসুদেবের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলির এত সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। ক্ষত্তা বিদুরের পান্ডবদের প্রতি অপত্যস্নেহ সবকিছুই ব্যাখ্যা করেছেন শুধু তাই নয় তীরন্দাজী বিদ্যার পিছনে লুক্কায়িত অলৌকিক ঘটনাগুলোর রহস্য উন্মোচন করেছেন। সঠিক পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাবহার , রসায়ন চর্চা, ধাতুবিদ্যার ব্যাবহার কিভাবে দ্রোণ শিক্ষাদান করেছিলেন বীর অর্জুনকে তার বিবরণ খুবই ভালো লেগেছে। মহাভারত গাথার প্রত্যেকটা ঘটনার পিছনে গূঢ় অর্থবহ রাজনীতি ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যা আমার অসাধারণ লেগেছে। তবে দ্রোণহন্তা হিসেবে পাঞ্চালকুমারের আবির্ভাবের বর্ণনা সত্যিই শিহরণ জাগায়। আর এতো সুন্দর ভাষার প্রয়োগ আর ঘটনার গতি যে পড়লে মনেই হয়নি এতো বড় উপন্যাস এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। " দৈবাদিষ্ট" ই বটে।
প্রতিশোধস্পৃহা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার অহরহ উদাহরণ আছে সমগ্র মহাভারত জুড়ে।এই ধরুন না দ্রোণাচার্যের কথা। দরিদ্র দ্রোণ বাল্যকালে পাঞ্চাল রাজকুমার দ্রুপদের সাথে একই গুরুর আশ্রমে অস্ত্রশিক্ষা নিয়েছিল।দ্রুপদ কথা দিয়েছিল সিংহাসনে আরোহণ করলে অর্ধরাজ্য দ্রোণকে প্রদান করবে। কিন্তু এ ছিল শুধুই ছলনা। বরং দ্রুপদের কাছ থেকে অপমানিত হয় দ্রোণ।একবুক প্রতিশোধ নিয়ে পাণ্ডব ও গৌরব রাজকুমারদের তৈরি করে দ্রুপদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া কালে দ্রোণের কাছে অপমানিত হয়ে ফিরে যায় সূতপুত্র কর্ণ ও নিষাদপুত্র একলব্য।দ্রোণের দ্বারা অপমানিত দ্রুপদ পুত্রসন্তান লাভের যজ্ঞের আয়োজন করে দ্রোণকে নির্বংশ করতে।অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ করতে গিয়ে নিজের মৃত্যুবাণ তৈরি করে ফেলেন দ্রোণ। তাইতো অপমানিত একলব্য বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে দ্রোণাচার্যের কাল হয়ে।
বইটি লিখতে ইন্দোনেশিয়ান মহাভারতের ধারণা নিয়েছেন লেখক।তাই লেখার বিনির্মাণে কিছুটা নতুনত্ব এসেছে যা বেশ চিত্তাকর্ষক। সমগ্র মহাভারত জুড়েই বাসুদেবের প্রভাবশীলতা কারণ অনুসন্ধান করছেন লেখক। লৌকিক উপায়ে ব্যাখ্যা করেছেন পঞ্চপাণ্ডবের জন্মবিত্তান্ত, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর আবির্ভাব। এছাড়াও রয়েছে প্রাচীন ভারতের শল্যচিকিৎসা ,অস্ত্রশিক্ষার খোঁজখবর।বহুল চর্চিত মহাকাব্যের এই নতুন সংযোজন ও ভাষার শৈল্পিক ব্যবহার পাঠকের মনে বহুদিন ছাপ রেখে যাবে।
Done!!!✨❤️✨❤️✨❤️✨❤️✨✨❤️✨❤️✨❤️✨ দৈবাদিষ্ট - সৌরভ মুখোপাধ্যায় রবিবাসরীয়তে প্রকাশকালীনই মহাভারতের ওপর গবেষণাধর্মী এই উপন্যাস পাঠকসমাজে ঝড় তুলেছিল... "প্রথম প্রবাহ " এর পর পুনর্বার এমন যুক্তিভিত্তিক পুনর্কথন সত্যি ভারত - ইতিবৃত্তে বিপ্লব তুল্য। বিদূর যে যুধিষ্টির এর ধর্মরূপী পিতা তা জেনেছি বহু আগেই... কিন্তু ব্যাধ একলব্যের ধৃষ্টদুম্ন হয়ে ফিরে আসা যেন শান্ত পুস্করিণীতে ঢেউ ওঠার সমতুল্য। এ উপন্যাসের আরো এক দিকপাল দিক হচ্ছে কৃষ্ণের আগমন - কিভাবে একজন ক্রান্তদর্শীসুতীক্ষ্ণ ও সুচারু কূটনীতির জাল বিস্তার করছেন এক কালান্তর রনোভূমির প্রেক্ষাপট সৃজনে... মহাভারত নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। আর বিতর্কই তুর্ণি চিন্তাধারার মন্থনকারী দন্ড। সৌরভ মুখোপাধ্যায় এর মননশীল যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ প্রতিবারই শুনিয়েছে একটাই কথা - এভাবে তো ভেবে দেখিনি! দেখোনি যখন, তখন দেখো... যারা পড়েননি, তারা পড়ুন, পড়তে বলুন... আমার কাছে বাংলাসাহিত্যে মহাভারত চর্চায় " দৈবাদিষ্ট " আরেক কনক - প্রদীপ হয়ে রইলো।
Rating : 4 stars Entertaining fast-paced interesting perspective .. but I felt it was a bit short it could have been more elaborate or can go on for little bit more .Some areas are mentioned in the novel but at last they didn't get time to develop
another thing is repetition of the statement how divine and supernatural things are used to hide the true incident and whether it would be mentioned in Mahabharat was not necessary .
Writer could have just presented what he thought about truly happened and that would have been enough readers always keep an open mind about Mahabharat retelling anyway
সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম মহাভারত নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়েছিলাম ২০২০ সালের লকডাউনে 'প্রথম প্রবাহ'। তারপরে কিছুদিন আগেই পড়েছি 'যুগ সম্ভাবিনী'। আর এখন পড়লাম 'দৈবাদিষ্ট'। বলা বাহুল্য তিনটি বইই খুবই উপভোগ করেছি লেখকের অনন্য সাধারণ লেখনী গুণে। মহাভারতের উপর উপন্যাস যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
সুলিখিত উপাখ্যান। সুন্দর ভাষা, গোছানো প্লট, সযত্ন চরিত্রচিত্রণ। তবে প্রতিভা বসুর ‘মহাভারতের মহারণ্যে’ আর গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ‘পাঞ্চজন্য’ যাদের পড়া আছে, তাদের হয়তো বইটি থেকে খুব বেশি কিছু আশা না করাই ভাল। (মতামত অবশ্যই ব্যক্তিগত)
মহাভারতকে সহজভাবে জানতে হলে অবশ্য পাঠ্য। কাহিনীর শুরুতে কুরু ও পাণ্ডবদের শিক্ষাগুরু হিসেবে দ্রৌণ-এর আবির্ভাব । এক নিশ্বাসে গিলে ফেলার মতো বই।এর আগে সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের 'প্রথম প্রবাহ' পড়ে নিলে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।লেখকের সব লেখা আমার অত্যন্ত প্রিয়,তবে পৌরাণিক কাহিনীগুলো বিশেষভাবে টানে।
উপন্যাস : দৈবাদিষ্ট লেখক : সৌরভ মুখোপাধ্যায় প্রকাশনী : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০/-
সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের 'দৈবাদিষ্ট' উপন্যাসটি রবিবাসরীয় আনন্দবাজারে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম দিকে কয়েকটি পর্ব পড়ার পরে মনে হয়েছিল, একসাথে সম্পূর্ণ লেখাটা না পড়লে ঠিক পুরোপুরি রসস্বাদন হয়তো গ্রহন করা যাবে না। তাই খাপছাড়াভাবে পত্রিকায় পঠনের পর বই থেকে সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পড়ার আগ্রহ ছিল চরমে। সেই উৎসাহী মনই আজ শান্ত হল, যখন সম্পূর্ণ লেখাটা পাঠের সৌভাগ্য হল।
🔰 এর আগে লেখকের 'প্রথম প্রবাহ' উপন্যাসটি পড়েছিলাম। সেখানে সত্যবতীর সাথে দেবব্রত অর্থাৎ ভীষ্মের এক অন্যরকম সম্পর্ক তুলে ধরেছিলেন তিনি। বেশ ভালো লেগেছিল সেই বিনির্মাণ।
👉 বিনির্মাণ কথাটা এখানে বলা প্রয়োজন, কারণ এরকম অনেকেই লিখেছেন সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে, নিজস্ব চেতনায়, নিজেদের মতোন করে। কখনও হয়তো পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে সেই লেখা, কখনও হয়তো হয়নি।
🔸️ রামায়ণ কিংবা মহাভারতের কথা যখনই ভাবি কিংবা এই মহাকাব্যগুলো যখন পড়া হয় তখন একসাথে কত বিচিত্র কর্মকাণ্ড, কত চরিত্র, কত ঘটনার যে সাক্ষী থাকি তার কোনও ইয়ত্তা নেই। এক কাব্যে, কত গল্প, কত ঘটনা!
🔹️ এই এত বিচিত্র গল্প, ঘটনা, এগুলো যে পরস্পরের সঙ্গে সবসময় আলাদা নয় তারই অন্যতম উদাহরণ এই উপন্যাস তা কিন্তু বলা যেতেই পারে।
🔸️ এই উপন্যাসে অনেকগুলো মুখ্য চরিত্র। অনেকেই ভাববেন যে মাত্র দুটো চরিত্রকে বেস করেই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে, কিন্তু তা নয়। চরিত্র অনেকগুলি, বরং সেই দুটো চরিত্রকে একটা সুতো দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
🔹️ বরং এই উপন্যাসের অনেকগুলো স্তর আছে। স্তর না বলে অনেকগুলো ভাগ বলা যেতে পারে। হস্তিনাপুরের রাজসভা, পাণ্ডবদের জন্মবৃত্তান্ত, বিদূরের দূরদর্শিতা, দুর্যোধনের মন্ত্রনাকক্ষ, দ্রোণের শিক্ষাপ্রদান, গুরুদক্ষিণা, পাণ্ডবদের পাঞ্জাল বিজয় ও দ্রোণের প্রতিশোধ, জরাসন্ধের আধিপত্য, কৃষ্ণের কূটনীতি, একলব্যের অসাধারণত্ব, দ্রুপদের যজ্ঞ, ধৃষ্টদুম্নের জন্ম - এই সকল ভাগের মিলিত ফল হল এই উপন্যাসের মূল ভিত্তি।
🔸️ লেখক খুব সুন্দরভাবে সকল সুতোকে এক জায়গায় এনে গেঁথেছেন আর গেঁথেছেন এমন সূচারুভাবে যে ফাঁক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে একটা খটকা আমার আছে, তা পরে বলছি।
🔰 মূল যে দুটি প্রসঙ্গের কথা লেখক উল্লেখ করেছেন তার উপন্যাসে, এমনকি লেখক নিজেও বইয়ের শেষভাগেও সেই সম্পর্কে তার নিজস্ব বক্তব্য রেখেছেন তার একটি হল একলব্যের কাহিনী। একলব্যের অস্ত্রশিক্ষা, অসাধারণত্ব, গুরুদক্ষিণার কথা আমরা মহাভারতে পড়েছি। তবে তারপর তার কী হল? সেরকম খুব একটা বেশি তথ্য আমরা পাই না, কিন্তু তার সম্পর্কে যথেষ্ট কিছু থাকার অবশ্যই দরকার ছিল। এরকম দুর্দান্ত এক বীর, অনবদ্য যার পারদর্শিতা, তাকে কী একেবারেই ভোঁতা করে দেওয়া সম্ভব!? তার কী হল এই কৌতুহল পাঠক হিসাবে বরাবরই ছিল আমার।
🔹️ অন্যদিকে যজ্ঞের মাধ্যমে সরাসরি সন্তান লাভের পিছনে যে কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার এক সূচারু প্রভাব তা লেখক খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ধৃষ্টদুম্নের জন্মের এক নতুন দিক খুলে দিয়েছেন। আহা যদি এমন হত!
🔸️ এই উপন্যাসে পাণ্ডবদের জন্মরহস্যের নতুন এক ব্যাখা মহাভারতের এই অধ্যায়কে নতুনভাবে ভাবার জন্য বাধ্য করে। কর্ণের জন্মের কথা লেখক উল্লেখ করেছেন, যুধিষ্ঠিরের কথা বলেছেন। বিদূর আর কুন্তির পারস্পরিক সম্পর্কের এক অন্য মাত্রা দিয়েছেন। শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষের মহাভারতেও এইরকম আঙ্গিক লক্ষ্য করেছিলাম। তবে যে খটকার কথা আগে বলেছিলাম, তার কথা বলি। লেখক ভীম, অর্জুন এর জন্মের তাহলে ব্যাখা কীভাবে দেওয়ার কথা ভেবেছেন? বা নকুল, সহদেবের ক্ষেত্রে সেক্ষেত্রে কী উত্তর হবে?
🔰 এই উপন্যাসের অন্যতম দুর্দান্ত চরিত্র আমার মতে জম্বুক। শ্রীকৃষ্ণ যদি মন্ত্রনার মস্তিষ্ক হয়, তবে তার অর্জুন কিন্তু জম্বুক। নতুন ভারত গড়ার যে সংকল্প তিনি নিয়েছেন, যেভাবে তিনি ভেবেছেন, তার কারিগর কিন্তু জম্বুকই। খবর সংগ্রাহক, দূত, বার্তাবহক - কী কাজ করে না জম্বুক! আর তার ভাষার ও শব্দের প্রয়োগ, (লেখক যতই উল্লেখ করুন না কেন সবই কৃষ্ণের শেখানো-পড়ানো) তা যেন কঠিন বরফকেও ধীরে ধীরে তরল করে ফেলে... কোচের থেকেও খেলোয়াড়ের গুরুত্ব বেশি বলেই মনে করি আমি।
🔹️ এছাড়া, এই উপন্যাসে দ্রোণের ভৃমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া কুন্তি কিংবা জরাসন্ধের কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, দ্রুপদের কিছু আকাঙ্খা - এই সবকিছু লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার লেখনীতে।
🔰 উপন্যাসের শেষ পর্বে দ্রোণের সাথে ধৃষ্টদুম্নের যে বাক্যালাপ লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন, তা যেন ভিতরের অনেক গভীর ক্ষত নিরাময়ের ওষুধ। সেই কথোপকথনে ছিল অভিযোগ, ছিল একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা; আবার ছিল নিজেদের ব্যক্তিগত সামর্থ্য প্রকাশ করার প্রতিজ্ঞা। শেষের এই লেখা পড়লে যেন বিহ্বল হয়ে পড়তে হয়।
🔸️ অদূর ভবিষ্যতে কী হবে তা আমরা জানি..... কীভাবে হবে, কী মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ফুটে উঠবে তা ভাবার জায়গা কিন্তু পাঠকের আছে। প্রসাদের গুণ বিচার তখনই সম্ভব যখন তা সঠিকভাবে গ্রহন করা হয়। তা সে দৈবই হোক আর না হোক...
🔰 বইটির প্রচ্ছদ তৈরি করেছেন সৌজন্য চক্রবর্তী। দুর্দান্ত কাজ। যজ্ঞের অগ্নি থেকে তীরধনুক হাতে এক যোদ্ধার আবির্ভাব। উপন্যাসের সাথে দুর্দান্তভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আর এই একটা ছবিই যেন উপন্যাসের অর্ধেক রহস্য উন্মোচন করে দেয়। অনবদ্য কাজ।
🔰 পুরাণকাহিনীর উপর লেখা যারা পড়তে পছন্দ করেন, মহাভারতের বিভিন্ন গল্প যাদের জানতে ইচ্ছা করে, তারা অবশ্যই পড়তে পারেন উপন্যাসটি। তবে হ্যাঁ, মন সুস্থ হওয়া আবশ্যিক, বিনির্মাণকে যথাযথ সন্মান দেওয়া আবশ্যিক আর খোলা মনে ভাবনাচিন্তা করার পরিসর থাকা অবশ্যই দরকার।