জেনগল্পের 'জেন' শব্দের অর্থ ধ্যান। এ ধরনের গল্প অল্প শব্দের হলেও গল্পগুলো আপনাকে নাড়া দেবে অনেক গভীর থেকে। বইটিতে রয়েছে নির্বাচিত কিছু জেনগল্পের অনুবাদ। এই গল্পগুলো আপনাকে আপনার ভেতরে শান্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করতে। পারে। শত শত বছর ধরে মানুষ জীবনের গভীর অনেক উপলব্ধি খুব সহজ শব্দে খুঁজে পেয়েছে জেনগল্পের মাঝে।
জেনগল্প আমাদের শেখায় আমাদের জীবনের অনেক সমস্যার সমাধানই লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের ভেতরে। সতর্কভাবে এই গল্পগুলোকে অনুধাবন করলে মন শান্ত ও স্থির হয়ে জীবনের নতুন এক দৃষ্টিকোণ পাঠকের সামনে উন্মোচিত হতে পারে। জেনগল্পের অদ্ভুত সুন্দর জগতে আপনাদের স্বাগতম!
এক বান্ধবীকে একটা জেনগল্পের ছবি তুলে পাঠিয়েছি। সে মহাবিরক্ত। বললো, "ধুর! এগুলা কী?" আমি অবাক। এগুলো কী মানে? বান্ধবী বললো, "এই যে সবকিছুর এতো সহজ সমাধান; বাস্তবে এমন হয়? মানুষ এতো নির্বিকারভাবে সবকিছু মেনে নিতে পারে?" আমি বললাম, "সেটাই তো! এমনটা হয় না। তবে হতে দোষ কী? 'জেন' একটা দর্শন, একটা জীবনপদ্ধতি।এসব গল্পের মূলকথা খুব সহজ, আবার খুব গভীর। জেনগল্পে মানুষ বিভিন্ন বিরূপ পরিস্থিতিতে যেভাবে ভয় না পেয়ে সহজভাবে সবকিছু স্বীকার করে নেয়, জীবনকে তারা যেভাবে দুহাতে আলিঙ্গন করে সেটা আমাদের জন্য ভীষণ দরকারি। আমাদের এই যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে সবকিছু যখন কঠিন হয়ে গেছে, সবকিছু হয়ে গেছে অস্থির তখন জেনগল্পের সহজতা আমাদের হয়তো (হয়তো) আরোগ্য লাভে সাহায্য করবে। পড়তে পড়তে একসময় হয়তো আমরা জেনদের মতো জীবনকে ভালোবাসতে পারবো, জীবনকে মেনে নিতে পারবো। এটুকু আশা করতে দোষ কী?"
ছোটখাট ৪০ খানা জেনগল্পের সংকলন। লেখক শ'খানেক জেনগল্প হতে তা বাছাই করেছেন। সুতরাং, বলা চলে সেরাগুলোই উঠে এসেছে বইয়ে। প্রতিটি গল্পের শেষে লেখকের নোট ও বিদ্যমান। পড়তে অনেকটা ঈশপের গল্পের মতন মনে হচ্ছিল। গল্পের শেষে শিক্ষামূলক বার্তা থাকে যেমন। ভূমিকার গল্পটা দুর্দান্ত লেগেছে। বোধিধর্ম এবং হুইকের গল্পটুকু খুব সম্ভবত আমি জীবনভর লালন করব।
জেনগুরুদের জীবনবোধের শিক্ষা কিংবা তাদের ফিলোসফি বেশ গভীরে ভাবায়। আমাদের সমস্ত দুশ্চিন্তা কিংবা কুচিন্তা আমাদের মনস্তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। চিন্তাহীন মস্তিষ্কে দুশ্চিন্তার আনাগোনা বেশি। তাই আমাদের সুস্থ মানসিকতা চর্চার প্রয়োজন অত্যধিক। জেনগল্প গুলো সকলের জীবনে ছোট ছোট শিক্ষা দিয়ে বড় পরিবর্তন আনুক তাই কামনা।
ছোট মিষ্টি একটা বই। বইতে ৪০টা জেনগল্প আছে। প্রতিটা গল্পের শেষে লেখকের নোট আছে। বই থেকে একটা গল্প তুলে দিলাম।
'আমি এখনো মরি নাই'
চীনের সম্রাট জেন মাস্টার গুডোকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'মৃত্যুর পর নির্বাণপ্রাপ্ত ব্যাক্তির কী হয়?’ ‘আমি কীভাবে জানব?' গুডো উত্তর দিলেন। ‘কারণ আপনি একজন জেন মাস্টার,' সম্রাট উত্তর দিলেন। ‘হ্যা, মহান রাজা! গুডো বললেন, “কিন্তু আমি তো এখনো মরি নাই!
লেখকের নোট: বুদ্ধবাদ কখনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। যা সে জানে না, সেটা পরিষ্কারভাবেই স্বীকার করে নেয়। আর সত্যিকারে জ্ঞানী তো সে-ই, যে 'আমি জানি না' বলতে ভয় পায় না ।
ভবিষ্যৎ অনির্ণেয়, আর অতীত মৃত। আমাদের বিচরণ বর্তমানের ভেতর। বুদ্ধের কাজও বর্তমান নিয়েই।
ছোট্ট কলেবরের এই বইটি খুব দ্রুত মনকে শান্ত করে দেয়। গল্পগুলো যেমন সরল, তেমনি গভীর। জীবনকে সহজ চোখে দেখার, আত্ম-অনুসন্ধানের শিক্ষা দেয় জেন-বুদ্ধবাদ।
লেখকের ফুটনোটগুলো দারুণ ছিল,অনেক গল্পের মূল অর্থ বুঝতে সাহায্য করেছে এগুলো। ভুমিকা আর মুল বইয়ের দু এক জায়গায় বাংলা উচ্চারনে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার একটু দৃষ্টিকটু লেগেছে, যদিও আমরা সচরাচর এগুলো ব্যবহার করি। কিন্তু বইয়ে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত নই।
আশা করি জেনগল্প ও বুদ্ধদর্শন নিয়ে লেখকের আরও বই পাব অতি দ্রুত।
জেন দর্শনটা চমৎকার জিনিস। আর এ বইটা জেনগল্পগুলোকে তো সংকলন করেছেই, সেই সাথে প্রতিটা গল্পের সাথে লেখকের নোট, বইটাকে অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। একটা গল্প আর নোট শেয়ার করি কেমন?
তানজান আর ইকিদো একদিন এক কাদার রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। এক বাঁকের মুখে এসে তারা ঝালরওয়ালা রেশমি কিমোনো পরা এক সুন্দরী মেয়েকে দেখতে পেলেন। মেয়েটি কাদাভর্তি মোড়টি পার হতে পারছিল না। তানজান বললেন, ‘এই যে, এদিকে আসেন।’ মেয়েটি এগিয়ে এলে মেয়েটিকে কাঁধে তুলে নিয়ে তানজান কাদাপানি পার করে তাকে নামিয়ে দিলেন। সেদিন রাতে মন্দিরে না পৌঁছা পর্যন্ত ইকিদো আর কোনো কথাই বললেন না। এরপর নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে বললেন, ‘আমরা ভিক্ষুরা মেয়েদের কাছে যাই না। সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। এমন করা খুব বিপজ্জনক। আপনি অমন করলেন কেন? ‘আমি মেয়েটাকে ওখানেই নামিয়ে রেখে এসেছি,’ তানজান বললেন। ‘আপনি কি এখনো তাকে বয়ে চলছেন?’
লেখকের নোট: অনেক বিদ্যাও আপনার চিন্তাকে শুদ্ধ করতে পারবে না, যদি আপনি চিন্তা বয়ে বেড়াতেই বেশি পছন্দ করেন।
তেইশ সালে মনে হয় জেনগল্পের আরেকটা বই পড়েছিলাম। এছাড়া টুকরো টুকরো পড়েছি অনেক জায়গায়। তবে এ বইয়ের গল্পগুলো আগের চেয়ে আলাদা। সিংহভাগ গল্পই আগে পড়া হয়নি। ভাল লাগলো পড়ে। জটিল বিষয়ের একেবারে সহজ সমাধান দেখা যায় জেনগল্পে এসে। জীবনে এগুলো কাজে লাগাতে পারলে অনেক আগে যাওয়া যায়
ছোটোখাটো একটা বই। এক বসাতেই শেষ করা যায়। ছোটো ছোটো জেনগল্প। প্রত্যেকটা গল্পের মাঝে তৃপ্তি আছে। বাইন্ডিং, আর্টওয়াকগুলোও চমৎকার। দামও হাতের নাগালেই। সব মিলিয়ে ভালো লাগলো।
জীবনের মানে খুজে পেতে আমরা সারা জীবন ধরেই ছুটে চলি। এভাবেই জীবনকে খুজে পেতে চাই৷ কেউ শান্তি, সুখ আর ভালবাসাকে খুজে ফেরে। কেউবা আবার ঈশ্বর নশ্বর ও বিশ্বাসকে খুজে থাকে৷ কিন্তু কিভাবে এই সকল কিছুই খুজে পাওয়া যায়। জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত তো অনিশ্চিত, তাহলে এই জীবনের মানে কি। সত্যি কি জীবনের কাছে আমাদের কোন মানে আছে৷
বুদ্ধের বা বৌধ ধর্মের একটি ভাগ হচ্ছে মহাযান৷ সেই মহাযানের একটি শাখা হচ্ছে জেন। অবশ্য শাখা বা ভাগ বললে ভুল হবে, জেন তারচেয়ে বড় কিছু। জেন শুধু মাত্র একটি শাখা নয় জীবনকে উপলদ্ধি করার অন্যতম একটি উপায়৷
জেন গুরুরা তার শিষ্য ও মানুষদের মাঝে শান্তির বানীকে সহজ ও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই উপস্থাপনা গুলো করেছেন বাস্তব সমৃদ্ধ। যেন মানুষ তার জীবনের সাথে এর মিল খুজে নিতে পারে।
যেমন কেউ সব কিছু পেয়েও যেন ধনী নয়, আবার সব ছেড়ে দেয়াটাই ধনী হবার সবচেয়ে বড় উপায়। কেউ শান্তি চায় নিজের জন্য, আবার সেটাই যখন সবার জন্য হয় তখন সেটাই আসল শান্তি।
জীবনকে সহজ সুন্দর ও দেখার ভঙ্গিকে অন্য একটি রূপ প্রদান করেছে জেন সাধুরা। তাদের জীবনকে দেখার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে নিজের ভেতর খুজে দেখো তুমি সব দেখতে পাবে।
একগুচ্ছ জেন গল্প পড়ার সময় মনে হচ্ছি আমাদের জীবন আসলে কত সহজ। আমরাই শুধু জটিল করে রেখেছি৷ জীবনের জটিলতাকেও খুব সহজ উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এটাই সম্ভবত এর সবচেয়ে ভালো দিক। আমরা অনেক কঠিন মুহুর্তে অসহায় হয়ে পরি অথচ চাইলেই এই সময় আমরা নিজদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি৷
জীবনকে দেখার আলাদা ভঙ্গিই এই গুল্প গুলো অন্য রকম তুলেছে। প্রতিটি গল্পের শেষে লেখকের কিছু উপলব্ধি নিবন্ধন করা হয়েছে যেখানে গল্প গুলো মুল ভাব তুলে ধরা হয়েছে। যাতে পাঠক খুব সহজেই বিষয় গুলো অনুধাবন করতে পারেন।
সর্বোপরি জীবন খুব ছোট একে জটিল না করে সহজ করে দেখাই উত্তম।
জেন গুরুরা তাদের শিষ্যদের ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে জীবনবোধ,দর্শন ও লক্ষ্য সম্পর্কে উপদেশ দিয়ে থাকেন যেগুলো বাস্তব যুক্তির বাইরে গিয়েও মুক্তির রসদ জোগায়।এই বইতে বেশকিছু বাছাই করা জেন গল্পের সংকলন রয়েছে যেখানে প্রতিটি গল্পের শেষে লেখকের উপলব্ধি ফুটনোট আকারে সংযোজিত আছে। একটি জেন গল্প এমন.....
এক শিষ্য গুরুর কাছে এল অনেক দুঃখ নিয়ে। এসেই গুরুকে বলল, গুরু, আমি হুটহাট রেগে যাই মানুষের ওপর। কিছুক্ষণ পরেই রাগ উবে যায়। মন খারাপ হয় খুব। আমি কী করতে পারি?' গুরু বললেন, 'যখনই মেজাজ খারাপ হবে, তখনই এই কাঠের ওপর পেরেক মারতে শুরু করবে।' এই কথা বলে তিনি সাগরেদকে একটা কাঠের একটা বেড়া দেখিয়ে দিলেন। এদিকে শিষ্যের এখন রাগ উঠলেই সে গিয়ে কাঠে পেরেক মারে। মারতে মারতে পুরো কাঠ ভরে গেল। আবার গেল সে গুরুর কাছে। গুরুকে সবকিছু দেখিয়ে সমাধান চাইলো। গুরু বললেন, 'এখন পেরেক তোলা শুরু করো। যত রাগ আসবে, পেরেক তুলতে থাকবে। শিষ্য অনুগত। রাগে আর পেরেক তোলে। তুলতে তুলতে কাহিল হয়ে পড়ল। গেল গুরুর কাছে। গুরু জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কেমন লাগছে?" ক্লান্ত শিষ্য উত্তর দিলেন, 'রাগ কমছে না।' গুরু বললেন, 'পেরেক তোলার পর কাঠটা দেখেছ কি?" 'হ্যাঁ,' শিষ্য উত্তর দিলেন। 'কেমন দেখলে?' 'অসংখ্য ছিদ্র।' গুরু হাসলেন। বললেন, 'এখন থেকে রাগলে মনে রেখো, যার উপর রাগছ, তার মনেও দাগ পড়ে। ওই কাঠের মতো।'
লেখকের নোট: আপনার রাগ কেটে গেলে হয়তো আপনি যার ওপর রাগ করলেন, তাকে সরি বলে ফেলতে পারবেন। কিন্তু যার ওপর আপনি রেগে ছিলেন, তার মনে যেই ক্ষত হয়েছে, তা কখনোই সারিয়ে তুলতে পারবেন না।
একদমই ছোট্ট একটা বই। কিন্তু এর গভীরতা এত বেশি যে বারবার এই বই পড়া যাবে অনায়াসেই। বিষণ্ণতায় ভুগছেন? একগুচ্ছ জেন গল্প পড়ুন। জীবন নিয়ে হতাশা কাজ করছে? একগুচ্ছ জেন গল্প পড়ুন। বলতে গেলে এরকম হাজারটা উপমা বাক্য তৈরি করে দেওয়া যাবে, এই বইয়ের এমনই বিশেষত্ব।
একটা প্রবাদ বাক্য আছে না - স্বর্ণের সন্ধানে আমরা হীরা অবহেলা করি। এই বইয়ের বিষয়বস্তুও অনেকটাই এমন। জীবন খুবই সহজ-সরল আর প্রাঞ্জলতায় পূর্ণ। আমরা অতিরিক্ত চিন্তায় তাকে জটিল ধাধায় উপস্থাপন করি। এই বইতে একটা গল্পে রাজা জিজ্ঞেস করে - মৃত্যুর পরের দুনিয়া কেমন? উত্তরে ভিক্ষু বলেন - আমি কীভাবে জানবো? আমি তো মরি নাই।
আসলেই তো! জীবিত মানুষ কী করে জানবে মৃত্যুর পর কী ঘটে? সাধারণ একটা বাক্য অথচ কি নিগূঢ় গভীরতা লুকিয়ে আছে কথার মর্মার্থে। প্রত্যেকটা জেন গল্পই এমন। আপনাকে একদম ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিবে। গভীর জীবনবোধের খুব সহজ অর্থ খুঁজে পাবেন।
অনুবাদক আর প্রকাশক দুজনকেই অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন সুন্দর একটা বই প্রকাশ করার জন্য। পাশাপাশি অনুবাদকের জ্ঞানের ভূয়সী প্রশংসা করছি তার প্রতিটা গল্পের শেষে দেওয়া নোটগুলোর বিশেষত্বের জন্যে।
ছোট ছোট জেনগল্পগুলো পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। খুব ছোট জিনিসই আসলে অনেক সময় বৃহত্তর পরিসরে ভাবতে বাধ্য করে। এটাও সেরকমই একটি বই। কয়েকটি গল্পের দর্শন বেশ ভালো লেগেছে৷ বুদ্ধিজম সম্পর্কে আরো জানার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সংসার, ধর্ম এসব বিষয়ে বৃহৎ পরিসর কিংবা মাঝেমধ্যে ক্ষুদ্র পরিসরে ভাবারও অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে। ওভার অল, worth reading.
লেখকের নোট থেকে :- "আপনার রাগ কেটে গেলে হয়তো আপনি যার ওপর রাগ করলেন, তাকে সরি বলে ফেলতে পারবেন। কিন্তু যার ওপর আপনি রেগে ছিলেন, তার মনে যেই ক্ষত হয়েছে, তা কখনোই সারিয়ে তুলতে পারবেন না।" এই মূহুর্তে এই লাইনটা আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।