'পথের দাবী' শরৎচন্দ্রের দেখা আঁধার ঠেলে সকাল বেলার রক্তিম সূর্যটা। ভারববর্ষের স্বাধীনতা, বিপ্লব সংগঠন, সাথে ভালোবাসার মেলবন্ধন, আর মায়ার করুণ চিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। অবিসংবাদিত ভাবে তিনি নতুন আঙ্গিকে ভারতের স্বাধীনতা আনার কথা বলেছেন। শিক্ষিত জনগণ যখন বিপ্লব আনবে সে বিপ্লব সর্বান্তকরণে সফল হবে, এবং হাজারো মানুষের রক্তের স্রোত বইবে তাতে শরৎ বাবু তা নির্নিমেষ ভাবে বলেছেন। ভারতের যা গর্ব করা তা যেন সময়ের সাথে বদলে যায় তা ফুটে উঠেছে। ধর্মকে আঁকড়ে ধরে যে মানুষের শুধু আত্ম-প্রবঞ্জনা হয় শুধু, নিজেকে ভুলিয়ে রাখা তা যেন ভারতে স্বাধীনতার পথে অন্তরায় না হয়।
আড়ালে আবডালে আকাশের মেঘ বৃষ্টি হয়ে কাঁদতে পারে, আমি তো মানুষ। আমার যে ভালোবাসার পতনে, দুঃখে বুক ভেসে যায় কান্নায়। মানুষ কেমন করে নিজের থেকেও দেশকে বেশি ভালোবাসে তা সব্যসাচী চরিত্র না দেখলে জানতাম না। তার এ্যানার্কিস্ট হয়ে উঠার পিছনের গল্প যেন বাংলার স্বাধীনতা। বিপ্লবী হয়ে উঠা সহজ, বিপ্লবটা নয়। তার মত অসীম হৃদয় আর জ্ঞানের পরিসীমা নিয়ে কেউ কখনো শান্ত ও প্রদীপ্ত মুখে জেগে থাকি নি স্বাধীনতা আসবে বলে! যার কাছে ভালোবাসা বিদ্যুৎ রেখার মত অকস্মাৎ হারিয়ে যায়।
বিপ্লবের সাথে ভালোবাসা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর বিপ্লবী হলে যে ভালোবাসা যায় না, ভালোবাসাকে রাখতে হয় আলমারির বাক্সে বন্দী করে লেখক তা বলতে ভুলে যান নি। যে গরুটার দড়ি লঘু করে বেঁধে তাকে বলা হয় ঘাস খেতে সে তো কখনো ঘাসের নাগাল পায় না। ইংরেজরা যে আমাদের এমন করে আইন কানুন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন লেখক তা বলতে দ্বিধা করেন নি। বাস্তবতার নিরিখে ভারতের স্বাধীনতা যে কত আমূল-পরিবর্তন প্রয়াসী তা সব্যসাচী চরিত্র দিয়ে লেখক বুঝিয়েছেন।
মনে বিষন্নতা দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠে ভারতীর জন্য। যে মেয়ে ভালোবাসার একটি দেবী মূর্তি হয়ে সকল কিছু আগলে রেখেছেন। সবার মাঝে মৌন থেকেও সে উজ্জ্বল। তার ভালোবাসার যে সীমানা আছে তা কেউ কখনো দেয়াল এঁকে দেখাতে পারবে না। যে নিশ্চল হয়ে সকলকে নিয়ে ভালোবাসতে চায়। মতভেদ থাকলেও অপরকে মতামতকে শ্রদ্ধা করার প্রয়াস তাকে করেছে অনন্য।
অপূর্বকে নিয়ে আমার ক্ষোভ ছিল অনেক জায়গায়। সংশয় ছিল এত ভীরুতা দিয়ে লেখক কেন গড়েছেন তাকে? আবার মনে হয়, প্রয়োজন ছিল যে ও তার বড্ড বেশি। তার নিষ্পাপ মন, তার হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার, জাত মেনে চলা দিয়ে লেখক কটাক্ষ করেছে পুরো সমাজকে। সারাজীবন এমন করে চললে যে ভারতের স্বাধীনতা আসবে না লেখক তাই প্রকাশ করেছেন তার চরিত্র দিয়ে। তাকে সত্য ধর্মের সন্ধান কোনটি লেখক শেষ মুহুর্তে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
সব্যসাচী তো পুরো উপন্যাসের প্রাণ কেন্দ্র। তাকে বোঝা যায় না, না বুঝলে লেখাও যে সম্ভব নয়।
উপন্যাসটির সারমর্ম হলো, অপূর্ব কলকাতার গোঁড়া হিন্দু পরিবারের ছেলে। বর্মা যায় চাকরীর জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে বারবার সে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে। যে ভারতীর সাথে পরিচয় হওয়ার পর যোগ দেয় 'পথের দাবী' সংগঠনে। যা বিপ্লবীদের গ্রুপ। কিন্তু যে দূর্বল প্রকৃতির মানুষ। তার ধারা যে দেশেন হিত সাধন হবে না ভারতী তার আভাস পায় সেদিন, যেদিন দেখে সামান্য হাতের জন্য তার ক্রদন। সব্যসাচীর দেখানো স্বাধীনতা পথের দাবী, ভারতীর অসংশয় প্রকাশ বইটিতে।