এই কাহিনির শুরু স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অবিভক্ত বাংলায় । এই কাহিনির বিস্তার এক মর্গে। এই কাহিনি শেষ হচ্ছে এক তীর্থে। কাহিনিটিকে জুড়ে রেখেছে এক রোমহর্ক যাত্রা।
সাধক পবন কুমার এক অদ্ভুত চরিত্র। সে একাধারে সাধক ও চিত্রশিল্পী। আবার এই পবন কুমারই হাসপাতালের মর্গ রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে। হাসপাতালের মৃত লাশের সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক এই পবন কুমারের। কী করে সে হাসপাতালের লাশেদের সঙ্গে?
অন্যদিকে বর্তমান যুগের কর্পোরেট জগতের কিছু ছেলেমেয়ে বাংলার সেই গ্রামে উপস্থিত হয়ে জড়িয়ে পড়েছে এক অভিশপ্ত অধ্যায়ের সঙ্গে। অভিশপ্ত ইতিহাসের সঙ্গে পবন কুমারের সম্পর্কটা ঠিক কী? এই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটানোর অদম্য ইচ্ছে নিয়ে তাদের উদ্ভব লিঙ্গ অভিযান। কী হয় উদ্ভব লিঙ্গে? কী এই উদ্ভব লিঙ্গ?
এক গর্ভবতীর তার সন্তানের জন্য লড়াইয়ের কাহিনি এই উদ্ভব লিঙ্গ, এক মনস্তাত্ত্বিকের অদ্ভুত উন্মাদ চিন্তাভাবনার কাহিনি এই উদ্ভব লিঙ্গ, বন্ধুত্বের কাহিনি এই উদ্ভব লিঙ্গ, নিশ্চিত পরাজয়ের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করার কাহিনি উদ্ভব লিঙ্গ।
সর্বোপরি এক ঐন্দ্রজালিকের কাহিনি এই উদ্ভব লিঙ্গ। ইন্দ্রজাল বিদ্যার আঁতুড়ঘর এই গ্রন্থ। সমস্ত সটীক ইন্দ্রজাল বিদ্যার প্রয়োগের বর্ণনা রয়েছে এই গ্রন্থে।
গ্রন্থ শেষে পাঠকের মন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বে - ভয়ের জাগরণ হবে নাকি ভক্তির, সে উত্তর নটেগাছটি মুড়োলেই পাওয়া যাবে।
মর্গ থেকে তীর্থযাত্রার এক রোমহর্ষক কাহিনি 'উদ্ভব লিঙ্গ'। ফ্ল্যাপে লেখা সারসংক্ষেপ দেখে আগ্রহ জন্মায়, তন্ত্রমন্ত্র সম্বলিত অসংখ্য "অতিপ্রাকৃত" বইয়ের ভীড়ে আলাদাভাবে নজর কাড়ে। অনিকেত মিত্রের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ আর পাতায় পাতায় কৃষ্ণেন্দু মণ্ডলের আঁকা চমৎকার কিছু ছবি সেই আগ্রহের পাল্লা ভারী করে তোলে।
এই গল্পের সূত্রপাত স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অবিভক্ত বাংলায়, বিস্তার লাশকাটা মর্গ জুড়ে, আর সমাপ্তি এক তীর্থযাত্রায়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পবন কুমার একজন মড়াকাটা ডোম, তবে সেই পরিচয় ছাপিয়ে সে একজন শিল্পী, এক ক্ষমতাধর ঐন্দ্রজালিক। যারা সাধনায় ঈশ্বর বা শয়তান কোনোটাই হয়না তারা শিল্পী হয়ে যায়!
আড্ডার আসরে এক ভৌতিক গল্পের অবতারণা ঘটায় অনিন্দ্য। অচিরেই জানা যায়, সেই বিস্ময়কর গল্পটি অনিন্দ্যর নিজের এবং তার প্রেমিকা ঋতুর অতীতের সাথে জড়িত। এদিকে গল্পের শ্রোতাবৃন্দ: রাহুল, তুলিকা ধৃতি, সৌরভ, আয়ুস্মানও নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ে ইন্দ্রজালের অভেদ্য চক্রে। শিল্পী পবন কুমারের আঁকা ক্যানভাসে সময়ের আবর্তে আবর্তিত হয়ে চলে তাদের জীবন।
অভিশপ্ত চক্রকে ভাঙতে এসে শেষপর্যন্ত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয় গল্পের চরিত্ররা। ষড় রিপু: কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের বিরুদ্ধে একে একে লড়াইয়ে নামে। আদিম রিপুর সাথে এ কষ্টসাধ্য লড়াইকেই আপাতদৃষ্টিতে বইয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশ বলে বোধগম্য হয়!
চমৎকার সূত্রপাতের পর মাঝখানে এসে অনেকখানি অংশ জুড়ে গল্প গতি হারিয়ে ফেলে। ছন্দপতন ঘটে উপভোগ্য এক যাত্রার।
ব্রিটিশ অধ্যুষিত ভারত। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাংলা সহ সারা ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চলছে আন্দোলন। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আহত আর নিহত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের এক গ্রামের নাম মৃতগ্রাম। অদ্ভুত নামের এই গ্রামের হাসপাতালের মর্গে আশেপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রচুর লাশ আসছে। এই অপঘাতে মারা যাওয়া মানুষগুলোর লাশ দেখাশোনা করে মর্গের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পবন কুমার। দিনে এই কাজ করলেও রাতে পবনের চালচলন পাল্টে যায়। সবার চোখের আড়ালে এক ভয়ানক সাধনায় রত হয় সে।
একজন মানুষ একাধারে সাধক, শিল্পী আবার ক্ষেত্রবিশেষে শয়তানও। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে এই জিনিসটা ব্যাখ্যা করা জটিল হলেও এটাই সত্যি। দীর্ঘকালের সাধনায় সে এমন কিছু ক্ষমতা অর্জন করেছে যে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করেছে মানুষটা। সে আঁকে। লাশের ছবি আঁকে। লাশগুলোকে নানান ভঙ্গিমায় সাজিয়ে গুছিয়ে তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসের বুকে ফুটিয়ে তোলে অসাধারণ কিছু চিত্রকর্ম। আর সেই চিত্রকর্মগুলোতে থাকে ইন্দ্রজালের ছোঁয়া, যা এই অদ্ভুত সাধককে আরো ক্ষমতাশালী করে তোলে।
প্রায় দেড়শো বছর পরের কথা। কলকাতা থেকে কয়েকজন যুবক-যুবতী বেড়াতে আসে মৃতগ্রামে। সেখানকার এক আঁখ ক্ষেতে বসে বিয়ার খেতে খেতে তাদের একজন অনিন্দ্য শুরু করে পবন কুমারের গল্প। গল্পটা অসম্পূর্ণ রেখেই তারা ফিরে যায় কলকাতায়। এরপর সেই অসম্পূর্ণ গল্পটার সম্পূর্ণরূপ দেখতে আবারও ফিরে আসে তারা। এবার সেই গল্প ওদেরকে শোনায় ঋতু নামের এক যুবতী। কিন্তু আধুনিক সময়ের এই শহুরে যুবক-যুবতীরা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি পবন কুমারের গল্পটার সাথে কি ভয়াবহ এক অভিশাপ মিশে আছে।
দক্ষিণ ভারতে আছে উদ্ভব লিঙ্গ নামের এক তীর্থস্থান। যে মন্দিরে উদ্ভব লিঙ্গ হিসেবে পূজিত হন দেবী দুর্গার আরেক রূপ দেবী মুকাম্বিকা। সেখানেই এবার যাত্রা অনিন্দ্য, ঋতু, ধৃতি, তুলিকা, সৌরভ, আয়ুষ্মান ও রাহুল। তাদের সঙ্গী হয়েছেন বৃদ্ধ মহাসাধক ও তাঁর দুই শিষ্য। পুরোনো এক অভিশাপ খণ্ডন করতে এই দলটা ছুটে চলেছে বনে-বাদাড়ে। তাদের লড়াই এক মহাপ্রতাপশালী ঐন্দ্রজালিকের সাথে, যেখানে জয়ের সম্ভাবনা সত্যিই খুব কম। উদ্ভব লিঙ্গের এই যুদ্ধের ফলাফল আসলে কি আসবে শেষতক?
ওপার বাংলায় যখন তন্ত্রমন্ত্র আর ভূত-প্রেত বিষয়ক বইয়ের ছড়াছড়ি ঠিক তখন আমি পরিচিত হই সৌরভ চক্রবর্তীর লেখার সাথে। সেই সময় তাঁর 'চন্দ্রহাস' পড়ে বেশ ভালো লেগেছিলো। দীর্ঘদিন পর আবারও সৌরভ চক্রবর্তীর কোন বই পড়ার সুযোগ হলো। 'উদ্ভব লিঙ্গ' বইটা যদিও অনেক আগেই কিনেছিলাম, তাও পড়তে দেরী হয়ে গেলো। কলকাতা ও বাংলাদেশে বইটা একই সাথে প্রকাশিত হয়েছিলো। লেখক তাঁর এই উপন্যাসে ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত ব্যাপারগুলোর প্রতি জোর বেশি না দিয়ে ইন্দ্রজালে আর ঐন্দ্রজালিকদের প্রতি বেশি জোর দিয়েছেন। তাই বলে যে ভৌতিক আবহ বইটাতে নেই এমনটা না। কিছুটা অন্যরকম ভাবে হলেও সৌরভ চক্রবর্তী এই উপন্যাসে ভৌতিক আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। তবে তন্ত্র ও ইন্দ্রজালের প্রতি তাঁর ফোকাসটা অনেকাংশে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে 'উদ্ভব লিঙ্গ' পড়তে গিয়ে।
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র পবন কুমারের যে জার্নিটা সৌরভ চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, তা মনোমুগ্ধকর। সেই সাথে আধুনিক সময়ের চরিত্রদের অঙ্কনও বেশ ভালো লেগেছে। বইয়ের ইন্দ্রজাল সম্পর্কিত জায়গাগুলোতে মন্ত্রসমূহের সরলার্থসহ উল্লেখের ব্যাপারটা মূল কাহিনিকে আরো শক্তিশালী করেছে। তবে 'উদ্ভব লিঙ্গ'-এর মাঝামাঝি আসার পর কাহিনির গতি হঠাৎ করেই ধীর হয়ে যায়, এমনটা লক্ষ্য করেছি। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে লেখক অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ করছেন। সর্বোপরি 'উদ্ভব লিঙ্গ' আমার কাছে ভালোই লেগেছে। শেষের ক্লিফহ্যাঙ্গারটা না থাকলে আরো বেশি ভালো লাগতো। জানি না, সৌরভ চক্রবর্তী এর সিকুয়েল টাইপ কিছু আনবেন কি-না সামনে।
কাহিনির প্রয়োজনে করা কৃষ্ণেন্দু মণ্ডলের অলঙ্করণগুলো বেশ ভালো লেগেছে। অনিকেত মিত্র'র করা প্রচ্ছদটাও ভালো লেগেছে। সুপারন্যাচারাল আর ফ্যান্টাসি ঘরানা যাদের পছন্দ তারা পড়ে দেখতে পারেন মর্গ থেকে তীর্থ যাত্রা নিয়ে লেখা 'উদ্ভব লিঙ্গ'।
🍀🫧সদ্য পড়ে শেষ করলাম লেখক সৌরভ চক্রবর্তী মহাশয়ের লেখা ‘উদ্ভব লিঙ্গ’ বইটি। লেখক ভূমিকা তে লিখেছেন এই কাহিনি সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক, কিন্তু আমার পড়ে একবার ও মন��� হয়নি এটা কাল্পনিক গল্প বলে। বার বার মনে হচ্ছে একদম সত্য ঘটনা..... বই পড়তে পড়তে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে চরিত্র গুলো। এই বই অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
🍀🫧এই উপন্যাসে ‘উদ্ভব লিঙ্গ’ একটি স্থানের নাম। উপন্যাসের মূখ্য চরিত্র হচ্ছে ‘পবনকুমার’, তিনি একজন মহাসাধক। দশ বছর বয়স থেকেই সে সাধনায় মগ্ন থাকতো। সে নিজেকে শিল্পী পরিচয় দিত ঠিকই, কিন্তু সে ছিল উঁচুদরের ঐন্দ্রজালিক। এই উদ্ভব লিঙ্গে সাধনা করে সে অর্জন করেছিল বেশ কিছু অসাধারণ ক্ষমতা। সে নিজে থেকে কারো অনিষ্ট করত না, নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারও করতে চাইত না। কিন্তু কিছু ক্ষমতা বা শক্তি এরকম থাকে যাতে সাধকের হাত থাকে না, সেগুলো চিরন্তন। এরকমই এক ক্ষমতা ছিল তার, সে যদি কোনো ছবি অসম্পূর্ণ এঁকে ফেলে রাখত তবে তার মডেল যে বা যিনি থাকতেন তার জীবন আর সময়ের নিরিখে এগোত না। স্তব্ধ হয়ে যেত সময়চক্র.........
🍀🫧 ‘পবনকুমার’-এর বাড়ি ছিল একদম শ্মশান-এর পাশেই। সে কাজ করতো ‘মৃতগ্ৰাম’ হাসপাতালে, হাসপাতালের লাসেদের নিয়ে যেতো ‘পবনকুমার' নিজের বাড়িতে। তারপর সেই লাস গুলো কে ভালো করে শুদ্ধ করিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে নিতো। তারপর টানা দুই দিন আর এই ঘর থেকে বাইরে আসতো না, ভিতরে চলতো ছবি আঁকার কাজ আর ‘পবনকুমার’-এর ছবি আঁকার জন্য মডেল হতো এই মৃত লাস গুলো........... এই ভাবে সবকিছু ঠিকঠাক-ই চলছিলো, হঠাৎ একদিন এই কাজে বাঁধা পড়লো..... বন্ধ দরজার বাইরে পুলিশ এসে উপস্থিত হয়েছে....... এরপর কি হয়েছিল মহাসাধক ‘পবনকুমার’-এর?? জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে।
🍀🫧২৬৩ পেজের এই উপন্যাস সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় শেষ...... এতো ইন্টারেস্টিং কাহিনি তাও আবার সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক উফ্ ভাবা যায় না! এই উপন্যাস কোথাও এতটুকু ও বোর করেনি। একদম টানা পড়ে শেষ করেছি, থামতেই পারিনি। আমার কাছে যে কপি টি রয়েছে সেটা বইচই পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত। বইটি হার্ড কভার, আর ফন্ট সাইজ ও বেশ বড়ো পড়ার সময় কোনো অসুবিধা হয়নি। আর পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটি পেজের মধ্যে ছবি এঁকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে উপন্যাস কিভাবে এগোচ্ছে......... বর্তমানে বইটি বিভা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আর সেটা পেপার ব্যাক। আমার বেশ ভালো লাগলো এই উপন্যাস। এর পর ওনার লেখা ‘চন্দ্রহাস’ সিরিজ টা পড়ার ইচ্ছে রইলো......