একাদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষ। একদিকে পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে চলছে হানাদারের আক্রমণ ও লুণ্ঠন— যার সামনে নির্বাপিত হচ্ছে উত্তর ভারতের একের পর এক জ্ঞান ও ঐশ্বর্যের প্রদীপ। বাংলার সিংহাসনে তখন মহীপালদেব। এক অদ্ভুত অপবিশ্বাস ও গূঢ়াচারের প্রবাহ গ্রাস করছে সেই রাজ্যকে। আবার পশ্চিম থেকে আগত ওই অন্ধকারের মধ্যেই উজ্জ্বল আলোকশিখা হয়ে এ-দেশে পা রেখেছেন আল বিরুনি— যাঁর লক্ষ্য প্রাচ্যের অতুলনীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে অনুবাদের মাধ্যমে বাগদাদে পৌঁছে দেওয়া। এই পটভূমিতে তিনটি কাহিনির সূত্র দেখা দিল আমাদের সামনে। তার একটিতে সাধক কাহ্ন-পা এক মূক বালিকাকে সাধনসঙ্গিনী করলেন। একটিতে মহীপালদেব এবং তাঁর প্রার্থিত নারী, বণিকশ্রেষ্ঠ রন্তিদেবের কন্যা লীলাবতী'র মধ্যে গড়ে ওঠা দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙার জন্য প্রয়োজন হল কারও। আর একটিতে— যাকে এই উপন্যাসটির চালিকা বললে অত্যুক্তি হবে না— এক নিম্নবর্ণের যুবক শুভঙ্কর অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার আগুনে শুদ্ধ হয়ে আত্মপ্রকাশ করল কিংবদন্তী ভিষক-রূপে। আপাত বিচ্ছিন্ন এই তিনটি সূত্রকে একসঙ্গে বেঁধে রাখল প্রেম আর সময়। আলোকবর্তিকা হয়ে রইলেন নাগার্জুন। আর নীরবে, ঝোড়ো হাওয়ায় দপ্দপ্ করে ওঠা অদৃশ্য আলোকশিখার মতো করে রইলেন মঞ্জুশ্রী। সরাসরি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়; বরং ইতিহাসাশ্রয়ী কল্পকাহিনি এটি— যাতে আছে বেশ কিছু অলৌকিক উপাদান, আছে বাস্তবের ঘনায়মান রাতের মধ্যে একটি আলোকিত ও উষ্ণ নীড়ের কল্পনা। কাহিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শুভঙ্করের জীবন নিয়েই মূলত এগিয়েছে লেখাটি, যাতে মহীপালদেবের অংশটি পার্শ্বীয় ঘটনাক্রমের মতো করে দেখা দিয়েছে। কাহ্ন-পা'র অধ্যায়গুলো মূল কাহিনির নিরিখে প্রক্ষিপ্ত হলেও সেই সময়ের বাংলার ধার্মিক ও সামাজিক জীবনের পরিচয় দিতে কার্যকরী হয়েছে। বইয়ের শেষে পাঠ-নির্দেশিকাটিও দেখে খুব ভালো লাগল। লেখনী চমৎকার হলেও হয়তো ভাষার দার্ঢ্য কিঞ্চিৎ বৃদ্ধির তাগিদেই হয়তো অপ্রচলিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় তৎসম শব্দের ব্যবহার লক্ষ করেছি। আবার একাদশ শতাব্দীতে বাংলার এক অঞ্চলের নাম 'ফরিদপুর' রাখার মতো একেবারে অপ্রত্যাশিত কালানৌচিত্যদোষ দেখেও চমকে উঠেছি। এই সামান্য আপত্তিটুকু বাদ দিলে বলতে হয়, অনেকদিন পর মধ্যযুগের বাংলা তথা ভারতের পটভূমিতে একটি জমজমাট উপন্যাস পড়লাম। বইটির মুদ্রণ ও বানান শুদ্ধ। প্রচ্ছদ অসাধারণ বললেও কম বলা হয়; তবে ভেতরেও কয়েকটি অলংকরণ থাকলে খুব ভালো হত। ইতিহাসাশ্রয়ী লেখার অনুরাগী হলে এই বইটি অবশ্যই পড়তে বলব। সেই সঙ্গে লেখককে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাব এমন একটি বিষয় নিয়ে লেখালেখির করার জন্য। আগামী দিনে তাঁর আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
বইমেলা '২৩-এর আলোচিত এবং বেস্টসেলার বইগুলোর অন্যতম একটি বই হল সাহিত্যিক নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়-এর 'বজ্রবিষাণ'। বইটির বিষয় এবং প্রচ্ছদ দেখে সংগ্রহ করার ইচ্ছে হয়েছিল। আমি একজন ভাগ্যবান পাঠক, লেখকের অটোগ্রাফ এবং বার্তা সমেত বইটি হাতে পেয়েছিলাম। এখানে বইটির সারসংক্ষেপ বলতে চাই না, তা ব্লার্ব (নিচে ছবিতে) পড়লেই জানা যাবে। শুধুমাত্র দু' একটা কথা যা আমার মনে হয়েছে সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
প্রথমেই বলি প্রচ্ছদের কথা। এক কথায় দুর্দান্ত এবং প্রাথমিকভাবে বিষয়ভাবনাকে যথাযথ উপস্থাপন করেছে। কম্পোজিশন, রঙের ব্যবহার থেকে অক্ষরবিন্যাস- সব কিছুই প্রায় নিখুঁত। শুধুমাত্র প্রচ্ছদটির জন্যই বইটা সংগ্রহ করা যায়। এমন একটি নান্দনিক প্রচ্ছদের জন্য শিল্পীকে ধন্যবাদ জানাই।
এবার আসি উপন্যাসের কথায়। লেখকের দীর্ঘদিনের পাঠ, মেধাশ্রম এবং গবেষণার ছাপ (বইটির শেষে রেফারেন্স দেওয়া আছে) উপন্যাসে সুস্পষ্ট। এই উপন্যাস ইতিহাস আশ্রিত হলেও অহেতুক সাল-তারিখ, ঐতিহাসিক তথ্যে ডুবে যায়নি। লেখকের কল্পনা এবং ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থেকেছে। এই সৃষ্টিকে শুধুমাত্র ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস হিসাবে দেখতে চাই না- পড়ে আমার ফ্যান্টাসি বা রূপকথা (লেখকও উল্লেখ করেছেন) বলে মনে হয়েছে। পটভূমি এবং প্রেক্ষাপট রচনা করতে যেটুকু তথ্য প্রয়োজন, লেখক সুনিপুণভাবে ততটুকুই ব্যবহার করেছেন। আর এখানেই উপন্যাসটি আরও বেশি মনোগ্রাহী হয়েছে বলে মনে হয়।
স্থান-কাল এবং চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন ধীরে ধীরে, কোন তাড়াহুড়ো নেই। তাই মূল চরিত্রগুলোর সঙ্গে পার্শ্ব চরিত্রগুলোও পূর্ণতা পেয়েছে। এই পার্শ্ব চরিত্রদের নিয়ে ছোট ছোট গল্প রয়েছে, সেগুলো বুঝতে অসুবিধা হয় না- বরং মনে দাগ কেটে যায় (যেমন- শ্রমন নীরবিন্দু, বিলাসী গ্রামের অতিসাধারণ মেয়ে মুক্তা) এবং মূল আখ্যানভাগকে অলংকৃত করে। ফলে সময়-পরিসর এবং চরিত্রগুলো আখ্যানে কোথাও অযৌক্তিক হয়ে ওঠেনি। অনেকটা স্লো-সিনেমার আঙ্গিক। পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হবে না চরিত্রগুলোর উদ্দেশ্য, সামাজিক অবস্থান এবং ভূমিকা। আবার পাঠক চিন্তা করার সময় পাবেন এবং চরিত্রগুলোর পাশাপাশি হাঁটতে পারবেন। বাস্তব এবং মায়া জগতের মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য আখ্যানে 'সময়-পরিসর'-কে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা আমার অত্যন্ত ভাল লেগেছে। এবং শিক্ষনীয়।
আপনি যদি এই উপন্যাসে অবাস্তব তন্ত্র এবং অলৌকিক ঘটনায় শিহরিত হতে চান, তা পাবেন না। তবে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার বিভিন্ন দিক, কায়াসাধনা, কিমিয়াবিদ্যা আর অলৌকিক ঘটনা আছে, এবং কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যথাসম্ভব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সেটা পড়তে গিয়ে কখনই অতিরঞ্জিত মনে হয়নি এবং কোথাও অতিরিক্ত জ্ঞান প্রদানের চেষ্টা নেই। লেখকের লেখনীর গুণে এই জায়গাগুলো পড়তে ভীষণ ভালোলেগেছে এবং যুক্তিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পড়তে পড়তে কখন যেন কল্পনায় সেই মায়া জগতে প্রবেশ করেছি। সোজাভাবে বললে, চটজলদি বিনোদন নেই, আছে গভীর দর্শন। তাই মননশীল পাঠকের কাছে এই বই অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠবে।
চরিত্রগুলো উপন্যাসের অন্যান্য উপাদানকে বেঁধে রেখে বিস্তার লাভ করেছে। তিনটি গল্প পেয়েছি- বিচ্ছিন্ন নয়, সময়-পরিসর এবং বক্তব্যে একসূত্রে গাঁথা (প্রথমদিকে আখ্যান রচনা রৈখিক নয়, যদিও সুপাঠকের বুঝতে সমস্যা হবে না)। তিনটি গল্পের মাধ্যমে এসেছে প্রেম, দর্শন, সেই সময়ে মানুষের সামাজিক অবস্থান, ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা, চিকিৎসাবিদ্যার কথা। তবে শুভঙ্কর এবং প্রভার গল্পটিই প্রাধান্য পেয়েছে মনে হল। এই শুভঙ্করের মাধ্যমেই আখ্যানের পটভূমি বঙ্গদেশ ছাড়িয়ে একাদশ শতাব্দীর ভারতের অন্যান্য স্থান, বাগদাদ, গ্রীসে ছড়িয়েছে। তার গল্পটি একজন প্রান্তিক চরিত্রের সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার। তা বলে অন্য দুটি গল্প গুরুত্ব হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েনি। এটা সম্ভব হয়েছে লেখকের মুনশিয়ানায়- তিনি যত্ন নিয়ে আখ্যানের প্রতিটি চরিত্রের পাশাপাশি প্রতিটি প্লট, সাব-প্লট সাজিয়েছেন।
আর মুগ্ধ হয়েছি শব্দের ব্যবহার এবং দৃশ্যের বর্ণনাতে। কী যে সুন্দর! মনের মাধুরী মিশিয়ে সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছেন। বইটির প্রচ্ছদ যেমন চোখের আরাম দিয়েছে, ঠিক তেমনই পড়েও মনের আরাম হয়েছে। সত্যি বলতে, এই উপন্যাস মন ভাল রাখার।
বইটি অনেক যত্ন নিয়ে প্রকাশ করেছেন প্রকাশক, হাতে নিলেই সেটা অনুভব করা যায়। মুদ্রন ত্রুটি প্রায় নেই বললেই চলে। এই উপন্যাস পাঠকের দরবারে নিয়ে আসার জন্য শ���লিধান-কে ধন্যবাদ জানাই।