একজন লেখক গল্প লিখেন। চরিত্রগুলোকে নিজের মধ্যে লালন করেন। তাদের জন্ম, মৃত্যু বা নিয়ন্ত্রণ থাকে লেখকের হাতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি কি তখন নিজেকে স্রষ্টা মনে করেন? এই যেমন সৃষ্টিকর্তা এই পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ করেন, লেখক কি তার নিজস্ব লেখা উপন্যাসের জন্য নিজেকে ক্ষণিকের জন্য তেমন কিছু মনে করতে পারেন? হতেও পারে, আবার না-ও পারে।
একটি গল্পের সূচনা কীভাবে হয়? লেখক যখন গল্পটা লিখতে বসেন তখন তার মধ্যে কেমন ভাবনা কাজ করে? প্রতিটি ধাপে ধাপে গল্পের এগিয়ে যাওয়ায় লেখক সম্ভবত নিজেকেই নিবেদন করেন। সেই চরিত্রগুলোর একাংশ মনে করেন। কিংবা হতেও পারে তিনি নিজের জীবনের অংশ থেকেই চরিত্রের সৃষ্টি করছেন। তার অভিজ্ঞতা ঢেলে দিচ্ছেন উপন্যাসের পাতায়। ফলে বাস্তবতা বিবর্জিত উপন্যাসগুলো হয়ে ওঠে নিখাঁদ বাস্তব। যদিও পাঠকের মনে বিস্ময়ের জন্ম হয়, এমন কি সত্যিই হতে পারে?
ফিওদর দস্তইয়েফ্স্কির নাম শোনেনি, এমন পাঠক পাওয়া দুষ্কর। রুশ এই সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে গিয়েছেন, বর্তমান সাহিত্যের তুলনা বা উদাহরণ তাকে ঘিরেই রচিত হয়। একের পর এক কালজয়ী সাহিত্যের স্রষ্টাকে আমরা কতটা জানি? তার জীবনের গল্পের যে অধ্যায়গুলো, তার বেশি একটা যে খোলা হয়নি।
লেখকেরা দূর থেকেই সুন্দর, সম্মানীয়। কাছে এলেই নিজের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। নতুন এক অচেনা সত্তার আবির্ভাব হয়। লেখনীর সাথে ব্যক্তিগত জীবন তখন হিসেবে গরমিল লাগায়।
এই যেমন দস্তইয়েফ্স্কির কথাই ধরা যাক। এত বড়ো একজন সাহিত্যিক, অথচ তিনি জীবনের প্রতি কম অবিচার করেননি। মানুষের কাছে গালমন্দ শুনতে হয়েছে অবিরত। কারণ, তার জুয়ার নেশা। জুয়া খেলে প্রচুর অর্থ খুইয়েছেন। অনেকের কাছে ধার নিয়ে শোধ দিতে পারেননি। গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে কর্যের হিসেব। প্রকাশকের কাছ থেকেও ধার নিতে কার্পণ্য করেননি। শর্তে একটি উপন��যাস লিখে দিতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। যদি না পারা যায়, তাহলে আগে পরের সব লেখার স্বত্ত্ব চলে যাবে প্রকাশকের কাছে। যার একটা কানাকড়িও পাবে না দস্তইয়েফ্স্কি।
“ছাব্বিশ দিন” মূলত সেই সময়ের গল্পই। বেঁধে দেওয়া যে নির্দিষ্ট সময়, এর মধ্যে লিখে ফেলতে হবে একটি গল্প — লেখক সিদ্ধান্ত নিলেন তার অন্যতম সেরা গল্প ‘জুয়াড়ি’ লিখবেন এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। কিন্তু, লেখকের মন হচ্ছে ছন্দময় এক পরিভ্রমণের মতো। যার মনের সাথে নিজের বোঝাপড়া হয় অজান্তেই। এই বোঝাপড়ায় যেকোনো লেখা বেঁধে দেওয়া সময়ে শেষ করা সব কি না, এই প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা যে উপন্যাস নিজস্ব গতিতে চলে, যে লেখা নিজেই নিজের পথ করে নেয়; তাকে কী করে জোর করে উপস্থাপন করা যায়?
প্রকাশকের বেঁধে দেওয়া ছাব্বিশ দিন উপন্যাস লিখতে হবে। তাই দস্তইয়েফ্স্কির একজন সহযোগী দরকার। লেখক বলবেন, আর সেই সহযোগী লিখবে। লেখক খুঁজে পেলেন আন্না নামের এক মেয়েকে। বিশ বছরের যুবতী আন্না তখন স্বপ্নে বিভোর। যে লেখকের বই পড়ে বড়ো হওয়া, প্রয়াত বাবার কাছে যে লেখকের অসংখ্য গল্প শুনেছে, তার সামনে তারই কাজ করে দেওয়ার অনুভূতি অন্যরকম। এমন একজন লেখকের বই প্রকাশের আগে জেনে যাওয়ার অনুভূতিও ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
তবে শুরুতেই লেখক সম্পর্কে বিরূপ এক প্রতিক্রিয়া। দস্তইয়েফ্স্কি বদ মেজাজি। একটুতেই রেগে ওঠেন। মানুষের কাছে আন্না শুনেছে লেখকের সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা। বিশেষ করে চারিত্রিক দোষের ফিরিস্তির তো অভাব নেই। নারী দেখলেই দুর্বল হয়ে পড়েন। জুয়া ছাড়া থাকতে পারেন না। এই জুয়া তাকে সর্বস্বান্ত করে তুলেছে। তার একমাত্র সম্বল কেবল তার লেখা, সেটাও হারাতে বসেছেন। শুরুর বিরূপ অনুভূতি কাটিয়ে যখন লেখকের জীবনে প্রবেশ করল আন্না, তখন এক ভিন্ন মানুষকে আবিষ্কার করল। যে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়।
আন্না জানতে পারল একজন মানুষ দস্তইয়েফ্স্কিকে। যে অনেকগুলো নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। জীবনের অনেক ট্র্যাজেডি পেরিয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছে। বাইরে থেকে একজন মানুষকে মন্তব্য করা সহজ, কিন্তু তার জীবনের অন্দরে প্রবেশ করলে ভিন্ন অনুভূতি হয়।
“ছাব্বিশ দিন” আমাদের জানায় দস্তইয়েফ্স্কির জীবনের একাংশ। যা হয়তো অনেকের ভালো লাগবে না। একজন নামকরা লেখক, বিশ্বসাহিত্যে যাকে আদর্শ মানা হয়; তার এরূপ অবস্থা অবশ্যই কপালে ভাঁজ আনতে যথেষ্ট। নিজের বেহিসাবি জীবন, লাগামছাড়া ছুটে যাওয়া তাকে যেমন পিছন দিকে টেনেছে, তেমনি পাঠকদের এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ উন্মুক্ত করেছে।
বইতে দস্তইয়েফ্স্কির বাবা, মায়ের কথা উঠে এসেছে। ছোটবেলা থেকে বাবার সাথে বনিবনা না হওয়া, একটু যুবক বয়সে বিদ্রোহী দস্তইয়েফ্স্কির জেল কাটানো, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্প বিস্ময়ের জন্ম দেয়। একাকি জীবনে বারবার প্রেম আসে। দস্তইয়েফ্স্কির এই প্রেম এসেছে জীবনে তরঙ্গের রূপ নিয়ে। কিন্তু কোমল হৃদয়ের এই লেখক এখানে আঘাত পেয়েছেন। তার এই আঘাতেই কি না কে জানে, অনেকগুলো উপন্যাসের জন্ম হয়েছে! মৃ ত স্ত্রীর প্রথম ঘরের সন্তান, কিংবা মৃ ত ভাইয়ের স্ত্রীর প্রতিও তার দায়িত্ববোধ অস্বীকার করেন না। নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে হলেও দায় মেটান। অথচ নিজেই যে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত এক জীবনের অংশীদার।
একজন জুয়াড়ি, মানুষ যাকে পছন্দ করে না, একাকীত্বে ডুবে থাকা লেখক, যাকে সম্মানও কম মানুষ করে; তার প্রতি নারীরা কোন দুর্বলতায় প্রেম নিবেদন করে? কী আছে দস্তইয়েফ্স্কির মাঝে? কেন আন্না নিজেও এই দুর্বলতা অনুভব করে? যেখানে তার বয়স দস্তইয়েফ্স্কির চেয়েও অর্ধেকের কম।
এই বইটা লেখকের মনস্তত্ত্বের এক দুয়ার খুলে দেয়। লেখক নিজেকে শান্ত করার জন্য বাইবেল পড়ে। অশান্ত মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে তার জুয়া খেলার বিকল্প নেই। জুয়াড়ি বইটি লিখতে গিয়েও যখন জুয়ার বর্ণনা আসে, লেখককে উচ্ছল মনে হয়। যেন এতেই জীবন, আর লেখক স্বয়ং এর চালক। লেখকের বিভিন্ন বইয়ের পটভূমি, অনুভূতি এখানে ফুটে উঠেছে। দস্তইয়েফ্স্কির নিজস্ব ভাবনা এখানে গুরুত্বপুর্ণ। একজন লেখক সমালোচকদের আলোচনা, সমালোচনার জন্য লেখে? না-কি পাঠকের কাছে কেমন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, তার জন্য লেখে?
এতক্ষন যাঁকে লেখক হিসেবে সম্বোধন করলাম তাঁকে যিনি দুই মলাটে জীবন্ত করেছেন পেরুমপদভম শ্রীধরন। তার গল্পের মায়াবী লেখায় দস্তইয়েফ্স্কি যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। একজন লেখকের জীবনের গল্প আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের জানার কথা না। সেই অনেক অজানা এখানে সামনে এসেছে। দস্তইয়েফ্স্কির প্রতিটি বিখ্যাত উপন্যাসের পটভূমি বা অনুভূতি তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। দস্তইয়েফ্স্কিকে উপস্থাপন করেছেন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। বিখ্যাত এই লেখককে অন্যভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস করেছেন। দস্তইয়েফ্স্কির কর্মকাণ্ডে যেমন বিরক্তিবোধ হয়, তেমন তার জন্য মায়াও হয়। যেই মায়ায় বাঁধা পড়েছে আন্না নিজেও। এই মায়াতেই দায়িত্ববোধ, খুনসুটি, রাগ-অভিমান মিলেমিশে এক হয়ে উঠেছিল।
যেহেতু একজনের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস, সাথে একটি উপন্যাস লেখার শুরু থেকে শেষ; সেহেতু কিছু অংশ যেমন আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, ঠিক তেমনি কিছু অংশ আবার একঘেয়ে লেগেছিল। গল্পের গতি এভাবে একেক জায়গায় একেকরকম ছিল। যদিও শেষের ঘটনা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। আন্নার সাথে যে সম্পর্কের সূচনা, এখানে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। আর বইটির যে মূল উপজীব্য বিষয়, ছাব্বিশ দিনের মধ্যে কি দস্তইয়েফ্স্কি জুয়াড়ি লেখা শেষ করতে পেরেছিলেন? পারলেও প্রকাশকের সাথে তার কোনো সমস্যা হয়নি তো?
বইটির অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন। দুর্দান্ত অনুবাদ। ভাষাশৈলী মনোমুগ্ধকর। বিশেষ করে এ জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে যেমন ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন প্রয়োজন হয়; ঠিক তেমনটাই। পড়তে গিয়ে উপভোগ্য হয়ে উঠে। মনে হচ্ছিল মৌলিক কোনো লেখা পড়ছি। এখানেই একজন অনুবাদকের স্বার্থকতা। প্রথমা প্রকাশন বড়ো প্রকাশনীগুলোর একটা। তাদের প্রোডাকশন কোয়ালিটি, সম্পাদনা, বানান যেন মানসম্পন্নতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। একদম পারফেক্ট যাকে বলে। ত্রুটি খুঁজে বের করার সুযোগ নেই। প্রচ্ছদের মধ্যেও এক ধরনের অ্যাস্থেটিক ভাব রয়েছে। এক কথায় দারুণ।
পরিশেষে, একজন লেখক তার জীবনে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে নিজের জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যে গল্পগুলো তিনি লিখেন, তার অনেকটাই হয়তো তার জীবন থেকে নেওয়া। নিজের দেখার চোখ, মানুষের মনকে বোঝার মতো ক্ষমতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার করার যোগ্যতা একজন লেখককে আরো শাণিত করে। পরিণত করে তোলে। এভাবেই একজন দস্তইয়েফ্স্কি হয়ে ওঠে সবার, সমগ্র বিশ্বের। জীবনের প্রতিটি অবস্থানে যেমন জীবনযাপনই করুক না কেন, প্রতিটি পাঠকের মনে তিনি তার লেখার জন্যই স্মরণীয়। সবাই তাকে বরণ করে নেয় মুগ্ধতা ছড়িয়ে মানবজীবনের গল্প বলার জন্যই।
▪️বই : ছাব্বিশ দিন
▪️লেখক : পেরুমপদভম শ্রীধরন
▪️অনুবাদ : জাভেদ হুসেন
▪️প্রকাশনী : প্রথমা প্রকাশন
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫