যে সময়ে উপহার হিসেবে ফুল দিলে অধিকাংশ মানুষ খুশি হয় না, খুশি হওয়ার অভিনয় করে মাত্র।
ফলাফল, জীবন হারাচ্ছে শুদ্ধতা। মানুষ তাই হাইওয়ের গাড়ি না হয়ে, হয়ে যাচ্ছে ট্রেনিং সেন্টারের গাড়ি। যার কোনও গন্তব্য নাই। একটু আধটু ঘুরে দিনভর বন্ধই হয়ে থাকে। আর সেটাই বা হবে না কেনো, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ জানেনা, কোথায় গেলে তার আসলে 'যাওয়া হয়?
“ধনী মানুষের একটা বড়ো সমস্যা আছে, তারা কখনো আইন, প্রশাসনের চেয়ে নিজেদের বড়ো মনে করা শুরু করে, এটা দিনশেষে তাদের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে যায়। কিন্তু যতক্ষণ বিপদটাতে না পড়ে তারা তার আগের সময়টুকুতে তাদের আটকানো, বোঝানো খুব কঠিন।”
সামান্য দুটি বাক্যে বর্তমান সময়ের বাস্তবিক চিত্রকে কী নিদারুণভাবেই না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অল্প কয়েকটি শব্দ, অথচ একরাশ মুগ্ধতা। মাত্র পড়ে শেষ করা ১১২ পৃষ্ঠার এই সমকালীন উপন্যাসের প্রতিটা পাতায় এমন অসংখ্য মুগ্ধতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
একটা প্রশ্ন করি- অবসর সময়ে আপনি সাধারণত কী করেন? সম্ভাব্য উত্তরে হয়তো পাওয়া যেতে পারে- বই পড়েন, সিনেমা দেখেন, গান শুনেন, বাগান করেন, গল্পগুজব করেন, ঘুরে বেড়ান... ইত্যাদি। কিন্তু আমার ধারণা- লেখক ইশতিয়াক আহমেদ তার অবসর সময়ে মানুষকে পড়েন, পর্যবেক্ষণ করেন। এই ধারণাটি অবশ্য হুট করে আসেনি। তার লেখা বইগুলো পড়ার পর এসেছে। এ বছর প্রকাশিত নতুন উপন্যাস ‘আজহার ট্রেনিং কার’ তার ব্যতিক্রম নয়। যে বইটির প্রতিটি চরিত্র, ঘটনা, কাহিনি বারবার একই জিনিসের দিকে ইঙ্গিত দেয়; ইশতিয়াক আহমেদ একজন মনোযোগী পাঠক। যিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে মানুষকে পড়েন। তাদের সুখ-দুঃখ, রসবোধ, জীবন সংগ্রাম, আবেগ-অনুভূতিকে শুধু যে পড়েন এমনও নয়; রীতিমতো মুখস্থ করেন। এরপর পরম যত্নে লিপিবদ্ধ করেন সেগুলোকে।
কাহিনির মূল চরিত্র সেলিম আর দশটা সাধারণ মানুষের চাইতেও অতি সাধারণ একজন। যাকে আপাতদৃষ্টিতে আলাদাভাবে সনাক্ত করা যায় না। ধরেন আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে সেইজন, যে পরিবারের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠান বা দরকার-প্রয়োজনে উপস্থিত থাকে; কিন্তু তার উপস্থিতি আপনার নজর এড়িয়ে যায়। কিংবা বন্ধুমহলের দশজনের একজন, যার সঙ্গে চোখাচোখি তো প্রায়ই হয়; কিন্তু মনখুলে একটিবার কথাও বলা হয় না। কাহিনির সেলিম তেমনই সাধারণ একজন। অথচ তার গানের গলা অসাধারণ। যার প্রমাণ মেলে চাকরির ইন্টারভিউতে! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। একের পর এক চাকরির ইন্টারভিউতে ব্যর্থ হওয়া সেলিম স্বভাব-দোষে অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বললেও তার গানের প্রতিভায় ঠিকই সবাইকে মুগ্ধ করে। আফসোস এটুকুই যে- এদেশে চাকরির ইন্টারভিউতে গান গেয়ে চাকরি পাওয়া যায় না।
পরিবারের পিছুটান নেই সেলিমের। নিজেকে সে শহুরে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানো। শত চেষ্টার পরেও ফলাফল শূন্য। তবুও টেনেটুনে প্রতিটি দিন কাটিয়ে দেয়। আর সেসকল দিনের রোজনামচা শোনায় মেসমেট নিয়ামতকে। ছেলেটা তাকে আপন ভাবে, মায়া করে খুব। সেলিমের দুরাবস্থা নিরসনে তাকে নিয়ে একদিন হাজির হয় পিতার বয়সী আজহার হোসেনের কাছে; আজহার ট্রেনিং কার সেন্টারে। উদ্দেশ্য- ড্রাইভিং শিখে বিদেশ পাড়ি দেবে, কর্মের সন্ধানে।
এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। ছক অনুযায়ী সেলিম চাকরির জন্য ইন্টারভিউতে যায়। ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসে। সময়মতো ড্রাইভিং শিখতে যায়। দিনের শেষে মেসে ফিরে নিয়ামতকে সারাদিনের গল্প শোনায়। কিন্তু জীবনের এই সহজ হিসাবে একদিন গড়মিল দেখা দেয়। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেলিমকে তার মেস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ বাহিনি। প্রথমে থানা, এরপর রিমান্ড, সবশেষে জেল খাটতে হলো সেলিমকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ- এক শিল্পপতির মেয়েকে অপহরণ করেছে। অপরদিকে চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা জহির এই কেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে জোঁকের মতো পিছু লেগে রইল। বিধিবাম, কেউই সেলিমের পক্ষে নেই। এরপর কী হয়? তার সবিস্তারিত জানতে পারবেন উপন্যাসে।
সমকালীন উপন্যাস হলেও মূল কাহিনিতে থ্রিল আর টুইস্টের উপস্থিতি রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে জীবন কেন্দ্রিক লেখকের দর্শন ও রসবোধ। সংক্ষিপ্ত ও সূক্ষ্ম বর্ণনায় প্রাঞ্জল লেখনশৈলী রীতিমতো মোহাবিষ্ট করে রাখে। যেসকল চরিত্র রয়েছে; তাদের ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ড দেখে আপনি হয়তো এক পর্যায়ে আৎকে উঠে বলবেন, ‘আরে! এমন একজনকে চিনি তো।’ সেই চেনা-পরিচিত মানুষটাকেও দেখবেন ঠিক নিজের গণ্ডিতেই। আর এখানেই লেখকের সবচাইতে বড় স্বার্থকতা। যিনি অচেনা মানুষের ভিড় থেকে, সাধারণ মানুষের জীবন ঘেটে অসাধারণ এক কাহিনি গড়ে তুলেছেন। যা পাঠকহৃদয়কে তৃপ্ত করে।
যারা সমকালীন উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘আজহার ট্রেনিং কার’ বইটি সাজেস্ট রইল। পড়া শেষে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখবে।
বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে: দারুন এক মুখোশ পরে আছে জীবন। যে সময়ে উপহার হিসেবে ফুল দিলে অধিকাংশ মানুষ খুশি হয় না, খুশি হওয়ার অভিনয় করে মাত্র। ফলাফল, জীবন হারাচ্ছে শুদ্ধতা। মানুষ তাই হাইওয়ের গাড়ি না হয়ে, হয়ে যাচ্ছে ট্রেনিং সেন্টারের গাড়ি। যার কোনও গন্তব্য নাই। একটু আধটু ঘুরে দিনভর বন্ধই হয়ে থাকে। আর সেটাই বা হবে না কেনো, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ জানেনা, কোথায় গেলে তার আসলে ‘যাওয়া’ হয়? যাওয়ার জন্য আসল ‘কোথাওটা’ তার কোন দিকে?