রাষ্ট্র-মেশিনের কোলে পাতা তুলতুলে লিবেরেল মাথা বইটি পাঠকের চিন্তাপ্রণালির অনেকগুলো আরামকে বিঘ্নিত করতে পারে। কারণ, যেসব ধারণার ওপর সমাজ-রাজনীতির প্রচলিত বিশ্লেষণগুলো প্রায়শই দাঁড়ানো থাকে, এ বইটি সেসব অনুমানকেই দুর্বল সাব্যস্ত করে এগিয়েছে। বরং, বইটি সেসব অনুমান-অনুসিদ্ধান্তগুলোর প্রতি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। বইটিতে ছয়টি খন্ড আছে। প্রথম খণ্ডে ‘শিক্ষায়তন ও শিক্ষাশাসন’ মুখ্যত উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় অভিঘাতগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে ‘সংবাদ-নিয়ন্ত্রণ ও প্রপাগান্ডাচর্চা’তে সংবাদ-পরিবেশনপ্রণালি আর সংবাদসংস্থাগুলোর সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিশ্লেষিত হয়েছে। ‘শ্রেণিবিদ্বেষের রাষ্ট্রকৃত্য’ খণ্ডে আলোকপাত করেছে কীভাবে বিধিবদ্ধ সব শ্রেণি-আচরণ সংগঠিত হচ্ছে সেদিকে। চতুর্থ খণ্ডে ‘সংস্কৃতি-সত্তার সংঘাত আর স্বার্থ’ এমন কিছু রচনাকে একত্রিত করেছে, যেখানে পরিচয়-নির্মাণের প্রবণতাগুলো আর সেখানকার লড়াইকে পাঠ করা হয়েছে। পঞ্চম খণ্ডে ‘প্রহরীর শাসনব্যবস্থা আর ভীতির কারিগরি’ বর্তমান সময়ের পদ্ধতিগত ভীতিমূলক পরিচালন-ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলেছে। শেষ খন্ডটিতে জাতীয়তাবাদকে কঠোরভাবে শ্লেষ করা হয়েছে 'জাতীয়তাবাদী জজবা' নামে । সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রকাঠামো আর এর বাসিন্দাদের বিষয়ে এ বইটি পাঠকদের নতুনভাবে ভাবাতে সক্ষম।
ভূমিকা এবং প্রথম খন্ডের প্রথম লেখাটি পড়েই সচেতন পাঠক এ বইয়ে হুকড হয়ে যেতে পারেন।
ফার্স্ট প্যারায় প্রথম খন্ড লিখেছি কারণ গ্রন্থটি ছয়টি খন্ডে লিখিত।
মানস চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক। এ পরিচয়ের বাইরেও তিনি সুপরিচিত। তাঁর রচিত কোন বই এই প্রথম পড়া হলো।
মূলত এই ছয়টি খন্ডে মানস জায়গা করে নিয়েছে 'বণিকবার্তা' 'দৈনিক ইত্তেফাক' সহ আরো কিছু ডেইলি এবং প্রবন্ধের কাগজে তাঁর ২০১০ থেকে শুরু করে ২০১৭-১৮ সন পর্যন্ত রচিত নন-ফিকশনসমূহ।
প্রচলিত এবং রেটরিক বিভিন্ন প্লাটফর্মের উপর যেসব ধারণা কেতাবী পড়ুয়া এবং সত্য না জানার পণ ধরে বসে থাকা মানুষজন অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সে সকল কম্ফোর্ট জোনে বেশ খানিকটা বিঘ্ন ঘটাতে পারে এ গ্রন্থ।
লেখকের বিভিন্ন প্রবন্ধে 'উত্তুঙ্গ' শব্দটি বারবার ঘুরেফিরে এসেছে, কারণ এক উত্তুঙ্গ সময়ের পর্যবেক্ষণ, ব্যবচ্ছেদ এবং বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি পুরো বইজুড়ে।
ফ্ল্যাশব্যাকের মতো অনেক কিছুই চোখের সামনে চলে আসবে রিডারের। স্পর্শকাতর সময়ের সহিংসতা, অসংবেদনশীল ঘটনাপ্রবাহ, ভূরাজনৈতিক জটিল সমীকরণ, শিক্ষা-ব্যবস্থার দূর্দশা, প্রপাগান্ডার ধারাক্রম, শ্রেণীবিদ্বেষের দারুন এভেইলিবিলিটি, বাংলাদেশে বিবাদমান প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যকার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গভীর বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক এবং আচার-আচরণের সেই সময়ের ঘটনাচক্র চলে এসেছে মানস চৌধুরীর হিউমার সমৃদ্ধ লেখনির মাধ্যমে।
স্থুল জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মতান্ত্রিকতার বাইরেও যে এক বিশাল বাংলাদেশ রয়েছে সেদিকে ফিরে ফিরে তাঁকিয়েছেন লেখক এবং পাঠকের দৃষ্টিও সেদিকে নিবিষ্ট করার কর্মটি করেছেন।
ভয়ের কারখানায় থাকা মানুষের 'তাজরীন' থেকে শুরু করে 'রানা প্লাজা' এর ঘটনা পরম্পরা কীভাবে একটি সংবেদনশীল মনকে আর্দ্র করে ফেলতে পারে তা মানস চৌধুরীর প্রবন্ধে পাওয়া যায়।
'লিবারেল' কে 'লিবেরেল' লেখার কারণও দর্শিয়েছেন লেখক। এছাড়া ২০১৩ থেকে ২০১৮ সন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে প্রায় অনিরাময়যোগ্য কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়েছে বিভিন্ন পক্ষের বিভিন্ন উদাসীনতা এবং হিংস্রতার কারণে সেই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন মানস চৌধুরী।
মানস চৌধুরীর প্রোজ আকর্ষণীয়। এফোর্টলেসলি প্রচন্ড উইট এবং হিউমারে পরিপূর্ণ। একই সাথে তৎকালীন বিভিন্ন নৈরাজ্যের মাঝে অনেক রাষ্ট্রের অনেক বিষয়-বৈশিষ্ট্য যেভাবে আচরণ করেছে সেসবের বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন বর্গ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কী তাও লিখেছেন লেখক। পরিবহন শ্রমিক, আগুন আক্রমণের শিকার সাধারণ মানুষ, গার্মেন্টস ওয়ার্কার থেকে রিকশাওয়ালাদের জীবন যাতনা যেভাবে নন-মার্ক্সিস্ট ওয়েতে দেখিয়েছেন লেখক তা প্রশংসনীয় এবং মনকে বহুলাংশে আর্দ্র করে দেয়।
গড়পরতা মানসিকতা এবং বিভিন্নমুখী প্রপাগান্ডায় আচ্ছন্ন প্রথাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই গ্রন্থ লেখা হয় নি।
বই রিভিউ
নাম : রাষ্ট্র-মেশিনের কোলে পাতা তুলতুলে লিবেরেল মাথা লেখক : মানস চৌধুরী প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২৩ প্রকাশক : দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত জনরা : প্রবন্ধ রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
লেখক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, উনার " সরল সমাজপাঠ " বইটি আগে পড়বার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই বইয়ে ২০১০ থেকে ২০১৬ এর সময়কার (বেশিরভাগই ২০১২, ২০১৩ সালের) বণিকবার্তা, সকালের খবর, ইত্তেফাক পত্রিকা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে লেখা প্রবন্ধসমূহ স্থান পেয়েছে। ৬ টি বিষয়ে সেই সময়কার সমসাময়িক সর্বমোট ৫৬ টি প্রবন্ধ বইটিতে আছে।
" সরল সমাজপাঠ " পড়ে থাকবার দরুণ আমি তার বই দেখেই আর দুইবার ভাবিনি, বইটি কিনে ফেলেছিলাম। এক্ষেত্রে আমি খেয়ালও করি নি যে বইটিতে মূলত দশ বারো বছর আগেকার লেখাই স্থান পেয়েছে।
সমসাময়িক রচনা হবার দরুণ, যার অনেককিছু নিয়েই আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম নাহ ( সেই সময়ে আমি ক্লাস ফাইভ - সিক্সের ছাত্র মাত্র ), কিন্ত এখন সেসব কিছু জানি-বুঝি-বিশ্লেষণ করতে পারি কিংবা চেষ্টা করি; এবং বইটা আমাকে কিছু নতুন ভাবনার খোরাক জুটিয়েছে। লেখকের চিন্তাভাবনা অপ্রচলিত, উনার বিশ্লেষণ আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ হয়েছে। বইটা নিয়ে এটা আমার প্রাপ্তি বলতে পারি।
এবার বলি বইয়ের কিছু ডাউনসাইড নিয়ে।
১. বইটি স্যারের বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা আজ থেকে ৮-১৫ বছর আগের প্রবন্ধ সংকলন মাত্র। এবং তিনি যেহেতু পত্রিকায় লিখতেন, সব সেই সময়কার সমসাময়িক লেখায় ভর্তি। সেই সময়ে ঘটা বিভিন্ন ঘটনায় তার মতামত, একই দৃষ্টিভঙ্গি বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। এবং সত্যি বললে পরপর কয়েকটা লেখায় একি টপিক, একি কথা বারবার আসতে দেখে আমি যারপরনাই বিরক্ত হয়েছি। এই প্রবন্ধগুলোর হয়তবা ২০১৩ তে সেই সময়ের হট টপিক ছিল, কিন্ত সেগুলোকেই ২০২৩ এ একটা বইয়ে তুলে দেওয়াটা আমি সমীচীন মনে করছিনা। ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথাকে বাদ আমি দিচ্ছি নাহ, কিংবা এই বলছিনা রানা প্লাজা ইস্যু এখন ব্যাকডেটেড: কিন্ত সেইসব ঘটনার প্রেক্ষাপট ২০২৩ এ বসে মানুষ বর্তমান ভাবনাতেই বুঝতে চাইবে, ২০১৩ এর পেপার কাটিং নাহ।
বরঞ্চ লেখক নিজে চাইলেও, ২০২৩ এ বসে ২০১৩ এর রানা প্লাজা,তাজরীন গার্মেন্টস আগুণ ইত্যাদি নিয়ে একটা রিভিউ করতে পারতেন - একটা প্রবন্ধেই তার সেই সময়ের দশটা প্রবন্ধের মূলভাব ব্যক্ত করতে পারতেন। পাঠকদের জন্যে সেটাই কি সুবিধের হতো নাহ?
২. 'সরল সমাজপাঠ' লেখকের এই সময়ের লেখা: এবং একটা স্পেসিফিক টপিক নিয়ে একটা রচনা লেখাতেই বোধহয় পড়ে বুঝতে পারা গিয়েছে। কিংবা বর্তমান সময়ের ক্রাইসিস নিয়ে লেখায় বাস্তবতার সাথে মিল পাচ্ছি। এবং এইক্ষেত্রে আমি মনে করি লেখকের লেখা বর্তমানে সহজবোধ্য কিছুটা।
কিন্ত,সেই সময়ের লেখার ভাষা তার কোনোভাবেই "সহজবোধ্য" মনে হয় নি। উনি এর চাইতে আরো সুন্দরভাবেই তার মনের ভাব ব্যক্ত করতে পারতেন। উপরন্ত এসব লেখা পত্রিকায় ছাপানো, যেখানে পত্রিকা আপামর জনসাধারণ পড়ে।
সেইখানে উনি যেইভাবে জটিল করে কথাবার্তা বলেছেন, আমি নিজে একেবারেই আনাড়ি পাঠক নাহ, কিন্ত আমিই বুঝতে অনেক ঝামেলায় পড়েছি। সহজ কথাকে সহজভাবেই প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল, অনেক মানুষ স্যারের লেখা বুঝবেনই নাহ এটা আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।
৩. ২০০৮ থেকে ২০১৫ এর সময়কার বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা বোঝার জন্যে , বা গবেষণা প্রয়োজনে বইটা পড়তে হতে পারে। কিন্ত ২০২৩ এ এসে আসলে এই বইটা সবার পড়বার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় নাহ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অলরেডি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে এই কয়েক বছরেই।
প্রবন্ধের বইয়ের আসলে কোনো রেটিং হয় নাহ। একেকটা সমসাময়িক অতীত ঘটনায় লেখক তার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন, পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য থাকবেই। তবে লেখক সাহসী, সুচিন্তক ��বং স্পষ্টভাষী - এটা নি:সন্দেহ।
কিন্ত সার্বিক বিবেচনায় আমি বইটির প্রেক্ষাপট, ভূমিকা, এবং প্রধানত পাঠকের বুঝতে পারবার সহজলভ্যতা বিবেচনায় খুব বেশি রেটিং দিতে পারছি নাহ। প্রবন্ধ পাঠের একটা আলাদা আনন্দ আছে, সেইটা আমি এই বই পড়ে পাই নি। লেখার ভাষা এত জটিল হওয়া বাস্তবিকই পাঠকদের জন্য অসুবিধার। প্রতিটা লেখাতেই উনার বক্তব্য আমার পছন্দ হয়েছে, কিন্ত একি সাথে এই বই পড়তে গিয়ে আমি রিডার্স ব্লকেই পড়ে গেছি।