“দৃশ্যমান অস্ত্রের চেয়ে অদৃশ্য অস্ত্রই বেশি ভয়াবহ হয়।”
“শত্রু দৃশ্যমান হোক কিংবা অদৃশ্য, কখনও দৃষ্টির আড়াল করতে নেই।”
বলছিলাম এমন একটা বইয়ের কথা যেখানে বর্ষ পুরনো জন্মজন্মান্তরের প্রাচীন যুদ্ধ ফুটে উঠেছে সময়ের সীমাকে অতিক্রম করে। যেখানে অতীতে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় ঘটনা যুক্ত হয়েছে বর্তমানকালের সুতোয়। কথা বলছি @শুভঙ্কর শুভ অনূদিত, BhumiProkash - ভূমিপ্রকাশ প্রকাশিত, ডেভিড হেয়ারের লেখা রিটার্ন অফ রাবণ সিরিজের দ্বিতীয় বই “দ্য গোস্ট ব্রাইড” নিয়ে।
উপন্যাসটি আসলে দ্বৈত-সময়রেখার বর্ণনা। গল্পে অতীত ও বর্তমানের দুই স্রোত পাশাপাশি বয়ে গিয়ে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। প্রথম গল্পটা, অর্থাৎ “পায়ার অফ কুইনস” ঠিক যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকেই এই গল্পখানা শুরু হয়েছে। দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে উপন্যাসটিকে, প্রথমভাগ হলো “মনের সাথে লড়াই”। আর দ্বিতীয়ভাগ হলো “মনের জন্য লড়াই”। এই নামকরণটা একেবারে যথার্থ হয়েছে। তবে জাতিস্মর অর্থাৎ অতীত জীবনের প্রভাব পরের জন্মে বেশি করে ফুটে উঠেছে বইটিতে। একটু খুলেই বলি। ভয় নেই, সম্পূর্ণ স্পয়লার ছাড়াই বলবো।
সময়টা ২০১০ সাল, বিক্রম খান্দাবানি সদ্যমাত্র ১৬টা পূর্বজন্মের স্মৃতি উদ্ধার করেছে। “সয়ম্বর লাইভ” নামের এক টিভি রিয়ালিটি শোতে অংশগ্রহণ করল যেখানে এক বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী, সুনিতা আশোক, দাবি করছে সেইই নাকি পূর্বজন্মের “সীতা”। যদিও টিভি শো’এর পুরস্কার বিশাল তবুও বিক্রমের অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিক্রমের লক্ষ্য খ্যাতি নয়। তার বিশ্বাস, সুনিতা হলো পদ্মার আত্মা, প্রাচীন মান্ডোরে যাকে সে রক্ষা করতে পারেনি। আর সেই বিশ্বাস বুকে নিয়ে বিক্রম এই শো’কে ব্যবহার করতে চায় তাদের চিরশত্রু “রবীন্দ্র”কে সামনে টেনে আনতে।
একই সাথে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে দ্বাদশ শতাব্দীর সময়স্রোত। এই সময়কালে আমরা বিক্রমের পুনর্জন্মের ইতিহাসের মুখোমুখি হই। বিক্রম তখন পরিচিত “চান্দ বারদাই” নামে, যিনি ছিলেন “পৃথ্বীরাজ চৌহান”এর দরবারের কবি ও উপদেষ্টা। গল্পে উঠে আসে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বয়ম্বরের ঘটনা যেখানে খোদ রাজকুমারীকেই অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় আর প্রারম্ভ হয় রাজপুত রাজ্যকে দুর্বল করে দেওয়ার মতো এক মহাযুদ্ধ। চান্দ বারদাই আর পৃথ্বীরাজ চৌহানকে মুখোমুখি হতে হয় তৎকালীন সময়ের “রবীন্দ্র” এর সামনে।
এবার আসা যাক গল্পের বেশ কিছু মূল চরিত্র নিয়ে।
প্রথমেই বলব বিক্রমের কথা, যে কিনা “আরম ধূপ” এর ভবিষ্যত আত্মা, অতীতের চান্দ বারদাই। এই চরিত্রকে একেবারে সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা হয়েছে। জ্ঞান আর স্মৃতির বিভীষিকাময় বোঝা নিয়ে চলা এই চরিত্রটিকে আমার কাছে বেশ ডায়নামিক লেগেছে।
এরপরই আসবে আমানজিতের কথা যে কিনা অতীতে মদন শাস্ত্রী আর আরও সুদূর অতীতের পৃথ্বীরাজ চৌহান। বিক্রমের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও এক মহান যোদ্ধা, অতীতে সেতো ছিল এক কিংবদন্তি সেনাপতি আর বর্তমানেও বিক্রমের রক্ষাকবচ হয়ে থাকা এক শিখ যুবক।
দীপিকা, আমানজিতের বাগদত্তা, যেই কিনা এই পুরো গল্পের মূল চালিকাশক্তি। রবীন্দ্র এর সমগ্র পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়ার মূল হোতা। অতীতে সে ছিল রাণী দরিয়া, আপাতত এতটুকুই বলব যেন স্পয়লার না থাকে।
এর পাশাপাশি সুনিতা অশোক তো রয়েছেই। ডাকসাইটে এই সুন্দরীর আত্মায় অতীতের রাণী পদ্মার আত্মার একটা ভগ্নাংশ থাকায় বেশ অস্থির আর বেমানান।
আর রাণী পদ্মার আরেকটা অংশ যার মধ্যে আছে, সেই রাসীতা, বিক্রমের বর্তমান সৎ বোন।
সর্বশেষ, রবীন্দ্র কিংবা বর্তমানের শিব বাকলি, গল্পের প্রধান প্রতিপক্ষ। মূলত এক প্রাচীন তান্ত্রিক রাজা, যে দেহ থেকে দেহে লাফিয়ে বেড়াতে পারে। বর্তমান সময়ের মুম্বাইয়ের এক প্রভাবশালী গ্যাং লিডারের দেহে আশ্রয় নিয়েছে, হাজার বছর আগে শুরু করা এক আচার/ব্রত/যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে।
এবার এই গল্পের বেশ কয়েকটা কাহিনির মূল ভাব আলোচনা করি চলুন। প্রথমত গল্পে “নিয়তি” আর “স্বেচ্ছাশক্তির” এক অসম লড়াইয়ের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলো যেন রামায়ণের এক অন্তহীন পুনরাবৃত্তির চক্রে আবদ্ধ। তাদের একটাই প্রশ্ন, সমাপ্তি কি আদৌ বদলানো সম্ভব? ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পৃথ্বীরাজ চৌহানকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার এই গল্পে আত্মাকে ভেঙ্গে ভিন্নমানুষের ভিতরে প্রবেশের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। ঠিক যেন হ্যারি পটারের হোরক্রক্স। তবে এখানে আত্মার ভগ্নাংশ সুনিতা আর রাসিতার জীবনকে এলোমেলো আর অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আবার আনুগত্য এবং বিশ্বাসঘাতকতার টানাপোড়েনেই গল্পের আবেগ ও দ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছে। কিন্তু কে কার সাথে লয়াল থাকতে গিয়েও বিশ্বাসঘাতকতা করে সেটা নাহয় বই পড়েই বুঝতে পারবেন। এছাড়াও সয়ম্বর সম্পর্কে জানতে পারবেন। দ্বাদশ শতাব্দীর সেই বিখ্যাত তারাইনের যুদ্ধে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী রাজপুতদের পরিণতি সম্পর্কেও জানতে পারবেন। এ যেন ইতিহাসের একটুকরো খণ্ডচিত্র।
গল্পটায় “স্বয়ংবর” একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। একদিকে এটা একটা ক্লাসিক ঐতিহাসিক মহাকাব্য আর অন্যদিকে আধুনিক থ্রিলারের মেলবন্ধন করেছে। গল্পটি সমকালীন পাঠকের জন্য ভারতীয় পুরাণকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করবে। দেখিয়ে দিবে যে কিংবদন্তিগুলো জীবন্ত। আর গল্পের সমাপ্তি এই সিরিজের উত্তেজনা বাড়িয়েছে, যেখানে নায়কদেরকে আপেক্ষিক নিরাপত্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে তৈরি করা হয়েছে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধী হিসেবে।
এবার আসি লেখার স্টাইল আর টোন নিয়ে। ডেভিড হেয়ার তার লেখায় এক রুক্ষ, সিনেমাটিক ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। তিনি সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক গবেষণা দ্রুতগতির আরবান ফ্যান্টাসির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। তার গল্পের টোন মহাকাব্যিক কিন্তু বিষণ্ণ। তিনি ঐতিহাসিক সময়রেখার ট্র্যাজেডিকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করেছেন, আবার একই সাথে সমকালীন অংশে বজায় রেখেছেন তীব্র উত্তেজনা। লেখক রামায়ণকে কেবল পটভূমি হিসেবে নয়, বরং পুরোগল্পের নীলনকশা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর এখানে অনুবাদকের কথা না বললেই নয়। অনুবাদকের নাকি তৃতীয় বই এটা। কিন্তু অনুবাদ পড়ে বোঝাই যাচ্ছিল এটা লেখকের যত্নের একটা প্রজেক্ট, বেশ পরিচর্যার সাথে অনুবাদ করেছেন। পুরাণের গল্পের একটা ভাইব পাচ্ছিলাম পুরো সময় জুড়ে। এর মূল কারণ হয়তো শব্দের নির্বাচন। কিছু শব্দ ইচ্ছে করেই প্রাচীন রাখা হয়েছে, মানে সমর্থক শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন অতীতের অনুভূতি পাওয়া যায়। আবার তার সাথে বর্তমান সময়ের ঘটনায়ও সাবলীলতা ছিল। অবশ্য কনভারসেশন কারো কারো কাছে যান্ত্রিক লাগতে পারে, তবে মনে রাখতে হবে “বর্তমান” সময়কাল আসলে ২০১০ সাল, এটা মাথায় রেখে এবং স্থান “যোধপুর” মাথায় রেখে পড়লে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে।
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গতি এবং কাঠামো। ডেভিড হেয়ার বেশ দক্ষতার সঙ্গে দুইটি টাইমলাইনকে সমান্তরালভাবে চিত্রায়ন করেছেন, যা ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে সমকালীন টানাপোড়েনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। “ভগ্ন আত্মা” (সুনীতা/রাসিতা) এর ধারণা পুনর্জন্মের থিম এর সাথে সাইকোলজিক্যাল ডেপ্ট/গভীরতা যোগ করেছে। শুধুমাত্র পুনর্জন্মের কেচ্ছাকাহিনী থেকে বেরিয়ে এসে একটু ভিন্ন ধারায় নিয়ে গেছে। অ্যাকশনের দৃশ্যগুলো, বিশেষ করে দ্বাদশ শতাব্দীর ধনুর্বিদ্যা এবং আধুনিক প্রাসাদের অবরোধ (siege), চমকপ্রদভাবে এবং স্পর্শকাতরভাবে এবং জীবন্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
উপন্যাসটার দুর্বল দিকগুলো হলো সমকালীন রিয়েলিটি শো-ভিত্তিক প্লট (“স্বয়ংবর লাইভ”) কখনো কখনো দ্বাদশ শতকের রাজপুত যুদ্ধের গুরুগম্ভীরতাকে হালকা করে দিয়েছে। হঠাৎ ছন্দভঙ্গের মতো মনে হতে পারে। এছাড়াও কিছু সমকালীন সহচরিত্রকে কিছুটা ক্লিশে মনে হয়েছে। হ্যাঁ, এটা সত্য যে তাদেরকে কমেডি রিলিফ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সত্য। তবে কখনো কখনো অতিপ্রাকৃতিক হুমকির যে সিরিয়াসনেস বা টেনশন সেটাকেই কমিয়ে দিয়েছে। টানটান উত্তেজনা আছে এতে, তবুও কেন যেন বইটা পড়তে অনেক সময় লেগে গেল। বেশ ধীরে ধীরে পড়েছি।
বইটির সম্পাদনা চলনসই। ভুল যা আছে সব লিমিটের মধ্যে। প্রচ্ছদটা মানানসই। সজল চৌধুরী যেখানে প্রচ্ছদ করে সেখানে নান্দনিকতা থাকবেই। গোস্ট ব্রাইডের গোস্টকে আলতো করে দেখা হচ্ছে বটে। স্ট্রেইট স্পাইন দেখা হয়েছে, তবুও খুলে পড়তে অসুবিধা হয়নি।
তো, এই বইটা কারা উপভোগ করবেন?
এই বইটি আরবান ফ্যান্টাসি ভক্তদের জন্য পারফেক্ট। যারা বিশ্বের পুরাণ ও কিংবদন্তি বিশদভাবে পড়তে ভালোবাসেন তাদের বেশ পছন্দ হবে। Rick Riordan এর লেখা যেমনটা হয় আরকি। এছাড়াও ঐতিহাসিক উপন্যাসের পাঠকদেরকেও আকর্ষণ করবে। রাজপুত রাজাদের যুগ ও ভারতের প্রাথমিক ইসলামী বিজয় অভিযান উপভোগ করার মতো। ভাগ্য/নিয়তি, পুনর্জন্ম এবং মহাকাল জুড়ে মহাকাব্যিক সংগ্রামের গল্প যারা ভালোবাসেন তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য তো বটেই।
এই গল্পের শেষটা পড়ার পর পরের গল্প দ্রুত শেষ করার জন্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাকে। যদিও “দ্য গোস্ট ব্রাইড” শেষ করেছি মার্চের ২৮ তারিখ, তবুও রিভিউ লিখতে লিখতে দেরীই হয়ে গেল। এর একটা কারণ ২৯ তারিখেই “সোলস ইন এক্সাইল” শুরু করার পর ওই গল্পটাতেই ডুবে আছি। বাংলা সন শেষ হওয়ার আগেই আমার পড়া শেষ হয়ে যাবে বোধ করছি। দেখা যাক। ততদিন এই মিথোলজিক্যাল হিস্টোরিক্যাল ফিকশনে ডুব দিতে থাকি। দেখা হবে অন্য কোনও একটা আলোচনায়।