বলুন তো, যুযুৎসু মানে কী? ব্রুস লি এবং জ্যাকি চ্যান প্রমুখ প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাবে ওই শব্দটি শোনামাত্র আমাদের মাথায় যে ছবিগুলো তৈরি হয়, তারা মার্শাল আর্টের একটি বিশেষ ঘরানার কথা বলে। কিন্তু এই বইয়ে শব্দটির অর্থ 'যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক'। তেমন মানুষের সংখ্যা কোনোকালেই কম ছিল না। তাদের মধ্য থেকে বিশেষ একজনকে বেছে নিয়েছেন লেখক। তাঁকে ঘিরে বহু যুদ্ধ ঘটেছে রণাঙ্গনে, সমাজে, অর্থনীতিতে, প্রযুক্তিতে। আবার যিনি আসল একটা যুদ্ধ করেননি বলেই হয়তো তাঁকে মরতে হয়েছিল। জে.এফ.কে! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঁয়ত্রিশতম রাষ্ট্রপতি জন ফিৎজেরাল্ড কেনেডি। 'কিছু কথা ছিল মনে...' শীর্ষক ভূমিকায় লেখক বলেছেন, লকডাউনের মধ্যে একান্ত সমকালীন রাজনীতি এবং বৃহত্তর পটভূমিতে ভারত-চিন সম্পর্ককে দেখতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এই কুরুক্ষেত্রের সূচনা হয়েছিল বহু আগে। তার উৎস নির্ধারণ করতে গিয়েই তিনি ওই ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করেন এক আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন নায়ক হিসেবে— যাঁর অসংখ্য ব্যক্তিগত ত্রুটি ছাপিয়ে গেছে স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্জিত কৃতিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। এই মানুষটির উত্থান, শাসন এবং গুপ্তহত্যার ইতিহাসটি সংক্ষেপে, সহজ ভাষায়, একান্ত ব্যক্তিগত টীকাটিপ্পনী সহযোগে ও সরস ভঙ্গিতে পরিবেশন করা হয়েছে বইটিতে। তারই সূত্রে এসেছে আমেরিকার ইতিহাস, বিংশ শতাব্দীতে তার রাজনীতি ও অর্থনীতির বিবর্তন, অপরাধ ও অপরাধীদের উদ্বর্তন, সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব। তাকেই পটভূমি করে দেখানো হয়েছে, কেন কেনেডির উত্থান শুধুই এক ব্যক্তির আখ্যান নয়। বরং ক্ষমতার লক্ষ্যে কেনেডি পরিবারের অমোঘ চলনকেই তুলে ধরেছে এই বই— যে পথে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে ঈর্ষা ও ভয়ের কাঁটা, আবার আশার ফুল। এসেছে কিউবা-কে মাঝখানে রেখে প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আর সেই সূত্র ধরেই এসে পড়েছে ঠিক সেই সময়েই ম্যাকমেহন লাইনের দু'পাশে থাকা দুই পড়শির মধ্যে সংঘাতের কাহিনি। তাতে কে কতটা দায়ী ছিল, আসলে কে কীভাবে জিতেছিল— এ-সব প্রশ্নের সহজ সাদা-কালো উত্তর দেননি লেখক। ঠিক সেভাবেই, তিনি নিশ্চিতভাবে বলার চেষ্টা করেননি, কেনেডি'র দিকে ধেয়ে যাওয়া বুলেটের পেছনে আঙুল যারই থাক, আসল মগজটা কার ছিল। তিনি শুধু সম্ভাবনার কথা বলেছেন— যেমনটা বলা যায় বাস্তবের এই ধূসর পৃথিবীতে। বইটির মুদ্রণ পরিষ্কার ও শুদ্ধ। তবে এমন লেখার সঙ্গে কিছু সাদা-কালো আলোকচিত্র ও স্কেচ জরুরি ছিল। আগামী সংস্করণে যদি সেগুলো সংযোজনের ব্যাপারে ভেবে দেখা যায়, তাহলে খুব ভালো হয়। বিশ্ব-রাজনীতি তথা নন-ফিকশনে আগ্রহী হলে, কিংবদন্তি আর মিথ্যের বিশাল খড়ের গাদা থেকে কয়েকটি সূচ খুঁজে নিতে চাইলে, এই বইটি আপনাকে পড়তেই হবে।
জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি, আমেরিকার ৩৫তম রাষ্ট্রপতি। আততায়ীর শিকারে পরিণত হওয়া আমেরিকার সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি।
ধনকুবের পরিবারের সদস্য ছিলেন কেনেডি। তাঁর বাবার লক্ষ্য ছিল পরিবারের একজন হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হবেন। সেটা হয়েছিলও। আমেরিকার রাজনীতিতে কেনেডি পরিবার সবসময় যেন প্রাসঙ্গিক। একইসাথে তাদের অকাল মৃত্যুও যেন প্রাসঙ্গিক।
লেখক বইটার নাম রেখেছেন যুযুৎসু। মার্শাল আর্ট টার্ম হলেও এক্ষেত্রে এর অর্থ হবে যুদ্ধ করতে আগ্রহী আর কি! যুদ্ধ করতে আগ্রহী অসংখ্য চরিত্রের মাঝে বেছে নিয়েছেন জন এফ কেনেডিকে।
বর্ণিল এক চরিত্র ছিলেন এ কেনেডি। ব্যক্তিগত জীবনে অসংখ্য নারীর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল। এ সংখ্যাটা নাকি এতটাই বেশি যে স্বয়ং এফবিআই পর্যন্ত হিসাব রাখা বাদ দেয়! সেই তিনিই কি-না আবার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারের বিষয়ে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করেছেন।
মাত্র বছর দেড়েকের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে অনেক কিছুর সাক্ষী ছিলেন কেনেডি। তাঁর সময় বহুল আলোচিত কিউবা মিসাইল সংকট, বে অব পিগস অভিযান, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ভারত-চীন বৈরিতা প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি।
গল্পচ্ছলে কেনেডির জীবনের কাহিনি উল্লেখ করেছেন লেখক। বাদ দেননি অস্বস্তিকর কোনো তথ্য। আমেরিকার এ রাষ্ট্রপতি ও সে সময়টাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে আগ্রহী পাঠকেরা নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন এ বই পড়ে। সেদিক বিবেচনায় লেখক ধন্যবাদ প্রাপ্য।