যিশু- সর্বজন শ্রদ্ধেয় সেই মানুষটির নাম, যিনি আজ ঈশ্বরে পরিণত হয়েছেন। তাঁর অন্যান্য পুরুষ সহচররাও পেয়েছেন এক- একজন মসিহা’র স্ট্যাটাস। আর মেরি? না না, যিশুর মা অথবা বোন মেরি নন! এ এক অন্য মেরি। ইতিহাস কখনও তাঁকে দিয়েছে পতিতার পরিচয়, কখনও বা ‘সিনার’ মেরি বলে আখ্যা দিয়েছে। আবার কখনও তিনি পেয়ছেন যিশুর প্রেমিকার পরিচয়। কেউ কেউ বলেন, তিনি নাকি ছিলেন যিশু নামক ঈশ্বরের স্ত্রী, তাঁর ঔরসজাত সন্তানের মা, পবিত্র ব্লাডলাইনের বাহক। তবে আসলে কে ছিলেন এই মেরি, ইতিহাস যাকে ‘মেরি অফ ম্যাগডেলা’ নামে চেনে।
বাইবেল বলছে, পুনর্জন্মের পর যিশুকে প্রথমবার দেখেছিলেন এই মেরিই। আর সেখান থেকেই জন্ম হয় খ্রিস্টানিটির। অথচ সেই ঘটনার পর বাইবেলে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না এই মেরির অস্তিত্ব। হঠাৎ করে কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি? নাকি কোনও বিশেষ কারণে কেউ বা কারা তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল? বঞ্চিত করতে চেয়েছিল তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা থেকে? খুঁজে দেখব আমরা…
ম্যাগডালেন কে ছিলেন? 'দ্য ভিঞ্চি কোড' পড়ে বা দেখে ফেলা জনতা তক্ষুনি বলে উঠবে, "যিশু খ্রিস্টের স্ত্রী!" গোঁড়া খ্রিস্টানরা নাক শিঁটকে বলবে, "যিশু'র অনুগ্রহ পেয়েছিল এমন এক পতিতা।" কিন্তু সত্যিটা কি এই দুই সহজ বাইনারি-র মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন লেখক আলোচ্য বইটিতে। বইটিতে দু'টি পর্ব আছে। প্রথম পর্বে আঠেরোটি অধ্যায়ের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করা হয়েছে, মেরি ম্যাগডালেন আসলে কে ছিলেন এবং যিশু'র সঙ্গে তাঁর কীভাবে আলাপ হয়েছিল। তারই সূত্র ধরে আলোচিত হয়েছে প্রত্নতত্ত্বের নানা আবিষ্কার ও তাদের ব্যাখ্যা। শেষে, সেইসব আবিষ্কার এবং অন্য ঐতিহাসিক উপাদানের মাধ্যমে বুঝতে চাওয়া হয়েছে, কীভাবে ও কেন ম্যাগডালেন যিশু'র নিজস্ব মানবতাবাদী ভাবনা তথা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। দ্বিতীয় পর্বটি আঠেরো অধ্যায়ে দেখিয়েছে, কীভাবে প্রশাসনের কাছে সন্দেহ ও ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিলেন যিশু— যার পরিণামে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। জুডাসের পরিচয়, বাকি অ্যাপোস্টলদের ভূমিকা, সর্বোপরি পিটারের মাধ্যমে যিশু'র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি সম্পূর্ণরূপে পিতৃতান্ত্রিক একদল মানুষের কুক্ষিগত হয়ে পড়াও স্পষ্ট হয়েছে এই পর্যায়ে। অবশেষে আমরা মুখোমুখি হয়েছি সেই মুহূর্তের, যেখানে পুনরুত্থানের পর যিশু'র মুখোমুখি হয়ে তাঁর আন্দোলনটিকে পুনরুজ্জীবিত করেও, এমনকি যিশু'র ঘোষণা-মাফিক তাঁর উত্তরসূরি হওয়া সত্বেও বিতাড়িত হয়েছেন ম্যাগডালেন। অবশেষে বিভিন্ন কিংবদন্তির বিচার করে লেখক বুঝতে চেয়েছেন, ম্যাগডালেনের অন্তিম পরিণতি কী ছিল। বাংলায় এই বিষয় নিয়ে একটিও বই নেই। তাই লেখক নিবিড় অধ্যয়ন এবং যথোচিত আবেগের সাহায্যে এই কাজটি করে আমাদের সবার কাছে ধন্যবাদার্হ হলেন। বইয়ের শেষে বিস্তৃত পাঠের জন্য একটি নির্দেশিকা দিয়েও তিনি কৃতজ্ঞতাভাজন হলেন। তবে এই বইয়ের তিনটি জিনিস আমার বেশ খারাপ লেগেছে। সেগুলো হল~ ১) লেখক বারবার "চলুন যাওয়া যাক" ইত্যাদি লিখে বইটিকে লঘু করেছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক কথা (যেমন ইজরায়েলে ঢোকা কতটা কঠিন) বারবার, বিভিন্ন অধ্যায়ে বলা। ফেসবুকে বা ব্লগে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত লেখায় লোকে এমন করে। সিরিয়াস বইয়ে এ জিনিস কাঙ্ক্ষিত নয়। ২) লেখকের ইংরেজি-প্রেম অত্যন্ত বিশ্রীভাবে প্রকট হয়েছে নানা জায়গায়। অর্থ মানে কী তা বোঝাতে পাশে ব্র্যাকেটে ফান্ড লেখা, নিচু-তলার মানুষ বোঝাতে পাশে ব্র্যাকেটে গ্রাস রুট লেখা— এ-সব তো আছেই। সঙ্গে রয়েছে বাইবেলের বিভিন্ন ইংরেজি অনুবাদ (যাদের কোনো উল্লেখ তথ্যসূত্রে পাইনি) থেকে নেওয়া রাশি-রাশি অতিনাটকীয় উদ্ধৃতি। ইংরেজি বাইবেলও যে আদতে অনুবাদ এটা মাথায় রেখে তিনি কথাগুলো একটি নির্ভরযোগ্য বাংলা অনূদিত সংস্করণ থেকে তুলে দিলেই যথাযথ হত। তার বদলে এই অকারণ ইংরেজি দেখে একে স্রেফ বিদ্যে জাহির করার প্রবণতা বলে মনে হয়। ৩) এমন একটি বইয়ে প্রচুর স্কেচ আর ম্যাপ দরকার ছিল। তার একটিও নেই এতে। তবু বলব, বাংলায় যে এমন বই লেখা হল, তাও এক বিশাল প্রাপ্তি। আশা রাখব যে পাঠকদের যথাযথ আনুকূল্য পেয়ে আগামী দিনে লেখক তাঁর গবেষণার সাহায্যে বইটিকে আরও সমৃদ্ধ তথা সূচিমুখ করে তুলবেন।
শেষ নৈশভোজনে ১২ জন অ্যাপোস্টলদের অভ্যর্থনা জানালেন যীশু। এরপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন যিশাস মুভমেন্ট সচল রাখতে তিনি রোমান সৈনিকদের হাতে ধরা দিবেন।অ্যাপোস্টলদের একজন 'জুডাস' তাকে ধরিয়ে দিবেন এবং অন্য একজন বিচারকালে তাকে চিনতে অস্বীকার করবে। বিচার শেষে দুইজন সৈনিক কাঠের বল্লা সমেত যীশুকে অত্যাচার করতে করতে নিয়ে যায় মাউন্ট জিওনের পাদদেশে। শেষ যাত্রায় তার সঙ্গী কেউই ছিল না একজন নারী বাদে। এই নারীই ম্যাগডালেন।যীশুর সুযোগ্য, একনিষ্ঠ সহকর্মী ও বন্ধু। তিনি দুদিন পর আবিষ্কার করেন যেখানে যীশুকে সমাহিত করা হয় তিনি সেখানে নেই।বরং শোনা যায় যীশুর কন্ঠস্বর। অর্থাৎ যীশুর রেজারেকশনের একমাত্র সাক্ষী তিনি।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে গেল কত ঘটনা, নতুন ধর্মের প্রবর্তন।অথচ সময়ের কি এমন ষড়যন্ত্র যে এই নারীকে হারিয়ে যেতে হল! সেইসময় রোমান সৈনিকদের দ্বারা ইউরোপে শাসন ও শোষণ চলছিল। ইউরোপের একটি অংশ গ্যালিলিতে একদল বিদ্রোহী গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করে।এই সংঘের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যীশু।এই যিশাস মুভমেন্ট চালিয়ে নেওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল।অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন ম্যাগডালেন।ফলে অল্পদিনেই তিনি যীশুর অনুরাগী, আস্থাভাজন, জনপ্রিয় ও প্রাধান্য বিস্তার করেন।তার জনপ্রিয়তা মেনে নিতে পারেনি অন্যসব অ্যাপোস্টলরা।ফলে হারিয়ে যেতে হল ম্যাগডালেনকে। অজানা ভয়ে লুকিয়ে রাখা হল ম্যাগডালেনের সাথে সম্পর্কিত সব নথি ও গসপলগুলো। অপবাদ দেওয়া হলো ম্যাগডালেনের নামে। কিন্তু সময়ই আবার ম্যাগডালেনকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে।
প্রাচীন নথিপত্রের রেফারেন্স, বিভিন্ন মিউজিয়াম থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও একের পর এক দেশ ঘুরে বিভিন্ন তথ্য আহরণ করেছেন লেখক। লেখকের সাথে আমাদেরও টাইম ট্রাভেল করে ম্যাগডালেনের অন্তর্ধানের রহস্য জানা হল।তবে লেখক একই তথ্য বারবার ব্যবহার করেছেন, এতে যথেষ্ট বিরক্ত লেগেছে। তথ্যবহুল বইটি লেখক সাবলীল ভাষায় লিখেছেন।
যেকোন বইয়ের একটা জিনিস ব্যক্তিগতভাবে খুব অপছন্দ করি। কোন বিষয়ে বলার সময়ে লেখক যখন বলে বসেন অমুক জিনিসটা পরে আলোচনা করা হবে। এইরকম লাইনে বইটা একদম ভর্তি থাকায় বেস বিরক্ত লেগেছে পড়তে।
যাহোক বইয়ের টপিক ইন্টারেস্টিং। এই বিষয়টা নিয়ে আগে একটু পড়াশোনা থাকায় খুব বেশি চমকে যাইনি। প্রথমবার যারা এই টপিকে পড়াশোনা করতে গিয়ে বইটা পড়বে তারা নির্ঘাত চমকাবে।
কে এই ম্যাগডালেন? যিশুর স্ত্রী? তাঁর প্রেমিকা? একজন পতিতা? নাকি মহান খ্রিস্ট ধর্মের উৎস?
যিশু খ্রিস্টের সবচেয়ে কাছের লোক বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে ধরিয়ে দেন রাজার পেয়াদার কাছে। মেকি বিচার ব্যবস্থায় মিথ্যে অভিযোগে যিশু খ্রিস্টের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি হয়। বিচারের সময় স্বপক্ষে তিনি কিছুই বলেননি। বিচারক জেরুজালেমের জুডেয়ার গভর্নর পন্টিয়াস পাইলেটের রায়ে রাজার পেয়াদারা তাঁর পায়ের পাতায়, হাতের কব্জিতে বড় বড় লোহার পেরেক গেঁথে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তার মাথায় পরানো হয়েছিল কাঁটার মুকুট। কাঠের ক্রুশে বিদ্ধ অবস্থায় যিশু খ্রিস্ট বলেছিলেন, "হে ঈশ্বর তুমি এদের ক্ষমা করো। এর অবুঝ, জানেনা কী অন্যায় করছে। তুমি এদের ক্ষমা করো।" এই সময় যিশু খ্রিস্টের সাথে সাথে মাউন্ট জিয়নের পাদদেশে এসে পৌঁছেছিলেন যীশুর মা, যীশুর বোন এবং মেরি ম্যাগডালেন। তিনজনের কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাদের প্রিয় মানুষটার এই পরিণতি। দীর্ঘ তিন ঘন্���ার বেশি সময় ধরে এই নারকীয় অত্যাচার সহ্য করার পর তিনি মারা যান। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পেয়াদারা বর্ষা দিয়ে ফুটো করে দেয় তাঁর বুক। নিউ টেস্টামেন্ট অনুযায়ী ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর পর যখন সৈনিকরা চলে গেলেন তখন নিজের আরাধ্য মানুষটার কাছে এগিয়ে গেলেন মেরি ম্যাগডালেন। যিশু খ্রিস্টের পায়ের কাছে বসে তিনি তাঁর পায়ের পাতায় শুকিয়ে যাওয়ার রক্ত পরিষ্কার করলেন। জোসেফ ও নিকোদামাসের সাহায্য নিয়ে মেরি যিশু খ্রিস্টের নগ্ন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমাট বেঁধে থাকা রক্ত একটি ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে পরিষ্কার করলেন। যিশু খ্রীষ্টের শরীরকে পরিষ্কার ও পবিত্র করে নিয়ে যাওয়া হয় মাউন্ট জিওনের এক গোপন গুহায়, সেখানে তার শরীরকে সাদা কাপড়ে ঢেকে টুম্বস্টোনের উপর রেখে দেওয়া হয়। এরপর মৃত্যুর তৃতীয় দিনে যীশু খ্রীষ্ট পুনরায় ফিরে আসেন পৃথিবীতে। এই ঘটনাই হল বিখ্যাত রেজারেকশন, যা কিনা খ্রীষ্ট ধর্মের মূল ভিত্তি। আর এই ঘটনার সর্বপ্রথম ও প্রধান সাক্ষী ছিলেন মেরি ম্যাকডালেন। যীশু খ্রিস্টের রেজারেকশনের পর যিশুর অন্যতম এক শিষ্যা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অস্তিত্ব প্রায় মুছে ফেলা হয়। কিন্তু কেন? তাকে কি কোন ষড়যন্ত্রের বশবর্তী হয়ে হারিয়ে যেতে হল ইতিহাসের পাতা থেকে? নাকি তিনি নিজে ইচ্ছে করে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার পেছনেও কি কোন কারণ ছিল?
যিশু খ্রীষ্টের মৃত্যুর পর তার অনুচরেরা যিশু খ্রীষ্টের জীবন এবং তার চিন্তাধারাকে নিজেদের মতো করে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, সেই লেখাকেই গসপেল বলা হয়। যে চারটি গসপেল চার্চ দ্বারা স্বীকৃত হয়েছিল সেগুলির রচয়িতা ছিলেন ম্যাথিউ, মার্ক, ল্যুক এবং জন। কিন্তু অজস্র গসপেলের মধ্যে মাত্র চারটিকেই কেন স্বীকৃতি দেওয়া হয়? বাকিগুলিকে স্বীকৃতি দিলে কী কোনো অস্বস্তিকর সত্য উঠে আসতো?
যিশু খ্রিস্টের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই গ্যালিলির উত্তর দিকে অবস্থিত এক মৎস্যজীবীদের গ্রাম ম্যাকডেলাতে গ্রামে জন্ম হয়েছিল মেরি ম্যাকডালেনের।
গ্যালিলিয়ান সমুদ্রের তলায় খুঁজে পাওয়া নৌকাই ছিল কাপোডিয়াম থেকে ম্যাকডেলা পৌঁছানোর যাতায়াতের মাধ্যম। অর্থাৎ অনুমান করা যায় এই নৌকো চড়েই আজ থেকে দু হাজার বছর আগে যীশুখ্রীষ্ট পৌঁছেছিলেন ম্যাকডেলা যেখানে তার সাথে প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়েছিল মেরি ম্যাগডালেনের।
ম্যাগডালেন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত সম্পত্তি মৎস্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যে অর্থ পেয়েছিলেন তা পুরোটাই তুলে দেন যিশু খ্রীষ্টের হাতে আন্দোলনের স্বার্থে। তিনি নিজে হয়ে ওঠেন যিশু খ্রীষ্টের ছায়াসঙ্গী। তিনি যিশু খ্রীষ্টকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যদি রেবেল গ্রুপকে প্রভাবিত করা যায় তাহলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রভাবে রোমান সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে যাবে, এক স্বাধীন ইজরাইলের জন্ম হবে আর যেখানে যিশু খ্রীষ্টের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
যিশুখ্রীষ্ট আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিক মেরি ম্যাগডালেন। কিন্তু যীশু খ্রীষ্টের অনুগামীদের মধ্যে পিটারের সাথে মেরি ম্যাগডালেনের সম্পর্ক ভালো ছিল না। যিশুখ্রিস্টের আন্দোলনের মধ্যে একটি ছিল হিব্রু সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পিটারের প্ররোচনায় যিশুখ্রিস্টের অনুগামীরা মেরি ম্যাগডালেনকে আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন। তারা মেরি ম্যাগডালেনকে পতিতা আখ্যা দেন। পিটার হয়ে ওঠেন যিশুখ্রিস্টের উত্তরসূরী। পরবর্তীকালে জন্ম নেয় সেই প্রতিষ্ঠান যা পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, যার নাম চার্চ। সেন্ট পিটার হলেন তার প্রধান, ইতিহাসের প্রথম পোপ বা বিশপ।
বেনি মাজারের গুহায় যে প্যাপিরাসগুলি পাওয়া গিয়েছিল তাতে দুটি ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল, একটি গ্রিক ভাষা অন্যটি কপটিক টেক্সট। কথিত আছে এই প্যাপিরাসগুলি নাকি পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান অ্যান্টিক যাতে এমন কিছু লেখা আছে যা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছলে অভিশাপ নেমে আসবে পৃথিবীতে। কপটিক মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে এই কোডেক্স চ্যাকোস যার অপর নাম গসপেল অফ জুডাস।
গসপেল অফ ফিলিপের প্যাপিরাসগুলির পাঠোদ্ধার করে যিশু খ্রীষ্ট, পিটার এবং মেরি সম্পর্কে কিছু বিস্ফোরক তথ্য পাওয়া যায়।
গসপেল অফ মেরিতে বর্ণিত যিশুর জীবন এবং শিক্ষাদানের পর্ব অন্যান্য গসপেলের থেকে বেশ কিছু আলাদা। আর সেই কারণেই গসপেল অফ মেরিকে বলা হয় নসটিক গসপেল। এই গসপেলের বেশ কয়েকটি প্যাপিরাসের পাতা হারিয়ে গেছে। সেগুলো খুঁজে পেলে হয়তো খ্রীষ্ট ধর্মের অন্য এক ইতিহাস জানতে পারতাম, আমরা হয়তো জানতে পারতাম যিশু খ্রীষ্টকে এক অন্যভাবে, হয়তো জানতে পারতাম মেরি ম্যাগডালেনের প্রকৃত ভূমিকা।
৩৩ খ্রিস্টাব্দের ১লা এপ্রিল ছিল সেই বিশেষ দিন যেদিন যিশুখ্রীষ্ট তার ১২ জন অ্যাপোস্টলকে সেই বিখ্যাত নৈশ ভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি পাউরুটি ভেঙ্গে ১২ টি টুকরো করে সেখানে উপস্থিত ১২ জন অ্যাপোস্টলকে নিজে হাতে খাইয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন এই গোটা রুটিটা হলো তিনি নিজেই আর ওই লাল রংয়ের পানীয় হল তাঁর রক্ত মাংসের উপস্থিতি। তিনি নিজেকে ভাগ করে দিলেন তাঁর বারো জন সবচেয়ে কাছের মানুষের মধ্যে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যীশুখ্রীষ্ট তাদের নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার উপদেশ দিয়েছিলেন। মেরি ম্যাগডালেন কি অনুপস্থিত ছিলেন ওই নৈশভোজে?
বইটিতে দু'টি পর্ব আছে। প্রথম পর্বে আঠেরোটি অধ্যায়ের মাধ্যমে লেখক বলেছেন মেরি ম্যাগডালেন আসলে কে ছিলেন এবং যিশু খ্রিস্টের সাথে তাঁর কীভাবে আলাপ হয়েছিল। তারই সূত্র ধরে আলোচিত হয়েছে প্রত্নতত্ত্বের নানা আবিষ্কার ও তাদের ব্যাখ্যা। দ্বিতীয় পর্বের আঠেরো অধ্যায়ে লেখক বলেছেন, কীভাবে প্রশাসনের কাছে সন্দেহ ও ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিলেন যিশু, যার পরিণামে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। কে ছিলেন জুডাস? কীছিল অ্যাপোস্টলদের ভূমিকা? লেখক একের পর এক প্রশ্ন তুলেছেন। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর যুক্তি নির্ভর উত্তর দিয়েছেন, উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর কলমের মুন্সিয়ানায় একটি বিষয়কেও একবারের জন্যও বিরক্তিকর লাগেনি।
চাপা পড়ে যাওয়া ইতিহাসকে লেখক যুক্তি আর তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত করেছেন পাঠকের সামনে।ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ নন-ফিকশন এই বইটিতে লেখক তাঁর অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে পাঠককে সম্মোহিত করে রেখেছন। বিতর্কিত একটি বিষয়কে নিয়ে লেখকের এত সুন্দর ব্যাখ্যামূলক আলোচনা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে।