এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন মানুষ সংগ্রাহক। তার সংগ্রহে আছে ডাকাত দলের সর্দার, বেশ্যার দালাল, স্মাগলার, কন্ট্র্যাক্ট কিলার, ড্রাগ ডিলার, মানবপাচারকারী, কথাসাহিত্যিক, কবিসহ নানা জাতের নারী-পুরুষ। বিচিত্র গল্পের আইডিয়ায় ভরপুর তার মাথা। আইডিয়াগুলো নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখার জন্য বন্ধু আজাদকে প্ররোচিত করে সে। কিন্তু লেখার জগৎ থেকে দূরে সরে গেছে আজাদ। ফলে গল্পগুলো আর লেখা হয়ে ওঠে না। না লেখা সে সব গল্প নিয়ে এ উপন্যাস। এখানে একটার পর একটা সম্ভাবনাময় ও মূল্যবান গল্প ডালপালা ছড়িয়ে হারিয়ে যায়। একের পর এক নিহত হয় উপন্যাসের আইডিয়া। সেই সব নিহত ও অসমাপ্ত গল্পের সমান্তরালে বইতে থাকে আরেকটি গল্প। দুনিয়াদারির গহন ও গোপন রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে এ উপন্যাসে।
মাহবুব মোর্শেদের জন্ম ১৯৭৭ সালে ২৯ জানুয়ারী রংপুরে। গল্পকার, ঔপন্যাসিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে। পেশা সাংবাদিকতা। শৈশব-কৈশর কেটেছে উত্তরের রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা ও দক্ষিণ-পশ্চিমের কুষ্টিয়ায়। ২০০৬ সালে তার গল্পগ্রন্থ ‘ব্যক্তিগত বসন্তদিন’ প্রকাশিত হয়েছে কাগজ প্রকাশনী থেকে। ২০১০ সালে ভাষাচিত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস ‘ফেস বাই ফেস’।
পরিচিত ঘটনাবলী মাহবুব মোর্শেদের গল্পে আসে নতুন আবিষ্কার, চমক আর বুননে সজ্জিত হয়ে। স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা বুনে দেয় রহস্যময় সংযোগ। তার স্টোরিটেলিং সব সময়ই আকর্ষক, স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। গদ্য সরল, কিন্তু দ্ব্যর্থকতায় ভরপুর—ইশারা আর পরিহাসে ঠাসা। তার কবিতা লিপ্সা, আকাঙ্ক্ষা, তাড়না ও প্রেমের আরেক উন্মীলন। গল্প-উপন্যাস রচনা ছাড়াও তিনি এক সময় বিচিত্র বিষয়ে লিখতেন ব্লগে। এখন ফেসবুকে লেখেন নানা বিষয়ে ছোট ছোট কথা।
গল্পটা রেজাউল আর আজাদের।যে গল্প নিয়ে আজাদ গল্প লেখেনি, যে গল্প নিয়ে আজাদ গল্প লিখতে পারতো, যে গল্পগুলো রেজাউল একের পর এক আজাদকে বলে গেছে লেখার জন্য, যে জীবন তারা যাপন করতে পারেনি অথচ যে জীবন তাদের হাতছানি দিয়ে গেছে ক্রমাগত, যেখানে তারা পৌঁছতে চেয়েছে অথচ যেখানে যাওয়ার যথেষ্ট উদ্যম তাদের ছিলো না,জীবনের কাছে তারা যা পেতে চেয়েছে অথচ মরীচিকার মতো যা সরে গেছে দূরে, জীবনের যে অর্থ তারা খুঁজেছে আজীবন অথচ যে অর্থ খুঁজে পেয়ে তারা দিশেহারা বোধ করেছে সেই গল্প বা অগল্প, সেই যাপিত বা অযাপিত জীবনের, সেই কারুবাসনার উপাখ্যান "বুনো ওল।" উপন্যাসটি মাহবুব মোর্শেদের স্বভাবসুলভ স্বাদু, সরস ও মৃদু গদ্যে লেখা। পড়তে শুরু করলে থামার উপায় নেই। দার্শনিক আর আত্মপরিচয়ের সংকটের দিকটা বাদ, শুধুমাত্র ভরপুর বিনোদনের জন্যে হলেও বইটা আরেকবার পড়ার ইচ্ছা আছে। প্রধান চরিত্র রেজাউলের কথা বহুদিন মনে থাকবে। এমন খামখেয়ালী, বর্ণিল ও অদ্ভুত চরিত্র বাংলা সাহিত্যে কমই আছে।
আজাদের চাইতে রেজাউলের বয়স একটু বেশিই হবে। তাও আজাদ রেজাউল কে তুই সম্বোধন করে।কারণ অস্পষ্ট। সমাজ ও পরিবারের চোখে তারা বন্ধু। খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আজাদ রেজাউলের সাথে মিশতে পছন্দ করে কারন আজাদ ভাবে রেজাউল একটা খিচুড়ি ক্যারেক্টার। আর রেজাউল আজাদের সাথে মিশে কারণ রেজাউল মনে করে আজাদ প্লেইন পোলাও চরিত্রের মানুষ। রেজাউলের জীবনে মাত্র দুইটা লক্ষ্য। একটা হলো দুনিয়ার মেয়েদের সাথে খাতির করা আর আরেকটা আজাদ কে লেখালেখি করার জন্য উৎসাহ দেওয়া। প্রথমটাতে সে সুবিধা করতে পারলেও দ্বিতীয়টাতে পারে নি।আজাদ তার কথাতে উৎসাহ তো পায় ই না বরঞ্চ বিরক্ত হয়। কোন মেয়ের সাথেও সে ঠিক মতো খাতির করতে পারে না। রেজাউলের ধারণা আজাদ টা আসলে অলস। পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই ঢাকা ছেড়ে নিজের এলাকায় বাপের ব্যবসায় বসে গেলো। যার আজকে বিখ্যাত লেখক হয়ে বইমেলায় মেয়েদের অটোগ্রাফ দিতে দিতে কলমের কালি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা সে কিনা গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে বসে একটু পরপর গেরস্তের আকুতি মিনতি শুনে "ভাই বাসায় মেহমান আসছে। এক চুলায় কাচ্চি আরেক চুলায় মুরগি, এর মধ্যে গ্যাস গন।একটু কুইক পাঠান" ছিঃ ছিঃ ছিঃ! মেধার কি নিদারুণ অপচয়! রেজাউল কিন্তু দমে না। উৎসাহ দিয়েই যায়। নানা ধরনের গল্পের সন্ধান দেয়। বিচিত্র সব ক্যারেক্টারের সাথে আজাদকে পরিচয় করিয়ে দেয়। আজাদ যদি দয়া করে কিছু একটা লেখে।আজাদ দয়া করে না। লেখার বদলে বিয়ে করে একেবারে সংসারী হয়ে যায়। বিয়ের পর রেজাউলের সাথে স্বাভাবিক ভাবেই তার দূরত্ব বাড়ে। রেজাউল তার মতো ঢাকায় থাকে…টিউশানি করে,নেশা করে, মেয়েদের সাথে আড্ডা দিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখে কখনো কখনো আজাদ এর কাছে টাকা ধার চেয়ে আর যোগাযোগ করে না। এভাবেই চলছিলো। একদিন হুট করে রেজাউল এসে বলে সে দেশ থেকে পলায়া যাবে। তার মতো একটা ছ্যাঁচড়ার জন্যে নাকি কোন টিনএজার বিষ খেয়ে মরে গেছে। আজাদ বিস্মিত হয়। এই যুগে প্রণয়ঘটিত কারনে মৃত্যু বিস্ময়কর ব্যাপার ই বটে যেখানে আকাশে বাতাসে মাল্টিপল চয়েস সর্বদা ঘূর্ণায়মান। অফিসের দেয়ালে ‘’চাকুরি খালি নাই’’’ এর মতো ‘’কোথাও হৃদয় খালি নাই’’ । সব হৃদয় ই অকুপাইড। তা যাই হোক আজাদ এই বয়সে রেজাউলের সাথে আর মিশে নষ্ট হতে হবে না ভেবে স্বস্তিবোধ করে এবং রেজাউল কে কিছু টাকা দিয়ে দেয়। রেজাউল চলে যায়। কিন্তু সিন্দাবাদের ভূত কি আসলেই এত সহজে চলে যায়? ব্যক্তিগতভাবে বুনো ওল পড়ে ভালো লেগেছে। তরতর করে সময় চলে যায়। লেখক উদারহস্তে লিখেছেন। কোন রাখঢাক নাই। এটাও ভালো। সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যে রেজাউলের মতো পিওর হারামজাদা চরিত্র দিন দিন এক্সটিংক্ট হইয়া যাইতেছে।তিন তারাই দিতাম। হারামজাদাটার জন্য এক তারা বেশি। বাংলা সাহিত্যে এরকম হারামি ক্যারেক্টারের আরো আবির্ভাব প্রত্যাশা করছি। এরা লিটারেচারিক ট্রেজার ।এক কথায় সাহিত্যিয় মূল্যবান চরিত্র।
রেজাউল নামের এক মানুষ সংগ্রাহককে নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি দিয়ে মাহবুব মোর্শেদের লেখার সাথে পরিচয় হলো। বেশ ইন্টারেস্টিং তবে খুব ভাল লাগেনি। আরও উন্নতি করা যেত।
রমজানের শেষের দিকে বইটা প্রকাশ করা হয়। এর আগে আমি মাহবুব মোর্শেদের লেখা খুব একটা পড়িনি। বঙ্গ বব (বেইজড অন বুকস) নামের একটা প্রোজেক্টে বেশ কয়েকটি বই থেকে ভিজুয়াল নির্মান করা হয়েছিল। বঙ্গ ববের প্রথম সিজনের প্রোমোশনের কিছু কাজ করতে গিয়ে আমি মাহবুব মোর্শেদের ‘নোভা স্কশিয়া’ নামের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। সেটা ছিল খুব ছোট। ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত বারো হাজার শব্দের মত। যেহেতু প্রোমোশনের লেখার কাজের কারণে পড়েছিলাম, তাই খুব একটা মনযোগ দেয়া হয়নি।
তাই ‘বুনো ওল’ বইটা কিনলাম রমজানে, যেদিন প্রকাশিত হয়েছে তার পরদিন। পরে শেষ করলাম ঈদের পরদিন। আমার কাছে বইটা একটা বিষয়ে ইশারা দিল যে, লিটারেরি ফিকশন বলে যে একটা চর্চা আছে সেটা আমাদের দেশে ‘জনরা’ ফিকশনের আড়ালে পরে যেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ‘জনরা’ ছাড়াও যে বই হয়, সেটাই অনেকে ভুলে যাচ্ছে। আমি বহুদিন পর খাটি একটা লিটারেরি ফিকশন পড়লাম।
বইটার ফ্ল্যাপে লেখা অংশটুকু বেশ অদ্ভুত। মুল চরিত্র আজাদের বন্ধু রেজাউল। তার কাছে হাজার রকমের মানুষের কালেকশন। তিনি সেসব মানুষের সঙ্গে আজাদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তা নিয়ে গল্প লিখতে বলেন। বই পড়তে গিয়ে বুঝি এসব মানুষেরা বেশিরভাগই ভয়ঙ্কর। কিন্তু তারা রেজাউল চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান নিমিষেই।
বিষন্নতার একটা ছাপ বই শেষে থেকে যায় বটে কিন্তু এই গল্পটা পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে বহু দূরে গিয়ে আমাদের গল্প বলে, যা অতি পরিচিত বলেই বারবার পাতা ওল্টাতে হয়। মেদহীন এই দুইশো পৃষ্ঠার উপন্যাস, আপনাকে নিয়ে যায় আজাদ ও রেজাউলের মধ্যকার জগতে যেখানে রয়েছে যৌনতা, লোভ, অপ্রাপ্তি এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো- একটা ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক সময়ের মধ্য দিয়ে বেয়ে চলা স্থির নদী।
আমার খুব ইচ্ছে মাহবুব মোর্শেদের সবগুলো বই পড়ে ফেলা। রকমারি ডট কমে ঢুঁ মেরে দেখলাম খুব বেশি বই তিনি লেখেননি। তাই কয়েক মাস সময় নিলেই তার সব বই পড়ে ফেলা সম্ভব নিমিষেই। আমার ভাষায় ‘মাহবুব মোর্শেদ খতম’ করা সম্ভব সহজেই। আমি যে কাউকে বইটা পড়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো বই।
হাতের বইটা শেষ করলাম, ২০৭ পেইজের বই শেষ করতে ৫ দিন লেগে গেল। অথচ এইরকম বই আমি ২/৩ দিনেই শেষ করতাম আগে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, সারাদিন অফিস করে আসার পর শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। আমিও উপন্যাসের নায়কের মতো পিছুটান বিহীন জীবন চাইতাম, কিন্তু সময় আর বাস্তবতার কাছে হার মেনে বয়সের কাছে পরাস্ত হয়ে এখন আরাম খুঁজে ফিরি।
এই এক অন্য রকম অনুভূতি, অন্য রকম উপন্যাস "বুনো ওল" মাহবুব মোর্শেদ এর লেখা ফেসবুকে নিয়মিত পড়তাম, উনার বই পড়া হয়নি আগে, এই প্রথম উনার বইটা পড়ে নিলাম। বাতিঘর অনেক যত্ন নিয়ে বইটা নির্মাণ করেছে, প্রচ্ছদটা একদম গল্পের পটের সাথে রিলেট করতে পারছিলাম।
মানুষের জীবনের গল্প মূলত দু:খের গল্প। মানুষ অনেক কিছু হারাতে হারাতে অবশেষে এটা ফাইন্ড আউট করে। এটা খুঁজে বের করতেই তো মাঝ রাতে সিদ্ধার্থকে ঘর ছাড়তে হইছিল। তলস্তয় যেমন বলেছিল, "প্রতিটা সুখী পরিবার একইরকম, কিন্তু প্রত্যেকটা দুখী পরিবার নিজেদের মত ভিন্ন-ভিন্নভাবে দুখী।" সুখের একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নাকি অন্য আরেকটা দরজা খুলে যায়। কিন্তু মানবচরিত্র সেই খোলা দরজাটার সন্ধান পায় না।
কিছু মানুষ থাকেই এমন, ছন্নছাড়া জীবনের ভারী কাঁধকে হালকা করে সবচেয়ে দীর্ঘ পথও শেষ করে ফেলে। সবাই যখন সুখের বৃষ্টি খুঁজে, কেউ কেউ নিজের বুকেই সমুদ্র ঘুরে বেড়ায়। মৃত্যুর মতো দুঃখ কিন্তু মানবজীবনের পিছু ছাড়ে না, এটা অবধারিত। এজন্য যে ভিনসেণ্ট ভ্যানগগ বদ্দা বলছিল, "দু:খ চিরস্থায়ী"
এই গল্পটা মূলত দুইজন বন্ধুর। গল্পের কথক আজাদ এবং তার বন্ধু রেজাউল। রেজাউল আজাদের থেকে দশ-বারো বছরের বড়। তবুও তাদের ভেতরে তুই-তোকারির সম্পর্ক। দুনিয়ার মানুষের সাথে রেজাউলের জানাশোনা। সে একজন মানুষ সংগ্রাহক। মানুষের সাথে মিশে মিশে সে মানুষ সংগ্রহ করে। তার সংগ্রহে থাকা মানুষগুলো কিন্তু সাধারণ মানুষ না। তাদের ভেতরে থাকতে হবে বিশেষ কিছু। তবেই রেজাউল তাদের সাথে মেশে। এভাবেই গল্পের কথক আজাদের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। কারণ রেজাউলের মনে হয়েছে আজাদ একজন দারুণ লেখক। সে তাই আজাদকে বারংবার চাপ দিতে থাকে একটা উপন্যাস লেখার জন্য। গল্পের প্লটের অভাব নেই রেজাউলের কাছে। এমনই একটা প্লট হচ্ছে লালমনিরহাটের বিখ্যাত ... https://oputanvir.blogspot.com/2026/0...
3.5 গল্পটা রাজনীতি, অপরাধ জগৎ, সাহিত্যের কানাগলি হয়ে সংসার জীবনের টানাপোড়েন এ শেষ হয়; যা পাঠক মনে কিঞ্চিত মায়া ও বিষন্নতার মিশেলে এক অতৃপ্তির উদ্রেক করে। এই অতৃপ্তি অকাম্য নয়।