বিশ্বাসঘাতকদের বিষাক্ত ছোবল প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও ভয়ানক। কারণ, মানুষ প্রকাশ্য শত্রু থেকে সতর্ক থাকলেও গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতকদের ব্যাপারে থাকে নির্ভার। ফলে এরা পুরো শক্তি নিয়ে আঘাত হানতে পারে। এদের বিষদাঁত এতই ভয়ংকর যে, একটা রাষ্ট্র অথবা সমৃদ্ধ একটা জাতি ধ্বংসের জন্য মাত্র এক বিশ্বাসঘাতকই যথেষ্ট।
ইতিহাসপাঠে জানা যায়, যুগে যুগে ঘরের শত্রুরা ইসলামের যে ক্ষতি করেছে, প্রকাশ্য শত্রুরা তার এক-দশমাংশও করতে পারেনি। মুসলিমদের ওপর যেসব বিপর্যয় নেমে এসেছে, এর মূলে কিন্তু এদেরই ভূমিকা বেশি। এদের বিষ এতই প্রতিক্রিয়াশীল যে, জাতিকে এর উপশম পেতে কয়েক শতাব্দী লেগে যায়।
সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে সত্য-মিথ্যার সংঘাত। সেই অমোঘ সত্য থেকে রক্ষা পায়নি ইসলাম ও তার অনুসারীরা। যুগে যুগে বাতিল ও বাতিলপন্থিরা টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে ইসলাম ও মুসলিমদের; কিন্তু হাজারো বাধা উপেক্ষা করে ইসলাম ও মুসলিমরা টিকে আছে আপন মহিমায়।
বিশ্বাসঘাতকদের ইতিহাস এমনই কতক ভ্রষ্টাচারীর কুকীর্তির জীবন্ত আখ্যান। এদের ওই কালো অধ্যায় পাঠ করে উম্মাহর কান্ডারিরা যাতে এদের চিনতে পারেন, ঘটে যাওয়া কালো অধ্যায় আর এদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে পারেন, সে লক্ষ্যেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
📌সিরিজ: ইতিহাস অংশ 📌মূল: মাওলানা ইসমাইল রেহান ও আব্দুর রশীদ তারাপাশী। 📌পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২১৬ 📌মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০ টাকা 📌প্রকাশক: কালান্তর প্রকাশনী
~যদি লেখা একান্ত বড় মনে হয় তবে বিষয়বস্তু অংশটি বাদ দিয়ে তারপরের অংশগুলো পড়ুন
বিষয়বস্তু ::
বইয়ের নাম শুনেই বুঝে যাওয়ার কথা বইটি ইতিহাসের খলনায়কদের নিয়ে রচিত। শুধুমাত্র খলনায়ক নয় বরং জাতি বা সাম্রাজ্যের পিঠ পিছে ছুরিকাঘাত করা ঘৃণিত ব্যক্তিদের নিয়েই রচিত। তবে এখানে শুধুমাত্র মুসলিম উম্মাহ'র পিঠ পিছনে ছুরি নিক্ষেপ করাদের ইতিহাস ই আছে।
বইটি মূলত 'আস্তিন কা সাপ' নামক একটি উর্দূ বইয়ের সাথে তারাপাশী দাদুর কিছু লেখার সংযোজনকৃত বই।
উর্দূ 'আস্তিন কা সাপ' এর বাঙলা মানে করলে দাড়ায় 'জামার হাতার সাপ বা পকেটের সাপ'। এটা বলার পেছনেও ছোট করে কাহিনি আছে।
আগেকার সময় এখনকার মতো কাগুজে নোটের প্রচলন ছিলোনা। তখন মানুষের লেনদেন চলতো 'সোনা' বা 'রুপা'র মুদ্রায়। মানুষ এসব মুদ্রা রক্ষার জন্য বর্তমানের মতো করে পকেট দিতো না জামায়। অধিক সতর্কতা হিসেবে নিজের হাতের সাথে মুদ্রার থলি বেধে রাখতো বা হাতার পকেটে রাখতো।এতকিছুর পরও পকেটমারেরা তাদের অজ্ঞাত বশত ছিনিয়ে নিয়ে চলে যেতো। তো যে বিষয়ে এত এত সতর্ক মানুষ, সে জায়গায় কি কেউ ইচ্ছে করে বিষাক্ত সাপ কে জায়গা দিবে?
না দিবেনা । তবে কারো হাতায় যদি সাপ ঢুকেই পরে আর সে যদি টের না পায় তাহলে তার চেয়ে উদাসীন আর কেই বা আছে । এদিক বিবেচনা করেই উর্দূ তে উক্ত বাক্যটি বলা হয়। বাংলায় আমরা যেমন বলি 'কড়িকাঠের ইদুর', 'দুধ কলা দিয়ে সাপ পোষা' বা 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' ইত্যাদি।
যেসব গাদ্দারদের ইতিহাস এখানে আলোচনা করা হয়েছে তারাও যুগে যুগে আমাদের সাথে এভাবেই ধোকাবাজী করে গেছে।আমাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে 'সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছে'।এরকম কতিপয় গাদ্দার নিয়েই এর আলোচনা।
📌পাঠপ্রতিক্রিয়া::
বইটির পাঠ কে আমি আমার মতো করে ২টি অংশে ভাগ করে নিয়েছি (সম্পূর্ণ পড়ার পর)। যেখানে~
📍১ম ভাগ:: যেখানে আমার মনে হয়েছে এসব গাদ্দার বা বিশ্বাস এর ঘরে 'চুরি' করা 'চামার' দের ইতিহাস আমি কিছুটা হলেও জানি। তার মধ্যে অন্যতম হলো,
মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মির জাফর আলি খান ও বিশ্বত্রাস সন্ত্রাস: হাসান ইবনু সাব্বাহ ইত্যাদি।
📍২য় ভাগ:: এভাগে এসে আমি সম্পূর্ণ নতুন কিছু জানতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। আমার মনে হয়েছে আমি এসব বিষয়ে অনেকটা আধারে ছিলাম। এই পাঠগুলোর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর শিরোনাম আপনাদের সুবিধার জন্য উল্লেখ করছি।
বিশ্বাসঘাতকের যোগ্য উত্তরসূরি: ইস্কান্দার মির্জা বিষাক্ত তরবারি: মুহাম্মদ আলি পাশা মিসরের দুই গাদ্দার: প্রথম ফুয়াদ ও ফারুক মিসরের নব্য ফারাও:জামাল আব্দুন নাসির রক্তখেকো নব্য ফারাও : হুসনি মোবারক বিশ্বাসঘাতক সেনাপ্রধান: জেনারেল সিসি
এতসব কিছু পড়ার পর আমার একটাই জিনিস মনে হয়েছে 'মিসর' সম্পর্কে।।
❝মিসর হলো বিশ্বাসঘাতক আর ষড়যন্ত্রকারীদের আতুড়ঘর। ❞
📌বইটির সমালোচনা ::
১/ বইয়ের 'বিশ্বত্রাস সন্ত্রায়' ও 'বিশ্বাসঘাতক সেনাপ্রধান: জেনারেল সিসি' অংশগুলোতে আমার মনে হয়েছে যে শিরোনাম অনুযায়ী আলোচনা করা হয়নি। 'সিসি' অংশে 'প্রেসিডেন্ট মুরসি' কে নিয়ে আলোচনা। আর হাসান সাব্বাহ অংশে 'নিজামুল মুলক' কে নিয়ে আলোচনা বেশি করা হয়েছে।তবে এটি হয়তো আমার বেশি না জানা থাকার ফল।
২/ বইটির কিছু অংশে 'সালের বা বছরের ' উদ্ধৃতি আমার যথাযথ মনে হয়নি। কিছু লেখায় সালগুলোর উল্লেখ আগে পরে করে লেখা। যা আমার জন্য মাঝে অসুবিধার কারণ হয়ে দাড়িয়েছিলো। আমার মনে হয়েছে সালগুলো ক্রমিক আকারে দিলেই ভালো হতো।
📌বইটি কেন পড়বেন?:
এ বইটি পড়ার পিছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। তার ভেতর অন্যতম কারণগুলো হলো:
১/আমাদের অসচেতনতার কারণে যুগে যুগে আমাদের কে কিভাবে পিঠ পিছনে ছুরি মেরে অন্যরা উদ্দেশ্য হাসিল করে নিয়েছে তা জানা যাবে।
২/ কমিউনিজমের আড়ালে কিভাবে একের পর এক আমাদের কাছ থেকে রাজ্যগুলো কেড়ে নেওয়া হলো তা।বিশেষত আফগান এ কিভাবে রাশিয়া ঢুকলো।কেনই বা যুদ্ধ শুরু হলো।
৩/ বর্তমান 'ফা-লাসতিন আর ই-য়া-হুদী' যুদ্ধে কেন মিসর 'ইয়া--হুদ' এর পক্ষে (অঘোষিত ভাবে)।মিসরের প্রেক্ষপট টা কি বা কি ওমন কারণে জেনারেল সিসি চুপ করে আছেন।
৪/ 'ভাষা আন্দোলন' আর 'মুক্তিযুদ্ধ' এর সময়কার পাকিস্তানের জেনারেল আর সরকার কেমন ছিলো তা ছোট করে জানতে পারবেন।
৫/ 'নজদ' 'আরব' অন্ঞ্চলে কিভাবে বৃটিশ রা প্রবেশ করলো। বা কি এমন হয়েছিল যার কারণে আরবরা বিদ্রোহ করলো তা সম্পর্কে ও অনেকখানি ধারণা পাওয়া যাবে।
৬/উত্তর ভারতের কর্ণাটকের বীর সুলতান 'টিপু সুলতান' কেন এত দৃঢ়চেতা স্বাধীন শাসক হয়েও পরাজিত হলেন তা জানতে পারবেন।
৭/বালাকোট আন্দোলন এর আগের পরের পরিস্থিতি সম্পর্কে ও কিছুটা ধারণা পাবেন।কেন এ আন্দোলন অনেকটা ব্যর্থ হয়েছিল তা সম্পর্কে ও জানতে পারবেন।
~সবশেষে এটাই বলতে চাই।এরকম টপিকে আলাদা করে বই প্রকাশ করার জন্য প্রকাশনীকে আলাদ করে ধন্যবাদ। তাছাড়া বইয়ের বিন্যাসের ধরণটাও পছন্দ হয়েছে বেশ।ঐতিহাসিক সময়কালের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রতিটা শিরোনামের বিন্যাস করা হয়েছে বলে বইটা পড়তে অনেকখানি সুবিধা হয়েছে।